পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৪

'ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ'

৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১৭ মাঘ ১৪২০ সাল ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
১। লাখ লাখ ক্রিকেটপ্রেমী তরুণ-তরুণীর অদম্য দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি তাদের সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয়েছে। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোর্ডের সভায় বাংলাদেশ ত্রিদেশীয়, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মোড়লিপনার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ চারটি দেশ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমি মনে করি অন্যদেশ প্রতিবাদ না জানালেও বাংলাদেশের তাতে প্রতিবাদ জানানো উচিত। যে কোনো অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোটাই একটি স্বাধীন ও বীরের জাতির দায়িত্ব। বাংলাদেশ তার দায়িত্ব পালন করেছে সঠিকভাবে। তবে এরজন্যে ধন্যবাদ যা পাওয়ার তা দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপাগল জনগণের, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর। এভাবে দেশের পক্ষে অনড় থাকার জন্যে তাদের প্রতি লাল-সালাম।

২। গত ২৭ জানুয়ারি সিলেটের বিজিবি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসে মন্ত্রীর ধূমপান করার ছবি তারপরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ নিয়ে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেতো বটেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলোধুনো করা হয় মন্ত্রীকে। গত সোম ও মঙ্গলবার ফেসবুকে আলোচনার টপলিস্টে ছিল মন্ত্রীর এই অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনাটি। শেষ পর্যন্ত একদিন পরে অর্থাৎ গত মঙ্গলবার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে মন্ত্রী মহোদয় ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন।

বাংলাদেশে সাধারণত কেউ ভুল করলেও তা স্বীকার করতে চান না- ক্ষমা চাওয়াতো দূরের কথা। মন্ত্রী মহসিন আলী এ ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জনমত উপলব্ধি করতে পেরে নিজেকে সুধরে নিয়েছেন।

৩। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর নতুন যে মন্ত্রিসভা গঠিত হল- তা দেখে অনেকে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। কারণ নতুন এই মন্ত্রিসভায় গত পাঁচ বছরের বিতর্কিতরা বাদ পড়েছেন। বিতর্কিতরা বাদ পড়েছেন এমনকি সংসদ পরিচালনা থেকেও। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় যে মন্ত্রী-সাংসদদের অস্বাভাবিক সম্পত্তির সন্ধান বা তথ্য পাওয়া গেছে তারা বাদ পড়েছেন নতুন মন্ত্রিসভা থেকে। এমনকি গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সভায় নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা তার প্রথম বক্তব্যেই সাংসদদের সৎ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ‘দুর্নীতি করলে রেহাই নেই’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

৪। সাংসদ ও মন্ত্রী হওয়ার পরপর সারাদেশে সংবর্ধনা নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। বান্দরবান থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করে বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ। সংবর্ধনার ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এর জন্যে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ব্রিজ থেকে শুরু করে বান্দরবানের অনুষ্ঠানস্থল রাজার মাঠ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয় ১৮০টি তোরণ। এর একদিন পরে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংবর্ধনা নিতে গিয়ে সোনার নৌকা উপহার পান। পরে তিনি তার সমপরিমাণ অর্থ একটি প্রতিবন্ধী সংগঠনকে দান করে দেন। এ ধরনের সংবর্ধনা নিতে গিয়ে বা দিতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয় শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে সমালোচনার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এভাবে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রাখা বন্ধ করার ঘোষণা দেন ।

৫। এতক্ষণ আলোচনা করলাম নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে এবার নির্বাচনের আগে ফিরে যাই। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আন্দোলন সংগ্রাম করেছে দীর্ঘদিন। তাদের এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে পক্ষান্তরে তাদের দলীয় নেতা যারা একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত তাদের বিচার রহিত করতে ও সাজাপ্রাপ্তদের মুক্ত করতে জামায়াত-শিবির মরিয়া হয়ে ব্যাপক হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়েছে বিশেষ করে গত এক বছর ধরে। শেষে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলে নির্বাচন বয়কট ও প্রতিহত করতে ব্যাপক নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলা চালায় ১৮ দলের নামে মূলত জামাত-বিএনপি। হরতাল অবরোধ ডেকে নেতারা বাড়িতে অবস্থান নিয়ে ভাড়াটে খুনীদের দিয়ে বোমা-পেট্রোল বোমা ককটেল অগ্নিকাণ্ড দিয়ে অকাতরে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। জনজীবন অচল করে দিয়েছে। অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করেছে এত কিছুর পরও তারা নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। বরং ক্রোধান্বিত হয়ে নিরীহ হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে, ভাঙচুর করেছে, লুটপাট ও কোথাও কোথাও নারী ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক কাজও করেছে।

নির্বাচনের আগে যেখানে দুএকটি পত্রিকার জরিপে ’৯০ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় ও ‘এখন নির্বাচন হলে বিএনপি জয়লাভ করবে’ বলে প্রচার প্রপাগাণ্ডা চালানো হয়েছিল বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি কেন?

৯০ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চাইলে এবং সে সাথে বিএনপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে মাসের পর মাস হরতাল-অবরোধ সত্ত্বেও মানুষ রাস্তায় নেমে এলো না কেন? কেন বিএনপি একটি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করতে পারল না। নির্বাচনতো কার্যত আওয়ামী লীগ একাই করে ফেলল। জাতীয় পার্টি ও এরশাদকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই খেলালো। তারপরও নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হলো কেন বিএনপি।

কারণ বাংলাদেশ বদলে গেছে। পুরনো সে রাজনৈতিক খেলা এদেশে আর চলবে না। রাজনীতিকদের এখন সময় বুঝে রাজনীতি করতে হবে। একজন সাধারণ কামলা তার একদিনের বেতন কমপক্ষে ৪০০ টাকা। একজন রিকশাচালকের প্রতিদিনের আয় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। একজন তরুণ একজন ছাত্র পড়ালে পায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। লাখ লাখ নারী শ্রমিক এখন তৈরি পোশাক শিল্পে জড়িত। একদিন অনুপস্থিত থাকলে তার বেতন কাটা। এই বাস্তবতার হরতাল-অবরোধ আর হালে পানি পাবে না। পেট্রোল বোমা না হলে বিএনপি-জামাতের পাঁচ মিনিটের হরতালেও কেউ সাড়া দিত না।

মানুষ এখন স্থিতিশীলতা চায়, শান্তি চায়। গণতন্ত্রের নামে জ্বালাও পোড়াও আর ক্ষতার লুটপাটও চায় না। বাংলাদেশ জেগে উঠছে। তরুণরা শুধু নয় দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার ভাগাভাগি নয় উন্নয়ন ও শান্তি চায়। এই বাস্তবতা বিএনপি বুঝতে পারেনি। সম্ভবত শেখ হাসিনা তা অনুধাবন করতে পেরেছেন। পেরেছেন বলেই প্রথম থেকেই তিনি দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। অন্যকিছু নয় একমাত্র সুশাসনই শেখ হাসিনার সরকারকে পূর্ণ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দিতে পারে।

সরকার গঠিত হওয়ার দুদিন পরেই সদ্য বিদায়ী মন্ত্রী ও সাংসদদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা প্রমাণ করল শেখ হাসিনা শক্ত হাতেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন 'Morning shows the day' । একজন মন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রাক্তন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া দুটোই নতুন ঘটনা।

৬। খাদের কিনারা থেকে দেশকে তুলে এনেছেন শেখ হাসিনা। তিনি জানেন দেশবাসী এবং বিশ্বও জানে এই নির্বাচনের ভোটারের উপস্থিতি। কাজেই এবার তার সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই দুর্বলতার কথাই বারবার আলোচিত হবে। কিন্তু আমার অনুমান যদি সত্য হয়, তিনি যদি পরিস্থিতি বা জনমত আন্দাজ করতে পারেন তাহলে আগামী যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন সুশাসন প্রতিষ্ঠারই চেষ্টা করবেন। আমি আবারও বলি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চেহারা দেখতে দেখতে মানুষ ত্যক্ত। এবার কয়েক বছরের জন্যে একটু স্থিতিশীলতা চায়- উন্নয়ন ও সুশাসন চায়। শেখ হাসিনা যদি তা দিতে পারেন, দুর্নীতি তথা মন্ত্রী এমপিদের লুটপাট, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজী যদি বন্ধ রাখতে পারেন তাহলে উৎরে যাবেন ।

এই প্রজন্মের তরুণদের কাছে এখন অবাধ তথ্য প্রযুক্তি। যে কোনো তথ্য এখন তাদের হাতের মুঠোয়। তাদের কাছে গোপন করার কিছু নেই। তরুণরা এখন সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া-ব্যাংককের সাথে নিজ দেশের তুলনা করে। ওদের বয়সে আমরা ভালো করে ওসব দেশের ছবিও দেখিনি।

৭। বাংলাদেশের মানুষ যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায় তার একটি বড় প্রমাণ নির্বাচন পরবর্তী আর্থ সামাজিক অবস্থা। দেশের বিভিন্নস্থানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ছাড়া সারাদেশে শুরু হয়েছে অবাধ কর্মযজ্ঞ। মনে হচ্ছিল বছর খানেকের যুদ্ধ শেষে একটি বিজয়ী জাতি দেশগঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে- ঠিক ’৭২ এর দেশ স্বাধীনের পরিস্থিতির মতো। পরপর দুই মৌসুম মুখ থুবড়ে পড়া পর্যটন শিল্প প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রাণ ফিরে পেয়েছে দেশের শিল্প-কারখানা উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য। হাসি ফুটেছে কোটিপতি থেকে রাস্তার জুতা সেলাইকারী মুচির মুখে পর্যন্ত। অবশ্য যারা ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, নিজদলের নেতাদের মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং এ স্বপ্ন চরিতার্থ করার জন্যে অর্থ ও জনবল দিয়ে গত এক বছর দেশকে নরকে পরিণত করিয়েছিলেন তাদের মুখে হাসি ফোটেনি-ফোটার কথাও নয়।

৮। শেখ হাসিনার সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। আধুনিক মালয়শিয়া এবং আধুনিক ও সমৃদ্ধ মালয়শিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেকের কাছে তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় আদর্শিক নেতা। শেখ হাসিনা তার পথ অনুসরণ করতে পারেন। এবং তাঁর ও তাঁর দলের পরিকল্পনা ভিশন ২০২১ এর মধ্যেই দেশকে মোটামুটি একটি স্তরে পৌঁছাতে পারবেন। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার একটি সুবিধা আছে- তাহলো তার পরিবার। তাঁর পুত্র-কন্যা দুজনই উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত। গত পাঁচ বছরে প্রমাণিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটে তাদের আগ্রহ নেই। কাজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া শেখ হাসিনার পক্ষে খুব বেশি কঠিন হওয়ার কথা নয়। তাঁর সৎ সাহস আছে।

একটি পাদটীকা- বিশ্ব রাজনীতি তথা উন্নয়নশীল দেশ সমূহের কাছে মালয়েশিয়া একটি মডেল। মাহাথির মোহাম্মদ একজন মডেল নেতা। মাত্র ২০ বছরে তিনি মালয়েশিয়াকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। তবে এরজন্যে তাকে কঠোরও হতে হয়েছিল। কথিত আছে ২০ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছিল তার সীমিত গণতান্ত্রিক শাসনামলে। ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন বলে বন্ধু ও দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সহকর্মী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জেলে ভরেছেন এবং এমন অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন যে, তাঁর (আনোয়ার ইব্রাহিম) রাজনৈতিক ক্যারিয়ারই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও মাহাথির মালয়েশিয়ানদের সবচেয়ে প্রিয় নেতা।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৪

'দুয়োরানি চট্টগ্রাম'


২৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১০ মাঘ ১৪২০ সাল ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
দুয়োরানি-সুয়োরানির গল্পটি নিশ্চয়ই পাঠকদের মনে আছে। হায়-দুয়োরানি, সারাদিন সমস্ত কাজ করেও রাজার কাছে তার স্বীকৃতি মেলে না। উল্টো জোটে গঞ্জনা-লাঞ্ছনা। সন্তান প্রসবের আকাঙক্ষায় রাজা সুয়োরানির জন্যে ‘আম-পড়া’ নিয়ে আসে। সে আম খেতে পারে শুধু সুয়োরানি। তবু তার সন্তান হয় না। অন্যদিকে ফেলে দেওয়া আমের আঁটি চুষে দুয়োরানি গর্ভবতী হয়। রাজাকে সন্তান দান করে। তবুও কত ষড়যন্ত্র দুয়োরানির বিরুদ্ধে। আজ আমার কাছে চট্টগ্রামকে দুয়োরানি মনে হয়। দেশের জন্যে, জাতির জন্যে, দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যে এত কিছু করেও চট্টগ্রামের ভাগ্যে জোটে ফেলে দেওয়া আমের আঁটি। যা খেয়েও সে গর্ভবতী হয়। দান করে সমৃদ্ধি।

আহা-কত বিশেষণেই না অভিষিক্ত করা হয় দুখিনী চট্টগ্রামকে। গালভরা সব বিশেষণ! প্রাচ্যের রানি! দ্বিতীয় রাজধানী! বাণিজ্যিক রাজধানী, বন্দর নগরী, পর্যটন নগরী, বাংলাদেশের প্রবেশ দ্বার আরও কত কী! রাজনীতির মাঠ গরম করেন বক্তৃতায় নেতারা। মুগ্ধ শ্রোতা-দর্শক আনন্দে ডুগডুগি বাজিয়ে বাড়ি ফেরে- তারপরে পরিস্থিতি যে তিমিরে- সে তিমিরেই। পরিবর্তন হয় না কোন কালে। কোনো দলের শাসনামলে। চট্টগ্রাম অবহেলিতই থাকে। কোনো কোনো নেতা চট্টগ্রামে এসে এই শহরকে নিজের বলেও ঘোষণা দেন কিন্তু বাস্তবে সবই ঠাট্টা-মশকরা বলে মনে হয়। চট্টগ্রাম পড়ে থাকে একই অবহেলায় একই অন্ধকারে।

বছর দেড়েক-দুয়েক আগে এই পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলাম, ‘পদ্মা সেতু কি সত্যিই জরুরি’ এই শিরোনামে। তখন পদ্মা সেতু নিয়ে তৎকালীন সরকার বেশ নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। দেশে-বিদেশে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একে একে সমস্ত দাতা দেশ তাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সরকারের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানকে নিয়ে দারুণ বিপাকে সরকার। বিব্রত সরকার কী করবে বুঝতে না পেরে একেকবার একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু সবই ব্যর্থ হচ্ছে আর সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে। বিরোধীদল ভালো একটি অস্ত্র পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সরকারের ওপর আর মধ্যরাতের টিভির টক শোগুলো তুলোধুনো করছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও ব্যক্তিদের।

সে লেখায় বোঝাতে চেয়েছিলাম পদ্মা সেতুর মত এত ব্যয়বহুল প্রকল্প কি এখন এতই জরুরি বাংলাদেশের জন্যে। একটি পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে ঠিক কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে তার অবদান কতটুকু? তা-কি ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক উন্নয়নের চেয়েও জরুরি? অন্তত চারলেন করার চেয়েও? ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক ৬ লেন বিশিষ্ট হলে-বন্দরের যে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, আমদানি-রফতানিতে যে গতিশীলতা আসবে তা কি পদ্মা সেতু থেকে অর্জিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম? ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি যদি ছয় লেন বিশিষ্ট হয় আর একটি কন্টেইনার যদি তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম আসা যাওয়া করতে পারে তার যে উপকার আমদানি-রফতানি কারক তথা জনগণ ভোগ করতো তার সমপরিমাণ কী পদ্মা সেতু নির্মিত হলে মিলতো? আমি লিখেছিলাম কোনো অর্থনীতি গবেষক তা যাচাই বাছাই করে উপাত্ত উপস্থাপন করুন। চট্টগ্রামে কি এমন একজন গবেষকও নেই যিনি হাতে-কলমে হিসাব করে জাতিকে বুঝিয়ে দিতে পারেন? দুর্ভাগ্য চট্টগ্রামের হয়ত তা-ও নেই। হয়ত আছেন কিন্তু তার গরজ নেই। পাছে তিনি আঞ্চলিকতার দোষে অভিযুক্ত হয়ে পড়েন। যেমন আমাদের জনপ্রতিনিধি তথা এমপি-মন্ত্রীরা ঢাকায় গেলে চট্টগ্রামের স্বার্থের কথা মুখে আনতে লজ্জা পান। গত বিএনপি আমলের সব মিলিয়ে আটজন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর মর্যাদায় নেতা থাকার পরেও আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। যেমন আওয়ামী লীগের সময়ও কাঙিক্ষত উন্নয়ন হয়নি।

গত ২১ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত অক্সিজেন-হাটহাজারী চারলেন সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ গত চার বছরে শেষ হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। তারা আরও লিখেছে, এরই মধ্যে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। সড়কের যে টুক অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে সেখানেও বসানো হয়েছে বাজার। সেই সঙ্গে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে এটুকু কাজেরও সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। নিত্যদিনের যানজটে আটকে আছে তারা। উল্লেখ করা প্রয়োজন অক্সিজেন-হাটহাজারী সম্প্রসারিত সড়কের দৈর্ঘ্য মাত্র ১২ কিলোমিটার। এতো গেল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অবস্থা। দেখা যাক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কী হাল।

গত ২১ জানুয়ারি স্থানীয় একটি দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প, তিন দফায় সময় বাড়িয়ে অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। ওই পত্রিকাটি লিখেছে, দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন ও প্রধানতম যোগাযোগ মাধ্যম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প আজো ধুঁকছে। কাজ শেষ করার সময়সীমা তিন দফা পেছানোর পরেও এ বছর চার লেনে গাড়ি চলাচল করার আশা একেবারেই ক্ষীণ। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিন বছরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪১ ভাগ।

একটি প্রধান বন্দর নগরীর সাথে, যে বন্দর দিয়ে দেশের ৮৫ ভাগ আমদানি-রফতানি কাজ হয়ে থাকে, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই হাল তাহলে বুঝে নিতে হবে চট্টগ্রামের অধিকারের জায়গাটা কতটা ক্ষীণ আমাদের নীতি নির্ধারকদের কাছে। অথচ উত্তর বঙ্গের একটি জেলার সাথে উপজেলার সংযোগ সড়কও এরচেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত। সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ঢাকা-সিলেট সড়ক এমন উন্নত করা হয়েছে যে, মাত্র তিন ঘণ্টায় যাতায়াত করা যায় ঢাকা-সিলেট। সে সিলেটের সাথে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। দুটো মাত্র আন্তনগর ট্রেন আছে যা লোকাল ট্রেনের চেয়েও খারাপ। তার ওপরে তার টিকেট পাওয়া প্রাইজবন্ডের লটারিতে জেতার মতো অবস্থা।

সড়ক পথে এখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে লাগে স্বাভাবিকভাবে নয় থেকে দশ ঘণ্টা। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কতক্ষণ লাগবে বলা সম্ভব নয়। প্রায় সিঙ্গেল লেনের এই তথাকথিত মহাসড়কের কোথাও কোনো গাড়ি বিকল হয়ে গেলে যে যানজটের সৃষ্টি হয় তার বিড়ম্বনা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন।

শুধু সড়কের কথাই বা বলি কেন? কোনো একটি বিশেষ দিক কি আছে যা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা যায়। শুধু চট্টগ্রাম নগরেই আছে চল্লিশ লাখ মানুষ। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নাকি তরুণ সে হিসেবে এই শহরেই আছে প্রায় ২০ লাখ তরুণ। ওদের জন্যে এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথায়। স্বধীনতার পরেতো চট্টগ্রামে একটিও সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এদের জন্যে না আছে বিনোদনের ব্যবস্থা না আছে শিক্ষার ব্যবস্থা। একটি পার্ক নেই, একটি সিনেমা হল নেই, একটি ভালো থিয়েটার নেই, খেলার মাঠ নেই, সময় কাটানোর উপকরণ নেই। এখন এত বিশাল সংখ্যক তরুণ যাবে কোথায়?

২০১০ সালে কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু উদ্বোধন করতে এসে প্রধানমন্ত্রী স্বপ্রণোদিতভাবে বলেছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্রে উন্নীত করা হবে। টেরিস্টিরিয়েল ও স্যাটালাইট দুভাবেই এর অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হবে। ১২ ঘণ্টা অনুষ্ঠান চলবে ইত্যাদি। তিনি দায়িত্বও দিয়েছিলেন তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদকে। দায়িত্ব নিয়ে টিভি ভবনে দুয়েকটি মিটিং করেই তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব সমাপ্ত করেছেন কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দিন দিন এর অবস্থা খারাপ হচ্ছে। এখন তো মনে হয় সিসিএলের নিজস্ব চ্যানেলের দর্শক-সংখ্যাও বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ে বেশি। আমি বলতে চাই চট্টগ্রাম টিভি কেন্দ্র নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর সাথে আর মশকরা করা ঠিক হচ্ছে না। যদি এটির মান, সক্ষমতা ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা নাই হয় তাহলে তা বন্ধ করে দেওয়া হোক। তার বদলে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলচ্চিত্র ও নাট্যকলা বিভাগ হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

এই শহরে একটি সিনেপ্লেক্স নেই। একটি কালচারাল সেন্টার নেই। আমি নিজে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম আলমাস সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে একটি কালচারাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলার। আমি একবার প্রস্তাব দিয়েছিলাম ডিসি হিলকে ইট-সিমেন্টের বস্তি না বানিয়ে সারা পাহাড় জুড়ে দেশীয় ফলের বাগান করে দেওয়া হোক। দেশীয় ফলের চর্চার সাথে সাথে আমাদের সন্তানরা দেশীয় ফল ও গাছ দেখা, চেনার সুযোগ পাবে। ফলের বাগান হলে সেখানে পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠবে।

যাক চট্টগ্রামের বঞ্চনার কথা লিখে শেষ করা যাবে না। সব লেখাও সম্ভব নয়। পরিবারে সব ছেলেরা সমান আয় করে না। তবে পরিবারে সমান সুবিধা ভোগ করে। এক সময় আমিও তাই মনে করতাম। চট্টগ্রাম উন্নয়ন নিয়ে কিছু বলাটা আঞ্চলিকতা মনে করতাম। কিন্তু এখন দেখছি না বলে,সোচ্চার না হয়ে উপায় নেই। যখন দেখি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বলে সম্ভব হচ্ছে না, না হলে চট্টগ্রাম বন্দরটি তুলে নিয়ে ঢাকার কাছাকাছি কোথায় স্থাপন করে ফেলা হতো। চা বোর্ড, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর, রেল সদর দপ্তর ইত্যাদির বেলায় যেমন ঘটেছে।

নতুন একটি সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে। আশা করি তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করবে। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে নয়।

সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে যারা মাঠ গরম করবে তাদের থামিয়ে দেওয়ার সময় এসে গেছে। বঞ্চনার ইতি টানার সময় এসে গেছে। দুয়োরানির দুঃখের দিন শেষ করতে হবে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com Google+

বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৪

'ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি'


৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৬ পৌষ ১৪২০ সাল ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
একাত্তরের এপ্রিলের মাঝামাঝি, তারিখটা মনে নেই। আমাদের গ্রামে (রাউজান উপজেলার গহিরা)প্রথম যেদিন পাকিস্তানি সেনা আসলো সেদিন তা দেখে এক কিশোর গহিরা চৌমুহনী থেকে বাড়িতে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে চিৎকার করে বলছিল, ‘ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি’। (ভোট কেন দিলি, এখন কোথায় যাবি)। কিশোরটি সত্তরের নির্বাচন নিয়ে বলছিল। তার ধারণা হয়েছিল ভোট দেওয়াতেই গ্রামে মিলিটারি এসেছে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকেই যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে সে কিশোর তা জানতো না।

আসলে ৭০ এর ভোটের কারণেই দেশে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কার্যত সে ভোট বা নির্বাচন ছিল বাঙালির দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের চরমতম ধাপ। তারপরেই শেষ ধাপ ছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরে জাতি বিজয় অর্জন করে। সে সব ইতিহাস নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। পাঠক মাত্রেই কম-বেশি জানেন।

’৭০ এর একটি নির্বাচন বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করে। বাঙালির প্রথমবারের মতো নিজের স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বমাঝে স্বীকৃত হয়। এই পরিচয় ৪৩ বছরে পদার্পণ করেছে। কিন্তু জাতির একটি অংশের কাছে,’ ‘ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি’ বিভীষিকা এখনো বিদ্যমান। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি নির্বাচনই এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুর কাছে দিনদিন বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে।

পাকিস্তান ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র ভেঙে জন্ম নিল বাংলাদেশ নামক একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এদেশ মুক্ত ও স্বাধীন করতে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানসহ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকও যুদ্ধ করেছে রক্ত দিয়েছে শহীদ হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রেও এদেশ সকল ধর্মের মানুষের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রের মূলস্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরে দেশের ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যা করার আগে পর্যন্ত রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট ও সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু এর পরে দুঃখজনক ভাবে ধর্মীয় রাজনীতি অবারিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একই সাথে একাত্তরের কলেবটেরদেরও রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। এমনকি শাহ আজিজের মতো একজন কুখ্যাত রাজাকারকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদলে ফেলেন। তিনি সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দেন। বাদ দেন সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকেও। এরপর থেকে সমাজে ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটে। এই সাম্প্রদায়িকতা সশস্ত্র জঙ্গিবাদে রূপ লাভ করে তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে (২০০১-২০০৬)।

মাঝখানে ’৮২ থেকে নব্বই দেশ শাসন করেন আরেক জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। তাঁর আমলে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে ঘোষণা ও সাপ্তাহিক ছুটি রোববারের বদলে শুক্রবার করা হয়। তাঁর শাসনকালেও দেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটেছে। তাঁর শাসনকালেই এদেশে হিন্দুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এই ভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িকতাকে লালন ও প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরে এর বিস্তার ঘটেছে ভীষণ বিপজ্জনকভাবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে দেশে যে কোনো নির্বাচনে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে। সে নির্বাচন ইউনিয়ন পরিষদ হোক আর জাতীয় নির্বাচনই হোক। নির্বাচনের পরপরই আক্রান্ত হয় হিন্দুরা। এখন হিন্দুদের কাছে মহা আতংক হয়ে উঠেছে নির্বাচন। সেই কিশোরের মত ভোট কেয়া দিলি, এ্যায়া ক’ডে যাবি’ বিভীষিকা দূর হচ্ছে না কোনো ভাবে।

পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক আচরণের প্রতিবাদে ৫৪ সালে এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে সাধারণভাবে সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। একই কারণে ভারতে অর্থাৎ কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে সেখানকার মুসলিমরা কংগ্রেসকে ও পশ্চিম বঙ্গে বামফ্রন্টকে ভোট দেয়। কাজেই আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া হিন্দুদের কোনো অপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে বিগত কয়েক দশক বিশেষ করে ’৭৫ এর পরে তাই ঘটছে। আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিনির্বাচনের পরে হিন্দুদের ওপর হামলা-নির্যাতন চালানো হচ্ছে নৃশংসভাবে। আর প্রতিবার এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ভয়ংকরভাবে।

এমনকি গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, যাকে ভোটার বিহীন নির্বাচন বলে প্রচার করা হচ্ছে, সে নির্বাচনের পরেও আক্রান্ত হতে হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। ঘরছাড়া করা হলো শত শত পরিবারকে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে তাদের বসতবাড়ি,দোকানপাট, উপাসনালয়। প্রচণ্ড শৈত্য প্রবাহে শত শত নারী-শিশু-বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে খোলা আকাশের নিচে রাত্রি যাপন করতে হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে প্রচণ্ড শীতের মধ্য রাতে নদীতে ঝাঁপ দিতে হয়েছে শত শত নর-নারী, শিশু-বৃদ্ধকে। যশোর, দিনাজপুর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বহুস্থানে হামলার শিকার হয়েছে সংখ্যালঘুরা। তাদের চোখের সামনেই ধ্বংস করা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে শত বছরের বাপ-দাদার ভিটায় গড়ে তোলা বসতঘর। এখন শরণার্থী বা উদ্বাস্তুর মতো লাইন ধরে কলাপাতায় তাদের খিচুড়ি খেয়ে দিনযাপন করতে হচ্ছে।

মূল কথা দেশের একটি রাজনৈতিক শক্তি দেশকে সংখ্যালঘু শূন্য করতে চায়। তাতে তাদের দুটো লাভ। দেশের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দুর্বল হবে, অন্যদিকে তাদের বাড়িঘর দখল করা যাবে। তাই দীর্ঘদিন থেকে এ ধরনের হামলা-নির্যাতন চললেও দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখী করা হয়নি কখনো। এমনকি এই ধরনের ঘটনা তদন্তে যে কমিটি গঠন করা হয় তাদের প্রতিবেদনে কি লেখা হয়েছিল তাও জানার সুযোগ হয়নি কখনো।

আমি ভাবছি এ বিষয়ে আমরা কি দায়িত্ব পালন করি। ভাবছি দিনাজপুর-যশোর-সাতক্ষীরা-সাতকানিয়া-বাঁশখালী ইত্যাদি স্থানে যখন এমন আক্রমণ পীড়নের ঘটনা ঘটে তখন সেখানে অন্যরা কি করেন? অন্যদল বিশেষ করে যে দলটিকে ভোট দেওয়ার অপরাধে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে হিন্দুদের সে দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের ভূমিকা কি থাকে তখন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কি দায়িত্ব পালন করেন তখন। ভাবছি সমস্ত এলাকায় কি একজন ঈমানদার ও পরহেজগার মুসলিম মৌলানাও কি নেই যিনি তাঁর ঈমানি দায়িত্ব নিয়ে বাধা দেবেন দুর্বৃত্তদের। অমুসলিমদের ওপর এমন নির্যাতন ইসলাম ধর্ম কি সমর্থন করে? করে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম নিয়ে যারা প্রায়ই বলে থাকেন, ইসলামের রক্ষাকারী বলে দাবি করেন তারা কি দায়িত্ব পালন করেন। একটি হাদিসে রাসূল (সা:) উল্লেখ করেছেন, ‘যে তার প্রতিবেশিকে অভুক্ত রেখে খায় সে আমার উম্মত নহে।’ এই হাদিসে প্রতিবেশি বলতে নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। কাজেই এ ধরনের কাজ যারা করে থাকেন তারাতো রাসূল (সা:) এর উম্মতই হতে পারলো না- মুসলমান হবে কি।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে যদি আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অপরাধে বা শুধু মুসলমান (আসল কারণতো তাই) না হওয়ার কারণে যদি হিন্দুদের মারি, ভারতে যদি কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার জন্য বিজেপি মুসলমানদেরকে মারে বা বিশ্বের দেশে দেশে শুধু ধর্মীয়, ভাষা বা জাতিগত সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে এ ধরনের মারপিট অত্যাচার, নির্যাতন হতেই থাকে তাহলে বিশ্ব তো নরকে পরিণত হবে। এই নরকময় বিশ্বতো আমরা চাই না। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত উৎকর্ষের যুগে আমরা যদি শুধু ধর্ম নিয়েই মানুষকে বিচার করি তবে এর চেয়ে বড় মূর্খতা, গোঁড়ামী ও দীনতা আর কিছু হতে পারে না।

ধর্ম-ভাষা বা জাতিগত কারণে মানুষকে গৌণ করে তোলা। তাদের সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলা এক প্রকার অসভ্যতাই বটে। সভ্যতা ও আধুনিকতা হচ্ছে মানুষ পরিচিত ও বিচার্য করে তার সততা,সৎগুণ ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে। ধর্ম দিয়ে কখনো নয়। ধর্ম তার একান্ত নিজস্ব বিশ্বাসের ব্যাপার। এ নিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা জরুরি নয়। রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের জন্য সমান আচরণ করবে। বাংলাদেশের মহান সংবিধানেও তাই উল্লেখ আছে। এক সময় প্রায় কাছাকাছি সংখ্যানুপাতে থাকা সংখ্যালঘুর সংখ্যা এখন ৯ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ’৪৭ এর পর থেকে তাদের দেশত্যাগ চলছে। আর প্রতিটি নির্বাচন নতুন করে দেশত্যাগের প্রবণতা বৃদ্ধি করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর দু দশক চললে দেশ সংখ্যালঘু শূন্য হয়ে পড়বে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি। হারিয়ে যাবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র। দেশ জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথ সুগম হবে।

একজন মানুষ হিসেবে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিপীড়নে আমি লজ্জা ও গ্লানি বোধ করছি। মানুষ হিসেবে নিজেকে বিপন্ন মনে হচ্ছে। এ ধরনের বাংলাদেশ আমরা কখনো চাইনি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৪

'অর্বাচিনের আগুন-বাংলাদেশ থেকে মিশর এবং ফ্যাসিবাদ'

২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১৯ পৌষ ১৪২০ সাল ২৯ সফর ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
মিশরের রাজধানী কায়রোয় বিশ্ববিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ভবনে আগুন দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকরা। ইসলামি জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের কাছে স্বীকৃত এই বিশ্ববিদ্যালয়। গত শনিবার পরীক্ষা না দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে মুসলিম ব্রাদারহুড কর্মীরা। তাদের বাধা দিলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় তারা। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য ও কৃষি অনুষদ ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এ ঘটনার পরে মনে পড়ছে ১২৫৮ সালে তৎকালীন সভ্যতার পাদপীঠ বাগদাদের বিখ্যাত লাইব্রেরি দারুল হিকমা ভস্মীভূত করেছিল হালাকু খান। এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আফগানিস্তানে তালেবানরা এমন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার ধ্বংস করেছে, জ্বালিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানেও তালেবানরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার ধ্বংস করে দিয়েছে। বাধা দিয়েছে শিক্ষা গ্রহণে বিশেষ করে নারীদের। পাকিস্তানের মালালা ইউসুফ জাই এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। যা বিশ্ববাসীর সাথে বাংলাদেশের জনগণও জানে। শুধু আফগানিস্তান বা পাকিস্তান নয় বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি এমন ঘটনা ও এর চেয়েও বড় ঘটনা ঘটার আলামত। অন্তত গত এক বছর ধরে বাংলাদেশে এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে যেগুলোর সাথে হালাকু খানের আগুন দেওয়ার ঘটনার সাজুয্য আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে এরা কারা? যারা মানুষের জ্ঞান চর্চার পথ রুদ্ধ করতে চায়। মানুষকে অন্ধকারে রাখতে চায়। মানুষের প্রগতির চাকাকে থামিয়ে দিতে চায়। বিশ্বে যুগে যুগে, কালে কালে এমন কিছু অপশক্তি আসে যারা মানুষের উত্থানকে ভয় পায়, মানুষের জাগরণকে ভয় পায়। এরা কখনো বিদেশি শাসকের নামে, ধর্মের নামে, কখনো বা গণতান্ত্রিক শক্তির ছদ্মাবরণে ফ্যাসিবাদি আচরণ করে দেশে সমাজে ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। এক এক দেশে এক একটি বিষয়কে তারা অবলম্বন করে। কখনো (কট্টর) জাতীয়তাবাদ, কখনো ধর্ম, কখনো ভাষা বা বর্ণও হয়ে উঠতে পারে তাদের ফ্যাসিবাদ চরিতার্থের অস্ত্র। গত শতকের মধ্যভাগে জার্মানি-ইতালিতে এমন ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল। হিটলার জার্মানিদের বুঝিয়েছিলেন পৃথিবীকে শাসন করবে জার্মানরাই। অস্ত্র হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী বা জাতিগত অহংবোধকে। তিনি জার্মানদের উসকে দিয়েছিলেন। যুদ্ধংদেহি করে তুলেছিলেন আর তার এসব কাজে প্রচারণার জন্যে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছিলেন তার প্রচার মাধ্যমকে। গোয়েবলস ছিলেন তাঁর তথ্য উপদেষ্টা। গোয়েবলসের একটি উক্তি কুখ্যাত হয়ে আছে এখনো। তিনি বলতেন, ‘একটি মিথ্যাকে সত্য বলে দশবার প্রচার করো, একদিন তা-ই সত্যে পরিণত হবে’। ফ্যাসিবাদের চরিত্রই হচ্ছে জবরদস্তিমূলকভাবে তার মতামত ও শাসন চাপিয়ে দেওয়া, অন্যের মতামত বা অধিকারকে স্বীকার না করা। হিটলার মুসোলিনি একটি ফ্যাসিবাদি বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করে তা পদানত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বমানবতাবাদীদের কাছে, গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে তাঁরা পরাজিত হয়েছিলেন।

ফ্যাসিবাদী আচরণ একদা ভারতে হিন্দুরাও করেছে। এক সময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নির্মম,নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। যে ধর্মের উৎপত্তি ভারতে সে ভারত থেকেই তাদের বিতাড়িত করা হয়েছিল। মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও ফ্যাসিবাদি আচরণ করেছে। জ্ঞান বিজ্ঞান ও মানুষের জাগরণকে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে স্তিমিত করার চেষ্টা করেছে। গির্জার বিরুদ্ধে, রাজা-রাজন্যের বিরুদ্ধে বলাকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। কিন্তু এক সময় তাদের থামতে হয়েছে। মেনে নিতে হয়েছে সত্যকে। মানবাধিকারকে।

বাংলাদেশেও ফ্যাসিবাদের উত্থান পর্ব চলছে। এবার এখানে তারা ভর করেছে জামায়াতে ইসলামির ওপর। আর জামাতি তার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ধর্মকে। জামায়াতে ইসলামি একটি রাজনৈতিক দল বলে দাবি করলেও রাজনৈতিক ময়দানে তার ওপর হামলা বা তার সাথে সংঘর্ষের ঘটনাকে ধর্মের বিরুদ্ধে আঘাত বলে প্রচার করে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের দলের নেতারা সাজাপ্রাপ্ত হলে তারা প্রচার করছে ইসলাম প্রতিষ্ঠা বা ইসলামি আন্দোলনের কারণে তাদের নেতাদের সাজা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রচারের জন্য তারা দেশে বিদেশে প্রচুর লবিস্ট ও প্রচারকর্মী নিয়োজিত করেছে কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে। বিদেশে তারা প্রয়োজনে ইহুদি লবিস্ট বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। এরা প্রায়ই ইহুদি নাসারা বলে গালাগালি করে থাকলেও তাদের স্বার্থের কারণে এদের সাথে সখ্য গড়তে কার্পণ্য করে না। জামায়াত যে একটি ইসলামি দল নয় তা দেশের অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ও বিখ্যাত আলেমরা মতামত দিয়েছেন। এমনকি জামায়াত ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর পুত্রও জামায়াতকে একটি ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে জামায়াতকে আফিংয়ের সাথে তুলনা করেছেন।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী আবার নতুন করে ফ্যাসিবাদের উত্থান শুরু হয়েছে সেখানেও ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে তার মাধ্যম হিসেবে। মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও অমুসলিম দেশেও এদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মের সর্বজনীন ও চিরকালীন শান্তির পথ পরিহার করে সহিংস পথে এরা ধর্মের নামে মূলত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায়। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। ধর্মকে ভালোবেসে নয়। তাই কথায় কথায় এরা ধর্মের অপব্যাখ্যা দেয়। যা ধর্মকে অসম্মান করার সামিল। প্রয়োজনে ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটাতে পারে। পাকিস্তানে এরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে স্বাস্থ্য কর্মীদের কাজে বাধা দেয়। ফলে সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের টিকা খাওয়ানো বা দেওয়ার মতো জরুরি কাজ করতে পারে না। গত বছর বাংলাদেশে শিশুদের টিকা খাওয়ানো নিয়ে তারা গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ শিশুদের জীবন নিয়েও এরা মিথ্যাচার করতে পারে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদির ফাঁসির রায় ঘোষিত হলে, চাঁদে সাঈদিকে দেখা গেছে গুজব রটিয়ে সারাদেশে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে। জ্বালিয়ে দেয় অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান, পুলিশ স্টেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের প্রধান কৌশল মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করার প্রক্রিয়ায় এরা সিদ্ধহস্ত।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের সবক’টি মুসলিম প্রধান দেশকে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে মূলত ফ্যাসিবাদই তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে ধর্মের ওপর ভর করে। এরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, অথচ গণতান্ত্রিক সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করার দাবি জানায় তারা। তারা প্রকাশ্যে কখনো গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আচরণ করে না। মিসরের ব্রাদারহুড ও বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামিও একই আচরণ করছে। বাংলাদেশে জামায়াত তাদের নেতাদের বাঁচাতে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সকল সুবিধা গ্রহণ করেছে, মামলা পরিচালনা করেছে, শক্ত আইনজীবী ও সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে উচ্চ আদালতে আপিল করেছে। সেখানে হেরে গেলে এ বিচার মানি না বলে সারাদেশে রক্তক্ষয়ী হাঙামা করেছে। দেশকে অচল করে দিয়েছে, পেট্রোল বোমা মেরে নারী-শিশুসহ নিরপরাধ মানুষ জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

তাই বলছিলাম বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ভর করেছে জামায়াতের ওপর। আর জামায়াত ভর করেছে বিএনপির ওপর। বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিএনপি দেশের একটি অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। প্রশ্ন উঠতে পারে এত বড় একটি রাজনৈতিক দল যারা গণতান্ত্রিক উপায়ে দু’বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেছে তাদের আমি ফ্যাসিস্ট বলি কী করে। আমরা যদি জার্মানে ফ্যাসিবাদের উত্থান বা হিটলারের উত্থানের পেছনে তাদের দেশের রাজনৈতিক দল ও সুশীল শ্রেণির ভূমিকা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব বাংলাদেশেও বর্তমানে তেমন পরিস্থিতি বিদ্যমান। পত্রিকার কলামের একটি নির্দিষ্ট আয়তন থাকে সে কারণে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া আজ সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি আগামী সংখ্যায় তার কিছুটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবো পাঠকদের।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ