পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১২

* নিখোঁজ ইলিয়াস, তিন দিনের হরতাল আর জাতির সাথে বজ্জাতি

দৈনিক আজাদী                             উপসম্পাদকীয়                      কাল, আজ, কাল

২৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৩ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি


কামরুল হাসান বাদল

তিন দিনের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। এর মধ্যে ইলিয়াস আলীকে ছেড়ে না দিলে বৃহস্পতি ও শনিবার জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ সমাবেশ রবিবার পূনরায় ঘোষিত হবে আবার কঠোর কর্মসূচি। বেশ ভাল কথা, ভাল দাবি, যৌক্তিক দাবি এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন কর্মসূচি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু গত তিন দিন কী হলো দেশে, প্রাথমিক কোন আন্দোলন, কর্মসূচি বা নিয়মতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন না করে প্রস্তুতিবিহীন জাতিকে হত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, আতংক আর ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে পর পর তিনদিন হরতালে অবরুদ্ধ করে কী অর্জিত হলো বিএনপির। তারাতো ইলিয়াস মুক্তি আন্দোলন আবার প্রথম থেকে শুরু করতে যাচ্ছে। আসলে ইলিয়াসের মুক্তির (!) বিষয়ে বিএনপির আন্দোলন এভাবেই শুরু হওয়া উচিৎ ছিল। রাত ১২টায় নিখোঁজ সংবাদের পরপর সিলেট-ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিএনপি যেভাবে অতি দ্রুততার সাথে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যেভাবে জ্বালাও পোড়াও ভাংচুরে নেমেছে তা কিছুটা সন্দেহজনক, রহস্যময়। তাদের প্রস্তুতি ও আচরণ দেখে যে কারোর মনে হতে পারে এসব পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া সম্ভব নয়। আর গত তিনদিন ধরে সারাদেশে বিএনপি-ছাত্রদল কর্মী সমর্থকদের তাণ্ডব দেখে মনে হলো ইলিয়াস আলী যে ঘরানার রাজনীতিবিদ তাঁর জন্যে বুঝি এমন মারদাঙ্গা প্রতিবাদ না হলে খেলা জমলো না। খেলার প্রসঙ্গ যখন উঠলো তখন আগেভাগেই বলে দিতে চাই ইলিয়াস আলীকে নিয়ে যে পক্ষই খেলুক, সে খেলা বড় নোংরা খেলা, এ খেলা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্যে কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না, বরং এ ডার্টি গেম এর খেসারত দিতে হবে রাজনীতিবিদদেরই। ইলিয়াস আলী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি, যার রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে অস্ত্র ও মাস্তানীর মাধ্যমে। সিলেটের বিএনপি রাজনীতিতে ইলিয়াস আলী এক অস্বস্তিকর অধ্যায়ের নাম। বিএনপি স্থায়ী পরিষদ সদস্য এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও মরহুম সাইফুর রহমান অসহায়ের মতো খালেদা জিয়ার কাছে অনেকবার নালিশ করেছেন। ইলিয়াসের বিরুদ্ধে। সাইফুর রহমান মারা গেলেও এই বিরোধ প্রশমিত হয়নি, (এখন) সাইফুর রহমানের পুত্র (এই) গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শমসের মবিন চৌধুরীর সাথেও ইলিয়াসের সুসম্পর্ক নেই বলে শোনা যায়। ইলিয়াস আলী নিষ্কলুশ রাজনীতিবিদ নন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সিলেটে তাঁর হাতে এমন গুম, খুন ও সন্ত্রাসের অভিযোগ ছিল বিস্তর এবং তিনি জাতীয় রাজনীতিতে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও নন। তবু তাকে কেন, কারা উঠিয়ে নিয়ে গেল, লুকিয়ে রাখা হলো, এবং সে কারণে তড়ি ঘড়ি করে তিন দিনের হরতাল পালিত হলো তা নিয়ে দেশের জনগণ মস্ত ধাঁধায় পড়েছে আর এই ধাঁধা ও কৌতূহলকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম আর উড়ো গুজব। প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে চলা এ ঘটনা নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। মধ্যরাতে ইলিয়াস শুধু ড্রাইভার নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন। ঘটনার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার মোবাইলে কার কার সাথে কথা হয়েছিল তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পুলিশ দিচ্ছে না কেন? সর্বশেষ কার সাথে কথা হয়েছিল? মধ্যরাতে নিখোঁজ হওয়ার পর সকালেই তাঁর স্ত্রী বলে বসলেন তাঁর স্বামীর লাশ হলেও ফেরত চাই। বিএনপি কীভাবে নিশ্চিত হলো ইলিয়াসকে সরকার বা র‌্যাব উঠিয়ে নিয়ে গেছে, এবং সে সাথে তারা কীভাবে নিশ্চিত হলো ইলিয়াস বেঁচে আছেন আন্দোলন কঠোর হলে কিংবা পর পর হরতাল দিলে সরকার তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। খালেদা জিয়াতো স্পষ্ট করে বলেছেন ইলিয়াসকে নিয়ে গেছে র‌্যাব। তবে তার অর্থ এই যে, বিএনপি জানে ইলিয়াস বেঁচে আছে আর বেঁচে আছে জানলে কোথায় বা কাদের হেফাজতে আছে তা-ও জানার কথা। বারবার ছেড়ে দেয়ার দাবির মধ্য দিয়ে তাই প্রমাণিত হয়। দু’দিন পরে ইলিয়াসের স্ত্রী র‌্যাবকে খবর দিয়ে নিজে সহ পুবাইলে ইলিয়াসের খোঁজে গিয়েছিলেন। রাতে খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করার পর তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলেন এবং শয্যাশায়ী হয়ে থাকলেন। বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক মিডিয়াকে বলেছেন ইলিয়াস বেঁচে আছে, তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, মিডিয়ার কর্ম তৎপরতা কমলে তাকে ছেড়ে দেয়া সহজ হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন খালেদা জিয়াই তাকে লুকিয়ে রেখে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে কিছু শর্ত মানলে ইলিয়াসকে ছেড়ে দেয়া হবে। বিএনপি কিছু মেনেছে কিছু মানতে নারাজ। ইলিয়াস ইস্যু নিয়ে বিএনপিকে অতিমাত্রায় সক্রিয় হতে দেখা গেলো অতীতে যা কখনো হয়নি। বিভিন্ন দূতাবাসে, দেশে নালিশ করা, বিদেশে তাদের দলের তাৎক্ষণিক কড়া প্রতিবাদ ইত্যাদি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের অর্থ কেলেংকারী ঘটনায় গাড়ির ড্রাইভারের সাথে ইলিয়াস বা তার গাড়ির ড্রাইভারের যোগাযোগ সূত্র। ইলিয়াসের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতাকে আটক করে সরকার বিএনপিকে কোন কোন শর্ত মানাতে চায় এবং কী সেই শর্ত? গায়ে পরে কেন সরকার দেশকে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের দিকে ঠেলে দেবে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর কি জানা যাবে? জানা যাবে যদি ইলিয়াস কখনো ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইলিয়াস কি আদৌ ফিরে আসবে? বর্ষিয়ান সাংবাদিক এ বি এম মুসা একটি টক শো’তে বলেছেন, তা সম্ভব নয়। কারণ ইলিয়াস ফিরে এলে বাংলাদেশের দু’শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার যে কোন একজন মিথ্যা বলেছেন বলে প্রমানিত হবেন। এ বাস্তবতা কি বাংলাদেশে সম্ভব? গুম, গুপ্তহত্যা কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশের সংস্কৃতি হতে পারে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে এই মানবতাবিরোধী কাজ ভবিষ্যতের জন্যে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা জানি আওয়ামী লীগের অধিকাংশ মন্ত্রী, এমপি ও নেতৃবৃন্দ বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একথা উল্লেখও করেছেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ কেন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যে গণতন্ত্রের জন্যে এ ঘটনা যে ভীষণ উদ্বেগজনক তা যে কোন রাজনীতিবিদ হতে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষও মনে করে। ব্যক্তিগতভাবে ইলিয়াসকে পছন্দ করার আমার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তাই বলে তাঁর এমন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারি না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে জনগণকে দেয়া অনেক প্রতিশ্রুতি এখনও পূর্ণ করতে পারেনি। দূর হয়নি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা। কমেনি দ্রব্যমূল্য দমন করা যায়নি দুর্নীতি। যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচারের বিষয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সংশয় এমন অবস্থায় এবং নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর খানেক আগে এসব ঘটনা চরম অদূরদর্শীতা ও বোকামীর পরিচায়ক। সম্ভবত আওয়ামী লীগ বাস্তবতা বুঝতে ক্রমশ অক্ষম হয়ে উঠছে, নতুবা সরকারের ভিতর দ্বিতীয় আরেকটি সরকার সক্রিয় হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি সম্পন্ন করার জন্যে। বলা হয়ে থাকে যে কোন সরকারের শেষের বছরে পুলিশ ও জন প্রশাসন মূলত বিরোধী দলের জন্যেই কাজ করে থাকে, এ সরকারের আমলে বুঝি এ তৎপরতা অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। যদি ইলিয়াসের এই ঘটনা সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোন ধরনের দরকষাকষির বিষয় হয়ে থাকে এবং গত তিন দিনের হরতাল, হত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর আর রাষ্ট্রের ও জাতির অর্থনীতির বিপুল ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে তবে তা কারুর জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে না। এ নোংরা খেলার জন্যে জাতির সাথে বজ্জাতির জন্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জনতার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। একদিন অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শ্রীজাতের একটি কবিতা দিয়ে শেষ করবো লেখাটি, 

লেখক: কবি, সাংবাদিক,কলামলেখক।
Email:qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১২

* তবে কে যাবে লংকায়?

দৈনিক আজাদী                                  উপসম্পাদকীয়                                 কাল, আজ, কাল

১৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.৬ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ২৬ জমাদিউল আওয়াল ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

গত বছরের ১ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদীর এই পাতায় একটি কলাম লিখেছিলাম। তার ক’দিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করে দু’জন রাজনীতিককে মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন সে সাথে ড. হাছান মাহমুদকে প্রতিমন্ত্রী হতে পূর্ণ মন্ত্রীর পদোন্নতি দিয়েছিলেন। আমি সে লেখায় বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভায় আরো অভিজ্ঞ, পুরোনো, ত্যাগী নেতার স্থান পাওয়া উচিত ছিল, বাংলার মানুষ যারা দেশ ও আওয়ামী লীগের শুভার্থী তাদের প্রত্যাশাও তাই। লেখার শিরোনাম ছিল “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানুষ হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল”। মানুষকে বিভিন্ন কারণে যেমন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় অধিকতর দক্ষতার পরিচয় দিতে মন্ত্রীসভার রদবদল ও বর্ষীয়ান ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্তি চায় আমি সে কথাটিই তুলে ধরবার চেষ্টা করেছিলাম। যদিও জানি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় আমার মত এক নগণ্য ব্যক্তির কোনরূপ আবেদন নিবেদনই কোনদিন প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবে না। এক সময়ের বামপন্থী রাজনীতিক, সাতবারের নির্বাচিত সাংসদ, (৭০ ও ৭৩ এর আওয়ামী লীগের প্রবল গণজোয়ারের সময়েও) অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান গত শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করায় আমি প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম, বলেছিলাম আরও যে ক’জন অভিজ্ঞ নেতা আছেন তাদের মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে জাতির সেবায় কাজে লাগানোর। মন্ত্রী হওয়ার আগে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বিভিন্ন মঞ্চে বা ফোরামে যুদ্ধাপরাধ, বিরোধীদল ও খোদ নিজ দলের মন্ত্রীসভা নিয়ে জোরালো ও তীর্যক বক্তব্য রেখে প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়ে থাকতেন। গত ২৮ নভেম্বর মন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, তিনি সততার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর সততা নিয়ে গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত কারো কোন প্রশ্ন ছিল না। তিনি রেলে দুর্নীতির ‘কালো বিড়াল’ এর কথা বলেছিলেন মানুষ তা বিশ্বাস করেছিল, রেলের দুর্নীতি কমবে বলে আশা করেছিল এবং কিছু কিছু ইতিবাচক ধারা লক্ষ্যও করা যাচ্ছিল। কিন্তু গত ৯ এপ্রিল মধ্যরাতের কাছাকাছি সময় তাঁর গাড়িতে বস্তাবন্দি ৭০ লক্ষ টাকাসহ তাঁর এপিএস আটক হওয়ার পর থেকে দ্রুত সবকিছু পাল্টাতে থাকে। এ ঘটনার পরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যতবারই সাংবাদিক বা মিডিয়ার সামনে এসেছেন ততবারই তাঁকে বিব্রত, পর্যুদস্ত ও ভেঙে পড়া মানুষ বলে মনে হয়েছে। তাঁর সাহসদীপ্ত দৃঢ়তা আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মত মোক্ষম শব্দের বাক্যবান আর তাঁর কাছ থেকে শোনা যায়নি। এক সময় তিনি নিজেই বলে ফেলেছিলেন, ‘আমি অন্যরে তীর ছুড়তাম আর অহন আমারে ছোড়ে।’ সততার সাহস নিয়ে এতদিন যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কথা বলতেন এ ক’দিন তাঁর মধ্যি তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। যাক গত সোমবার তিনি পদত্যাগ করেছেন, তবে তার আগের রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়ে তাদের মধ্যে কী ধরনের আলাপ হয়েছে তা আমরা কেউই জানি না। তাঁর পদত্যাগ একটি ভালো সিদ্ধান্ত ও দৃষ্টান্ত। এখন অন্তত তদন্তকে প্রভাবিত করার মত অভিযোগ সহজে কেউ করতে পারবেন না। বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রায় অর্ধ শতকাল তিল তিল করে যে ব্যক্তিটি তাঁর একটি রাজনৈতিক ইমেজ তৈরি করেছিলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ও তাদের অনুসারী লেখক বুদ্ধিজীবীরাও যাঁর সম্পর্কে বলার আগে দু’দণ্ড ভেবে নিতেন, এমন এক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক মৃত্যু আমরা চাই না। আমরা চাই না রাজনীতির এই দুঃসময়ে প্রকৃত রাজনীতিকরা যখন ক্রমশ কোণঠাসা, অবহেলিত, নিগৃহিত ও অপমানিত হচ্ছেন এখন তাঁর মত এক বর্ণাঢ্য রাজনীতিকের বিদায়। এই ঘটনা কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করছে, তা দূর করা প্রয়োজন। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? এতদিনের বিশ্বস্ত গাড়ি চালক কেন এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? এতরাতে বিজিবি হেড কোয়ার্টারে আগে থেকে অবহিত না করে একটি পাবলিক মাইক্রোবাস ঢুকে গেল কীভাবে? মন্ত্রীর এপিএস ফারুক তালুকদারের নিয়োগ হয়েছিল কীভাবে? দুর্নীতির মাধ্যমে বা আয় বহির্ভূত এত সম্পদের মালিক তো সে মাত্র গত সাড়ে চার মাসে হয়নি? রেলের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক একজন দুর্নীতিবাজ ও কট্টর বিএনপি সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এত দাপট ও মন্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্ক গভীর হলো কীভাবে? কার বা কাদের স্বার্থে ও প্ররোচনায় বর্তমান ডিজি আবু তাহেরকে সরিয়ে তাঁকে ডিজি পদে পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়া চলছিল? তবে কি কালো বিড়াল তাড়াতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়ে সুরঞ্জিত বাবু নিজেই কালো বিড়ালে পরিণত হলেন? তবে কি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এতদিনের চলে আসা দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন আর লুটপাটের হোতাদের ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন? পূর্বাঞ্চলীয় রেলের মহাব্যবস্থাপকরা চট্টগ্রামের সিআরবিতেই অফিস করেন তবে তাঁদের পরিবার ঢাকায় থেকে বিলাসী জীবন যাপন করেন যা রেলের সবাই ছাড়াও রেলের সাথে সংশ্লিষ্টরা ভালই জানেন। মাঝে মধ্যে রেলের জি.এমের বাংলোয় ডাকাতির ঘটনা স্থানীয় পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয়ে থাকে। বছর দুয়েক আগে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ডাকাতি হওয়ার সংবাদ প্রকাশ হয়ে পড়লে জি.এমের পক্ষ থেকে পুলিশকে ডাকাতি হওয়া অর্থের পরিমাণ বলা হয়েছিল তিন লাখ, আর পুলিশের কাছে ধরা পড়া ডাকাতরা স্বীকারোক্তি দিয়েছিল ১২ লাখ টাকা ডাকাতি করেছিল বলে। প্রচলিত আছে কোন্‌দিন রেলভবনে টাকা জমা হয় তার সংবাদ প্রায়ই ডাকতরা পেয়ে থাকে আর অনেক সময় এসব ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয় অর্থের উৎস গোপন করার স্বার্থে। রেলে কী পরিমাণ দুর্নীতি হয় তা লিখতে গেলে কয়েক খণ্ড মহাভারত হয়ে যাবে। যুগ যুগ ধরে গেড়ে বসা দুর্নীতিবাজ এ চক্রকে সুরঞ্জিত বাবু কি একটু নাড়া দিতে পেরেছিলেন? ফলে এই দুষ্টু চক্রের প্রলোভনে পড়ে এ ধরনের দুর্নীতিতে অনভ্যস্ত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পুরো ব্যাপারটিকে ঠিকমতো ‘হ্যান্ডল’ করতে না পেরে গুবলেট করে ফেলেছেন? যাক সত্য একদিন বেরিয়ে আসবে এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হবে বলে বিশ্বাস করি। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দুর্নামের দায় কেন হাজার হাজার নিরাপরাধ কর্মকর্তা কর্মচারীরা বহন করবে? এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভূমিকাটি একটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ঘটনার পরদিন থেকে বিএনপির নেতানেত্রীগণ মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন, বিশেষ করে ব্যারিস্টার মওদুদ ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নিয়ে মওদুদ সাহেব যখন ব্যঙ্গ করছিলেন তখন হয়ত তিনি ও তাঁর দলের অনুসারীরা ভুলে গিয়েছিলেন মওদুদ সাহেবের নামে কয়টি দুর্নীতির মামলা হয়েছিল আর মামলাগুলো কীভাবে প্রত্যাহার হয়েছিল। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তাঁর বক্তব্যে একবার বলেছেন মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিৎ, আবার পদত্যাগ করার পরে বলেছেন তিনি (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) ভেবেছিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তা হয়নি। মির্জার আরেকটি বক্তব্য ‘‘এই মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো এই মন্ত্রিসভা ও বর্তমান সরকার দুর্নীতিবাজ অতএব এই সরকারের পদত্যাগ করা উচিত।’’ মন্ত্রীর পদত্যাগের পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশিষ্ট জনেরা যখন মন্তব্য করলেন এই পদত্যাগ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত, কেউ কেউ লিখলেন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এই-ই প্রথম এখন তার প্রতিক্রিয়ায় মির্জা সাহেব বললেন, তাঁদের দলের শামসুল ইসলাম, এরশাদের বান্ধবী জিনাত মোশাররফের স্বামী তৎকালীন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন (যিনি নাইকো থেকে কোটি টাকা দামের গাড়ি নিয়েছিলেন ঘুষ হিসেবে) এরাও পদত্যাগ করেছিলেন। এখন এই বক্তব্যগুলো খণ্ডনের জন্যে’ বলতে হয়, প্রধানমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে রক্ষা করার চেষ্টা না করে যদি পদত্যাগ করতে বলে থাকেন তাতে শেখ হাসিনার দৃঢ়তা বাড়লো না কমলো? দুর্নীতিকে কি তিনি প্রশ্রয় দিলেন? যদিও বিষয়টি তদন্তাধীন। আর দুর্নীতির অভিযোগে কোন মন্ত্রী পদত্যাগ করলে যদি পুরো সরকারকেই পদত্যাগ করতে হয় তবেতো যুক্তরাজ্য সরকারকে অনেক আগে পদত্যাগ করে বাড়ি ফিরতে হতো, সেভাবে জাপান ও পার্শ্ববর্তী ভারতের মনমোহন সরকারকে বর্তমানে রাজপথে থাকতে হতো। মির্জা সাহেবদের মন্ত্রিসভা থেকে যখন শামসুল ইসলাম বা মোশাররফ হোসেন পদত্যাগ করেছিলেন তখন কি খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগ করেছিল? এককালের সমাজতন্ত্রী, গণমানুষের রাজনীতি করা মির্জা ফখরুলদের মুখে এমন বালখিল্য বক্তব্য শুনে তাদের এই পতন ও পচনের জন্যে শুধু করুণা করতে ইচ্ছে করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক হাওয়া ভবনের দুর্নীতির পরিমাণ ও ব্যাপকতা দীর্ঘকাল লজ্জার অধ্যায় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের রাজনীতি, ক্ষমতা আর প্রশাসনে এমন কি ‘সিস্টেম’ প্রচলিত আছে যার সংস্পর্শে এলে যে কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন? এমনকি অর্ধশতকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন যার, এটি কি এমন একটি বৃত্ত যা ভাঙা যায় না বরং জড়িয়ে যেতে হয়। ওখানে গেলেই যদি রাবণ হতে হয় তবে ভবিষ্যতে ভালো মানুষদের সৎ মানুষদের মধ্যে কে যাবে লংকায় ? 

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক 
Email-qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১২

* মিনার মাহমুদ, আত্মহত্যা কিংবা একটি হত্যাকাণ্ড

দৈনিক আজাদী                           উপসম্পাদকীয়                       কাল, আজ, কাল

৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২২ চৈত্র ১৪১৮ সাল ১২ জাদিউল আওয়াল ১৪৩৩ হিজরি



১। প্রাকলিখন -  দেশের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে খুলনা-মংলা তখন চোরাচালানিদের স্বর্গরাজ্য। দেশের বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিকের কনিষ্ঠতম রিপোর্টারের ওপর এর এসাইনমেন্ট। বন্ধু এবং পরিচিত জনদের সহযোগিতায় মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি এখন শুধু একটি ছবি, চোরাচালান পণ্যের অবাধ বিপণনের। কিন্তু মুশকিল হলো ক্যামেরা কাঁধে ওসব এলাকায় প্রবেশ তো দূরের কথা সাংবাদিক পরিচয় ফাঁস হলেই অক্ষত ফিরে আসা দুষ্কর। পকেটে ক্যামেরা নিয়ে প্রতিবেদক ঢুকে গেলেন সবচেয়ে সুসজ্জ্বিত একটি দোকানে। হাবাগোবা তরুণের মত দোকানির কাছে ক্যামেরা চালানোর ব্যাটারি কিনতে চাইলে বিক্রেতার সম্মতি, আর বোকাসোকা ক্রেতা ক্যামেরায় ব্যাটারি লাগিয়ে নিষ্পাপ প্রশ্ন করে “দেখতো ফ্লাশ জ্বলে কি না? দোকানির সম্মতিতে দুতিনবার ফ্লাশ জ্বলার সাথে সাথে মূল্য পরিশোধের পরে বোকা ক্রেতার ঝটিকা স্থান ত্যাগ। এরপরে সোজা ঢাকার বাস, দুদিন পরে বিচিত্রায় সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হলে প্রেসিডেন্ট এরশাদের সে এলাকা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত। প্রতিবেদক তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ণ্ডয়া সাপ্তাহিক বিচিত্রার তরুণ তুর্কী, দুর্বিনীত প্রতিবেদক মিনার মাহমুদ। ২। ১৯৮৭ সাল, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ক্রমেই পরিণতির দিকে এগুচ্ছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে যায় যায় দিন। সে বছরে ১০ জুন মিনার মাহমুদের সম্পাদনায় বেরুলো সাপ্তাহিক বিচিন্তা। যায় যায় দিনের মত নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপানো ছাড়া এ যাবৎ কালের আর কোন পত্রিকার চরিত্রের সাথে মিল থাকলো না এই পত্রিকার। প্রতিবেদনের বিষয়, ভাষা, শব্দচয়ন, সম্পাদকীয় আর তারুণ্যের অপার সাহস আর সততা দিয়ে প্রতি সপ্তাহে এই পত্রিকা ভাঙ্গতে থাকলো তার নিজের সার্কুলেশনের রেকর্ড। বিচিন্তা, তার সম্পাদক আর প্রতিবেদনগুলো হয়ে উঠলো সামাজিক ঘটনা, তরুণদের আড্ডার প্রধান আলোচ্য বিষয়। ১৯৮৮ সাল, চট্টগ্রাম লালদীঘির মাঠে শেখ হাসিনার সমাবেশ। এরশাদের নির্দেশে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদার লেলিয়ে দেয়া বর্বর পুলিশ বাহিনী গণহত্যা চালায়। বিচিন্তার পরবর্তী সংখ্যায় প্রধান কভার স্টোরি, ‘নিরোর বাঁশি’ প্রতিবেদক শহীদুল ইসলাম বাচ্চু, তৎকালীন পূর্বকোণের সাংবাদিক, বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী। নিষিদ্ধ হলো বিচিন্তা, গ্রেফতার হলেন এর সম্পাদক মিনার মাহমুদ। ৩। নব্বই সালে এরশাদের পতন। বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদের অন্তর্বর্তী সরকার। দ্বিতীয়বার বের হলো বিচিন্তা, ১৯৯১ এর ১০ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ বছর স্বৈর শাসনের পর একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্বপ্নবান তারুণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠলো বিচিন্তা। স্ট্যাচু অব লিবার্টির চোখে কাপড় বাধা, তার নিচে লেখা ‘আমাকে দেখতে দাও, আমাকে বলতে দাও’, কিংবা ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ তার সাথে প্রতি সপ্তাহে উদ্বেলিত করা, উদ্দীপ্ত আর উজ্জ্বীবিত করা মোহময় সম্পাদকীয়। মিনার মাহমুদের সম্পাদকীয় অভিধানে লেখা যাবে না, বলা যাবে না-ধরনের কোন বাক্য বা শব্দবন্ধ ছিল না। প্রতিবেদকরা ছিলেন স্বাধীন। এ সময় প্রতিবেদক অম্লান দেওয়ান লিখলেন, শ্রীকৃষ্ণ এক লম্পট অবতারের প্রতিকৃতি’ বলা বাহুল্য অম্লানের বাড়িও চট্টগ্রামে। এ প্রতিবেদন প্রকাশের সাথে সাথে সারাদেশে একশ্রেণীর মানুষের প্রতিবাদ। ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর চট্টগ্রামে শ্রীকৃষ্ণ সেবক সংঘের একব্যক্তির দায়ের করা মামলা। ব্যাস, এক সপ্তাহে ঢাকায় হাজিরা পরের সপ্তাহে চট্টগ্রাম। আমি তখন জড়িয়ে আছি বিচিন্তায় সে সাথে বিচিন্তা পাঠক ফোরামের চট্টগ্রাম বিভাগীয় আহ্বায়ক। আমাদের পাঠক ফোরামের এক সদস্য ছিলেন আইনজীবী। এম আর হাসান। তাঁর সহযোগিতায় চট্টগ্রামে মামলা চালাই। আর ঘন ঘন মিনার মাহমুদের সান্নিধ্যে সময় কাটাই। ওনি তসলিমার সাথে তাঁর ভেঙ্গে যেতে বসা সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টাও চলতে থাকে। সে কারণে তসলিমা নাসরিনও দুদিন থাকলেন চট্টগ্রামে। মামলা নিয়ে ঝামেলা চালালেও হাসান ভাই শহীদুল ইসলাম বাচ্চু, এজাজ মাহমুদ, শোয়েব ফারুকীসহ অন্য বেশ কজন মানুষের উপস্থিতি, আড্ডা আর আলোচনায় সময়গুলো ভালই কাটছিল। এক সময় আপস মিমাংসায় চট্টগ্রামের মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়, কিন্তু বিএনপি সরকার মিনারকে এত সহজে ছেড়ে দেয়ার মত বোকা নয় বলে মিনারের নিয়মিত হাজিরা চলতে থাকলো আদালত পাড়ায়। তসলিমা নাসরিন বিষয়ক জটিলতা, মামলা আর পত্রিকা চালিয়ে নেয়ার মত আর্থিক সচ্ছলতার অভাব ক্লান্ত করে পর্যটক ডানা। হাফিয়ে ওঠেন হয়ত এক সময়, ফলে স্বদেশ ত্যাগ-আমেরিকার প্রবাস জীবন। একটি ভিসা ম্যানেজ করার বিনিময়ে বিচিন্তা নিয়ে নিলেন কসমস এর এনায়েতুল্লাহ খান। এবং একটি সময় আপনা হতে বন্ধ হলো বিচিন্তা। ৪। ২০০৯, একটি রোদ ঝলমল সকালে মোবাইলের স্ক্রিনে একটি অপরিচিত নম্বর, হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, বাদল ক্যামন আছেন, আমি মিনার, এখন টেকনাফে আছি। সন্ধ্যায় মেরিডিয়ানে থাকবেন বাচ্চুকে নিয়ে। দীর্ঘ আঠার বছর পর দেখা, সঙ্গে এক নতুন মুখ। পরিচিত হতে গিয়ে জানলাম ডা. লুবনা, লাজুক। বর্তমানে মিসেস মিনার মাহমুদ। আমি ও বাচ্চু কিঞ্চিৎ বিস্মিত। পরের দিন আমার বাসায়, দীর্ঘদিন পর আড্ডা, আগের সেই স্বপ্নদীপ্ত, আশাবাদী আর উদ্যমী মিনার মাহমুদ। ২০১০ সালের প্রথম দিকে জানালেন আবার বের হবে বিচিন্তা, বললেন এনায়েত সাহেব আমাকে বিচিন্তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ১৮ বছরে অনেক বদলে যাওয়া বাংলাদেশে তৃতীয় বারের মত প্রকাশিত হলো সাপ্তাহিক বিচিন্তা। প্রকাশের প্রস্তুতিকালে হোটেলের রুমে বসে অনেক কথা বলেছিলেন একদিন, বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল, দীর্ঘ চার দশক পরে দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ, দিন বদলের োগান আর প্রযুক্তি সচেতন তরুণদের নিয়ে ভীষণ আশাবাদী হয়ে আমেরিকার গ্রীনকার্ড উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রকাশের সময় পুরোনো তেমন ও যোগ্য কাওকে না পাওয়া, পত্রিকার কাটতি না হওয়ায় দিন দিন হতাশ হচ্ছিলেন তিনি। বিশেষ করে তাঁর হাতে গড়া সাংবাদিক আজ যারা বিভিন্ন মিডিয়ায় খুব ভালো অবস্থানে আছেন তাদের আচরণেও দারুণ ব্যথিত হয়েছিলেন তিনি। গত বছর মার্চের দিকে অফিসে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন গুরুতর, সে চিকিৎসা ব্যয় ও ছিল প্রচুর। শারীরিক ও আর্থিক কারণে আবার বন্ধ হয় বিচিন্তা। যদিও বলেছিলেন তিনি এটিকে অনলাইন করার কথা। শেষ পর্যন্ত হয়নি। কতেক মাস আগে ফোনে বলেছিলেন, কেউ আমাকে চাকরি দিতে রাজি নয়, ঢাকার সাংবাদিকরা বোধহয় আমাকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাসখানেক আগে জানালেন আজকের প্রত্যাশায় অফার পেয়েছি, আপনি নিয়মিত লিখবেন, বললাম লিখবো, তবে আপনি দু এক মাস দেখুন কাজ করতে পারেন কিনা। দুর্ভাগ্য এক মাসের মধ্যে সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তারপর গত বৃহস্পতিবার, মিনারের ক্লান্ত ডানা ভেঙ্গে পড়েছে, শুক্রবার থেকে মিনার মাহমুদ দেশের সবকটি সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন, যার যে কোন একটিতেও তাঁর যোগ্য পদটি তিনি পাননি। সংবাদপত্রের এই তুর্কী তরুণ দেশকে পরিবর্তন করার আশায় স্বদেশে ফিরে মাত্র তিন বছরের মধ্যে মানুষ থেকে নামে পরিবর্তিত হয়ে গেলেন। সমাপ্তির পূর্বে: মিনার মাহমুদের আত্মহত্যায় আমি দু:খিত নই। নষ্ট রাষ্ট্রে, নষ্ট সমাজে, সংবাদ মাধ্যমের নষ্ট মানুষদের ক্রীতদাশ হয়ে প্রতিদিন বিবেকের সাথে আপস করে, মেনে নিতে নিতে একটু একটু মৃত্যুবরণ করার চেয়ে এ মৃত্যুও কম গৌরবের নয়। একজন সামান্য তিব্বতী তার শরীরে আগুন লাগিয়ে তার স্বাধীনতার কথা বলে যায়। একদিন তিব্বত যখন স্বাধীন হবে এই সামান্য আত্মাহুতিটাও বড় উজ্জ্বল ও প্রেরণা হয়ে উঠবে প্রতিটি তিব্বতবাসীর জন্যে। রাষ্ট্র সমাজ আর সংবাদপত্রের সুস্থ দিন যেদিন ফিরে আসবে। সংবাদ মাধ্যমগুলো যেদিন প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকদের হয়ে উঠবে সেদিন এই আত্মহত্যা আত্মত্যাগ হিসেবে লিখিত হবে বাংলাদেশের সুস্থ সংবাদ মাধ্যমের ইতিহাসে। সক্রেটিসদের আগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো, তাকে বাধ্য করা হতো হেমলকের বিষপাত্র মুখে তুলে নিতে। আজকাল সক্রেটিসদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না কিংবা বিষপাত্র মুখে নিতে বাধ্য করতে হয়না। রাষ্ট্র এবং সমাজ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যাতে সক্রেটিসরা নিজেরাই নিজেদের বিষ খুঁজে নিয়ে মরবে। যুগের সাথে, পরিস্থিতির সাথে, ভণ্ডামী আর হিপোক্রেসির সাথে মানিয়ে না নেয়া দৃঢ়, ঋজু মিনার মাহমুদ আপনাকে আমার লাল সালাম। 

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক 
Email : qbadal@yahoo.com


পোস্টসমূহ