পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৯ মে, ২০১৪

'করপোরেট পুঁজির নমিনি নরেন্দ্র মোদি'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৯ মে বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ২৯ রজব ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল
৪৫ সদস্যের-মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে ভারতের পঞ্চদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন গুজরাটের অতি সাধারণ পরিবার
থেকে উঠে আসা নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদি। নির্বাচনে যেমন ক্যারিসমা দেখিয়েছেন তেমনি করে নিজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকেও জমকালো ও ব্যতিক্রমী করে তুলেছেন এই নতুন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের ইতিহাসে লাল বাহাদুর শাস্ত্রির পর তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি কোনো অভিজাত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য নন।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, যার ভোটার সংখ্যাও চুরাশি কোটির অধিক, ভারতের এই নির্বাচন,তার ফলাফল এবং বিজয়ী দল বিজেপি ও তার মনোনীত প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মোদিকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের কমতি ছিল না।

প্রতিবেশী ও অন্যতম বৃহৎ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতি, টেবিল টক, টক শোসহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই নির্বাচন। নির্বাচনের আগে বেশ কিছু জনমত জরিপে আগাম আভাষ দেওয়া হয়েছিল বিজেপির সম্ভাব্য বিজয় নিয়ে। কিন্তু বিজেপির এমন ভূমিধস বিজয় অর্জিত হবে, কিংবা প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেসের এমন ভরাডুবি হবে তা বাংলাদেশেতো নয়ই ভারতেও ভাবেনি কেউ।

নির্বাচনে বিজেপি ও তাদের জোটের বিজয়কে অনেকে নরেন্দ্র মোদির বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ মোদির জাদুতেই ভারতবাসী মজেছে ফলে ১৯৮৪ সালের পর এবারই এমন ‘ব্রুট ম্যাজরিটি’ পেয়েছে কোনো দল।

দেহরক্ষীদের গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর ভারতবাসীর সহানুভূতিকে পুঁজি করে তার প্রথম সন্তান যিনি মূলত ছিলেন একজন পেশাদার বিমানচালক, রাজিব গান্ধী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এখন চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ ও তথ্যানুসন্ধান চলছে মোদি জাদুর রহস্যটা কী তা জানার বা উদঘাটনের।

বলা হচ্ছে মোদিকে তৈরি করেছে করপোরেট পুঁজি তাকে হিরো করে তোলার, গ্রহণযোগ্য করে তোলার রাজনৈতিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় সকল ক্ষেত্রই প্রস্তুত করা হয়েছিল। যিনি নিজ দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘৃণিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন তাঁর নিজ রাজ্য গুজরাটে নিরীহ মুসলিম হত্যার অভিযোগে। মাত্র কয়েকমাস আগেও যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ভিসা নিষিদ্ধ ছিল, সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিজয়ের সাথে সাথে মোদিকে অভিনন্দন জানান। নির্বাচনের আগে আগে মোদির বিজয়ের সম্ভাবনা দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চতম প্রতিনিধিদল মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। এসব সম্ভব হলো কী করে। রক্তের দাগ লেগে থাকা হাতে পুষ্পস্তবক ঠাঁই পেল কী করে।

বলা হচ্ছে মোদির গুজরাট মডেল অর্থাৎ তাঁর রাজ্যের উন্নয়ন মডেল আকর্ষণ করেছে ভারতবাসীকে। দেশের চেয়ে রাজ্যের জিডিপি বেশি এবং সে সাথে এক ধরনের দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠারকারণেই মোদির নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রেখেছে ভারতবাসী। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায় ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতে বিজেপির মতো একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক দল এবং তার নেতা মোদি যিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উস্কানিদাতা ও এক সময়ের আর এস এসের সক্রিয় কর্মী। তিনি কীভাবে এমন বিজয় অর্জন করতে পারেন।

এর কিছু কারণ চিহ্নিত করলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে এবং তা থেকে একটি শিক্ষা ও অন্তত নেওয়া যাবে বলে মনে হয়।

ভারতে এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে টেলিভিশনের সংখ্যা কত তা আমরা জানি না। আমরা শুধু তাদের হিন্দি ও বাংলা চ্যানেলগুলোই দেখি যার সংখ্যাও চল্লিশের কম নয়। ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ও বিভিন্ন চ্যানেল আছে যা ভাষাগত কারণে আমাদের দেশে দেখে না কেউ। ভারতীয় এসব হিন্দি ও বাংলা চ্যানেলগুলো আমাদের দেশেও ভাষণ জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা অর্জনের ও তা ধরে রাখার জন্যে করপোরেট পুঁজিওয়ালার নিরন্তর গবেষণা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানের দিকে লক্ষ্য করলে তা স্পষ্ট হবে। প্রায় ১০০ কোটি সনাতন ধর্মের দেশের ধর্ম যে একটি মূল্যবান পণ্য বা রেমঢলর্ড তা বুঝতে দেরি করেনি করপোরেট হাউজগুলো। ওসব টেলিভিশনে যেহেতু সিরিয়ালগুলো বেশ জনপ্রিয় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিরাট একটি অংশ এর দর্শক সেহেতু এসব নাটক ও সিরিয়ালগুলোতে ধর্ম ও ধর্মাচারের ব্যবহার হতে থাকলো যথেষ্টভাবে। ধর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে জনপ্রিয় করতে কাজে লাগানো হয় এসব নাটক ও সিরিয়ালকে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বেশি পূজা-অর্চনা, মোর্চা সিঁদুর আর বিভিন্ন আস্তানাবাজিদের কেরামতি দেখাতে দেখাতে সমাজকে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভাববাদী বা অদৃষ্টবাদী করে তোলা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মধ্যরাতের পর বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে তাবিজ কবজ, পানি পড়া, হনুমানজির রক্ষা কবজ, বিভিন্ন মায়ের প্রতিকৃতি সম্বলিত কবজ আর ভোরে বিভিন্ন বাবাজির ফুলে ফুলে শোভিত আসন থেকে ধর্মীয় বয়ান। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমন প্রচার প্রপাগান্ডায় মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার আর সে সাথে ধর্মান্ধতা। এসবরই প্রতিরূপ দেখতে পাই রাজনীতিতে এবং তার ফলে এই উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর জনপ্রিয়তা।

এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানের উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান, সে সাথে আফগানিস্তানেরও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ও সংখ্যালঘুদের ওপর নানা সময়ের নির্যাতন ভারতীয় জনগণকে সাম্প্রদায়িক দলকে সমর্থন দানে অনুঘটকের কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করি আর তা হলো পাকিস্তানের কিছু জঙ্গি কর্তৃক ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় অনেক ভারতীয় অপমানিত ও আহত বোধ করে,তাদের ধারণা এক্ষেত্রে কংগ্রেস যথার্থ ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এদেরই অনেকের ধারণা এক্ষেত্রে বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদির মতো নেতা থাকলে পাকিস্তানিদের আরও কঠোর জবাব দেওয়া যেত। তার মানে ভারতের জনগণের একটি বিশাল অংশ এখন কঠোর ও যুদ্ধাংদেহী একটি সরকার দেখতে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি আগ্রহী।

বিজেপির বিপুল বিজয় ও কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য কংগ্রেসও কম দায়ী নয়। প্রথমত দুর্নীতি দমন করতে না পারা, মন্ত্রীদের অনেকেই দুর্নীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা এবং সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারা ছিল কংগ্রেস ও তাদের সমর্থিত জোট সরকারের ব্যর্থতা। এর পাশাপাশি কংগ্রেসের দলীয় একটি সিদ্ধান্ত ছিল চরম আত্মঘাতি আর তা হলো প্রণব মুখার্জিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা। এরফলে এই নির্বাচন মোদির সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো কংগ্রেসে সর্বভারতীয় নেতা ও দলের কাণ্ডারি কেউ ছিলেন না। রাহুল গান্ধী তেমন কোনো ক্রেজ তৈরি করতে পারেননি।

এত কিছুর পরেও নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সাফল্যকে খাটো করে দেখার জো নেই। কারণ অতি সাধারণ পরিবারের এই সন্তান রাজনীতিতে হাত পাকানোর পাশাপাশি নিজেকে যোগ্য ও শিক্ষিত করে তুলেছেন নিজের প্রচেষ্টায়। গুজরাটে আহত, নিহত সর্বস্বহারা সংখ্যালঘু মুসলিমরা ন্যায় বিচার না পেলেও সংখ্যাগুরুদের স্বার্থে তিনি যেখানে সুশাসন কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠা করেছেন। উন্নয়ন করেছেন গুজরাটের। কাজেই করপোরেট পুঁজিদাতারা সঠিক ব্যক্তিকেই বেছে নিয়েছেন বলা যেতে পারে।

এখন মোদি গুজরাটের নন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আর ভারত একটি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ক্ষমতার বাইরে থেকে মাঠ গরম করার মতো অনেক কিছুই বলা যায় কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সবকিছুই সংযমী ও সতর্ক হতে হয়। বাবরী মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের ঘোষণা কার্যত কতটা বাস্তবায়ন করা যায় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বারাক ওবামা যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন এখন এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশের কোটি কোটি জনগণ ভেবেছিল এবার হয়ত মার্কিন নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন হবে। কিন্তু বাস্তবে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করে ওবামা ব্ল্যাক বুশেই পরিণত হয়েছেন, চলমান মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেননি তিনি। এবার আমরা অপেক্ষা করি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনায় মোদি কতটা উগ্র ও কট্টর হয়ে থাকতে পারেন। নাকি করপোরেট পুঁজিওয়ালাদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়ে ধর্মীয় জিগির তুলে ধর্মকে পুঁজি করে বিস্তৃত করবে বাজার। আর প্রতিবেশী দুদেশের মধ্যে ভারত-পাকিস্তান মারদাঙ্গা মনোভাব জিইয়ে রেখে অস্ত্র বাজারের বিস্তৃতি ঘটাতে তৎপর থাকবে। ভারতের নতুন সরকারকে যুদ্ধংদেহী করে তোলা গেলে মার্কিন অস্ত্র নির্মাতাদের বাজার প্রশস্ত হবে। আর আমরা বিশ্ববাসী কে না জানি যে, এসব অস্ত্র বিক্রেতার পক্ষে প্রকাশ্য দালালি করতে যুক্তরাষ্ট্রের খোদ প্রেসিডেন্টেওর লাজ লজ্জা থাকে না।

ভারতে যে প্রক্রিয়ায় প্রচার মাধ্যম নরেন্দ্র মোদিকে শিখণ্ডী করে তুলেছে। আমরা একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবো ঠিক একই কায়দায় বাংলাদেশেও তেমনটি করার চেষ্টা চলেছিল বিগত দুতিন বছর ধরে। কিছু কিছু গণমাধ্যম বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে বারবার একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রতি জনসমর্থন দেখানোর চেষ্টা করেছে এবং এই লক্ষ্যে বারবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও উচ্চ আদালতের রায় ইত্যাদি বিষয় উহ্য রেখে বারবার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিকে একটি সময় অত্যন্ত পক্ষপাতমূলক বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশে এই শক্তিটি চেষ্টা করে, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও পলাতক আসামি তারেক জিয়া, আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সাথে যার যোগাযোগ আছে বলে অভিযোগ আছে তাকে বাংলাদেশের মোদি করে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক দুর্নীতি-দুঃশাসনের স্মৃতি জনগণের মন থেকে অপসৃত না হওয়ায় এবং আমেরিকার হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে নিজ সিদ্ধান্তে শেখ হাসিনা অটল থাকার কারণে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অন্য ধরনের হয়েছে। বাংলাদেশে গত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই করপোরেট মিডিয়া হাউজগুলোর চক্রান্ত থেকে থেমে থাকবে না ভবিষ্যতে তা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশেও একজন নরেন্দ্র মোদি তৈরি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

ভারতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার দায় নিতে হয়েছে কংগ্রেসকে। বিগত কিছুদিনের ঘটনায় মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগও সে পথেই অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ মনে হয় আওয়ামী লীগ নিজেই বাংলাদেশে একজন নরেন্দ্র মোদির আগমনের পথকে মসৃণ করে তুলছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২২ মে, ২০১৪

'চিকিৎসকদের নিয়ে আরেক প্রস্ত'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২২ মে বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ২২ রজব ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল
গত সপ্তাহে চিকিৎসকদের নিয়ে লেখাটি ছাপা হওয়ার পরে অনেকে ফোনে, ফেসবুকে, ইমেইলে ও খুদে বার্তায় তাদের প্রতিক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখাটির জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। তাঁদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। দু একজন ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন। ফেসবুকে একজন লিখেছেন আপনি ডাক্তারদের পেছনে লাগলেন কেন? আমি উত্তরে লিখলাম-ভয়ে, চিকিৎসকদের বর্তমান যে মারমুখি আচরণ দেখছি সামনা-সামনি লাগতে গেলে জান নিয়ে ফেরত আসা যাবে না। আমার এক কবিবন্ধু লিখেছেন-প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের অর্থ ব্যয় হয়। আমি যেহেতু পেশায় একজন সাংবাদিক তাই তিনি তা উল্লেখ করতে ভুলে যাননি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের পেছনেও সরকারের অর্থ ব্যয় হয় তাহলে শুধু ডাক্তারদের খোঁচা দিচ্ছি কেন। বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখেছি-সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্য চিকিৎসকরা সংবাদ শিরোনাম ও সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন বলে তাঁদের নিয়ে লিখেছি। সব পেশা নিয়ে লিখতে গেলে তা না হয়ে মহাভারত হয়ে উঠবে।

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, গবেষক ও চিকিৎসক ডা. মাহফুজুর রহমান লিখেছেন-ডাক্তার ও শিক্ষার্থীরা এসব ভুলে যায় মাঝে মধ্যে মনে করিয়ে দিও যে, সরকার তথা জনগণের অর্থ ব্যয় হয় এঁদের ডাক্তার হয়ে ওঠায়। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেকে অনুরোধ করেছেন ভুয়া ডাক্তারদের নিয়ে লিখতে।

সত্যি করে বলি-কোনো নির্দিষ্ট পেশা তা যদি চিকিৎসা পেশার মতো মহৎ হয় তার বিরুদ্ধে আমার বিশেষ কোনো ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নেই। চিকিৎসকদের বর্তমান অসংযত আচরণ দেখে সে বিষয়ে লিখেছি শুধু। আর যা লিখেছি ভুলতো কিছু লিখিনি। বরং লেখাটি প্রকাশ পাওয়ার পরে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে যা শুনেছি তাতে মনে হলো আমিতো কিছুই লিখিনি। এরই মধ্যে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নার্সদের পিটিয়েছে ইনটার্নরা। তাতে ধর্মঘটে গেছে নার্সরা। অর্থাৎ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি সামান্যতমও।

চিকিৎসকদের সাথে প্রায়ই সংঘাত বাঁধে রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে। বিশেষ করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কিছু কিছু রোগী মারা গেলে রোগীর আত্মীয়দের সাথে চিকিৎসকদের সংঘাত লেগে যায়। এর কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। প্রথম ও প্রধান কারণটি হচ্ছে চিকিৎসকদের ওপর রোগী ও তার স্বজনদের অনাস্থা। মৃত্যুরকারণ নিয়ে ডাক্তার যা-ই বলুক রোগীর স্বজনরা তা বিশ্বাস করে না। তাদের ধারণা ডাক্তারের অবহেলা নতুনবা ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে। হতে পারে কিছু কিছু ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার কারণে, কিন্তু সবতো তা নয়। তবুও ডাক্তারদের দায়ী করা হয়। তার কারণ ওই যে বললাম আস্থা বা বিশ্বাসের জায়গাটি তৈরি করতে পারেনি আমাদের দেশের চিকিৎসকরা। রোগীদের প্রতি দুর্ব্যবহার, অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাবের কারণে দিনে দিনে তৈরি হয়েছে এই অবিশ্বাস ও অনাস্থা। দুর্ব্যবহারও অনেক সময় অবহেলার কারণ নিয়ে চিকিৎসকদের ব্যাখ্যাও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সরকারি হাসপাতাল ও ডিসপেন্সারিতে এত এত রোগী সামলাতে হয় যে, তখন তাদের মেজাজ-মর্জি ঠিক রাখা দায়। কারণটি পুরো নয়,আংশিক সত্য। বাংলাদেশে শুধু যে চিকিৎসকরাই খারাপ ব্যবহার করেন তা কিন্তু নয়। নার্স ও আয়ারাও রোগী ও তার স্বজনদের সাথে মাঝে মধ্যে এমন আচরণ করেন মানুষ তা ভিক্ষুকের সাথেও করে না। আমরা মেনে নিতে পারি সরকারি হাসপাতালগুলোয় অত্যধিক রোগীর কারণে না হয় চিকিৎসকরা বিরক্ত হলেন কিন্তু ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালেও কেন রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পায় না। মানবিক আচরণ পায় না। একটু মমতা সহানুভূতি পায় না। একটি প্রবাদ আছে এমন হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি কোনো প্যাথিই কাজ করবে না যতক্ষণ না রোগীর প্রতি ডাক্তারের সিমপ্যাথি না থাকবে। থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুর বা উন্নত দেশের চিকিৎসা পদ্ধতি বা সেবার কথা বাদই দিলাম পার্শ্ববর্তী ভারতের চেয়েও এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। এমনকি কলকাতার চেয়েও।

অথচ একটি সময়ে এমন ছিল না। চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগী ও তার পরিবারের ছিল হার্দিক ও আন্তরিক সম্পর্ক। ছোটবেলায় আমাদের দেখলেই পাড়া বা এলাকার ডাক্তাররা জিজ্ঞাসা করতেন তোর বাবা কেমন আছে রে। আমাদের গ্রামের বাড়ি গহিরার বিখ্যাত ডাক্তার মতিলাল শর্মা। সবাই মতি ডাক্তার নামেই ডাকতেন। তাঁর চেম্বার ছিল গহিরার কালাচাঁদ হাটে। ঘরের কারো কিছু হলেই মা অথবা বাবা বলতেন ‘তোর মতি মামার কাছে যা।’

মতি মামা কাগজের দাগ শিশিতে মিক্সার ভরে দিতেন। জগতের চরম বিস্বাদময় সে ওষুধ খেয়ে আমরা ভালো হয়ে যেতাম। সবার সাথে সব পরিবারেই ছিল মতি মামার অবাধ প্রবেশাধিকার। আমার মায়ের নাম ধরে ডাকতেন। মা ডাকতেন তাঁকে দাদা বলে। মামা ধুতি পরতেন আর সাইকেল চালাতেন। আমার নানার বাড়িতেও দেখতাম মামা রান্না ঘরে বসে চা খাচ্ছেন। আমি দীর্ঘদিন তাঁকে আপন মামা হিসেবে ভেবেছি। কারণ ব্যবহার ও আন্তরিকতায় নিজ মামা আর তাঁর মধ্যে কোনো তফাৎ দেখিনি। মামা কোনো পাশ করা ডাক্তার ছিলেন না। একজন ফার্মাসিস্ট ছিলেন মাত্র। শহরে যে এলাকায় আমরা থাকতাম অর্থাৎ কোরবানীগঞ্জ। সেখানে দুজন বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. রবীন্দ্র চন্দ্র বনিক ও ডা. এম এ রউফ। তাঁরা দুজনেই ছিলেন সিম্পল এম বি বি এস পাস। অথচ এমন কোনো রোগ ছিল না যার চিকিৎসা এরা দুজন করেননি। গর্ভবতী নারী ও বিভিন্ন

মেয়েলি রোগ থেকে শুরু করে ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়ার কাজও তাঁরা সুচারুভাবে করেছেন। পাড়া ও মহল্লার লোকদের সাথে তাঁদের ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। পেশার বাইরে মানুষের সুখ দুঃখের খবর নিতেন এঁরা। প্রথম কয়েকটি সন্তান অ্যাবরশন হওয়ার পরে আমার মেজো ভাইয়ের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো সম্পূর্ণভাবে ডা. এম. এ রউফের তত্ত্বাবধানে। এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ত্রঁদের ছিল না। নাড়ি টিপে, চোখ দেখে, আর জিহ্বা দেখেই বলে দিতেন রোগের নাম। ওঁদের দেখে কিংবা এঁদের সাথে কথা বলেই অনেক রোগী অর্ধেক সুস্থ হয়ে যেতেন। শুধু ডা. বণিক বা ডা. রউফ নন। তখন মানে আজ থেকে মাত্র ২০/৩০ বছর আগেও আমাদের সমাজের চিকিৎসকরা এমনই ছিলেন। সর্বরোগের ওষুধ দিতেন তাঁরা। আর পাড়ায় পাড়ায় তাঁদের চেম্বার থাকায় রোগীদের সুবিধাও হতো তাদের সেবা পাওয়া। এখন সব ডাক্তারই বিশেষজ্ঞ। সবারই ফি ৪০০ টাকার ওপরে। সবার সাথে দেখা করতে আগে থেকে নম্বর নিয়ে রাখতে হয়। এখন সাধারণ ফিজিশিয়ান খুব কম। সবাই প্রায় অসাধারণ (বিশেষজ্ঞ) । এখন সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য আলাদা আলাদা ডাক্তার। চোখের ডাক্তার একজন হলে ভ্রূ’র ডাক্তার অন্যজন। তিনমাস অপেক্ষা করে ফেরেশতার মতো যে ডাক্তারের দেখা বা সাক্ষাত পাওয়া গেল দেখা গেল ৩ মিনিট ধরে যাবতীয় টেস্টের ফিরিস্তি লিখে ডাক দিলেন, ‘নেক্সট’। সমাজে এখন মতিলাল শর্মা, রবীন্দ্র চন্দ্র বণিক ও ডা. এম এ রউফদের মতো চিকিৎসকদের সংখ্যা কমে গেছে বলে সেবার মান হ্রাস পেয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী ডাক্তারদের এখন কসাই বলে সম্বোধন করেন। অথচ ছোটবেলায় দেখেছি একেকটি ডাক্তারখানা বা ডাক্তারের চেম্বারকে কেন্দ্র করে পাড়া-মহল্লার মুরুব্বিদের মিলনকেন্দ্র গড়ে উঠতো।

চিকিৎসকদের নিয়ে সমাজে এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির নতুন বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে ভুয়া ডাক্তার ও ভুয়া ডায়াগনোসিস সেন্টারগুলো। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে সরকারি চাকরি করেছেন এবং বেশ বড় পদে পর্যন্ত প্রমোশন পেয়েছেন এমন ভুয়া ডাক্তারের নজিরও আছে দেশে। কোনো ডিগ্রি নেই অথচ নামের পরে দু’চার পাঁচখানা ডিগ্রির উল্লেখ করে দিব্যি চেম্বার খুলে বছরের পর বছর মানুষকে ঠকিয়ে যাচ্ছেন। ভুল চিকিৎসা দিয়ে জীবন কেড়ে নিচ্ছেন এমন নজিরতো ভুরি ভুরি দেশে। বড় বড় ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনোসিস সেন্টারগুলোতে এমন অনেক ভুয়া ডাক্তার আছেন যারা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মাঝে মাঝে চাঁদা দিয়ে এমন বিপজ্জনক ও অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এ ধরনের ভুয়া ডাক্তার ও ভুয়া ডায়াগনোসিস সেন্টারের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয় কিন্তু ফলপ্রসূ কিছুই হয় না। দু’চার-পাঁচদিন বন্ধ থাকার পরে আবার যথারীতি চলতে থাকে তাদের অবৈধ কাজকারবার। এ ধরনের অজ্ঞ ও ভুয়া চিকিৎসকদের পাল্লায় পড়ে কত রোগী ও তাদের পরিবারের সর্বনাশ হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য দফতর থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের কারো কাছেই কোনো সঠিক তথ্য নেই এবং এ ধরনের নকল ডাক্তার প্রতিরোধে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপও নেই কোনো কর্তৃপক্ষের।

নকল ডাক্তার, নকল ওষুধ, ভেজাল ওষুধ, নিয়ন্ত্রণহীন চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বাজারের জন্য বাংলাদেশ এখন স্বর্গরাজ্য। কারণ এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের প্রতিকারে কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে নেই। থাকলেও টাকার বিনিময়ে তারা ম্যানেজ হয়ে থাকেন। আর জীবন দিয়ে অঙ্গ দিয়ে পঙ্গু হয়ে এসব অপকর্মের মূল্য পরিশোধ করেন নিরপরাধ অসহায় জনগণ।

আমি বলছি না পেশার দিক দিয়ে শুধু চিকিৎসকরা খারাপ। সকল পেশার মধ্যেই এমন অসৎ অসাধু ও অমানবিক ব্যক্তি আছেন। আমাদের সাংবাদিক সমাজেও আছেন। আবারও উল্লেখ করতে হয় চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক আচরণের জন্যেই তাদের নিয়ে লিখতে হলো। অন্য পেশার লোকরা ধোয়া তুলসি পাতা নন।

আসলে পচন যখন মাথায় ধরে তখন তা ছড়িয়ে পড়ে শরীরের সর্বাঙ্গে। আমাদের সমাজের মাথায় পচন ও অবক্ষয় হওয়াতে সমাজের সর্বক্ষেত্রে দুরবস্থা বিরাজ করছে। এর থেকে আমরা কেউই মুক্ত হতে পারছি না। সমাজ এখন এতটা অমানবিক হয়ে উঠেছে যে চার-চার পাঁচটি মৃত্যু, হত্যাকাণ্ড,খুন খারাবি আমাদের খুব একটা স্পর্শ করে না। গত মঙ্গলবার ফেনী শহরেই প্রকাশ্যে গুলি করে ও গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে ফুলগাজি উপজেলা চেয়ারম্যানকে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের নির্মমতা আমরা ভুলতে না ভুলতে ঘটল এই ঘটনা।

কয়েকদিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরি ডুবি শিক্ষার্থী নিহত হওয়ায় সে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট বক্তৃতা দিতে গিয়ে কেঁদেছেন এবং দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রেখে তার ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

আমার কাছে অনেকে জানতে চেয়েছেন আমাদের দেশে কি এমন নজির দেখবো কখনো? আমি বললাম এমন ঘটনার জন্য যদি পদত্যাগ করতে হয় তবে তো আমাদের দায়িত্বশীলদের পাবলিক টয়লেটের মতো ক্ষমতায় আসা-যাওয়া চলতে থাকবে হরদম।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ১৫ মে, ২০১৪

'চিকিৎসকরা হঠাৎ অসহিষ্ণু কেন?'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৫ মে বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ১৫ রজব ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
হঠাৎ করে দেশের চিকিৎসকরা অসহিষ্ণু ও মারমুখী হয়ে উঠেছেন। কোনো পূর্ব ঘোষণা বা আলটিমেটাম ছাড়া কর্মবিরতি করছেন অর্থাৎ চিকিৎসা সেবা বন্ধ ঘোষণা করছেন। এরফলে হাজার হাজার রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে চিকিৎসার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ পেশায় যারা জড়িত, মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন যে পেশার সাথে জড়িত তারা এমন আচরণ করতে পারেন কি? বিষয়টি কতটা যৌক্তিক, মানবিক এবং পেশার সাথে সংগতিপূর্ণ। চিকিৎসকরাতো সাধারণ কোনো পেশা বা শ্রমিক শ্রেণীর নয় যে, ইচ্ছে করলেই কর্মবিরতি পালন করতে পারেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসকরা এমন অমানবিক আচরণই করছেন। রোগীদের জিম্মি করে তারা তাদের দাবি আদায় করে নিতে চাইছেন।

এ লেখাটি লিখতে বসার একটু আগে (মঙ্গলবার রাত ১টা, বস্তুত বুধবার) একটি টিভি চ্যানেলে দেখলাম- সাক্ষাৎকার দেওয়ার নাম করে সিকদার মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক এক সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে বেদম প্রহার করেছেন। এই পর্যন্ত ঘটে যাওয়ার মধ্যে এটি শেষ ঘটনা। বৃহস্পতিবার লেখাটি পাঠকদের কাছে যাওয়ার আগে আরও ঘটনা হয়ত ঘটতে পারে। এর আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, তারপরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ওপর হামলা। আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসা না দেওয়া, ইন্টার্নি চিকিৎসক কর্তৃক ইনজেকশন দিয়ে রোগী মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া ইত্যাদি অনেক অনেক ঘটনা। রাজশাহীর ঘটনার পর সারা দেশে এখন চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের সম্পর্ক অনেকটা শাপে-নেউলের মতো দাঁড়িয়েছে।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ, ভাবছি হঠাৎ চিকিৎসকরা এমন আচরণ করছেন কেন? নিজের পেশার মহত্ব ভুলে তাঁরা যদি অন্য দশটি মানুষের মতো আচরণ করেন তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে, তাদের চিকিৎসা হবে কী ভাবে। এমনিতে দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রতি অনাস্থার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য চলে যান। এমনকি খুব সাধারণ অসুখ বা পরীক্ষার জন্যেও অনেকে দেশের চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের ওপর ভরসা করতে পারেন না। এভাবে অর্থাৎ শুধু চিকিৎসার জন্যেই বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশে অনেক অভিজ্ঞ ও বিশ্বমানের চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও শুধু আস্থার সংকটের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রবণতা আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি করবে সন্দেহ নেই।

একবার এক চিকিৎসকের চেম্বারে আমার আগের নম্বরে থাকা রোগী ডাক্তারকে ফিস কম দিতে চাইলে ডাক্তার সাহেব ভীষণ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, আমার বাবা হালের গরু বিক্রি করে আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আমাকে ডাক্তার বানিয়েছেন ফিস কম নেওয়ার জন্যে নয়। আমি সে সময় প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম, ডাক্তার সাহেব একটু ভুল বললেন। আপনার ডাক্তারি পড়ার খরচ আপনার বাবার গরু বেচার টাকায় শুধু হয়নি, তা সম্ভবও নয়। ডাক্তার বানাতে আপনাদের মতো একেকজন ছাত্রের জন্য সরকারকে কয়েক লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। আর সরকারি টাকা মানে তা জনগণের টাকা। ওই রোগী এবং আমার বাবার টাকাও আছে তাতে। আপনিতো সরকারি হাসপাতালেই পড়েছেন। আমার কথা শুনে ডাক্তার সাহেব খুশি হননি হওয়ার কথাও নয়। মাঝখানে যা ঘটল তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কটি নষ্ট হয়ে গেল।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কথা পরে বলব। আগে সরকারি মেডিকেল কলেজ নিয়ে বলি। এসব কলেজে যাঁরা পড়েন নিঃসন্দেহে তাঁরা দেশের অত্যন্ত মেধাবী সন্তান। যোগ্যতার কঠিন পরীক্ষা দিয়ে তাঁরা মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পান। মেডিকেলে লেখাপড়া করাও অনেক কষ্টকর। প্রচণ্ড মনোযোগী ও স্মরণশক্তির অধিকারী হতে হয় তাদের। এমবিবিএস পাস করলেই যে ভালো বেতনের চাকরি পান অথবা প্রাকটিস করে ভালো রোজগার করতে পারেন- তা কিন্তু নয়। প্রতিনিয়ত তাঁদের পড়াশোনা করতে হয়। রোগ-রোগী চিকিৎসা ও ওষুধের নব নব অধ্যায়ে তাদের সমকালীন অর্থাৎ আপ-টু-ডেট থাকতে হয়। চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়নও বেশ ব্যয়বহুল। যা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির পক্ষেও অনেক সময় সম্ভব হয় না। তবে অনেক সময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে কারণ এইখাতে অর্থাৎ একজন চিকিৎসা শাস্ত্রের ছাত্রের পেছনে সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। ধনী-গরিব যাই হোক একজন ডাক্তার তৈরি করতে সরকারের কোষাগার থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার ব্যয় আর সরকারি কলেজের ব্যয় পাশাপাশি দাঁড় করলেই তফাৎটা পরিষ্কার হবে। এ ছাড়া পেশার মধ্যে একমাত্র চিকিৎসকদেরই পাস করার পরে একটি শপথ নিতে হয়- সেখানে যা লেখা থাকে খুব দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বেশিরভাগ চিকিৎসকই তা ভুলে যান। অথবা ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। ওই শপথনামা যদি চিকিৎসকরা মেনে চলেন তবে তাঁকে হত্যা করতে আসা ব্যক্তিটি যদি আহত হন তার চিকিৎসা করাটাও ডাক্তারের পবিত্র দায়িত্ব। কারণ একজন বিচারকের মতো চিকিৎসকরাও রাগ-অনুরাগ- ক্রোধ ও প্রতিশোধে বশবর্তী হতে পারেন না।

বর্তমান চিকিৎসা-ব্যবস্থা ও চিকিৎসকদের অসহিষ্ণু আচরণের জন্যে কয়েকটি কারণকে আমি চিহ্নিত করেছি-

১। পেশার চেয়ে রাজনীতির প্রতি বেশি মনস্ক হওয়া।

২। রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠার প্রবণতা। সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া।

৩। বর্তমান সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ডাক্তার তথা সরকারি ডাক্তারদের গ্রামে পোস্টিং হলে সেখানে থাকতে বাধ্য করার প্রতিক্রিয়া

৪। জামায়াত-শিবির সমর্থিত চিকিৎসকদের অন্তর্ঘাতমূলক প্ররোচনা।

দেশের প্রায় মানুষই জানেন চিকিৎসকরা মূলত দুটি রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত। একটি আওয়ামীলীগ ও প্রগতিশীল অংশের যা স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদ (স্বাচিপ) ও অন্যটি বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তখন সে সরকার সমর্থিত ডাক্তারদের সংগঠন বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে হাসপাতালের ওষুধ বেচা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সংগঠনের নেতাদের মর্জিতেই মোটা টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্য হয়ে থাকে। প্রতিপক্ষের নেতারা তখন গ্রাম বা প্রত্যন্ত ও অলাভজনক স্থানে বদলি হয়ে পড়ে থাকেন বছরের পর বছর। অবশ্য মোটা টাকার বিনিময়ে তার ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে। স্বাচিপ আর ড্যাবের জ্বালায় অতিষ্ঠ অনেক দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকরা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন শেষ পর্যন্ত এমন নজিরও আছে। এ কারণে সরকারি ডাক্তাররা চিকিৎসায় মনোযোগী না হয়ে শুধু ওপরওয়ালাকে তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট থাকেন বেশি।

চিকিৎসকরা সমাজের বাইরের কেউ নন। কাজেই বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা ও ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের বাইরে থাকতে পারছেন না তারা। আমাদের সমাজ ক্রমশ অমানবিক, নির্দয় ও নির্মম হয়ে উঠছে। চরম অসহিষ্ণু ও হিংসাত্মক হয়ে উঠছে, যা বাঙালির হাজার বছরের চরিত্র ও মানস গঠনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কাজেই যে কোনো প্রকারে রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠা, খ্যাতি ও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার একটি প্রবণতা কাজ করে তাদের মধ্যে। রোগীর কাছ থেকে মোটা অংকের ফি নেওয়ার পরেও শুধুমাত্র কমিশনের লোভে তাদের দিয়ে অনর্থক কিছু টেস্ট করিয়ে নেন অধিকাংশ চিকিৎসকরা। প্রতিদিন কতজন রোগী দেখবেন বা একজন চিকিৎসকের পক্ষে ভালো করে দেখতে গেলে কতজন রোগী দেখা সম্ভব সে নিয়মটাও তারা মানেন না। এর মধ্যে ভুল চিকিৎসা। ভুল ডায়াগনোসিস ও ওষুধ কোম্পানির উপটোকন নিয়ে নিম্নমানের, ভেজাল ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রেসক্রাইব করাতো আছেই।

একজন সরকারি কর্মচারী পক্ষান্তরে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাকে যেখানে বদলি করা হবে চাকরির শর্ত অনুযায়ী সেখানে যেতে বাধ্য। কিন্তু সরকারি চিকিৎসকরা গ্রামে বা প্রত্যন্ত কোনো এলাকায় থাকতে চান না। মাসের পর মাস বছরের পর বছর তারা ওই পদের বিপরীতে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন কিন্তু জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করে অনুপস্থিত থাকেন। পেশার শপথ ও সরকারি চাকরি বিধিমালা ভঙ্গ করে গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ধস নামিয়েছেন এসব চিকিৎসক। বর্তমান সরকার বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক আগে থেকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। মাস দুয়েক আগে তিনি সরাসরি বলেছেন গ্রামে পোস্টিং হলে সেখানে থাকতে হবে নতুবা চাকরি ছেড়ে দিতে হবে। চিকিৎসকদের এই অসদাচরণের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান কি কোনো কোনো পক্ষকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক প্রায় সব ক্ষেত্রেই জামায়াত-শিবিরের একটি বড় ও শক্ত অবস্থান আছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরপর দেশব্যাপী তাদের ভয়াবহ তাণ্ডবের দুঃসহ স্মৃতি দেশের মানুষ এখনও ভোলেনি। সমাজের ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরেই তাদের লোক আছে শক্ত ও সংঘবদ্ধভাবে। গত ৪৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি,জাতীয়পার্টি ক্ষমতায় থেকে কমবেশি তার অপব্যবহার, দুর্নীতি, লুটপাট করেছে অন্যদিকে এই তিন দলের সাথে নানাভাবে সহাবস্থান ও ঐক্য গড়ে প্রশাসনসহ সকল স্তরে নিজেদের লোকদের নিয়োগ দিয়ে জামায়াত শক্তি ও অবস্থান দৃঢ় করেছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে বর্তমান অরাজকতা সৃষ্টি ও সংবাদমাধ্যমসহ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংঘাত তৈরির পেছনে ওই শক্তির কোনো হাত আছে কিনা তা-ও ভাবনার বিষয় বৈ কি। এটিও খতিয়ে দেখা উচিত।

এক কিস্তিতে লেখাটি শেষ করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ আরও অনেক বিষয় রয়ে গেল যা এই কিস্তিতে উল্লেখ করা গেল না। তবে এ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ পাঠক ও ডাক্তারদের কেউ কেউ মনে করে থাকতে পারেন যে আমি শুধু চিকিৎসকদের নেতিবাচক দিকগুলোই তুলে ধরলাম। প্রশ্ন উঠতে পারে দেশে কি তবে ভালো ও সৎ চিকিৎসা নেই। আমি বলব অবশ্যই আছে না হলে দেশের মানুষ অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন কীভাবে। চট্টগ্রামসহ সারাদেশে অনেক চিকিৎসক আছেন যাঁরা সততার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেও দেশ ও জাতির যে কোনো সংকট দুরবস্থায় জনতার পাশে এসে দাঁড়ান। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। গরিব-অসহায়দের প্রতি সহৃদয়তার হাত প্রসারিত করেন। একটি পেশার সব যেমন মন্দ হয় না তেমনি সবাই সৎও হয় না। তবে এই পেশার সাথে মানুষের জীবন মরণ ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্নটি যখন জড়িত তখন এই পেশা নিয়ে সাধারণে আগ্রহ সমালোচনা ইত্যাদি বেশি থাকবেই। এরও একটি কারণ আছে। পশ্চিমা দেশ নয় মোটামুটি উন্নত দেশের চিকিৎসা সেবাও নয়, শুধু পার্শ্ববর্তী কলকাতার চিকিৎসা সেবার কথা শুনেই মনে হয় কোন দোজখে বাস করছি। কাদের হাত নিজের ও প্রিয়জনের জীবন তুলে দিচ্ছি।

পুনশ্চঃ এই লেখার পরে আমার নিজেরই চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায় কিনা আল্লাহ মালুম।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ৮ মে, ২০১৪

'এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না'

দৈনিক আজাদী                                          উপসম্পাদকীয়                                          কাল আজ কাল 
৮ মে বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৫ বৈশাখ ১৪২১ সাল ৮ রজব ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল
কবি নবারুন ভট্টাচার্য অন্য এক বাস্তবতায় বেশ আগে লিখেছিলেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।’ সে কবিতার একটি অংশ-
এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/ এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/ এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না...

আজ এই পংক্তি উচ্চারণ করতে গিয়ে আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। আমার জিহ্বা অনড় হয়ে যাচ্ছে। আমার শ্বাস আটকে যাচ্ছে, আমার বুকের পাঁজর ভেদ করে কান্নার রোল নদীর মতো প্রবাহিত হতে চাইছে। আমি বলতে পারি না-আমি পারি না বলতে-৫২ এর চেতনায় গড়া এই দেশ আমার না, ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ আমার না, প্রায় সাড়ে তিন লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ আমার না, জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা আমার দেশ না।

আমি বলতে পারি শুধু এই দেশ আমার তা কোনো হন্তারকের নয়, এই দেশ আমার, তা কোনো জল্লাদের নয়, এই দেশ আমার, তা কোনো দুর্বৃত্তের নয়, এই দেশ আমার তা কোনো নির্দিষ্ট বাহিনীর নয়।

নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনার পরে সারা দেশের মানুষ আজ চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় কালাতিপাত করছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, গুম-খুনের আতঙ্কে ভুগছে।

কারণ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনাই শেষ ঘটনা নয়। এরপরেও দেশজুড়ে আরও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সত্যিকার অপহরণের সাথে সাথে বানোয়াট অপহরণের ঘটনাও ঘটছে অবিরাম।

বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক ও টেলিভিশন চ্যানেলের নিয়মিত দর্শকরা এখনও প্রতিদিন সে সংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছেন। বর্তমান যে ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে তেমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এতগুলো লোককে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে অপহরণ করা হলো, আর তারপরে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো এমন ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম। মঙ্গলবারে পাওয়া পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে উদ্ধার হওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের হত্যা করা হয়। অনেকে মনে করছেন পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হয়ত তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো।

এ বিষয়ে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর দুটি গুরুতর অভিযোগ এনেছেন পুলিশ ও র‌্যাবের বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ করেছেন থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে তাঁকে র‌্যাব অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। তার ভাষায় ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাব তাঁর জামাতাসহ অন্যদের হত্যা করেছে। এই লেখাটি যখন লিখছি(মঙ্গলবার-মধ্যরাত) তখন কয়েকটি টিভি চ্যানেলে এবং চ্যানেলের টক শো’তে প্রদর্শিত বুধবারের কয়েকটি পত্রিকায় এই বিষয়ে আর ও বিস্তারিত রিপোর্ট করা হয়েছে। কয়েকটি পত্রিকায় একজন মন্ত্রীপুত্রের মধ্যস্থতার বিষয়েও লেখা হয়েছে।

লেখাটি প্রকাশ হওয়ার আগেই অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের মধ্যে আরও অনেক কিছু হয়ত প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।

যদি এসব অভিযোগ সত্যি হয়ে থাকে তবে তা রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ে অনেক সংশয় বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দেবে।

স্বীকার করি সমাজ এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হয়ে উঠেছে। হানাহানি, হিংসা, দ্বেষ, মারামারি, খুন খারাবি অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যে চিকিৎসকরা মানুষের জীবন বাঁচানোর পেশায় জড়িত তাদেরও নিষ্ঠুর ও নির্দয় আচরণে মৃত্যু ঘটছে অনেক নিরপরাধ রোগী তথা জনগণের। (এ প্রসঙ্গে পরের সপ্তাহে লেখার আশা রইল) অন্তত বিগত প্রায় এক বছর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সাধারণ নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সারাদেশ জুড়ে জামায়াত-হেফাজত-বিএনপির ধ্বংস-নৈরাজ্য হত্যার উৎসব দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে মানবতাবোধ ভ্রাতৃত্ব সৌহার্দ ও সহানুভূতি লোপ পেয়েছে।

এটি আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের কথা নয়। মনোবিদরাই বলে থাকেন টেলিভিশন সিনেমার অতিরিক্ত ভায়োলেন্সপূর্ণ ছবি দেখলে দর্শকের মধ্যেও তা সংক্রমিত হয়, তারাও সহিংস আচরণ করতে অভ্যন্ত হয়ে ওঠে। আর তা যদি নাটক-সিনেমা না হয়ে বাস্তবচিত্র হয় তবে তার প্রভাবতো বহুগুণ হতে বাধ্য। এমন নিষ্ঠুর পরিবেশ থেকে এরশাদ সিকদারদের মতো সিরিয়াল খুনীদের জন্ম হয়, যারা দীর্ঘদিন বিচারহীনতার কারণে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

দেশ বিদেশের নানাবিধ চাপ ও বৈরীতাকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা দেশকে বর্তমান অবস্থায় এনেছেন। অন্যতম প্রধান একটি রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও তিনি একটি নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে। বলা যেতে পারে আপাতত সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের হুমকিকে উপেক্ষা করে দেশকে মোটামুটি একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এমন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেও তাঁর সরকার টিকে যেতে পারে শুধুমাত্র দুটি চ্যালেঞ্জ শক্তভাবে মোকাবেলা করতে পারার মধ্য দিয়ে। তার একটি দুর্নীতি কমানো ও অন্যটি দেশের ‘ল এন্ড অর্ডার’ অর্থাৎ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অথচ এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের মতো ঘটনা এবং সারাদেশে সংঘটিত গুম ও খুনের ঘটনা তাঁর সমস্ত অর্জন ও কর্মপরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।

ভাবতে হবে এমন ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক তারা কখনোই বর্তমান সরকারের বন্ধু নয়। তা কোনো দলীয় লোক, তার বাইরের কিংবা কোনো বাহিনীর লোক হোক। এক কথায় একে বলতে হবে স্যাবোটাজ। এমন সব ঘটনার সাথে যদি আওয়ামী লীগের দলীয় কেউ জড়িত থাকেন তবে তার বিচারই আগে হওয়া উচিত। তাকে কিংবা তার অনুসারীদের চিহ্নিত করা উচিত। মনে রাখতে হবে গায়ে মুজিবকোট থাকলেই শুধু হবে না। মনে রাখতে হবে খন্দকার মোশতাক, কে এম ওবায়দুর রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, কোরবান আলী, শফিউল আলম প্রধানরাও একদিন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ডাক সাইটে নেতা ছিলেন।

মনে রাখতে হবে এখনও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকার্য শেষ হয়নি। সাজা কার্যকর হয়নি। মনে রাখতে হবে সরকারকেই কেউ কেউ জঙ্গিদের অর্থ যোগানদাতা ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে সাফাই গেয়ে গলা শুকিয়ে দেখছেন এখনও। সারাদেশে গুম খুনের মহোৎসব করে সরকারকে যারা বেকায়দায় ফেলতে চাইছেন তারা কোনোভাবেই সরকারের তো নয়-ই একটি মানবিক সমাজ সভ্য সমাজেরই বন্ধু নয়।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পেছনে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত তা আমরা এখনও জানি না। তবে জানতে বা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, তারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান দক্ষ ও এমন কাজে পারদর্শী। পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়ায় অন্যান্যদের বরাত দিয়ে, এর মধ্যে একজন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও আছেন,যেভাবে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তাতে বিষয়টি গোপন করা বা ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হবে না। অথবা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা সফল করাও উচিত হবে না। যে ব্যক্তির দিকে অভিযোগের অঙ্গুলি উত্তোলিত হয়েছে তার প্রতি সদয় আচরণ বা পক্ষপাতিত্ব আখেড়ে ভালো ফল দেবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে আইনের সর্বোচ্চ শাসন প্রত্যাশা করি এবং আইনকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে দেওয়ার দাবিও জানাই। এত মৃত্যুর দায়, এত ক্রন্দন, এত বিলাপের দায় এই সরকার কেন বহন করতে যাবে তার কোনো অর্থও আমি খুঁজে পাই না।

একটি মিথ্যা যেমন অসংখ্য মিথ্যার জন্ম দেয় তেমনি একটি হত্যাকাণ্ড অনেক হত্যাকাণ্ডেরও জন্ম দেয়। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত আগের হত্যাকাণ্ডের যদি সঠিক বিচার হতো, খুনীরা যদি বিচারের সম্মুখীন হতো তবে এত বড় হত্যাকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হতো। আর হয়ত অনেক মায়ের বুক খালি হতো না, স্ত্রী-সন্তানের বিলাপে আকাশ ভারী হতো না। বলতো হতো না, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’।

স্বজন হারানোর বেদনা, পিতা-মাতা-ভাই-বোন ও নিকট আত্মীয়দের হারানোর বেদনা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কে অনুভব করেছে বেশি। শোকের পাথর কে বহন করেছে বেশি। এত শোক এত বেদনা এত হাহাকার ও শূন্যতা নিয়েও তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য স্থানের নিখোঁজ গুম ও খুন হওয়া মানুষদের পরিবারের ক্রন্দন নিশ্চয়ই শেখ হাসিনাও শুনতে পাচ্ছেন। তিনি নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। তাঁর সরকার, দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্যে এবার নিশ্চয়ই তিনি কঠোর হবেন।

এমন ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

পুনশ্চ: আন্তর্জাতিকভাবে যখন র‌্যাবের ভূমিকা দারুণ সমালোচিত হচ্ছে, কোনো কোনো রাষ্ট্র যখন র‌্যাবকে আর প্রশিক্ষণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে ঠিক সে মুহূর্তে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে এই বাহিনীর সম্পৃক্ততা সরকারকে ব্যাপক বিব্রত করবে এবং সে সাথে এই বাহিনী বিলোপের দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হবে। তাই বিষয়টির গভীর তদন্ত ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ