পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৩

'রাজনৈতিক সংকট নাকি ‘ইগো’ সংকট'

২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি, ৯ কার্তিক ১৪২০ সাল, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
২৫ অক্টোবর দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে, আদৌ নির্বাচন হবে কি না, হলেও কেমন সরকার ব্যবস্থায় ও কার অধীনে হবে- এতোসব সংকট ও প্রশ্ন নিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন প্রবল উৎকণ্ঠায় সে সময় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন। তাঁর দেওয়া প্রস্তাবে তিনি সরকারি দলের বাইরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নাম চেয়েছেন নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রীসভার জন্য। এ বিষয়ে তিনি বিরোধী দলের নেতার সহযোগিতাও চেয়েছেন। অর্থাৎ সরকারি দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনেই নির্বাচনের প্রস্তাব পেশ করেছেন।

সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনের পরে অবশ্য এছাড়া উপায়ও নেই। কারণ বর্তমান সংবিধান মোতাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সুযোগ নেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চায় না। তারা কোনো অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক নয়। কাজেই তারা তাদের অবস্থান থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার একটি রূপরেখা দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের ভাষণে এবং তার আগে-পরে তিনি নিজে কখনও সেই সরকারের প্রধান থাকবেন বলে দাবি করেন নি। যদিও তাঁর দলের কয়েকজন মন্ত্রী ও নেতা এ ধরনের দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরে দেশের রাজনীতি মহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল। ‘অনেকে বরফ গলতে যাচ্ছে’, ‘সংকট উন্মোচনের পথ খুলছে’ ইত্যাদি বাক্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এমনকি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন, তারাও প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে বিএনপির জন্য একটি এক্সিট পয়েন্ট হিসেবে মন্তব্য করেছে।

এরপরে গত সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া পাল্টা আরেকটি রূপরেখা ঘোষণা করেন। প্রস্তাবে তিনি বিগত ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক ২০ উপদেষ্টার মধ্যে থেকে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। সরকারি দলের পাঁচ ও বিরোধী দলের পাঁচ মোট ১০ জন উপদেষ্টা ছাড়া সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত নাগরিককে ওই সরকারের প্রধান করারও প্রস্তাব করেন তিনি। অর্থাৎ তিনি তাঁর দাবি অনুযায়ী পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথাই তুলে ধরলেন পুনর্বার।

বিরোধী দলের নেতার এই বক্তব্যের পর সংকট আবার ঘনীভূত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ তাঁর সেদিনের সংবাদ সম্মেলনের প্রদত্ত ভাষণ বা নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা প্রদান যে আকস্মিক ও ভাবনা-চিন্তা তা ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ১৮ দলীয় জোট বিরোধীদের তো বটেই এই জোটেরও কারো কারো কাছে তা কৌতূকের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১৩ ও ১৭ বছর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবকে অনেকে প্রলাপ ও অবিবেচনা প্রসূত বলে আখ্যায়িত করেছেন ইতোমধ্যেই। তাঁর এই ধরনের প্রস্তাবের পরপরই খোঁজ পড়ে যায় এই দুই সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা এখন কোথায় ও কী অবস্থায় আছে। তথ্য উপাত্ত ও খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল দুই সরকার মিলে উপদেষ্টা ছিলেন ১৮ জন। কারণ ২ জন দু’সরকারেই ছিলেন। এর মধ্যে ৬ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনজন অনীহা প্রকাশ করেছেন আর ছয় থেকে আটজনের উপদেষ্টা হওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। তাহলে উপদেষ্টা হওয়ার মতো বাকি থাকলো ক’জন। তবে এই লেখাটি তৈরি করার সময় পর্যন্ত মঙ্গলবার মধ্যরাতে একটি চ্যানেলের পর্দায় একটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় একটি সংবাদে দেখলাম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হয়েছেন। তিনি বলেছেন যেহেতু ১৭ বছর আগে তিনি একবার উপদেষ্টা হয়েছিলেন সেহেতু এত বছর পর আবার উপদেষ্টা হওয়া তাঁকে মানায় না। কাজেই প্রধান উপদেষ্টা করা হলে তিনি রাজি আছেন। তাঁর দাবি অযৌক্তিক নয়, ১৭ বছরে একজন মানুষ পদোন্নতি চাইতেই পারেন।

বিরোধী দলীয় নেত্রীর এই প্রস্তাব যে আকস্মিক ও তা বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী বৈঠকে উত্থাপিত ও আলোচিত নয় তাও তুলে ধরেছে একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিক। ওই পত্রিকার কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বীকার করেছেন, সংবাদ সম্মেলনে নেত্রী কী প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন তা তারা (এমন অন্তত ছয়শ) জানতেন না। প্রস্তাব প্রদানের সময় তাই তারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলেন। অর্থাৎ বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে,খালেদা জিয়ার এই রূপরেখাটি সুচিন্তিত নয়। তা তড়িঘড়ি করেই কেউ কেউ প্রস্তুত করে দিয়েছেন। যেহেতু শেখ হাসিনা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন সেহেতু খালেদা জিয়াকেও একটি প্রস্তাব দিয়ে রাখতে হবে, তা যাই হোক না কেন।

এসবই হচ্ছে আমাদের রাজনীতিকদের ‘ইগো’ সংকট। কেউ কারো কাছে হারতে রাজি নয়। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবটি সংবিধান সম্মত নয়। এটি তাঁর না বোঝার কারণ নেই। তবুও তিনি তাই বলবেন। কারণ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য খালেদা জিয়ার সরকারকে বাধ্য করেছিল। তাই তিনিও শেখ হাসিনাকে বাধ্য করতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে। ২০০৬ সালে বিচারপতি এম আর হাসানের অধীনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যায় নি, কাজেই তিনিও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। অন্যদিকে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামি ও তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির তৈরি হয়ে আছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত ঘটনার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য। ২৫ তারিখ ঢাকায় সমাবেশে দা-কুড়াল নিয়ে উপস্থিত থাকার আহবানের মধ্যে সে ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যেই একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে সে উদ্দেশ্যে শিবিরের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

পাল্টা রূপরেখা না দিয়ে বরং খালেদা জিয়া ও তার জোট প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নিয়েই আলোচনায় যেতে পারতেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ওই সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়েই আলোচনা হতে পারতো বা হওয়া বাঞ্ছনীয়। শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারে নির্বাচিত পাঁচ-পাঁচ সদস্য ছাড়া সরকার প্রধান হিসেবে কাকে মনোনীত করা যায় তা নিয়ে দর কষাকষি হতে পারতো। খালেদা জিয়া যেহেতু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না সেক্ষেত্রে বিকল্প নাম প্রস্তাবের দায়িত্ব বিএনপিরই। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ও গত মঙ্গলবার যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন জাতির কল্যাণে শেখ হাসিনা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

খালেদা জিয়ার অন্তঃসার শূন্য পাল্টা প্রস্তাবের চেয়ে শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনেক বেশি বাস্তব ও সংবিধান সম্মত। জয়-পরাজয় ও ইগো সমস্যায় না ভুগে বিএনপি ও তার সমর্থকদের উচিত হাসিনার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সরকার প্রধানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকলে বিএনপি আখেরে লাভবান হবে বলে মনে হয় না। কারণ ১৯৯৬ সালের বাস্তবতা ও ২০১৩ সালের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। আর কোনো কারণে যদি দেশে নির্বাচন না-ও হয় সেক্ষেত্রেও লাভবান হবে বর্তমান সরকার, বিএনপি নয়। নির্বাচন হতেই হবে এবং সে নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি নিয়ে সংঘাত না করে একটি স্থায়ী সমাধান বা প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে। আমি আমার পূর্বের অনেক লেখায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। তাকেই কীভাবে স্বাধীন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করা যায় সে চেষ্টাই করা উচিত। নির্বাচনকালীন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করে খুব সহজে অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব। এছাড়া বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে নির্বাচনে কারচুপি বা অন্যভাবে প্রভাব বিস্তার কতটুকু সম্ভব তা ভেবে দেখতে হবে। মাগুরার মতো ভোট ডাকাতি এখন কোনো দলের পক্ষেই করা সম্ভব নয়। করলেও তা আড়াল বা ‘হাইড’ করারও সুযোগ নেই।

যারা একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরে শুধু মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে চাঁদে দেখা গেছে গুজব রটিয়ে সারা বাংলাদেশে ছোট খাটো কিয়ামত সৃষ্টি করতে পারে তাদের সাথে ভোট কারচুপি করে বর্তমান সরকার দেশে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ