পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৩

' ভাল মানুষও যখন মন্দ কাজ করেন '

কামরুল হাসান বাদল

গত ২০ এপ্রিল শনিবার ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সমাবেশ বা আয়োজন হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নাগরিক সমাজের জাতীয় সম্মেলন। জাতীয় ঐক্যের সমাবেশ ও নির্মূল কমিটির আলোচনা সভা অন্যতম। আমি তার মধ্যে দুটি সমাবেশ এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করব আজ।
বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ আহবান ভিত্তিক নাগরিক সমাজের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে শনিবার সকালে রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ মিলনায়তনে। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ। পাঁচ দফা দাবি সংবলিত ঘোষণা পাঠ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডাসারওয়ার আলি । এই সমাবেশের দাবিগুলো হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাযুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করাসাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোমুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেয়া ও মুক্তচিন্তার পথ খোলা রাখাতালেবানি রাষ্ট্র বানানোর পাঁয়তারা প্রতিহত করা ও নারীর অধিকার সমুন্নত রাখা। গণজাগরণ মঞ্চসহ ঢাকা ও বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংগঠনের প্রতিনিধিবেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাবামপন্থি বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সুলতানা কামাল অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসানজীদা খাতুনসৈয়দ শামসুল হককামাল লোহানী,অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালরামেন্দু মজুমদারনাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুস আরেফিনআবেদ খানরানা দাশ গুপ্তখুশি কাবরসহ অনেকে। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে অতীতের মতো মূল্য দিতেও আমরা প্রস্তুত।’
প্রিয় পাঠক একই দিন রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে ‘জাতীয় ঐক্যের’ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ড.কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে। ‘জাতীয় স্বার্থে জাতীয় ঐক্য’র আহবান সম্বলিত এই সমাবেশের মঞ্চের পেছনে ব্যানারে মাত্র দুটো দাবি লেখা ছিল। একটি হলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচারের দাবি। এই সমাবেশটির সভাপতির নামটি আগে উল্লেখ না করলে মনে হতে পারতো এটি বিএনপি-জামাত সমর্থিতকোন পেশাজীবী সংগঠনের সমাবেশ। যাক আমরা এক নজরে দেখে নিই এই সমাবেশে আর কারা কারা উপস্থিত ছিলেন। গণফোরামের মহাসচিব মোস্তফা মহসীন মন্টুর পরিচালনায় বক্তৃতা করেন আকবর আলি খানমাহমুদুর রহমান মান্নাশাহদীন মালিক বদিউল আলম মজুমদারএকে আজাদসৈয়দ আবুল মকসুদ প্রমুখ। (তথ্য প্রথম আলো)
প্রথম সমাবেশ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ রুখে দাড়াও’ নিয়ে বিশদ বলবার প্রয়োজন নেই। তাদের দাবিগুলো লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি এবং সভাপতি হিসেবে ডআনিসুজ্জামানের বক্তব্যের সারাংশটুকু উদ্ধৃত করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরে সারাদেশে জামায়াত-শিবির এবং তাদের সাথে বিএনপি হেফাজতের লাগাতার ধ্বংসনৈরাজ্যখুনখারাবী বিপরীতে দেশের মুক্তচিন্তার কিছু ব্যক্তি ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে মৌলবাদীসাম্প্রদায়িক জামায়াত-শিবির হেফাজতের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বাঙালিকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন গত ১ মাসেরও অধিক সময় আগে। সাম্প্রদায়িক এই অপশক্তি দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার লক্ষ্যে লাগাতার হরতাল অবরোধভাঙচুরঅগ্নিসংযোগলুটপাটপুলিশের ওপর আক্রমণ ও হত্যা,বাঁশখালীবামনডাঙ্গাবগুড়াসাতক্ষীরাচাপাইনবাবগঞ্জমিঠাপুকুর সাতকানিয়া এবং সর্বশেষ চট্টগ্রামে ফটিকছড়িতে বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম হত্যাকাণ্ড পরিচালিত করেছে। দেশের অপার সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ভেঙে দিয়েছে দেশের সুশৃঙ্খল শিক্ষা-ব্যবস্থাকে। শুধু তাই নয় সাদেক হোসেন খোকা থেকে শুরু করে বিএনপির প্রায় সব নেতারাই প্রকাশ্যে বলছেন দেশের প্রতিটি উপজেলায় ফটিকছড়ির মতো ঘটনা ঘটাতে হবে। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টস কারখানাগুলো। পরিবহন সংকটের কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে নির্মমভাবে। গত দু’মাসে জামায়াত-শিবির-বিএনপি-হেফাজতের হরতাল অবরোধ আর তাণ্ডবে দেশের লক্ষ কোটি টাকার ওপর ক্ষতি হয়েছে। জিডিপি প্রত্যাশিত মাত্রা ৬-৭ থেকে নেমে ৫ এসে ঠেকেছে। জাপানসহ কয়েকটি দেশ বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। দেশের স্মরণকালের এই মহা দুর্যোগকালে দেশের বরেণ্য সন্তানরা মিলিত হয়েছেন পরম উৎকক্তায়। তাঁরা এই অপশক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে যোগ্য আইনজীবী ব্যর্থ রাজনীতিক ডকামাল হোসেনমাহমুদুর রহমান মান্নারা মিলিত হয়েছেন ঐক্যের ডাক দিয়ে। তাদের ব্যানার দেখেআমি পূর্বেও বলেছি যে কারও ভুল হতে পারে যে,এটি বিএনপি জামাত সমর্থিত কোন সংগঠনের সমাবেশ। যে দাবি দুটো নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রায়ই দেখা যায় জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন সংগঠনকে মানববন্ধন করতে। ডকামালমান্না মকসুদ সাহেবরা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বা সংকটের মূল কারণ হিসেবে খুঁজে পেয়েছে একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ইস্যু। যেন এটিই হলেই দেশের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জামায়াত-শিবিরের এত নৈরাজ্য
তাতে বিএনপি’র খোলাখুলি সমর্থন দানহেফাজতে ইসলাম নামক জামায়াত-বিএনপি’র বি টিম বলে খ্যাত এই নব্য ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সংবিধান বিরোধী ১৩ দফা দাবি যেন কোন সমস্যাই নয়। বিগত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণমন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর,অগ্নিসংযোগ কিছুই তাদের বিচলিত করে না। ফটিকছড়ির নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাদের বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না এবং এ বিষয়ে এদের দৃঢ় কোন বক্তব্য বা অবস্থানও নেই। এদের চোখে দু’দলই সমান। এদের চোখে সব সমস্যার মূলে বর্তমান সরকার যারা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মেনে নিলেই দেশে শান্তি নেমে আসবে। সে সাথে তাঁরা আরেকটি দাবিও করেছেন নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করা।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে আমাদের কারো কোন দ্বিমত নেই। আওয়ামী লীগও তা অনুধাবন করে। কিন্তু কথা হলো তার জন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেনআজ যেই নেত্রী এবং তার সহযোগী ১৮ দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন দাবি করছেন সেই চলমান সংসদে তো গত চার বছরে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী ৪ ঘণ্টাও অবস্থান করেননি সব মিলিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হলেই কি বিএনপি ক্ষমতায় যাবেতত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও কি অনন্তকাল ধরে চলবেনা কি ডকামালমান্নার মতো সুশীলরা যাওয়ার মতো কোন ব্যবস্থা করে রেখেছেন। কারণ আবার যদি বিএনপি জিততে না পারে তখনও কি বিভিন্ন অজুহাতে বর্তমানের মতো বছরের পর বছর সংসদ বর্জন করবেন তারাহেরে গেলেও বিএনপি সংসদ বর্জন করবে না সে নিশ্চয়তা নাগরিক ঐক্য কীভাবে পেলোদ্বিতীয়ত বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় মরহুম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে একটি সার্চ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই কমিটিতে তখন বিএনপি সহযোগিতা করেনি কেনকামালমকসুদ সাহেবরাও তখন নীরবতা পালন করেছিলেন কার স্বার্থে?
নিজেদের নেতা যারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত তাদের বাঁচাতে দেশকে অচল করে দিতে চায়যারা ১৩ দফার নামে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও চেতনাকে নস্যাৎ করে দেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিতে চায় তাদের বিষয়ে রহস্যময় নীরবতা পালন করে নাগরিক ঐক্য কী ধরনের ঐক্য গড়তে চায় দেশে?
রাজাকারের সাথে মুক্তিযোদ্ধারকট্টরউগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি হেফাজতের সাথে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল শক্তিরতবে সে আশায় গুড়ে বালি। বাংলাদেশে কখনো তা ঘটবে না। গণজাগরণের মাধ্যমে দেশের লক্ষ কোটি তরুণের যে জাগরণ তৈরি হয়েছে দেশে শত মিথ্যা অপপ্রচারে বিভক্ত হবে না এই শক্তি। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সংগ্রাম মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যেরধ্বংসের বিরুদ্ধে নির্মাণেরঅমঙ্গলের বিরুদ্ধে কল্যাণেরপশুত্বের বিরুদ্ধে মানবতারহিংসার বিরুদ্ধে অহিংসার। বিশ্বের কোথাও কখনো মিথ্যার চিরস্থায়ী জয়লাভ ঘটেনি। বাংলাদেশেও ঘটবে না। নাগরিক ঐক্যের মাধ্যমে যতই বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হোক না কেন। কথায় বলে, ‘টাকা যখন কথা বলে ঈশ্বর তখন চুপ করে থাকে’। জামায়াতের হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে কথা বলা শুরু করেছে। এখন কী দেখছি। সামনে আরো বহু কিছু দেখার বাকি আছে।
নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘সমাজের যে সব সময় মন্দ লোকেরা ক্ষতি করে তা কিন্তু নয়,ভাল লোকেরাও ক্ষতি করে যখন তারা জাতির ক্রান্তিকালে চুপ করে থাকেন। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য এখানে যাদের ভাল লোক বলে এতকাল জেনে এসেছি তাঁরা নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বলছেন বটে তবে তা মন্দ লোকদের পক্ষেই বলছেন। এই পরিস্থিতিকে বোনাপার্ট কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন বুঝতে পারছি না।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৩

' এ কোন মৃত্যু, কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন?'

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৫ বৈশাখ ১৪২০ সাল ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী 



১১ এপ্রিল। গ্রাম বাংলার আর দশটি দিনের মতো ফটিকছড়ি, ভূজপুরের সাধারণ মানুষও শুরু করেছে তাদের স্বাভাবিক কর্মজীবন। গত কয়েকমাসে সারা বাংলায় ঘটে-যাওয়া জামায়াত-শিবিরের নৈরাজ্য-তাণ্ডব-ফটিকছড়িতে এখন পর্যন্ত তেমন ঘটেনি। মোট কথা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমান অন্য উপজেলার তুলনায় কিছুটা শান্ত। যদিও একসময়ে ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ ‘বাংলার লেবানন ইত্যাদি বলে-ফটিকছড়ির এক প্রকার প্রচার ছিল দেশজুড়ে। সে বদনাম কিছুটা ঘুচে গেছে। বিশেষ করে বিগত চার বছরে ফটিকছড়িতে তেমন কোন সন্ত্রাসের ঘটনাও ঘটেনি। একটি উজ্জ্বল সূর্যোদয়ের সাথে ফটিকছড়ি-ভূজপুরের মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে জীবনের পথে। কিন্তু সেই আলোকিত দিনেও কিছু মৃত্যু দূত শান দিয়েছে অস্ত্রে গোপন অন্ধকারে। সেদিন ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগ আয়োজন করে হরতাল বিরোধী মিছিলের। এই মিছিল ভূজপুর থানা ঘুরে দুপুরে ফটিকছড়িতে ফিরে আসার কথা। সে অনুযায়ী প্রায় দু’হাজার মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থাও করে রাখা হয়েছিল। এক সময়ের ছাত্রনেতা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, এ টি এম পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি মিছিল বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কাজীরহাটে পৌঁছালে-“আওয়ামী লীগের কর্মীরা মসজিদে হামলা করেছে, তারা মাদ্রাসার হুজুরকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে’ বলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে থাকা জামায়াত-শিবির ও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র আওয়ামী, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ওপর। মিছিলকারীরা কিছু বুঝে উঠবার আগেই শত শত মানুষ রাম দা, বটি, কুড়াল, লাঠি ও অস্ত্র নিয়ে মৃত্যুর উল্লাসে মেতে ওঠে। ছাত্রলীগ কর্মীদের টেনে হিঁচড়ে মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে নিয়ে রাস্তায় বা যেখানে যে অবস্থায় পেয়েছে পৈশাচিকভাবে খুন করেছে। সেদিন তারা মিছিলে অংশ নেয়া ২ শতাধিক মোটর সাইকেল, ১১টি জিপ ও পিকআপ, তিনটি কার ও একটি নোয়া মাইক্রোবাস জ্বালিয়ে দেয়। প্রিয় পাঠক সেদিনের সেই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখানো হচ্ছে। অনেকের ফেশবুকে ও মোবাইলেও ডাউনলোড করা আছে। এমন নির্মম নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হত্যার দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি। শুধু আমি নই কোন জঘন্য খুনি ছাড়া তা দেখার সুযোগও কারো হয়নি। আমি বগুড়া, গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর তাণ্ডব দেখিনি স্বচক্ষে। বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের দৃশ্য দেখেছি শুধু। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে। হত্যার পরে উল্লাস করতে পারে সে সাথে নারায়ে তাকবির শ্লোগান দিতে পারে তা বড় কষ্টকল্পিত। এ কোন মৃত্যু কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন?
সেদিন শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেয়া ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের অপরাধ কি ছিল? মিছিলের আগে তো যে কোন সংঘাত এড়ানোর উদ্দেশ্যে পেয়ারুল ইসলাম স্থানীয় মাদ্রাসার হুজুরের সাথে আলাপও করে নিয়েছিলেন। ইবাদতের স্থান এবং আল্লাহর ঘর বলে মান্য মসজিদের মাইকে এমন মিথ্যা ঘোষণা কে দিয়েছিল, কার নির্দেশে দিয়েছিল, আজ যারা ইসলামের ধ্বজাধারী ও সোল এজেন্ট সেজে ব্লগ কাকে বলে তা না জেনে শুনে যাকে তাকে নাস্তিক-মুরতাদ ঘোষণা দিচ্ছেন সে সব স্বঘোষিত আলেম-ওলেমারা তো এই মিথ্যাচার নিয়ে। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিন্দা জানানোতো দূরের কথা একটু সমবেদনা বা দুঃখও তো প্রকাশ করলেন না। যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তারা সবাইতো মুসলিম পরিবারেরই সন্তান। যাঁরা ধর্মের নামে মসজিদে দাঁড়িয়ে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে মানুষ হত্যা করতে পারে তাদের তুলনায় নাস্তিকরা খারাপ কী সে। পৃথিবীর ইতিহাসে একজন নাস্তিক কোন মানুষ হত্যা করেছে তার মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য তেমন নজির কোথাও নেই। পবিত্র ধর্মকে পুঁজি করে যারা ক্ষমতায় যেতে চায় তাদের মতো জঘন্য মানুষতো আর কেউ হতে পারে না। এই কারণে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা বা রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা বেআইনি ঘোষণার দাবি উঠছে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার। রাষ্ট্রের কিংবা রাজনীতির সাথে তাকে গুলিয়ে ফেললে দুর্বৃত্তরা এমন সুযোগই কাজে লাগাবে। এখনো দেশের কোথাও না কোথাও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে তাতে আহত হয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে পুলিশ বাহিনী।
এগুলোতো কোন সভ্য বা গণতান্ত্রিক দেশের চিত্র হতে পারে না। এরা কী চায়? কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশে। যে দেশ স্বাধীন হয়েছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মূল স্তম্ভ করে। এরা কথায় কথায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়। তারা তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করতে চায়। তাদের পরিকল্পনা মাফিক এদেশ একদিন সত্যি সত্যি সংখ্যালঘু শূন্য হলে তখন তারা কাদের আক্রমণের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করবে? তখন কি পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো প্রতি শুক্রবার দেশের কোন না কোন মসজিদে আক্রমণ বা বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের জিঘাংসাকে চরিতার্থ করবে? ওরা কি দেশকে সে পথেই নিয়ে যেতে চায়। কোন যুক্তি নয়, আলোচনা নয় হত্যা আর ধ্বংসই হবে ভিন্নমতকে মোকাবেলা করার উপায়?
মডারেট ইসলামি দল বলে পরিচয় দানকারী বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগরের আহবায়ক, রাজনীতিতে যার ক্লিন ইমেজ আছে বলে প্রচার আছে এই ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ২০০/ ৩০০ লোক অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসার সামনে দিয়ে গালি গালাজ করতে করতে যাচ্ছিল। তখন গ্রামবাসী এসে তাদের আক্রমণ করেছে এটাই সত্যি ঘটনা। কী সুনিপুণ মিথ্যাচার। তাঁর এই বক্তব্যে ফটিকছড়ির খোদ বিএনপি নেতারাই লজ্জা পেয়েছেন। এমন কি ঘটনার পরে যে হুজুরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তাঁর ছেলে মাওলানা জুনায়েদ বিন জালাল ঘটনার পরদিন সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, আমার বাবা মাওলানা জালালকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে বলে মাইকে গুজব রটিয়ে একটি পক্ষ স্বার্থ হাসিল করতে এই কাজ করেছে।’ (সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১৪ এপ্রিল)
হেরোইনের মত কিছু নেশা আছে যা প্রথম প্রথম খাওয়ার পরে এক প্রকার বিভ্রম তৈরি করে। প্রথম প্রথম তরুণরা যখন এই নেশায় আসক্ত হতে থাকে তখন তাদের এই বিভ্রমকালকে রঙিন স্বপ্নের জগত বলে মনে হয়। তারপর এক সময় এই নেশাই তার জীবনঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। এই নেশার বৃত্ত থেকে আর সে বেরুতে পারে না। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধীদলসহ দেশের কিছু সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী এখন এই নেশার প্রাথমিক বিভ্রমে ভুগছেন। এই নেশাকে অবলম্বন করে ক্ষমতায় যাওয়ার রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে আবোল তাবোল বকছেন। কিন্তু এ নেশা বড় ভয়ঙ্কর। একবার আসক্ত হয়ে পড়লে আফগানিস্তান হয়ে যেতে হবে। আর এই নেশা যারা বিক্রি করেন তারাও আসক্ত হন আর তাদেরও পরিণতি হবে পাকিস্তানের মতো।
তাই বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সাবধান করতে গিয়ে বলি এখনো সময় আছে এই ভয়ঙ্কর নেশা, এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবকে এখনই থামাতে হবে। নতুবা রঙিন স্বপ্ন একদিন বিভ্রম থেকে বিপত্তি ও সর্বনাশ ডেকে আনবে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়।
যারা গণতন্ত্র মানে না, মানবতা মানে না। যারা একটু ভিন্নমত পোষণ করলেই হত্যার মচ্ছবে মেতে ওঠে তারা কখনোই মানুষ বা মানবতার বন্ধু হতে পারে না। হিংস্র এই দানবদের বিশ্বাস করে দেশ ও জাতির সর্বনাশ ডেকে আনবেন না। প্রিয় রাজনীতিকগণ অপার সম্ভাবনার এই বাংলাদেশকে রক্ত পিপাসুদের হাতে তুলে দেবেন না। আপনি বা আপনারা হয়ত পালিয়ে অন্য দেশে যাওয়ার আর্থিক ব্যবস্থা করে রেখেছেন কিন্তু কোটি কোটি সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে কিছু হিংস্র প্রাণির সামনে ছেড়ে দিয়ে যাবেন না। দয়া করুন জাতিকে। আফগানিস্তানে তালেবানিদের কাছে মার্কিনীদের দেয়া অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করতে করতে পাকিস্তান নিজেই আক্রান্ত হয়েছে তীব্র নেশায়। অনেক দাম দেওয়ার পরে এখন পাকিস্তানের বোধোদয় হয়েছে। একটু পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। এবার প্রথমবারের মতো মেয়াদ পূর্ণ করেছে জাতীয় পরিষদ। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্তটি হলো পাকিস্তানে নির্বাচনী প্রচারে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের নির্বাচন কমিশন।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকেও শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৩

'প্রকৃত ইসলাম ও হেফাজতে ইসলাম'

দৈনিক আজাদী                     উপসম্পাদকীয়                      কাল আজ কাল 
১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৮ চৈত্র ১৪১৯ সাল ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি
*কামরুল হাসান বাদল


মিথ্যা হলো সকল পাপ, দুর্নীতি, অনৈতিকতা ও অন্যায়ের মূল। সকল ধর্মেই মিথ্যা না বলার কথা বলা হয়েছে। কারণ সত্য বলতে হলে কোন মানুষ আর পাপ বা অন্যায় করতে পারে না। সকল ধর্মেই বলা হয়েছে মিথ্যা বলা মহাপাপ। ইংরেজিতে বলা হয় ‘tell a lie এবং Speak truth । অর্থাৎ একটি মিথ্যা ও বলবে না, সত্য বলবে। ইসলাম ধর্মেও মিথ্যা বলা গুণাহ বা পাপ।
নবী করিম (সা.) নবুওত প্রাপ্তির বহু আগে অর্থাৎ তাঁর বাল্যকাল থেকেই সত্যি বলার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। যে কারণে তৎকালীন আরব সমাজে তিনি আল আমিন উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর সত্যবাদিতা ও ন্যায়-নীতিবোধের কারণে কাবাগৃহের পুনর্নির্মাণের সময়ে কুরাইশদের মধ্যে পারস্পরিক দাঙ্গা প্রশমনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তাঁর ওপর। এবং তিনি তা সবার সম্মান অক্ষুণ্ন রেখেই সমাধা করেছিলেন।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিও না, আর জেনে শুনে সত্য গোপন করো না”। সুরা বাকারা-৪২
গত ৬ এপ্রিল রাজধানী ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ উপলক্ষে তার আগের দিন ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে সমবেত হয় হেফাজতের কর্মী সমর্থকরা। সেই সমাবেশে জামায়াত-শিবির-বিএনপি ছাত্রদল-জাতীয় পার্টি উপস্থিত থেকে সমর্থন, সংহতি জানিয়েছেন, অনেকে বক্তৃতাও করেছেন। বিএনপি সমর্থিত চিকিৎকরা অর্থাৎ ড্যাবের কর্মীরা সমাবেশে চিকিৎসা সেবাও দান করেছেন। সমাবেশে অনেকেই উত্তেজনাকর বক্তৃতা প্রদান করেছেন। এমন এক পর্যায়ে, “(এই অংশটুকু প্রথম আলো থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তাং ৭ এপ্রিল)” সুন্নি আলেমদের প্রতিনিধি দাবি করে মাহবুবুল বশর আল কাদেরী নয়া দিগন্ত ছাড়া অন্যসব গণ মাধ্যমের নেতাদের সমাবেশস্থল থেকে বিতাড়িত করার দাবি জানান। তিনি ঘোষণা দেন এসব গণমাধ্যমের কার্যালয় ঘেরাও করা হবে।” এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যের এক পর্যায়ে হেজাফত কর্মীরা বেশ ক’জন সংবাদ মাধ্যমকর্মীর ওপর চড়াও হয়। এতে আহত হন একাত্তর টিভির বেশ ক’জন সাংবাদিক। লাঞ্ছিত করা হয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ব্যুরো প্রধানসহ অন্যদের। এই দৃশ্য ও সংবাদ দেশের প্রায় সব ক’টি সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। যার প্রতিবাদে ঢাকা চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। এই ঘটনার পরপরই যখন সারাদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে তখন এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে হেফাজতের নেতারা বলেন। “এ কাজ তাদের কর্মীদের নয়, ছাত্রলীগের ছেলেরাই সমাবেশে ঢুকে সাংবাদিক আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।” ঐ সমাবেশ যারা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন কিংবা টেলিভিশনে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তারা দয়া করে একবার ভেবে দেখুন হেফাজতের ঐ মারমুখী সমাবেশে ছাত্রলীগের যুবলীগের কোন কর্মীর পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল কিনা। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই আক্রমণকারীরা ছাত্রলীগেরই কর্মী, তাহলে হেফাজতের হাজার হাজার নেতা-কর্মীরা তাদের ধরে গণধোলাই দিল না কেন, অথবা পুলিশের কাছে সোপর্দ করল না কেন?
এখন প্রশ্ন হলো যারা ইসলামের প্রকৃত দাবিদার বলে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন সেই হেফাজতে ইসলামের নেতারা যারা নামের আগে পরে অনেক বিশেষণ সংযোজন করেন তারা প্রকাশ্যে মিথ্যা বললেন কী করে? তাঁদের সেই মিথ্যা বয়ান বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের দর্শকরা দেখেছেন। যে নেতা বা মৌলানা প্রমাণিত একটি সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করেছেন তিনি কি তবে কোরআনের শিক্ষাকে অমান্য করলেন না? আর কোরআন অমান্যকারী একজন ব্যক্তি কী করে মৌলানা শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন। তিনি কীভাবে ইসলামের হেফাজত করতে পারেন। আর এখনো যে সব মুসলিম ঐ মৌলানার(?) নেতৃত্ব মানছেন তাদেরকে কী বলা যায়!
মূলত বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে সুফি-সাধক-পীর-আওলিয়াদের কল্যাণে। যাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক। তাঁদের মহত্ব, সততা উদারতা ও মানবতাবোধে মুগ্ধ হয়ে উপমহাদেশের অন্যধর্মের নিপীড়িত বঞ্চিত লোকেরাই দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখনো তাঁদের মাজারে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ নর-নারীর সমাবেশ ঘটে। এই ধারা ইসলামের সুফিধারারই একটি অংশ।
বৃটিশ আমলেই এক সময়ে ওয়াহাবী ও শেষের দিকে মওদুদীবাদের জন্ম হয়। অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন ব্রিটিশদের আনুকূল্যেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এই দুই ধারা অত্যন্ত কট্টর ও উগ্র। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ, ওলেমা-মাশায়েখ এই দুই মতবাদকে ইসলামের বাতিল মতবাদ বলে আখ্যা দিয়ে তাদের বর্জনের আহবান জানিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো ওয়াহাবী মতবাদেই বিশ্বাসী। এই দুই মতবাদের বাইরে ইসলামের মূলধারা সুন্নী বা আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত ও আরো দু’একটি নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এখনো এই ধারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বর্তমানে সৌদি রাজপরিবারও ওয়াহাবী মতাদর্শের। যারা মূলত ইয়ামেনি বংশোদ্ভুত। আরবের এই অংশ দখল করে ইঙ্গ-মার্কিন সহযোগিতায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার নামে দেশের নামকরণ করেছে সৌদী আরব। যা ইসলামসিদ্ধ নয়, শুধু তাই নয় এই রাজবংশের রাজকীয় জীবন যাপনও ইসলাম সম্মত নয়। কারণ ইসলামে বিলাসিতা বা জাঁকজমকের কোন স্থানই নেই। এদের প্রভাবেই বাংলাদেশে ওয়াহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় হচ্ছে। এবং এদের মতই কওমী মাদ্রাসার অনেক শিক্ষক যারা বর্তমানে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে আছেন তাদের জীবনযাপনও বিলাসীতাময়। যাঁদের আয়ের সাথে জীবনযাপন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মোটেও। এরা যদি সত্যি সত্যি রাসুল (সা.) এর সুন্নত পালন করতে বদ্ধপরিকর হন তবে তাদের বর্তমানের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার প্রায় সবকিছুই বর্জন করতে হবে। এত আয়েশী জীবন ইসলাম ধর্ম কোনভাবেই সমর্থন করে না।
এঁরা শতকরা নব্বইভাগ মুসলিমের দেশে ইসলাম রক্ষা বা হেফাজতের আন্দোলন করেন মানুষ রক্ষা বা হেফাজতের কোন কাজ করেন না। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংকটে দুই বস্তা চাল নিয়ে কখনো কোন দুর্গত মানুষের পাশে তাঁদের দাঁড়াতে দেখা গেল না। দুর্নীতি নিয়ে, অনিয়ম নিয়ে তাঁদের কোথাও দাঁড়াতে দেখলাম না। কোন ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের বিপক্ষে কিছু বলতে শুনলাম না। যে সব মানুষের বেতন বা প্রকাশ্য আয়ের সাথে জীবনযাপনের মিল নেই তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে দেখলাম না। আজ থেকে ৪২ বছর আগে যারা ইসলামের নাম দিয়ে এদেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল, প্রায় তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানী ঘটিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনলাম না। যারা চাঁদে সাঈদীকে দেখা গেছে ব লে এমন ডাহা মিথ্যা রটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধ্বংস লীলা চালালো তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে দেখা গেল না। যারা এখনো সংখ্যালঘুদের বাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করছে তাদের বিরুদ্ধে একটু নিন্দাও জানালো না। ভেবে বিস্মিত হই এঁরা কোন ইসলামের কথা বলেন। আমার চৌদ্দ পুরুষতো এমন ইসলামের নামও শোনেননি।
মূলত হেফাজতে ইসলাম এখন জামায়াত-বিএনপির বি-টিম হিসেবেই মাঠে নেমেছে। জামায়াতের অর্থ- আর বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় হেফাজতে ইসলাম দুর্বিনীত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রায় ১৫ কোটি মুসলমানের মুখপাত্রতো হেফাজতে ইসলাম নয়। সেই ম্যান্ডেটও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হেফাজতকে দেয়নি। হেফাজত যে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছে তা পূরণে সরকার বদ্ধপরিকর বা বাধ্য নয়। কারণ বর্তমান সরকার তাদের ভোটে ও তাদের এজেণ্ডা বাস্তবায়নের জন্যে ক্ষমতায় আসে নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। যার সহযোগী আরো ১৩টি দল যারা আওয়ামী লীগের মতো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। এই জোটকে এদেশের মানুষ ভোট দিয়েছে এই তিন আদর্শসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রত্যাশায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা এবং দেশকে জঙ্গিমুক্ত করা। ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সম মর্যাদা নিশ্চিত করা। প্রগতির চাকাকে সামনে এগিয়ে নেয়া। আওয়ামী লীগ বাধ্য নয় হেফাজতের দাবি মেনে নিতে। হেফাজত যদি তাদের দাবি পূরণ করতে চায় তবে তারা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসুক। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি উস্কে দিয়ে, হরতাল-নৈরাজ্য করে দাবি প্রতিষ্ঠিত করা যায় না এবং তা গণতান্ত্রিক আচরণও নয়।
মুশকিল হলো জামায়াত ও হেফাজতের মতো শক্তিগুলো গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে সরকার পতন ঘটাতে চায় কিন্তু নিজেরা কখনো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। এরা কোন যুক্তিতর্কের ধার ধারে না। এদের পরমত ও পরধর্ম সহিষ্ণুতা নেই। এরা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলতে শুধু তাদের অনুভূতিই ও প্রতিক্রিয়া বোঝায় কিন্তু অন্যধর্মের লোকদের ওপর অত্যাচার, তাদের উপাসনালয় ভাঙচুর, লুণ্ঠন নিয়ে একটি কথাও বলে না। অন্য ধর্মের অনুসারীদেরও যে ধর্মীয় অনুভূতি আছে তারা তা বিশ্বাসই করতে চায় না।
আজ থেকে আট-নয়’শ বছর আগে এই উপমহাদেশে সুফি-সাধকদের পরিবর্তে যদি এই জামায়াত-হেফাজত ইসলামের স্টাইলে ধর্ম প্রচারে আসতো তাহলে সারা উপমহাদেশে বর্তমানে ২০০ জন মুসলমান খুঁজে পাওয়া যেতো কি না সন্দেহ। তাঁদের হিংস্র আচরণে আমরা মুসলমানরাই ভীত-সন্ত্রস্ত, অন্য ধর্মের মানুষকে আকর্ষণ করবে কী ভাবে?


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ