পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৪

'দুয়োরানি চট্টগ্রাম'


২৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১০ মাঘ ১৪২০ সাল ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
দুয়োরানি-সুয়োরানির গল্পটি নিশ্চয়ই পাঠকদের মনে আছে। হায়-দুয়োরানি, সারাদিন সমস্ত কাজ করেও রাজার কাছে তার স্বীকৃতি মেলে না। উল্টো জোটে গঞ্জনা-লাঞ্ছনা। সন্তান প্রসবের আকাঙক্ষায় রাজা সুয়োরানির জন্যে ‘আম-পড়া’ নিয়ে আসে। সে আম খেতে পারে শুধু সুয়োরানি। তবু তার সন্তান হয় না। অন্যদিকে ফেলে দেওয়া আমের আঁটি চুষে দুয়োরানি গর্ভবতী হয়। রাজাকে সন্তান দান করে। তবুও কত ষড়যন্ত্র দুয়োরানির বিরুদ্ধে। আজ আমার কাছে চট্টগ্রামকে দুয়োরানি মনে হয়। দেশের জন্যে, জাতির জন্যে, দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যে এত কিছু করেও চট্টগ্রামের ভাগ্যে জোটে ফেলে দেওয়া আমের আঁটি। যা খেয়েও সে গর্ভবতী হয়। দান করে সমৃদ্ধি।

আহা-কত বিশেষণেই না অভিষিক্ত করা হয় দুখিনী চট্টগ্রামকে। গালভরা সব বিশেষণ! প্রাচ্যের রানি! দ্বিতীয় রাজধানী! বাণিজ্যিক রাজধানী, বন্দর নগরী, পর্যটন নগরী, বাংলাদেশের প্রবেশ দ্বার আরও কত কী! রাজনীতির মাঠ গরম করেন বক্তৃতায় নেতারা। মুগ্ধ শ্রোতা-দর্শক আনন্দে ডুগডুগি বাজিয়ে বাড়ি ফেরে- তারপরে পরিস্থিতি যে তিমিরে- সে তিমিরেই। পরিবর্তন হয় না কোন কালে। কোনো দলের শাসনামলে। চট্টগ্রাম অবহেলিতই থাকে। কোনো কোনো নেতা চট্টগ্রামে এসে এই শহরকে নিজের বলেও ঘোষণা দেন কিন্তু বাস্তবে সবই ঠাট্টা-মশকরা বলে মনে হয়। চট্টগ্রাম পড়ে থাকে একই অবহেলায় একই অন্ধকারে।

বছর দেড়েক-দুয়েক আগে এই পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলাম, ‘পদ্মা সেতু কি সত্যিই জরুরি’ এই শিরোনামে। তখন পদ্মা সেতু নিয়ে তৎকালীন সরকার বেশ নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। দেশে-বিদেশে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একে একে সমস্ত দাতা দেশ তাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সরকারের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানকে নিয়ে দারুণ বিপাকে সরকার। বিব্রত সরকার কী করবে বুঝতে না পেরে একেকবার একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু সবই ব্যর্থ হচ্ছে আর সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে। বিরোধীদল ভালো একটি অস্ত্র পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সরকারের ওপর আর মধ্যরাতের টিভির টক শোগুলো তুলোধুনো করছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও ব্যক্তিদের।

সে লেখায় বোঝাতে চেয়েছিলাম পদ্মা সেতুর মত এত ব্যয়বহুল প্রকল্প কি এখন এতই জরুরি বাংলাদেশের জন্যে। একটি পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে ঠিক কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে তার অবদান কতটুকু? তা-কি ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক উন্নয়নের চেয়েও জরুরি? অন্তত চারলেন করার চেয়েও? ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক ৬ লেন বিশিষ্ট হলে-বন্দরের যে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, আমদানি-রফতানিতে যে গতিশীলতা আসবে তা কি পদ্মা সেতু থেকে অর্জিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম? ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি যদি ছয় লেন বিশিষ্ট হয় আর একটি কন্টেইনার যদি তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম আসা যাওয়া করতে পারে তার যে উপকার আমদানি-রফতানি কারক তথা জনগণ ভোগ করতো তার সমপরিমাণ কী পদ্মা সেতু নির্মিত হলে মিলতো? আমি লিখেছিলাম কোনো অর্থনীতি গবেষক তা যাচাই বাছাই করে উপাত্ত উপস্থাপন করুন। চট্টগ্রামে কি এমন একজন গবেষকও নেই যিনি হাতে-কলমে হিসাব করে জাতিকে বুঝিয়ে দিতে পারেন? দুর্ভাগ্য চট্টগ্রামের হয়ত তা-ও নেই। হয়ত আছেন কিন্তু তার গরজ নেই। পাছে তিনি আঞ্চলিকতার দোষে অভিযুক্ত হয়ে পড়েন। যেমন আমাদের জনপ্রতিনিধি তথা এমপি-মন্ত্রীরা ঢাকায় গেলে চট্টগ্রামের স্বার্থের কথা মুখে আনতে লজ্জা পান। গত বিএনপি আমলের সব মিলিয়ে আটজন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর মর্যাদায় নেতা থাকার পরেও আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। যেমন আওয়ামী লীগের সময়ও কাঙিক্ষত উন্নয়ন হয়নি।

গত ২১ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত অক্সিজেন-হাটহাজারী চারলেন সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ গত চার বছরে শেষ হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। তারা আরও লিখেছে, এরই মধ্যে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। সড়কের যে টুক অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে সেখানেও বসানো হয়েছে বাজার। সেই সঙ্গে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে এটুকু কাজেরও সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। নিত্যদিনের যানজটে আটকে আছে তারা। উল্লেখ করা প্রয়োজন অক্সিজেন-হাটহাজারী সম্প্রসারিত সড়কের দৈর্ঘ্য মাত্র ১২ কিলোমিটার। এতো গেল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অবস্থা। দেখা যাক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কী হাল।

গত ২১ জানুয়ারি স্থানীয় একটি দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প, তিন দফায় সময় বাড়িয়ে অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। ওই পত্রিকাটি লিখেছে, দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন ও প্রধানতম যোগাযোগ মাধ্যম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প আজো ধুঁকছে। কাজ শেষ করার সময়সীমা তিন দফা পেছানোর পরেও এ বছর চার লেনে গাড়ি চলাচল করার আশা একেবারেই ক্ষীণ। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিন বছরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪১ ভাগ।

একটি প্রধান বন্দর নগরীর সাথে, যে বন্দর দিয়ে দেশের ৮৫ ভাগ আমদানি-রফতানি কাজ হয়ে থাকে, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই হাল তাহলে বুঝে নিতে হবে চট্টগ্রামের অধিকারের জায়গাটা কতটা ক্ষীণ আমাদের নীতি নির্ধারকদের কাছে। অথচ উত্তর বঙ্গের একটি জেলার সাথে উপজেলার সংযোগ সড়কও এরচেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত। সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ঢাকা-সিলেট সড়ক এমন উন্নত করা হয়েছে যে, মাত্র তিন ঘণ্টায় যাতায়াত করা যায় ঢাকা-সিলেট। সে সিলেটের সাথে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। দুটো মাত্র আন্তনগর ট্রেন আছে যা লোকাল ট্রেনের চেয়েও খারাপ। তার ওপরে তার টিকেট পাওয়া প্রাইজবন্ডের লটারিতে জেতার মতো অবস্থা।

সড়ক পথে এখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে লাগে স্বাভাবিকভাবে নয় থেকে দশ ঘণ্টা। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কতক্ষণ লাগবে বলা সম্ভব নয়। প্রায় সিঙ্গেল লেনের এই তথাকথিত মহাসড়কের কোথাও কোনো গাড়ি বিকল হয়ে গেলে যে যানজটের সৃষ্টি হয় তার বিড়ম্বনা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন।

শুধু সড়কের কথাই বা বলি কেন? কোনো একটি বিশেষ দিক কি আছে যা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা যায়। শুধু চট্টগ্রাম নগরেই আছে চল্লিশ লাখ মানুষ। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নাকি তরুণ সে হিসেবে এই শহরেই আছে প্রায় ২০ লাখ তরুণ। ওদের জন্যে এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথায়। স্বধীনতার পরেতো চট্টগ্রামে একটিও সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এদের জন্যে না আছে বিনোদনের ব্যবস্থা না আছে শিক্ষার ব্যবস্থা। একটি পার্ক নেই, একটি সিনেমা হল নেই, একটি ভালো থিয়েটার নেই, খেলার মাঠ নেই, সময় কাটানোর উপকরণ নেই। এখন এত বিশাল সংখ্যক তরুণ যাবে কোথায়?

২০১০ সালে কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু উদ্বোধন করতে এসে প্রধানমন্ত্রী স্বপ্রণোদিতভাবে বলেছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্রে উন্নীত করা হবে। টেরিস্টিরিয়েল ও স্যাটালাইট দুভাবেই এর অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হবে। ১২ ঘণ্টা অনুষ্ঠান চলবে ইত্যাদি। তিনি দায়িত্বও দিয়েছিলেন তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদকে। দায়িত্ব নিয়ে টিভি ভবনে দুয়েকটি মিটিং করেই তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব সমাপ্ত করেছেন কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দিন দিন এর অবস্থা খারাপ হচ্ছে। এখন তো মনে হয় সিসিএলের নিজস্ব চ্যানেলের দর্শক-সংখ্যাও বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ে বেশি। আমি বলতে চাই চট্টগ্রাম টিভি কেন্দ্র নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর সাথে আর মশকরা করা ঠিক হচ্ছে না। যদি এটির মান, সক্ষমতা ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা নাই হয় তাহলে তা বন্ধ করে দেওয়া হোক। তার বদলে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলচ্চিত্র ও নাট্যকলা বিভাগ হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

এই শহরে একটি সিনেপ্লেক্স নেই। একটি কালচারাল সেন্টার নেই। আমি নিজে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম আলমাস সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে একটি কালচারাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলার। আমি একবার প্রস্তাব দিয়েছিলাম ডিসি হিলকে ইট-সিমেন্টের বস্তি না বানিয়ে সারা পাহাড় জুড়ে দেশীয় ফলের বাগান করে দেওয়া হোক। দেশীয় ফলের চর্চার সাথে সাথে আমাদের সন্তানরা দেশীয় ফল ও গাছ দেখা, চেনার সুযোগ পাবে। ফলের বাগান হলে সেখানে পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠবে।

যাক চট্টগ্রামের বঞ্চনার কথা লিখে শেষ করা যাবে না। সব লেখাও সম্ভব নয়। পরিবারে সব ছেলেরা সমান আয় করে না। তবে পরিবারে সমান সুবিধা ভোগ করে। এক সময় আমিও তাই মনে করতাম। চট্টগ্রাম উন্নয়ন নিয়ে কিছু বলাটা আঞ্চলিকতা মনে করতাম। কিন্তু এখন দেখছি না বলে,সোচ্চার না হয়ে উপায় নেই। যখন দেখি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বলে সম্ভব হচ্ছে না, না হলে চট্টগ্রাম বন্দরটি তুলে নিয়ে ঢাকার কাছাকাছি কোথায় স্থাপন করে ফেলা হতো। চা বোর্ড, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর, রেল সদর দপ্তর ইত্যাদির বেলায় যেমন ঘটেছে।

নতুন একটি সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে। আশা করি তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করবে। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে নয়।

সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে যারা মাঠ গরম করবে তাদের থামিয়ে দেওয়ার সময় এসে গেছে। বঞ্চনার ইতি টানার সময় এসে গেছে। দুয়োরানির দুঃখের দিন শেষ করতে হবে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ