পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১১

* 'ডা. জাকির নায়েকের বক্তব্য ও বাংলাদেশের দশ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলা'

দৈনিক আজাদী                                                       উপসম্পাদকীয়
১৯ মে ২০১১  বৃহস্পতিবার

কামরুল হাসান বাদল
মাঝে মধ্যে রাতে আমার ঘুম হয়না। বিশেষ করে মধ্যরাতের কোন রাজনৈতিক টকশো দেখার পরে। ঘুমের ওষুধ খায় তাতেও কাজ হয় না। সে সময়টা অবশ্য খারাপ কাটে না। সবাই নিদ্রিত, সুনসান পরিবেশে আলেক্সান্দার সেলকার্কদের কবিতার দীপান্তরিত লোকটির মত আমারও মনে হয়, “I am monarch of all survey” এ রকম একটি রাত, ৪ জুন দিবাগত ভোর প্রায় চারটা। টেলিভিশনের রিমোট চাপতে চাপতে থমকে গেলাম একটি চ্যানেলে এসে। peace tv এতদিন এটাতে উর্দু বা হিন্দিতে অনুষ্ঠান প্রচার হতে দেখেছি। আজ দেখলাম বাংলায় বক্তৃতা দিচ্ছেন ডা. জাকির নায়েক। লোগো খেয়াল করে দেখতে পেলাম peace tv বাংলা। এই ভদ্রলোকের বয়ান রাত-দিন প্রচারিত হয় জামাতে ইসলাম পরিচালিত বাংলাদেশের ইসলামিক টিভিতে। পিস টিভি বাংলায় প্রচারিত হওয়ায় আমি একটু আগ্রহ নিয়ে দেখতে চাইলাম। সে সময় ডা. জাকির নায়েক তাঁর কাশ্মির ও আসাম সফর নিয়ে বলছিলেন। তাঁর তরজমাকৃত বক্তব্য ছিলো এ রকম, “আমি একবার কাশ্মির ভ্রমণে গিয়েছিলাম, পৌঁছানোর পর দেখতে পাই কর্তৃপক্ষ আমার জন্যে যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছেন। আমার নিরাপত্তার জন্যে অনেক অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত করেছেন। সেখানে আমি বেশ ক’টি সমাবেশে বক্তৃতা করেছি, বহু মানুষ সে সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন। এ অবস্থায় আমার মনে হয়েছে কাশ্মিরে আমাকে নিরাপত্তা দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই, আমি কোনরূপ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি না। ওর কিছুদিন পরে আমি আসামে গিয়েছিলাম। বিমান থেকে নেমে সেখানেও দেখলাম কর্তৃপক্ষ আমার নিরাপত্তার যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সেখানে গিয়ে কিন্তু আমার মনে হয়েছে আমার নিরাপত্তার প্রয়োজন। কারণ আসামে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী “(উনি টেররিস্ট শব্দটি বলেছিলেন কিনা মনে করতে পারছি না) দল আছে যার নাম উলফা। এটি হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত এবং যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে মুসলমানদের হত্যা করা।” তাঁর এই বক্তব্যের পরে বিজ্ঞাপন বিরতি আসে আমিও একটি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হই, আমার তখনই মনে পরে বাংলাদেশে ২০০৪ সালে দশ ট্রাক অস্ত্র খালাসের ঘটনাটি যা বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে সংঘটিত হয়েছিলো।

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে আপনাদের সামনে ডা. জাকির নায়েকের সামান্য পরিচিতি তুলে ধরা যাক। জামাতে ইসলামী দ্বারা পরিচালিত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ইসলামিক টিভির মাধ্যমেই মূলত জাকির নায়েক বাংলাদেশে পরিচিতি পান। এই টিভিতে ২৪ ঘণ্টার অনুষ্ঠানের সিংহভাগ অংশ জুড়ে থাকে ডা. জাকিরের বক্তৃতার ভিডিও ফুটেজ। যা বাংলায় ডাবিং করা। বর্তমানে বাংলাদেশে তিনি নাকি এতই জনপ্রিয় যে প্রতিদিন তাঁর বক্তৃতার cd, dvd ও বই বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি।

জাকির আবদুল করিম নায়েক ওরফে জাকির নায়েকের জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৮ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে। ইনিই মূলত prace tv এর স্বত্বাধিকারী ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। জাকির নায়েক মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটার্স হাই স্কুল ও কিশিনচান্দ চেলারাম কলেজে পড়াশোনার পর মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড নায়ার হাসপাতাল থেকে এম.বি.বি এস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সাল থেকে পেশা শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো “যেসব মুসলিম তরুণ যুবক, যারা তাঁদের আপন ধর্মের নানা ত্রুটি ও দুর্বলতা নিয়ে লজ্জিত ও কৈফিয়তপ্রবণ এবং মনে করে যে, ধর্মটা সেকেলে হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন ইসলাম সম্পর্কে বিদ্যমান ভুল ধারণাগুলো দূর করা এবং নাইন এলেভেনের পরে ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলো যে বিষোদগার করে যাচ্ছে তা প্রতিহত করা। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে এটি করতে গিয়ে তিনি মুসলিম তরুণদের শান্তির পথ থেকে হিংসা ও হানাহানির পথে ডেকে আনছেন। লাদেন সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছিলেন লাদেনের সাথে দেখা হয়নি বা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এ জন্যে তিনি তাঁর সমালোচনা করবেন না। তিনি আরও বলেন বিন লাদেন যদি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকেন তবে আমি তাঁর পক্ষে। তিনি আরও বলেন প্রত্যেক মুসলমানেরই এক একজন জঙ্গিবাদী হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যের মাঝেও অনেক বৈপরীত্য আছে। তিনি জিহাদে অংশ নিতে বলেন আবার বলেন, “কোন মুসলমান কখনোই যেন একজনও নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস সৃষ্টি না করেন।” টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনাকে তিনি বুশের ষড়যন্ত্র বলে মত দিলেও এর আগে পরে জিহাদ বা ইসলামী আন্দোলনের নামে হাজার হাজার নিরপরাধ ব্যক্তি হত্যার জন্যে কখনোই কোন জঙ্গিগোষ্ঠীর নিন্দা জানান নি। বরঞ্চ তিনি তাঁর দেশে ও বহির্বিশ্বে বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবিদদের কাছে বিতর্কিত ও নিন্দনীয় হয়েছেন কারবালার যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও এজিদের নামের পরে “রাদি আল্লাহ তা’আলা আনহু” উচ্চারণ করে। ইসলামের ১৪৩২ বছরের ইতিহাসে এজিদ একটি ঘৃণিত নাম এবং বিশ্বের কোন মুসলিম পরিবারে এই নামে সন্তানের নামকরণ করেনি কেউ। তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হচ্ছে তিনি তাঁর সধর্মের কথা বলতে গিয়ে অন্য ধর্মের ব্যাপারে অসম্মানজনক ও আপত্তিকর মন্তব্য করে থাকেন যা বর্তমান বিশ্বে সকল ধর্মের সহাবস্থান ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিয়েছে। যে কারণে ভারতের প্রখ্যাত কলামিস্ট, রাজনীতিক ও গ্রন্থাকার খুশবন্ত শিং নায়েকের এইসব বক্তৃতাকে নেহায়েত বালখিল্য বলে অভিহিত করে বলেছেন এগুলো বড়জোড় আন্ডার গ্রাজুয়েট লেবেলের বিতর্কের বিষয়বস্তুর মত। তালেবান বা পাক-আফগান সীমান্ত অঞ্চলে জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরির পিছনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার কথা কে না জানে। সাম্রাজ্যবাদের নিন্দা করা যাবে আর তার সৃষ্ট ও মদদপুষ্ট শক্তির নিন্দা করা যাবে না তাতো হয়না। আর ডা. নায়েক নিশ্চয়ই ভাল করে জানেন যে, পাক আফগান সীমান্তের গভীর অরণ্যে উৎপাদিত পপি (যে গাছ থেকে আফিং, হেরোইন ও অন্যান্য মাদক তৈরি হয়) ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ কারা করেন এবং এইসব মাদকের বিনিময়ে অন্য দেশ থেকে কারা অস্ত্র সংগ্রহ করেন।এসব ব্যাপারে ডা. জাকিরের কোন মন্তব্য আছে কিনা জানি না তবে তার উপর্যুক্ত মন্তব্যটি নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই।

তিনি বলেছেন উলফা হিন্দুদের দ্বারা গঠিত ও নিয়ন্ত্রিত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন যাদের প্রধান কাজ হলো মুসলিমদের হত্যা করা। তাহলে তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে উলফাকে সমর্থন করা মানে মুসলিমদের হত্যায় সহায়তা করা যা কোন সভ্য মানুষ করতে পারেনা। আর মুসলিমরাতো মরে গেলেও নয়। উলফা সংক্রান্ত ডা. জাকির নায়েকের কথাটি যদি সত্যি হয় তাহলে ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল ভোরে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় জেটিঘাটে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। এ কথাটি আজ কারো অজানা বা অজ্ঞাত থাকার কারণ নেই যে উক্ত ১০ ট্রাক অস্ত্র বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কোন দেশে কাদের জন্যে এবং কী উদ্দেশ্যে চালান করা হচ্ছিল। মামলাটির সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে গত ২৯ জুন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা সচিব মোহাম্মদ নুরুল আমিন ও উলফার সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ণ্ডয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে তাদের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার নির্দেশ দিয়েছেন। সামান্যতম খোঁজখবর রাখেন এমন সব পাঠক নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন বিএনপি-জামাত জোটের অনেক নেতা এমনকি সাংসদ পর্যন্ত বলার চেষ্টা করেছেন যে কাজটি সঠিক ছিল এবং যে কোন স্বাধীনতাকামী (তাদের ভাষায়) জাতিকে সাহায্য করা আরেকটি স্বাধীন জাতির কর্তব্য। বাংলাদেশ যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে সেহেতু অন্য জাতির মুক্তিযুদ্ধকে অবশ্যই সমর্থন করা উচিৎ।

বাংলাদেশের প্রতি ভারতের একটি বড় অভিযোগ ছিল বরাবরই যে এদেশে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হয় পাকিস্তানের আই. এস. আই এর সহযোগিতায়।

আমরা মানে বাংলাদেশের মানুষেরা জানে না এই ঘটনার (১০ ট্রাক অস্ত্র আটক) আগে বা পরে আরও কত শত ট্রাক অস্ত্র পারাপারের পরে এই ঘটনাটি জানাজানি হয়েছিল। সম্ভবত দুজন জুনিয়র পুলিশ অফিসার এর আগে থেকে ঘটনা না জেনে থাকা কিংবা অন্যকোন কারণে সেদিন অস্ত্রসমেত ঘটনাটি ফাঁস হয়।
 
বগুড়ার গুলিভর্তি ট্রাক আটকের ঘটনাটিও এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। এই ঘটনার পরে এবং ডা. নায়েকের উক্ত মন্তব্যের পরে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসে তাহলো-
 
১। এ ঘটনার দ্বারা ভারতের তোলা এতদিনের অভিযোগ সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে যা দুটি বন্ধু রাষ্ট্রের জন্যে বিব্রতকর শুধু নয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক পরিণতি আনতে পারতো।
 
২। শেখ হাসিনার সরকার যখন প্রকাশ্যে ও চুক্তির মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট বা করিডোরের কথা বলে তখন বিএনপি জামাত জোট তার তীব্র বিরোধিতা করে শুধু না তাদের ভাষায় বাংলাদেশ তাহলে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হবে। তাহলে বিএনপি-জামায়াত জোট রাতের আঁধারে একটি জঙ্গি-সংগঠনকে কী করে তাদের অস্ত্র পরিবহনে করিডোর প্রদান করলো।

৩। যদি সে সংগঠনের প্রধান কাজ হয় মুসলিমদের হত্যা করা (ডা. নায়েকের ভাষায়) তাহলে বিএনপি-জামায়াত জোট যারা কথায় কথায় ইসলামের দোহাই দেয়, আওয়ামী লীগ বিসমিল্লাহ ভক্ষক বলে প্রচারণা চালায়, আওয়ামী লীগ ইসলামের শত্রু বলে প্রচার করে তারা কী করে এমন একটি সংগঠনকে গোলাবারুদ সরবরাহের কাজে সহায়তা করে? এখানে স্মর্তব্য যে, সিইউএফএল- মানে ইউরিয়া সার কারখানার যে ঘাটে অস্ত্র খালাস হয়েছিলো সেই কারখানাটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে যার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী। যে জামায়াতে ইসলামী “আল্লাহর আইন চাই সৎ লোকের শাসন চাই” োগান দেয় তারা কীভাবে এমন একটি জঙ্গি সংগঠনকে সমস্ত কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ করে রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও নিরাপত্তা প্রদান করলো। এই প্রশ্নগুলোর জবাব কে দেবে?

অথচ এই বিএনপি জামায়াত গোষ্ঠীটিই ইসলামের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের সহজ সরল মানুষদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে ক্ষমতায় যায়, আর ক্ষমতায় গিয়ে সারা দেশকে বোমাতঙ্কে ডুবিয়ে রাখে, বাংলাভাইয়ের উত্থান ঘটায়, ৬৪ জেলায় বোমা ফাটায় আর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মত ইতিহাসের জঘণ্যতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।

বাংলাদেশের যে গোষ্ঠীর কাছে ডা. জাকির নায়েক নায়কতুল্য তারা এবার কী বলবেন? দশ ট্রাক অস্ত্র কাদের জন্যে পাচার করা হচ্ছিল এবং সে ঘটনার সাথে কারা কারা জড়িত তা আজ প্রকাশ্য। আর নায়েক যা বলেছেন তা সত্য ধরে নিলে বুঝতে হয় বিএনপি-জামায়াত জোট আসলেই মুসলমানদের শত্রু, বাইরে যতই ইসলামের কথা বলুক না কেন আসলে এদের বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ