৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১৭ মাঘ ১৪২০ সাল ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি
- কামরুল হাসান বাদল
১। লাখ লাখ ক্রিকেটপ্রেমী তরুণ-তরুণীর অদম্য দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি তাদের সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয়েছে। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোর্ডের সভায় বাংলাদেশ ত্রিদেশীয়, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মোড়লিপনার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ চারটি দেশ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমি মনে করি অন্যদেশ প্রতিবাদ না জানালেও বাংলাদেশের তাতে প্রতিবাদ জানানো উচিত। যে কোনো অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোটাই একটি স্বাধীন ও বীরের জাতির দায়িত্ব। বাংলাদেশ তার দায়িত্ব পালন করেছে সঠিকভাবে। তবে এরজন্যে ধন্যবাদ যা পাওয়ার তা দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপাগল জনগণের, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর। এভাবে দেশের পক্ষে অনড় থাকার জন্যে তাদের প্রতি লাল-সালাম।
২। গত ২৭ জানুয়ারি সিলেটের বিজিবি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসে মন্ত্রীর ধূমপান করার ছবি তারপরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ নিয়ে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেতো বটেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলোধুনো করা হয় মন্ত্রীকে। গত সোম ও মঙ্গলবার ফেসবুকে আলোচনার টপলিস্টে ছিল মন্ত্রীর এই অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনাটি। শেষ পর্যন্ত একদিন পরে অর্থাৎ গত মঙ্গলবার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে মন্ত্রী মহোদয় ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন।
বাংলাদেশে সাধারণত কেউ ভুল করলেও তা স্বীকার করতে চান না- ক্ষমা চাওয়াতো দূরের কথা। মন্ত্রী মহসিন আলী এ ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জনমত উপলব্ধি করতে পেরে নিজেকে সুধরে নিয়েছেন।
৩। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর নতুন যে মন্ত্রিসভা গঠিত হল- তা দেখে অনেকে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। কারণ নতুন এই মন্ত্রিসভায় গত পাঁচ বছরের বিতর্কিতরা বাদ পড়েছেন। বিতর্কিতরা বাদ পড়েছেন এমনকি সংসদ পরিচালনা থেকেও। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় যে মন্ত্রী-সাংসদদের অস্বাভাবিক সম্পত্তির সন্ধান বা তথ্য পাওয়া গেছে তারা বাদ পড়েছেন নতুন মন্ত্রিসভা থেকে। এমনকি গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সভায় নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা তার প্রথম বক্তব্যেই সাংসদদের সৎ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ‘দুর্নীতি করলে রেহাই নেই’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
৪। সাংসদ ও মন্ত্রী হওয়ার পরপর সারাদেশে সংবর্ধনা নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। বান্দরবান থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করে বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ। সংবর্ধনার ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এর জন্যে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ব্রিজ থেকে শুরু করে বান্দরবানের অনুষ্ঠানস্থল রাজার মাঠ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয় ১৮০টি তোরণ। এর একদিন পরে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংবর্ধনা নিতে গিয়ে সোনার নৌকা উপহার পান। পরে তিনি তার সমপরিমাণ অর্থ একটি প্রতিবন্ধী সংগঠনকে দান করে দেন। এ ধরনের সংবর্ধনা নিতে গিয়ে বা দিতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয় শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে সমালোচনার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এভাবে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রাখা বন্ধ করার ঘোষণা দেন ।
৫। এতক্ষণ আলোচনা করলাম নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে এবার নির্বাচনের আগে ফিরে যাই। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আন্দোলন সংগ্রাম করেছে দীর্ঘদিন। তাদের এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে পক্ষান্তরে তাদের দলীয় নেতা যারা একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত তাদের বিচার রহিত করতে ও সাজাপ্রাপ্তদের মুক্ত করতে জামায়াত-শিবির মরিয়া হয়ে ব্যাপক হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়েছে বিশেষ করে গত এক বছর ধরে। শেষে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলে নির্বাচন বয়কট ও প্রতিহত করতে ব্যাপক নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলা চালায় ১৮ দলের নামে মূলত জামাত-বিএনপি। হরতাল অবরোধ ডেকে নেতারা বাড়িতে অবস্থান নিয়ে ভাড়াটে খুনীদের দিয়ে বোমা-পেট্রোল বোমা ককটেল অগ্নিকাণ্ড দিয়ে অকাতরে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। জনজীবন অচল করে দিয়েছে। অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করেছে এত কিছুর পরও তারা নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। বরং ক্রোধান্বিত হয়ে নিরীহ হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে, ভাঙচুর করেছে, লুটপাট ও কোথাও কোথাও নারী ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক কাজও করেছে।
নির্বাচনের আগে যেখানে দুএকটি পত্রিকার জরিপে ’৯০ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় ও ‘এখন নির্বাচন হলে বিএনপি জয়লাভ করবে’ বলে প্রচার প্রপাগাণ্ডা চালানো হয়েছিল বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি কেন?
৯০ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চাইলে এবং সে সাথে বিএনপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে মাসের পর মাস হরতাল-অবরোধ সত্ত্বেও মানুষ রাস্তায় নেমে এলো না কেন? কেন বিএনপি একটি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করতে পারল না। নির্বাচনতো কার্যত আওয়ামী লীগ একাই করে ফেলল। জাতীয় পার্টি ও এরশাদকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই খেলালো। তারপরও নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হলো কেন বিএনপি।
কারণ বাংলাদেশ বদলে গেছে। পুরনো সে রাজনৈতিক খেলা এদেশে আর চলবে না। রাজনীতিকদের এখন সময় বুঝে রাজনীতি করতে হবে। একজন সাধারণ কামলা তার একদিনের বেতন কমপক্ষে ৪০০ টাকা। একজন রিকশাচালকের প্রতিদিনের আয় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। একজন তরুণ একজন ছাত্র পড়ালে পায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। লাখ লাখ নারী শ্রমিক এখন তৈরি পোশাক শিল্পে জড়িত। একদিন অনুপস্থিত থাকলে তার বেতন কাটা। এই বাস্তবতার হরতাল-অবরোধ আর হালে পানি পাবে না। পেট্রোল বোমা না হলে বিএনপি-জামাতের পাঁচ মিনিটের হরতালেও কেউ সাড়া দিত না।
মানুষ এখন স্থিতিশীলতা চায়, শান্তি চায়। গণতন্ত্রের নামে জ্বালাও পোড়াও আর ক্ষতার লুটপাটও চায় না। বাংলাদেশ জেগে উঠছে। তরুণরা শুধু নয় দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার ভাগাভাগি নয় উন্নয়ন ও শান্তি চায়। এই বাস্তবতা বিএনপি বুঝতে পারেনি। সম্ভবত শেখ হাসিনা তা অনুধাবন করতে পেরেছেন। পেরেছেন বলেই প্রথম থেকেই তিনি দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। অন্যকিছু নয় একমাত্র সুশাসনই শেখ হাসিনার সরকারকে পূর্ণ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দিতে পারে।
সরকার গঠিত হওয়ার দুদিন পরেই সদ্য বিদায়ী মন্ত্রী ও সাংসদদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা প্রমাণ করল শেখ হাসিনা শক্ত হাতেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন 'Morning shows the day' । একজন মন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রাক্তন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া দুটোই নতুন ঘটনা।
৬। খাদের কিনারা থেকে দেশকে তুলে এনেছেন শেখ হাসিনা। তিনি জানেন দেশবাসী এবং বিশ্বও জানে এই নির্বাচনের ভোটারের উপস্থিতি। কাজেই এবার তার সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই দুর্বলতার কথাই বারবার আলোচিত হবে। কিন্তু আমার অনুমান যদি সত্য হয়, তিনি যদি পরিস্থিতি বা জনমত আন্দাজ করতে পারেন তাহলে আগামী যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন সুশাসন প্রতিষ্ঠারই চেষ্টা করবেন। আমি আবারও বলি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চেহারা দেখতে দেখতে মানুষ ত্যক্ত। এবার কয়েক বছরের জন্যে একটু স্থিতিশীলতা চায়- উন্নয়ন ও সুশাসন চায়। শেখ হাসিনা যদি তা দিতে পারেন, দুর্নীতি তথা মন্ত্রী এমপিদের লুটপাট, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজী যদি বন্ধ রাখতে পারেন তাহলে উৎরে যাবেন ।
এই প্রজন্মের তরুণদের কাছে এখন অবাধ তথ্য প্রযুক্তি। যে কোনো তথ্য এখন তাদের হাতের মুঠোয়। তাদের কাছে গোপন করার কিছু নেই। তরুণরা এখন সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া-ব্যাংককের সাথে নিজ দেশের তুলনা করে। ওদের বয়সে আমরা ভালো করে ওসব দেশের ছবিও দেখিনি।
৭। বাংলাদেশের মানুষ যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায় তার একটি বড় প্রমাণ নির্বাচন পরবর্তী আর্থ সামাজিক অবস্থা। দেশের বিভিন্নস্থানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ছাড়া সারাদেশে শুরু হয়েছে অবাধ কর্মযজ্ঞ। মনে হচ্ছিল বছর খানেকের যুদ্ধ শেষে একটি বিজয়ী জাতি দেশগঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে- ঠিক ’৭২ এর দেশ স্বাধীনের পরিস্থিতির মতো। পরপর দুই মৌসুম মুখ থুবড়ে পড়া পর্যটন শিল্প প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রাণ ফিরে পেয়েছে দেশের শিল্প-কারখানা উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য। হাসি ফুটেছে কোটিপতি থেকে রাস্তার জুতা সেলাইকারী মুচির মুখে পর্যন্ত। অবশ্য যারা ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, নিজদলের নেতাদের মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং এ স্বপ্ন চরিতার্থ করার জন্যে অর্থ ও জনবল দিয়ে গত এক বছর দেশকে নরকে পরিণত করিয়েছিলেন তাদের মুখে হাসি ফোটেনি-ফোটার কথাও নয়।
৮। শেখ হাসিনার সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। আধুনিক মালয়শিয়া এবং আধুনিক ও সমৃদ্ধ মালয়শিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেকের কাছে তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় আদর্শিক নেতা। শেখ হাসিনা তার পথ অনুসরণ করতে পারেন। এবং তাঁর ও তাঁর দলের পরিকল্পনা ভিশন ২০২১ এর মধ্যেই দেশকে মোটামুটি একটি স্তরে পৌঁছাতে পারবেন। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার একটি সুবিধা আছে- তাহলো তার পরিবার। তাঁর পুত্র-কন্যা দুজনই উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত। গত পাঁচ বছরে প্রমাণিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটে তাদের আগ্রহ নেই। কাজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া শেখ হাসিনার পক্ষে খুব বেশি কঠিন হওয়ার কথা নয়। তাঁর সৎ সাহস আছে।
একটি পাদটীকা- বিশ্ব রাজনীতি তথা উন্নয়নশীল দেশ সমূহের কাছে মালয়েশিয়া একটি মডেল। মাহাথির মোহাম্মদ একজন মডেল নেতা। মাত্র ২০ বছরে তিনি মালয়েশিয়াকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। তবে এরজন্যে তাকে কঠোরও হতে হয়েছিল। কথিত আছে ২০ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছিল তার সীমিত গণতান্ত্রিক শাসনামলে। ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন বলে বন্ধু ও দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সহকর্মী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জেলে ভরেছেন এবং এমন অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন যে, তাঁর (আনোয়ার ইব্রাহিম) রাজনৈতিক ক্যারিয়ারই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও মাহাথির মালয়েশিয়ানদের সবচেয়ে প্রিয় নেতা।
email: qbadal@yahoo.com
Google+

