পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৪

'ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি'


৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৬ পৌষ ১৪২০ সাল ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
একাত্তরের এপ্রিলের মাঝামাঝি, তারিখটা মনে নেই। আমাদের গ্রামে (রাউজান উপজেলার গহিরা)প্রথম যেদিন পাকিস্তানি সেনা আসলো সেদিন তা দেখে এক কিশোর গহিরা চৌমুহনী থেকে বাড়িতে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে চিৎকার করে বলছিল, ‘ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি’। (ভোট কেন দিলি, এখন কোথায় যাবি)। কিশোরটি সত্তরের নির্বাচন নিয়ে বলছিল। তার ধারণা হয়েছিল ভোট দেওয়াতেই গ্রামে মিলিটারি এসেছে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকেই যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে সে কিশোর তা জানতো না।

আসলে ৭০ এর ভোটের কারণেই দেশে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কার্যত সে ভোট বা নির্বাচন ছিল বাঙালির দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের চরমতম ধাপ। তারপরেই শেষ ধাপ ছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরে জাতি বিজয় অর্জন করে। সে সব ইতিহাস নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। পাঠক মাত্রেই কম-বেশি জানেন।

’৭০ এর একটি নির্বাচন বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করে। বাঙালির প্রথমবারের মতো নিজের স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বমাঝে স্বীকৃত হয়। এই পরিচয় ৪৩ বছরে পদার্পণ করেছে। কিন্তু জাতির একটি অংশের কাছে,’ ‘ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি’ বিভীষিকা এখনো বিদ্যমান। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি নির্বাচনই এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুর কাছে দিনদিন বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে।

পাকিস্তান ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র ভেঙে জন্ম নিল বাংলাদেশ নামক একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এদেশ মুক্ত ও স্বাধীন করতে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানসহ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকও যুদ্ধ করেছে রক্ত দিয়েছে শহীদ হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রেও এদেশ সকল ধর্মের মানুষের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রের মূলস্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরে দেশের ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যা করার আগে পর্যন্ত রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট ও সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু এর পরে দুঃখজনক ভাবে ধর্মীয় রাজনীতি অবারিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একই সাথে একাত্তরের কলেবটেরদেরও রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। এমনকি শাহ আজিজের মতো একজন কুখ্যাত রাজাকারকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদলে ফেলেন। তিনি সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দেন। বাদ দেন সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকেও। এরপর থেকে সমাজে ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটে। এই সাম্প্রদায়িকতা সশস্ত্র জঙ্গিবাদে রূপ লাভ করে তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে (২০০১-২০০৬)।

মাঝখানে ’৮২ থেকে নব্বই দেশ শাসন করেন আরেক জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। তাঁর আমলে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে ঘোষণা ও সাপ্তাহিক ছুটি রোববারের বদলে শুক্রবার করা হয়। তাঁর শাসনকালেও দেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটেছে। তাঁর শাসনকালেই এদেশে হিন্দুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এই ভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িকতাকে লালন ও প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরে এর বিস্তার ঘটেছে ভীষণ বিপজ্জনকভাবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে দেশে যে কোনো নির্বাচনে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে। সে নির্বাচন ইউনিয়ন পরিষদ হোক আর জাতীয় নির্বাচনই হোক। নির্বাচনের পরপরই আক্রান্ত হয় হিন্দুরা। এখন হিন্দুদের কাছে মহা আতংক হয়ে উঠেছে নির্বাচন। সেই কিশোরের মত ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি’ বিভীষিকা দূর হচ্ছে না কোনো ভাবে।

পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক আচরণের প্রতিবাদে ৫৪ সালে এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে সাধারণভাবে সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। একই কারণে ভারতে অর্থাৎ কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে সেখানকার মুসলিমরা কংগ্রেসকে ও পশ্চিম বঙ্গে বামফ্রন্টকে ভোট দেয়। কাজেই আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া হিন্দুদের কোনো অপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে বিগত কয়েক দশক বিশেষ করে ’৭৫ এর পরে তাই ঘটছে। আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিনির্বাচনের পরে হিন্দুদের ওপর হামলা-নির্যাতন চালানো হচ্ছে নৃশংসভাবে। আর প্রতিবার এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ভয়ংকরভাবে।

এমনকি গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, যাকে ভোটার বিহীন নির্বাচন বলে প্রচার করা হচ্ছে, সে নির্বাচনের পরেও আক্রান্ত হতে হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। ঘরছাড়া করা হলো শত শত পরিবারকে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে তাদের বসতবাড়ি,দোকানপাট, উপাসনালয়। প্রচণ্ড শৈত্য প্রবাহে শত শত নারী-শিশু-বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে খোলা আকাশের নিচে রাত্রি যাপন করতে হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে প্রচণ্ড শীতের মধ্য রাতে নদীতে ঝাঁপ দিতে হয়েছে শত শত নর-নারী, শিশু-বৃদ্ধকে। যশোর, দিনাজপুর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বহুস্থানে হামলার শিকার হয়েছে সংখ্যালঘুরা। তাদের চোখের সামনেই ধ্বংস করা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে শত বছরের বাপ-দাদার ভিটায় গড়ে তোলা বসতঘর। এখন শরণার্থী বা উদ্বাস্তুর মতো লাইন ধরে কলাপাতায় তাদের খিচুড়ি খেয়ে দিনযাপন করতে হচ্ছে।

মূল কথা দেশের একটি রাজনৈতিক শক্তি দেশকে সংখ্যালঘু শূন্য করতে চায়। তাতে তাদের দুটো লাভ। দেশের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দুর্বল হবে, অন্যদিকে তাদের বাড়িঘর দখল করা যাবে। তাই দীর্ঘদিন থেকে এ ধরনের হামলা-নির্যাতন চললেও দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখী করা হয়নি কখনো। এমনকি এই ধরনের ঘটনা তদন্তে যে কমিটি গঠন করা হয় তাদের প্রতিবেদনে কি লেখা হয়েছিল তাও জানার সুযোগ হয়নি কখনো।

আমি ভাবছি এ বিষয়ে আমরা কি দায়িত্ব পালন করি। ভাবছি দিনাজপুর-যশোর-সাতক্ষীরা-সাতকানিয়া-বাঁশখালী ইত্যাদি স্থানে যখন এমন আক্রমণ পীড়নের ঘটনা ঘটে তখন সেখানে অন্যরা কি করেন? অন্যদল বিশেষ করে যে দলটিকে ভোট দেওয়ার অপরাধে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে হিন্দুদের সে দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের ভূমিকা কি থাকে তখন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কি দায়িত্ব পালন করেন তখন। ভাবছি সমস্ত এলাকায় কি একজন ঈমানদার ও পরহেজগার মুসলিম মৌলানাও কি নেই যিনি তাঁর ঈমানি দায়িত্ব নিয়ে বাধা দেবেন দুর্বৃত্তদের। অমুসলিমদের ওপর এমন নির্যাতন ইসলাম ধর্ম কি সমর্থন করে? করে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম নিয়ে যারা প্রায়ই বলে থাকেন, ইসলামের রক্ষাকারী বলে দাবি করেন তারা কি দায়িত্ব পালন করেন। একটি হাদিসে রাসূল (সা:) উল্লেখ করেছেন, ‘যে তার প্রতিবেশিকে অভুক্ত রেখে খায় সে আমার উম্মত নহে।’ এই হাদিসে প্রতিবেশি বলতে নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। কাজেই এ ধরনের কাজ যারা করে থাকেন তারাতো রাসূল (সা:) এর উম্মতই হতে পারলো না- মুসলমান হবে কি।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে যদি আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অপরাধে বা শুধু মুসলমান (আসল কারণতো তাই) না হওয়ার কারণে যদি হিন্দুদের মারি, ভারতে যদি কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার জন্য বিজেপি মুসলমানদেরকে মারে বা বিশ্বের দেশে দেশে শুধু ধর্মীয়, ভাষা বা জাতিগত সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে এ ধরনের মারপিট অত্যাচার, নির্যাতন হতেই থাকে তাহলে বিশ্ব তো নরকে পরিণত হবে। এই নরকময় বিশ্বতো আমরা চাই না। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত উৎকর্ষের যুগে আমরা যদি শুধু ধর্ম নিয়েই মানুষকে বিচার করি তবে এর চেয়ে বড় মূর্খতা, গোঁড়ামী ও দীনতা আর কিছু হতে পারে না।

ধর্ম-ভাষা বা জাতিগত কারণে মানুষকে গৌণ করে তোলা। তাদের সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলা এক প্রকার অসভ্যতাই বটে। সভ্যতা ও আধুনিকতা হচ্ছে মানুষ পরিচিত ও বিচার্য করে তার সততা,সৎগুণ ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে। ধর্ম দিয়ে কখনো নয়। ধর্ম তার একান্ত নিজস্ব বিশ্বাসের ব্যাপার। এ নিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা জরুরি নয়। রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের জন্য সমান আচরণ করবে। বাংলাদেশের মহান সংবিধানেও তাই উল্লেখ আছে। এক সময় প্রায় কাছাকাছি সংখ্যানুপাতে থাকা সংখ্যালঘুর সংখ্যা এখন ৯ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ’৪৭ এর পর থেকে তাদের দেশত্যাগ চলছে। আর প্রতিটি নির্বাচন নতুন করে দেশত্যাগের প্রবণতা বৃদ্ধি করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর দু দশক চললে দেশ সংখ্যালঘু শূন্য হয়ে পড়বে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি। হারিয়ে যাবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র। দেশ জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথ সুগম হবে।

একজন মানুষ হিসেবে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিপীড়নে আমি লজ্জা ও গ্লানি বোধ করছি। মানুষ হিসেবে নিজেকে বিপন্ন মনে হচ্ছে। এ ধরনের বাংলাদেশ আমরা কখনো চাইনি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ