পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৩

' অস্ট্রেলিয়ার ফ্রেড বনাম বাংলাদেশের ফ্রড '

দৈনিক আজাদী                         উপ-সম্পাদকীয়                                কাল আজ কাল
১৩ জুন বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০ সাল ‌ ৩ শাবান ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
পুরো নাম ফ্রেডরিক হ্যারল্ড হাইড। সংক্ষেপে ফ্রেড। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। একটি জাতীয় দৈনিকের সাপ্তাহিক আয়োজনে তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তা পড়েই জানতে পারলাম বয়োবৃদ্ধ এই মানুষটি। যার এখন অবসর জীবন কাটার কথা অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি উন্নত দেশে পরম সুখে বিলাসিতায় ও নিরাপদে। তিনি এখন পড়ে আছেন ভোলার মতো একটি দ্বীপ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ছিন্নমূল ও প্রান্তিক মানুষদের সাথে।

সেখানে তাঁর গড়া সংগঠন কো-ইভ (কো অপারেশন ইন ডেপেলপমেন্টএই চর এলাকায় গড়ে তুলেছে ৪০ প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে পাঠদান করা হয় বিনামূল্যে। বইপত্র থেকে শিক্ষার সমস্ত উপকরণও সরবরাহ করা হয় একেবারে বিনামূল্যে। ফ্রেডের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বদলে দিয়েছে ভোলার চরফ্যাশনের জীবনমান।

ফ্রেড প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৮০ সালে। শুরুতে চরফ্যাশনের একটি অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব নেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার একটি সাহায্য সংস্থা এই আশ্রমটি পরিচালনা করতো। এখানকার লোকজনের চরম দারিদ্র্য ফ্রেডকে ব্যথিত করে। তিনি চিন্তা করলেন শিক্ষাই পারে এদের ভাগ্য বদলে দিতে। সেই থেকে শুরু।

উন্নত বিশ্বের আধুনিক সমাজে বেড়ে ওঠা এবং জীবন কাটানো সাদা চামড়ার ফ্রেডের এখন ২৪ ঘণ্টাই কাটে কালোপুষ্টিহীন অধিকারবঞ্চিত বাংলাদেশের শিশুদের সাথে। এই ফ্রেড কোন ব্যাংক ঋণ নেন নি। স্কুলের এমপিওভুক্তি বা সরকারিকরণের জন্যে আবেদনও জানাননি। ফ্রেড কখনো উপদেষ্টা চেয়ারম্যান বা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনেও দাঁড়াবেন না। ঈদের আগে নূরানি চেহারা মার্কা রঙিন ছবি ছাপিয়ে সমাজ সেবক হিসেবে জনগণের কাছে দোয়াও চাইবেন না। তবে কীসের আসায় ফ্রেড এসব করছেনকী তার স্বার্থসত্যিই বুঝতে পারছি না। আমি বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে ফ্রেডকে মেলাতে পারছি না। ফ্রেড রাত্রি যাপন করে স্কুলের পাশেই একটি অতি সাধারণ কক্ষে। বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ যখন অস্ট্রেলিয়াআমেরিকাইংল্যান্ড বা এমন উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমাতে হেন কাজ নেই করছে না। সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরছে না। দেশের অর্থনীতি লুটপাট করে বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে যেখানে ‘সেটলড’ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সে সময় সে দেশের ফ্রেড কেন পড়ে আছে। সে পাগল নাকি আমি বুঝতে পারছি না। না কি ‘সাধু বেশে . . .। এদেশে তো সৎ লোকরা বোকা হিসেবে বিবেচিত। ভদ্রলোকরা হাবলা হিসেবে পরিচিত আর ভালো মানুষ তো সে আহম্মকব্যাক ডেডেটসো কল্‌ড মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট’ তাদের।

পাশাপাশি আমাদের শিক্ষকরা দেখুন কত স্মার্ট। ফ্রেড তো ফকিরনীর বাচ্চাদের পড়ায়। ওর তো কোন স্ট্যাটাসই নেই (ফেসবুক স্ট্যাটাস নয় আবারআমাদের শিক্ষকরা তাদের অবস্থা দেখুন। একটি উদাহরণ দেইফতেয়াবাদ কলেজের প্রিন্সিপাল তথা অধ্যক্ষ মহাশয় কত স্মার্ট দেখুন। অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর কক্ষে পরীক্ষা শুরুর অন্তত ঘণ্টা দেড়েক আগে প্রশ্নপত্র চলে আসে। বৈষয়িক প্রিন্সিপাল সাহেবসঙ্গে সঙ্গে তা খুলে মুঠোফোনে তা জানিয়ে দেন তার পরীক্ষার্থী কন্যাকে। কয়েকদিন আগে এইচএসসির গণিত বিষয়ের পরীক্ষার দিন এই অপকর্ম করতে গিয়ে তিনি ধরা খেয়েছেন উপজেলা কর্মকর্তার হাতে। এখন দু’বছরের জন্যে শ্রীঘরে আছেন। এটি গেলো একটি উদাহরণ আপনার আশেপাশে একটু খবর নিন এর চেয়েও ভয়াবহ সংবাদ পেয়ে যাবেন। ফ্রেডের জীবন কাটে এখন শিক্ষকতায় ও শিক্ষা বিস্তারে। ভাবছি ফ্রেড ও শিক্ষক ফতেয়াবাদ কলেজের প্রিন্সিপালও একজন শিক্ষক।

পূর্বেই বলেছি প্রায় ৪০টি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন ফ্রেড। তাঁর সাথে তাঁর দেশ অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের বেশ ক’জন মহান ব্যক্তি আছেন।

বাংলাদেশেও প্রতি বছর বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও বর্তমান সরকারের কঠোরতায়(এর কারণ ব্যাখ্যা করা হবে পরেএখন কিছুটা কমেছে এই প্রবণতা। একটি সময়ে এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের অভিপ্রায়ে স্থানীয় জমিদাররা স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতেন। সে সাথে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের জন্যে কিছু জমি জমাও দান করে যেতেন। এছাড়া বিত্তশালী ও শিক্ষানুরাগীরাও এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। নিঃস্বার্থ এমন ব্যক্তিদের বদান্যতায় এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার চেয়েও বড় কথা হলো এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষুদ্র কোন চিন্তা কাজ করতো বলে জানা যায় নি। কিন্তু একটি সময়ে বিশেষ করে দেশ স্বাধীনের পরে সমাজের কিছু কিছু লোক যখন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল এবং সমাজে তাদের কদর বাড়তে থাকলো তখন থেকে শুরু হলো এক ধরনের আত্মপ্রচারের প্রবণতা। নিজের নামেঅখ্যাত বাবার নামেবৌয়ের নামেশ্বশুরের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তেলা শুরু হলো। শিক্ষার মান নাইমানসম্পন্ন শিক্ষক নাইশিক্ষক থাকলে বেতন নাইশিক্ষার্থী থাকলে পাশের সংখ্যা নাইশুধু নাই নাই অবস্থা। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে এমপিওভুক্তিকরণ। অর্থাৎ দায়টিও সরকার তথা জনগণের কাঁধের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। লোক দেখানো এসব সমাজ সেবকদের ঠেলায় দেশের শিক্ষার মানেরও বারোটা বেজেছে। এখন বাধ্য হয়ে সরকার এর ওপর শর্তারোপ করেছে। ইচ্ছে করলেই আর যার তার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়েও চলছে চরম নৈরাজ্য। সরকার দিন দিন কঠোর হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ও আদালতের আদেশের কারণে বন্ধ করা যাচ্ছে না শুধু সার্টিফিকেট বিক্রিকারী উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান তথা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো। প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে মারামারি দলাদলি এমনকি একই নামে দুই তিনটি ইউনিভার্সিটি থাকার ইতিহাসও বাংলাদেশে বিদ্যমান। অর্থাৎ শিক্ষাও এখন বাণিজ্যের উপাদানে পরিণত হয়েছে।

দেশের নামকরা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার নামে নগ্নভাবে বাণিজ্যে নেমেছে। সরকার নির্ধারিত ভর্তি ফি’র বাইরে প্রচুর টাকা নিয়ে প্রতিবছর হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে জড়িত থাকেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সরকার বা শিক্ষামন্ত্রী চাইলেও তাদের বাগে আনা যায় না। সম্প্রতি ঢাকার মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ বাড়তি আদায়কৃত পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা অভিভাবকদের ফেরত দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এমন কি এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীর এমপিও বাতিলের হুমকিতে কাজ হয় নি কিছু।

আমার কাছে ফ্রেডের পাশে এদেরকে এক নম্বরের ফ্রড বলে মনে হয়। এক ব্যক্তি সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এসে দেশের এক চরাঞ্চলে শিক্ষার মহান আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন আর তার পাশাপাশি দেশের কিছু মুনাফালোভী বিবেকহীন মানুষ শিক্ষা ও শিক্ষকদের মহান পেশাকে দিন দিন কদর্য ও কালিমালিপ্ত করছেন। বাংলাদেশের শিক্ষিতজনেরাই ফ্রড। অশিক্ষিত ও গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা ফ্রড বা অসৎ নয়। দেশে যে আজ দুর্নীতির অবাধ প্রচলনলুটপাটদুর্বৃত্তায়ন সবকিছুই হয়েছে শিক্ষিত শ্রেণীর বিভিন্ন পেশার লোকজনদের দ্বারাই। পোশাক শ্রমিকপ্রবাসী আর গ্রামের কৃষকদের রক্ত ঘামে পরিশ্রমে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছে ওসব তথাকথিত শিক্ষিত ফ্রডরা। এরা হালুয়া রুটির চামচ বদল করে শুধু। পাঁচ বছর এরা যাবে তো পাঁচ বছর ওরা। জনগণের ভাগ্যের চিন্তা করে যে দুই চারজন তাদের অবস্থা হরিজনদের চেয়েও খারাপ।

তার চেয়েও ফ্রেডরা আছে বলে আমরা তাদের কাহিনী পড়ে উদ্দীপ্ত হই। আশায় বুক বাঁধি। হয়ত একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। অসংখ্য ফ্রডের দেশে একজন দুইজন করে ফ্রেডের সংখ্যা বাড়বে। গ্রামে গঞ্জে কি প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বলে উঠবে।

তোমাকে নতশির অভিবাদন ফ্রেড।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০১৩

' চরম ভাবাপন্ন জাতি ! '

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
-কামরুল হাসান বাদল

প্রকৃতি মানুষের আচার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। একটি জাতিসত্তা বা একটি জাতি কীভাবে গড়ে উঠবে তা নির্ভর করে সে অঞ্চলের জলবায়ুআবহাওয়া বা প্রকৃতির ওপর। যেমনগ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের মানুষ হয় একটু রুক্ষউগ্র ও বদমেজাজি। পাশাপাশি শীতপ্রধান দেশের মানুষ হয় নম্র,কিছুটা কোমল ও কৌশলী। পোশাক থেকে খাদ্যাভ্যাস সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় জলবায়ু ভেদে। বন্যাপ্রবণ বৃষ্টিপ্রধান অঞ্চল বলে আমাদের পোশাক লুঙ্গি। শীতপ্রধান দেশে কোট জ্যাকেট আর মরুভূমির গরম ও লু-হাওয়া থেকে বেঁচে থাকবার জন্যে লম্বা আলখাল্লা ধরনের পোশাক। খাবার দাবারেও তাই। এক সময় মরু অঞ্চলে যখন কিছুই উৎপন্ন হতো না সেখানে তারা দিনে সামান্য কয়েকটি খেজুর খেয়েই জীবন ধারণ করতো। তাদের প্রয়োজনীয় ক্যালরির যোগান দিতো খেজুর। যেমন আমাদের বর্তমান এই তাপদাহে অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের ফলের দিকে তাকান দেখবেন সব ফলই কেমন রসালো ও ঠাণ্ডা। বর্ষায় লক্ষ লক্ষ বাঙালি কৃষকের ভাতের অভাব পূর্ণ করেছে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল। ফলনে স্বাদে ও পুষ্টিতে নিরন্ন মানুষের ক্যালরি যুগিয়ে এসেছে প্রকৃতির এই অপার দান। প্রকৃতি তার সন্তানদের এমন করেই রক্ষা করে এসেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।

কথাগুলো মনে পড়লো অন্য কারণে। আমাদের এই দেশ এক সময় নাতিশীতোষ্ণ পরিমণ্ডলের ছিল। অর্থাৎ ছয় ঋতুর এই দেশ বেশি গরমও নয় বেশি ঠাণ্ডাও নয়। এটি এমন একটি দেশ অতি বর্ষণ ও অতি শীতের কয়েকটা দিন বাদ দিলে এখানে খোলা আকাশের নিচেও প্রচুর লোক বাস করতে পারে। শীতপ্রধান বা গ্রীষ্মপ্রধান বা মরু অঞ্চলে তা সম্ভব নয়। তাই এখানে আম খেয়ে আঁটি ছুঁড়ে ফেললেও সেখানে চারা গজিয়ে ওঠে তেমনি এখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও বেশ অধিক। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদেশের আবহাওয়া হয়ে উঠছে চরম ভাবাপন্ন অর্থাৎ অতি গরমের দেশে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বেই উষ্ণতা বাড়ছে এবং এর ফলে মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংবাদ নতুন নয়। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখিআলোচনা হয়েছেহচ্ছে এবং সামনে আরো হবে। আমার আজকের আলোচনার বিষয় সেটিও নয়। আমি ভাবছি প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সাথে সাথে এই জাতির মনোজগতেও একটি বিশাল পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে তা অনেকের অলক্ষে হলেও আমি তা নিয়েই আলোচনা করবো।

বাঙালির চরিত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি চমৎকার মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন,এদেশের মানুষ যেমন চৈত্রের প্রচণ্ড শুষ্কতায় ফেটে চৌচির হওয়া মাটির মতো শক্ত হতে পারে তেমনি আবার বর্ষার কাদার মতো নরম ও বিগলিত হতে পারে। অর্থাৎ বাঙালির কোমল কঠিন চরিত্রটি বঙ্গবন্ধু বেশ ভালোভাবেই বিশ্লেষণ করেছিলেন। তবে সম্প্রতি জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধির মতো অর্থাৎ চরম ভাবাপন্ন (আবহাওয়ারমতো মানুষও চরমভাবাপন্ন বা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে বলে আমার মনে হয়। অর্থাৎ ব্যবহারে আমরা ভীষণ অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছি। কোনকিছুর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে হয়ে উঠছি চরম প্রতিক্রিয়াশীল। শালীনতাভদ্রতাভব্যতা ও মাত্রাজ্ঞান আমাদের লোপ পাচ্ছে প্রতিদিন আশঙ্কা জনকভাবে। সেটি সিনিয়র রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বাজারের মাছ বিক্রেতা পর্যন্ত। এখন আমরা কথা বলার আগেই তর্ক করছি। তর্ক শুরুর সাথে সাথে মারামারি করছি,মারামারি করতে গিয়ে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধাচ্ছি তারপরে ধ্বংস নৈরাজ্য আর হত্যার উৎসব করছি। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে সামান্য গায়ে গা লাগলেও ঝগড়া বাঁধাচ্ছি। সবকিছুতেই চরম আচরণ করার প্রবণতা পেয়ে বসেছে আমাদের। এ থেকে এমনকি আমাদের রাজনীতিকরাও মুক্ত নন।
আমাদের রাজনীতিবিদগণ দেশকে পরিচালিত করেন। ভোট দিয়ে তাঁদেরকে নেতা নির্বাচন করি। আমরা কোথায় তাঁরা আমাদের জন্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন তা না উল্টো তাদের অমার্জিতঅশালীন কথায় আমাদেরই লজ্জা পেতে হয়। বিবিসির একটি সংলাপে কদিন আগে চট্টগ্রামের দু’জন রাজনীতিকের মধ্যে একটু ‘উত্তপ্ত’ শব্দ বিনিময় হয়েছে। একজন মন্ত্রী বিরোধী দলের এক নারী সংসদ সদস্যের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বললেন ও কথাগুলো নিষিদ্ধ পল্লীতে মানায় বা শোনা যায়। মন্ত্রী মহোদয়ের এই কথার বিপরীতে তাঁর প্রায় পিতার বয়সি বিরোধী দলের নেতা ও প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বললেনওখানে কী বলে তার অভিজ্ঞতা তো আমার নেই। কারণ আমি যাইনি কখনোওনার হয় তো সেই অভিজ্ঞতা আছে।

গত শনিবার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সাদেক হোসেন খোকা আইন প্রতিমন্ত্রীকে বেয়াদব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চরম বেয়াদব বলে আখ্যায়িত করেছেন। অবশ্য সংসদে একবার বেগম খালেদা জিয়া তৎকালীন বিরোধী দলের সদস্যদেরও ‘চুপ বেয়াদব’ বলে ধমক দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সরকারি দলও কম যায় না। দুই জোটের অনেক নেতানেত্রীর বক্তব্য বিবৃতি শুনলে কানে হাত দিতে হয়। তাঁরা পরস্পরের প্রতি এমন শক্ত ব্যবহার করেন যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষরাও করি না। কারো বিরুদ্ধে যে কোন অশালীন বক্তব্য দিতে আমরা আর এখন কুণ্ঠিত হচ্ছি না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু কথা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার একটি লেখায় সমালোচনা করেছিলাম। তা পড়ে আমার এক বন্ধু ফেসবুকে আমাকে কমেন্ট করেছেন, ‘এমন পেলব ভাষায় সমালোচনা না করে সরাসরি বলুন তিনি একজন মানসিক রোগী।’ তার উত্তরে আমি লিখেছি ‘যে শব্দ বা ভাষা ঘরোয়া আড্ডায়চায়ের দোকানে বা বেশি হলে ফেসবুকে লেখা যায় তা কি একটি কলামে মানায়প্রতিক্রিয়া প্রকাশে এমন অসহিষ্ণু হলে বুঝতে হবে এ জাতির কপালে দুঃখ আছে’।

অসহিষ্ণুতার অংশ হিসেবে দেশে যে শুধু রাজনৈতিক হানাহানিই বৃদ্ধি পেয়েছে তা না। সামাজিক ও পারিবারিক সহিংসতাও বৃদ্ধি পেয়েছে সমানভাবে। প্রায় প্রতিদিন দেখুন মাছধরাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ মৃত্যুফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ মৃত্যুদু’দল গ্রামবাসীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-মৃত্যুসামান্য ডাব পাড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ মৃত্যু। চাচার হাতে ভাতিজাভাতিজার হাতে চাচাস্বামীর হাতে স্ত্রীস্ত্রীর হাতে স্বামীপিতার হাতে শিশু পুত্র আরো কতো শত নির্মমতার খবর শুনি। চিত্র দেখি প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। ভদ্রতা ভব্যতা শালীনতা ও মাত্রা জ্ঞান লুপ্ত হতে বসেছে মারাত্মকভাবে। আমি এমনও দেখেছি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষকে ডেকে বলছে। আগুনটা দিন তো সিগারেট ধরাবো। সিগারেট ধরিয়ে বললো ঠিক আছে যান। এমন আচরণ একজন সুস্থ মানুষ করতে পারে তা ভেবে আমি বিস্মিত হই।

বাংলা ভাষায় সবচেয়ে কম ব্যবহৃত দুটি শব্দ ধন্যবাদ (Thank youও মাফ করবেন (Excuse me )। কার আগে কে লাইনে দাঁড়াবেকাকে কে কনুই দিয়ে ধাক্কা দেবে তার প্রতিযোগিতা চলে সারাদিন। একজন সাধারণ রিকশা চালকেরও যে আত্মসম্মানবোধ থাকতে পারে তা আমাদের মনে থাকে না মোটেও।

সমালোচনা যে ব্যক্তি আক্রমণ নয় সে কথা আমরা ভুলে যাই প্রায়-ই। আর সত্যিকার সমালোচকও যে একজন প্রকৃত বন্ধু সে কথাও মনে রাখি না আমরা। যে কারণে দেখছি এখন ‘ব্যাঙকে খাটো,সাপকে লম্বা’ বলা যাবে না অবস্থা। সমালোচনার নামে আজকাল যা হয় তার অধিকাংশ ব্যক্তি আক্রমণ নয়তো দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বুদের পরিস্থিতিতো আরো ভয়াবহ। জাতীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ওখানে যেভাবে কটাক্ষ করা হয় তা রীতিমত অশালীন। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় অন্যকে চরমভাবে অপমানিত করার মধ্যে কোন বাহাদুরি নেই।

আসলে এই রুচিবোধের পরিচয় ওপর থেকে দিয়ে আসা উচিত। যারা সরকার ও দল পরিচালনা করেন যাঁরা উচ্চ শিক্ষায় প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষকতা করেন। সমাজে যাঁরা বিশেষভাবে সম্মানিত তাঁরা যদি বিনয়শালীনতা ও মাত্রাবোধের পরিচয় দিতেন সঠিকভাবে তবে তার কিছুটা প্রভাব হলেও সমাজে পড়তো।

আসলে মাথায় পচন ধরলে শরীরের করার থাকে না কিছুই।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ