পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ, ২০১৪

'ভারতের নির্বাচন, বিএনপির আন্দোলন ও শেখ হাসিনার সরকার'

দৈনিক আজাদী                                        উপসম্পাদকীয়                                      কাল আজ কাল
১৩ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৯ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
সাম্প্রদায়িকতা থেকে উপমহাদেশের রাজনীতি সহসা মুক্ত হচ্ছে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থান দেখে তাই মনে হলো আবার। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে লোকসভা নির্বাচন। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছে। যদিও অতি সাম্প্রতিক একটি জরিপে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রায় দু’বছর আগে থেকেই বিজেপি নরেন্দ্র মোদিকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এ নিয়ে লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে দল ও মোদির সাথে কিছুটা মন কষাকষিরও সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু দলের নেতাদের মনোভাব বুঝতে পেরে শেষে আদভানি মোদির উত্থানকে মেনে নিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণের কাছে মোদিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আদভানির ব্যাপারটিও তাই। বাজপেয়িকে হটিয়ে দলের কর্তৃত্ব নিয়েছিলেন আদভানি - যিনি বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্যে অন্যতম দায়ী ব্যক্তি। বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বাজপেয়ি এক সময় কংগ্রেস করতেন। নেহেরুর সাথেও তাঁর সদ্ভাব ছিল। কবিতা লিখতেন বাজপেয়ি। ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি গঠনেও দল সম্প্রসারণে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। বাজপেয়ির এই পরিবর্তনে তখন তাঁর অনেক রাজনৈতিক বন্ধু ও সহকর্মীরা হতবাক হয়েছিলেন। অনেকে বলে থাকেন সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির রাজনীতি করলেও তিনি ততটা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না যতটা ছিলেন লালকৃষ্ণ আদভানি। বিজেপি, শিবসেনা, রাষ্ট্র স্বয়ং সেবক সংঘ এমন বেশকিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল আছে ভারতে। তবে সব দলকে ছাপিয়ে বিজেপি এখন সর্বভারতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এই দলের নেতৃত্ব বাজপেয়ি থেকে আদভানি-আদভানি হয়ে নরেন্দ্র মোদির হাতে- যে হাতে- লেগে আছে গুজরাটের অসংখ্য নিরপরাধ মুসলিমের রক্ত।

নরেন্দ্র মোদির জীবন শুরু হয়েছিল রেল স্টেশনে চা বিক্রির মাধ্যমে। রাজনীতিতে এসে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন এবং গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর শাসনামলে নিজ প্রদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙা তথা মুসলিমদের নিপীড়নের জন্য গোধরা রেল স্টেশনে এক বগি তীর্থ যাত্রীকে পুড়িয়ে মেরে তা মুসলিমদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙায় গুজরাটে নিহত হয়েছিল শত শত নিরপরাধ মুসলিম। বসতবাড়ি ও সম্পদহারা হয়ে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে হাজার হাজার মুসলিম। এই অপরাধে তার নামে মামলা হয়েছে তার দেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোদিকে সে দেশে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল কয়েক দফা। ভারতের প্রগতিশীল মহল ও বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে নরেন্দ্র মোদি একজন নিন্দিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি। এই ঘৃণিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লতা মঙ্গেশকর, বাপ্পি লাহিরীর মতো বাংলাদেশেও দারুণ জনপ্রিয় সঙ্গীত তারকারা দলে দলে যোগ দিচ্ছেন কট্টর রাজনৈতিক দল বিজেপিতে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগে থেকেই খারাপ। বর্তমান সরকার এক প্রকার তালেবান অনুমোদিত সরকার। মুসলিম লীগ নিজেই একটি সাম্প্রদায়িক দল। সেনাবাহিনী ও তালেবানকে ‘ম্যানেজ’ করেই নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে নির্বাচনী প্রচারাভিযানও চালাতে দেয় নি তালেবানরা। পিপিপির সভাপতি ও বেনজির তনয় বিলওয়াল মৃত্যু হুমকির মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের আগে। পাকিস্তানে অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে তালেবানদের হুমকি ও আক্রমণের মুখে। শেষে বেনজির ভুট্টোকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে কার্যত প্রগতিশীল রাজনীতির কবর রচিত হয়েছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ক্লান্ত। পাকিস্তানে এখন মুখ্যত আধা সামরিক আধা তালেবানি প্রভাবে কোনো ভাবে একটি দল ক্ষমতায় টিকে আছে।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের অবস্থাও পাকিস্তানের চেয়ে নাজুক। যদিও উপমহাদেশ বলতে আমরা আফগানিস্তানকে হিসেবে ধরি না কিন্তু এতদাঞ্চলের রাজনীতির ব্যাপক বিশ্লেষণের প্রয়োজনে আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ টানতে হচ্ছে। সে দেশের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হামলার মাধ্যমে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান। গত সোমবার এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া সরাসরি ভণ্ডুল করতে ভোটার, নিরাপত্তা বাহিনী, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও এই নির্বাচনের সহযোগী হিসেবে যারা জড়িত তাদের আক্রমণ করা থেকে পিছপা হবে না তারা।

বাংলাদেশেও দীর্ঘ দু’বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী হাঙ্গামার পরও অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি,মানবতাবিরোধী অপরাধে চিহ্নিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম ও অরাজনৈতিক কিন্তু কট্টর মৌলবাদী হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য মৌলবাদী ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সহিংস প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পরেও শেখ হাসিনা একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিস্থিতি আপাতত সামলে নিয়েছেন মনে হয়। গত দু’বছর ব্যাপী বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের নামে লাগাতার সহিংসতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। ৪৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দেশে। আপাতত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসলে অনেকে সন্দিহান এই পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে।

কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক প্রতিবেদনে লিখেছে বিএনপি আন্দোলনে নামার জন্য ভারতের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে। বিষয়টি কারও কাছে গোপনীয় নয় যে, বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার তার গত পাঁচ বছর শাসনকালে ও বর্তমান নির্বাচন সম্পন্ন করতে ভারতের বর্তমান শাসক দল কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিশেষ করে উলফার জন্য দশ ট্রাক অস্ত্র সরবরাহের ঘটনা ও সর্বশেষ হরতালের অজুহাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করায় ভারতের সাথে বিএনপির সম্পর্ক একেবারে বরফের পর্যায়ে নেমে এসেছে। সে হিসেবে দৈনিকটির পর্যবেক্ষণ ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যেহেতু কংগ্রেসের সাথে বিএনপির সম্পর্ক খারাপ সেহেতু বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারত সরকারের নীতির কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে ভেবে বিএনপি তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। মোরারজি দেশাই ও জেনারেল জিয়ার সখ্যের স্মৃতিটা নিশ্চয়ই পাঠকদের অনেকেই ভোলেন নি। (মোরারজি দেশাই বিজেপির নেতা ছিলেন না, তবে কট্টর ও সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন)।

এই উপমহাদেশের সুস্থ ও মানবিক রাজনীতির জন্য এটি একটি অশনি সংকেত। আফগানিস্তান-পাকিস্তানে এক প্রকার তালেবানি শাসন, ভারতে (যদি নির্বাচনে জেতে) বিজেপি আর বিজেপির সহায়তা ও সহযোগিতায় যদি বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসে তাহলে সারা উপমহাদেশ জুড়েই ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উন্মত্ততা শুরু হতে পারে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হলে বা বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে ভারতে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে বিজেপির মতো সে দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো।

যদিও এটি নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, ভারতে বিজেপি জিতলে তাদের বৈদেশিক নীতি বিশেষ করে তাদের সেভেন সিস্টার নামে খ্যাত রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে তাদের নীতির পরিবর্তন হবে। ভারত সরকার যেহেতু নিশ্চিত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশে আশ্রয় প্রশ্রয় পায় সেক্ষেত্রে এই দুই দলের ব্যাপারে বিজেপির অবস্থান কী হবে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। তবে নরেন্দ্র মোদির ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিয়ে তার সাম্প্রতিক বক্তৃতা বিবৃতি বিএনপি-জামায়াত নেতাদের মতোই শোনায়।

এসব গেলো আঞ্চলিক বা উপমহাদেশের রাজনীতির কথা। বাংলাদেশের রাজনীতির কথা বলি এবার। মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ সংগঠন ওআইসির নতুন মহাসচিব জাইয়াদ আমিন মাদারি এ সপ্তাহে তিনদিনের বাংলাদেশ সফরে এসে বর্তমান সরকারের প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করে বলেছেন,ওআইসি বর্তমান সরকারের সাথে কাজ করবে। নির্বাচন যা-ই হোক তা টিকে গেল শেখ হাসিনা কর্তৃক জঙ্গিবাদকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করার কারণে। কারণ আগেই বলেছি গত দু’বছর ধরে দেশে যেভাবে লাগাতার সহিংসতা চালানো হয়েছে তার জন্য নিন্দিত হয়েছে জামায়াত-হেফাজত এবং তাদের প্রশ্রয়দাতা বিএনপি।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এবং ভারতে বিজেপির মতো কট্টর মৌলবাদী দল ক্ষমতায় এলেও শেখ হাসিনার সরকার শুধুমাত্র একটি কারণে টিকে যেতে পারে আর তা হলো দুর্নীতি নির্মূল করা। গণতন্ত্রের নামে জ্বালাও- পোড়াও- হত্যা- ধ্বংস আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা জনগণের সম্পদ লুটপাটের দৃশ্য দেখতে দেখতে মানুষ এখন প্রচণ্ড রাজনীতি বিমুখ। উপজেলা নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল অংশ নেওয়ার পরেও ভোট দানের পরিমাণ তার সপক্ষে প্রমাণ দেবে। নির্বাচনে হানাহানি হত্যা- ধ্বংসে- জ্বালাও পোড়াও মানুষ আর দেখতে চায় না। দেখতে চায় না লুটপাটের অবাধ রাজত্বও। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি শেখ হাসিনার হাতে আর একটি ট্র্যাম্প কার্ড আর তাহলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এখানে সফল হলে দু’তিন বছর নয় আগামী পাঁচ বছর পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাবেন শেখ হাসিনা।

এখন প্রশ্ন হলো সে সুযোগের তিনি সদ্ব্যবহার করবেন কি-না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ৬ মার্চ, ২০১৪

'জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানো যাবে কি? ' ২য় পর্ব


৬ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২২ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
গত ১ মার্চ রাজধানীর বাইরে নির্বাচনোত্তর প্রথম সমাবেশ রাজবাড়িতে বেগম জিয়ার বক্তৃতায় জামায়াতের নাম না নেওয়ায় রুষ্ট হয়েছে জামায়াত নেতৃত্ব-এমন দাবি করেছে একটি জাতীয় দৈনিক। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের
রাজনৈতিক শক্তির সন্তোষ প্রকাশ করার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না। জামায়াতকে পরিত্যাগ করার আন্তর্জাতিক ও দেশিয় চাপ আছে বিএনপির ওপর। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন জামায়াতের সাথে তাঁদের নির্বাচনী জোট আছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেল উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে। এ পর্যন্ত দু’পর্যায়ের নির্মাণ শেষে দেখা যাচ্ছে এককভাবে বিএনপি চেয়ারম্যান পদে এগিয়ে আছে এবং সে সাথে জামায়াতে ইসলামীও অভাবিত সাফল্য পেয়েছে। চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের ২০ ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৬৬ জন জয়লাভ করেছে। অথচ ২০০৯ সালের নির্বাচনে জামায়াত পেয়েছিল ৬ চেয়ারম্যান ও ১০ জন ভাইস চেয়ারম্যান। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক গত দু’বছর ধরে দেশে এত এত নেতিবাচক রাজনীতি করার পরেও এই দলের জনপ্রিয়তা বাড়ল কি তবে। আসলে ঘটনাটি জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির নয়, এটি মির্জা ফখরুলের ভাষায় নির্বাচনী জোট অন্যদের ভাষায় আঁতাত। অর্থাৎ প্রকাশ্য জনসভায় বিএনপি নেত্রী জামায়াতের নাম উচ্চারণ না করলেও ভেতরে ভেতরে তাদের যোগাযোগ ও আঁতাত ঠিকই বহাল আছে। উপজেলা নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোট ও বিজয়ীদের রাজনৈতিক পরিচয় খোলাশা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে পাঠকদের কাছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দল, দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকায় বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে না দেওয়ার প্রবণতা এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

আল-কায়দা প্রধান জাওয়াহিরির অডিও বার্তা, তারপরে পুলিশ হত্যা করে প্রিজনভ্যান থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতাদের মুক্ত করাও উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের জয়লাভের নতুনভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে বাংলাদেশে জঙ্গিদের উত্থান ঠেকানো যাবে কি?

এই প্রশ্নের সোজাসাপটা একটি উত্তর হতে পারে-বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রেখে দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের উত্থানরোধ সম্ভব নয়। কারণ দেশে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি ও তার পথ ধরে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের ভূমিকা আছে। ভূমিকা আছে বর্তমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কমবেশি দুঃশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপকৌশলের।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালিরা ফুঁসে উঠেছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠা বা ন্যায্যতার দাবিতে। বাঙালির মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়া, শিক্ষা-দীক্ষা, স্বাস্থ্য-জীবন মান, চাকরি-ব্যবসা ইত্যাদিতে বাঙালিদের বঞ্চিত করে পাকিস্তানিরা যে অন্যায় করে আসছিল তার বিরুদ্ধেই বাঙালিরা সোচ্চার হয়েছে এবং সবশেষে ১৯৭০ সালের নিবার্চনে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে ভোট দিয়েছে। আবার বাঙালির ওই ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ না দেওয়ার মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বাঙালি বিদ্রোহ করেছে, সর্বশেষ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছে। শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের সাথে ন্যায় আচরণ করলে এবং তাদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান প্রদান করলে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ হতো না।

বর্তমান বাংলাদেশেও জঙ্গি উত্থান রোধে প্রথমে জরুরি-সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচলিত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম দূর করা। এছাড়া ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পর সমাজ ও রাষ্ট্রে যেভাবে ধর্মান্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে লালন ও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে তা বন্ধ করা। বিশ্বের সমস্ত সামরিক শাসকদের মতো বাংলাদেশেও সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ অন্যায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জেনারেল জিয়া মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি তথা ধর্ম ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় রাজনীতিকদের রাজনীতি করার পথ সুগম করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করেছেন আরেক জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ। জেনারেল জিয়ার হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক শক্তির নব অভ্যুদয় ঘটেছিল তা বিরাট মহীরূহ হয়ে দেখা দিয়েছিল তারই স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০১-২০০৬।

এ সময় দেশে জঙ্গিবাদের চরম উত্থান ঘটে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান ঘটে। দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। শায়খ আবদুর রহমানদের উদয় হয় এই আমলে। গণতান্ত্রিক বিশ্বকে হতচকিত করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যা ও শত শত মানুষকে আহত পঙ্গু করা হয়েছিল। পুরানো এসব কথা বিএনপির সমালোচনার জন্য লিখিনি, লিখেছি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ঠেকাতে হলে এই অন্যতম বৃহৎ দলটিকেও আন্তরিক হতে হবে। তাদেরও সমর্থন থাকতে হবে এই প্রক্রিয়ায়। নতুবা তা একা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী ও জোটভুক্ত দলগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে দেশের জনগণের মধ্যে বিশাল একটি অংশ বিএনপির সমর্থক। কাজেই বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম প্রধানদেশে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী ও সন্ত্রাসবাদকে ঠেকাতে হলে এই দলের সমর্থনও জরুরি। এখন কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন বিএনপি কেন এ কাজে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে? এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে দেশকে জঙ্গিমুক্ত করা আওয়ামী লীগের একক কোনো এজেন্ডা নয়। এবং তাদের একার পক্ষে তা সম্ভবও নয়। ইসলামী উগ্রপন্থীদের ঠেকাবে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের স্বার্থে। কারণ আজ বিএনপি যে অপশক্তির ওপর ভর করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় ব্যস্ত ওই শক্তিই একদিন বিএনপিকে বিনাশ করবে।

পুঁজিবাদের সমান্তরালে বিশ্বে ফ্যাসিবাদেরও উত্থান ঘটছে। এসময় ফ্যাসিবাদ ভর করেছে বাংলাদেশের জামায়াত ও অন্যান্য উগ্র ইসলামী দলগুলোর মতো বিশ্বের কট্টর ইসলামী দলগুলোর ওপর। এই শক্তি পরগাছার মতো বর্তমানে বিএনপির জনপ্রিয়তাকে ভর করে বিস্তৃত হচ্ছে-অদূর ভবিষ্যতে আগাছাই মূল গাছকে গিলে খাবে। এসব উগ্র ইসলামী দলগুলো যে শাসন পদ্ধতি কায়েম করতে চায় বিএনপি শেষ পর্যন্ত ততদূর অগ্রসর হতে পারবে না। কারণ বিএনপি একটি মাল্টি ক্লাস ও সুবিধাবাদীদের দ্বারা গড়া দল। এক সময় হয়ত বিএনপিতে নারী নেতৃত্ব থাকবে না তবে এই দল কট্টর উগ্রবাদী দলেও পরিণত হবে না। আখেরে যা হবে এই দল বিলীন হবে উগ্রবাদীদের উদরে। সেক্ষেত্রে দেশে প্রধানতঃ দুটি রাজনৈতিক শক্তিই টিকে থাকবে একটি আওয়ামী লীগ বা অন্যদলের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে আরেকটি তার বিপক্ষে কট্টর মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি। মাঝখানে বিএনপির মতো রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশে জঙ্গি দমনে বিএনপির মতো অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও আগ্রহ থাকতে হবে।

নির্বাচন করে বাংলাদেশে মৌলবাদীরা কখনো ক্ষমতায় আসবে না। সেটি তারাও ভালোভাবে জানে। আর জানে বলেই তারা সশস্ত্র বিপ্লব ও জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চায়। আর জিহাদের জন্য তারা ব্যবহার করবে দেশের উঠতি বয়সি কিশোর ও তরুণদের। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যেন তারা বিভ্রান্ত করতে না পারে তার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন সাধন করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধের কথা আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। উল্লেখ করেছি এক্ষেত্রে (প্রথম কিস্তিতে) আন্তর্জাতিক রাজনীতি তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভুল ও আগ্রাসননীতির ভূমিকা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক ও উদার মুসলিম রাষ্ট্রগুলো।

এর বাইরে দেশে উদার গণতন্ত্রচর্চার পাশাপাশি সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষকে মানবিক ও সংস্কৃতিসম্পন্ন করে তুলতে হবে। জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে, শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসাকে সরকারি তত্ত্বাবধানে আনতে হবে। তাদের পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন এনে অধিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় নিয়মিত করে তুলতে হবে। সম্ভব হলে একধারার শিক্ষাপদ্ধতি প্রচলন করতে হবে। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ ধর্ম বিষয়ে পড়তে চাইলে তাকে যেভাবে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ রেখে জাতীয় পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা যেতে পারে।

সংবিধান থেকে বিশেষ কোনো ধর্মের পক্ষপাতমূলক সংযোজন বাদ দিতে হবে।

রাষ্ট্রক্ষে সবধর্মের সব মানুষের করে তুলতে হবে। সবধর্মের মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করলেই তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে না। বরং সে শক্তিকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে এবং তার জন্য সমাজের তৃণমূল থেকে মানুষের চেতনাকে শাণিত করে তুলতে হবে।

বিএনপি-জামাত-জাতীয় পার্টি অনুসৃত নীতির সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বর্তমান রেখে এই পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। কাজেই এই পরিবর্তন ঘটানোর জন্য যে রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তা একা আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই এ কাজে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব প্রগতিশীল দল ও প্রতিষ্ঠানের ঐক্য প্রয়োজন।

দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের অর্থায়নের পথ বন্ধ করা। এবিষয়ে ড. আবুল বারাকাত বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তাদের অর্থের উৎস বন্ধ করতে না পারলে তাদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে না। জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ