পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই, ২০১২

* ' এবং হুমায়ুন '

দৈনিক আজাদী                      উপসম্পাদকীয়                     কাল, আজ,কাল

২৬ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি ১১ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ৬ রমজান ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

রাত নয়টার দিকে অমানুষিক যন্ত্রণার মাঝে আমার সন্তানের জন্ম হলোআমার আর তারপর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান হলো ঘরভরা মানুষ। হৈ চৈ চেঁচামেচিতে কান পাতা যায় না। আমার ভাই বোনেরা ধাক্কাধাক্কি করে বাচ্চা দেখছে। আনন্দ উল্লাসে ঘর ভরপুর। ছেলে হয়েছে শুনতে পেলাম কিন্তু এক নজর বাচ্চাকে দেখতে পারলাম না। নিজ থেকে দেখতে চাইব এতবড় নির্লজ্জ কাজ করি কেমন করে? ---- আমাকে নিজের বিছানায় শুইয়ে বাচ্চাকে এনে দেয়া হলোমাথা ভরা কাল চুলটকটকে ফর্সা গায়ের রঙচোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেভাবখানা কিবলছিলে না আমার মুখ দেখবে না?এখনআমার বুকের ভেতর নড়েচড়ে গেল আমার প্রথম ছেলের মুখ দেখে। “তখনো আমি জানতাম না আমার এই ছেলে এককালে হুমায়ূন আহমেদ নামে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে সুপরিচিত হবে।” মা আয়েশা ফয়েজ তাঁর ‘জীবন যে রকম’ গ্রন্থে প্রথম সন্তান হুমায়ূন আহমেদের জন্মক্ষণটি তুলে ধরেছেন এভাবে।
বাচ্চার নাম রাখা হলো কাজল। কাজলের জন্মের খবর জানিয়ে তার বাবাকে টেলিগ্রাম করা হলো পরদিন ভোরে। তার তখন খুব কাজের চাপ। আসতে পারলো না। অন্যরা এল।
কাজলের বাবা বাচ্চা দেখতে আসার সুযোগ পেল এক মাস পর। তার খুব মেয়ের শখ ছিল।--- আমার সাথে যখন প্রথম নিরিবিলি দেখা হলো প্রথমেই বললোকাজলের ভাগ্য গণনা করে ফেলেছি!
কিভাবে করলে?
বই পত্র কিনে পড়াশোনা করেছিলাম।
কী আছে ভাগ্য?
অনেক বিখ্যাত হবে তোমার ছেলে। জান রাণী এলিজাবেথের ছেলে আর তোমার ছেলের জন্ম একই দিনেএকই লগ্নে?
আমি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসলামকোথায় রাণী এলিজাবেথ আর কোথায় আমি।
কাজলের বাবা গম্ভীর হয়ে বললোরাণীর ছেলে বিখ্যাত হবে বাবা মায়ের নামেআর আমার ছেলে বিখ্যাত হবে তার নিজের যোগ্যতায়তুমি দেখে নিও।”
গত সোমবার শহীদ মিনারে লক্ষ জনতার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের সময়ে সেই বিখ্যাত পুত্রের কফিনে মাথা রেখে মা আয়েশা ফয়েজের মনে চৌষট্টি বছর আগের স্মৃতি কি দোলা দিয়েছিল একবারও?
এমন অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী করাপেশায় পুলিশ অফিসারলোকটি কেমন ছিলেন?হুমায়ূনের লেখার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। “আমার ছোটভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল তার লেখা প্রথম গ্রন্থ কপোট্রনিক সুখ দুঃখের উৎসর্গ পত্রে লিখেছে “পৃথিবীর সবচেয়ে ভালমানুষটি বেছে নিতে বললে আমি আমার বাবাকে বেছে নেব।” বইয়ের উৎসর্গপত্রে লেখকরা সবসময় আবেগের বাড়াবাড়ি করেন। আমার ভাইয়ের এই উৎসর্গপত্র আবেগপ্রসূত ধরে নিতে খানিকটা অসুবিধা আছে। সে যদি লিখতো পৃথিবীর সবচে ভালমানুষ আমার বাবা এবং মা তাহলে আবেগের ব্যাপারটি চলে আসতো। সে তা না করে বাবার কথাই লিখেছে। পৃথিবীর সবচে ভাল মানুষটির মধ্যে মা’কে ধরেনি। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে তার উৎসর্গ পত্র আবেগ প্রসূত নয়। চিন্তাভাবনা করে লেখা। ইকবালকে আমি যতটুকু চিনি সে চিন্তাভাবনা না করে কখনো কিছু বলে না এবং লেখেও না।”
গত বৃহস্পতিবার হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন। এই এক সপ্তাহ জুড়ে বাংলাদেশের প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন নন্দিত এই লেখক। এবং বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই লেখকের বিচিত্র জীবন যাপনভাবনাআচরণ ইত্যাদি বিষয়ে জানতে পেরেছে দেশের অগণিত মানুষ। হুমায়ূন আহমেদতার পরিবার ও তার ছেলেবেলার কাহিনিগুলো বেশ চমকপ্রদ। মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তাঁর বাবাএ বিষয়ে তিনি লিখেছেনআমার বাবা পৃথিবীর সবচে ভাল মানুষদের মধ্যে একজন কিনা জানি নাতবে বিচিত্র একজন মানুষতা বলতে পারি। তার মতো খেয়ালিতার মতো আবেগবান মানুষ এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি। আবেগ ছাড়াও তার চরিত্রে আরও সব বিস্ময়ের ব্যপার ছিল। তিনি ছিলেন জন স্টেইনবেকের উপন্যাস থেকে উঠে আসা এক রহস্যময় চরিত্র। সবার আগে ছোট্ট একটা ঘটনা বলি। রাত প্রায় বারোটা। রঙমহল সিনেমা হল থেকে সেকেন্ড শো ছবি দেখে বাবা এবং মা রিকশা করে ফিরছেন। বড় একটা দিঘির পাশ দিয়ে রিকশা যাচ্ছে। মা হঠাৎ বললেনআচ্ছা দেখো কী সুন্দর দিঘি। টলটল করছে পানি। ইচ্ছে করছে পানিতে গোসল করি। বাবা সঙ্গে সঙ্গে বললেনরিকশা থামাও। রিকশাওয়ালা থামল। বাবা বললেন চলো দিঘিতে গোসল করি। মা হতভম্ব। এই গভীর রাতে দিঘিতে নেমে গোসল করবেন কিনিতান্ত পাগল না হলে কেউ এরকম বলেমা বললেন কী বলছো তুমি। বাবা গম্ভীর গলায় বললেন। দ্যাখো আয়েশা। একটাই আমাদের জীবন। এই এক জীবনে আমাদের বেশির ভাগ সাধই অপূর্ণ থাকবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে সব সাধ আছে। যা মেটানো যায় তা মেটানোই ভাল। তুমি আসো আমার সঙ্গে। বাবা হাত ধরে মাকে নামালেন। স্তম্ভিত রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে দেখলো হাত ধরাধরি করে দুজন নেমে গেলো দিঘিতে। এই গল্প যতবার আমার মা করেন ততবার তার চোখে পানি এসে যায়। তার নিজের ধারণা। তার জীবনে যে অল্প কিছু শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত এসেছিল ঐ দিঘিতে অবগাহন তার মধ্যে একটি।”
হুমায়ূন আহমেদ সারাজীবন তার লেখালেখির মাধ্যমে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধঘটনাদুঃখ বেদনাহাসি ও আনন্দের চিত্রই শুধু তুলে ধরেছেন তার গল্প,উপন্যাসনাটক ও চলচ্চিত্রে। আর এখানেই তার অসাধারণত্বযেভাবে কেউ লেখেননি আগেযে ভাষায় কেউ বলেন নি আগে। যে ঘটনা কেই তুলে ধরেননি আগেযে রসবোধের পরিচয় দেননি আগেএত সহজ করে বর্ণনা করেননি আগে হুমায়ূন তাই করেছিলেন। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এই হুমায়ূনবাদশাহ হুমায়ূনের তুলনায় কম শক্তিমান ছিলেন না। চলেছেন সম্রাটের মতোযখন যা ইচ্ছে তাই করেছেন।
মৃত্যুর আগে কেউ কেউ কি তা জেনে যায় খুব অবচেতন মনেআমরা এমন অনেককে দেখেছি মৃত্যুর আগে আগে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটাতে। হুমায়ূন আহমেদের ইনট্যুইশন কি এমন কিছু ধারণা দিয়েছিলনা হলে গত একুশের বই মেলায় তার উপন্যাস “মেঘের ওপর বাড়ি’ লিখলেন কেন ওভাবে। উপন্যাসটি একটি মৃত মানুষের দেখা বর্ণনা। শুরুটা এরকম, ‘আমি মারা গেছিনাকি মারা যাচ্ছি এখনো বুঝতে পারছিনা। মনে হয় মারা গেছি। মৃত অবস্থা থেকে অলৌকিকভাবে যারা বেঁচে ওঠে,তাদের মৃত্যু অভিজ্ঞতা হয়। এর নামNDE (Near death Experience )। বাংলায় ‘মৃত্যু অভিজ্ঞতা’ এই বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যার জন্যে যখন আমি এই উপন্যাস লিখিতখন ক্যান্সার নামক জটিল ব্যাধি আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে। এই খবরটা আমি জানি না। ক্যান্সার সংসার পেতেছে কোলনেসেখান থেকে রক্তের ভেতর দিয়ে সারা শরীরে ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার অবচেতন মন কি এই খবরটি পেয়েছেআমার ধারণা পেয়েছে। যে কারণে আমি উপন্যাস ফেঁদেছি একজন মৃত মানুষের জবানিতে। উপন্যাসে এক মহিলার কথা আছে,যার হয়েছে কোলন ক্যান্সার। সেই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে সারা শরীরে। বাসা বেঁধেছে লিভারেফুসফুসে। হঠাৎ এইসব কেন লিখলামজগৎ অতি রহস্যময়।”
রবীন্দ্র পাগলবৃষ্টি পাগলপ্রকৃতি ও মানুষ পাগল এই লোকটিসারাজীবন পৃথিবীর রহস্য উম্মোচনের চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও অনেক বার অনেক জায়গায় বলেছেন, ‘কোথাও একটি রহস্য আছে। তার এই উপন্যাসের শুরুতে তিনি লিখেছিলেন, (মৃত্যু অভিজ্ঞতা যাদের হয়তারা সবাই দেখেলম্বা এক সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। অন্তহীন যাত্রার শেষের দিকে খানিকটা আলো দেখা যায়। আলো আসে সুরঙ্গের শেষ মাথা থেকে। এই আলোর চুম্বকের মতো আকর্ষণী ক্ষমতা। কঠিন আকর্ষণে অন্ধের মতো আলোর দিকে এগিয়ে যেতে হয়।”
এই উপন্যাসের শেষটি হয়েছে এভাবে। “চারদিক কেমন জানি গুটিয়ে সিলিন্ডারের মতো হয়ে যাচ্ছে। সিলিন্ডারের শেষ প্রান্তে আলোর বন্যা। সেই আলোয় ভয়াবহ চৌম্বক শক্তি। আমি আলোর দিকে ছুটে যাচ্ছি। আমি পিছনে ফিরে বললাম পৃথিবীর মানুষেরা। তোমরা ভালো থেকো। সুখে থেকো। আমি ছুটে যাচ্ছি আলোর দিকে। আমি জানি আমাকে অসীম দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। অসীম কখনো শেষ হয় না। তাহলে যাত্রা শেষ হবে কীভাবে?
কে বলে দেবে আমাকে।”
আলোর দিকে ছুটে গিয়েছেন হুমায়ূন। জীবনকালেও যিনি ছিলেন আলোকময় তারকা।
আজ আকাশে কোন নক্ষত্র নেই
একটি নক্ষত্র খসে গেলে
তাদের শোকে ও মৌনতায়
ব্রহ্মাণ্ডে অন্ধকারের স্তূপ---
অন্ধকারে বসে ভাবছিঅনেক দুঃখ ও কষ্টেহতাশা ও বেদনায় প্রাপ্তি ও হাহাকারে আমাদের দীর্ঘকাল নির্মল আনন্দ দান করেছিলেন তিনি। যা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। বাংলা ভাষার ক’জন লেখকই তা পেরেছিলেন।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই, ২০১২

* 'পারিবারিক মূল্যবোধের আকাল'

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                      উপসম্পাদকীয়                          ব্রাত্যজনের কথা

চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার ১৯ জুলাই ২০১২, ৪ শ্রাবণ ১৪১৯


সামনেই ঈদ। নিজের খরচ ছাড়াও প্রেমিকার জন্যে দামি কোন গিফট আর তার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার জন্যে একটি ল্যাপটপ। বেশ ব্যয়সাধ্য বটে। কিন্তু টাকারতো জোগাড় করতেই হবে। মা’কে কিংবা পরিবারে বললে তো আর একসাথে এত টাকা পাওয়া যাবে না কাজেই উপায় একটি বের করতেই হয়। কিডন্যাপ বা অপহরণ টাকা উপার্জনের একটি সহজ (!) তরিকা। ছেলেটি তাই নিজে নিজেই অপহৃত হলো। টেরিবাজারে বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে লালদীঘির পাড়ের একটি হোটেলে উঠে অন্য একটি সিম থেকে মায়ের কাছে ফোন করে জানানো হলো, তার সন্তান অপহৃত হয়েছে দু লক্ষ টাকা চাই....।

অবশ্য সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটির এই অপহরণ নাটক দীর্ঘ হতে পারেনি। তার আগেই সে ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। পুলিশ সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ছেলেটির বিরুদ্ধে মামলা না করে তাকে তার বাবার জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ কাজটি মন্দ করেনি। অপরিপক্ক এই তরুণের সংশোধনের একটি সুযোগ করে দিয়েছে তারা। খামাখা থানা পুলিশ বা কোর্ট হাজত করতে গিয়ে, বা হাজতে কিছু মন্দ লোকের কয়েক ঘণ্টার সান্নিধ্যও হয়ত, ছেলেটির ভবিষ্যতকে অন্যপথে ঠেলে দিতে পারতো। এই লেখাটি ছেলেটির পরিবারের কারো চোখে পড়বে কিনা জানি না। পড়ে থাকলে আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করবো ছেলেটিকে লজ্জা কিংবা অপমানজনক পরিস্থিতিতে না ফেলে তাকে বরং জীবনের বাস্তবতা, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বেশি করে শিক্ষা দিন। ঘটনাটি চট্টগ্রামের হলেও সঙ্গত কারণে ছেলেটি কিংবা তার পরিবারের পরিচয় দেয়া থেকে বিরত থাকলাম। ওর প্রেমিকা যাকে মধ্যপ্রাচ্যে, এ সংবাদ তাদেরও কানে যাবে কিনা জানি না। অথবা এমনও হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের তার প্রেমিকাটি আসলেই ভূয়া। ফেসবুকে তা হরহামেশা এমন ঘটনাই ঘটছে। এমন ফেসবুক বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় হওয়া থেকে জীবনসঙ্গী হতে গিয়ে নিজের জীবনইতো খুইয়েছেন অনেকে। এই ছেলেটির ঘটনাও তাই। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় তারপর প্রেম। আর সেই প্রেমিকার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্যে একটি ল্যাপটপ ও তাকে ঈদে উপহার পাঠানোর জন্যে মরিয়া ঐ ছেলেটি বিভ্রান্ত ও অপরিণামদর্শী। আর দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এমন বিভ্রান্ত ও অপরিণামদর্শী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বেশি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। সে খেয়াল আমাদের কারুরই নেই। অতি রাজনীতি ও টক শো প্রবণ বা ভারতীয় চ্যানেলের প্রভাবে বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের মা-বাবারা হয়ত জানেনই না এ মুহূর্তে তাদের প্রিয় সন্তানটি কোথায় কিংবা কার সাথে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে। এখনও হয়ত একবছরও হয়নি একটিমাত্র ল্যাপটপের লোভে প্রিয় বন্ধুকে খুন করে জমিয়তুল মসজিদ এলাকায় ফেলে গিয়েছিলো যে তরুণ সে দিব্বি ঐ বন্ধুর মরণোত্তর সকল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলো একজন শোকার্ত বন্ধুর মতোই। প্রিয় পাঠক, এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশে ঘটছে তা কিন্তু নয়।

কয়েকদিন আগে ভারতীয় একটি টিভি চ্যানেলে একটি ক্রাইম রিপোর্টধর্মী অনুষ্ঠানে দেখলাম, বিত্তশালী পরিবারের একমাত্র সন্তানটিকে খুন করেছে তারই সমবয়সী বন্ধুরা। কারণ টিনএজ এই ছেলেটিকে তার বিত্তশালী বাবা একটি দামি গাড়ি কিনে দিয়েছিলো। আর এতেই ওর বন্ধুদের ধারণা হলো বড়লোকের একমাত্র সন্তানটিকে অপহরণ করে মোটা অংকের টাকা আদায় করা সম্ভব হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু অপহরণের পরে পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে পাঁচ বন্ধু মিলে হত্যা করে নিরপরাধ ছেলেটিকে। এবার খুন হওয়া ছেলেটিরসহ অন্য পাঁচটি পরিবার বা তাদের মা-বাবাদের কথা ভাবুন। উঠতি বয়সী এই যুবকরা জীবনের কতটুকুইবা দেখেছে, কতটুকুইবা শিখেছে। কিন্তু অর্থ-বিত্ত-ভোগ-বিলাসের স্বাদ তারা পেয়ে গেছে। আর সে স্বাদ পূরণের জন্যে যেকোন কাজই তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়ে উঠছে। আমি বলেছি এ ধরনের সমস্যা শুধু বাংলাদেশ কিংবা শুধু ভারতেরই নয়। এ সমস্যা উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে যে সব দেশে সদ্য পুঁজির বিকাশ ঘটতে শুরু করেছে। কিংবা পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের ভোগবাদী সমাজের আছর পড়েছে যে সব দেশে। পুঁজিবাদ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির ডামাডোলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো হাট করে রেখেছে নিজেদের দুয়ার, আর অবলীলায় সেখানে ঢুকে পড়ছে পশ্চিমা বা আকাশ সংস্কৃতি। যেখানে আজ সকল কিছুই পণ্য। মা, মাটি, মানুষ এমন কি নিজেদের একান্ত গোপনীয়তাও। টাকা কামাও আর ভোগ করো’র মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে এসব দেশের তরুণসমাজ। ফলে ভেস্তে পড়েছে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও বন্ধন। স্বাতন্ত্র্য জীবনযাপন কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ভেঙে দিয়ে পরিবারপ্রথা পণ্যের চাহিদা বাড়াও। এই না হলে পুঁজির বিকাশতো সম্ভব নয়।

একান্নবর্তী পরিবারপ্রথা ভেঙে গেছে। যার যার মতো জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে সবাই। ফলে আগের মতো সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনও শিথিল হয়ে পড়েছে। খুপড়ির মতো ফ্ল্যাট বাড়ির চার দেয়ালে বন্দি হয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসীর মতোই হয়ে উঠছে অনেকের জীবন। ফলে এসব পরিবারে সন্তানরা বেড়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর আর অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে। এ ধরনের অনেক পরিবারে জীবন কাটে যার যার মতো করে। এসব পরিবারে পিতা-মাতা-সন্তানের সম্পর্কটিও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। এখানে নীতিকথার চর্চা হয় না। বাবা-মা সন্তানদের কাছে কোন সৎ মানুষ, ভালো মানুষের কথা বলেন না। কোন মনীষীর জীবনকথা শোনান না, স্বপ্ন বুনন করতে পারেন না কোন সন্তানের বুকে। কোন কোন ক্ষেত্রে বাবা-মা নিজেই আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন তাদের সন্তানদের কাছে। নিজের আয়ের সাথে ব্যয় কিংবা জীবনযাপনের সঙ্গতি না থাকায় পরিবারের অভিভাবকও মানসিকভাবে কুণ্ঠিত হয়ে থাকেন নিজ সন্তান বা পরিবারের অন্যদের কাছে। খুব কম মা-বাবাই আছেন যারা নিজ সন্তানকে সৎ হওয়ার শিক্ষা দেন। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের উৎসাহিত করেন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে। কিন্তু সে প্রতিষ্ঠার পথ কী? তার সাথে সততা বা মূল্যবোধের সম্পর্ক আছে কিনা তা বলে দেননা। এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংজ্ঞা হচ্ছে গাড়ি, বাড়ি-অর্থ-বৈভব। কিন্তু এর উৎস বৈধ কি অবৈধ তা নিয়ে ভাবেন না কেউ। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জমান এই সমাজব্যবস্থায় একজন সৎ মানুষের পরিচয় হয়ে ওঠে বোকা বলে। দ্রুত ধনী হয়ে উঠবার নগ্ন প্রতিযোগিতায় সমাজে আজ নীতি কথা বলে কিছু নেই। রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি মোটকথা সমাজের কয়জন লোককে দেখিয়ে আমার সন্তানকে বলতে পারি তুমি ওনার মতো হও। কাজেই এ সময়ের সন্তান যারা এমন বেপথু হয়ে পড়ছে তাদের দোষই- বা কতটুকু। আর্থ-সামাজিক অবস্থাইতো ওদের ভোগবাদী করে তুলছে।

কিন্তু এ থেকে তো পরিত্রাণ চাই। নতুবা ভবিষ্যৎ তো আরো বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে। একটি রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থাতো এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। সমাজের এই অবক্ষয় ঠেকাতে বিবেকবান মানুষের ঐক্য হওয়া জরুরি। পরিবারের ভেতর থেকেই প্রথমে মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। হাজার বছর থেকে চলে আসা সামাজিক মূল্যবোধ ও বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে। ব্যক্তি সৎ না হলে সমাজতো সৎ হবে না। আর বিশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রও ব্যর্থ হয়ে পড়বে।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা তাদের প্রয়োজনেই সমাজকে ভোগবাদী করে তোলে। বিলাসবহুল হোটেল, ক্যাসিনো, মদ ও নারী  আজ বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ। এর ঢেউ এসে পড়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যার আঘাতে ভেঙে পড়ে আমাদের আবহমান সমাজব্যবস্থা, সংস্কার ও প্রথা। আর এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে যে কেউ হয়ে পড়বেন সেকেলে ও অনাধুনিক।

যদি আমরা বোঝাতে পারতাম আমাদের সন্তানদের। জীবন ভোগের নয় উপভোগের। যদি আমরা বোঝাতে পারতাম একটি দামি মোবাইল সেটের চেয়ে একসেট রবীন্দ্র কিংবা নজরুল রচনাবলি অনেক বেশি আনন্দের ও উপভোগের। যদি আমরা বোঝাতে পারতাম ভোগে নয় ত্যাগেই শান্তি। যদি আমরা বোঝাতে পারতাম চিন্তাকে উষ্ণ করে জীবনযাপনকে করো সাধারণ তাহলে হয়ত, এই সংকট থেকে মুক্তির একটি পথ বেরিয়ে আসতো।

 লেখক : কবি, কলামিস্ট।
ইমেলঃ qbadal@yahoo.com

* 'অসমাপ্ত ‘আত্মজীবনী’ এক পবিত্র গ্রন্থ' - ১

দৈনিক আজাদী                                  উপসম্পাদকীয়                      কাল, আজ, কাল

১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি ৪ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ২৮ শাবান ১৪৩৩ হিজরি


“বন্ধুবান্ধবরা বলে তোমার জীবনী লেখ”। সহকর্মীরা বলে, “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলী লিখে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে”। আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, “বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনকাহিনী।” বললাম, “লিখতে যে পারি না, আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”....

“হঠাৎ মনে হলো লিখতে ভাল না পারলেও ঘটনা যতদূর মনে আছে লিখে রাখতে আপত্তি কি? সময় তো কিছু কাটবে। বই ও কাগজ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে চোখ দুইটাও ব্যথা হয়ে যায়। তাই খাতাটা নিয়ে লেখা শুরু করলাম। আমার অনেক কিছুই মনে আছে। স্মরণ শক্তিও কিছুটা আছে। দিন তারিখ সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে, তবে ঘটনাগুলো ঠিক হবে বলে আশা করি। আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেনু আমাকে কয়েকটি খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেনু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।”

এ যাবতকালের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ’ অসমাপ্ত আত্মীজীবনী’র শুরুর অংশ বিশেষ এটি। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর চিঠিগুলো যখন ইতিহাসের অংশ হতে দেখতাম, কিংবা বিশ্বের অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতার আত্মজীবনী পড়ার, দেখার অথবা শোনার সুযোগ হতো তখন আমি এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু কি কোনদিন কিছু লিখেননি?তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে কারো কাছে কি একটি চিঠিও লিখেননি। এমন কি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের কাছেও? তিনি লিখলে কেমন লিখতেন। ’৭৫ এ তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপরে দীর্ঘকাল তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁকে নিয়ে এতসব অপপ্রচার,নিন্দা আর কুৎসা রটিয়েছিল যে, তা একটি সময় প্রায় সত্যে পরিণত হয়ে উঠছিল। জার্মানির হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস বলতেন, ‘একটি মিথ্যাকে দশবার প্রচার কর এক সময় তা সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে।’ একটি সময়ে এই দেশের অনেক রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী (!) বঙ্গবন্ধুকে অর্ধশিক্ষিত বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম,জনগণের প্রতি ভালবাসা আর শুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ শুনে আমার হীনম্মন্যতা অনেকটা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না আমার জন্যে কিংবা বাঙালি জাতির জন্য কিংবা বিশ্বের সকল ত্যাগী, সৎ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের জন্যে একটি চরম বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শেখ মুজিবুর রহমান। হাতে আসা এবং পাঠের আগ পর্যন্ত। বাঙালির আরেক শ্রেষ্ঠতম সন্তান রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। অথচ বঙ্গবন্ধু কত সহজেই না তাঁর জীবনের কথা, দেশের কথা, মানুষ আর রাজনীতির কথা লিখলেন। বাংলা ভাষার যে কোন শক্তিমান লেখকের জন্যে তা এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর বর্ণনা চরিত্র চিত্রন, ঘটনার সূক্ষ্ম বর্ণনা ভাষা শৈলী সব মিলিয়ে এই গ্রন্থটি একদিকে ইতিহাসের আকর হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসের মতো গতিশীল ও সুখপাঠ্য। সততা হচ্ছে একজন লেখকের প্রধান শক্তি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু যেমন, তার কয়েকটি বর্ণনা তুলে দিচ্ছি। ‘তখন পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ খাদ্য সংকট চলছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি হুকুম দিলেন কলকাতার বড় বাজার ঘেরাও করতে। সেখানে গুদামের পর গুদাম চাউলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কাপড় গুদামজাত করে রেখেছিল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। শহীদ সাহেব এসব উদ্ধার করলেন বটে তবে মাড়োয়ারিরা তার বদলা নিতে কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে কয়েকজন এমএলএকে কিনে নেয়। এরপরে লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটে প্রবর্তিত হয় গভর্নর এর শাসন। এমন পরিস্থিতির পরে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমি কিছু সংখ্যক ছাত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খবর যখন রটে গেল লীগ মন্ত্রীত্ব নাই, তখন দেখি টুপি ও পাগড়ি পরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈ চৈ করতে আরম্ভ করেছে। সহ্য করতে না পেরে, আরও অনেক কর্মী ছিল, মাড়োয়ারিদের খুব মারপিট করলাম, ওরা ভাগতে শুরু করলো।” আরেক জায়গায় লিখেছেন, “আমি ও আজিজ সাহেব পরামর্শ করছি শাহ সাহেবের কাছ থেকে খাতাগুলো কেড়ে নিতে হবে। আমাদের ছাত্রলীগের কাজে সাহায্য হবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব যখন চলে যাচ্ছিলেন, শাহ সাহেবও রওয়ানা হলেন, আজিজ তাঁকে ধরে ফেলল। আমি খাতাগুলি কেড়ে নিয়ে বললাম, কথা বলবেন না চলে যাবেন। আজকাল যখন শাহ সাহেবের সাথে কথা হয় ও দেখা হয় তখন সেই কথা মনে করে হাসাহাসি করি। শাহ সাহেব (শাহ আজিজুর রহমান) ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলিতে আওয়ামী লীগ পার্টির নেতা এবং বিরোধী দলের লিডার হন। তাঁর সাথে আমার মতবিরোধ ১৯৫৮ সালের মার্শাল ল জারি হওয়া পর্যন্ত চলে।” সাধারণত আত্মজীবনীতে মানুষ নিজের দুর্বলতার কথাগুলো প্রকাশ করেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তিনি অত্যন্ত সততার সাথে তাঁর জীবনের এই অংশগুলোও প্রকাশে দ্বিধা করেন নি। তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব। আবুল হাশিম সাহেব মিল্লাত পত্রিকার প্রেস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলে বললো “তুমি বললেই আর ভয়েতে বিক্রি করবে না।” বললাম, ঠিক আছে আমি অনুরোধ করতে পারি।” এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু হাশিম সাহেবের সাথে রেগে কথা বলেছিলেন। এরপর তিনি লিখেছেন, “পরের দিন ঐ সমস্ত বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে বললো, “হাশিম সাহেব খানা খান না। শুধু বলেন, মুজিব আমাকে অপমান করলো।” “আমি হাশিম সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম,আপনি মনে কিছু করবেন না। আমার এভাবে কথা বলা অন্যায় হয়েছে, আপনি যা ভাল বোঝেন তাই করুন। আমার কিছুই বলার নাই।” হাশিম সাহেব হিন্দুস্থানে থাকবেন, আমি চলে আসবো পাকিস্তান। আমার বাড়িও পাকিস্তানে। আমি যাওয়াতে তিনি খুশী হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ভিন্নমত হতে পারি কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি, সেটাতো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোন দিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেবো, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকতো না।” “আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করবো ঠিক করি তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”

৪৭ এর দেশভাগ ভারতবর্ষের এক রক্তাক্ত ইতিহাসও বটে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে শুধু মানচিত্রই ভাগ হয়নি, ভাগ হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিও। যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে বঙ্গবন্ধুর অসীম সাহসী ভূমিকার কথা জানা যায় এই বইতে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন অনেক হিন্দু ও মুসলিমের। ’৪৭ এর পরে তিনি লিখেছেন, “আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে আর চিন্তা কি? এখন ঢাকায় যেয়ে ল’ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে। চেষ্টা করবো, সমস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়। যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে পূর্ব বাঙলার ঘরে ঘরে তিনি আন্দোলন ও জনমত তৈরি করেছিলেন সে পাকিস্তানে মাত্র কয়েক মাসেই তার মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি লিখেছেন, “আমি বললাম” এত তাড়াতাড়ি এরা আমাদের ভুলে গেল হক সাহেব (শামসুল হক)।” হক সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, “এই তো দুনিয়া।”

কলকাতা থাকাকালীন তিনি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছেন। হিন্দুদের হাতে মুসলিম নারী-শিশুদের হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের একসেট ফটোগ্রাফও তিনি মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই মুজিব লিখছেন, “আমরা যখন জেলে তখন এক রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হল কলকাতা ও ঢাকায়। কলকাতায় নিরপরাধ মুসলমান এবং ঢাকা ও বরিশালে নিরপরাধ হিন্দু মারা গেল।” এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করে অনেককে জেলে পাঠানো হয়। এদের সাথে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন, “তাদের কাছে বসে বলি, দাঙ্গা করা উচিৎ না, যে কোন দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ। মুসলমানরা কোন নিরপরাধীকে অত্যাচার করতে পারে না। আল্লাহ ও রসুল নিষেধ করেছেন। হিন্দুদেরও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তারাও মানুষ। হিন্দুস্থানের হিন্দুরা অন্যায় করবে বলে আমরাও অন্যায় করবো-এটা হতে পারে না। ঢাকায় অনেক নামকরা গুণ্ডা প্রকৃতির লোকদের সাথে আলাপ হলো, তারা অনেকেই আমাকে কথা দিল, আর কোনদিন দাঙ্গা করবে না।”

একটি ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম এবং সে সাথে একটি চরিত্র চিত্রণে তাঁর অসাধারণ মুন্সীয়ানা ধরা পড়ে। “সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় হাঁটা চলা করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম এমন সময় একজন আধুবুড়া কয়েদি, সেও হাসপাতালে ভর্তি আছে আমার কাছে এল এবং মাটিতে বসে পড়ল। আমি জিজ্ঞাস করলাম আপনার বাড়ি কোথায়? বললেন বাড়ি গোপালগঞ্জ থানায় ভেন্না বাড়ি গ্রামে নাম রহিম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম রহিম মিঞা আপনি না আমাদের বাড়িতে চুরি করে সর্বস্ব নিয়ে এসেছিলেন। রহিম মিঞা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। এই ডাকাতের সাথেও পরম আন্তরিকতায় আলাপ চালিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁকে দুর্ব্যবহার না করে ক্ষমা করে দিয়েছেন। শেষে রহিম ডাকাতই বলছে, “জানেন জীবনে ডাকাতি বা চুরি করতে গিয়ে আমি ধরা পড়ি নাই। কিন্তু আপনাদের বাড়ি চুরি করার পর যেখানেই গেছি ধরা পড়েছি। জেলে বসে চিন্তা করে দেখলাম, আপনাদের বাড়ি আমাদের পুণ্যস্থান ছিল। সেখানে হাত দিয়ে হাত জ্বলে গেছে। আপনার মা’র কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে বোধহয় পাপমোচন হতো।”

আমি বলছি না, ইতিহাস সাক্ষী দেয় বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাঁকে যারা হত্যা করেছিলেন এবং এসব হত্যাকারীদের যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও পুনর্বাসন করেছিলেন দেশে বা বিদেশে তাদের কারুরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বিচারের মাধ্যমে (দেশে) এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে (ভূট্টো ও গাদ্দাফী) তাঁদের নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। পুনশ্চঃ অনুমতি ব্যতিত বইটির কোন অংশ বিশেষ পুনর্মুদ্রণে নিষেধাজ্ঞা আছে। তবুও লিখেছি। এর মধ্যে মামলায় না জড়ালে আগামী সপ্তাহে আরেক প্রস্থ লেখার ইচ্ছে রইল।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক।
Email: qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ