পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

'নির্বাচনই কি সংকটের মূল কারণ'


১৯ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৫ পৌষ ১৪২০ সাল ১৫ সফর ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ একটি প্রণিধানযোগ্য প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এলেন। এতদিন এ বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক পদে থাকা এবং আসন্ন নির্বাচনের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তির এই বক্তব্য বেশ আলোচনার সূত্রপাত ঘটাবে সন্দেহ নেই। গত মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়। তিনি বলেন, আপনারা(সাংবাদিকরা) নিজেরাই বিগত অনেকদিন থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। এই নৈরাজ্য অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। বলাবাহুল্য বর্তমান পরিস্থিতির দায় নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে বলে বিএনপি ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করলেন সিইসি। বর্তমানে সারাদেশে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা কি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুধু? একটু অতীতে, একটু গভীরে গেলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

১। বিএনপি কি প্রকৃতই নির্বাচনে যেতে আগ্রহী? তাদের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কোনো সুযোগ নেই। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের পরে সংসদ মনে করেছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আর প্রয়োজন নেই- কাজেই সংসদে তা রহিত করা হয়েছে অর্থাৎ এই ব্যবস্থা বাদ দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছে। সংবিধানে সংশোধনী আনতে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়। বর্তমান সরকারের তা ছিল বলে তারা সহজেই সংবিধান সংশোধন করতে পেরেছে। সংবিধান যারা সংশোধন করেছেন তারা সবাই একটি স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনের দ্বারা নির্বাচিত। যে নির্বাচন দেশে-বিদেশে সর্বমহল দ্বারা স্বীকৃত ও প্রশংসিত। তারা-দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। কাজেই তাদের সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত বলেই মেনে নিতে হবে। সংবিধানের কোথাও লেখা নেই সংশোধন সর্বসম্মতিক্রমে হতে হবে কিংবা গণভোট দিতে হবে।

২। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে বিএনপি প্রথম থেকে অসহযোগিতার মনোভাব নিয়েছে। এ বিষয়ে গঠিত কমিটিকে বিএনপি কোনো প্রকার সহযোগিতা করেনি। তাদের কোনো প্রকার প্রস্তাবও পেশ করেনি। অন্যদিকে নির্বাচন পরিচালনার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন গঠনেও তারা সহযোগিতা করেনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের আহবানেও তারা সাড়া দেয়নি। সার্চ কমিটিতে কোনো নামও জমা দেয়নি তারা। অর্থাৎ নির্বাচনকালীন একটা জট তৈরি পরিকল্পনা তারা আগে থেকেই নিয়ে রেখে ছিল। শেষমেশ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি প্রস্তাব এনেও পরে তারা তা ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন মহল থেকে তাদের দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হবে তা উপস্থাপনের দাবি জানান হলেও তারা তা করেনি। শেষে শেখ হাসিনা নিজে থেকে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়ে সে সরকারের বিএনপিকে অংশগ্রহণের আহবান জানালে বেগম খালেদা জিয়া তড়িঘড়ি করে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি ফর্মূলা পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ৫ জন করে নিয়ে দশ জনের একটি উপদেষ্টা পরিষদ ও নিরপেক্ষ একজনকে সরকার প্রধান নির্বাচিত করা। তার এই প্রস্তাব বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিল। কারণ অদূরদর্শী, হোমওয়ার্কবিহীন এই প্রস্তাব অন্তসার শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কারণ ১৩ ও ১৭ বছর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেকেই মৃত এবং বাকিদের মধ্যে অধিকাংশই শারীরিক ও মানসিকভাবে এমন গুরুদায়িত্ব বহনে অক্ষম। বেগম জিয়ার এই সংবাদ সম্মেলনের পর জানা গেছে তাঁর এ ধরনের প্রস্তাবের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির অনেকেই অব্যহিত ছিলেন না। তার মানে বিএনপি এখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে অনড় থাকলেও তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য বা প্রস্তাব এখনো নেই।

৩। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা হোক বা সর্বদলীয় সরকারই হোক মূল সমস্যাটি হলো সরকার প্রধান কে হবেন তাই নিয়ে। বিএনপির দাবি মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করে তাহলে সে সরকারের প্রধান কে হবেন? এই প্রশ্নটি চিরকালীন অমিমাংসিত। একটি সময়ে মনে করা হয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি বুঝি নিরপেক্ষ হন। কিন্তু ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান ও ২০০৬ সালে বিএনপির পছন্দনীয় প্রধান বিচারপতি এম আর ইমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার অভিপ্রায়ে চাকরির বয়সসীমা বাড়িয়ে দেওয়া ও তৎপরবর্তী বিএনপি সরকারের কার্যকলাপে আর সেই বিশ্বাসের জায়গা নেই এমন কি বিচারপতি খায়রুল হকও আর সরকার প্রধান হতে চান না। এমনকি বিচারপতিদের বিব্রত ও বিতর্কিত না করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি তাঁর রায়ে।

৪। আসলে এখন নির্বাচনটি মুখ্য নয়। এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও এই প্রশ্নে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান। কারণ বিএনপি জামায়াতের দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সহচর। এবং স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্জম্মদাতা। কাজেই বিএনপি তার দীর্ঘ কালের সহচর ও সহযোদ্ধাকে বেকায়দায় ফেলে একটি নির্বাচনে আসতে রাজি নয়। বর্তমানের পরিস্থিতি অনেকটা একাত্তরের পরিস্থিতিরই মতো। শুধু দেশে নয়, বাংলাদেশের প্রশ্নে এখন বিশ্ব রাজনীতিতেও একাত্তরের মতো মেরুকরণ ঘটেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে রাষ্ট্রগুলো আমাদের বন্ধু হিসেবে ছিল তারা ঠিকই বন্ধু আছে, অন্যদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবারও একাত্তরের ভূমিকায়। একাত্তরে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে ভারত ছাড়া তৎকালীন অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। এবার ভেঙে যাওয়া সেই সোভিয়েত পাশে নেই বাংলাদেশের। দেশের পরিস্থিতিও তাই। যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, অন্যদিকে পাকিস্তানি ও তাদের ভাবধারায় গঠিত বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অন্যদিকে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবধারায় একটি মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানানোর যুদ্ধ। যুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করছি এ কারণে যে, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক দল জামায়াত ও তার সহযোগী শক্তিগুলো ইতোমধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলে ঘোষণাও দিয়েছে। তারা অনেক আগে থেকেই গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে এসেছে।

৫। বিগত এক বছরেরও অধিক সময় ধরে বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী বা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারও রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত শিবির যা করেছে এবং তাতে নৈতিক সমর্থন দিয়ে দেশে যে পরিস্থিতি উদ্ভব করেছে তার দায় থেকে বিএনপি মুক্ত থাকতে পারে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হরতাল-অবরোধের নামে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে তাকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। বর্তমানের আন্দোলন বিএনপির আন্দোলন নয়। এবং এই আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণের চাবিও এখন বিএনপির হাতে নেই। তারা অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে কর্মসূচি দিচ্ছেন আর সারা দেশে অমানবিক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা।

৬। বর্তমান পরিস্থিতি যে একাত্তরেরই মতো তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে- পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বাংলাদেশের ওপর নিন্দা প্রস্তাব পাশ। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রতিবাদে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলাম কাদের মোল্লাকে শহীদি-পাকিস্তান আখ্যা দিয়ে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করে। তাতে সমর্থন দেয় ইমরান খানের তাহরিখ-ই-ইস্তেকলান, বর্তমান ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ও অন্যান্য কয়েকটি দল। বিরোধীতা করে পাকিস্তান পিপলস পার্টি,ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিসহ আরো কয়েকটি দল। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ও সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভীষণ আপত্তিকর মন্তব্য করেছে বাংলাদেশকে নিয়ে। সেদেশের জামায়াত পাকিস্তান সরকারকে আহবান করেছে বাংলাদেশ আক্রমণ করার জন্যে। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার আগে-পরে গোলাম মাওলা রনির মতো সাধুবেশে যে শয়তানগুলো এই কাদের মোল্লা সেই কসাই কাদের মোল্লা নয় বলে প্রচারণা চালিয়েছিল পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান তাদের গালে চপেটাঘাত হিসেবে বর্ষিত হয়েছে সন্দেহ নেই।

৭। যারা বাংলাদেশ চায়নি, তারা হুমকি দিয়ে তা কার্যকর করতে পারে যে ৫৫ হাজার বর্গমাইল তারা জ্বালিয়ে দেবে। যারা বাংলাদেশ চায়নি তারা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নও চায় না। তারা চায় এদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হোক। এদেশের অর্থনীতির চাকা একেবারে বন্ধ হয়ে গেলেও তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিএনপির মতো একটি বড় দল, যারা দুবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, বাংলাদেশের বিনির্মাণে যাদেরও কিছু অবদান ছিল তারা কেন জামায়াতের মতো একটি দলের কাছে সব কিছু সপে দিয়ে বসে আছে। জামায়াতের ইশারায় পরিচালিত হবে?

৮। কাজী রকিবউদ্দিন সাহেবের মন্তব্যের সাথে আমি একমত। বর্তমানে দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি চালানো হচ্ছে তা নির্বাচন বানচালের জন্যে নয়। মূলত বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা। বিগত ৫ বছর দেশের সকল ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটেছে তাকে বিস্ময়কর বলে আখ্যায়িত করেছিল বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়। বিশ্বের দ্রুত অগ্রসরমান দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০০৬ সালের পরে যারা আর দেশে ফেরেননি, আজকের বাংলাদেশ তাদের জন্যে এক অপার বিস্ময়। বাংলাদেশের অগ্রগতি যারা চায় না, কল্যাণ যারা চায় না এবং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নকে যারা (দেশি-বিদেশি) বাধাগ্রস্ত করতে চায় তাদের এজেন্ট হিসেবে একটি অপশক্তি আজ ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছে। আর বিএনপি একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে তাতে সমর্থন যুগিয়ে কার্যত আত্মঘাতী সিদ্ধান্তই নিচ্ছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৩

'নষ্ট রাজনীতি-ভ্রষ্ট রাজনীতিক'

২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২০ সাল ২৩ মহররম ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
যেদিন থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব সেদিন থেকে জবরদখল, সেদিন থেকেই রাজনীতির শুরু। অতএব রাজনীতি মানেই অপরের রাজ্য-সম্পদ আর ক্ষমতা দখলের চর্চা। অ্যারিস্টটল, কার্লমার্ক্স এঁরা রাজনীতিকে সভ্য-শোভন ও গণমানুষমুখী করে তোলার চিন্তা-ভাবনা করেছিরেন। রাজনীতিকে গণমানুষের মুক্তির কথা বলে অধিকারের কথা বলে, সাম্যের কথা বলে তা শিখিয়েছিল কার্ল মার্ক্স। গত শতকের ৮০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বিপর্যয় নেমে আসে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে। রাজনীতি থেকে সুস্থ সভ্যতা ও মানবতাবোধ বিদায় নিয়েছে তখন থেকে। সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতিকে প্রতিনিয়ত অমানবিক করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে পুঁজিবাদী বিশ্বের নয়া কৌশল। এজন্যে বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিতেও ব্যাপৃত তারা। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্ব মোড়ল। যে দেশটি প্রকৃত অর্থে কোনো দিন বিশ্বের কোনো সাধারণ মানুষ অর্থাৎ নির্যাতিত নিপীড়িত-বঞ্চিত জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি। নিঃস্বার্থভাবে একটি দানা-পানি দিয়েও সাহায্য করেনি কোনো দেশ বা জাতিকে।

ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে আমাদের এ অঞ্চলে রাজনীতিক বেচাকেনা অর্থাৎ প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ইতিহাসও নতুন নয়। রাজনীতিকরা বেচা-বিক্রি হয়েছেন অনেক আগে থেকেই। বেশি পেছনে না গিয়ে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের কথাই ধরি। যে যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার কথাই ধরি। সেদিন মীরজাফর বিক্রি হয়েছিলেন বলেই বাংলার পতন হয়েছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল। সেদিনের যুদ্ধে মীরজাফর ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিশ্বাসঘাতকতা না করলে উপমহাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হতো হয়ত। অন্তত ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হওয়ার গ্লানি আমাদের বহন করতে হতো না। পরে ভারতজুড়ে এমন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মীর জাফর কাজী জাফরদের (গত শতকের মীরজাফর) কারণে ব্রিটিশরা ১৯০ বছর ভারত শাসন করে যেতে পেরেছিল।

ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে। রাজনীতি তখনও জমিদার জোতদার নবাব শ্রেণীর দখলে। অভিজাতরাই তখন মুসলিম লীগ করতেন। অবিভক্ত বাংলায় তখন একটু একটু পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের মতো কিছু তরুণ রাজনীতিকে গণ মানুষের করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। ভারতবর্ষ স্বাধীন হতে যাচ্ছে সে সময়ও রাজনীতিকরা কীভাবে বেচা-কেনা হতেন তার একটি চমৎকার বর্ণনা আছে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে। তা থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দিচ্ছি। যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে তখন বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের পতন হয়েছে। অর্থাৎ পতন ঘটানো হয়েছে। ও সময়ের কথা, বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, এর পূর্বে আমার ধারণা ছিল না যে, এমএলএরা (নিম্ন সভার সদস্য) এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি। আমার মনে আছে, আমাদের উপর ভার পড়ল কয়েকজন এমএলএকে তাদের নাম বলতে চাই না, কারণ অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন এমএলএকে মুসলিম লীগ অফিসে আটকানো হলো। তিনি বারবার চেষ্টা করেন বাইরে যেতে। কিন্তু আমাদের জন্য পারছেন না। কিছু সময় পরে বললেন, “আমাকে বাইরে যেতে দিন, কোনো ভয় নেই, বিরোধীদল টাকা দিয়েছে। আমি যদি কিছু টাকা আনতে যাই আপনাদের ক্ষতি কি? ভোট আমি মুসলিম লীগ পক্ষেই দেব।” আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। বৃদ্ধ লোক, সুন্দর চেহারা, লেখাপড়া কিছু জানেন, কেমন করে এই কথা বলতে পারলেন আমাদের কাছে? টাকা নেবেন একদল থেকে অন্য দলের সভ্য হয়ে, আবার টাকা এনে ভোটও দেবেন না। কতটা অধঃপতন হতে পারে আমাদের সমাজের। এই ভদ্রলোককে একবার রাস্তা থেকে ধরে আনা হয়েছিল। শুধু সুযোগ খুঁজছিলেন কেমন করে অন্য দলের কাছে যাবেন। এ রকম আরেক এমএলএকে আনতে বঙ্গবন্ধুকে রংপুর পাঠানো হল। যুদ্ধাবস্থায় প্রায় উপোস থেকে তিনি ওই জমিদার কাম এমএলএর বাড়ি পৌঁছানোর পরে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন না কিছু খাব কিনা। পথে খেয়েছি কিনা। বলতেন, এখনতো রাত তিনটা বাজে। বিছানার কি দরকার হবে? বললাম, দরকার নেই যে সময়টা আছে বসিয়েই কাটিয়ে দেব। ঘুমালে আর উঠতে পারব না। খুবই ক্লান্ত। একদিকে পেট টনটন করছে, অন্যদিকে অচেনা রংপুরের মশা। একদিন পরে তিনি এসেছিলেন (কলকাতায়) তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য লোক রাখা হয়েছিল। তবু পেছনের দরজা দিয়ে এক ফাঁকে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে পাওয়া যায় নি। আমরা ছাত্র ছিলাম, দেশকে ভালোবাসতাম, দেশের জন্য কাজ করতাম। এই সকল জঘন্য নীচতা এই প্রথম দেখলাম। পরে যদিও অনেক দেখেছি। এই সমস্ত খান বাহাদুরদের দ্বারা পাকিস্তান আসবে, দেশ স্বাধীন হবে ইংরেজদের তাড়ানো যাবে। বিশ্বাস করতে কেন যেন কষ্ট হয়। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের (এম.এনএ, এম এলএ) শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। টাকার বিনিময়ে নিজদলের বিপক্ষে ভোট দিয়ে যেন ষড়যন্ত্র পাকাতে না পারেন সে লক্ষেই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ সংযোজন করেন। এ আইনের কারণে বর্তমানে কোনো সংসদ সদস্য ফ্লোর ক্রস করতে পারে না, অর্থাৎ নিজদলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবে না সংসদে।

স্বাধীন বাংলাদেশে নেতা বেচাকেনার সংস্কৃতি চালু হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির জনককে হত্যার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া তখন ইচ্ছা পোষণ করলেন রাজনীতি করবেন। দল গঠন করবেন। জড়ো করলেন শাহ আজিজদের মতো শীর্ষ রাজাকারদের। অন্যান্য দল থেকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য ভয় দেখিয়ে অর্থ দিয়ে অন্যদল থেকে নেতা ভাগিয়ে গঠন করলেন রাজনৈতিক দল। স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার,চীনাপন্থি কমিউনিস্ট, মুসলিম লীগার ও নীতি ভ্রষ্ট রাজনীতিক নিয়ে গঠিত হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। তৎকালে স্বাধীনতা ও আওয়ামীলীগ বিরোধী সবাই জড়ো হলেন জেনারেল জিয়ার পেছনে।

পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদও তার গুরু জেনারেল জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। অন্যদল থেকে নেতা কিনে দল গঠন করেছেন। যুগে যুগে মীরজাফর থেকে কাজী জাফর, রায় বল্লভ থেকে মওদুদের মতো নেতার অভাব হয়নি রাতারাতি ভোল পাল্টাতে এবং অর্থ ও ক্ষমতার বিনিময়ে স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে।

আজ এরশাদের গৃহপালিত প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর এরশাদের বর্তমান অবস্থান দেখে বলেছেন, গত ১০০ বছরের মধ্যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা তিনি দেখেননি। যে স্বৈরাচারের দাসত্ব করেছিলেন তিনি,সেবাদাসে পরিণত হয়ে তার শাসন শোষণকে দীর্ঘায়িত করেছিলেন তেমন তাঁবেদার কাজী জাফর ও মওদুদদের মুখে নীতিকথা, গণতন্ত্র ইত্যাদির কথা মানায় না। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন করে কলুষিত করার অপরাধে দু’ জেনারেলের সাথে এ ধরনের রাজনীতিকদেরও বিচার হওয়া উচিত। আজ বিএনপির সাথে এরশাদ যে আচরণ করেছে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি সৃষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির শিকার এখন তারা নিজেই। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই বলে যারা রাজনীতির সুবিধাবাদিতাকে জিইয়ে রেখে নিজেদের ক্ষমতা ও লাভের অংশীদার করে রাখতে চান বর্তমান রাজনীতিতে তো তাদেরই খেলা চলছে। রাজনীতিকদের জন্যে রাজনীতিকে সত্যি কঠিন করে গেছেন জেনারেল জিয়া। তাই দেশে আজ পরীক্ষিত, সৎ নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক নেই বললেই চলে। রাজনীতির নিয়ন্তা আজ পেশিশক্তি, কালোটাকার মালিক। যারা নিজেদের বিক্রি করার জন্যে কোরবানি পশুর মতো সেজে গুজে থাকেন। বিএনপি সৃষ্ট রাজনৈতিক কূটচালে নিজেরা পতিত হয়েছে। তাতে বিস্ময়ের কী আছে?

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৩

'নেই কাজ তো খই ভাজ'

২১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২০ সাল ১৬ মহররম ১৪৩৫ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
প্রিয় পাঠক, জনগণ হিসেবে যখন আমাদের করার কিছুই নেই তখন এক কাজ করা যায়। বসে বসে ভাবা যায়। ‘কী হইলে কী হইত’ ধরনের। নিকট অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়েই শুরু করি। ধরুন সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়ে যদি মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতা বলতেন, যাক দেরিতে হলেও যখন আপনি নিজেই ফোন করেছেন, আপনার কথাই রাখলাম। হরতাল প্রত্যাহার করে নিলাম। আমি আপনার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে আলোচনার জন্য আসছি। মাননীয় বিরোধীদল নেতা গণভবনে গেলেন এবং আলোচনার সূত্রপাত করলেন। বিরোধী দলীয় নেতা বললেন, যেহেতু আমি গেস্ট, আপনি হোস্ট। আপনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছেন সেহেতু আমার কথাই আপনাকে আগে শুনতে হবে। বেগম জিয়া বললেন, আমার দাবি ছিল নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন। আপনি তা চান না। আপনি চান সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। ঠিক আছে, আমি এক পা পেছনে গেলাম। বাদ দিলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি। আপনার ফর্মূলাতেই নির্বাচনে যাব তবে এবার মাত্র দুটো দাবি মেনে নিন। প্রথম দাবি সংসদে আসন হিসেবে নয়, ভোটের হিসেবে নির্বাচনকালীন সরকারের ১০ জন মন্ত্রীর মধ্যে আমাদের পাঁচ, আপনাদের পাঁচ। এই সরকার প্রধান হিসেবে আপনাকে (শেখ হাসিনাকে) মেনে নেব না। অন্য কাউকে নির্বাচিত করতে হবে যার প্রতি আমাদেরও আস্থা আছে। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেছিলেন, যেসব মন্ত্রণালয়চান আপনাদের তা দেওয়া হবে। সে সুযোগও খালেদা জিয়া কাজে লাগাতে পারতেন। বলতে পারতেন, স্বরাস্ট্র, তথ্যও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের মতো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন কয়েকটি মন্ত্রণালয় আমাদের দিতে হবে। এরপরের ঘটনা কী হতো? আওয়ামী লীগের দফা রফা হতো। তখন আওয়ামী লীগেরই দায়িত্ব হতো বিরোধী দলের দাবি মেনে নেওয়া নতুবা পাল্টা কোনো অজুহাত তৈরি করা। কিন্তু তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোনে সরাসরি ধমকিয়ে গেছেন পুরো ৩৭ মিনিট। পরে অবশ্য দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। টেলিফোনের বিষয়টি নিয়ে ছোট্ট করে একটু বলতে চাই। এই টেলিফোন সংলাপের পরে আওয়ামী লীগ (বিরোধী) শিবিরে দুটো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এক পক্ষ বলেছেন, আমাদের নেত্রী আচ্ছা ধোলাই দিয়েছেন হাসিনাকে। ৩৭ মিনিটতো কোনো কথাই বলতে দেন নাই। দুই পয়সারও পাত্তা দেন নাই আমাদের নেত্রী হাসিনাকে। অন্যপক্ষ বলছে এটি সরকারের একটি পাতানো ফাঁদ। শেখ হাসিনা জানতেন যে এই কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে, অতএব তিনি সংযত হয়ে কথা বলছেন। এর উত্তরে আমি পূর্বেই লিখেছি। টেলিফোনে আড়িপাতা হবে না বা রেকর্ড হয়ে তা জনসম্মুখে আসবে না এমন ভাবনা যাদের তারা অদূরদর্শী ও অনাধুনিক। এটিও আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয়। আর একজন প্রধানমন্ত্রী নয়, সাধারণ একজন আমন্ত্রণকারীর কথাও যে ধৈর্য ধরে শুনতে হয়, ভদ্রভাবে জবাব দিতে হয় তা শিক্ষিত মানুষ মাত্রই জানেন। অসৌজন্যতা, অভব্যতা বিজয়ী হওয়ার পন্থা নয়। এভাবে যারা জিততে চান তারা মূলত গণতন্ত্রের বন্ধু নন। যাক আমরা জনগণ ভাবলেতো আর হবে না। নেতানেত্রীকে ভাবতে হবে। তাঁরা যে সবসময় আমাদের কথা মাথায় রেখে কাজ করেন তা তো নয়। তাঁরা চলবেন তাঁদের মতো আমরা শুধু পেছন থেকে জিন্দাবাদ োগান দিয়ে যাব। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ ভাবতেই পারেন সেদিন বেগম খালেদা জিয়া সামান্য একটু নমনীয় হলে আজকের দিনগুলো অন্য ধরনের হতো। কিন্তু তা তিনি হননি। হননি কারণ তিনি পরাজিত (!) হতে চান না। অর্থাৎ নির্বাচনের আগেই তিনি জিততে চান। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে ও পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া সরকারের পছন্দের বিচারপতি এম আর হাসানের অধীনে নির্বাচনে যাননি শেখ হাসিনা। কাজেই তিনিও শেখ হাসিনাকে দিয়ে এসব কাজ করিয়ে নিতে চান। এক-তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন। দুই. হাসিনার পদত্যাগ ও এই সরকারের মনোনীত বা পছন্দের কারও অধীনে নির্বাচনে না যাওয়া। নিজদলীয় সংসদ সদস্যদের দ্বারা গঠিত সরকারের চেয়ে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ওপর বেগম জিয়ার আস্থা বেশি কেন বুঝতে পারছি না। আর বর্তমানে যেভাবে দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণ হতে যাচ্ছে তার ভবিষ্যত কী হবে তা-ও আমি বুঝতে পারছি না।

তবে এতকিছু পরেও আমি বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বড় একটা দোষ দিই না। কারণ জনগণ চায় বলেই এমন নেতৃত্ব দেশে টিকে আছে। এমন সব ব্যক্তি নেতৃত্ব দিচ্ছেন বা নেতারা সম্মান পাচ্ছেন তা দেখলে শিহরিত হতে হয়। একটি আপ্তবাক্য মনে পড়ে আমার। চোরের সর্দার চোর হয়,ডাকাতের সর্দার ডাকাত। আউলিয়ার সর্দার হয় আউলিয়া। দেশের জনগণ যদি সৎ নেতৃত্ব, যোগ্য নেতৃত্ব চাইতো তবে রাজনীতিতে সৎ মানুষদের কদর বাড়তো।

রাজনীতি পরিশুদ্ধ হতো। রাজনীতি থাকতো সৎ মানুষের হাতে। পেশি শক্তি, কালো টাকার মালিক আর ফার্মের রাজনীতিকদের আখড়ায় পরিণত হত না রাজনৈতিক দলগুলো। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি ব্যক্তি সৎ হলে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সৎ হতে বাধ্য। আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, পেশাজীবী সংগঠন থেকে শুরু করে প্রতি স্তরেই নোংরা রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত আজ দলদাসে পরিণত হয়েছেন। জাতির এই সংকটকালে একটি অভিভাবক শ্রেণি নেই দেশে যাঁদের কথা বা পরামর্শে জাতি একটি দিক নির্দেশনা পেতে পারেন। অনেকেতো ভয়ে আমাদের গৌরবের,অহংকারের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, ত্রিশ লক্ষ শহীদ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না। পাছে তিনি আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। স্বাধীনতার সমস্ত সুফল ভোগ করেও যারা স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আশ্চর্য নীরবতা পালন করেন তাদের সততা ও পৌরুষ নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থেকে যায়। এখন প্রতিদিন আমাদের নিত্য নতুন চমকের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এখনই বলা যাচ্ছে না আগামী দুঘণ্টা পরে দেশে কী ঘটতে পারে। এমন একটি অনিশ্চিত পরিবেশে দেশে যে কোনো কিছু ঘটে যাওয়া সম্ভব। সেটি রাষ্ট্রীয় হোক অথবা সামাজিক হোক। সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন অনেক দুষ্টচক্র থাকে যারা এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নিতে বলে বেগম খালেদা জিয়া নতুন কোনো আশার আলো দেখাতে পারেন নি। তারা বঙ্গভবনে গিয়ে তাঁদের পুরনো দাবি-দাওয়াগুলোই তুলে ধরেছেন শুধু। বাস্তবে যা সম্ভব হবে না বলেই মনে হয়। এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার আগেই যদি সংসদ ভেঙে যায় তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু সুরাহা না করে, তবে বর্তমান পদ্ধতি ও নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই দেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে। সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও হবে। অর্থাৎ নির্বাচন একটি হতে যাচ্ছে দেশে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি যদি মনে করে তাদের ছাড়া নির্বাচন করে সরকারকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ফলভোগ করতে হবে সেটিও হয়ত ভুল চিন্তা বিএনপির। কারণ ১৯৯৬ সালের বাস্তবতা আর ২০১৩ সালের বাস্তবতা এক নয়, বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিও অনেক পাল্টে গেছে ইতোমধ্যে আর সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপিযে আওয়ামী লীগের মত সমর্থ নয় তা পরীক্ষিত। আর জামায়াতের অর্থ নিয়ে ভাড়াটে লোকদের দিয়ে সারাদেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টাও বেশিদিন চালানো যাবে বলে মনে হয় না। কারণ এই হত্যা-ধ্বংস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই জনমত তৈরি হতে শুরু করেছে। সে সাথে সাধারণ মানুষ মনে করছে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য তাকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত। এটি শুধু দেশের জনগণের ভাষ্য নয়, বিএনপির প্রতি সমর্থন আছে এমন বন্ধুরাষ্ট্রগুলোও চায় বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করুক। যারা বিএনপি নেতৃত্বকে বোঝাতে চায় বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করলে ভোট ব্যাংকে ঘাটতি পড়বে তারা দলকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। বাস্তবে জামায়াতের ৩ শতাংশ ভোট বিএনপি না পেলেও অন্যভাবে এরচেয়ে কয়েক শতাংশ ভোট বরং বেশিই পাবে।

খই ভাজতে ভাজতে রাজনীতি নিয়ে অন্তত এটুকু বলতে পারি যে, বাংলাদেশ সামাজিক,অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে ভাবে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে তার সাথে যদি রাজনীতিকরা নিজেদের সামিল করতে না পারেন তবে দেশের সৎ, পরিশ্রমী ও ভালো মানুষরা দ্রুত রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বেন। কারণ মানুষ তাদের শ্রমে-ঘামে গড়া এই বিশাল অর্থনৈতিক ভিত দুর্নীতিবাজ ক্ষমতালোভী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেবে না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৩

'আর কত হত্যা ও লাশের রাজনীতি'


১৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৩০ কার্তিক ১৪২০ সাল ৯ মহররম ১৪৩৫ হিজরী

-কামরুল হাসান বাদল
মনিরের জন্যে একটি শোকগাঁথা লিখব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু ভাবনাগুলো স্থির করতে পারছিলাম না। পত্রিকায় মনিরের অঙ্গার হওয়া ছবিটি দেখেছি। অদ্ভুত একটি ছবি। শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেছে। হাঁটুজোড়া বুকের কাছে এনে মনির বসে আছে হতভম্বের মতো। তার সারা শরীর ঝলসে গেছে। মনির বুঝতে পারছে না তার কী হয়েছে। সে তো তার বাবার কাভার্ড ভ্যানে ঘুমিয়ে পড়েছিল। গাড়ি চালাচ্ছিল তার বাবা। মনির ভাবছে সে কি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিছুই তো জানে না সে, বাবার সাথে ঢাকা বেড়াতে বেরিয়েছিল সে। ঘুরতে ঘুরতে গাজীপুর পৌঁছেছিল বাবার সাথে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত বোঝে না মনির। হরতাল বোঝে না। পিকেটিং বোঝে না। বোঝে না এখন পিকেটিংয়ের নামে একদল হায়েনা নেমে আসে জনপদে। নিষ্ঠুর, অতি নির্মমভাবে ওরা ধ্বংসলীলা চালায়। গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে দেয়। নিরীহ, নিরপরাধ,নারী-শিশু, বৃদ্ধ-প্রতিবন্ধী কেউ-ই রেহাই পাচ্ছে না এই হায়েনাদের হাত থেকে। এই হায়েনারা একাত্তরের হায়েনাদের চেয়েও ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর। এরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হরতাল আহবান করে। আর সে হরতালের একদিন আগে থেকে শুরু করে এমন প্রাণঘাতি নিষ্ঠুর নির্মম পিকেটিংয়ের নামে বর্বরতা।

দুঃখিত আমি মনিরের জন্য কোনো শোকগাঁথা রচনা করতে পারিনি। বরং মনিরের অগ্নিদগ্ধ হয়ে হতভম্বের মতো বসে থাকার দৃশ্যটি মনে আসতেই সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছি। চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায়। রক্তচাপ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে এমন ঘটনা, বাড়তে থাকে আগুনে পোড়া মানুষের সংখ্যা, বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা, বাড়তে থাকে বিলাপ, বাড়তে থাকে স্বজনের আহাজারী,বাড়তে থাকে রক্তচাপ, তারপর হাসপাতাল-ক্লিনিক, পূর্ণ বিশ্রাম আর এই নিষ্ঠুর ও বিভৎস চিত্র ও সংবাদ দেখার ওপর নিষেধাজ্ঞা। তারপরে আমি বিশ্রামে শুয়ে কাটাই। ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমাই। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাই। শুয়ে থাকি, ঘুমিয়ে থাকি- কিন্তু মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে মনির,অবচেতন মনে মনিরের অর্ধদগ্ধ, হতবিহ্বল বসে থাকার, বুক ভেঙে যাওয়া ভঙ্গির ছবিটি ভেঙে দেয় আমার স্বস্তি। অবস করে দিচ্ছে আমার অনুভূতি। আমি দেখতে থাকি, শুনতে থাকি আর্তনাদ, মানুষ পুড়ে যাচ্ছে- তাদের গায়ে পেট্রোল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা মরে যাচ্ছে। সে ভয়াবহ আগুন থেকে,ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে একজন-দুজন এভাবে শত শত অসহায় মানুষের বিলাপ আর আর্তনাদ আমি শুনতে পাই। আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার বিশ্রাম টুটে যায়। আমি এলোমেলো পায়চারি করি মধ্যরাতে। একলা দুপুরে- বিষন্ন বিকেলে- একাকী সন্ধ্যায়। আমি নিজের সামনে দাঁড়াতে পারি না অগ্নিদগ্ধ- নিহত শিশু মনির ঔদ্ধত্যের ভঙ্গিমায় বলে, আমাকে পোড়ালে কেন? তোমাদের আন্দোলনের কী ক্ষতি করেছিলাম। আমিতো বাবার সাথে ঢাকা শহর দেখতে বেরিয়েছিলাম। মনিরকে বলি, মনির শোন, তোমার জন্যে এমন একটি শোকগাঁথা লিখব,যা পড়ে কেউ কোনোদিন আর শিশুহত্যা করবে না এ দেশে। মানুষ মরবে না বিনাদোষে। একাত্তরের ঘাতকদের বাঁচাতে নব্য ঘাতকরা প্রাণ নিতে পারবে কোনো নাগরিকের।

কিন্তু না কিছুই হয় না। মনিরদের জন্যে শোকগাঁথা রচিত হয় না। মৃত্যুর মিছিল থেমে থাকে না। বরং এ মিছিল দীর্ঘ হয়। আরও শিশু মনিরের মতো দগ্ধ হয়। পুড়ে যায়, মরে যায়। একসাথে ১২ জন যাত্রীর গায়ে পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। তারা অগ্নিদগ্ধ হয়। হাসপাতালে যায়। হাসপাতালের বাতাস আরও ভারী হয়ে ওঠে।

এই হত্যা ও লাশের রাজনীতি বন্ধ হবে কবে। গত ২২ বছরে এ ধরণের রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহাণি ঘটেছে আড়াই হাজার। ২০০১-০৬ বিএনপি শাসনামলে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০৮। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৫৪৯ জন। শুধু গত ১০ মাসে নিহতের সংখ্যা ৩০৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছে ২০০১ সালে ৫০০ জন। একদিনের হরতালে তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষতি ২০০ কোটি। পরিবহন খাতে ২৫০ কোটি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায় ৬০০ কোটি টাকা। তারপরেও হরতাল হতে পারে। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় হরতাল কর্মসূচি বিদ্যমান। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। দ্বিমত নেই। যে দল যত পারে হরতাল ডাকুক। জনগণ যদি সে দলের দাবিকে যৌক্তিক মনে করে তবে তারা হরতালে সংহতি প্রকাশ করবে। নিজেরাও হরতাল পালন করবে। অন্যদিকে সমর্থন না দিলে বা সহমত পোষণ না করলে তারও অধিকার আছে হরতাল পালন না করার। নিজের কাজ করার। তারপরেও অতীতে আমরা পিকেটিং করতে দেখেছি। খুব বেশি হলে টায়ার পাংচার করে দেওয়া। চালকদের কান ধরে ওঠ-বস করা। নেতানেত্রীরা রাস্তায় শুয়ে বসে অবরোধ ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। এমন সহিংস, নির্মম পিকেটিং আগে কখনও দেখিনি। গত ১৫/১৬ বছর থেকে পিকেটিং ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছিল। তবে গত ডিসেম্বর থেকে বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই জামায়াত-শিবির এমন সহিংস হয়ে ওঠে। জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর আর নৃশংস উৎসবে মেতে ওঠে ওরা। এমন নিষ্ঠুর আচরণ একটি স্বাধীন দেশে হতে পারে, তা ভাবতেও কুক্তিত হই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সাধারণ মানুষের গাড়ি-বাড়ি-দোকান প্রতিষ্ঠান কিছুই বাদ যাচ্ছে না এসব আন্দোলনকারী নামের হায়েনাদের কাছ থেকে।

বিগত দিনে বিএনপি’র রাজনীতি আমরা দেখেছি। তাদের আন্দোলন-সংগ্রামও প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এমন নির্মম হতে কখনও তাদের দেখিনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার চেয়ে কিছু কিছু বিএনপি নেতাকে অনেক বেশি সহনশীল ও সংযম বলে মনে হয়েছে। অনেক যুব ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদেরও চিনি, যাদের কখনো এমন নিষ্ঠুর ও নির্মম বলে মনে হয়নি। মনে হয় না বিএনপি বা তার সহযোগী কোনো সংগঠনের কর্মীরা কোনো সংবাদমাধ্যম কর্মীর ওপর আঘাত হানতে পারে। তাদের গায়ে হাত তুলতে পারে। নিষ্ঠুর-নির্মমভাবে নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে। অথচ অন্তত গত একবছর থেকে আমরা তেমন আচরণই দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কাছ থেকে। তাই বিস্ময় জাগে এই আন্দোলনের চাবি বা নিয়ন্ত্রণ বিএনপি’র হাতে আছে না কি হাজার হাজার কোটি টাকার খেলায় অন্য কেউ তা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে যারাই করুক আমার ধারণা এতে আসলে বিরোধীদলের খুব বেশি লাভ হবে না। মানুষ এমন নিষ্ঠুর-নির্মম কর্মকাণ্ড সমর্থন করবে না। এখনতো মিডিয়াকর্মীদের ফোন করে বা এসএমএস এর মাধ্যমে গাড়ি পোড়ানোর দৃশ্য তুলে মিডিয়ায় প্রচার করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। এই চালাকির তথ্যও এখন মানুষ জেনে গেছে। ওপথও এখন বন্ধ হওয়ার পথে। গণপ্রতিরোধ সৃষ্টি হবে এমন গণহত্যার বিরুদ্ধেই। এক একজন মুনিরের হত্যার দায় তাদের নিতেই হবে। বিচার তাদের হতেই হবে।

দেশের রাজনীতি থেকে এমন সহিংস কর্মসূচিকে চিরতরে দূর করতে হবে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৩

'বাংলাদেশ! পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়'


৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ২৩ কার্তিক ১৪২০ সাল ২ মহররম ১৪৩৫ হিজরী

-কামরুল হাসান বাদল
এক। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সারা বিশ্বের মুরুব্বি। বলতে গেলে তার ইচ্ছেতেই পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ব। অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করেই ক্ষান্ত নয় দেশটি, বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সেসব দেশের নেতারা কার সাথে কী আলাপ করছেন তা-ও আড়ি পেতে শোনার ব্যবস্থা করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন। দীর্ঘদিনের মিত্রদের সাথে তাদের এমন শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে আর বিশ্বের বিবেকবান মানুষগুলো স্তম্ভিত হচ্ছে। যাক সে কথা- যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও যখন কালো মানুষদের কোনো ভোটাধিকার এমন কি নাগরিক অধিকারও ছিল না সে সময়েও আমাদের ভূখণ্ডে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং সে নির্বাচনে নারী পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভোটার ভোট দিয়েছে। তাছাড়া মার্কিনীরা যখন জাহাজে করে আফ্রিকার সহজ-সরল কালো মানুষদের তাদের মুল্লুকে এনে ক্রীতদাস হিসেবে কেনা-বেচা করতো তারও বহু আগে এই উপমহাদেশের এক প্রখ্যাত কবি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। মার্কিনীদের ইতিহাস হচ্ছে অস্ত্র ও যুদ্ধের ইতিহাস। পররাষ্ট্র দখল ও ভোগ করার ইতিহাস। আর বাংলার ইতিহাস হচ্ছে শান্তি ও সৌহার্দ্যের ইতিহাস। কারণ বাঙালির দ্বারা আজ পর্যন্ত কোনো জাতি ও দেশ আক্রান্ত হয় নি, লুণ্ঠিত হয় নি। কাজেই শান্তিপ্রিয় ও সভ্য জাতি বলতে গেলে মার্কিনীদের আগে বাঙালির নাম উচ্চারিত হওয়া উচিত।

দুই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৭১’র ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রাক্কালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। এই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পর এই দেশের একজন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডিকে যখন ‘রাবিশ’ বলেছিলেন সেদিন গর্বে আমার বুক ভরে গিয়েছিল। কোন সাহসে বাংলাদেশের একজন অর্থমন্ত্রী একথা বলার সাহস রাখেন এবং কিসের জোরে এদেশের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন সে কথাই বলার চেষ্টা করছি এখন।

তিন। কার্তিকের মঙ্গা এখন বাংলাদেশের জন্য শুধুই অতীত। কৃষকের আন্তরিক পরিশ্রম ও সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সেসব দুঃসহ কাল আর ফিরে আসবে না বলেই মনে হয়। প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে আমন ধান ঘরে তোলার আগে আগে সারা দেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় দেখা দিত মঙ্গা বা দুর্ভিক্ষ। লাখ লাখ মানুষ খাদ্যের অভাবে কষ্ট পেতো। শুধু আশ্বিন-কার্তিক নয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো।

গত শতকের ৭০ দশক। আমাদের স্বাধীনতার আগে পরে এদেশের লোকসংখ্যা ছিল ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি। এর ৪২ বছর পরে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, পাশাপাশি আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। অথচ দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশেষ করে গত তিন বছরে এক কেজি চালও আমদানি করতে হয় নি সরকারকে। বরং সুগন্ধি চাল ও ভুট্টা রফতানি করছে বাংলাদেশ। প্রিয় পাঠক এ হিসেব আমার মন গড়া নয়। গত অক্টোবরে বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বিশ্বের ক্ষুধা সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরেই এই সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। আর এভাবেই প্রধান খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদনের দিক থেকেও অধিকাংশ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্যে পথিকৃৎ। বিশ্বের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভিয়েতনাম, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম ও মিসরই রয়েছে বাংলাদেশের ওপর। আর হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদনের হিসেব ধরলে বাংলাদেশের ওপরে আছে মাত্র ভিয়েতনাম ও চীন।

চার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কিউবায় চট রফতানি করার অপরাধে ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর থেকে খাদ্যভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছিল। আর সে দুর্ভিক্ষের কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সরকারকে সবচেয়ে বড় বিব্রতকর ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। ঘরে চাল থাকলে তো শাক পাতা কুড়িয়েও ভাত খাওয়া যায়। এই বাংলাদেশ এখন মার্কিনীদের রাবিশ বলতেই পারে।

পাঁচ। এ-তো গেল শুধু কৃষিখাত। গত ২ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে ‘জীবনযাপনের জন্য ভারতের চেয়ে ভালো বাংলাদেশ’। এটি নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের উদ্ধৃতি নয়। তিনি তো এ বিষয়ে অনেক আগেই তাঁর মতামত ও পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছেন। বর্তমান জরিপটি চালিয়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক লেগাটাম ইনস্টিটিউট। লেগাটাম প্রসপারিটি ইনডেক্স শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদনে বসবাসের উপযোগিতার দিক দিয়ে বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম। ভারতের অবস্থান আরো তিন ধাপ পিছিয়ে ১০৬তম। এই জরিপে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে নিত্য দিনের জীবন উপভোগের জন্য ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ ঢের ভালো এবং ভবিষ্যতে আরো সুন্দর জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে।

ছয়। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কয়েক কোটি মানুষ এখন এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দশম স্থানে ছিল এশিয়ায় দু’বছর আগে। দারিদ্র্যের সংখ্যা চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। কমেছে শিশু মৃত্যু ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যুহার। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কমেছে নিরক্ষরতার হার। এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর হাতে কয়েক কোটি নতুন বই তুলে দেওয়া হয় বছরের প্রথম দিনেই। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলারেরও বেশি। বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল দশটি নগরীর মধ্যে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম একটি।

মুসলিম প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে গণতন্ত্র বিদ্যমান। (সকল সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই)এখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, স্পিকার নারী। এছাড়া বিচারপতি,ডিসি, এসপি, সশস্ত্র বাহিনীসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

সাত। বাংলাদেশে এত যে অগ্রগতি তার পেছনে এদেশের সাধারণ মানুষের ভূমিকা যেমন তেমনি ভূমিকা আছে রাজনীতিকদেরও। তবে সবচেয়ে বড় অবদান বাংলার কৃষকদের। যারা রাতদিন পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। অবদান আছে শ্রমিক বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত নারী শ্রমিকরা, যারা কম বেতনে মানবেতরভাবে বছরের পর বছর রফতানির চাকা সচল রেখেছেন। অবদান আছে প্রবাসী ভাইদের, যারা বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করেও দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে এক্ষেত্রে রাজনীতিকদের যে অবদান একদম নেই তাই বা বলি কী করে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সময়মত সার ও কীটনাশক এবং সেচের জন্যে বিদ্যুতের সরবরাহ না দিলে উৎপাদন তো ব্যাহত হতো। গত তিন বছরে যে, এক কেজি চালও আমদানি করতে হয় নি সেখানে কি বর্তমান সরকার ও তার কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর একটুও অবদান নেই। নিশ্চয়ই আছে। রাজনীতিকদেরও অবদান আছে। তাদের অবদান আরো উজ্জ্বল হবে যদি তারা বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, কৃষি, শিল্প, তথা অর্থনৈতিক এই অগ্রযাত্রায় তাদের রাজনীতিকেও জড়িত করেন। তারা যদি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল একটি রাষ্ট্র উপহার দিতে পারেন তাহলে বাংলাদেশের এই সাধারণ মানুষ তথা অশিক্ষিত কৃষক- শ্রমিকরা একটি উন্নত বাংলাদেশ উপহার দিতে পারত। খুব বেশি নয় আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ একটি মধ্য আয়ের দেশে এমন কি ইউরোপের কয়েকটি দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে পারত। আমাদের রাজনীতিকরা কি বাংলাদেশের এমন অগ্রযাত্রায় নিজেদের শামিল করবেন? নাকি হরতাল- অবরোধ, নৈরাজ্য, ধ্বংস, হত্যার উৎসব অব্যাহত রেখে দেশকে চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবেন। দয়া করে শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে মারদাঙা জাতিতে পরিণত করবেন না। আজ যখন বর্তমান বিরোধী জোটের নির্মম-নৃশংস হরতালের বিরুদ্ধে বলি তখন কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিরোধী দল থাকাকালীন হরতাল নৈরাজ্যের প্রসঙ্গ তোলেন। আমি বলি এমন পাল্টাপাল্টি জেদ না করে এমন কর্মসূচিকে এখনই ‘না’ বলুন। আর প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করুন এমন নৈরাজ্যমূলক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি কোনো দল ভবিষ্যতেও দেবে না।

এই দাবিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না। তথাকথিত সুশীল শ্রেণি যারা রাতদিন শুধু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দাবি তুলে মুখে ফেনা আনছেন তাদের সবিনয়ে বলি, ’৯১ থেকে এ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় নির্বাচনের ফলাফল তো পরাজিত কোনো দলই মেনে নেয় নি। শুধু তাই নয় তারা সংসদেও উপস্থিত থাকে নি। সংসদ কার্যকর হয় নি। বরং বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে সম্পদ আর জীবনহানি ঘটিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় ফেরার আগে এই বিষয়গুলোর মীমাংসা হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের যে অগ্রগতির কথা তুলে ধরলাম এর পেছনে যাদের ন্যূনতম ভূমিকা নেই সে শক্তির কোনো দাবির প্রতি সমর্থন জানানোরও কোনো প্রয়োজন নেই। এদেশ পরিশ্রমী ও মুক্তিকামী মানুষের। পরজীবীদের নয়।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com Google+

বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৩

'জিবরান কাহলিলের গল্প ও অন্যান্য'


৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৬ কার্তিক ১৪২০ সাল ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
তোমারে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে। একটু কঠিন হয়ে গেল সাধারণ পাঠকদের জন্যে। এর ব্যাখ্যা পরে দিচ্ছি, আগে আরেকটি বলি-ডিমকে বলছে মুরগির ছানা, আরে দোস্ত তোমারে তো দেহি পোছ (পোচ) বানাইয়া ফালাইছে -হি - হি- হি। শুনে ডিম বলছে, ‘আমারে তো পোছ বানাইছে কটা দিন সবুর লও, দেহনা তোমারে কেমন চিকেন রোস্ট বানায়। যারা এখনও ধরতে পারেননি কী বলতে চাইছি, তাদের জন্যে আরেকটি গল্প।

নিজেদের রাজ্য ছেড়ে দু’বন্ধু বেরিয়ে পড়ল শান্তির খোঁজে। এমন যেতে যেতে একদিন তারা উপস্থিত হলো এক আজব রাজ্যে। তারা দেখতে পেল সেখানে সব কিছু সস্তা। এমন কি তেলের দামেই ঘি বিক্রি হয়। প্রথম বন্ধু তা দেখে মুগ্ধ। দ্বিতীয় বন্ধুকে বলল, ‘দোস্ত এমন দেশতো আর হয় না। তেলের দামে ঘি। এ রাজ্যে থেকে যাবো, তেলের বদলে ঘি খাব শুধু। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘মাথা খারাপ যে দেশে তেলও ঘিয়ের দাম একই সে দেশে আমি থাকব না। এ দেশে কোনো আইনশৃঙ্খলা নেই। ভালোর মূল্য নেই। প্রথম বন্ধু নাছোরবান্দা সেই থাকবেন আর দ্বিতীয় বন্ধু থাকবে না। শেষে প্রথম বন্ধু বলল, তাহলে আমি থেকে যাই তোমার না পোষালে যাউগা।’ প্রথম বন্ধু চলে গেল অন্য রাজ্যে। এদিকে তেলের দামে ঘি পেয়ে খেয়ে খেয়ে প্রথম বন্ধু দিন দিন প্রশস্ত হতে থাকল। এভাবে দিন যায়। হঠাৎ সে রাজ্যে একটি খুনের ঘটনা ঘটল। কিন্তু খুনিকে পাওয়া গেল না কোনো ভাবেই। রাজাতো রেগে-মেগে আগুন। আমার রাজ্যে খুন হবে আর বিচার হবে না। উজির-নাজির আমাত্য বর্গ ঘেমে নেয়ে একসা। কী আর করা, যে কাউকে তো শাস্তি দিতে হবে। শেষে সিদ্ধান্ত হলো রাজ্যের সব চেয়ে মোটা ব্যক্তিটিকে ধরে এনে শূলে চড়ানো হবে। রাজ্যে খোঁজ পড়ে গেল মোটা মানুষের। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ওই প্রথম বন্ধু যে খেয়ে দেয়ে বেশ মোটা তাজা হয়েছিল। তাকে ধরে আনা হলো শূলে চড়ানোর জন্যে। এদিকে দ্বিতীয় বন্ধু অনেক দিন পরে বন্ধুর খোঁজ নিতে এসে দেখে এই কাণ্ড। অনেক ফন্দি ফিকির করে প্রথম বন্ধুকে বাঁচাতে সক্ষম হয় সে।

এবার শেষ গল্পটি বলি। এটি জিবরান কাহলিলের। পাহাড়ের উপত্যকায় মা মেষ তার শাবকদের নিয়ে খাদ্য অন্বেষণ করছিল। এমন সময় মা মেষ খেয়াল করল একটি বাজপাখি উড়ে আসছে তার শাবকদের দিকে। সে তার শাবকদের আগলাতে আগলাতে খেয়াল করল আর একটি বাজপাখি এসে প্রথম পাখিটিকে বাধা দিচ্ছে। এ নিয়ে দু পাখির মধ্যে লেগে গেল তুমুল যুদ্ধ। শাবকরা মাকে বলছে তখন। মা ওরা দুজন কি আমাদের খেয়ে ফেলতে আসছে। শুনে মা বলল, বাছা তোমরা এখনও বুঝতে পারছো না এদের মধ্যে কে তোমাদের খেতে আসছে আর কে রক্ষা করতে আসছে।

প্রিয় পাঠক প্রতি সপ্তাহে রাজনীতি নিয়ে না লিখে আজকে শুধু কাহিনী ও কাহিনীর অংশ বিশেষ শোনালাম। তবে হ্যাঁ, লেখা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রতিটি কাহিনীর মধ্যে একটি শিক্ষনীয় বিষয় থাকে, আজকে অন্তত সে টুকুই আলোচনা করি। উল্টো দিক থেকে আসি।

জিবরানের গল্প-বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল্য করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি তারা মেষ শাবকদের মতো বুঝতে পারছে না কোন বাজ পাখিটি তাদের গ্রাস করতে চায়। আর কোনটি তাদের বাঁচাতে চায়।

দু বন্ধুর গল্প যে দেশে তেল ও ঘি অর্থাৎ ভালো-মন্দের একই ফল সে দেশ বাসযোগ্য নয়। সে দেশে কোনো বিচার নেই। ভালো-মন্দ সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা থাকে না জনগণের। তারা বোকা। মন্দ লোকের কথায় তারা সহজে বিভ্রান্ত হয়। মন্দরা দেশ শাসনের সুযোগ পায়। গুণীরা কদর পায় না। নায়কেরা পরাস্ত হয় ভিলেনের কাছে। ডিম ও মুরগি ছানার গল্প-অনেক কিছু মিলে বর্তমান সরকার একটু বেকায়দায় পড়েছে। বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম হাতে নিয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে বেশ পোক্ত হওয়া জামায়াতের নেতাদের বিচার খুব সহজ সাধ্য নয় তা এখন টের পাচ্ছে সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ চাপের মধ্যে এই বিচার কাজ চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যেও অনেক ভাবে এই বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরপর জামায়াত-শিবির নৈরাজ্য ও ধ্বংস লীলা চালিয়েছে দেশে। সরকারের মেয়াদ শেষে তারা এখন অসম্ভব বেপরোয়া। গত ৬০ ঘণ্টার হরতালে ব্যাপক বোমাবাজি করা হয়েছে দেশজুড়ে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক থেকে শুরু করে সাক্ষী ও সমর্থক এমন কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় ও কর্মীদের ওপরও বোমা হামলা ও আক্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও আক্রমণের শিকার হচ্ছে আওয়ামী, যুব ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে মৃত্যুবরণও করেছে অনেকে। অনেককে না পেয়ে তাদের বসত বাড়িতেও আগুন দেওয়া হচ্ছে। মোট কথা সরকারের শেষ সময়ে এসে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ দূরত্বে থেকে কিছু কিছু ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপহাস করছেন। যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করতেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিলম্ব হচ্ছে বা করছে বলেন সরকার তথা আওয়ামী লীগকে গালাগাল করতেন তাদের উদ্দেশ্যে পোচ করা ডিমের ভাষায় বলি, এবার ক্ষমতায় গেলে লীগের ছেলেদের হয়ত পোচ করা হবে ঠিকই কিন্তু অন্যদের যে চিকেন ফ্রাই হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে সে কথাটি বলে রাখি।

প্রথম উদ্ধৃতি যা বহুল প্রচলিত তা নিয়ে বিশদ বলতে হয়। বর্তমান বিএনপির কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচি দেখে মনে হয় এই দলটি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারছে না। কোথাও কোনো শক্তির কাছে এর দায়বদ্ধতা আছে। আজকাল এই দলের কর্মসূচিতে জঙ্গিরূপে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির। তাদের বিশেষ সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ মঞ্চ নির্মাণ থেকে শুরু করে এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা। এমনকি সমাবেশের প্রথম বক্তাও ছিলেন শিবিরের এক নেতা। সে সমাবেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত জামায়াতের সকল নেতার মুক্তি দাবি সম্বলিত সচিত্র ব্যানার ফেস্টুন শোভা পেলেও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলিমের মুক্তি বা তাদের নিয়ে কোনো ব্যানার ফেস্টুন দেখা যায়নি। বিএনপি বা ছাত্রদলের কর্মী সমর্থকদের কখনও বেপরোয়া আচরণ করতে দেখা যায় না। অথচ গত এক বছর ধরে বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রামে বেশ ধ্বংস নৈরাজ্য দেখা গেছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে এসবের সাথে জড়িতদের অধিকাংশই জামায়াত-হেফাজতের কর্মী। বিএনপি বা ছাত্রদলের নয়। ছাত্রদলের রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেছেন তারাও এর সাথে একমত পোষণ করবেন বলেই আমার ধারণা। অর্থাৎ এক সময়ের মধ্য পন্থার দল বা মডার্ন ইসলামিক দল বিএনপি এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অতি মাত্রায় নির্ভর করছে এই ধরনের জঙ্গি ও চরমপন্থী দলের উপর। যা আখেরে বিএনপিরই সর্বনাশ ডেকে আনবে।

যে শক্তি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। বাম স্বাধীনতা বা অন্যের মতামতকে সহ্য করে না। নারী স্বাধীনতা ও জাগরণে বিশ্বাসী নয় তেমন একটি শক্তির সাথে গাঁটছড়া বেধে বিএনপি কতদূর যেতে পারবে। এই শক্তিতো নারী নেতৃত্বেও বিশ্বাসী নয়। নারী শিক্ষায় তো নয়-ই।

আজ ক্ষমতায় না থেকেও দেশব্যাপী এদের যে তাণ্ডব, এদের সাথে জোটগতভাবে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি রাশ টেনে রাখতে পারবে? না কি এদের গর্ভেই বিলীন হয়ে যাবে একদিন। কিন্তু বিএনপির মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল কেন এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দেশের মধ্যপন্থার বিশাল একটি জনসমর্থন রয়েছে এ দলটির প্রতি। দুবার তারা গণতান্ত্রিক পর্যায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও গেছে। এ কথাগুলোও আজ লিখতাম না যদি না খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সাথে দেখা করে বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদের আশ্রয় না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিতেন। বলতাম না যদি তিনি অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বলে প্রতিশ্রুতি না দিতেন। যদি না তিনি তাঁর সন্তান তারেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত জঙ্গি কানেকশানের সংবাদকে মিথ্যা না বলতেন।

আসলে বলা উচিত ছিল, ‘তোমারে বধিবে যে, জোটেই বাড়িছে সে।’

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৩

'রাজনৈতিক সংকট নাকি ‘ইগো’ সংকট'

২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি, ৯ কার্তিক ১৪২০ সাল, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
২৫ অক্টোবর দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে, আদৌ নির্বাচন হবে কি না, হলেও কেমন সরকার ব্যবস্থায় ও কার অধীনে হবে- এতোসব সংকট ও প্রশ্ন নিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন প্রবল উৎকণ্ঠায় সে সময় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন। তাঁর দেওয়া প্রস্তাবে তিনি সরকারি দলের বাইরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নাম চেয়েছেন নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রীসভার জন্য। এ বিষয়ে তিনি বিরোধী দলের নেতার সহযোগিতাও চেয়েছেন। অর্থাৎ সরকারি দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনেই নির্বাচনের প্রস্তাব পেশ করেছেন।

সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনের পরে অবশ্য এছাড়া উপায়ও নেই। কারণ বর্তমান সংবিধান মোতাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সুযোগ নেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চায় না। তারা কোনো অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক নয়। কাজেই তারা তাদের অবস্থান থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার একটি রূপরেখা দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের ভাষণে এবং তার আগে-পরে তিনি নিজে কখনও সেই সরকারের প্রধান থাকবেন বলে দাবি করেন নি। যদিও তাঁর দলের কয়েকজন মন্ত্রী ও নেতা এ ধরনের দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরে দেশের রাজনীতি মহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল। ‘অনেকে বরফ গলতে যাচ্ছে’, ‘সংকট উন্মোচনের পথ খুলছে’ ইত্যাদি বাক্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এমনকি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন, তারাও প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে বিএনপির জন্য একটি এক্সিট পয়েন্ট হিসেবে মন্তব্য করেছে।

এরপরে গত সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া পাল্টা আরেকটি রূপরেখা ঘোষণা করেন। প্রস্তাবে তিনি বিগত ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক ২০ উপদেষ্টার মধ্যে থেকে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। সরকারি দলের পাঁচ ও বিরোধী দলের পাঁচ মোট ১০ জন উপদেষ্টা ছাড়া সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত নাগরিককে ওই সরকারের প্রধান করারও প্রস্তাব করেন তিনি। অর্থাৎ তিনি তাঁর দাবি অনুযায়ী পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথাই তুলে ধরলেন পুনর্বার।

বিরোধী দলের নেতার এই বক্তব্যের পর সংকট আবার ঘনীভূত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ তাঁর সেদিনের সংবাদ সম্মেলনের প্রদত্ত ভাষণ বা নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা প্রদান যে আকস্মিক ও ভাবনা-চিন্তা তা ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ১৮ দলীয় জোট বিরোধীদের তো বটেই এই জোটেরও কারো কারো কাছে তা কৌতূকের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১৩ ও ১৭ বছর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবকে অনেকে প্রলাপ ও অবিবেচনা প্রসূত বলে আখ্যায়িত করেছেন ইতোমধ্যেই। তাঁর এই ধরনের প্রস্তাবের পরপরই খোঁজ পড়ে যায় এই দুই সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা এখন কোথায় ও কী অবস্থায় আছে। তথ্য উপাত্ত ও খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল দুই সরকার মিলে উপদেষ্টা ছিলেন ১৮ জন। কারণ ২ জন দু’সরকারেই ছিলেন। এর মধ্যে ৬ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনজন অনীহা প্রকাশ করেছেন আর ছয় থেকে আটজনের উপদেষ্টা হওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। তাহলে উপদেষ্টা হওয়ার মতো বাকি থাকলো ক’জন। তবে এই লেখাটি তৈরি করার সময় পর্যন্ত মঙ্গলবার মধ্যরাতে একটি চ্যানেলের পর্দায় একটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় একটি সংবাদে দেখলাম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হয়েছেন। তিনি বলেছেন যেহেতু ১৭ বছর আগে তিনি একবার উপদেষ্টা হয়েছিলেন সেহেতু এত বছর পর আবার উপদেষ্টা হওয়া তাঁকে মানায় না। কাজেই প্রধান উপদেষ্টা করা হলে তিনি রাজি আছেন। তাঁর দাবি অযৌক্তিক নয়, ১৭ বছরে একজন মানুষ পদোন্নতি চাইতেই পারেন।

বিরোধী দলীয় নেত্রীর এই প্রস্তাব যে আকস্মিক ও তা বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী বৈঠকে উত্থাপিত ও আলোচিত নয় তাও তুলে ধরেছে একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিক। ওই পত্রিকার কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বীকার করেছেন, সংবাদ সম্মেলনে নেত্রী কী প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন তা তারা (এমন অন্তত ছয়শ) জানতেন না। প্রস্তাব প্রদানের সময় তাই তারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলেন। অর্থাৎ বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে,খালেদা জিয়ার এই রূপরেখাটি সুচিন্তিত নয়। তা তড়িঘড়ি করেই কেউ কেউ প্রস্তুত করে দিয়েছেন। যেহেতু শেখ হাসিনা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন সেহেতু খালেদা জিয়াকেও একটি প্রস্তাব দিয়ে রাখতে হবে, তা যাই হোক না কেন।

এসবই হচ্ছে আমাদের রাজনীতিকদের ‘ইগো’ সংকট। কেউ কারো কাছে হারতে রাজি নয়। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবটি সংবিধান সম্মত নয়। এটি তাঁর না বোঝার কারণ নেই। তবুও তিনি তাই বলবেন। কারণ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য খালেদা জিয়ার সরকারকে বাধ্য করেছিল। তাই তিনিও শেখ হাসিনাকে বাধ্য করতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে। ২০০৬ সালে বিচারপতি এম আর হাসানের অধীনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যায় নি, কাজেই তিনিও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। অন্যদিকে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামি ও তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির তৈরি হয়ে আছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত ঘটনার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য। ২৫ তারিখ ঢাকায় সমাবেশে দা-কুড়াল নিয়ে উপস্থিত থাকার আহবানের মধ্যে সে ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যেই একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে সে উদ্দেশ্যে শিবিরের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

পাল্টা রূপরেখা না দিয়ে বরং খালেদা জিয়া ও তার জোট প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নিয়েই আলোচনায় যেতে পারতেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ওই সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়েই আলোচনা হতে পারতো বা হওয়া বাঞ্ছনীয়। শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারে নির্বাচিত পাঁচ-পাঁচ সদস্য ছাড়া সরকার প্রধান হিসেবে কাকে মনোনীত করা যায় তা নিয়ে দর কষাকষি হতে পারতো। খালেদা জিয়া যেহেতু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না সেক্ষেত্রে বিকল্প নাম প্রস্তাবের দায়িত্ব বিএনপিরই। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ও গত মঙ্গলবার যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন জাতির কল্যাণে শেখ হাসিনা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

খালেদা জিয়ার অন্তঃসার শূন্য পাল্টা প্রস্তাবের চেয়ে শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনেক বেশি বাস্তব ও সংবিধান সম্মত। জয়-পরাজয় ও ইগো সমস্যায় না ভুগে বিএনপি ও তার সমর্থকদের উচিত হাসিনার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সরকার প্রধানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকলে বিএনপি আখেরে লাভবান হবে বলে মনে হয় না। কারণ ১৯৯৬ সালের বাস্তবতা ও ২০১৩ সালের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। আর কোনো কারণে যদি দেশে নির্বাচন না-ও হয় সেক্ষেত্রেও লাভবান হবে বর্তমান সরকার, বিএনপি নয়। নির্বাচন হতেই হবে এবং সে নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি নিয়ে সংঘাত না করে একটি স্থায়ী সমাধান বা প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে। আমি আমার পূর্বের অনেক লেখায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। তাকেই কীভাবে স্বাধীন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করা যায় সে চেষ্টাই করা উচিত। নির্বাচনকালীন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করে খুব সহজে অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব। এছাড়া বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে নির্বাচনে কারচুপি বা অন্যভাবে প্রভাব বিস্তার কতটুকু সম্ভব তা ভেবে দেখতে হবে। মাগুরার মতো ভোট ডাকাতি এখন কোনো দলের পক্ষেই করা সম্ভব নয়। করলেও তা আড়াল বা ‘হাইড’ করারও সুযোগ নেই।

যারা একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরে শুধু মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে চাঁদে দেখা গেছে গুজব রটিয়ে সারা বাংলাদেশে ছোট খাটো কিয়ামত সৃষ্টি করতে পারে তাদের সাথে ভোট কারচুপি করে বর্তমান সরকার দেশে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৩

'বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন?'

দৈনিক আজাদী             উপসম্পাদকীয়                কাল আজ কাল
৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৮ আশ্বিন ১৪২০ সাল ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী

মোমিন রোডের একটি দোকান থেকে পরিবারের যাবতীয় ওষুধ কিনতাম। দোকানটি চেরাগি থেকে বাসায় আসা-যাওয়ার পথের ধারেই। একদিন লক্ষ করলাম দোকানি তার পরিত্যক্ত বাক্স ও কার্টুনগুলো ফুটপাতেই ছুঁড়ে মারছে। ফলে তার দোকানের সামনে প্রায়ই আবর্জনা পড়ে থাকে। এর প্রতিবাদে তার দোকান থেকে ওষুধ কেনা ছেড়ে দিয়েছি।

শুধু এই দোকান বলে নয়। চট্টগ্রামে এমন কোনো দোকান বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না যার সামনের ফুটপাতের অংশটি জনগণের চলাচলের জন্য অবাধ ও নির্বিঘ্ন। আর যদি পাওয়া যায় তা আমি দেখতে যাব। আন্দরকিল্লার মোড় থেকে ডিসি হিল হয়ে নন্দনকানন পর্যন্ত মোমিন রোডের এই ফুটপাতটির মতো এত বহুমাত্রিক ব্যবহার্য ফুটপাত চট্টগ্রামে আর আছে কিনা তা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। পেঁয়াজআলুটমেটোধনেপাতাকলালুঙ্গিগেঞ্জিশাড়িশাকবাতের ওষুধপান সুপারির দোকানলেবুকলাসূতিকার ওষুধ নেহারি-তেহারি হালিমচনাপিঁয়াজুঘড়িশুঁটকিমাছফুলবাঁশ রকমারি ফার্নিচার,এমন কিছু নেই যা এই ফুটপাতে পাওয়া যায় না। এর সাথে গাড়ির চাকার দোকানচাকায় বাতাস দেওয়ার দোকান এমনকি এই জনারণ্য ফুটপাতে দিনে দুপুরে গোসল করার দৃশ্যও দেখা যায় অহরহ। অবশ্য এই ফুটপাত নয় চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের কোনো ফুটপাতে নর-নারী শিশু অবাধে হাঁটাচলা করতে পারে বলে আমার অন্তত জানা নেই। কিছু কিছু অভিজাত এলাকায় থাকতে পারে হয়তআমার সেসব এলাকায় যাওয়ার বেশি অভিজ্ঞতা নেই।

কোনো দোকানিই তার সামনের ফুটপাতের অংশটি নিয়মমাফিক মুক্ত রাখছেন না। বরং ফুটপাত দখলতো কেউ কেউ আবার ফুটপাত ছাপিয়ে রাস্তাও দখল করে নিয়েছেন। এ বিষয়ে কার কাছে অভিযোগ করা উচিত বা কারা এ সমস্যার প্রতিকার করতে পারেন তা জনগণ জানে না। আসলে এই নগরের কর্তৃপক্ষ কে-সিটি কর্পোরেশনসিডিএ মেট্রোপলিটন পুলিশ না কি সরাসরি সরকার তা বোঝা যাচ্ছে না কোনো মতেই।

লেখার শুরুতে যে উল্লেখ করলাম দোকানি তার দোকানের আবর্জনা ফুটপাতে ফেলছে। আমি ভেবে দেখেছি এরও একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। দোকানি তার দোকানটি ছাড়া আর কিছুকেই নিজের বলে ভাবতে পারছে না। দোকানটি সে সালামি বা ভাড়ায় নিয়েছে। এর জন্য তাকে প্রতি মাসে ভাড়া গুণতে হয়। এখান থেকেই তার পরিবার চলে কাজেই ওই দোকানটিকেই সে তার সম্পদ বলে মনে করে। নিজের বলে মনে করে। দোকানের বাইরের অংশটিকে সে তার বলে ভাবে না। ওই অংশটিকে সে ‘ওন’ করে না। দোকান থেকে ময়লা দূর করতে পারলেই হলো। বিভিন্ন বাসা বাড়িতেও দেখা যায় এমন আচরণ করতে। ঘরের ময়লা,তরিতরকারিমাছ-মাংস ইত্যাদির উচ্ছিষ্টটুকু জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে মেরে পরিত্রাণ পেতে চায় গৃহকর্ত্রী বা কর্তা। অর্থাৎ ঘরটা আমার বাইরের অংশটি আমার নয়। মনস্তাত্ত্বিক এই সমস্যা শুধু ওই দোকানি বা ঘরের কর্তা-কর্ত্রীদেরই শুধু নয়,এই সমস্যা আমাদের জাতীয় সমস্যা। সমস্যাটি হলো আমরা আমার অংশটি ছাড়া বাকিটুকুকে আমাদের ভাবতে পারছি না। নিজেদের ভাবতে পারছি না।

নিজের দোকান বা ঘর ছাড়া বাকি দেশটাও যে আমারএদেশের প্রতিটি ধুলিকণায়ও যে আমার মালিকানা স্বত্ব লেখা আছে। এদেশের ভালো-মন্দ সবকিছুরই যে আমিও একজন ভাগিদার সে কথাটি আমরা কেউ ভাবতে পারছি না। রাস্তায় ওয়াসার পাইপ থেকে অবিরাম পানি পড়তে দেখেও আমাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। পানির অপচয় বন্ধ করতে উদ্যোগ নিই না। রেলের প্ল্যাটফর্ম নোংরা করি। ট্রেনের বগি নোংরা করি। জিনিসপত্র নষ্ট করি আর ভাবি এতো আমার সম্পদ নয় রেলের। রেলের সম্পদ অন্য কেউ নষ্ট করছে। চুরি করছে দেখেও প্রতিবাদ করি না ভাবি এ-তো আমার নয়। অর্থাৎ যা কিছু সরকারের তাকেই আমরা শত্রুর সম্পদ বলে মনে করছি। তা ধ্বংস করতে পারলেই যেন পরম শান্তি। অদৃশ্য কোনো শত্রুর ওপর প্রতিশোধ নেওয়া।

এখন আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রি-পেইড। তার মানে আগে টাকা পরিশোধ করে পরে সেবা নিচ্ছি। পোস্ট পেইডও প্রায়ই একইটাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেবাও শেষ। অথচ সরকারি টেলিফোন অর্থাৎ এখন যাকে ল্যান্ডফোন বলা হচ্ছে তার টাকা বা বিল কত মাস পরে পরেই না পরিশোধ করেছি। নোটিসের পর নোটিস দেওয়া সত্বেও বিল পরিশোধের নামটিও নেই। বরং বিল চুরির জন্য কত ধরনের পন্থাই না আবিষ্কার করেছি। ব্যবহার করেছি। এখনও সরকারি আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে টিএন্ডটির শত শত কোটি টাকার বিল অনাদায়ী পড়ে আছে। আদায় হওয়ার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। এমনকি আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাইতো বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ টাকা বাকি ফেলে রেখেছেন টিএন্ডটির। অথচ মোবাইলের বিল কিন্তু সময় মতো পরিশোধ করছেন। একই অবস্থা ওয়াসার। এক লিটার পানি ২৫ টাকা দিয়ে কিনে খাই অথচ ওয়াসার পানির অপচয় আর সঠিকভাবে বিল পরিশোধ করা হলে ওয়াসার এমন দৈন্যদশা হতো না।

এশিয়ার সেরা চিটাগাং স্টিলমিল রুগ্ন করেধ্বংস করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন দেশে অন্তত ৫০টি ব্যক্তিখাতের স্টিলমিল দাপটের সাথে ব্যবসা করছে। ধ্বংস করা হয়েছে পাট শিল্প। বন্ধ করা হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম জুটমিল আদমজী জুট মিল। এর পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী ভারতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য জুটমিল। পাটশিল্পের পরিণতির আশঙ্কা করছি এখন তৈরি পোশাক শিল্পের। একটি অশুভ শক্তি সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী এই শিল্পকে ধ্বংস করতে। সময় থাকতে সচেতন না হলে পাটের মতো এই শিল্পও অনেকটা লুপ্ত হবে এ দেশ থেকে।

বর্তমানে এক বিপজ্জনক প্রবণতা পেয়ে বসেছে জাতিকে। কিছু একটা হলেই অবাধেনির্বিবাদেনিষ্ঠুরভাবে গাড়ি ভাঙচুর অগ্নি সংযোগ ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা। যে কোনো তুচ্ছ ঘটনায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন জ্বালানো আমাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড হয়ে উঠছে। বেতন-বোনাসের দাবিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন কমানোর দাবিশিক্ষা সম্পর্কিত যেমন পরীক্ষা পেছানো ভর্তি সমস্যা,দু’দলের মধ্যে কথা কাটাকাটিপ্রেম ঘটিত সংঘাতচা খেতে বসা নিয়ে তর্কাতর্কিএমন কি পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে না পারার মতো ঘটনার জন্যেও রাস্তা অবরোধ। গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটছে। এর সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতো আছেই। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের পথ রুদ্ধ করতে জামাত-শিবির ও হেফাজতে অব্যাহত ধ্বংস-নৈরাজ্যতো নিত্য-নৈমিত্তিকভাবে চলছেই।

নিজের দেশকে এবং দেশের সম্পদকে নিজের বলে ভাবতে না পারাভালো না বাসার মধ্যে আছে বাঙালির হাজার বছর ধরে উপনিবেশিক শাসনের কুফল। কারণবাঙালি ১৯৭১ এর আগে কখনোই স্বাধীন ছিল না। হাজার বছর ধরে শাসিত হয়েছে অন্যের দ্বারা। যে কারণে তারা নিজের ঘর-বাড়ি আর সম্পদ ছাড়া বাকি অংশটুকুকে ভেবেছে শাসকের সম্পত্তি হিসেবে। আর শাসক বা সরকার যেহেতু তাদের নয় সেহেতু ‘সরকারের মাল দরিয়া মে ঢাল’ মানসিকতায় প্রতিপালিত হয়েছে বাঙালি। ২১৩ বছর বৃটিশ-পাকিস্তানের গোলামি করতে করতে এ জাতির রক্ত-মাংস-মজ্জায় মিশে আছে এক প্রকার গোলামির হীনমন্যতা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীন দেশের আন্দোলনের মধ্যে চরিত্র ও আচরণগত পার্থক্য থাকতে হবে তা-ও বুঝতে পারছে বাঙালি। বৃটিশ পাকিস্তান সরকার অর্থাৎ শাসকশ্রেণি আমাদের প্রতিনিধি নয় সত্য কিন্তু এই দেশএই সরকার,এই সম্পদতো একান্তই আমারআমাদের। রেলের একটি বগি জ্বালিয়ে দেওয়া মানে আমিতো আমার সম্পদই পুড়িয়ে দিলাম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ মিলিয়ন ডলার হওয়ার অর্থতো আমার। আমাদের অর্থাৎ আমার দেশেরই অগ্রগতি সাধিত হওয়া।

এ জাতির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝা বড় মুশকিল। যারা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করে তারাই নিজ মাতৃভাষার প্রতি এত অবহেলা করে তা দেখে কষ্ট পেতে হয়। যে জাতি তুলনাহীন রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে তারা সে স্বাধীনতাকে এত অপব্যবহার ও অবমূল্যায়ন করে তা দেখে কষ্ট পেতে হয়।

তাই মাঝে মাঝে ভাবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি একটি অনিচ্ছুক ও অপ্রস্তুত জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেননতুবা একটি স্বাধীন দেশযা অর্জন করতে ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আড়াই লাখ মা-বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছেপ্রচুর সম্পদ নষ্ট হয়েছে তেমন একটি দেশে কীভাবে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দুটি ধারা থাকতে পারে। স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

'নিতে পার প্রাণ, দিতে পার কি?'

দৈনিক আজাদী              উপসম্পাদকীয়             কাল আজ কাল
২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১১ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী


এক. “অরা খালি বাপেক পুড়্যাই মারেনিপরিবারকে ছারখার কর‌্যা দিচে”। এই বিলাপ ট্রাকচালক শামসুল হকের মেজো ছেলে হাবলু মিয়ার।
গত সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর টানা ৪৮ ঘন্টার হরতালের প্রথম দিনে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার দশমাইল এলাকায় হরতাল সমর্থকরা শামসুল হকের ট্রাকে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। এতে ট্রাকে আগুন লেগে গেলে তিনি গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে গত রোববার তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুরের গণ্ডগ্রামে। শামসুল হকের ছেলে লাবলু মিয়া কাঁদতে কাঁদতে আরও বলেনসংসারে ১২/১৩ জন সদস্য। বাবার উপার্জনেই খরচ চলত। শামসুল হকের একটি মেয়ে গত বছর বগুড়াস্থ শাহ সুলতান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে মেয়েটি আহাজারি করছিল, ‘হামার আব্বুক তোমরা অ্যানে দাওহামার আব্বুতো কোনো পাপ করেনি। ক্যানে মারলে ওরা’।

আসলে শামসুল হককে কেনো মেরেছে ওরা তার উত্তর আমরাও জানি না। শুধু জানি একাত্তরে এভাবে নিরপরাধ ত্রিশ লক্ষ মানুষকে যারা হত্যা করেছিলহত্যায় সহযোগিতা করেছিল তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে। ৪৩ বছর আগের হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করতে ওদের উত্তরসূরিরা আবার হত্যার উৎসবে মেতেছে। শুধু একজন শামসুল হক নয়। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে বিশেষ করে বিভিন্ন অপরাধীর সাজার রায় ঘোষিত হতে থাকার পর থেকে ওদের হাতে কত শামসুল হক প্রাণ হারিয়েছেকতজন পঙ্গু হয়েছেকত পরিবার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়েছে তার হিসাব এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়। ঢাকায় একটি গাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। আগুন লাগার পরে চালক নেমে প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা তাকে নামতে দেয়নি। বলেছে তুই মরলে অ্যারা গাড়ি নিয়ে বের হতে ভয় পাবে।

দুইপাকিস্তানের পেশোয়ারে ঐতিহাসিক একটি গির্জার পাশে গত রোববার আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৭০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক। পাকিস্তানে খ্রিস্টানদের ওপর এটাই মারাত্মক হামলার ঘটনা। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতায় ১৩০ বছরের পুরনো অল সেইন্টস গির্জার আশপাশের কয়েকটি ভবনের জানালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। মৃতের মধ্যে শিশুনারী ও পুলিশও রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র বলেছে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে। তালেবানের সঙ্গে জড়িত জঙ্গিদল টিটিপি জানদুল্লাহ এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। পাকিস্তানে ১৮ কোটি জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।

তিনকেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির একটি শপিংমলে গত শনিবার সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৭০ জনআহতের সংখ্যা ৩০০শ’রও বেশি। তারা এই বিপণি কেন্দ্রে ঢুকে অনেক নারী ও শিশুকে জিম্মি করে রাখে। আল কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ইসলামপন্থি জঙ্গি সংগঠন সোমালিয়ার আল-শাবাব এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত এই দুটি-বৃহৎ হত্যাকাণ্ডের সংবাদের চাপে আফগানিস্তানইরাকলিবিয়াসহ অন্য কয়েকটি মুসলিম দেশে ছোটখাটো কিছু হত্যাকাণ্ডের সংবাদ চাপা পড়ে গেছে।

চারখুব অসহায় হয়েবিনীতভাবে (জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী নই বলেপ্রশ্ন করতে চাই এই মৃত্যুএই হত্যার উৎসব কার স্বার্থে। কিসের স্বার্থে। কোন উদ্দেশ্যে শত শত নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করা হলো। এতে কার কী অর্জিত হলো। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের কোথাও কি এমন হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ আছেনা বৈধতা আছে। এতে ইসলাম ধর্মের কী লাভ হলো। মুসমানদের কোন স্বার্থ রক্ষিত হলো। এভাবে এরা কোন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলাম ধর্মের সাথে এদের নৈতিক ও আদর্শিক মিলটা কোথায়। বরং এ ধরনের কাপুরুষোচিত হত্যা ও আক্রমণের কারণে আজ সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্ম জঙ্গিবাদের সমার্থক হয়ে উঠছে আর বিপন্ন ও পরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘুরামুসলিমরা। পশ্চিমা বিশ্বে আজ মুসলিম নামধারী হলেই তাকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অনেককে সন্দেহের তালিকায়ও রাখা হচ্ছে। এদের অধিকাংশই নিরীহ ও নিরপরাধ। এসব কারণে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের সন্তান যারা ওদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে তারা ভীষণ বিব্রত ও অবমাননাকর পরিস্থিতিতে পড়ছে। ওদেশের শিশুদের মনেও এখন এক প্রকার ঘৃণা ও অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে মুসলিম শিশু সহপাঠীদের প্রতি। ইসলামের নামে এমন জঙ্গিরূপ পরিহার না করলে অদূর ভবিষ্যতে সকল সভ্য ও উন্নত দেশগুলো মুসলিমদের এক প্রকার বয়কট করা শুরু করবে তাদের দেশ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার খাতিরে।

পাঁচবাংলাদেশে বর্তমানে যা চলছে তা জঙ্গিবাদেরই অন্য রূপ। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা গণহত্যাধর্ষণঅগ্নিকাণ্ড ও লুটপাট করেছিল তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে স্বাধীনতার দীর্ঘ চারদশক পরে। এই দীর্ঘসময়ে সিংহভাগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এই শক্তির সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকরাই। ফলে অর্থনৈতিকসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এরা ’৭১’র চেয়েও অনেক শক্তিশালী। বিশেষ করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান শুধু ভালো নয়। দেশের বর্তমান অর্থনীতির ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো। কাজেই বর্তমান বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালকে বিব্রতবিতর্কিত ও অকার্যকর করতে তারা শত শত কোটি ডলার খরচ করার মতো ক্ষমতা রাখে। করছেও তাই। ফলে টাকার জোরে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টাও করছে তারা। জামায়াত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলো মোকাবেলা করছেউচ্চ আদালতে আপিল করছে অন্যদিকে মামলায় হেরে গিয়ে হরতালের নামে দেশে নৈরাজ্যও চালাচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার ও এর প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেমানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছে অথচ হরতাল ডেকে যারা মানুষ হত্যা ও নৈরাজ্য চালাচ্ছে সে বিষয়ে আশ্চর্য নীরবতা পালন করছে।

ছয়তারুণ্যের ধর্ম হচ্ছে আধুনিক হওয়া। নতুনকে ধারণ করা। তারুণ্যের ধর্র্ম হচ্ছে বিদ্রোহ আর বিপ্লব করাসকল অসুন্দর আর অকল্যাণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তারুণ্যের ধর্ম হচ্ছে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের জয়গান গাওয়া। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকা। এই তারুণ্যের রূপ দেখলাম শাহবাগসহ দেশের আনাচে-কানাচে। যারা দিনের পর দিন অহিংসভাবে আন্দোলন-অবস্থান করে গেছে। আর অন্যদিকে আরেকদল তরুণদের দেখছি যারা হঠাৎ মৃত্যুদূতের মতো উপস্থিত হয়ে ভেঙেচূরে ধ্বংস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করে মেতে ওঠে হত্যার উল্লাসে। জীবনের পরিবর্তে তারা নিয়ে আসে মুত্যুর পয়গাম। কিন্তু প্রশ্ন করতে চাই যা তারা দিতে পারে নাসৃষ্টি করতে পারে না তা ধ্বংস বা হত্যা করবে কীভাবে। জীবনতো কেউ দিতে পারেনাযা সে দিতে পারে না তা বধ করবে কীভাবে সে। পৃথিবীর সমস্ত ধনরাজী দিয়ে একটি মানুষতো দূরের কথামানুষের একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কি অবিকল তৈরি করা সম্ভব। যারা জীবন দিতে পারে না।

জীবনের জয়গান যাদের দ্বারা গীত হয় নাজীবনের পক্ষে যারা কোনোদিন দাঁড়ায় না তারা জীবন কেড়ে নিতে আসে কোন দুঃসাহসে। ত্রিশ লক্ষ প্রাণ হত্যার বিচার ঠেকাতে এরা আরও কত প্রাণ কেড়ে নেবে মানুষের?

পুনশ্চঃ- ‘অভিজাত যুবলীগ’ শীরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম কয়েক সপ্তাহ আগে। সেখানে যুবলীগের কিছু সমালোচনা করেছিলাম। গত কয়েকদিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় দেখলাম চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ-মাদক বিরোধী প্রচারণা ও আন্দোলন শুরু করেছে। প্রীত হলাম। আমি মূলত এ সংগঠনগুলোর কাছে এ ধরনের ইতিবাচক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা করি। নবগঠিত যুবলীগ কমিটিকে ধন্যবাদ।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

'জয় নব উত্থান'

দৈনিক আজাদী                   উপসম্পাদকীয়               কাল আজ কাল
১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৪ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১২ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী

বছর দুয়েক আগে সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ করলেও গত সপ্তাহ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। অবশ্য এর আগে দু’তিনটি জনসভায় মায়ের সাথে জনসম্মুখে এসেছিলেন তিনি। কার্যত সেসব সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী পুত্র জয়কে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘রূপকল্প ২০২১ গত পাঁচ বছরের অর্জনআগামী পাঁচ বছরের অঙ্গীকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি একক ও স্বাধীনভাবে জনগণের মুখোমুখি এলেন। সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তর বিশেষ করে তরুণদের সাথে মতবিনিময় করেন। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। এর পরের দিন অর্থাৎ গত শনিবার চট্টগ্রাম ক্লাবেও এমন একটি আয়োজনে তিনি মুখোমুখি হন চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এ অনুষ্ঠানে তিনি তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে।

রাজনীতিতে জয়ের সক্রিয় হওয়া নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান বিরোধীদল স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দলের যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবীর রিজভী জয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য প্রদানের অভিযোগ এনেছেন। এছাড়া নামে সুশীল কার্যত রাজনীতিককিছু অতি বাম ও ‘কনফিউজড’ কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তবে মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়া আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছেন জয়তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

উত্তরাধিকারের রাজনীতি যারা পছন্দ করেন না তাঁরাই মূলত জয়ের রাজনীতিতে আসা সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। আমি নিজেও উত্তরাধিকারের রাজনীতি বা রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র পছন্দ না করলেও ঘোরতর বিরোধী নই। কারণ রাজনীতি পরিচালিতই হয় ভাবাবেগ দিয়ে। প্রিয় নেতা বা দলের জন্য অধিকাংশ কর্মী সমর্থকরা যুক্তি-তর্কের ধার ধারে না। নেতা যা বলে বা দল যে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় তারা তা-ই করে। এক্ষেত্রে অনেকটা রেজিমেন্টালটা আগে এই ভাবাবেগ বা ধারা শুধু বাংলাদেশই নয়। এর উদাহরণ আছে ভারতপাকিস্তানশ্রীলংকানেপালইন্দোনেশিয়াবার্মা বা মায়ানমারকাশ্মিরউত্তর কোরিয়াএমনকি আমেরিকায়ও। জন এফ কেনেডির জনপ্রিয়তার তোড়ে তার পরিবারও সম্মানীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। শাসনকার্যে জড়িত না থাকলেও বৃটেনঅস্ট্রেলিয়ানিউজিল্যান্ডজাপানবেলজিয়ামথাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে রাজা-রানিরা পূজনীয় হচ্ছেন স্রেফ ভালোবাসা ও আবেগের টানে।

তবে পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে যদি অযোগ্যদুর্নীতিবাজ অর্ধশিক্ষিত আর সন্ত্রাসের গডফাদার কেউ রাজনীতিতে আসেন সেখানেই আপত্তি থাকার কথা। একজন আধুনিকশিক্ষিতমার্জিত ও সৎ তরুণ যদি রাজনীতিতে আসেন এবং তা যদি পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমেও হয় তাতে আপত্তি থাকবে কেন?

রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নিয়ে বলতে গেলে একটু পূর্ব থেকে শুরু করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড স্রেফ ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নয়। এই হত্যাকাণ্ড একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে একটি জাতির মৌলিক পরিচয়সহ রাষ্ট্রের মূল স্বপ্নকেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। যে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন ও মুক্ত করা হয়েছিল ’৭৫ এর পরে বাংলাদেশ সে রাষ্ট্রের দিকেই ধাবিত করা হচ্ছিল। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাসমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো মৌলিক চেতনাগুলো মুছে ফেলা হয়েছিল এবং এই কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন করার সব ধরনের কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বলা বাহুল্য কার্যত তাই ঘটতো দেশেযদি ৮০’এর দশকের শুরুতে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ন্যস্ত করা না হতো। আজ বাংলাদেশ বলতে (একাত্তরের চেতনায়)যতটুকু আছে তা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগের পুনর্জীবনের কারণেও এবং আওয়ামী লীগ যে এখনো বৃহৎ রাজনৈতিক দল তা শেখ হাসিনার কারণে। ৭৫ থেকে ৮১ পর্যন্ত বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা অবলোকন করেছেন তারা আমার সাথে একমত পোষণ করবেন বলেই মনে করি। যদি সে কাল রাতে (১৫ আগষ্ট ১৯৭৫বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যদের সাথে শেখ হাসিনা ও রেহানাকেও হত্যা করা হতো তাহলে আজ ‘আমার সোনার বাংলা’ বদলে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ গাইতে হতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো এক একটি ওয়াজিরিস্তানে পরিণত হতো। এছাড়া শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আগমন আকস্মিক হলেও অসম্ভব ছিল না। কারণ তিনি দেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিয়েছেন। নিজে অল্পসময়ের জন্য হলে ও ছাত্র রাজনীতি করেছেন। এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতো অবিস্মরণীয় ও অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তির কন্যা হিসেবে কিছুটা দীক্ষা হলেও পেয়েছিলেন।

সে হিসেবে শেখ হাসিনার রাজনীতিকে উত্তরাধিকারের রাজনীতি বলে একেবারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা সঙ্গত হবে না। বরং কিছু ভুল-ভ্রান্তি ছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন ও চারদশকের কলঙ্ক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে শেখ হাসিনা একজন দক্ষ রাষ্ট্র নায়কের পরিচয়ই দিয়েছেন। যারা এতকাল বলেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আওয়ামী লীগ করতে পারবে না বা করবে নাযুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে না বা তার সবটাই শেখ হাসিনার সরকার করে দেখিয়েছেন। এবং এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অবস্থান ও আন্তরিকতাই ছিল প্রধান। যারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন নাআওয়ামী লীগকে ভোট দেন নাবিএনপি ও জামায়াতের চেয়ে আওয়ামী লীগকেই বেশি গালাগাল করেনতারাই কিন্তু আবার আওয়ামী লীগকে দিয়েই সকল জঞ্জাল পরিষ্কার করিয়ে নিতে চান।

আওয়ামী লীগে অনেক ভুল-ত্রুটি আছে। অনেক গডফাদারচাঁদাবাজটেন্ডারবাজদুর্নীতিবাজ আছে। আওয়ামী লীগে যুবলীগ-ছাত্রলীগের মতো রাজনৈতিক টিউমার আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার অন্যদিকে জামায়াত-হেফাজত ও জঙ্গিদের ঠেকানোর মতো রাজনৈতিক সামাজিক শক্তিও আছে তাতেও সন্দেহ নেই। অর্থাৎ এই মুহূর্তে দেশে তৃতীয় কোনো শক্তির উদ্ভব হয়নি যারা বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবেলা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আমার অনেক বন্ধুরা অভিযোগ করেন তৃতীয় ধারা আওয়ামী লীগই তৈরি হতে দেয়নি। কী বালখিল্য কথাগণজাগরণ মঞ্চের উত্থান কি আওয়ামী লীগ ঠেকাতে পেরেছিলআর যদি আওয়ামী লীগ গণজাগরণ মঞ্চকে শেষ পর্যন্ত গ্রাসই করে থাকে তবে তৎপরবর্তী সময়ে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন করে চাঙ্গা হলো না কেনসমস্যাটি আওয়ামী লীগের না কি বামপন্থি সংগঠন বা তৃতীয় ধারা তৈরির কারিগরদের। আওয়ামী লীগের প্রতি বিরক্ত হয়ে জনমত বিএনপি’র দিকে ঝুঁকবে কেনতৃতীয় ধারা তা কাজে লাগাতে পারলো না কেনআওয়ামী লীগ-বিএনপিতো নিজেরা তাদের অবস্থান ছেড়ে দেবে না। অন্যদের তা দখলে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য দলগুলোর দুর্বলতার জন্যও কি আওয়ামী লীগ দায়ী!

আওয়ামী লীগ পুরনো ও বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এই দল জাতিকে অনেক কিছু অর্জন করে দিয়েছে। আর বৃহৎ ও পুরনো হওয়ার কারণে এই দলে অনেক সুবিধাবাদীলুটেরা উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীর সমাহার ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে যদি জয়ের মতো একজন তরুণসৎ ও শিক্ষিত রাজনীতিকের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর নেতৃত্বে যদি দল গতি পায়দিক নির্দেশনা ও সঠিক পথের সন্ধান পায় তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না। বরং নতুন যুগের সাথেসময়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজাতে অর্থাৎ যুগোপযোগী করে তুলতে সজীব ওয়াজেদ জয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি যাদের আবেগ এখনো অটুট তাঁদের কাছে জয়ের নেতৃত্ব অধিকতর গ্রহণীয়ই হবে-পরিত্যাজ্য নয়।

দুভাগে বিভক্ত জাতির সামনে দু’শিবিরের নেতৃত্বের চিত্রটি তুলে ধরতে চাই পাঠকদের সামনে। এর একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানশেখ হাসিনাসজীব ওয়াজেদ জয়। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানবেগম খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া। গত বিএনপি জামায়াত জোটের পাঁচ বছরে তারেক জিয়ার রাজনীতির চিত্র আমরা দেখেছি। এখন সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতি দেখার পালা। পারিবারিক ঐতিহ্যশিক্ষাসংস্কৃতি আর রাজনৈতিক সততার কথা আজ নাইবা তুললাম। জয়ের আগমনে বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতির নব উত্থান ঘটুক। তা-ই প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ