পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই, ২০১২

* 'পারিবারিক মূল্যবোধের আকাল'

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                      উপসম্পাদকীয়                          ব্রাত্যজনের কথা

চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার ১৯ জুলাই ২০১২, ৪ শ্রাবণ ১৪১৯


সামনেই ঈদ। নিজের খরচ ছাড়াও প্রেমিকার জন্যে দামি কোন গিফট আর তার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার জন্যে একটি ল্যাপটপ। বেশ ব্যয়সাধ্য বটে। কিন্তু টাকারতো জোগাড় করতেই হবে। মা’কে কিংবা পরিবারে বললে তো আর একসাথে এত টাকা পাওয়া যাবে না কাজেই উপায় একটি বের করতেই হয়। কিডন্যাপ বা অপহরণ টাকা উপার্জনের একটি সহজ (!) তরিকা। ছেলেটি তাই নিজে নিজেই অপহৃত হলো। টেরিবাজারে বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে লালদীঘির পাড়ের একটি হোটেলে উঠে অন্য একটি সিম থেকে মায়ের কাছে ফোন করে জানানো হলো, তার সন্তান অপহৃত হয়েছে দু লক্ষ টাকা চাই....।

অবশ্য সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটির এই অপহরণ নাটক দীর্ঘ হতে পারেনি। তার আগেই সে ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। পুলিশ সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ছেলেটির বিরুদ্ধে মামলা না করে তাকে তার বাবার জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ কাজটি মন্দ করেনি। অপরিপক্ক এই তরুণের সংশোধনের একটি সুযোগ করে দিয়েছে তারা। খামাখা থানা পুলিশ বা কোর্ট হাজত করতে গিয়ে, বা হাজতে কিছু মন্দ লোকের কয়েক ঘণ্টার সান্নিধ্যও হয়ত, ছেলেটির ভবিষ্যতকে অন্যপথে ঠেলে দিতে পারতো। এই লেখাটি ছেলেটির পরিবারের কারো চোখে পড়বে কিনা জানি না। পড়ে থাকলে আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করবো ছেলেটিকে লজ্জা কিংবা অপমানজনক পরিস্থিতিতে না ফেলে তাকে বরং জীবনের বাস্তবতা, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বেশি করে শিক্ষা দিন। ঘটনাটি চট্টগ্রামের হলেও সঙ্গত কারণে ছেলেটি কিংবা তার পরিবারের পরিচয় দেয়া থেকে বিরত থাকলাম। ওর প্রেমিকা যাকে মধ্যপ্রাচ্যে, এ সংবাদ তাদেরও কানে যাবে কিনা জানি না। অথবা এমনও হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের তার প্রেমিকাটি আসলেই ভূয়া। ফেসবুকে তা হরহামেশা এমন ঘটনাই ঘটছে। এমন ফেসবুক বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় হওয়া থেকে জীবনসঙ্গী হতে গিয়ে নিজের জীবনইতো খুইয়েছেন অনেকে। এই ছেলেটির ঘটনাও তাই। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় তারপর প্রেম। আর সেই প্রেমিকার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্যে একটি ল্যাপটপ ও তাকে ঈদে উপহার পাঠানোর জন্যে মরিয়া ঐ ছেলেটি বিভ্রান্ত ও অপরিণামদর্শী। আর দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এমন বিভ্রান্ত ও অপরিণামদর্শী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বেশি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। সে খেয়াল আমাদের কারুরই নেই। অতি রাজনীতি ও টক শো প্রবণ বা ভারতীয় চ্যানেলের প্রভাবে বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের মা-বাবারা হয়ত জানেনই না এ মুহূর্তে তাদের প্রিয় সন্তানটি কোথায় কিংবা কার সাথে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে। এখনও হয়ত একবছরও হয়নি একটিমাত্র ল্যাপটপের লোভে প্রিয় বন্ধুকে খুন করে জমিয়তুল মসজিদ এলাকায় ফেলে গিয়েছিলো যে তরুণ সে দিব্বি ঐ বন্ধুর মরণোত্তর সকল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলো একজন শোকার্ত বন্ধুর মতোই। প্রিয় পাঠক, এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশে ঘটছে তা কিন্তু নয়।

কয়েকদিন আগে ভারতীয় একটি টিভি চ্যানেলে একটি ক্রাইম রিপোর্টধর্মী অনুষ্ঠানে দেখলাম, বিত্তশালী পরিবারের একমাত্র সন্তানটিকে খুন করেছে তারই সমবয়সী বন্ধুরা। কারণ টিনএজ এই ছেলেটিকে তার বিত্তশালী বাবা একটি দামি গাড়ি কিনে দিয়েছিলো। আর এতেই ওর বন্ধুদের ধারণা হলো বড়লোকের একমাত্র সন্তানটিকে অপহরণ করে মোটা অংকের টাকা আদায় করা সম্ভব হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু অপহরণের পরে পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে পাঁচ বন্ধু মিলে হত্যা করে নিরপরাধ ছেলেটিকে। এবার খুন হওয়া ছেলেটিরসহ অন্য পাঁচটি পরিবার বা তাদের মা-বাবাদের কথা ভাবুন। উঠতি বয়সী এই যুবকরা জীবনের কতটুকুইবা দেখেছে, কতটুকুইবা শিখেছে। কিন্তু অর্থ-বিত্ত-ভোগ-বিলাসের স্বাদ তারা পেয়ে গেছে। আর সে স্বাদ পূরণের জন্যে যেকোন কাজই তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়ে উঠছে। আমি বলেছি এ ধরনের সমস্যা শুধু বাংলাদেশ কিংবা শুধু ভারতেরই নয়। এ সমস্যা উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে যে সব দেশে সদ্য পুঁজির বিকাশ ঘটতে শুরু করেছে। কিংবা পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের ভোগবাদী সমাজের আছর পড়েছে যে সব দেশে। পুঁজিবাদ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির ডামাডোলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো হাট করে রেখেছে নিজেদের দুয়ার, আর অবলীলায় সেখানে ঢুকে পড়ছে পশ্চিমা বা আকাশ সংস্কৃতি। যেখানে আজ সকল কিছুই পণ্য। মা, মাটি, মানুষ এমন কি নিজেদের একান্ত গোপনীয়তাও। টাকা কামাও আর ভোগ করো’র মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে এসব দেশের তরুণসমাজ। ফলে ভেস্তে পড়েছে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও বন্ধন। স্বাতন্ত্র্য জীবনযাপন কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ভেঙে দিয়ে পরিবারপ্রথা পণ্যের চাহিদা বাড়াও। এই না হলে পুঁজির বিকাশতো সম্ভব নয়।

একান্নবর্তী পরিবারপ্রথা ভেঙে গেছে। যার যার মতো জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে সবাই। ফলে আগের মতো সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনও শিথিল হয়ে পড়েছে। খুপড়ির মতো ফ্ল্যাট বাড়ির চার দেয়ালে বন্দি হয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসীর মতোই হয়ে উঠছে অনেকের জীবন। ফলে এসব পরিবারে সন্তানরা বেড়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর আর অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে। এ ধরনের অনেক পরিবারে জীবন কাটে যার যার মতো করে। এসব পরিবারে পিতা-মাতা-সন্তানের সম্পর্কটিও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। এখানে নীতিকথার চর্চা হয় না। বাবা-মা সন্তানদের কাছে কোন সৎ মানুষ, ভালো মানুষের কথা বলেন না। কোন মনীষীর জীবনকথা শোনান না, স্বপ্ন বুনন করতে পারেন না কোন সন্তানের বুকে। কোন কোন ক্ষেত্রে বাবা-মা নিজেই আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন তাদের সন্তানদের কাছে। নিজের আয়ের সাথে ব্যয় কিংবা জীবনযাপনের সঙ্গতি না থাকায় পরিবারের অভিভাবকও মানসিকভাবে কুণ্ঠিত হয়ে থাকেন নিজ সন্তান বা পরিবারের অন্যদের কাছে। খুব কম মা-বাবাই আছেন যারা নিজ সন্তানকে সৎ হওয়ার শিক্ষা দেন। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের উৎসাহিত করেন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে। কিন্তু সে প্রতিষ্ঠার পথ কী? তার সাথে সততা বা মূল্যবোধের সম্পর্ক আছে কিনা তা বলে দেননা। এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংজ্ঞা হচ্ছে গাড়ি, বাড়ি-অর্থ-বৈভব। কিন্তু এর উৎস বৈধ কি অবৈধ তা নিয়ে ভাবেন না কেউ। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জমান এই সমাজব্যবস্থায় একজন সৎ মানুষের পরিচয় হয়ে ওঠে বোকা বলে। দ্রুত ধনী হয়ে উঠবার নগ্ন প্রতিযোগিতায় সমাজে আজ নীতি কথা বলে কিছু নেই। রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি মোটকথা সমাজের কয়জন লোককে দেখিয়ে আমার সন্তানকে বলতে পারি তুমি ওনার মতো হও। কাজেই এ সময়ের সন্তান যারা এমন বেপথু হয়ে পড়ছে তাদের দোষই- বা কতটুকু। আর্থ-সামাজিক অবস্থাইতো ওদের ভোগবাদী করে তুলছে।

কিন্তু এ থেকে তো পরিত্রাণ চাই। নতুবা ভবিষ্যৎ তো আরো বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে। একটি রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থাতো এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। সমাজের এই অবক্ষয় ঠেকাতে বিবেকবান মানুষের ঐক্য হওয়া জরুরি। পরিবারের ভেতর থেকেই প্রথমে মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। হাজার বছর থেকে চলে আসা সামাজিক মূল্যবোধ ও বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে। ব্যক্তি সৎ না হলে সমাজতো সৎ হবে না। আর বিশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রও ব্যর্থ হয়ে পড়বে।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা তাদের প্রয়োজনেই সমাজকে ভোগবাদী করে তোলে। বিলাসবহুল হোটেল, ক্যাসিনো, মদ ও নারী  আজ বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ। এর ঢেউ এসে পড়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যার আঘাতে ভেঙে পড়ে আমাদের আবহমান সমাজব্যবস্থা, সংস্কার ও প্রথা। আর এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে যে কেউ হয়ে পড়বেন সেকেলে ও অনাধুনিক।

যদি আমরা বোঝাতে পারতাম আমাদের সন্তানদের। জীবন ভোগের নয় উপভোগের। যদি আমরা বোঝাতে পারতাম একটি দামি মোবাইল সেটের চেয়ে একসেট রবীন্দ্র কিংবা নজরুল রচনাবলি অনেক বেশি আনন্দের ও উপভোগের। যদি আমরা বোঝাতে পারতাম ভোগে নয় ত্যাগেই শান্তি। যদি আমরা বোঝাতে পারতাম চিন্তাকে উষ্ণ করে জীবনযাপনকে করো সাধারণ তাহলে হয়ত, এই সংকট থেকে মুক্তির একটি পথ বেরিয়ে আসতো।

 লেখক : কবি, কলামিস্ট।
ইমেলঃ qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ