পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই, ২০১২

* ' এবং হুমায়ুন '

দৈনিক আজাদী                      উপসম্পাদকীয়                     কাল, আজ,কাল

২৬ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি ১১ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ৬ রমজান ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

রাত নয়টার দিকে অমানুষিক যন্ত্রণার মাঝে আমার সন্তানের জন্ম হলোআমার আর তারপর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান হলো ঘরভরা মানুষ। হৈ চৈ চেঁচামেচিতে কান পাতা যায় না। আমার ভাই বোনেরা ধাক্কাধাক্কি করে বাচ্চা দেখছে। আনন্দ উল্লাসে ঘর ভরপুর। ছেলে হয়েছে শুনতে পেলাম কিন্তু এক নজর বাচ্চাকে দেখতে পারলাম না। নিজ থেকে দেখতে চাইব এতবড় নির্লজ্জ কাজ করি কেমন করে? ---- আমাকে নিজের বিছানায় শুইয়ে বাচ্চাকে এনে দেয়া হলোমাথা ভরা কাল চুলটকটকে ফর্সা গায়ের রঙচোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেভাবখানা কিবলছিলে না আমার মুখ দেখবে না?এখনআমার বুকের ভেতর নড়েচড়ে গেল আমার প্রথম ছেলের মুখ দেখে। “তখনো আমি জানতাম না আমার এই ছেলে এককালে হুমায়ূন আহমেদ নামে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে সুপরিচিত হবে।” মা আয়েশা ফয়েজ তাঁর ‘জীবন যে রকম’ গ্রন্থে প্রথম সন্তান হুমায়ূন আহমেদের জন্মক্ষণটি তুলে ধরেছেন এভাবে।
বাচ্চার নাম রাখা হলো কাজল। কাজলের জন্মের খবর জানিয়ে তার বাবাকে টেলিগ্রাম করা হলো পরদিন ভোরে। তার তখন খুব কাজের চাপ। আসতে পারলো না। অন্যরা এল।
কাজলের বাবা বাচ্চা দেখতে আসার সুযোগ পেল এক মাস পর। তার খুব মেয়ের শখ ছিল।--- আমার সাথে যখন প্রথম নিরিবিলি দেখা হলো প্রথমেই বললোকাজলের ভাগ্য গণনা করে ফেলেছি!
কিভাবে করলে?
বই পত্র কিনে পড়াশোনা করেছিলাম।
কী আছে ভাগ্য?
অনেক বিখ্যাত হবে তোমার ছেলে। জান রাণী এলিজাবেথের ছেলে আর তোমার ছেলের জন্ম একই দিনেএকই লগ্নে?
আমি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসলামকোথায় রাণী এলিজাবেথ আর কোথায় আমি।
কাজলের বাবা গম্ভীর হয়ে বললোরাণীর ছেলে বিখ্যাত হবে বাবা মায়ের নামেআর আমার ছেলে বিখ্যাত হবে তার নিজের যোগ্যতায়তুমি দেখে নিও।”
গত সোমবার শহীদ মিনারে লক্ষ জনতার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের সময়ে সেই বিখ্যাত পুত্রের কফিনে মাথা রেখে মা আয়েশা ফয়েজের মনে চৌষট্টি বছর আগের স্মৃতি কি দোলা দিয়েছিল একবারও?
এমন অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী করাপেশায় পুলিশ অফিসারলোকটি কেমন ছিলেন?হুমায়ূনের লেখার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। “আমার ছোটভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল তার লেখা প্রথম গ্রন্থ কপোট্রনিক সুখ দুঃখের উৎসর্গ পত্রে লিখেছে “পৃথিবীর সবচেয়ে ভালমানুষটি বেছে নিতে বললে আমি আমার বাবাকে বেছে নেব।” বইয়ের উৎসর্গপত্রে লেখকরা সবসময় আবেগের বাড়াবাড়ি করেন। আমার ভাইয়ের এই উৎসর্গপত্র আবেগপ্রসূত ধরে নিতে খানিকটা অসুবিধা আছে। সে যদি লিখতো পৃথিবীর সবচে ভালমানুষ আমার বাবা এবং মা তাহলে আবেগের ব্যাপারটি চলে আসতো। সে তা না করে বাবার কথাই লিখেছে। পৃথিবীর সবচে ভাল মানুষটির মধ্যে মা’কে ধরেনি। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে তার উৎসর্গ পত্র আবেগ প্রসূত নয়। চিন্তাভাবনা করে লেখা। ইকবালকে আমি যতটুকু চিনি সে চিন্তাভাবনা না করে কখনো কিছু বলে না এবং লেখেও না।”
গত বৃহস্পতিবার হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন। এই এক সপ্তাহ জুড়ে বাংলাদেশের প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন নন্দিত এই লেখক। এবং বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই লেখকের বিচিত্র জীবন যাপনভাবনাআচরণ ইত্যাদি বিষয়ে জানতে পেরেছে দেশের অগণিত মানুষ। হুমায়ূন আহমেদতার পরিবার ও তার ছেলেবেলার কাহিনিগুলো বেশ চমকপ্রদ। মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তাঁর বাবাএ বিষয়ে তিনি লিখেছেনআমার বাবা পৃথিবীর সবচে ভাল মানুষদের মধ্যে একজন কিনা জানি নাতবে বিচিত্র একজন মানুষতা বলতে পারি। তার মতো খেয়ালিতার মতো আবেগবান মানুষ এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি। আবেগ ছাড়াও তার চরিত্রে আরও সব বিস্ময়ের ব্যপার ছিল। তিনি ছিলেন জন স্টেইনবেকের উপন্যাস থেকে উঠে আসা এক রহস্যময় চরিত্র। সবার আগে ছোট্ট একটা ঘটনা বলি। রাত প্রায় বারোটা। রঙমহল সিনেমা হল থেকে সেকেন্ড শো ছবি দেখে বাবা এবং মা রিকশা করে ফিরছেন। বড় একটা দিঘির পাশ দিয়ে রিকশা যাচ্ছে। মা হঠাৎ বললেনআচ্ছা দেখো কী সুন্দর দিঘি। টলটল করছে পানি। ইচ্ছে করছে পানিতে গোসল করি। বাবা সঙ্গে সঙ্গে বললেনরিকশা থামাও। রিকশাওয়ালা থামল। বাবা বললেন চলো দিঘিতে গোসল করি। মা হতভম্ব। এই গভীর রাতে দিঘিতে নেমে গোসল করবেন কিনিতান্ত পাগল না হলে কেউ এরকম বলেমা বললেন কী বলছো তুমি। বাবা গম্ভীর গলায় বললেন। দ্যাখো আয়েশা। একটাই আমাদের জীবন। এই এক জীবনে আমাদের বেশির ভাগ সাধই অপূর্ণ থাকবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে সব সাধ আছে। যা মেটানো যায় তা মেটানোই ভাল। তুমি আসো আমার সঙ্গে। বাবা হাত ধরে মাকে নামালেন। স্তম্ভিত রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে দেখলো হাত ধরাধরি করে দুজন নেমে গেলো দিঘিতে। এই গল্প যতবার আমার মা করেন ততবার তার চোখে পানি এসে যায়। তার নিজের ধারণা। তার জীবনে যে অল্প কিছু শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত এসেছিল ঐ দিঘিতে অবগাহন তার মধ্যে একটি।”
হুমায়ূন আহমেদ সারাজীবন তার লেখালেখির মাধ্যমে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধঘটনাদুঃখ বেদনাহাসি ও আনন্দের চিত্রই শুধু তুলে ধরেছেন তার গল্প,উপন্যাসনাটক ও চলচ্চিত্রে। আর এখানেই তার অসাধারণত্বযেভাবে কেউ লেখেননি আগেযে ভাষায় কেউ বলেন নি আগে। যে ঘটনা কেই তুলে ধরেননি আগেযে রসবোধের পরিচয় দেননি আগেএত সহজ করে বর্ণনা করেননি আগে হুমায়ূন তাই করেছিলেন। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এই হুমায়ূনবাদশাহ হুমায়ূনের তুলনায় কম শক্তিমান ছিলেন না। চলেছেন সম্রাটের মতোযখন যা ইচ্ছে তাই করেছেন।
মৃত্যুর আগে কেউ কেউ কি তা জেনে যায় খুব অবচেতন মনেআমরা এমন অনেককে দেখেছি মৃত্যুর আগে আগে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটাতে। হুমায়ূন আহমেদের ইনট্যুইশন কি এমন কিছু ধারণা দিয়েছিলনা হলে গত একুশের বই মেলায় তার উপন্যাস “মেঘের ওপর বাড়ি’ লিখলেন কেন ওভাবে। উপন্যাসটি একটি মৃত মানুষের দেখা বর্ণনা। শুরুটা এরকম, ‘আমি মারা গেছিনাকি মারা যাচ্ছি এখনো বুঝতে পারছিনা। মনে হয় মারা গেছি। মৃত অবস্থা থেকে অলৌকিকভাবে যারা বেঁচে ওঠে,তাদের মৃত্যু অভিজ্ঞতা হয়। এর নামNDE (Near death Experience )। বাংলায় ‘মৃত্যু অভিজ্ঞতা’ এই বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যার জন্যে যখন আমি এই উপন্যাস লিখিতখন ক্যান্সার নামক জটিল ব্যাধি আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে। এই খবরটা আমি জানি না। ক্যান্সার সংসার পেতেছে কোলনেসেখান থেকে রক্তের ভেতর দিয়ে সারা শরীরে ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার অবচেতন মন কি এই খবরটি পেয়েছেআমার ধারণা পেয়েছে। যে কারণে আমি উপন্যাস ফেঁদেছি একজন মৃত মানুষের জবানিতে। উপন্যাসে এক মহিলার কথা আছে,যার হয়েছে কোলন ক্যান্সার। সেই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে সারা শরীরে। বাসা বেঁধেছে লিভারেফুসফুসে। হঠাৎ এইসব কেন লিখলামজগৎ অতি রহস্যময়।”
রবীন্দ্র পাগলবৃষ্টি পাগলপ্রকৃতি ও মানুষ পাগল এই লোকটিসারাজীবন পৃথিবীর রহস্য উম্মোচনের চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও অনেক বার অনেক জায়গায় বলেছেন, ‘কোথাও একটি রহস্য আছে। তার এই উপন্যাসের শুরুতে তিনি লিখেছিলেন, (মৃত্যু অভিজ্ঞতা যাদের হয়তারা সবাই দেখেলম্বা এক সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। অন্তহীন যাত্রার শেষের দিকে খানিকটা আলো দেখা যায়। আলো আসে সুরঙ্গের শেষ মাথা থেকে। এই আলোর চুম্বকের মতো আকর্ষণী ক্ষমতা। কঠিন আকর্ষণে অন্ধের মতো আলোর দিকে এগিয়ে যেতে হয়।”
এই উপন্যাসের শেষটি হয়েছে এভাবে। “চারদিক কেমন জানি গুটিয়ে সিলিন্ডারের মতো হয়ে যাচ্ছে। সিলিন্ডারের শেষ প্রান্তে আলোর বন্যা। সেই আলোয় ভয়াবহ চৌম্বক শক্তি। আমি আলোর দিকে ছুটে যাচ্ছি। আমি পিছনে ফিরে বললাম পৃথিবীর মানুষেরা। তোমরা ভালো থেকো। সুখে থেকো। আমি ছুটে যাচ্ছি আলোর দিকে। আমি জানি আমাকে অসীম দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। অসীম কখনো শেষ হয় না। তাহলে যাত্রা শেষ হবে কীভাবে?
কে বলে দেবে আমাকে।”
আলোর দিকে ছুটে গিয়েছেন হুমায়ূন। জীবনকালেও যিনি ছিলেন আলোকময় তারকা।
আজ আকাশে কোন নক্ষত্র নেই
একটি নক্ষত্র খসে গেলে
তাদের শোকে ও মৌনতায়
ব্রহ্মাণ্ডে অন্ধকারের স্তূপ---
অন্ধকারে বসে ভাবছিঅনেক দুঃখ ও কষ্টেহতাশা ও বেদনায় প্রাপ্তি ও হাহাকারে আমাদের দীর্ঘকাল নির্মল আনন্দ দান করেছিলেন তিনি। যা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। বাংলা ভাষার ক’জন লেখকই তা পেরেছিলেন।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ