পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৪

'ফিলিস্তিনিদের পাশে আছি আমরা'


দৈনিক আজাদী                                      উপসম্পাদকীয়                                                কাল আজ কাল
১৭ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২ শ্রাবন ১৪২১ সাল ১৮ রমজান ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল

প্যালেস্টাইন আরবিতে যা ফিলাসত্বীন এর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটি আত্মিক ও আদর্শিক। এর কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকাংশ আরব দেশ আমাদের বিপক্ষে থাকলে ফিলিস্তিন ও এর অবিসম্বাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন পক্ষে। শুধু তাই নয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিল তাঁর (ইয়াসির আরাফাতের) হৃদত্যপূর্ণ সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর যে গভীর আবেগ ও ভালোবাসা ছিল তা বহুভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি তা আমৃত্যু বহাল রেখেছিলেন। আরব বিশ্বের একমাত্র দেশ ফিলিস্তিন যার রাষ্ট্রীয় আদর্শ ছিল বাংলাদেশের মতো ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মীয় কারণ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যে সম্পর্কটি তৈরি হয়েছিল তা হলো বাংলাদেশের মতো তারা শোষিত, বঞ্চিত ও স্বাধীনতাকামী। তারাও দীর্ঘকাল পি এল ও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) প্রধান ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে আসছিল। এই প্রজন্মের হয়ত অনেকে জানেন না গত শতকের সত্তর দশকে বাংলাদেশের অনেক তরুণ ও মুক্তিযোদ্ধা প্যালেস্টাইনে গিয়ে তাদের সাথে একত্রে যুদ্ধ করেছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। আরব দেশ সমূহের মধ্যে ইরাক ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের সমর্থন দিয়েছিল। যে কারণে আরবের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফিলিস্তিন ও ইরাকের প্রতি বাংলাদেশ ও এর জনগণের ভালোবাসা ও সহানুভূতি অপরিসীম।

বাংলাদেশের সেই অকৃত্রিম বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ফিলিস্তিনে আবারও রক্ত ঝরছে। এ পর্যন্ত প্রায় দু শ’র কাছাকাছি ফিলিস্তিনি মারা গেছে তার মধ্যে ৮৬ শতাংশই বেসামরিক ও নারী-শিশু। প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আমরা ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তাক্ত ছবি দেখতে পাচ্ছি। গাজার অসহায় নারী শিশুসহ শত শত মানুষের ভয়ার্ত, অসহায় ছবি দেখতে পাচ্ছি। হামাসের ব্যর্থ, অকার্যকর ও লক্ষভ্রষ্ট একেকটি রকেট হামলার জবাব দিচ্ছে ইসরাইল গাজার নিরপরাধ নারী-শিশুসহ বেসামরিক লোকদের হত্যা করে। ইতোমধ্যেই গাজার অনেক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর পর্যন্ত আরব দেশসমূহের কোনো ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানায়নি তেমন কেউ। এমনকি জাতিসংঘ, অ্যামানস্টি ইন্ট্যারন্যাশনাল,হিউম্যান রাইট ওয়াচের মতো সংগঠন, যারা এখনও বাংলাদেশের যোদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে প্রায় বক্তৃতা বিবৃতি প্রদান করে যাচ্ছে।

আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ছোট্ট একটি ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল এত ক্ষমতাধর কী ভাবে হলো বা এই ছোট্ট রাষ্ট্রটিই বা কী করে পুরো আরব জাহানকে তটস্থ করে রাখে এবং এই রাষ্ট্রের শক্তির উৎস কী প্যালেস্টাইনের সাথে যুদ্ধের কারণ কী তা জানতে আমাদের একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে।

একটি সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের অধীন করে রেখেছিল ব্রিটেন। শত শত বছরও শাসন করেছে কোনো কোনো দেশ। কিন্তু এক সময় সে সব দেশে স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার হওয়ার ফলে তাদের স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয় ব্রিটেন। তবে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলে অধিকাংশ দেশে এমন কিছু সংকট তারা জিইয়ে রেখেছিল যে তার কারণে স্বাধীনতা অর্জন করলেও দীর্ঘ দীর্ঘ সময়ের জন্যে গভীর কিছু সংকটে নিপাতিত হতে হয়েছে দেশগুলো। ভারতের কাশ্মির সমস্যা, ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত ও ছিটমহল সমস্যার মতো মধ্যপ্রাচ্যেও তারা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি করে। কিছু ঐতিহাসিক কারণে ইহুদি মুসলিমদের মধ্যে চিরকালীন বৈরী সম্পর্ক সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মাঝখানে একটি ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপন ইঙ্গ মার্কিন বদ মতলবেরই একটি অংশ। সিমেটিক ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম এই তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছে প্যালেস্টাইনের জেরুজালেম একটি পবিত্র নগরী হিসেবে পরিগণিত। যে কারণে এই নগরীর অধিকার নিজেদের মধ্যে রাখতে এই তিন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে মারামারি যুদ্ধ বিগ্রহ কম সংঘটিত হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের মধ্যে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম এই তিন ধর্মাবলম্বীর অবস্থান হলেও এক সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিতারিত হতে হয় ইহুদিদের। খ্রিস্টানদের একটি বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আরব জাতীয়তাবাদ নিয়ে অবস্থান করতে পারলেও ইহুদিরা এক সময় রাষ্ট্রবিহীন জাতিতে পরিণত হয়। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বা দেশে। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দি পরে গত শতকের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মূলত ব্রিটেনই প্রথম উদ্যোগ নেয় মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের জন্য বোমা তৈরি প্রয়োজনীয় উপাদান কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়ভাজনে পরিণত হন ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইজ বাইজম্যান। মূলত তারই প্রস্তাবে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনে উদ্যোগে গ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি গড়ে তুলতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির হিটলার কর্তৃক নির্বিবাদে ইহুদি হত্যার ফলে বিশ্বব্যাপী ইহুদির প্রতি একটি সমবেদনা ও সহানুভূতি জন্ম নেয়। তাই যুদ্ধে হিটলারের পরাজয় ও মিত্রবাহিনীর বিজয় অর্জিত হলে মিত্র বাহিনীর দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেন ও আমেরিকার প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও হস্তক্ষেপে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘে ভোট গ্রহণ হয় তাতে ৩৩টি রাষ্ট্র পক্ষে, ১৩টি বিপক্ষে এবং ১০টি ভোট দানে বিরত থাকে।

ফিলিস্তিনে ইহুদিদের পুনর্বাসনের পরেও মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পায় ৫৭% আর ফিলিস্তিনিরা পায় ৪৩ শতাংশ ভূমি। এভাবে ইঙ্গ-মার্কিন উদ্যোগে জাতিসংঘে পাস হয়ে যায় একটি অবৈধ রাষ্ট্রের প্রস্তাব কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বিষয়টি থাকে উপেক্ষিত। এরপর থেকে ইজরাইল নামক রাষ্ট্রটির পরিধি ও ইহুদি বসতি বৃদ্ধি চেষ্টা অব্যাহত থেকেছে আর ফিলিস্তিনি জনগণ উদ্বাস্তুর জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের নিজ মাতৃভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইঙ্গ-মার্কিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা উদ্বাস্তু হয়ে শরণার্থী হয় বেঁচে খাকে বিভিন্ন দেশে। এক সময়ে ফিলিস্তিনিরা নিজ মাতৃভূমি ফিরে পেতে সংগঠিত হয়। গঠিত হয় পিএলও বা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে পিএলও ও প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ (পিএসসি) ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর আগে ১৯৭৪ সালে আরব লীগ শীর্ষ বৈঠকে পি এলও কে ফিলিস্তিন জনগণের একমাত্র বৈধ-প্রতিনিধি ও তাদের জন্য একটি দেশ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশসহ মুসলিমদেশসমূহ ইয়াসির আরাফাতকে ফিলিস্তিনের বৈধ রাষ্ট্রনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনের মাধ্যমে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি শুধু ইহুদি, যারা বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ কর্পোরেট পুঁজির অধিকারী তাদের সন্তুষ্টি রাখতে চেয়েছে অন্যদিকে আরবদের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে একটি মিনি আমেরিকা গড়ে তুলতে চেয়েছে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধের পরে আমেরিকা ইজরাইলের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এবং এক সময়ে এই রাষ্ট্রটি আমেরিকার কাছে নিজেদের একটি অঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে নিরাপত্তার জন্য চূড়ান্ত সুবিধা অর্জন করেছে। কয়েকদিন আগে ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যেও একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। অর্থাৎ আমেরিকা আজ তার অধিকার বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য যা করবে তদ্রুপ করবে ইজরাইলের জন্য।

বর্তমানে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস আল ফাতাহ নিয়ন্ত্রণে আছে রামাল্লা আর গাজার নিয়ন্ত্রণ আছে হামাসগ্রুপের অধীনে। বর্তমানে হামাসের সাথে দ্বন্দ্বে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইজরাইল। ইজরাইল নিয়ে আমেরিকার দু ধরনের স্বার্থ জড়িত। প্রথমটি হচ্ছে আমেরিকাসহ বিশ্বের বড় বড় করপোরেট হাউজগুলোর মালিক ইহুদি। আমেরিকার অস্ত্র নির্মাতা-বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা ইহুদি। আমেরিকার অর্থনীতির বিশাল একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ইহুদিরা। এবং এর ফলে আমেরিকার রাজনীতিতে এদের বিপুল প্রভাব। কাজেই ক্ষমতায় যেতে এবং ক্ষমতাকে মসৃণ করতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসনকে ইহুদি লবির কর্তৃত্ব মেনে নিতে হয়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োজন ছিল একটি মিনি আমেরিকার। ইসরাইলের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তটস্থ রেখেছে আমেরিকা। আবার অন্যদিকে আরবের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার নাম করে কবজা করে রেখেছে তারা। যে কারণে ইজরাইলের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলেও আমেরিকাকে তোষামোদ করার ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ। শাহের পতনের পর ইরান ও সাদ্দাম হোসেনের শেষের শাসনকাল ছাড়া আরবের অন্যান্য দেশ আমেরিকার প্রভাবমুক্ত নয়।

ইজরাইল-ফিলিস্তিন বিষয়টি মোটা দাগে ইহুদি মুসলমান দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা হলেও তা মূলত একমাত্র ধর্মীয় কারণ নয়। এর পেছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী ক্ষমতা ও অর্থের স্বার্থ। আমেরিকা যখনই তার নিজ দেশে বা নিজ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমস্যায় পতিত হয় তখনই তারা বিশ্বের অন্য একটি অঞ্চলে আরেকটি সমস্যা তৈরি করে বিশ্ব জনগণের দৃষ্টি বিভ্রান্ত করে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ও ইরাকের বর্তমান দাঙ্গা-হাঙ্গামা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি ফেরাতে গাজা বা ফিলিস্তিনে একটি সমস্যা তৈরির প্রয়োজন ছিল তাদের। বিশ্বের মনোযোগ ইসরাইল গাজার দিকে নিবদ্ধ রেখে ইরাকে নতুন করে কোন খেলা খেলবে আমেরিকা তা ঠাহর করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে আমেরিকা বা তার মিত্রদের সৃষ্ট কোনো সমস্যার আড়ালে দীর্ঘকালের আরেকটি সমস্যা তৈরির পাঁয়তারা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি পুরানো ও চেনা আচরণ।

আজ আবার ফিলিস্তিনের নারী শিশু হত্যা করে নতুন কিছু একটি ঘটানোর ফন্দিতে আছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ইজরাইলের সীমানা বৃদ্ধি বা নতুন বসতি স্থাপনের আগে অতীতেও ইজরাইল ফিলিস্তিনে এরূপ হামলা পরিচালিত করেছে। তারপরে যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবের আড়ালে নিজ দেশের আয়তন বৃদ্ধি করেছে। এবারও সম্ভবত তেমন কিছু অথবা ইরাককে দুটুকরা করার একটি উদ্যোগ কার্যকর করার পথেই অগ্রসর হচ্ছে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি। তবে যারা যাই করুক ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন সব সময়ের জন্য অব্যাহত থাকবে। ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে থাকবে বাংলাদেশ ও তার স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ।

লেখকঃ  কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

শনিবার, ১২ জুলাই, ২০১৪

'ব্যাটারিচালিত রিকশা, পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা ও চালকদের অসহায়ত্ব'

সুপ্রভাত বাংলাদেশ 
 ১২ জুলাই ২০১৪ 
উচ্চ আদালতের একটি রায়ে আপাতত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারল ভুক্তভোগী নগরবাসী।এই রায়ের
ফলে বিতর্কিত ও অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে প্রশাসন।অনুমোদনহীন এসব রিকশা মালিকদের করা রিট মামলা গত বৃহস্পতিবার খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট।

২০১১ সালের ২৪ জানুয়ারি বিনিয়োগ বোর্ড বিভাটেক লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৪০০টি অটোরিকশা প্রস’ত বা সংযোজনের অনুমতি দেয়। ২০১২ সালের শুরু থেকে রাস্তায় চলাচল শুরু করে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা। ২০১৩ সালে রিকশার মালিকরা লাইসেন্সের জন্য সিটি কর্পোরেশনের কাছে আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে স’ানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চায়। কিন’ টেক্সাশন রুলস এর বিধান ও স’ানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর বিধানে এমন রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম না থাকায় ২০১৩ সালের জুলাই মাসে স’ানীয় সরকার মন্ত্রণালয় লাইসেন্স না দেওয়ার নির্দেশ দেয় সিটি কর্পোরেশনকে।

অন্যদিকে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ধারা-২৫ অ্যাক্ট অনুযায়ী রিকশার রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার বিধান না থাকায় বিআরটিএ এসব রিকশার রেজিস্ট্রেশন না দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপরে এসব রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস’া নিতে চাইলে রিকশা মালিকরা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিবাদি করে একাধিক রিট পিটিশন করে। এতদিন রিট আবেদনের ফয়সালা না হওয়ায় এসব রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস’া নিতে পারেনি প্রশাসন। এখন রায়ের পূর্ণকপি হাতে পেলে কার্যকর ব্যবস’া গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন।

বিগত বেশ কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। হঠাৎ করে নগরে এ ধরনের রিকশা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনার সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় অস্বাভাবিক হারে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যমতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের প্রায় ৭০ শতাংশই এ ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশার যাত্রী। এই রিকশায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হারও কম নয়। যাত্রী ছাড়াও অনেক সময় চালক নিহত হওয়ার ঘটনাও অনেক।

এসব রিকশা ব্যাটারি বা যন্ত্রের সাহায্যে গতি বৃদ্ধি করা হলেও গিয়ারবিহীন ও হ্যান্ডব্রেক হওয়ার কারণে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তাছাড়া সনাতনরিকশা ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অটোরিকশার চেয়ে বেশি হওয়ায় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রশিক্ষণহীন চালকদের আয়ের উৎস হয়ে ওঠে এসব রিকশা। ট্রাফিক নিয়মকানুন না জানা ও প্রশিক্ষণের অভাবে তাই প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায় এরা। ফলে গত এক দেড় বছর ধরে বিভিন্ন মহল থেকে এসব রিকশা বন্ধ করার দাবি জোরালো হতে থাকে। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম হলেও সাধারণ মানুষ এই রিকশা চলাচল বন্ধের পক্ষেই থেকেছে।

একটি আধুনিক নগরে কী ধরনের যানবাহন চলাচল করবে তা নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেবে যথাযথ কর্তৃপক্ষ। নগর ও নাগরিকদের উপযোগী যান চলাচলের ব্যবস’াই সাধারণত গ্রহণ করা হয়। কিন’ স্বাধীনতার চার দশক পরেও দেশের নগরগুলোতে সমন্বিত একটি পরিবহন নীতি গড়ে ওঠেনি। গড়ে ওঠেনি গণপরিবহন ব্যবস’াও। ফলে এক্ষেত্রে বিরাজ করছে চরম অব্যবস’াপনা। এর ফলে নগরীর সৌন্দর্য, শৃঙ্খলাহানির পাশাপাশি যাত্রীরাও পড়েছে সংকটে।

একটি অনিয়ম সাধারণত অনেক অনিয়মকে ডেকে আনে। যেমন একটি মিথ্যা অনেক মিথ্যার জন্ম দেয়। শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশাই নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি ছোট বড় শহরে এ ধরনের রিকশার ন্যায় অজস্র গাড়ি কিলবিল করছে রাস্তাঘাটে। কোথাও এদের নাম টমটম কোথাওবা অন্যনাম। এছাড়া মহাসড়কে অনেকদিন থেকে চলাচল করে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠলেও নসিমন ধরনের যান চলাচল বন্ধেও কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস’া গ্রহণ করতে পারেনি। মোট কথা নগরের অভ্যন্তরে বলুন বা এর বাইরে সড়ক- মহাসড়কগুলোতে বলুন যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ তা আর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই। এর ফলে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দেশের শীর্ষ তালিকায়।

ইতিমধ্যেই ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মহীন মানুষ ও কম আয়ের শ্রমিকরা বেশি উপার্জনের আশায় দলে দলে চলে এসেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটের মতো বড় শহরগুলোতে। ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের বেশির ভাগই এরা। ইতিমধ্যেই এদের অধিকাংশই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এসব রিকশার ওপর।

এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বিকল্প কর্মসংস’ানের ব্যবস’া না করে এবং বর্তমান রমজান মাস ও ঈদকে সামনে রেখে এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করাও (বর্তমানে) কতটা মানবিক হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে যাই হোক অনিয়ম যত দ্রুত সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করাই শ্রেয়। তবে এর পাশাপাশি যাত্রীদের কথা ভেবে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে বড় বড় শহরগুলোতে গণপরিবহন ব্যবস’া গড়ে তোলা। শুধু শহরেই নয় আন্তশহর যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গণপরিবহনকে একটি সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে আনা। দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস’া নাজুক। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত আছে সড়ক দুর্ঘটনা। মাত্র কয়েকদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় যে দশ ব্যক্তি প্রাণ হারালেন সে দুর্ঘটনা ঘটেছে চালকের অসতর্কতা ও গাফিলতির কারণে। বলা হয়েছে চলন্ত অবস’ায় চালক স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এমন ঘটনা নতুন নয়। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণের মধ্যে এটিও একটি। দুর্ঘটনা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে আমি শুধু একটি বিষয়েই একটু আলোকপাত করতে চাই।

অনেক তথ্য-উপাত্ত, গবেষণা ও বিচার বিশ্লেষণ করে একজন মানুষের দৈনিক শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ ঘণ্টা। এর বাইরে কাজ করলে তা ‘ওভারটাইম’ হিসেবে গণ্য হবে এবং তা করতে একজন শ্রমিক-কর্মচারী বাধ্য নন। একজন শ্রমিক তার আর্থিক প্রয়োজন ও শারীরিক সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে ‘ওভারটাইম’ করে থাকেন। তবে বাংলাদেশ ও এর মতো তৃতীয় বিশ্বের কোথাও কোথাও এর ব্যতিক্রম আছে। শ্রমিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং ওভারটাইমের পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করিয়ে নেন। আমার ধারণা বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে পরিবহন চালকরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হন। শুধু আট ঘণ্টা নয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একেকজন চালককে ২৪ ঘণ্টারও অধিক গাড়ি চালানোর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয়।

এই পরিস্হিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে দু ঈদ ও বিভিন্ন কারণে টানা ছুটির সময়ে। ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকে একজন চালক ড্রাইভিং সিটে বসার পর সে নিশ্চিত নয় কতঘণ্টা পর তার প্রয়োজনীয় বিশ্রামটি মিলবে। দূরবর্তী যাত্রায় তাদের অবস’া আরও বেশি সঙ্গীন হয়ে ওঠে। দীর্ঘ যানজট, সড়ক অব্যবস্থাপনা ও নানা স’ানে বিভিন্ন প্রকার চাঁদাবাজির মতো বিড়ম্বনা সহ্য করে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। দেশের অধিকাংশ যানবাহনে বদলি চালকের ব্যবস’া নেই। ব্যবস’া নেই তাদের বিশ্রাম, বিনোদন ও প্রাত্যহিক ক্রিয়াকর্ম সমাধা করার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালকের আসনে বসে থাকতে থাকতে একজন চালকের ক্লান্তি আসতেই পারে। এবং এ ক্ষেত্রে যে কোনো সময় ঘটতে পারে চরম দুর্ঘটনা।

উন্নত বিশ্বে নয় শুধু আমাদের দেশেও চালকদের এই পরিসি’তি বিবেচনা করা হয় যেমন সশস্ত্রবাহিনীর প্রতিটি গাড়িতে একজন ‘সেকেন্ড সিটার’ থাকেন। অর্থাৎ চালকের পাশের আসনে দ্বিতীয় আরেকজন চালক থাকা বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয় কত কিলোমিটার গাড়ি চালানোর পর একজন চালককে বিশ্রামের সময় দিতে হবে এবং কখন আরেকজন বদলি চালক গাড়ি চালাবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে এবং তারা তা যথাযথভাবে পালনও করে। তাই এক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীতে সড়ক দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

প্রতিটি মানুষেরই একটি মানবিক দিক থাকে। তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থাকে। একজন চালক যখন চালকের আসনে বসেন তখন তাকে এসব কিছু থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হয়। কিন’ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব। গন্তব্যে রওনা দিয়ে মাঝপথে যদি একজন চালক শোনে যে ঘরে তার কোনো স্বজন যেমন-সন্তান, স্ত্রী বা বাবা-মা অসুস’ তখন তার মানসিক অবস’া কী দাঁড়াবে। কোনো এক প্রান্তে নিরাপত্তাহীনভাবে রেখে আসা তার পরিবারের কথা ভেবে তার মানসিক অবস’া কী হবে তখন।

এ ক্ষেত্রে তার পরিবারের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস’া যদি থাকতো কিংবা একজন বদলি চালকের ব্যবস’া থাকলে হয়ত সে চালক নিশ্চিত হতে পারত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সে ধরনের কোনো ব্যবস’া গড়ে ওঠেনি। এতদিনেও তেমন ব্যবস’া গড়ে তোলার প্রয়োজন মনে করেনি কেউ। কাজেই চালকদের জন্য যদি আবাসন ব্যবস’া, বিশ্রামাগার ও তার প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি-ছাটার ব্যবস’া করা যেত সেক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনার হার ব্যাপকভাবে কমানো যেত।

হাইওয়ের পাশে চালকদের বিশ্রামাগার, বদলিচালক ও বিভিন্ন টার্মিনালগুলোর আশে-পাশে অথবা টার্মিনালকে বহুতলবিশিষ্ট করে চালক-হেলপারদের বিশ্রাম ও অবসর বিনোদনের ব্যবস’া করা যেতে পারে। দুর্ঘটনার সব দায় চালকদের ওপর না চাপিয়ে সরাসরি বেসরকারি উদ্যোগে চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস’া গ্রহণ করে সঠিক দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। দেশের এনজিওগুলো শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ঋণের দিকে না ঝুঁকে এবং সে সাথে স’বির হয়ে পড়া শ্রমিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারতো। কারণ দেশের বিদ্যমান পরিসি’তিতে এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।



লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 
Google+
http://www.suprobhat.com/?p=168798

বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০১৪

' পুকুর দীঘি রক্ষায় একজন মুনীর চৌধুরী চাই'

দৈনিক আজাদী                      উপসম্পাদকীয়              কাল আজ কাল
১০ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২৬ আষাড় ১৪২১ সাল ১১ রমজান ১৪৩৫ হিজরি
- কামরুল হাসান বাদল


দুই বিঘা জমি’ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রাম বাংলার এক অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন-
অবারিত মাঠগগনললাট চুষে তব পদধূলি
ছায়াসুনিবিড় শান্তির-নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ ।
স্তব্ধ অতল দীঘি কালোজল-নিশীথ শীতল স্নেহ।
বুকভরা মধু বাংলার বধূ জল লয়ে যায় ঘরে,
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে...’
এ চিত্র গ্রাম বাংলার চিরন্তন এক চিত্র। নদী পুকুর দীঘি ছাড়া গ্রামবাংলাকে কল্পনাও করা যায় না। কৃষি প্রধান দেশে দৈনন্দিন প্রয়োজন ছাড়াও পানীয় জলের একমাত্র উৎস ছিল তখন পুকুর দীঘি ও নদ-নদী। শুধু গ্রাম বাংলার নয় শহরে যখন পানি সরবরাহের জন্যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। চালু হয়নি নলকূপের প্রচলন তখন পুকুর দীঘি ও কূয়ার পানিই ছিল শহর এলাকার মানুষের একমাত্র জলের উৎস।

গ্রাম বাংলায় বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রতিটি বাড়িতে থাকতো একাধিক পুকুর। এর মধ্যে অন্তত দুটি পুকুর ছিল অপরিহার্য। একটি পুরুষদের ব্যবহারের জন্যে বাড়ির সামনে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় “ঘাঁডার পইর।’ বাড়ির সম্মুখভাগ বা প্রবেশ পথের প্রশস্ত আঙিনাকে চট্টগ্রামে ‘ঘাডা বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ বাড়ির সম্মুখের পুকুর। আরেকটি পুকুর থাকতো বাড়ির পেছনে যাকে বলা হয় ‘বাড়িচের পইর।’ ‘বাড়িচ’ মানে বাড়ির পেছনের অংশ। এই পুকুরে বাড়ির নারীরাই স্নান ও কাপড় চোপর ও অন্যান্য ধোয়ার কাজ সারতো। এ ছাড়াও বড় বড় বাড়িতে আরও দু একটি পুকুর থাকতো। এর মধ্যে ‘ভিতুর পইর’ বা ভিতরের পুকুর নামেও পুকুর থাকতো। এছাড়া কয়েকটি বাড়ি মিলে বা পাড়ার মাঝখানে আরেকটি বড় ধরনের পুকুর থাকতো যে পুকুরগুলোকে ‘বড় পইর’ ‘বড়ঢি’ বড় পুকুর বা বড় দীঘি বলা হতো। সাধারণত মুসলিম পাড়াগুলোয় এমন বড় পুকুর বা বড় দীঘির পাড়ে নির্মাণ করা হতো মসজিদ এবং মসজিদের পাশে দীঘি বা পুকুরের পাড়েই থাকতো ওই পাড়ার কবরস্থান। সাংসারিক-কাজ-কর্ম ছাড়াও এই দীঘি ও পুকুর থেকে গ্রামবাসীরা তাদের পানীয় জল সংগ্রহ করতোটিউবওয়েল প্রচলনের আগে। হিন্দু বাড়ি চিত্রও ছিল অনেকটা একই ধরনের। শ্মশানের জন্য নদীর পাড় দূরবর্তী হলে অনেক সময় বড় বড় পুকুর বা দীঘির পাড়ে চিতার ব্যবস্থা হতো। কারণ শ্মশান থেকে ফেরার সময় হিন্দুদের স্নান করা ধর্মীয় আচার। এছাড়া তৎকালীন জমিদার ও অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের উদ্দেশ্যে পথের পাশে পুকুর ও দীঘি খনন করতেন। কোনো কোনো দানশীল ব্যক্তি পথে পথে বিশ্রামের জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়া ছাড়াও সেখানে মাটির কলসিতে পানি রাখার ব্যবস্থা করতেন পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। বলা বাহুল্য এখনকার অধিকাংশ বিত্তবানরা এসব পুকুর দখল করে ভরাট করেন আর আলীশান দালান তৈরি করেন নিজেদের ভোগের জন্য। পুকুর দীঘির অস্তিত্ব শুধু গ্রামে নয় শহরেও ছিল। শহরেও প্রতিটি বাড়ির সাথে এমন কয়েকটি পুকুর থাকতো এখনও খোঁজ নিলে শহরের কিছু কিছু এলাকায় পুরনো বাড়িগুলোর পাশে পুকুর বা এর অস্তিত্ব বোঝা যায় । একটি বেসরকারি তথ্যসূত্রে জানা যায় শুধু চট্টগ্রাম শহরেই এমন পুকর দীঘির সংখ্যা ছিল চার হাজারেরও অধিক। এখন এই শহরে পুকুর দীঘির সংখ্যা ৪০টিও হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে গত শতাব্দির আশির দশক থেকে মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হতে থাকে। কর্মসংস্থানশিক্ষাচিকিৎসানিরাপত্তা ও আরাম-আয়েসের লোভে দলে দলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় জমিয়েছে। এই চট্টগ্রাম শহরেই মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে জনসংখ্যা অর্ধকোটি ছাড়িয়ে গেছে। এত বিপুল সংখ্যক লোকের আবাসন চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে জায়গা-জমির দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে আর সে লোভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে হাজার হাজার পুকুর জলাশয় দীঘি। রাতারাতি পুকুর-জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনমার্কেট ও কল-কারখানা। আর বর্তমানে আবাসন ব্যবসার লোভনীয় প্রস্তাবে পুকুর ভরাট করে প্লট তৈরি অনেক লাভজনক হওয়ায় যে পথেই ধাবিত হয়েছে অনেকে।

এভাবে পুকুর জলাশয় ভরাট করে পুরো শহর ইট সিমেন্টের জঞ্জালে পরিণত করায় কমে গেছে পানির উৎসকমে গেছে বর্ষায় পানি ধারণের ক্ষমতা। ফলে একটু বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে শহর অন্যদিকে একটু রোদেই অসহনীয় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পরিবেশ। প্রায় পুরো শহর ইট-কংক্রিটের জঞ্জাল করতে গিয়ে কোথাও খালি জায়গা না রাখায় বৃষ্টি বা বর্ষা মৌসুমে মাটি পানি শোষণ করতে পারে না। অন্যদিকে অর্ধকোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যথেচ্ছারভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নামতে নামতে প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। শহরে শুধু নয় একই পরিস্থিতি গ্রামেও বিদ্যমান হওয়ায় সেখানেও অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানির নাগাল পাওয়া যায় না। শীতকাল শুরু হতেই শুকিয়ে যায় পুকুর দীঘিগুলো। এক্ষেত্রে আরেকটি আত্মঘাতী কাজ চলছে কয়েক দশক ধরে। তা হলো কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ভূগর্ভস্থ পানির উৎস যেভাবে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পানীয় জলের সংকট মোকাবেলায় এখন থেকেই সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প সেচের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বলছিলাম শহরের পুকুর-দীঘির কথা। গত শুক্রবারে আমার এক আত্মীয়ের জানাজার জন্যে গিয়েছিলাম বলুয়ার দীঘির পাড়ে কোরবানীগঞ্জ জামে মসজিদে। জুমার নামাজের পরে জানাজার নামাজ শেষে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে বলুয়ারদীঘির বর্তমান অবস্থা দেখে আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিবাকরুদ্ধ হয়েছিক্ষুব্ধ হয়েছি। কোরবানীগঞ্জ মসজিদটি বলুয়ার দীঘির দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিতশুধু এ কারণে দক্ষিণ পাড়ের মসজিদের অংশটি ছাড়া দীঘির চতুর্পার্শ্ব অনেকটাই দখল হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দীঘির ভেতরে ১০ থেকে ২০ হাত দখল করে বহুতল ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবে অবৈধ দখলে দীঘির অন্তত ৩০ ভাগ অংশই “নেই” হয়ে গেছে। এখন দীঘির পাড় বলতে কিছু নেইপানির উপরের বিভিন্ন স্থাপনা দেখে যে কারও মনে হতে পারে এটি নিতান্তই একটি পরিত্যক্ত জলাশয়। দখলের এই প্রক্রিয়া এখনই বন্ধ করা না হলে শহরের মানচিত্র থেকে হাজারো পুকুর-দীঘির মতো প্রাচীন বলুয়ার দীঘিও হারিয়ে যাবে। অথচ একটি সময়ে এই দীঘি ছিল কোরবানীগঞ্জখাতুনগঞ্জআছাদগঞ্জ,ঘাটফরহাদবেগসহ ব্যাপক এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের অন্যতম প্রধান জলের আধার। ওই এলাকার অনেক পুকুর-দীঘি ভরাট করে ফেলা হলেও এখনও কোনোমতে থাকায় এর আগে পাশে বিস্তীর্ণ এলাকার অগ্নি নির্বাপণের জলের প্রধান উৎসও এখন শুধুমাত্র বলুয়ারদীঘি। এখনও প্রতিদিন কয়েক’শ মানুষ এই দীঘির পানি ব্যবহার করে গোসলসহ অন্যান্য কাজে।

এই শহরে এই দীঘির মতো আর মাত্র কয়েকটি দীঘি-পুকুর বিদ্যমান আছে তার মধ্যে আশকার দীঘিরানির দীঘিআগ্রাবাদের ঢেবা দীঘিরেলওয়ের জোড়া দীঘিচকবাজারের মুন্সী পুকুর ইত্যাদি। অনেক লেখালেখির কারণে আশকার দীঘি সংস্কার করা হয়েছে। স্থানীয় কিছু পরিবেশ সচেতন নাগরিকের আন্দোলনের কারণে ভরাট হওয়ার হাত থেকে বেঁচেছে চকবাজারের মুন্সী পুকুর। তবে পরিস্থিতি দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না কর্তৃপক্ষ এখন থেকে আরও বেশি কঠোর না হলে এগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হবে না। উল্লেখিত পুকুর ও দীঘি ছাড়া শহরে এখনও যা টিকে আছে তা রক্ষা করতে হলে কালবিলম্ব না করে খুব দ্রুত এসব দীঘি ও পুকুরকে ‘ন্যাশনাল হ্যারিটেজ’ বা ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ ঘোষণা করতে হবে। তবে তার আগে এসব দীঘি ও পুকুরগুলো সরকারকে অধিগ্রহণ করতে হবে এবং তা করতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। কথায় বলে ‘মানুষ পিতৃশোক ভোলে সম্পত্তির শোক ভোলে না’তাই অধিগ্রহণ করার আগে সম্পদের মালিকদের প্রাপ্যমূল্য তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে অধিগ্রহণ করার আগে এসব পুকুর ও দীঘির সঠিক খতিয়ান অনুযায়ী অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে জলাধারগুলোকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে।

আমরা জানি কাজটি কঠিন তবে অসাধ্য নয়। শুধু একজন সৎদক্ষ ও সাহসী ব্যক্তির প্রয়োজন। মনে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রেষণে থাকাকালীন দেশখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট (এ নামেই তিনি বিখ্যাতমুনীর চৌধুরী অভিযান চালিয়ে বন্দরের বেদখল হওয়া কয়েক’শ কোটি টাকার সম্পদ বন্দরের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছিলেন। মনে পড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ম্যাজিস্ট্রেট-ইনফোর্সমেন্ট থাকা অবস্থায় অনেক রাঘব-বোয়ালের শিল্প-কারখানাকে পরিবেশ বিনষ্টের দায়ে জরিমানা করে ইটিটি স্থাপনে বাধ্য করেছিলেন। এখনও তিনি মিল্ক ভিটার মতো দুর্নীতিগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। চট্টগ্রাম নগরীর হারিয়ে যেতে বসা জলাধারগুলো রক্ষার জন্যে একজন মুনীর চৌধুরীর বড্ড প্রয়োজন। কয়েকদিন আগে সার্কিট হাউসে ম্যাজিস্ট্রেটদের একটি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেনণ্ড বন্দরের সম্পত্তি রক্ষার অভিযানের সময় তাঁকে দু’কোটি টাকা উৎকোচ প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কাজেই একবার অন্তত তাঁকে এ দায়িত্বটি দিলে অনেক বিপর্যয়ের হাত থেকে চট্টগ্রামবাসী রক্ষা পাবে।

তারুণ্যের প্রথম লগ্নে আমি এই বলুয়ারদীঘির পাড়ে এসেছিলাম। আমার জীবনের একটি সোনালী সময় আমি এখানে অতিবাহিত করেছি। এই দীঘির বিশুদ্ধ বাতাসে নিজের ফুসফুসকে সতেজ করেছি। অনেকবার স্নান ও সাঁতার কেটেছি এর স্বচ্ছ জলে। কাজেই আমার স্মৃতিবাহী এই দীঘির অপমৃত্যু আমি দেখতে চাই না। এই লেখাটি প্রকাশের পরে ওই এলাকার আসার অনেক স্বজন ও বন্ধু আমার ওপর বিরূপ হবেনঘৃণা ও তাচ্ছিল্যে ভ্রু কোঁচকাবেন আমায় দেখে। আমি আমার সে স্বজন-বন্ধুদের জানাতে চাই আমার ব্যক্তিগত কোনো লাভালাভের বিষয় নেই এখানে। যারা অবৈধ দখলে দূষণে এই দীঘিকে হত্যা করে তার বিনিময়ে ইমারত নির্মাণ করতে চানসন্তান-সন্ততির জন্যে নিরাপদ ভবিষ্যত নির্মাণ করতে চান তারা যে পক্ষান্তরে তাদের উত্তরসূরির জন্য একটি দোযকের দরজা খুলে দিচ্ছেন আমি শুধু সে দোযকের যন্ত্রণা থেকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিলাম।
দখলে দূষণে আর পরিবেশ বিপর্যয়ে এ দেশ যে দোযকের দিকেই যাচ্ছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ