পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০১৪

'চট্টগ্রামের দুঃখই হয়ে থাকবে চাক্তাই খাল'

দৈনিক আজাদী                      উপসম্পাদকীয়                  কাল আজ কাল
২৬ জুন বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ১২ আষাড় ১৪২১ সাল ২৭ শাবান ১৪৩৫ হিজরি
- কামরুল হাসান বাদল
এক সময়ে হোয়াংহো নদীকে চীনের দুঃখ বলা হতোকিন্তু সঠিক পরিকল্পনাব্যবস্থাপনা ও নদী শাসনের ফলে সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে চীনের দুঃখও মুছে গেছে আজ। কিন্তু চট্টগ্রামের দুঃখ বলে খ্যাতচাক্তাই খাল এখনও দুঃখই হয়ে থাকল চট্টগ্রামবাসীর জীবনে।

কর্ণফুলী নদীর অন্যতম শাখা খাল চাক্তাইখাল শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম শহর ও আশেপাশের এলাকার পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে অবদান রেখে এসেছে। চট্টগ্রাম শহরে শিরা-উপশিরার মতো প্রবাহিত ছিল অসংখ্য খাল। পাহাড়-টিলা পরিবেষ্টিত এই নগরের জলনিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই খালগুলো অধিকাংশই মিলিত হয়েছে চাক্তাইখালের সাথে। অসংখ্য খালের মিলনের ফলে ভাটির দিকে প্রশস্ত হতে হতে এক সময় চাক্তাই নামক স্থানে এই খালটি কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। সম্ভবত এই কারণে খালটির নামকরণও হয়েছে চাক্তাই খাল। বঙ্গোপসাগরের সাথে কর্ণফুলীর সংযোগ বা কর্ণফুলীর মোহনাকে কেন্দ্র করে হাজার বছর আগে যে রূপ চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম গড়ে উঠেছে তদ্রুপ চাক্তাই খালের মোহনাকে কেন্দ্র করে এর আশে-পাশে গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র। দেশের প্রধান পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। এখান থেকে পণ্য কিনে ব্যবসায়ীরা নৌকা-সাম্পানে করে জেলাসহ দেশের নানা স্থানে নিয়ে যেতেন। পণ্যবাহী বড় বড় নৌকা ও সাম্পান এই চাক্তাই খাল কখনও এর শাখা খাল দিয়ে শহরের নানা স্থানে এমনকি বহদ্দারহাট পর্যন্ত যেতে পারতো। পণ্য পরিবহনজল নিষ্কাশন ছাড়াও এই খাল ও এর শাখা খালগুলো ছিল বিভিন্ন প্রকার মাছের উৎস। কর্ণফুলীতে পাওয়া যায় এমন সব মাছই পাওয়া যেত চাক্তাই খাল ও এর অসংখ্য শাখা খালসমূহে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে গত শতকের ৭০ দশকের পর থেকে জনসংখ্যাবৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা কর্মসংস্থান বাড়তে থাকে শহরমুখী জনতার স্রোত। জনতার চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরের আয়তনও বাড়তে থাকে দ্রুত। বাড়তে থাকে জায়গা জমির দাম। আর এর খেসারত দিতে থাকল খাল ও জলাশয়গুলো। মানুষের অপরিনামদর্শিতাঅতি লোভ ও লালসার কারণে দখল হতে থাকল খাল ও জলাশয়গুলো দখলে দূষণে একসময়ের খাল নালায় পরিণত হলো আর নালাগুলো বিভিন্ন অপচনশীল বর্জ্যে ভরাট হতে থাকল। এভাবে ক্রমে ক্রমে বর্ষা বা বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রায় সব পথ নিশ্চিহ্ন হতে হতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়াল যেএখন কয়েক ইঞ্চি বৃষ্টিপাতেই জলাবদ্ধতা হচ্ছে নগরীতে। মাত্র কয়েকঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরের কী হাল হয় তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কারণ এখনও পানিবন্দী অবস্থায় আছে কয়েক হাজার মানুষ। এভাবেই প্রয়োজনের চাক্তাই খাল চট্টগ্রামের দুঃখ হয়ে উঠল। গত শতকের ৮০ দশকের মধ্যসময় থেকে চাক্তাই খাল খননের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম দানা বাঁধতে থাকে। যদিও সে সময়ের পরিস্থিতি আজকের মতো এতটা ভয়াবহ ছিল না। এই আন্দোলন সংগ্রামের ফলে চাক্তাই খাল খননের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। বিএনপি নিয়োজিত মীর নাছিরের মেয়র থাকাকালীন চাক্তাই খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয় যা পরবর্তী মেয়রদের সময়েও অব্যাহত থাকে। একটি সময়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে চাক্তাই খাল খননই সিটি করপোরেশনের যেন অন্যতম একটি কাজ হয়ে দাঁড়াল। অনেক মতামতঅনেক আলোচনাঅনেক বিশেষজ্ঞ নিয়ে চাক্তাই খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হলো। মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন চীন থেকে বিভিন্ন প্রকার মেশিনপত্র আনা হলো। এক সময় চাক্তাই খালের তলদেশ পাকা করা হলো। খালের পাশে দেওয়াল দিয়ে দুপাড়ে মানুষ চলাচলের পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলো আর সে সাথে প্রতি বছর চাক্তাই খালসহ অন্যান্য খাল খননসংস্কার ও দখলমুক্ত করার তথাকথিত কর্মোদ্যোগ চলতে থাকলো। এখন ফি বছর শুধু খাল খননবাবদ কোটি কোটি টাকা খরচ হতে থাকল আর তার বিনিময়ে একটু বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরী জলে ভাসতে থাকল। এরপরেও আমাদের মেয়র মহোদয় ও কাউন্সিলরদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাদেখে বাইরের বৃষ্টির চেয়েও আমাদের ভেতরটা সিক্ত হতে থাকল বেশি বেশি। চাক্তাই খাল খননের নামে সিটি করপোরেশনের শত শত কোটি টাকা অপচয়দুর্নীতি ও লুটপাটের পরে বলা হচ্ছে এখন নতুন করে কিছু খাল কাটতে হবে। পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম-পাহাড়ি এলাকা বলে এই শহরেই শিরা-উপশিরার মতোই প্রবাহিত ছিল অসংখ্য খাল-ছড়া ইত্যাদি। এছাড়া এই শহরেই ছিল কয়েক হাজার পুকুর দীঘি জলাশয়। মানুষের লোভের কাছে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার পুকুর দীঘিশহরের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে অনেক অনেক খাল।গত চল্লিশ বছরে এই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ খাল-দীঘি জলাশয়গুলো রক্ষা করতে পারেনি এখন চসিক বলছে নতুন করে খাল খননের কথা।

আমরা এই নগরেরই সন্তান। প্রতি বছর খাল খননের নামে কীভাবে সিটি করপোরেশন তথা জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ করা হয়েছে তা আমাদের অজানা নয়। খাল কেটে তার মাটি খালের পাড়েই রাখা হতো যাতে বৃষ্টিতে সে মাটিগুলো আবার খালে গিয়ে পড়ে ফলে পরের বছর আবার খাল কাটার কাজ আর তার জন্য লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ এসব এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ ব্যাপার। এই শহরের প্রতিটি নাগরিকই জানে খাল খননের নামে লুটপাটের কাহিনী। এখনতো ‘খাল খননই’ হয়ে উঠেছে সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি ও লুটপাটের একটি অন্যতম উৎস।

এই পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। গত কয়েকদিনে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ত্বরিৎ হস্তক্ষেপ করেছেন। বহদ্দারহাট বাড়াইপাড়া হতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননের এই প্রকল্প গত ৩ বছর ধরে ঝুলে ছিল। একনেকের সভায় এই প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার সাথে সাথে অবশ্য এর কৃতিত্ব নেওয়ার ধুমও পড়ে গেছে।

গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও তাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দেখে আবার নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন মেয়রের মেয়াদকালে চাক্তাইখালের জন্য কতটাকা খরচ করা হয়েছে এবং এর বিনিময়ে কাজ কতটুকু হয়েছে।

৩০০ কোটি টাকার নতুন এই প্রকল্প শুরুর আগে আমরাও তা জানতে চাই। আমরা চাই চাক্তাই খাল নিয়ে এই পর্যন্ত কত টাকা খরচ করা হয়েছে তার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। এবং এই দুর্নীতিলুটপাট ও অপচয়ের সাথে জড়িত স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর ঠিকাদারদের নাম প্রকাশ করা হোক।

এ মুহূর্তে যখন নগরবাসীর বড় বিড়ম্বনার নাম জলাবদ্ধতা এবং তা নিয়ে সারাদেশে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা সে সময়ে বর্তমান মেয়র তাঁর মেয়াদকালের শেষ বাজেট ঘোষণা করলেন যেখানে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের কোনো নতুন প্রস্তাব নেই। অথচ আজ থেকে চার বছর আগে এমনি জলাবদ্ধতার দিনে-জলাবদ্ধতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

একটি বিষয়ে বর্তমান মেয়রসহ সাবেক মেয়রগণ এক ও অভিন্ন কক্তে কথা বললেন। আর তা হলো সরকারি অনুদানে অপ্রতুলতা। আমরা চট্টগ্রামবাসীরা চট্টগ্রামের বঞ্চনার কথা জানি অবহেলার কথা জানি। জানি চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কথাও। তবে একটি কথা এখনও স্পষ্ট জানি না তা হলো চাক্তাই খাল খননের পেছনে এ পর্যন্ত কত টাকাকী ভাবে ও কোথায় খরচ করা হয়েছে তার খবর।

আর এর জন্যেই শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 email: qbadal@yahoo.com
 Google+

বৃহস্পতিবার, ১২ জুন, ২০১৪

'বিশ্বকাপ জ্বর, বিদেশি পতাকা এবং দেশের ভাবমূর্তি'

দৈনিক আজাদী                          উপসম্পাদকীয়                              কাল আজ কাল
১২ জুন বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ১৩ শাবান ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল

বিশ্বকাপ জ্বরে ভুগছে বিশ্ব। খেলাধুলার জগতে সবচেয়ে বড় আয়োজন বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বরঞ্চ তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশিই। সারা দেশের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বাড়িগুলোর ছাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় এই জ্বরে কতটা আক্রান্ত বাংলাদেশ।

এ লেখাটি পাঠকদের কাছে যেদিন যাবে তার আগের রাতেই শুরু হয়ে যাবে উত্তেজনাকর ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার খেলা দিয়ে বিশ্বকাপ ২০১৪ পর্ব। অনেকে রাতজাগা ক্লান্তি নিয়ে বা দেরিতে ঘুম থেকে উঠে ঘুম ঘুম চোখে পত্রিকা খুলে বসবেন।

প্রতিবার বিশ্বকাপের আগে (ফুটবল বা ক্রিকেট) একটি বিতর্ক তৈরি হয় দেশে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়। যেহেতু ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা এবং এর আয়োজন ও অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যাও অনেক সেহেতু যার যার সমর্থিত দেশ নিয়ে তার তার আবেগ, উত্তেজনা ও বাড়াবাড়িও থাকে বেশ এবং এর বহি:প্রকাশ ঘটে প্রায় ঘরে ঘরে প্রিয় দেশের (বাস্তবে ও দেশের ফুটবলের) পতাকা ওড়ানোর মধ্য দিয়ে। বিতর্কটি হয় তা নিয়েই, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। খেলা যতই কাছে আসতে থাকে ততই বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, উত্তেজনা বাড়তে থাকে সে সাথে বাড়তে থাকে বিভিন্ন দেশের রকমারি পতাকার সংখ্যাও। আর এটাতেই অনেকের আপত্তি। পতাকা উত্তোলনকারীদের দেশ প্রেম, সাধারণ জ্ঞান এবং ঔচিত্যবোধ নিয়ে শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশিষ্টজনদের বিরূপ মন্তব্য। পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল লড়াই, তবে এবারের লড়াইয়ের ক্ষেত্র আরেকটু প্রশস্ত হয়েছে। বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ লড়াই এখন তুঙ্গে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে পক্ষে-বিপক্ষের তুমুল বাড়াবাড়িকে অপছন্দ করছি। এটি বাঙালির হুজুগেপনা অস্থিরতা ও আদিখ্যেতার একটি প্রকাশ বলে মনে করি। আমার ছেলের যখন কিশোর বয়স তখন সেও একদিন এমন একটি বিশ্বকাপে কিনে নিয়ে এলো তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের পতাকা। টাঙ্গিয়ে রাখলো তার রুমে খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিন পরেও। ও এখনও ওর প্রিয় দলের, (ফুটবল ও ক্রিকেট) জার্সি কেনে এবং ক্যাজুয়েলি তা পরিধানও করে। এখন তাকে কেউ জোর করলেও পতাকা কিনবে না, টাঙ্গাবে না। এমনকি রাত জেগে হয়ত খেলাও এবার দেখবে না কারণ পেশাগত ব্যস্ততায় সকাল ৯টার মধ্যেই তাকে তার কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। নিজের সন্তানের উদাহরণ দিলাম এজন্যে যে, প্রত্যক্ষ করেছি জীবন যাপন ও কর্মব্যস্ততা অর্থাৎ জীবনের বাস্তবতা মানুষকে কিভাবে বদলে দেয়। আমি আজ রাত প্রায় ১১টায় অফিস থেকে বাসায় যাওয়ার পথে দেখলাম জামালখানের মোড়ে ব্রাজিলের বিশাল পতাকা নিয়ে কিছু কিশোর-তরুণ-আনন্দ প্রকাশ করছে। আমি নিশ্চিত এদের অধিকাংশই বলতে পারবে না ব্রাজিল কোন মহাদেশে অবস্থিত, তার আয়তন, লোকসংখ্যা, সে দেশের রাষ্ট্রপতি কে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে ওরা ব্রাজিলের সমর্থক, অর্থাৎ ব্রাজিলের ফুটবল দলের সমর্থক। ব্রাজিলের প্রতি ওদের ভালোবাসা ফুটবলের জন্যে। ওরা ভালোবাসে ব্রাজিলের ফুটবলকে, ব্রাজিলকে নয় এবং ওদের এই ভালোবাসা নিজ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ছাপিয়েও নয়। আর্জেন্টিনা বা অন্য দেশের বেলায়ও তেমন। ওরা আর্জেন্টিনাকে চেনে ম্যারাডোনা বা মেসির জন্যে। অথচ চেনার কথা ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা বিপ্লবী চে গুবারার জন্যে। আসলে এদের এই সমবর্তের পেছনে কোনো রাজনীতি নেই আছে নির্ভেজাল আবেগ আর ভালোবাসা।

ওদের এই আবেগ ও ভালোবাসার ভুল ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয় বলে আমি মনে করি। এই দুর্নীতি, মিথ্যা, ভণ্ড, দুরাচার আর অপশাসন ভরা সমাজ ও রাষ্ট্রে এই তরুণরা একটি মাস অন্তত একটু আনন্দ বেদনায় আর উত্তেজনায় কাটাক না তাতে এমন ক্ষতি কি। ওরা তো দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে না, ওষুধে ভেজাল দিচ্ছে না, ফলে ফরমালিন আর কার্বাইড দিচ্ছে না। বিষাক্ত পানীয় বিক্রি করছে না, শিশু খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে না। দেশপ্রেম কি এতই ঠুনকো জিনিস কয়েকটি দেশের পতাকা ওড়ালেই তা খানখান হয়ে যাবে ! দেশপ্রেম কি এমন জিনিস যে কোনো পতাকা না উড়িয়ে তার প্রমাণ দিতে হবে?যে তরুণরা আজ ভিনদেশি পতাকা ওড়াচ্ছে বলে নিন্দিত হচ্ছে বয়স্কদের কাছে-বলতে দ্বিধা হয় সত্যিকার দেশপ্রেমের পরীক্ষা নিতে গেলে ওই বয়স্ক নিন্দুকেরাই হেরে যাবেন নবীনদের কাছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান একাত্তর এমনকি গণ জাগরণের বিশাল উদ্দীপনাতো এ তরুণরাই তৈরি করেছে, সফল করেছে। এ লেখাটি লিখতে বসার আগে আগেই খবরে শুনলাম যশোর ও সুনামগঞ্জ জেলার ডিসি সাহেবরা স্ব স্ব জেলার সমস্ত জায়গা থেকে ভিনদেশি পতাকা নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপরে সাক্ষাত একজন মন্ত্রীও এমন একটি কথা বলেছেন। প্রিয় পাঠক এবার আপনারাই দেশপ্রেমের পরীক্ষায় ওসব তরুণ আর ডিসি মন্ত্রীকে ভাগ করুন। আমি কোনো মন্তব্য করলাম না।

আমাদের জাতীয় পতাকার নির্দিষ্ট মাপ আছে। পতাকার নির্দিষ্ট রং আছে এবং পতাকা আইনে তার ব্যবহারের নিয়মও উল্লেখ আছে। কিন্তু সারা বছর এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে ডিসি, মন্ত্রী এবং আমাদের সমালোচনাকারীরাতো প্রতিবাদ করেন না। আমাদের জাতীয় দিবসসমূহে এবং সরকারি ভবনে কোথাও তো পতাকা আইন যথাযথভাবে গণ্য করা হয় না। প্রায় সরকারি ভবনে বিবর্ণ ও ছেঁড়া-ফাটা পতাকা এবং কোথাও কোথাও সূর্যাস্তের পরেও পতাকা উড়তে দেখা যায়-সে বিষয়ে কারওতো কোনও মাথা ব্যথা নেই। জাতীয় দিবসে সরু কাঠির আগায় কোনো বোঁচকা পেটি থেকে প্রত্ন সামগ্রীর মতো উদ্ধার করা ‘দলামোচা’ মার্কা জাতীয় পতাকা ওড়ানোর দীনতা দেখেও যাদের মাথা লজ্জায় হেট হয় না তাঁরা কী করে অন্য দেশের পতাকা ওড়ানোর মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব দেখতে পান তা আমার বোধগম্য নয়। অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন সব দেশের পতাকা ওড়াতে বাধা নেই শুধু পাকিস্তানি পতাকা ওড়ালে অনেকের গাত্রদাহ হয়। এটিও একুট মুর্খতা এবং গোঁয়ার্তুমী। যে দেশটি এদেশে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা চালিয়েছে, যে দেশটি আমার প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছে। যে দেশ থেকে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জিত হয়েছে যে দেশের সাথে, সে দেশের পতাকার সাথে অন্য দেশের তুলনা হয় না। ওদেশের পতাকা ওড়ালে যে ত্রিশ লাখ শহীদেরই অবমাননা হয় এ কথা যারা বোঝেন না তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যে ভিন্ন তা আমাদের বুঝতে বেগ পেতে হয় না।

যে রাষ্ট্র লক্ষ কোটি তরুণের জন্য একটু সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে পারে না, একটা খেলার মাঠের জায়গা দিতে পারে না, একটু খোলা আকাশ দিতে পাবে না। একটু নির্মল আনন্দ দিতে পাবে না সে রাষ্ট্র বা সমাজের কী অধিকার আছে তরুণদের সাময়িক আনন্দে বাধাদান করার। ওরা বাড়ির ছাদে বা গাছের ডালে অন্যদেশের পতাকা ওড়ালেও ওদের বুকের মাঝে প্রিয় বাংলাদেশ সতত সমুজ্জ্বল ও বহমান। খেলাকে সমর্থন করা আর দেশকে সমর্থন করা এক করে ফেলা উচিত নয়। ওসব দেশের সাথে তো আমাদের যুদ্ধাবস্থা নেই কাজেই সমর্থন করা না করার প্রশ্নটাও এত জরুরি কেন।

এই লেখাটি লিখতে বসার সময় (মঙ্গলবার মধ্যরাত) আরেকটি সংবাদে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান ও সহযোগিতার জন্যে কিছু বন্ধু প্রতীম রাষ্ট্র ও ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল গত স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে। পরে জানা গেছে যে পদকে যে পরিমাণ স্বর্ণ দেওয়ার কথা তার মধ্যে পঁচিশ ভাগ আনা স্বর্ণও ছিল না। এ খবরটি নতুন নয়। কয়েক মাস ধরে এই কেলেংকারি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। আজ(মঙ্গলবার) রাতে শুনলাম সব ক্রেস্ট নতুন করে বানিয়ে দেওয়া হবে অতিথিদের। হায় লজ্জা! রাষ্ট্রীয় সম্মান যা আগে দেওয়া হয়েছে বিদেশি অতিথিদের তা নিয়েও এমন ন্যক্কারজনক চুরি। এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। এই কেলেংকারির সাথে জড়িত স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ও।

দেশের সবচেয়ে কলংকময় এই জোচ্চুরির যথার্থ বিচার হোক আগে। এই অপকর্মের সাথে যারা জড়িত আমার ধারণা (তাদের পেশা, বয়স, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে) তাদের কেউ তাদের বাড়ির উপরে ভিনদেশি পতাকা লাগান না। কাজেই আমাদের আবেগ ও ভালোবাসায় অবুঝ তরুণদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন না তুলে আগে দেশের সুনাম ও সম্পদ লুক্তনকারীদের বিচার হোক। ওদের মধ্যে সততা ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা হোক আগে-তারপরে নেওয়া যাবে বাড়ির ছাদে অন্যদেশের পতাকা ওড়ানো কিশোর তরুণদের দেশপ্রেমের পরীক্ষা।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৫ জুন, ২০১৪

'কালুরঘাট ব্রিজ; একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার অপেক্ষায় কি?'

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                   কাল আজ কাল
৫ জুন বৃস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ৬ শাবান ১৪৩৫ হিজরি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) ফ্রন্টে সৈন্য সমাবেশ ও তাদের পরিচালনার সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে রেল লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন ব্রিটিস সরকার। তার জন্য কর্ণফুলী নদীতে একটি ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় মটরযানের তেমন চল না থাকায় মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য ব্রিজটির নির্মাণ শুরু হয় গত শতকের ২০ দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৩১ সালে ব্রিজটি ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় অর্থাৎ চালু করা হয়। এরপর আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পুনরায় বার্মা ফ্রন্টে সৈন্য পরিবহনের সুবিধার্থে মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। তবে দেশ বিভাগের পর তা তুলে ফেলা হয়। পরে ১৯৫৮ সালে মোটরযান চলার উপযোগী করা হয় ব্রিজটিকে।

এই ব্রিজটির নাম কালুরঘাট ব্রিজ। এক সময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে রেল ও সড়ক যোগাযোগের একমাত্র সেতুবন্ধন। এর অনেক বছর পরে কর্ণফুলী নদীতে আরও দুটি সেতু নির্মিত হয়েছে শাহ আমানত সেতু ১ ও ২। শাহ আমানত সেতু বিশেষ করে নতুন সেতুটি নির্মিত হওয়ার পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হয়েছে সন্দেহ নেই।

কালুরঘাট ব্রিজটি নির্মিত হয়েছিল আপতকালীন ও জরুরি ভিত্তিতে। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এ অঞ্চলে লোক সংখ্যাইবা কত ছিল আর তার মধ্যে ট্রেনে বা গাড়িতে ভ্রমণের সংখ্যাওবা ছিল। এ সংখ্যা এখন হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লোক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবনযাপন পরিবর্তনের ফলে এই সেতু দিয়ে যাতায়াতকারী লোক ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বিন্দুমাত্র বাড়েনি এই সেতু পারাপারের সুবিধা। ফলে বোয়ালখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্টের নাম হয়ে আছে কালুরঘাট ব্রিজ।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি সেতুটি নির্মিত হয়েছিল মূলত ট্রেন চলাচলের জন্যে, পরে এটিকে যানবাহন বা মটরযান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। ফলে সেতুটি অপ্রশস্ত। দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলতে না পারার কারণে এটি একমুখী সেতু অর্থাৎ একদিক থেকে গাড়ি আসলে অপরদিকে গাড়ি বন্ধ রাখতে হয় আর ট্রেন চলাচলের সময়ে দুদিকেই গাড়ি বন্ধ থাকে। এসব কারণে কালুরঘাট ব্রিজকে কেন্দ্র করে সারা দিনই যানজট লেগে থাকে। নারী-শিশু ও অসুস্থদের জন্য চরম ভোগান্তি ও কষ্টকর হয়ে উঠেছে এই যানজট। এই সেতুটির সক্ষমতার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক আগে। মেয়াদোত্তীর্ণ এই সেতুটি মেরামতের নামে বারবার জোড়াতালি দিয়ে চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। একেকবার মেরামতের সময়ে মাসের পর মাস সেতুর ওপর দিয়ে যানচলাচল বন্ধ থাকে। দূরা বিকল্প হিসেবে ফেরি দিয়ে চলাচল অব্যাহত রাখা হয়। তখন জনগণের বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। এই সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনকহারে। দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুসহ পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিতে হয়েছে অনেককে।

এতসব কারণে বোয়াখালীবাসীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখানে একটি নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘ বছর ধরে। কিন্তু তাদের সে দাবি শোনার বোঝার অনুধাবন করার সময় হয়নি এখনও সংশ্লিষ্ট মহলের। মনে হয় মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কর ঝক্কর এই সেতুর কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার জন্য অপেক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ। কারণ বাংলাদেশে সাধারণত: তাই ঘটে থাকে। বেশি দাম দিয়ে, খুব ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের প্রাপ্তির ডালা ভরে।

২০১০ সালেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম-ঘুমদুম পর্যন্ত সম্প্রসারিত রেল লাইন প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করেন। সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণসহ বেশ কিছু কাজ শুরু করে প্রকল্প কমিটি। মাঝখানে অর্থাভাবে কাজের গতি শ্লথ হয়ে যায়। কয়েকদিন আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে ২০২০ সালের আগে চট্টগ্রাম-ঘুমদুম রেল যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে না। অথচ পূর্বমুখী সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযোগের ক্ষেত্রে এই রেল লাইন বা রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা। ট্রান্স রেলওয়ে ছাড়াও দেশের পর্যটন শিল্প ও পণ্য পরিবহনে এই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

আসলে কার গোয়ালে কে ধোঁয়া দেবে। চট্টগ্রামকে নিয়ে বলার, চট্টগ্রামের অধিকার,বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তির কথা যথাস্থানে তুলে ধরার তেমন যোগ্য নেতাও কোথায় চট্টগ্রামে। এক সময় এম.এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরীরা চট্টগ্রামে অবস্থান করেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এম এ আজিজের একক প্রচেষ্টা, সাহস ও উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য জনসভা করেছিলেন লালদীঘির মাঠে। তখন এত আধুনিক সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। এত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি, আন্তঃনগর টেন, আর আধুনিক প্রযুক্তির টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকলেও চট্টগ্রামে অবস্থান করে তাঁরা তাদের দল পরিচালনা করেছেন। আজ তেমন কোনো প্রভাবশালী নেতা নেই যার কথা বা পরামর্শ ভীষণ গুরুত্ব দেবে কেন্দ্র। শুধু বর্তমান সরকার বলে নয়, বিএনপি সরকারের ৮/৯ জন মন্ত্রী ও সমপর্যায়ের ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের প্রকৃত উন্নয়ন করাতে পারেননি। চট্টগ্রামের বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তির কথা তুলে ধরতে পারেননি।

কালুরঘাট ব্রিজের উন্নয়ন বা নতুন আরেকটি ব্রিজের জন্য ওই এলাকার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করলেও তাতে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। জনগণকে আস্বস্ত করা যায়নি। এমন আচরণ নতুন নয়। এ প্রসঙ্গে আমি পদ্মা সেতু বনাম ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন নিয়ে এই কলামে একটি লেখা লিখেছিলাম। সে লেখাতেই আমি উল্লেখ করেছিলাম পদ্মা সেতু নির্মিত হলে যা ঘটবে অর্থাৎ সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন ছাড়া আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে যে পরিমাণ অবদান রাখবে তারচেয়ে বেশি অবদান রাখবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অন্তত ছয় লেন বিশিষ্ট হলে। আমি চট্টগ্রামের অর্থনীতিবিদদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলাম এ হিসাবটা কাগজে কলমে তুলে ধরার জন্যে। দুঃখিত তেমন কোনো সাড়া বা কারও উদ্যোগ অন্তত আমার চোখে পড়েনি। লেখার অপেক্ষা রাখে না ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের অবস্থা এখনও কী অবস্থায় আছে।

আসলে এটি শুধু এই মহা সড়ক বা কালুরঘাট ব্রিজ নিয়েই নয়। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা লক্ষ্য করছি প্রশাসন বা নীতি নির্ধারকদের মধ্যে যে কোনো কারণে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী একটি শক্তি সদা সক্রিয়। চট্টগ্রাম উন্নয়নের কথা বললেই এদের গা-জ্বালা করে ওঠে। চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করার ভেতরেই যেন এদের সুখ। এমন ঘটনার ফিরিস্তি দিতে গেলে তা একখণ্ড মহাভারতে পরিণত হবে।

এক সময়ে আলাদা করে চট্টগ্রাম উন্নয়নের কথা বলতে আমার বাধতো। ভাবতাম সাারদেশেই সমদ্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু একটি সময়ে অনুধাবন করেছি চট্টগ্রাম তার প্রাপ্য অধিকার পায়নি এবং দুর্ভাগ্য আমাদের খুব কম সংখ্যক রাজনৈতিক নেতা এ ব্যাপারে সোচ্চার। নানাবিধ উন্নয়নের নামে জনগণের টাকার যথেষ্ট শ্রাদ্ধ করা হয় কিন্তু কালুরঘাট সেতুর মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই কাজটি দীর্ঘদিন থেকে হয় না। অথচ আমাদের চোখের সামনে এই নগরে এমন কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে বা সম্পূর্ণ করা হয়েছে তার প্রকৃত প্রয়োজন ছিল কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে শহরে বেশ কয়েকটি ওভারপাশ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বহদ্দারহাট ও দেওয়ানহাট ওভারপাশ যান চলাচলের জন্যে খুলে দেওয়া হয়েছে বেশ আগেই। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী এসব ওভারপাশ দিয়ে সারাদিন ধরে চলাচল করে মাত্র কিছু বেবি ট্রেক্সি ও দুএকটি ট্রাক। তারপরেও আরও ওভারপাশের কাজ চলছে এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত উড়ালপথের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই অপচয় ও পরিকল্পনহীনতা নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে অনেকে এসবকে শুধু শুধু অর্থের অপচয় বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ যেখানে যেভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করার কথা সেখানে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। তার মানে একটি সমন্বয়হীনতা কাজ করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহুবার বলেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি তাঁর কাঁধে নিয়েছেন। একবার চট্টগ্রামে এসে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ও কালুরঘাট ব্রিজ নিয়ে তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে কিছু স্মৃতির কথাও বলেছিলেন। তাই এবার বলতে চাই চট্টগ্রামে এমন কোনো নেতা কি আছেন এই কালুরঘাট ব্রিজের কথা, দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখ লাখ জনগণের দুর্দশার কথা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন?

কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই কাজটিও হবে বলে মনে হয় না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ