পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৩

'জিবরান কাহলিলের গল্প ও অন্যান্য'


৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৬ কার্তিক ১৪২০ সাল ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
তোমারে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে। একটু কঠিন হয়ে গেল সাধারণ পাঠকদের জন্যে। এর ব্যাখ্যা পরে দিচ্ছি, আগে আরেকটি বলি-ডিমকে বলছে মুরগির ছানা, আরে দোস্ত তোমারে তো দেহি পোছ (পোচ) বানাইয়া ফালাইছে -হি - হি- হি। শুনে ডিম বলছে, ‘আমারে তো পোছ বানাইছে কটা দিন সবুর লও, দেহনা তোমারে কেমন চিকেন রোস্ট বানায়। যারা এখনও ধরতে পারেননি কী বলতে চাইছি, তাদের জন্যে আরেকটি গল্প।

নিজেদের রাজ্য ছেড়ে দু’বন্ধু বেরিয়ে পড়ল শান্তির খোঁজে। এমন যেতে যেতে একদিন তারা উপস্থিত হলো এক আজব রাজ্যে। তারা দেখতে পেল সেখানে সব কিছু সস্তা। এমন কি তেলের দামেই ঘি বিক্রি হয়। প্রথম বন্ধু তা দেখে মুগ্ধ। দ্বিতীয় বন্ধুকে বলল, ‘দোস্ত এমন দেশতো আর হয় না। তেলের দামে ঘি। এ রাজ্যে থেকে যাবো, তেলের বদলে ঘি খাব শুধু। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘মাথা খারাপ যে দেশে তেলও ঘিয়ের দাম একই সে দেশে আমি থাকব না। এ দেশে কোনো আইনশৃঙ্খলা নেই। ভালোর মূল্য নেই। প্রথম বন্ধু নাছোরবান্দা সেই থাকবেন আর দ্বিতীয় বন্ধু থাকবে না। শেষে প্রথম বন্ধু বলল, তাহলে আমি থেকে যাই তোমার না পোষালে যাউগা।’ প্রথম বন্ধু চলে গেল অন্য রাজ্যে। এদিকে তেলের দামে ঘি পেয়ে খেয়ে খেয়ে প্রথম বন্ধু দিন দিন প্রশস্ত হতে থাকল। এভাবে দিন যায়। হঠাৎ সে রাজ্যে একটি খুনের ঘটনা ঘটল। কিন্তু খুনিকে পাওয়া গেল না কোনো ভাবেই। রাজাতো রেগে-মেগে আগুন। আমার রাজ্যে খুন হবে আর বিচার হবে না। উজির-নাজির আমাত্য বর্গ ঘেমে নেয়ে একসা। কী আর করা, যে কাউকে তো শাস্তি দিতে হবে। শেষে সিদ্ধান্ত হলো রাজ্যের সব চেয়ে মোটা ব্যক্তিটিকে ধরে এনে শূলে চড়ানো হবে। রাজ্যে খোঁজ পড়ে গেল মোটা মানুষের। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ওই প্রথম বন্ধু যে খেয়ে দেয়ে বেশ মোটা তাজা হয়েছিল। তাকে ধরে আনা হলো শূলে চড়ানোর জন্যে। এদিকে দ্বিতীয় বন্ধু অনেক দিন পরে বন্ধুর খোঁজ নিতে এসে দেখে এই কাণ্ড। অনেক ফন্দি ফিকির করে প্রথম বন্ধুকে বাঁচাতে সক্ষম হয় সে।

এবার শেষ গল্পটি বলি। এটি জিবরান কাহলিলের। পাহাড়ের উপত্যকায় মা মেষ তার শাবকদের নিয়ে খাদ্য অন্বেষণ করছিল। এমন সময় মা মেষ খেয়াল করল একটি বাজপাখি উড়ে আসছে তার শাবকদের দিকে। সে তার শাবকদের আগলাতে আগলাতে খেয়াল করল আর একটি বাজপাখি এসে প্রথম পাখিটিকে বাধা দিচ্ছে। এ নিয়ে দু পাখির মধ্যে লেগে গেল তুমুল যুদ্ধ। শাবকরা মাকে বলছে তখন। মা ওরা দুজন কি আমাদের খেয়ে ফেলতে আসছে। শুনে মা বলল, বাছা তোমরা এখনও বুঝতে পারছো না এদের মধ্যে কে তোমাদের খেতে আসছে আর কে রক্ষা করতে আসছে।

প্রিয় পাঠক প্রতি সপ্তাহে রাজনীতি নিয়ে না লিখে আজকে শুধু কাহিনী ও কাহিনীর অংশ বিশেষ শোনালাম। তবে হ্যাঁ, লেখা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রতিটি কাহিনীর মধ্যে একটি শিক্ষনীয় বিষয় থাকে, আজকে অন্তত সে টুকুই আলোচনা করি। উল্টো দিক থেকে আসি।

জিবরানের গল্প-বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল্য করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি তারা মেষ শাবকদের মতো বুঝতে পারছে না কোন বাজ পাখিটি তাদের গ্রাস করতে চায়। আর কোনটি তাদের বাঁচাতে চায়।

দু বন্ধুর গল্প যে দেশে তেল ও ঘি অর্থাৎ ভালো-মন্দের একই ফল সে দেশ বাসযোগ্য নয়। সে দেশে কোনো বিচার নেই। ভালো-মন্দ সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা থাকে না জনগণের। তারা বোকা। মন্দ লোকের কথায় তারা সহজে বিভ্রান্ত হয়। মন্দরা দেশ শাসনের সুযোগ পায়। গুণীরা কদর পায় না। নায়কেরা পরাস্ত হয় ভিলেনের কাছে। ডিম ও মুরগি ছানার গল্প-অনেক কিছু মিলে বর্তমান সরকার একটু বেকায়দায় পড়েছে। বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম হাতে নিয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে বেশ পোক্ত হওয়া জামায়াতের নেতাদের বিচার খুব সহজ সাধ্য নয় তা এখন টের পাচ্ছে সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ চাপের মধ্যে এই বিচার কাজ চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যেও অনেক ভাবে এই বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরপর জামায়াত-শিবির নৈরাজ্য ও ধ্বংস লীলা চালিয়েছে দেশে। সরকারের মেয়াদ শেষে তারা এখন অসম্ভব বেপরোয়া। গত ৬০ ঘণ্টার হরতালে ব্যাপক বোমাবাজি করা হয়েছে দেশজুড়ে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক থেকে শুরু করে সাক্ষী ও সমর্থক এমন কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় ও কর্মীদের ওপরও বোমা হামলা ও আক্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও আক্রমণের শিকার হচ্ছে আওয়ামী, যুব ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে মৃত্যুবরণও করেছে অনেকে। অনেককে না পেয়ে তাদের বসত বাড়িতেও আগুন দেওয়া হচ্ছে। মোট কথা সরকারের শেষ সময়ে এসে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ দূরত্বে থেকে কিছু কিছু ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপহাস করছেন। যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করতেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিলম্ব হচ্ছে বা করছে বলেন সরকার তথা আওয়ামী লীগকে গালাগাল করতেন তাদের উদ্দেশ্যে পোচ করা ডিমের ভাষায় বলি, এবার ক্ষমতায় গেলে লীগের ছেলেদের হয়ত পোচ করা হবে ঠিকই কিন্তু অন্যদের যে চিকেন ফ্রাই হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে সে কথাটি বলে রাখি।

প্রথম উদ্ধৃতি যা বহুল প্রচলিত তা নিয়ে বিশদ বলতে হয়। বর্তমান বিএনপির কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচি দেখে মনে হয় এই দলটি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারছে না। কোথাও কোনো শক্তির কাছে এর দায়বদ্ধতা আছে। আজকাল এই দলের কর্মসূচিতে জঙ্গিরূপে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির। তাদের বিশেষ সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ মঞ্চ নির্মাণ থেকে শুরু করে এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা। এমনকি সমাবেশের প্রথম বক্তাও ছিলেন শিবিরের এক নেতা। সে সমাবেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত জামায়াতের সকল নেতার মুক্তি দাবি সম্বলিত সচিত্র ব্যানার ফেস্টুন শোভা পেলেও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলিমের মুক্তি বা তাদের নিয়ে কোনো ব্যানার ফেস্টুন দেখা যায়নি। বিএনপি বা ছাত্রদলের কর্মী সমর্থকদের কখনও বেপরোয়া আচরণ করতে দেখা যায় না। অথচ গত এক বছর ধরে বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রামে বেশ ধ্বংস নৈরাজ্য দেখা গেছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে এসবের সাথে জড়িতদের অধিকাংশই জামায়াত-হেফাজতের কর্মী। বিএনপি বা ছাত্রদলের নয়। ছাত্রদলের রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেছেন তারাও এর সাথে একমত পোষণ করবেন বলেই আমার ধারণা। অর্থাৎ এক সময়ের মধ্য পন্থার দল বা মডার্ন ইসলামিক দল বিএনপি এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অতি মাত্রায় নির্ভর করছে এই ধরনের জঙ্গি ও চরমপন্থী দলের উপর। যা আখেরে বিএনপিরই সর্বনাশ ডেকে আনবে।

যে শক্তি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। বাম স্বাধীনতা বা অন্যের মতামতকে সহ্য করে না। নারী স্বাধীনতা ও জাগরণে বিশ্বাসী নয় তেমন একটি শক্তির সাথে গাঁটছড়া বেধে বিএনপি কতদূর যেতে পারবে। এই শক্তিতো নারী নেতৃত্বেও বিশ্বাসী নয়। নারী শিক্ষায় তো নয়-ই।

আজ ক্ষমতায় না থেকেও দেশব্যাপী এদের যে তাণ্ডব, এদের সাথে জোটগতভাবে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি রাশ টেনে রাখতে পারবে? না কি এদের গর্ভেই বিলীন হয়ে যাবে একদিন। কিন্তু বিএনপির মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল কেন এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দেশের মধ্যপন্থার বিশাল একটি জনসমর্থন রয়েছে এ দলটির প্রতি। দুবার তারা গণতান্ত্রিক পর্যায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও গেছে। এ কথাগুলোও আজ লিখতাম না যদি না খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সাথে দেখা করে বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদের আশ্রয় না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিতেন। বলতাম না যদি তিনি অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বলে প্রতিশ্রুতি না দিতেন। যদি না তিনি তাঁর সন্তান তারেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত জঙ্গি কানেকশানের সংবাদকে মিথ্যা না বলতেন।

আসলে বলা উচিত ছিল, ‘তোমারে বধিবে যে, জোটেই বাড়িছে সে।’

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৩

'রাজনৈতিক সংকট নাকি ‘ইগো’ সংকট'

২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি, ৯ কার্তিক ১৪২০ সাল, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
২৫ অক্টোবর দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে, আদৌ নির্বাচন হবে কি না, হলেও কেমন সরকার ব্যবস্থায় ও কার অধীনে হবে- এতোসব সংকট ও প্রশ্ন নিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন প্রবল উৎকণ্ঠায় সে সময় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন। তাঁর দেওয়া প্রস্তাবে তিনি সরকারি দলের বাইরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নাম চেয়েছেন নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রীসভার জন্য। এ বিষয়ে তিনি বিরোধী দলের নেতার সহযোগিতাও চেয়েছেন। অর্থাৎ সরকারি দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনেই নির্বাচনের প্রস্তাব পেশ করেছেন।

সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনের পরে অবশ্য এছাড়া উপায়ও নেই। কারণ বর্তমান সংবিধান মোতাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সুযোগ নেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চায় না। তারা কোনো অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক নয়। কাজেই তারা তাদের অবস্থান থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার একটি রূপরেখা দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের ভাষণে এবং তার আগে-পরে তিনি নিজে কখনও সেই সরকারের প্রধান থাকবেন বলে দাবি করেন নি। যদিও তাঁর দলের কয়েকজন মন্ত্রী ও নেতা এ ধরনের দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরে দেশের রাজনীতি মহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল। ‘অনেকে বরফ গলতে যাচ্ছে’, ‘সংকট উন্মোচনের পথ খুলছে’ ইত্যাদি বাক্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এমনকি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন, তারাও প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে বিএনপির জন্য একটি এক্সিট পয়েন্ট হিসেবে মন্তব্য করেছে।

এরপরে গত সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া পাল্টা আরেকটি রূপরেখা ঘোষণা করেন। প্রস্তাবে তিনি বিগত ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক ২০ উপদেষ্টার মধ্যে থেকে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। সরকারি দলের পাঁচ ও বিরোধী দলের পাঁচ মোট ১০ জন উপদেষ্টা ছাড়া সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত নাগরিককে ওই সরকারের প্রধান করারও প্রস্তাব করেন তিনি। অর্থাৎ তিনি তাঁর দাবি অনুযায়ী পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথাই তুলে ধরলেন পুনর্বার।

বিরোধী দলের নেতার এই বক্তব্যের পর সংকট আবার ঘনীভূত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ তাঁর সেদিনের সংবাদ সম্মেলনের প্রদত্ত ভাষণ বা নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা প্রদান যে আকস্মিক ও ভাবনা-চিন্তা তা ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ১৮ দলীয় জোট বিরোধীদের তো বটেই এই জোটেরও কারো কারো কাছে তা কৌতূকের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১৩ ও ১৭ বছর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবকে অনেকে প্রলাপ ও অবিবেচনা প্রসূত বলে আখ্যায়িত করেছেন ইতোমধ্যেই। তাঁর এই ধরনের প্রস্তাবের পরপরই খোঁজ পড়ে যায় এই দুই সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা এখন কোথায় ও কী অবস্থায় আছে। তথ্য উপাত্ত ও খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল দুই সরকার মিলে উপদেষ্টা ছিলেন ১৮ জন। কারণ ২ জন দু’সরকারেই ছিলেন। এর মধ্যে ৬ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনজন অনীহা প্রকাশ করেছেন আর ছয় থেকে আটজনের উপদেষ্টা হওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। তাহলে উপদেষ্টা হওয়ার মতো বাকি থাকলো ক’জন। তবে এই লেখাটি তৈরি করার সময় পর্যন্ত মঙ্গলবার মধ্যরাতে একটি চ্যানেলের পর্দায় একটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় একটি সংবাদে দেখলাম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হয়েছেন। তিনি বলেছেন যেহেতু ১৭ বছর আগে তিনি একবার উপদেষ্টা হয়েছিলেন সেহেতু এত বছর পর আবার উপদেষ্টা হওয়া তাঁকে মানায় না। কাজেই প্রধান উপদেষ্টা করা হলে তিনি রাজি আছেন। তাঁর দাবি অযৌক্তিক নয়, ১৭ বছরে একজন মানুষ পদোন্নতি চাইতেই পারেন।

বিরোধী দলীয় নেত্রীর এই প্রস্তাব যে আকস্মিক ও তা বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী বৈঠকে উত্থাপিত ও আলোচিত নয় তাও তুলে ধরেছে একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিক। ওই পত্রিকার কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বীকার করেছেন, সংবাদ সম্মেলনে নেত্রী কী প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন তা তারা (এমন অন্তত ছয়শ) জানতেন না। প্রস্তাব প্রদানের সময় তাই তারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলেন। অর্থাৎ বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে,খালেদা জিয়ার এই রূপরেখাটি সুচিন্তিত নয়। তা তড়িঘড়ি করেই কেউ কেউ প্রস্তুত করে দিয়েছেন। যেহেতু শেখ হাসিনা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন সেহেতু খালেদা জিয়াকেও একটি প্রস্তাব দিয়ে রাখতে হবে, তা যাই হোক না কেন।

এসবই হচ্ছে আমাদের রাজনীতিকদের ‘ইগো’ সংকট। কেউ কারো কাছে হারতে রাজি নয়। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবটি সংবিধান সম্মত নয়। এটি তাঁর না বোঝার কারণ নেই। তবুও তিনি তাই বলবেন। কারণ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য খালেদা জিয়ার সরকারকে বাধ্য করেছিল। তাই তিনিও শেখ হাসিনাকে বাধ্য করতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে। ২০০৬ সালে বিচারপতি এম আর হাসানের অধীনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যায় নি, কাজেই তিনিও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। অন্যদিকে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামি ও তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির তৈরি হয়ে আছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত ঘটনার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য। ২৫ তারিখ ঢাকায় সমাবেশে দা-কুড়াল নিয়ে উপস্থিত থাকার আহবানের মধ্যে সে ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যেই একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে সে উদ্দেশ্যে শিবিরের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

পাল্টা রূপরেখা না দিয়ে বরং খালেদা জিয়া ও তার জোট প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নিয়েই আলোচনায় যেতে পারতেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ওই সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়েই আলোচনা হতে পারতো বা হওয়া বাঞ্ছনীয়। শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারে নির্বাচিত পাঁচ-পাঁচ সদস্য ছাড়া সরকার প্রধান হিসেবে কাকে মনোনীত করা যায় তা নিয়ে দর কষাকষি হতে পারতো। খালেদা জিয়া যেহেতু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না সেক্ষেত্রে বিকল্প নাম প্রস্তাবের দায়িত্ব বিএনপিরই। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ও গত মঙ্গলবার যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন জাতির কল্যাণে শেখ হাসিনা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

খালেদা জিয়ার অন্তঃসার শূন্য পাল্টা প্রস্তাবের চেয়ে শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনেক বেশি বাস্তব ও সংবিধান সম্মত। জয়-পরাজয় ও ইগো সমস্যায় না ভুগে বিএনপি ও তার সমর্থকদের উচিত হাসিনার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সরকার প্রধানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকলে বিএনপি আখেরে লাভবান হবে বলে মনে হয় না। কারণ ১৯৯৬ সালের বাস্তবতা ও ২০১৩ সালের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। আর কোনো কারণে যদি দেশে নির্বাচন না-ও হয় সেক্ষেত্রেও লাভবান হবে বর্তমান সরকার, বিএনপি নয়। নির্বাচন হতেই হবে এবং সে নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি নিয়ে সংঘাত না করে একটি স্থায়ী সমাধান বা প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে। আমি আমার পূর্বের অনেক লেখায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। তাকেই কীভাবে স্বাধীন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করা যায় সে চেষ্টাই করা উচিত। নির্বাচনকালীন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করে খুব সহজে অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব। এছাড়া বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে নির্বাচনে কারচুপি বা অন্যভাবে প্রভাব বিস্তার কতটুকু সম্ভব তা ভেবে দেখতে হবে। মাগুরার মতো ভোট ডাকাতি এখন কোনো দলের পক্ষেই করা সম্ভব নয়। করলেও তা আড়াল বা ‘হাইড’ করারও সুযোগ নেই।

যারা একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরে শুধু মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে চাঁদে দেখা গেছে গুজব রটিয়ে সারা বাংলাদেশে ছোট খাটো কিয়ামত সৃষ্টি করতে পারে তাদের সাথে ভোট কারচুপি করে বর্তমান সরকার দেশে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৩

'বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন?'

দৈনিক আজাদী             উপসম্পাদকীয়                কাল আজ কাল
৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৮ আশ্বিন ১৪২০ সাল ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী

মোমিন রোডের একটি দোকান থেকে পরিবারের যাবতীয় ওষুধ কিনতাম। দোকানটি চেরাগি থেকে বাসায় আসা-যাওয়ার পথের ধারেই। একদিন লক্ষ করলাম দোকানি তার পরিত্যক্ত বাক্স ও কার্টুনগুলো ফুটপাতেই ছুঁড়ে মারছে। ফলে তার দোকানের সামনে প্রায়ই আবর্জনা পড়ে থাকে। এর প্রতিবাদে তার দোকান থেকে ওষুধ কেনা ছেড়ে দিয়েছি।

শুধু এই দোকান বলে নয়। চট্টগ্রামে এমন কোনো দোকান বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না যার সামনের ফুটপাতের অংশটি জনগণের চলাচলের জন্য অবাধ ও নির্বিঘ্ন। আর যদি পাওয়া যায় তা আমি দেখতে যাব। আন্দরকিল্লার মোড় থেকে ডিসি হিল হয়ে নন্দনকানন পর্যন্ত মোমিন রোডের এই ফুটপাতটির মতো এত বহুমাত্রিক ব্যবহার্য ফুটপাত চট্টগ্রামে আর আছে কিনা তা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। পেঁয়াজআলুটমেটোধনেপাতাকলালুঙ্গিগেঞ্জিশাড়িশাকবাতের ওষুধপান সুপারির দোকানলেবুকলাসূতিকার ওষুধ নেহারি-তেহারি হালিমচনাপিঁয়াজুঘড়িশুঁটকিমাছফুলবাঁশ রকমারি ফার্নিচার,এমন কিছু নেই যা এই ফুটপাতে পাওয়া যায় না। এর সাথে গাড়ির চাকার দোকানচাকায় বাতাস দেওয়ার দোকান এমনকি এই জনারণ্য ফুটপাতে দিনে দুপুরে গোসল করার দৃশ্যও দেখা যায় অহরহ। অবশ্য এই ফুটপাত নয় চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের কোনো ফুটপাতে নর-নারী শিশু অবাধে হাঁটাচলা করতে পারে বলে আমার অন্তত জানা নেই। কিছু কিছু অভিজাত এলাকায় থাকতে পারে হয়তআমার সেসব এলাকায় যাওয়ার বেশি অভিজ্ঞতা নেই।

কোনো দোকানিই তার সামনের ফুটপাতের অংশটি নিয়মমাফিক মুক্ত রাখছেন না। বরং ফুটপাত দখলতো কেউ কেউ আবার ফুটপাত ছাপিয়ে রাস্তাও দখল করে নিয়েছেন। এ বিষয়ে কার কাছে অভিযোগ করা উচিত বা কারা এ সমস্যার প্রতিকার করতে পারেন তা জনগণ জানে না। আসলে এই নগরের কর্তৃপক্ষ কে-সিটি কর্পোরেশনসিডিএ মেট্রোপলিটন পুলিশ না কি সরাসরি সরকার তা বোঝা যাচ্ছে না কোনো মতেই।

লেখার শুরুতে যে উল্লেখ করলাম দোকানি তার দোকানের আবর্জনা ফুটপাতে ফেলছে। আমি ভেবে দেখেছি এরও একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। দোকানি তার দোকানটি ছাড়া আর কিছুকেই নিজের বলে ভাবতে পারছে না। দোকানটি সে সালামি বা ভাড়ায় নিয়েছে। এর জন্য তাকে প্রতি মাসে ভাড়া গুণতে হয়। এখান থেকেই তার পরিবার চলে কাজেই ওই দোকানটিকেই সে তার সম্পদ বলে মনে করে। নিজের বলে মনে করে। দোকানের বাইরের অংশটিকে সে তার বলে ভাবে না। ওই অংশটিকে সে ‘ওন’ করে না। দোকান থেকে ময়লা দূর করতে পারলেই হলো। বিভিন্ন বাসা বাড়িতেও দেখা যায় এমন আচরণ করতে। ঘরের ময়লা,তরিতরকারিমাছ-মাংস ইত্যাদির উচ্ছিষ্টটুকু জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে মেরে পরিত্রাণ পেতে চায় গৃহকর্ত্রী বা কর্তা। অর্থাৎ ঘরটা আমার বাইরের অংশটি আমার নয়। মনস্তাত্ত্বিক এই সমস্যা শুধু ওই দোকানি বা ঘরের কর্তা-কর্ত্রীদেরই শুধু নয়,এই সমস্যা আমাদের জাতীয় সমস্যা। সমস্যাটি হলো আমরা আমার অংশটি ছাড়া বাকিটুকুকে আমাদের ভাবতে পারছি না। নিজেদের ভাবতে পারছি না।

নিজের দোকান বা ঘর ছাড়া বাকি দেশটাও যে আমারএদেশের প্রতিটি ধুলিকণায়ও যে আমার মালিকানা স্বত্ব লেখা আছে। এদেশের ভালো-মন্দ সবকিছুরই যে আমিও একজন ভাগিদার সে কথাটি আমরা কেউ ভাবতে পারছি না। রাস্তায় ওয়াসার পাইপ থেকে অবিরাম পানি পড়তে দেখেও আমাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। পানির অপচয় বন্ধ করতে উদ্যোগ নিই না। রেলের প্ল্যাটফর্ম নোংরা করি। ট্রেনের বগি নোংরা করি। জিনিসপত্র নষ্ট করি আর ভাবি এতো আমার সম্পদ নয় রেলের। রেলের সম্পদ অন্য কেউ নষ্ট করছে। চুরি করছে দেখেও প্রতিবাদ করি না ভাবি এ-তো আমার নয়। অর্থাৎ যা কিছু সরকারের তাকেই আমরা শত্রুর সম্পদ বলে মনে করছি। তা ধ্বংস করতে পারলেই যেন পরম শান্তি। অদৃশ্য কোনো শত্রুর ওপর প্রতিশোধ নেওয়া।

এখন আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রি-পেইড। তার মানে আগে টাকা পরিশোধ করে পরে সেবা নিচ্ছি। পোস্ট পেইডও প্রায়ই একইটাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেবাও শেষ। অথচ সরকারি টেলিফোন অর্থাৎ এখন যাকে ল্যান্ডফোন বলা হচ্ছে তার টাকা বা বিল কত মাস পরে পরেই না পরিশোধ করেছি। নোটিসের পর নোটিস দেওয়া সত্বেও বিল পরিশোধের নামটিও নেই। বরং বিল চুরির জন্য কত ধরনের পন্থাই না আবিষ্কার করেছি। ব্যবহার করেছি। এখনও সরকারি আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে টিএন্ডটির শত শত কোটি টাকার বিল অনাদায়ী পড়ে আছে। আদায় হওয়ার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। এমনকি আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাইতো বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ টাকা বাকি ফেলে রেখেছেন টিএন্ডটির। অথচ মোবাইলের বিল কিন্তু সময় মতো পরিশোধ করছেন। একই অবস্থা ওয়াসার। এক লিটার পানি ২৫ টাকা দিয়ে কিনে খাই অথচ ওয়াসার পানির অপচয় আর সঠিকভাবে বিল পরিশোধ করা হলে ওয়াসার এমন দৈন্যদশা হতো না।

এশিয়ার সেরা চিটাগাং স্টিলমিল রুগ্ন করেধ্বংস করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন দেশে অন্তত ৫০টি ব্যক্তিখাতের স্টিলমিল দাপটের সাথে ব্যবসা করছে। ধ্বংস করা হয়েছে পাট শিল্প। বন্ধ করা হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম জুটমিল আদমজী জুট মিল। এর পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী ভারতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য জুটমিল। পাটশিল্পের পরিণতির আশঙ্কা করছি এখন তৈরি পোশাক শিল্পের। একটি অশুভ শক্তি সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী এই শিল্পকে ধ্বংস করতে। সময় থাকতে সচেতন না হলে পাটের মতো এই শিল্পও অনেকটা লুপ্ত হবে এ দেশ থেকে।

বর্তমানে এক বিপজ্জনক প্রবণতা পেয়ে বসেছে জাতিকে। কিছু একটা হলেই অবাধেনির্বিবাদেনিষ্ঠুরভাবে গাড়ি ভাঙচুর অগ্নি সংযোগ ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা। যে কোনো তুচ্ছ ঘটনায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন জ্বালানো আমাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড হয়ে উঠছে। বেতন-বোনাসের দাবিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন কমানোর দাবিশিক্ষা সম্পর্কিত যেমন পরীক্ষা পেছানো ভর্তি সমস্যা,দু’দলের মধ্যে কথা কাটাকাটিপ্রেম ঘটিত সংঘাতচা খেতে বসা নিয়ে তর্কাতর্কিএমন কি পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে না পারার মতো ঘটনার জন্যেও রাস্তা অবরোধ। গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটছে। এর সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতো আছেই। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের পথ রুদ্ধ করতে জামাত-শিবির ও হেফাজতে অব্যাহত ধ্বংস-নৈরাজ্যতো নিত্য-নৈমিত্তিকভাবে চলছেই।

নিজের দেশকে এবং দেশের সম্পদকে নিজের বলে ভাবতে না পারাভালো না বাসার মধ্যে আছে বাঙালির হাজার বছর ধরে উপনিবেশিক শাসনের কুফল। কারণবাঙালি ১৯৭১ এর আগে কখনোই স্বাধীন ছিল না। হাজার বছর ধরে শাসিত হয়েছে অন্যের দ্বারা। যে কারণে তারা নিজের ঘর-বাড়ি আর সম্পদ ছাড়া বাকি অংশটুকুকে ভেবেছে শাসকের সম্পত্তি হিসেবে। আর শাসক বা সরকার যেহেতু তাদের নয় সেহেতু ‘সরকারের মাল দরিয়া মে ঢাল’ মানসিকতায় প্রতিপালিত হয়েছে বাঙালি। ২১৩ বছর বৃটিশ-পাকিস্তানের গোলামি করতে করতে এ জাতির রক্ত-মাংস-মজ্জায় মিশে আছে এক প্রকার গোলামির হীনমন্যতা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীন দেশের আন্দোলনের মধ্যে চরিত্র ও আচরণগত পার্থক্য থাকতে হবে তা-ও বুঝতে পারছে বাঙালি। বৃটিশ পাকিস্তান সরকার অর্থাৎ শাসকশ্রেণি আমাদের প্রতিনিধি নয় সত্য কিন্তু এই দেশএই সরকার,এই সম্পদতো একান্তই আমারআমাদের। রেলের একটি বগি জ্বালিয়ে দেওয়া মানে আমিতো আমার সম্পদই পুড়িয়ে দিলাম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ মিলিয়ন ডলার হওয়ার অর্থতো আমার। আমাদের অর্থাৎ আমার দেশেরই অগ্রগতি সাধিত হওয়া।

এ জাতির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝা বড় মুশকিল। যারা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করে তারাই নিজ মাতৃভাষার প্রতি এত অবহেলা করে তা দেখে কষ্ট পেতে হয়। যে জাতি তুলনাহীন রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে তারা সে স্বাধীনতাকে এত অপব্যবহার ও অবমূল্যায়ন করে তা দেখে কষ্ট পেতে হয়।

তাই মাঝে মাঝে ভাবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি একটি অনিচ্ছুক ও অপ্রস্তুত জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেননতুবা একটি স্বাধীন দেশযা অর্জন করতে ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আড়াই লাখ মা-বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছেপ্রচুর সম্পদ নষ্ট হয়েছে তেমন একটি দেশে কীভাবে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দুটি ধারা থাকতে পারে। স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ