পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২২ মে, ২০১৪

'চিকিৎসকদের নিয়ে আরেক প্রস্ত'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২২ মে বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ২২ রজব ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল
গত সপ্তাহে চিকিৎসকদের নিয়ে লেখাটি ছাপা হওয়ার পরে অনেকে ফোনে, ফেসবুকে, ইমেইলে ও খুদে বার্তায় তাদের প্রতিক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখাটির জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। তাঁদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। দু একজন ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন। ফেসবুকে একজন লিখেছেন আপনি ডাক্তারদের পেছনে লাগলেন কেন? আমি উত্তরে লিখলাম-ভয়ে, চিকিৎসকদের বর্তমান যে মারমুখি আচরণ দেখছি সামনা-সামনি লাগতে গেলে জান নিয়ে ফেরত আসা যাবে না। আমার এক কবিবন্ধু লিখেছেন-প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের অর্থ ব্যয় হয়। আমি যেহেতু পেশায় একজন সাংবাদিক তাই তিনি তা উল্লেখ করতে ভুলে যাননি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের পেছনেও সরকারের অর্থ ব্যয় হয় তাহলে শুধু ডাক্তারদের খোঁচা দিচ্ছি কেন। বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখেছি-সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্য চিকিৎসকরা সংবাদ শিরোনাম ও সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন বলে তাঁদের নিয়ে লিখেছি। সব পেশা নিয়ে লিখতে গেলে তা না হয়ে মহাভারত হয়ে উঠবে।

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, গবেষক ও চিকিৎসক ডা. মাহফুজুর রহমান লিখেছেন-ডাক্তার ও শিক্ষার্থীরা এসব ভুলে যায় মাঝে মধ্যে মনে করিয়ে দিও যে, সরকার তথা জনগণের অর্থ ব্যয় হয় এঁদের ডাক্তার হয়ে ওঠায়। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেকে অনুরোধ করেছেন ভুয়া ডাক্তারদের নিয়ে লিখতে।

সত্যি করে বলি-কোনো নির্দিষ্ট পেশা তা যদি চিকিৎসা পেশার মতো মহৎ হয় তার বিরুদ্ধে আমার বিশেষ কোনো ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নেই। চিকিৎসকদের বর্তমান অসংযত আচরণ দেখে সে বিষয়ে লিখেছি শুধু। আর যা লিখেছি ভুলতো কিছু লিখিনি। বরং লেখাটি প্রকাশ পাওয়ার পরে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে যা শুনেছি তাতে মনে হলো আমিতো কিছুই লিখিনি। এরই মধ্যে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নার্সদের পিটিয়েছে ইনটার্নরা। তাতে ধর্মঘটে গেছে নার্সরা। অর্থাৎ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি সামান্যতমও।

চিকিৎসকদের সাথে প্রায়ই সংঘাত বাঁধে রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে। বিশেষ করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কিছু কিছু রোগী মারা গেলে রোগীর আত্মীয়দের সাথে চিকিৎসকদের সংঘাত লেগে যায়। এর কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। প্রথম ও প্রধান কারণটি হচ্ছে চিকিৎসকদের ওপর রোগী ও তার স্বজনদের অনাস্থা। মৃত্যুরকারণ নিয়ে ডাক্তার যা-ই বলুক রোগীর স্বজনরা তা বিশ্বাস করে না। তাদের ধারণা ডাক্তারের অবহেলা নতুনবা ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে। হতে পারে কিছু কিছু ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার কারণে, কিন্তু সবতো তা নয়। তবুও ডাক্তারদের দায়ী করা হয়। তার কারণ ওই যে বললাম আস্থা বা বিশ্বাসের জায়গাটি তৈরি করতে পারেনি আমাদের দেশের চিকিৎসকরা। রোগীদের প্রতি দুর্ব্যবহার, অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাবের কারণে দিনে দিনে তৈরি হয়েছে এই অবিশ্বাস ও অনাস্থা। দুর্ব্যবহারও অনেক সময় অবহেলার কারণ নিয়ে চিকিৎসকদের ব্যাখ্যাও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সরকারি হাসপাতাল ও ডিসপেন্সারিতে এত এত রোগী সামলাতে হয় যে, তখন তাদের মেজাজ-মর্জি ঠিক রাখা দায়। কারণটি পুরো নয়,আংশিক সত্য। বাংলাদেশে শুধু যে চিকিৎসকরাই খারাপ ব্যবহার করেন তা কিন্তু নয়। নার্স ও আয়ারাও রোগী ও তার স্বজনদের সাথে মাঝে মধ্যে এমন আচরণ করেন মানুষ তা ভিক্ষুকের সাথেও করে না। আমরা মেনে নিতে পারি সরকারি হাসপাতালগুলোয় অত্যধিক রোগীর কারণে না হয় চিকিৎসকরা বিরক্ত হলেন কিন্তু ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালেও কেন রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পায় না। মানবিক আচরণ পায় না। একটু মমতা সহানুভূতি পায় না। একটি প্রবাদ আছে এমন হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি কোনো প্যাথিই কাজ করবে না যতক্ষণ না রোগীর প্রতি ডাক্তারের সিমপ্যাথি না থাকবে। থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুর বা উন্নত দেশের চিকিৎসা পদ্ধতি বা সেবার কথা বাদই দিলাম পার্শ্ববর্তী ভারতের চেয়েও এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। এমনকি কলকাতার চেয়েও।

অথচ একটি সময়ে এমন ছিল না। চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগী ও তার পরিবারের ছিল হার্দিক ও আন্তরিক সম্পর্ক। ছোটবেলায় আমাদের দেখলেই পাড়া বা এলাকার ডাক্তাররা জিজ্ঞাসা করতেন তোর বাবা কেমন আছে রে। আমাদের গ্রামের বাড়ি গহিরার বিখ্যাত ডাক্তার মতিলাল শর্মা। সবাই মতি ডাক্তার নামেই ডাকতেন। তাঁর চেম্বার ছিল গহিরার কালাচাঁদ হাটে। ঘরের কারো কিছু হলেই মা অথবা বাবা বলতেন ‘তোর মতি মামার কাছে যা।’

মতি মামা কাগজের দাগ শিশিতে মিক্সার ভরে দিতেন। জগতের চরম বিস্বাদময় সে ওষুধ খেয়ে আমরা ভালো হয়ে যেতাম। সবার সাথে সব পরিবারেই ছিল মতি মামার অবাধ প্রবেশাধিকার। আমার মায়ের নাম ধরে ডাকতেন। মা ডাকতেন তাঁকে দাদা বলে। মামা ধুতি পরতেন আর সাইকেল চালাতেন। আমার নানার বাড়িতেও দেখতাম মামা রান্না ঘরে বসে চা খাচ্ছেন। আমি দীর্ঘদিন তাঁকে আপন মামা হিসেবে ভেবেছি। কারণ ব্যবহার ও আন্তরিকতায় নিজ মামা আর তাঁর মধ্যে কোনো তফাৎ দেখিনি। মামা কোনো পাশ করা ডাক্তার ছিলেন না। একজন ফার্মাসিস্ট ছিলেন মাত্র। শহরে যে এলাকায় আমরা থাকতাম অর্থাৎ কোরবানীগঞ্জ। সেখানে দুজন বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. রবীন্দ্র চন্দ্র বনিক ও ডা. এম এ রউফ। তাঁরা দুজনেই ছিলেন সিম্পল এম বি বি এস পাস। অথচ এমন কোনো রোগ ছিল না যার চিকিৎসা এরা দুজন করেননি। গর্ভবতী নারী ও বিভিন্ন

মেয়েলি রোগ থেকে শুরু করে ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়ার কাজও তাঁরা সুচারুভাবে করেছেন। পাড়া ও মহল্লার লোকদের সাথে তাঁদের ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। পেশার বাইরে মানুষের সুখ দুঃখের খবর নিতেন এঁরা। প্রথম কয়েকটি সন্তান অ্যাবরশন হওয়ার পরে আমার মেজো ভাইয়ের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো সম্পূর্ণভাবে ডা. এম. এ রউফের তত্ত্বাবধানে। এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ত্রঁদের ছিল না। নাড়ি টিপে, চোখ দেখে, আর জিহ্বা দেখেই বলে দিতেন রোগের নাম। ওঁদের দেখে কিংবা এঁদের সাথে কথা বলেই অনেক রোগী অর্ধেক সুস্থ হয়ে যেতেন। শুধু ডা. বণিক বা ডা. রউফ নন। তখন মানে আজ থেকে মাত্র ২০/৩০ বছর আগেও আমাদের সমাজের চিকিৎসকরা এমনই ছিলেন। সর্বরোগের ওষুধ দিতেন তাঁরা। আর পাড়ায় পাড়ায় তাঁদের চেম্বার থাকায় রোগীদের সুবিধাও হতো তাদের সেবা পাওয়া। এখন সব ডাক্তারই বিশেষজ্ঞ। সবারই ফি ৪০০ টাকার ওপরে। সবার সাথে দেখা করতে আগে থেকে নম্বর নিয়ে রাখতে হয়। এখন সাধারণ ফিজিশিয়ান খুব কম। সবাই প্রায় অসাধারণ (বিশেষজ্ঞ) । এখন সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য আলাদা আলাদা ডাক্তার। চোখের ডাক্তার একজন হলে ভ্রূ’র ডাক্তার অন্যজন। তিনমাস অপেক্ষা করে ফেরেশতার মতো যে ডাক্তারের দেখা বা সাক্ষাত পাওয়া গেল দেখা গেল ৩ মিনিট ধরে যাবতীয় টেস্টের ফিরিস্তি লিখে ডাক দিলেন, ‘নেক্সট’। সমাজে এখন মতিলাল শর্মা, রবীন্দ্র চন্দ্র বণিক ও ডা. এম এ রউফদের মতো চিকিৎসকদের সংখ্যা কমে গেছে বলে সেবার মান হ্রাস পেয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী ডাক্তারদের এখন কসাই বলে সম্বোধন করেন। অথচ ছোটবেলায় দেখেছি একেকটি ডাক্তারখানা বা ডাক্তারের চেম্বারকে কেন্দ্র করে পাড়া-মহল্লার মুরুব্বিদের মিলনকেন্দ্র গড়ে উঠতো।

চিকিৎসকদের নিয়ে সমাজে এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির নতুন বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে ভুয়া ডাক্তার ও ভুয়া ডায়াগনোসিস সেন্টারগুলো। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে সরকারি চাকরি করেছেন এবং বেশ বড় পদে পর্যন্ত প্রমোশন পেয়েছেন এমন ভুয়া ডাক্তারের নজিরও আছে দেশে। কোনো ডিগ্রি নেই অথচ নামের পরে দু’চার পাঁচখানা ডিগ্রির উল্লেখ করে দিব্যি চেম্বার খুলে বছরের পর বছর মানুষকে ঠকিয়ে যাচ্ছেন। ভুল চিকিৎসা দিয়ে জীবন কেড়ে নিচ্ছেন এমন নজিরতো ভুরি ভুরি দেশে। বড় বড় ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনোসিস সেন্টারগুলোতে এমন অনেক ভুয়া ডাক্তার আছেন যারা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মাঝে মাঝে চাঁদা দিয়ে এমন বিপজ্জনক ও অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এ ধরনের ভুয়া ডাক্তার ও ভুয়া ডায়াগনোসিস সেন্টারের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয় কিন্তু ফলপ্রসূ কিছুই হয় না। দু’চার-পাঁচদিন বন্ধ থাকার পরে আবার যথারীতি চলতে থাকে তাদের অবৈধ কাজকারবার। এ ধরনের অজ্ঞ ও ভুয়া চিকিৎসকদের পাল্লায় পড়ে কত রোগী ও তাদের পরিবারের সর্বনাশ হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য দফতর থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের কারো কাছেই কোনো সঠিক তথ্য নেই এবং এ ধরনের নকল ডাক্তার প্রতিরোধে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপও নেই কোনো কর্তৃপক্ষের।

নকল ডাক্তার, নকল ওষুধ, ভেজাল ওষুধ, নিয়ন্ত্রণহীন চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বাজারের জন্য বাংলাদেশ এখন স্বর্গরাজ্য। কারণ এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের প্রতিকারে কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে নেই। থাকলেও টাকার বিনিময়ে তারা ম্যানেজ হয়ে থাকেন। আর জীবন দিয়ে অঙ্গ দিয়ে পঙ্গু হয়ে এসব অপকর্মের মূল্য পরিশোধ করেন নিরপরাধ অসহায় জনগণ।

আমি বলছি না পেশার দিক দিয়ে শুধু চিকিৎসকরা খারাপ। সকল পেশার মধ্যেই এমন অসৎ অসাধু ও অমানবিক ব্যক্তি আছেন। আমাদের সাংবাদিক সমাজেও আছেন। আবারও উল্লেখ করতে হয় চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক আচরণের জন্যেই তাদের নিয়ে লিখতে হলো। অন্য পেশার লোকরা ধোয়া তুলসি পাতা নন।

আসলে পচন যখন মাথায় ধরে তখন তা ছড়িয়ে পড়ে শরীরের সর্বাঙ্গে। আমাদের সমাজের মাথায় পচন ও অবক্ষয় হওয়াতে সমাজের সর্বক্ষেত্রে দুরবস্থা বিরাজ করছে। এর থেকে আমরা কেউই মুক্ত হতে পারছি না। সমাজ এখন এতটা অমানবিক হয়ে উঠেছে যে চার-চার পাঁচটি মৃত্যু, হত্যাকাণ্ড,খুন খারাবি আমাদের খুব একটা স্পর্শ করে না। গত মঙ্গলবার ফেনী শহরেই প্রকাশ্যে গুলি করে ও গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে ফুলগাজি উপজেলা চেয়ারম্যানকে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের নির্মমতা আমরা ভুলতে না ভুলতে ঘটল এই ঘটনা।

কয়েকদিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরি ডুবি শিক্ষার্থী নিহত হওয়ায় সে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট বক্তৃতা দিতে গিয়ে কেঁদেছেন এবং দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রেখে তার ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

আমার কাছে অনেকে জানতে চেয়েছেন আমাদের দেশে কি এমন নজির দেখবো কখনো? আমি বললাম এমন ঘটনার জন্য যদি পদত্যাগ করতে হয় তবে তো আমাদের দায়িত্বশীলদের পাবলিক টয়লেটের মতো ক্ষমতায় আসা-যাওয়া চলতে থাকবে হরদম।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ