পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১২

বাংলাদেশ সংখ্যালঘু শূন্য হলে লাভ কার

দৈনিক আজাদী                      উপসম্পাদকীয়                         কাল আজ কাল
৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৯ আশ্বিন ১৪১৯ সাল ‌১৭ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

বাংলাদেশে কখনোই কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। এমনকি ’৪৭ এর দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের ২৩ বছর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ৪১ বছরের মধ্যে এই বক্ষমান কলামটি লেখার সময় পর্যন্ত কোথায়ও কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়নি। যা হয়েছে তা সংখ্যালঘুর ওপর হামলা ও নির্যাতন। দাঙ্গার জন্যে দু’পক্ষকে সক্রিয় হতে হয়। দু’পক্ষেরই অংশগ্রহণ থাকে তাতে। এ ভূ-খণ্ডের কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দাঙ্গায় অংশ নেয়ার মতো বা দাঙ্গা করার মতো মানসিক শক্তি অর্জন করেনি। তারা বরাবরই সংখ্যাগুরুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং এদের বিশাল একটি অংশ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। ’৪৭ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দুদের দেশত্যাগ কখনো থামেনি। ’৪৭ এ একবার, ’৬৫তে পাক-ভারত যুদ্ধের পরে একবার ’৭১ এ একবার এরশাদের আমলে দুবার২০০১ সালে জোট সরকার (বিএনপি-জামাত জোটক্ষমতায় আসার পরে একবার এভাবে এদেশের বিপুল সংখ্যক হিন্দু পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে এদেশের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে। আশ্রয় নিয়েছে না বলে বলা উচিৎ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত আদম শুমারীর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে বিগত দশ বছরে ৯ লাখ সংখ্যালঘু কমেছে দেশে। দেশ বিভাগের সময় সংখ্যালঘুর সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় এক চতুর্থাংশ আজ সেখানে সংখ্যালঘুর সংখ্যা ৮ ভাগের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। তথ্যটি উদ্বেগজনক,অমানবিকসাম্প্রদায়িক ও একটি সভ্য জাতির জন্যে অবমাননাকর।

এই চট্টগ্রামেই কয়েকমাস আগে পাথরঘাটার একটি মসজিদে আক্রমণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে এলাকার হিন্দু পরিবারগুলোর উপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল। সে সময় অনেকের বাড়িতে আগুনও দেয়া হয়। এই এলাকার এই মসজিদকে কেন্দ্র করে বা মসজিদে ভাংচুর করার অভিযোগ তুলে দুয়েক বছর পরপর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলেও আজ পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। বিচার হওয়াতো দূরের কথা। এখানে বলে রাখা ভাল চট্টগ্রাম নগরীর এই এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এই ঘটনার কিছুদিন পরে হাটহাজারী থানার নন্দীরহাট গ্রামেও এমনি করে মসজিদ ভাঙ্গার চেষ্টা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে হিন্দুদের ওপর হামলা নির্যাতন করা হয়েছে। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে বেশ ক’টি মন্দির। এই ঘটনারও কোন সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। দোষীদের চিহ্নিত করা হয়নি। বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তখনকার পত্র-পত্রিকায় জড়িত দু’একজনের নাম প্রকাশ পেলেও পরবর্তীতে তাদের কারুরই বিচার হয়নি।

মাত্র কয়েকদিন আগে রাঙামাটি কলেজে পাহাড়ি ও বাঙালি দু’ছাত্রের মধ্যে সামান্য কথা কাটিকাটিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত হয় পাহাড়িরা। এখানেও বলে রাখা প্রয়োজন আগামী দু’এক দশকের মধ্যে পাহাড়ে পাহাড়িরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। (সুযোগ পেলে এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছে আছে)। রাঙামাটিতে সংঘটিত এই ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতে গত শনিবার রাতে এবং পরবর্তী আরও দু’দিন কক্সবাজারের রামুউখিয়াটেকনাফ আর চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। বাড়ি-ঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বসতির পর বসতি এমনকি বৌদ্ধদের ধর্মীয় উপাসনালয় বিহার ও প্যাগোডা। সেখানে গৌতমবুদ্ধের মূর্তি ভাংচুর ও অপমান করা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা নির্বিচারে জ্বালিয়ে দিয়েছে শত শত বছরের পুরনো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোযা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যই শুধু নয় বলতে হবে বিশ্ব ঐতিহ্যও। তারা শতবর্ষী পাঠাগারও জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি অনেক বছর আগে রামুর ঐ এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এই মন্দিরগুলোর নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আবার নতুন করে এসব নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। যদিও বা নির্মাণ করা যায় বৌদ্ধদের মনে আর মুসলিমদের বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা যাবে কিনা সন্দেহ আছে। সহিংস ধর্মের পবিত্রস্থান হিংসার অনলে দাহ হতে পারে তা ভাবতেও কুণ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু এই হিংসা কেনকার বিরুদ্ধেকী অপরাধ করেছিল সেদিন ঘুমন্ত,পরিশ্রান্তশান্তিপ্রিয়রামুবাসী বৌদ্ধরাতাদের একটি মাত্র অপরাধ হতে পারে তারা সংখ্যায় কম। প্রতিরোধ করার শক্তি তাদের নেই এবং এ ধরনের সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার এই দেশে আজ অবধি না হওয়া। (সম্ভবত ২০০১ এর নির্যাতনের শিকার পূর্ণিমা ছাড়া)। আমি পূর্বে যে ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিলাম তা শুধুমাত্র চট্টগ্রামে খুব অল্প সময়ে সংঘটিত হওয়া যার একটিরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারকাজ সম্পন্ন হয় নি। যা পূর্বেও উল্লেখ করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৌদ্ধদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এর আগে সম্ভবত ঘটেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এইসব কি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনাআমি তা মনে করি না। আমার মনে হয় দেশের বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন কোন ব্যক্তিই তা মনে করেন না। ধারাবাহিক ঘটনার কথা পরে বলবো আগে বর্তমানগুলো নিয়ে বলি। বর্তমানে দেশে খুব বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যক্রম চলছে আর তা হলো একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম। যে যাই বলুক কিংবা যত শিথিলতাই (!) থাক আগামী ডিসেম্বর বা তার কয়েক মাসের মধ্যেই ক’জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ শেষ হবে এবং রায়ত্ত ঘোষিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে সাড়ে তিন বছর আগে তা কল্পনাও করা যায়নি। এই তালিকায় এমন কয়েকজন আছেন সরকার তাদের গ্রেফতার করতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা খোদ আওয়ামী লীগেরও অনেকে ভাবতে পেরেছে কিনা সন্দেহ আছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কী পরিমাণ অর্থ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রদান করা হয়েছে এই বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্যে এবং বর্তমান আইন এবং ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার জন্যে। মীর কাশিম আলী একার পক্ষেই বিদেশি লবিস্ট নিয়োগের জন্যে দেয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার। প্রবাদ আছে, “টাকা যখন কথা বলে ঈশ্বর তখন চুপ করে থাকেন।” জামাত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধীদের টাকা এখন কথা বলতে শুরু করেছে। অতএব বাংলাদেশে এখন থেকে প্রতিদিনই অপেক্ষা করতে হবে নতুন নতুন অরাজক পরিস্থিতি অবলোকন করার জন্যে। এ কাজে যে শুধু বিএনপি-জামাত বা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা জড়িত তা নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পুলিশে ও অন্যান্য বাহিনীতে এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও লুকিয়ে আছে তাদের সমর্থক ও চর। তাদের ইন্দনেই এমন ঘটনা আরও ঘটবে। শুধু সংখ্যালঘু নয় মুসলিমদের মধ্যেও বিভিন্ন তরিকা বা মতভেদ নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হতে পারে। পুলিশ বিরোধী দল ঠেকাতে যত সহজে অ্যাকশনে যেতে পারে। লাঠি পেটা এমন কি গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না সেই পুলিশ সংখ্যালঘু নির্যাতনের সময় নিষ্ক্রিয় থাকে কাদের খুশী করার জন্যে। কাদের ফায়দা লুটের জন্যে।

আরাকানে রাখাইনদের দ্বারা রোহিঙ্গা নির্যাতনের পরে। এবং রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কারণে এসব সীমান্ত এলাকায় আগে থেকে প্রশাসন সতর্ক মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কেনকেন সন্ধ্যা থেকে রামুতে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হলেও পুলিশ আগাম কোন ব্যবস্থা নেয়নি। রামুর ঘটনার পর অন্যান্য এলাকায় আক্রমন করার সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে। এসব এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়নি কেনএখন পর্যন্ত দোষীরা চিহ্নিত হলো না কেনসে রাতে গাড়িতে করে কোন কোন এলাকা থেকে লোক আনা হয়েছিল। সেসব গাড়ির মালিক কারাঅনেক প্রশ্নের উত্তর একটিই। আর তা হলো সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল।

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও তাড়ানোর ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী কারণটি বলি। বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দ্বিধারায় বিভক্ত। একটি ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে উজ্জীবিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় লালিত অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষউদার গণতান্ত্রিক ধারা। অন্যটি পাকিস্তানী ভাবধারায় লালিত সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িকআধা সামরিক ও জঙ্গি গোষ্ঠী সমর্থিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ধারা। ঐতিহাসিকরাজনৈতিক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা প্রথম ধারাটির সাথে যুক্ত এবং সমর্থক। এখন বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইলেদুর্বল করতে হবে প্রগতিশীল ধারাটিকে। আর প্রগতিশীল ধারার বড় একটি অবলম্বনসমর্থক বা সহজ করে বললে ভোটার দেশের সংখ্যালঘু জনগণ। এখন সংঘাত স্থানীয় মাধ্যমেআক্রমণ আতঙ্ক ও জবরদখলের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা গেলে দুর্বল হবে প্রগতিশীল শক্তি। আর তাতে সহজ অংকে লাভবান হবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। অংকটি বড় সহজ। যে অংকের শুরু ’৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর। এর সাথে একটি উপরি পাওনা আছে বটে। হিন্দুদের ফেলে যাওয়া জায়গা জমি। ভোট কমার সাথে সম্পদ বৃদ্ধির হিসেব যারা বোঝে তাদের খুব বেশি বোকা ভাবা ঠিক হবে না। আমরা চাই রামুর ঘটনাটি দেশে এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা হোক। সে সাথে প্রত্যেকটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক। বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশ সাম্প্রদায়িক নয়। হাজার বছর দরে এদেশে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃস্টান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করেছে। সাম্প্রদায়িক হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণেই যুগে যুগে এই উপমহাদেশে বলি হয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। এই ঘৃন্য অপকর্মের অবসান চাই।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ