পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩০ আগস্ট, ২০১২

* 'উপেন, হলমার্ক আর-পদ্মায় নিক্ষিপ্ত দুই শিশু'

দৈনিক আজাদী                          উপসম্পাদকীয়                    কাল, আজ, কাল
৩০ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৫ ভাদ্র ১৪১৯ সাল. ১১ শাওয়াল ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

শুধু বিঘে দুই/ ছিল মোর ভুঁই/ আর সবই গেছে ঋণে/ বাবু কহিলেন, ‘বুঝেছ উপেন/ এ জমি লইব কিনে’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যখন এই কবিতাটি লিখছিলেন তখন হয়ত বাবুদের সামান্যতম হলেও চক্ষুলজ্জা ছিল। উপেনের জমি তার চাই। কিন্তু সামান্য ভদ্রতার খাতিরে হলেও সে বলছে ‘এ জমি লইব কিনে’। কবিতাটি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন শেষ পর্যন্ত উপেনের কাছ থেকে জমিটি জমিদার বাবু দখল করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় চুরির অপবাদ নিয়ে উপেনকে দেশ ছাড়া হতে হয়েছিল। বাবুদের এই কীর্তি নতুন নয়। যুগে যুগে কালে কালে, স্থানে স্থানে বাবুদের জন্ম হয়। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন চেহারায়। ছোট বাবু মেঝো বাবু, বড় বাবু এবং শেষমেশ বিশ্ব বাবু, ( বিশ্বজিৎ কিংবা বিশ্বনাথ নয়) এরা একে অপরের সহায়ক হয়ে ওঠে। এবং ওভাবেই সারা বিশ্বের উপেনদের সর্বস্ব কেড়ে নেয় বাবুরা। বিশ্ব বাবুদের স্বার্থ রক্ষা করে যে দেশীয় বাবু তাকে ক্যাপানো যায় না। তার বিরুদ্ধে বলা যায় না, আন্দোলন করা যায় না, তাতে বিশ্ব বাবু ক্ষেপে যায়। দুর্গতি নেমে আসে সে দেশে। আমাদের দেশে এখন ছোট বড় অনেক বাবু। এরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ভূমিহীন করছে অসংখ্য উপেনকে। তবে আগের মতো ভদ্রতার খাতিরেও বলে না, ‘এ জমি লইব কিনে’। এখন সরাসরি দখল ও রাতারাতি দেয়াল। রাষ্ট্রযন্ত্র এখানে নির্বিকার। পক্ষান্তরে বাবুদের পক্ষেই। তাই বাবুরা এখন আর ভূমি দখল করেই ক্ষান্ত নয়, ব্যাংক,বীমা, কল-কারখানা, নদী-সাগর- পাহাড়- অরণ্য সবকিছুতে তাদের আগ্রাসী নখর। তবু আজও উপেনরা বলে, সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ/ যে মাটি সোনার বাড়া/ দৈনের দায়ে বেচিব সে মায়ে/এমনি লক্ষীছাড়া। তারপরেও রক্ষা নেই।

আজ দুই দশক ধরে এমন অনেক বাবুদের নাম শুনেছি। তাদের কীর্তিকলাপ জেনে এসেছি। আজ কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আরেকটি নতুন বাবুদের দলের নাম শুনছি। তার নাম হলমার্ক গ্রুপ। গত কয়েক দিন আগে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে খবর বেড়িয়েছে কেবল ১০ একর সরকারি জমিই নয়, হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখলেরও অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে জনতা হাউজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের শতাধিক প্লট জোর করে দখল করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৫০টি মামলা ও ২০টি জিডি আছে থানায়। একটি মামলায় হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির মাহমুদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি। ওসবের আগে হলমার্ক গ্রুপ আরেকটি নজিরবিহীন কেলেংকারির জন্ম দিয়েছে। সোনালী ব্যাংক, রূপসী বাংলা শাখা থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দুই হাজার ৬৬৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এতবড় কেলেংকারির সাথে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শাখা ব্যবস্থাপকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়ি বলে একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষ নিরীক্ষার পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর- অর্থমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছিলেন সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিতে। তার উত্তরে গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটি গভর্নর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ার বহির্ভূত। অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী আপাতত এই কেলেংকারিদের পক্ষেই তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করলেন। সোনালী ব্যাংকের ওই শাখার ঋণ দেয়ার যে ক্ষমতা ছিল তা থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি ঋণ দিয়েছে। শুধু তাই নয় ব্যাংক যেভাবে চেয়েছে সেভাবে নয় বরং হলমার্ক গ্রুপ যেভাবে চেয়েছে ব্যাংক সেভাবেই ঋণ দিয়েছে। তার মানে আরেকটি শেয়ার বাজার কেলেংকারি, আরেকটি ইউনি পে-টু ইউ, আরেকটি ডেসটিনি। বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উদ্দেশে বিদ্রোহী কবি নজরুল থেকে ধার করে বলতে চাই, ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’।

এই সংবাদগুলো যেদিন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হলো সে দিনের আরেকটি সংবাদের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সংবাদটি শুরু হয়েছে এভাবে। “বাবার সঙ্গে চুল কাটাতে গেল দুই সন্তান মুন্নি আক্তার (১০) ও মানসুর হোসেন (৫) কিন্তু শিশুদের বাবা ওদের চুল কাটাতে নিয়ে গেলেন না। নিয়ে গেলেন পদ্মা নদীর ওপর লালন শাহ সেতুতে। এরপর সেতু থেকে তাদের নদীতে ফেলে দিলেন”। এই বর্ণনা ওই দুই শিশু সন্তানের মায়ের। এ শিশু দুটির পিতা মালেক সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার সকালে (ঈদের আগের শুক্রবার) দুই সন্তানকে নিয়ে লালন শাহ সেতুতে যাই। মুন্নি ও মানসুরকে সেতুর রেলিঙের ওপর বসিয়ে প্রথমে মুন্নিকে ফেলে দেই। ভয়ে মানসুর দৌড় দিলে তাকে ধরে নদীতে ফেলে দেই। মালেক আরও জানায়, “আমার অভাবের সংসার। পেটে ভাত নাই, সন্তান বাঁচিয়ে রেখে কী করব। তাই সেতুর ওপর নিয়ে “ফেলি দিছি”। হায় দারিদ্র্য! হায় দারিদ্র্য বিমোচন!

একদিকে শেয়ার বাজার, ইউনি পে টু ইউ, ডেসটিনি হলমার্ক ও নব্য বাবুদের হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট আর অন্যদিকে এক অসহায় ব্যর্থ পিতা কর্তৃক নিজ শিশু সন্তানকে নদীতে নিক্ষেপ। হায় কী নিদারুণ বৈপরীত্য।

প্রতিটি ক্রিয়ার একটি প্রতিক্রিয়া থাকে। কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হয় মানুষকে। আজ যারা লুটপাটে ব্যস্ত সরকার বদলের সাথে সাথে তাদের অনেকে বদলে যাবে। অনেকে পালিয়ে দেশের লুটের টাকা দিয়ে বিদেশে আয়েশী জীবন যাপন করবে। অনেকে হয়ত পরিবর্তিত ক্ষমতার অংশীদারদের সাথে অর্থের ভাগাভাগি করে নেবে। অনেকে ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাবে। কিন্তু আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ একটু সুশাসনের (আশায়) একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্যে, জাতির জনকের সোনার বাংলার জন্যে বর্তমান সরকারকে সমর্থন করেছিলাম আমাদের কী হবে? আমাদের কোন বাঘের মুখে ফেলে যাবে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা?


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট, ২০১২

* 'হায়, জীবন এত ছোট কেনে?'


১৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১ ভাদ্র ১৪১৯ সাল ‌২৭ রমজান ১৪৩৩ হিজরি 


‘এই খেদ আমার মনে মনে।
ভালবেসে মিটল না আশ-কুলাল না এ জীবনে।
হায় জীবন এত ছোট কেনে?’ 

এ যেনো, ‘এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গ-মর্ত্য ছেয়ে।/ সবচেয়ে পুরাতন কথা,/ সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন; এ ক্রন্দন শোনা গিয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যার এর ‘কবি’ উপন্যাসের নায়ক নিত্য বা নিতাইয়ের কণ্ঠে। জীবনের এক চরম ও নির্মম সত্যকে গানের মাধ্যমে তুলে এনেছিল গ্রাম্য কবি নিতাই। নিতাই কবি হতে চেয়েছিল। মানুষের জীবনের ক্ষণ স্থায়িত্ব ও প্রেম তৃষ্ণার অতি প্রসার ও চিরস্থায়ী অতৃপ্তজনিত বেদনাবোধ থেকে যে গানের ধারা নিঃসৃত তা মুহূর্তেই বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাঙালির জীবনের এ যেনো এক নির্মম সত্য ও ট্রাজেডির প্রামাণ্য বয়ান। কয়েক বছর পরপরই আমরা হারাতে থাকি আমাদের বরেণ্য সন্তানদের। তারপরে দীর্ঘশ্বাসের সাথে পুনরায় উচ্চারণ করি জীবন এত ছোট কেনে? 

এই অগাস্ট, রক্তাক্ত অগাস্ট। শোক, বেদনা, হাহাকার আর দীর্ঘ বিলাপের অগাস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট। ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরে রচিত হলো বিশ্বের ভয়ংকর ও বর্বরতম ইতিহাস। হত্যা করা হলো ইতিহাসের মহানায়ককে। হত্যা করা হলো একটি জাতির স্বপ্নকে। একজন সাধারণ পরিবারের সন্তান সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় যোগ্যতায়,সততা ও নিষ্ঠায় একটি জাতির জনকে পরিণত হয়েছিলেন। জন্ম দিয়েছিলেন বাঙালির প্রথম সার্বভোম রাষ্ট্রের। দেশের চরম প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ও তাদের আদর্শিক মিত্র সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন নিহত হলেন তখন তার বয়স কতো? ১৯২০ থেকে ১৯৭৫- মাত্র ৫৫ বছর। তিনি জাতির পিতায় অভিষিক্ত হয়েছিলেন যখন তাঁর বয়স মাত্র ৫০ পেরিয়েছে। এই অল্প বয়সেই একটি রাষ্ট্রের স্থপতি হলেন তিনি। বাঙালির দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ,দুজনের মধ্যে কিছু সাজুয্য আছে। বিশ্বকবি উত্তরাধিকায় সূত্রে কোন সমৃদ্ধ ভাষা, সাহিত্য পাননি। তিনি সব ক’টি পথ নিজেই নির্মাণ করেছেন এবং যে পথে নিজের জাতিকে, ভাষা ও সাহিত্যকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সে ভাষায় কবিতা লিখে-নোবেল পুরস্কারও এনে দিয়েছেন। গান, কবিতা, উপন্যাস, গল্প ছোট গল্প, নাটক,চিত্রকলা যে খানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই তিনি ফুলে ফলে সুশোভিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুও তেমনি একটি জাতিকে জাগিয়ে তুলে তাঁর বুকে স্বাধীনতার স্বপ্ন বীজ বপন করে তাকে মহীরূহে পরিণত করেছেন। জাতির হস্তে তুলে দিয়েছেন স্বাধীনতার অনন্ত পতাকা। একদা বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন শাসকের দ্বারা শাসিত হওয়া জাতিকে দান করেছিলেন তাদের হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র এবং সে স্বাধীন ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্নির্মাণ করেছেন একান্ত নিজের মোহনীয় নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতার গুণে। বাঙালির পাপ তাপ ধারণ করে অগাস্টে যিশুর মতো প্রাণ দিয়েছেন মুজিব। তারপর ১৯৭৬ এর ২৭ অগাস্ট জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এর মহাপ্রয়াণ। নজরুল যে অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন বঞ্চনাহীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, মুজিবের সেই বাংলাদেশেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মানবতার নবী, মানবতার কবি নজরুল ৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন বটে,কিন্তু তাঁর কবিসত্তা বা লেখনির মৃত্যু হয়েছিল আরো আগে ১৯৪১ সালে। নজরুলতো প্রকৃত বেঁচেছিলেন ৪২ বছর। ২০০৭ সালের ১৭ অগাস্ট মৃত্যুবরণ করেন বাংলা কবিতার রাজপুত্র কবি শামসুর রাহমান। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে, মানবতার পক্ষে অবিচল এক কলমযোদ্ধা। ২০০৫ সালের ১২ অগাস্ট জীবন থেমে যায় আরেক প্রতিবাদী ও প্রথাবিরোধী সব্যসাচী লেখক হুমায়ুন আজাদের। বাংলাদেশের মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীকে তীব্র আক্রমণ করে লেখা তার কবিতা ও সাহিত্যের জন্যে তাদের হাতেই আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশেও ফিরেছিলেন। তার মৃত্যুতে জাতি একজন সাহসী সন্তানকে হারিয়েছিল। তারপর গত বছর এই অগাস্টে ১২ তারিখে জাতির দুই বরেণ্য সন্তান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর প্রাণ হারান এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে যিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন এবং মুক্তির গানের মাধ্যমে যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য ছবিকে জাতির কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। সে তারেক মাসুদ জীবন ও কর্মের মাঝামাঝিতে হারিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে বিশ্বমানের করে তুলেছিলেন শহীদ মুনীর চৌধুরীর সন্তান মিশুক মুনীর। অপূর্ণ জীবনে অপূর্ণ রয়ে গেলো কর্ম। 

গত ১৯ জুলাই আমেরিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক, নাটকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। মৃত্যুর আগে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, একটি কাছিমও বাঁচে ৩০০ বছর। কিন্তু একজন মানুষ কেন এত কম জীবন পাবে। তার কণ্ঠেও হাহাকার করে উঠেছিল নিতাই এর বেদনা ‘জীবন এত ছোট কেনে?’ 

আসলে জীবন এত ছোট কেন? বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্র, নজরুল-সুকান্ত, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদ, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর, হুমায়ূন আহমেদসহ দেশের বরেণ্য সন্তানেরা, কৃতি সন্তানেরা দীর্ঘ জীবন বাঁচে না কেন? এর মধ্যে বিশ্ব কবির জীবন হয়ত কিছুটা পূর্ণতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু অন্যদের? কী এমন ক্ষতি হতো প্রকৃতির বা বিধাতার, আমাদের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানরা যদি আরও দীর্ঘ জীবন লাভ করতেন। এ জাতিকে দেয়ার তো তাদের আরও অনেক কিছুই ছিল। এই অভাগা জাতিকে আর বঞ্চিত না করলে কী এমন ক্ষতি হতো এই মহাসৃষ্টির। এঁরাতো আর প্রতি যুগে যুগে জন্মাবেন না। খুব সাধারণভাবে বলতে ইচ্ছে হয় দেশেতো এমন অনেক দুর্বৃত্ত আছে যারা দীর্ঘ জীবন লাভ করে মানুষের জীবনকে করে তুলছে বিষময়। এই মন্দ লোকেরা সমাজে বেঁচে থাকবে আর অকালে মৃত্যুবরণ করবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা। আমি জানিনা প্রকৃতই জানিনা আগামীকাল কার অকাল মৃত্যু সংবাদে বিচলিত হয়ে উঠবে। আবার কোন বরেণ্য সন্তান তাঁর আধেক জীবনে, আধেক কর্মে আমাদের নিঃস্ব করে দিয়ে ওপারে পাড়ি জমাবেন। 

‘এই খেদ আমার মনে 
ভালবেসে মিটল না সাধ- কুলাল না এ জীবনে। 
হায়- জীবন এত ছোট কেনে? 
এই ভুবনে? 

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৯ আগস্ট, ২০১২

* 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী-বাঙালির পবিত্র গ্রন্থ-৩'

দৈনিক আজাদী                    উপসম্পাদকীয়                কাল, আজ, কাল
৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৫ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ‌২০ রমজান ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

১৯৬৯ সাল। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও ৬ দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে তাদের আন্দোলন গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে অনেক হতাহত হলে গণ অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব সরকার ১ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের আহবান জানায় এবং বঙ্গবন্ধুকে আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আন্দোলনের চাপে অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয়া হয় (তাঁকে)। তারপর দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে(তৎকালীন রেসকোর্স) প্রায় দশ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে এক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এবং সে সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই বছরের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, একসময় এদেশের বুক হইতে মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।’ জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’। এখানে উল্লেখ করতে চাই, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে বঙ্গবন্ধু অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন সে পাকিস্তানে তাঁর আশাভঙ্গ হয়েছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু কোনদিন পূর্ব পাকিস্তান বলেননি। তিনি বরাবরই তাঁর মাতৃভূমিকে সম্বোধন করেছেন পূর্ব বাংলা বলে। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে স্পিকারকেও উদ্দেশ্যে করে এই অনুরোধ করেছিলেন পাকিস্তানের এই অংশকে পূর্ব পাকিস্তান না বলে পূর্ব বাংলা বলার জন্যে। তিনি বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার পূর্ব বাংলা বলুন কারণ এদেশের মানুষের রয়েছে হাজার বছরের গৌরবময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।”
আজ স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করে, বাঙালি বা বাংলাদেশি জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব পরিচয় নিয়ে, নিজেদের দলের নামের আগে বা পরে বাংলাদেশ শব্দটি লাগান তারা অনেকে হয়ত জানে না ‘বাংলাদেশ’ নামকরণটিও কে করেছিলেন। অথবা জেনেও ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলগুলোতো নয়ই এমনকি তথাকথিত নিরপেক্ষদের অনেকেও শেখ মুজিব নামটি বলার আগে বঙ্গবন্ধু বলতে কুক্তিত হন। এসব অর্বাচনীদের জেনে রাখা প্রয়োজন শেখ মুজিবের নামের আগে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করতে গেলে আওয়ামী লীগার হতে হয় না। শুধুমাত্র একটু মার্জিত, ভদ্র আর কৃতজ্ঞ হতে হয়। বিএনপির বিষয়ে মেনে নিতে বাধ্য হই কারণ দলটি মুসলিম লীগের বাংলাদেশি সংস্করণ। আর জামাতে ইসলামিতো একটি স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গি একটি সংগঠন। তারা বঙ্গবন্ধুর অবদান না হয় স্বীকার করলো না। কিন্তু আমাদের বামপন্থি প্রগতিবাদীরা তাদের আপত্তি কীসের। তাদের চোখে বঙ্গবন্ধুর অপরাধ কী। দেশের কতিপয় বাম রাজনৈতিক দলের কাছে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অনেক পছন্দের। সে পছন্দ কীসের বিচারে? আজ বিভিন্ন সভা সেমিনারে, মধ্যরাতের টক শো গুলোতে কিছু কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন পরিচয়ে জাতির উদ্দেশ্যে নসিহত করেন। এদের মধ্যে অনেকে এতই প্রগতিবাদী বলে নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করেন যে, তাদের এ রূপ দেখে বঙ্গবন্ধুরই একটি কথা মনে পড়ে যায়। তিনি লিখেছেন “অতি প্রগতিবাদীদের কথা আলাদা। তারা মুখে চায় ঐক্য। কিন্তু দেশের জাতীয় নেতাদের জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে, চেষ্টা করে সেজন্য। তাহলেই ভবিষ্যতে জনগণকে বলতে পারে যে, এ নেতাদের ও তাদের দলগুলো দ্বারা কোন কাজ হবে না। এরা ঘোলা পানিতে মাছ ধরবার চেষ্টা করতে চায়।” আজ বাংলাদেশের অনেক লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও কলামিষ্টদের ভূমিকা দেখে আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগে লেখা বঙ্গবন্ধুর কথাগুলি খুবই আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
বিএনপির জন্ম সেনানিবাসে আর জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীও এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্মদাতা। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘খাজা সাহেবের (খাজা নাজিমুদ্দিন) আমলে পাঞ্জাবে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। তাতে হাজার হাজার লোক মারা যায়। লাহোরে মার্শাল ল জারি করা হয়। আহমদিয়া বা কাদিয়ানি বিরোধী আন্দোলন থেকে এই দাঙ্গা শুরু হয়। কয়েকজন বিখ্যাত আলেম (!) এতে উস্কানি দিয়েছিলেন। কাদিয়ানিরা মুসলিম না এটাই হল এই সকল আলেমদের প্রচার। আমার এ সম্বন্ধে বিশেষ কোন ধারণা নাই। তবে একমত না হওয়ার জন্য যে অন্যকে হত্যা করা হবে। এটা যে ইসলাম পছন্দ করে না এবং একে অন্যায় মনে করা হয়-এটুকু ধারণা আমার আছে। কাদিয়ানিরা তো আল্লাহ ও রসুলকে মানে। তাই তাদের তো কথাই নাই এমনকি বিধর্মীর উপরও অন্যায়ভাবে অত্যাচার করা ইসলামে কড়াভাবে নিষেধ করা আছে। লাহোরে ও অন্যান্য জায়গায় জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে স্বামী, স্ত্রী, ছেলেমেয়েদেরকে একসাথে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। যারা এই সমস্ত জঘন্য দাঙ্গার উসকানি দিয়েছিল তারা আজও পাকিস্তানের রাজনীতিতে সশরীরে অধিষ্ঠিত আছে।” প্রিয় পাঠক আপনারা হয়ত ভুলে যাননি গত বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলেও বাংলাদেশে এমন আহমদিয়া বিরোধী আন্দোলন তথা দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। যার পিছনেও কলকাঠি নেড়েছিল জামাত ও তাদের অনুসারী ধর্মান্ধ দলগুলো। বঙ্গবন্ধু সঙ্গত কারণেই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। যে নিষেধাজ্ঞা পরবর্তীতে জেনারেল জিয়া প্রত্যাহার করে নিয়ে বাংলাদেশে জামাতে ইসলামীর মতো চরম সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন এটা সবারই জানা। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তা কিন্তু প্রথম নয়। এর আগে চীন সফরে গিয়েও তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন বাংলায়। শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে আরও অনেকের সাথে ছিলেন বঙ্গবন্ধুও। তিনি লিখেছেন, “আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীন, রুশ ও স্পেনিস ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করবো না? পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবন্ধুর প্রিয় কবি। তাঁর সঙ্গীতকেই নির্বাচন করেছিলেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে। বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধারণা কেমন ছিল তাঁরভাষায় পড়া যাক, “এখানে(চীনে) রুশ লেখক আসিমভের সাথে আলাপ হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এই সম্মেলনেই আমি মোলাকাত করি তুরস্কের বিখ্যাত কবি নাজিম হিকমতের সাথে। বহুদিন দেশের জেলে ছিলেন। এখন তিনি দেশত্যাগ করে রাশিয়ায় আছেন। তাঁর একমাত্র দোষ তিনি কমিউনিস্ট। দেশে তাঁর স্থান নাই, যদিও বিশ্ববিখ্যাত কবি তিনি।” ১৯৪৮ সালের কথা। একদিকে ছাত্র সংগঠন অন্যদিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জন্য দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। এই সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবী নগর থানার কৃষ্ণনগরে রফিকুল হোসেন এক সভার আয়োজন করেছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে বর্ণনা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম, ... নদীতে বসে আব্বাস উদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল নদীর ঢেউগুলোও যেন তাঁর গান গাইছে। আমি আব্বাস উদ্দিন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।
তিন কিস্তিতে বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনী নিয়ে আলোচনা করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এই বইয়ের ব্যাপারে পাঠকদের আগ্রহী করে তোলা। রাজনীতির মাঠে যে নোংরামী চলছে। কালো টাকার মালিকরা যখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনীতি যখন ক্ষমতা আর অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম ও লক্ষ্য হয়ে উঠছে তখন এই দেশের স্থপতি, জাতির জনকের চিন্তা, চেতনা, ত্যাগ, বিসর্জন ও দেশপ্রেম কি ধরনের ছিল তা তুলে ধরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জাতির পিতার কোন ধারণা নেই। রাষ্ট্র বিজ্ঞান তা স্বীকার করে না। কিন্তু ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ ভালবাসা তা শুধু স্বীকারই করে না বুকে ধারণও করে। জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী, তুরস্কের কামাল, পাকিস্তানের জিন্নাহ এমন অনেকের নাম বলা যাবে। অনেক দেশের নাম উল্লেখ করা যাবে যাদের কাছে তাদের জাতির পিতার সম্মান দেবতুল্য। আমি পূর্বেও বলেছি একটি জাতির কৃষ্টি, সংস্কৃতি,ভাষাকে রক্ষার মাধ্যমে তার ভেতর জাতীয়তাবাদী চেতনা বীজ রোপণ করে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে জাতি হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছেন। একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। যা বাঙালিদের ছিল না কখনই। মোট কথা আত্মপরিচয়হীনতার পথে অগ্রসরমান একটি জাতিকে যিনি পুনর্জীবিত করতে পারেন তিনিই তো হবেন সে জাতির পিতা বা জনক। তাতে কোন দ্বিধা নেই। আর এ সত্য যারা অস্বীকার করবেন তাঁরা জাতির কুপুত্র হিসেবেই চিহ্নিত হবেন।
পুনশ্চ :গতকাল ৮ আগস্ট ছিল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব রেনুর জন্মদিন। ১৯৩০ সালের এই দিনে টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে নবীজির পাশে থেকে বিবি খোদেজা (রা:) যে রূপ ভূমিকা রেখেছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে ফজিলাতুন্নেছা সেরূপ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর ভূমিকার কারণেই মুজিব জাতির জনক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রতি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে আমার সশ্রদ্ধ সালাম।



লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ২ আগস্ট, ২০১২

* 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী, বাঙালির পবিত্র গ্রন্থ-২'

দৈনিক আজাদী                    উপসম্পাদকীয়                        কাল, আজ, কাল
২ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৮ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল. ১৩ রমজান ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

গত ১৯ জুলাই- এই শিরোনামে লেখার প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার পরে অনেকে সাক্ষাতে ও টেলিফোনে জানতে চেয়েছেন আমি মামলায় জড়ানোর আশংকা কেন ব্যক্ত করে ছিলাম। তাদের উদ্দেশ্যে বলি তা আমি এক প্রকার ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলাম। কারণ স্বত্বের বিষয়ে বইটিতে লেখা হয়েছিল, ‘এই বইটির কোন অংশ বিশেষই যে কোন রূপেই হোক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট অথবা প্রকাশকের অনুমতি ব্যতীত কোথাও কোনভাবে পুনর্মুদ্রণ করা যাবে না।’ আমি এমন শর্তারোপের সাথে দ্বিমত পোষণ করি। কারণ আমি মনে করি এই বইটি কিংবা এর কোন অংশ যতবেশি উদ্ধৃত হবে, প্রকাশিত হবে ততবেশি উপকৃত হবে জাতি। বইটির বাংলাদেশে প্রকাশক ‘দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’ শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিকভাবেও সুপরিচিত একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থা থেকে গ্রন্থ প্রকাশ গৌরবের বিষয় বৈ কি। এর সত্ত্বাধিকারী মহিউদ্দিন আহমেদ সাহেব নিজেও একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী ও সজ্জন ব্যক্তি। আর সে সাথে তিনি এই গ্রন্থটি সুচারুভাবে, আন্তরিকতার সাথে প্রকাশের দায়িত্ব নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন সন্দেহ নেই। সে জন্য তিনি ধন্যবাদার্হ। তবে আমি মনে করি, বইটির দাম ৫২৫ টাকা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটু বেশি। যদিও স্বীকার করতে হয় কাগজ ও মূদ্রণ ব্যয়ের কারণে প্রকাশক এই দাম রাখতে বাধ্য হয়েছেন তবে এমন কি হতে পারতো না ভর্তুকী দিয়ে বইটির দাম মধ্যবিত্তের ক্রয় সীমার মধ্যে রাখা। এই ভর্তুকী স্বয়ং মেমোরিয়াল ট্রাস্টও তো দিতে পারতো। অথবা চাইলে এমন অনেকেই আছেন বইটি প্রকাশের জন্যে স্বইচ্ছায় অনুদান দিয়ে এর বহুল প্রচারে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারতেন। যাই হোক আমি মনে করি গুরুত্বপূর্ণ এই বইটির সুলভ সংস্করণ বের করা উচিৎ। যাতে করে দেশের বেশি সংখ্যক পাঠক যেনো এটি পড়ার সুযোগ পান। আমি আগেও বলেছি বইটি সবার পড়া উচিৎ। রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের এবং তা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও এর সমর্থক অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের। সাধারণ একটি পরিবারের সন্তান নিজের চেষ্টা, আত্মবিশ্বাস, শ্রম,মেধা, সততা এবং দেশ ও মানবপ্রেমের দ্বারা একটি জাতির নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। কীভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির জনকে পরিণত হলেন। তা জানার জন্যে এবং তার আদর্শ নিজেদের মধ্যে ধারণ করার জন্য।

আজ রাজনীতি পরিণত হয়েছে অল্প সময়ে কোটিপতি হওয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে। নিজেদের আখের গোছাতেই তৎপর আজ প্রায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। দেশের জন্যে জাতির জন্যে ত্যাগ কাকে বলে বর্তমান রাজনীতির অভিধানে তা বোধ হয় নেই। ক্ষমতার সাথে সাথে নিজেদের ভাগ্য বদলই আজ মুখ্য উদ্দেশ্য অধিকাংশ নেতা কর্মীদের।

মূল সংগঠনের নেতাদের বাদই দিলাম। আজ ছাত্র নেতারাও কোটিপতি। তারা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। নিজস্ব বাড়ি বা ফ্ল্যাটে বসবাস করে চলাফেরা করেন নিজস্ব গাড়িতে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে রাজনীতি করার চেয়ে টেন্ডার আর চাঁদা ভাগাভাগীর রাজনীতিতে ব্যস্ত বেশি তারা। এই অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা বাদ যাবে না। অথচ এই ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু স্বয়ং কেমন ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে? দেখা যাক তার নিজের জবানবন্দিতে। (দেশ বিভাগের আগে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার পতন হয়েছে। এমএলএরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন) এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “এর পূর্বে আমার ধারণা ছিলনা যে, এমএলএরা এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি।” ঐ সময়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অনাস্থা ভোটের প্রচলন ছিল যেখানে দলীয় এমএলএরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারতেন। এই নিয়মের সুযোগে তৎকালীন এমএলএরা টাকার বিনিময়ে নিজ দলের বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা ভোট দিতেন। প্রিয় পাঠক এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে বর্তমান ধারাটির প্রচলন করেছিলেন যেখানে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বা অনাস্থা ভোটে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে অর্থাৎ ফ্লোর ক্রস করলে সংসদ সদস্যপদ হারাতে হয়। ’৭০ এর নির্বাচনের পরে পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী যখন সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুকে আহবান জানাতে গড়িমশি করছিল তখন মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, তৎকালীন রেসকোর্স মাঠে নির্বাচিত সকল প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করছিলেন। বাঙালিদের চরিত্র তার চেয়ে কে বেশি বুঝবে আর। যাক আমি মূল কথায় ফিরে আসি। মুসলিম লীগ সরকার পতনের ঐ সময়ের একটি ঘটনা। যখন এমএলএদের পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে, প্রতিপক্ষের টাকা খেয়ে যেনো শহীদ সাহেবের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট না দেয়। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এই সময়ে ফজলুর রহমান সাহেব আমাকে ডাকলেন। তিনি চিফ হুইফ ছিলেন। আমাকে বললেন, আপনাকে এই বারটার সময় আসাম বেঙ্গল ট্রেনে রংপুর যেতে হবে। মুসলিম লীগের একজন এমএলএ যিনি খান বাহাদুরও ছিলেন তাকে নিয়ে আসতে হবে। টেলিগ্রাম করেছি, লোকও পাঠিয়েছি, তবুও আসছেন না। আপনি না গেলে অন্য কেউ আনতে পারবে না।--- খাওয়ার সময় পেলাম না। যুদ্ধের সময় কোথাও খাবার পাওয়া কষ্টকর। ট্রেনে চেপে বসলাম। তখন ট্রেনের কোন সময়ও ঠিক ছিল না। মিলিটারিদের ইচ্ছেমত চলতো।--- রিকশাওয়ালা খান বাহাদুর সাহেবের বাড়ি চেনে,আমাকে ঠিকই পৌঁছে দিল। আমি অনেক ডাকাডাকি করে তাঁকে তুললাম, চিঠি দিলাম। তিনি আমাকে জানেন। বললেন আগামীকাল আমি যাবো। আজ ভোর পাঁচটায় যে ট্রেন আছে সে ট্রেনে যেতে পারবো না। আমি বললাম, তাহলে আপনি চিঠি দিয়ে দিন, আমি ভোর পাঁচটায় ট্রেনে ফিরে যেতে চাই। তিনি বললেন, সেই ভাল হয়। আমাকে জিজ্ঞাস করলেন না কিছু খাব কিনা। পথে খেয়েছি কিনা। বললেন, এখন তো রাত তিনটা বাজে,বিছানার কি দরকার হবে? বললাম দরকার নাই। যে সময়টা আছে বসিয়েই কাটিয়ে দেবো। ঘুমালে আর উঠতে পারবো না খুবই ক্লান্ত। একদিকে পেট টনটন করছে। অন্যদিকে অচেনা রংপুরের মশা। গতরাতে কলকাতার বেকার হোস্টেলে ভাত খেয়েছি। এক গ্লাস পানি দিলে ভাল হয়।--- কলকাতায় পৌঁছলাম আরেক সন্ধ্যায়। রাতে আবার হোস্টেলে এসে ভাত খাই। ৪৮ ঘণ্টার প্রায় অনাহারে কলকাতা-রংপুর-কলকাতা ঘুরে এসেছেন দলীয় সিদ্ধান্তে। এমনি শত শত ঘটনা আছে বঙ্গবন্ধুর জীবনে। বঙ্গবন্ধু কারাগারে একবার অনশন করেছিলেন। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বঙ্গবন্ধু মুক্তির জন্যে আপোষ করেন নি। পুলিশের ভয়ে পালিয়ে যাওয়া বা নিজেকে রক্ষা করার মত কোন শিক্ষা বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেন নি। ’৭১ এর ২৫ মার্চ নিজের এবং পরিবারের জীবন অনিশ্চয়তায় জেনেও পালিয়ে যান নি তিনি। কারণ পালিয়ে যাওয়ার মত নেতা তিনি নন। গত কয়েকমাস আগে একটি মামলার আসামি হওয়ার সাথে সাথে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অন্য নেতাদের সাথে স্বয়ং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের লুকিয়ে পড়ার ঘটনা আমাকে বারবার বঙ্গবন্ধুর এই দৃঢ়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৩৮ সালে তার ছাত্রজীবনের একটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, কোন গণ্যমান্য লোকের ছেলেদের বাকি রাখে নাই। সকাল ন টায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে কী করে আসবে- থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা লাগছিল। প্রায় দশটার সময় হল মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তাঁর উদ্দেশ্য হলো আমি যেনো সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই মাদারীপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করতো। সে আমাকে বলে, মিয়াভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাওনা। বললাম যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি। ১৫ আগস্ট কাল রাতে উদ্যত মারণাস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধু তাঁর তর্জনী উত্তোলন করেছিলেন, ঘাতকরা তাঁর পিঠে গুলি করতে পারেনি। তিনি অসীম সাহসে মৃত্যুর মুখে নিজের বুক পেতে দিয়েছিলেন, পলায়ন কাকে বলে তা জানতেন না বঙ্গবন্ধু।

মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করেছিল নাথুরাম গড্‌সে। একটি চরম হিন্দুত্ববাদী দলের সদস্য। তাদের অভিযোগ গান্ধীজী মুসলিমদের পক্ষে বলেন। মাত্র কয়েকদিন আগে আমেরিকার একটি জরিপে বলা হয়েছে রিপাবলিকানদের প্রতি তিনজনের একজন এখনও বিশ্বাস করে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একজন মুসলিম। স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে তাকে এবং এখনো তার কন্যা শেখ হাসিনাকে অনেকেই হিন্দু বা হিন্দুদের দলের নেত্রী হিসেবে প্রচার করে। বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। জেলজীবন নিয়ে এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, আমি তখন নামাজ পড়তাম এবং কোরআন তেলাওয়াত করতাম রোজ। কোরআন শরীফের বাংলা তরজমাও কয়েকখণ্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি।--- আমাকে রাখা হল শাস্তি দেয়ার জন্য। কারাগারের অন্ধকার কামরায় একাকী তাকা যে কী কষ্টকর, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুভব করতে পারবে না।

স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু বড় বড় কলকারখানা জাতীয়করণ করেছিলেন। এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে এমন রাজাকার আলবদর ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের জন্যে দালাল আইনের মাধ্যমে বিচারের ব্যবস্থা করে অন্যদের জন্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে গড়ে তুলবেন। চীন সফরে গিয়ে তাঁদের দেশপ্রেম ও দেশগঠনের আগ্রহ প্রত্যক্ষ করে বঙ্গবন্ধু অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যা তিনি এই বইয়ে উল্লেখ করেছেন। আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া বিশ্ব শাসন, যুদ্ধ ও যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং তাদের অদম্য আগ্রাসী রূপ দেখে সারা বিশ্ববাসী ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও হতাশ। এই অপশক্তিকে রুখবার কৌশলও জানা নেই এখন আক্রান্ত দেশগুলোর। এ বিষয়ে প্রায় ৫০ বছর আগে বঙ্গবন্ধু কী লিখেছিলেন, “আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি। এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ করতে পারবে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জনগণের কর্তব্য বিশ্ব শান্তির জন্য সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শৃংখলে যারা আবদ্ধ ছিল, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যাদের সর্বস্ব লুট করেছে তাদের প্রয়োজন নিজের দেশকে গড়া ও জনগণের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির দিকে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। বিশ্ব শান্তির জন্য জনমত সৃষ্টি করা তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে”।

শেষ পর্যন্ত লিখতে পারলে আমরা হয়ত আরও অনেক কিছু জানতে পারতাম। স্বাধীকার আন্দোলনের মূল সময় পর্যন্ত তিনি আসতে পারেন নি। তার আগে ‘গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার কারামুক্তি ঘটে। এরপরের ঘটনা প্রবাহ এত দ্রুত ঘটেছিল যে বঙ্গবন্ধু আর খাতা কলম নিয়ে বসারও সময় পাননি’। তারপরেও বলবো ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাঙালির একটি পবিত্র গ্রন্থ। যা এই জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির জনকের সরল বয়ান।

অন্য কোন দলের কথা জানি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি অন্তত তার দলের ২০ ভাগ নেতাকর্মীকে বইটি পড়তে এবং অনুধাবন করার ব্যবস্থা করতে পারবেন? তাহলে শুধু দলের নয় জাতিরও বিশাল লাভ হতো তাতে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ