পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

' ১৯৭১ ভেতরে বাইরে- একটি ব্যবচ্ছেদ' - ২য় পর্ব

দৈনিক আজাদী                                উপসম্পাদকীয়                                   কাল আজ কাল
১৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ৩ আশ্বিন ১৪২১ সাল ২২ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
জনাব এ. কে. খন্দকার তাঁর বইয়ের ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) গ্রেপ্তারের কথা জানতে পেরে আমার মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় যে, বঙ্গবন্ধু কেন এই রকমের ভুল করলেন, যা তিনি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে এই কথাটি আমাকে খুব পীড়া দিত যে, এই ভুল না হলে মুক্তিযুদ্ধে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। হয়ত অনেক মানুষকে জীবন দিতে হতো না বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতো না। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন অথচ গ্রেপ্তারের আগে কোনো আদেশ নির্দেশ বা উপদেশ দেন নি এবং পরিষ্কারভাবে আমাদের ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে কিছু বলেন নি। তাঁর আদেশ বা নির্দেশের অভাবে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আমি মনে করি, নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট সুযোগ ছিল এবং গোপনে থেকে তিনি যুদ্ধে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। জাতির জনকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে খন্দকার সাহেব চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়। কারণ তাঁর বইয়ের বিশাল একটি অঙ্গ জুড়ে তিনি বার বার এই একটি ব্যাপারকেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করার চেষ্টা করেছেন যে, রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতা- পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর কারণে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বারবার রাজনীতিবিদদের খাটো করার অপচেষ্টা করেছেন। তিনি অনেক স্থানে উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধুর কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না। অথচ তিনিই মুজিব বাহিনীর বিষয়ে লিখতে গিয়ে একস্থানে লিখেছেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি বা কোনো মাধ্যম দিয়ে আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর একটা যোগাযোগ হয়েছিল বলে মনে হয়। এ কথাটি এজন্য বলছি যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হওয়া ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগেই মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পেতে শুরু করে। জুলাই মাস থেকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ শেষে সীমান্ত এলাকায় বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। এই খন্দকার সাহেবই তার বইয়ের ৫২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, অসহযোগ আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতারা মোটামুটি সফল হয়েছিলেন বটে কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্বের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় দূরদৃষ্টি দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। যার জন্য আমাদের অনেক উচ্চমূল্য দিতে হয়েছিল।’ কী বৈপরীত্য!

নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে খন্দকার সাহেব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি এই বই লিখতে গিয়ে বার বার ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি একটি জনযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছিল রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বেই। রাজনৈতিক নেতাদের কৃপা, সুপারিশ ও আগ্রহ না থাকলে, তিনি ভারতে প্রবেশ করাতো দূরের কথা মুক্তিযুদ্ধেই অংশ নিতে পারতেন না। কারণ ভারত জেনারেল ওসমানি, খন্দকার, জিয়া, খালেদ মোশাররফ, তাহেরদের মতো সামরিক বাহিনীর লোকদের বিশ্বাস করেছে, আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার বিষয়টি মেনে নিয়েছে তৎকালীন প্রবাসী সরকারের অনুমোদনে যে সরকার ছিল বেসামরিক ও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। আমি ভীষণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি সমগ্র বই জুড়ে তিনি সামরিক বেসামরিক প্রায় সকলের সমালোচনা করেছেন একমাত্র নিজেরও মরহুম তাজউদ্দিন সাহেব ছাড়া। এমনকি খন্দকার সাহেব যুদ্ধকালীন জেনারেল ওসমানীর ভূমিকা নিয়ে যেভাবে লিখেছেন তাতে যে কারও মনে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানি ছিলেন অকর্মণ্য, অযোগ্য। পুরো যুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছে খন্দকার সাহেবের একক যোগ্যতা ও প্রচেষ্টায়।

যে ব্যক্তিটি জনগণের মুক্তির জন্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো জেলে কাটিয়েছেন, একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভেঙে, যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেই লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান োগানে সোচ্চার ছিলেন, একটি উদার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। যিনি প্রথম একটি মুসলিম প্রধান দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছিলেন যিনি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যিনি একটি ভাষা ও জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খন্দকার সাহেব তাঁকেই,তাঁর নেতৃত্বকেই বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবে। নইলে কেন তিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করবেন। ৭ মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দুটোই ঐতিহাসিক ও সংবিধান এমনকি বিশ্ব স্বীকৃত বিষয়। তিনি কেন ও কোন উদ্দেশ্যে এই দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি এমন সময়ে এই কুবিতর্ক উসকে দিলেন যখন তারেক জিয়া লন্ডনে অবস্থান করে বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত ও মৌলিক বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই বই লেখা এবং তা এই সময়ে প্রকাশ কি শুধু কাকতালীয় বিষয় না কি এতে কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে। সে উদ্দেশ্যটি কী?

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সুশীল শ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর একটি অংশ রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন। অনেকে নিজের পত্রিকায় তা নিয়ে স্বনামে কলামও লিখেছিলেন কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আমার ধারণা ওই শক্তি বা গোষ্ঠীটিই এবার মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের অবদানকে মাইনাস করার নতুন আরেকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন এবং তার অংশ হিসেবেই ওই বইয়ের পরতে পরতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার ও রাজনীতিকগণের ভূমিকায় তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

খন্দকার সাহেব লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ যদি বঙ্গবন্ধু পালিয়ে যেতেন-’ স্বাধীনতার পরে দেশি বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদানকালে বঙ্গবন্ধু সে রাতে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বহুবার বলেছেন তিনি যদি পালিয়ে যেতেন তাহলে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তারের অজুহাতে অসংখ্য জায়গায় গণহত্যা চালাত এবং বঙ্গবন্ধুকে পেলে তাঁকে হত্যা করে ‘পালিয়ে যাওয়ার সময়ে ক্রসফায়ারে নিহত’ বলে প্রচার করার সুযোগ পেত। আমি মনে করি সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু পালাতেন তবে তা-ই ঘটতো এবং শুধু তাই নয় এই খন্দকার সাহেবদের মতোই অনেকে বলতেন যে, জাতিকে নিরস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তানিদের মুখে ফেলে রেখে তিনি ভীতু কাপুরুষের মতো পালিয়েছেন। তাঁরাই বলত মাত্র এক কোটি মানুষইতো ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বাকি সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে তিনি ভারতে আশ্রয় নিলেন কী করে। পালানোর মতো নেতা যে বঙ্গবন্ধু নন তার একটি প্রমাণ পাঠকদের সামনে তুলে ধরছিণ্ড ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ শহরে হিন্দু মুসলিম দাঙা হয়েছিল। দু’পক্ষেই বেশ হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে থানায় মামলা হলে পুলিশ তখন অনেককে গ্রেপ্তার করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন যা তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে- সকাল নটায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেপ্তার করে ফেলেছে আমাদের বাড়িতে কি করে আসবে থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা করছিল। প্রায় দশটার সময় টাউন হল মাঠের ভিতরে দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তার উদ্দেশ্য হল আমি যেন সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই, মাদারিপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করতো, সে আমাকে বলে, মিয়া ভাই পাশের বাসায় একটু সরে যাও না’। বললাম, যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি। এই হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। আর ২৫ মার্চের বঙ্গবন্ধুর না পালানোর বিষয়ে ফিরিস্তি দিচ্ছেন একজন বেতনভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা যিনি জীবনে কখনো বঙ্গবন্ধুর সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা জানি না। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট স্টেনগান তাক করা অবস্থায়ও সামান্য বিচলিত হন নি। হাত কাঁপে নি, চিরাচরিত অভ্যাসমতো হাতে পাইপধরা অবস্থায় ঘাতকদের ধমক দিয়েছেন যাঁকে ঘাতকরা পিঠে গুলি করতে পারে নি- তাঁর দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙক্ষা নিয়ে খন্দকার সাহেব প্রশ্ন ও বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। জয় পাকিস্তান তত্ত্বের উদ্ভাবক জনাব এ কে খন্দকার সামরিক উর্দি পরা হয়ে গণমানুষের ভাবাবেগ, ভালোবাসা আর তাদের নেতৃত্ব নিয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন। তাই তিনি নয় মাস শুধু বেসামরিক সরকার তথা প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ছিদ্রান্বেষণের চেষ্টা করেছেন।

খন্দকার সাহেব যে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়েই অজ্ঞ ছিলেন তা নয়, মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব রাজনীতির কোনো খবরও জানতেন না বলে মনে হয়। তাঁর বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় তিনি যুদ্ধে ভারত সরকারের সমালোচনা করে লিখেছেন, বিএসএফ পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহ না করার কারণ তাদের হয়ত অস্ত্র ছিল না অথবা তারা সরকারের অনুমতি পায় নি। আমার মনে হয়েছিল ভারতীয়রা প্রথমদিকে যুদ্ধটি শুধু টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কোনো কিছু অর্জন করতে চায় নি। তখন পর্যন্ত ভারতীয়দের সহযোগিতার কথা বলতে গেলে বলব, তারা সীমান্তে কতগুলো সামরিক ঘাঁটি তৈরি, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু লজিস্টিক সহায়তা ও কিছু হালকা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার অতিরিক্ত বিশেষ কিছু করে নি।’ মুক্তিযুদ্ধের সামান্যতম ইতিহাস যারা জানেন তাদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার থাকলেও উপ-সেনাপতির কাছে বিষয়টির কোনো ব্যাখ্যা নেই আসলে বাস্তবতাটি ছিল সেদিন। ভারতে তখন শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় এক কোটি মানুষ। তাদের খাওয়া, পরা, আশ্রয়, চিকিৎসা, ওষুধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ আর প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে নানাবিধ সাহায্য প্রদান ওসময়ে ভারতের অর্থনীতির ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া ছিল বিশ্ব রাজনীতির চাপ। পূর্বের সকল দৃষ্টান্ত পাল্টে দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির দুই মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে ইউরোপ ও অন্যান্য মহাদেশের প্রভাবশালী দেশ, মধ্যপ্রাচ্য তখন পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল। ওই সময়ে ভারতের জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ছিল অত্যন্ত জরুরি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব জনমত তৈরির জন্যে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন এবং একটি পর্যায়ে অর্থাৎ জুনের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ কথাগুলো খন্দকার সাহেবের গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে আসা উচিত ছিল এবং এই যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদানের কথা একটু কৃতজ্ঞতার সাথে উচ্চারণের প্রয়োজন ছিল।

তিনি তাঁর বইতে আগাগোড়া রাজনীতিকদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অনেকের ত্রুটির কথা উল্লেখ করলেও নিজের কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে বলে মনে করেন নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নই। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, প্রবাসী সরকারের ভূমিকা, মুজিব বাহিনী ইত্যাদি নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। যারা জড়িত ছিলেন তাঁরা তার অসংলগ্নতা বা তাঁর লেখায় অনিয়ম ও বিকৃতি কিছু থাকলে তা তারা প্রতিবাদ করবেন আমি শুধু তাঁর বইতে পরস্পর বিরোধী ও জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিকৃতির বিরুদ্ধে বলেছি এবং তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেছি। একজন উপ সেনাপতি হিসেবে তাঁর এ গ্রন্থ অন্যভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে, কারণ তাঁর মতো এত কাছে থেকে দেখা অন্য কারোর কোনো গ্রন্থ আমরা এখনও পাই নি। এই বইয়ের সত্যমিথ্যা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা সমালোচনা হবে। আমিও লেখাটি শেষ করব তাঁরই বইয়ের বর্ণনা তুলে দিয়ে। কারণ সারা বইতে তিনি অন্যদের অর্থাৎ বেসামরিক ও প্রবাসী সরকারের সমালোচনা করেছেন কিন্তু তাঁরা দু’সেনাপতি সামরিক বাহিনীর অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের কাজের নমুনা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দূরদর্শিতা ও শৃঙ্খলার একটি নমুনা তুলে ধরছি।

তার বইয়ে দেওয়া তথ্যসূত্রে ৬ ডিসেম্বর সকালে ভুটান ও বিকেলে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। . . . ৭ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মানিক যুদ্ধবিরতির জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে একটি আবেদন করেন। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। . . . ১৪ ডিসেম্বর বিকেল চারটায় ভারতীয় বিমানবাহিনী গভর্নর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবন) অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদের সভায় আক্রমণ করে। গভর্নর মালিক ভীত হয়ে তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে গিয়ে রেডক্রসের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ উদ্ধৃতিগুলো খন্দকার সাহেবের। তার মানে তাঁর লেখার মধ্যেও আমরা পাঠকরা আন্দাজ করতে পারি যে, বিজয় আমাদের আসন্ন। কারণ এরই মধ্যে মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে। এ ধরনের টান টান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আমাদের দু’সেনাপতি- প্রধান সেনাপতি এম. এ. জি. ওসমানি ও উপ-প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার কেমন তৎপর, বিচক্ষণ, কর্তব্যনিষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল ছিলেন তার একটি নমুনা খন্দকার সাহেবের বই থেকেই তুলে দিচ্ছি। খন্দকার সাহেব তার বইতে যেখানে রাজনৈতিক নেতা তাদের যুদ্ধ পরিচালনা, সরকার ব্যবস্থা ও নেতৃত্ব নিয়ে বারংবার সমালোচনা করেছেন সেখানে তাঁরা দু’জন সামরিক বাহিনী সুশৃঙ্খল অফিসার ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কী করেছেন দেখুন- তাঁর লেখনীতে- ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার কর্নেল পি দাস অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব ফারুক আজিম খানের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠেয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর জানান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানির খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন যে, কর্নেল ওসমানির মুক্ত এলাকা পরিদর্শনে সিলেটে গেছেন। এ হচ্ছে প্রধান সেনাপতির কাণ্ড। এবার উপপ্রধান কী করছেন দেখুন কর্নেল ওসমানির অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিকেল চারটায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমি বাংলাদেশ বাহিনীর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করব। এ সময় আমি সম্ভবত কমল সিদ্দিকীসহ কয়েকজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখার জন্য গিয়েছিলাম, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ড. ফারুক আজিজ খান এবং প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার মেজর নুরুল ইসলাম আমাকে চারদিকে খুঁজতে শুরু করেন’। ‘. . . সে সময় আমার পরনে বেসামরিক পোশাক, অর্থাৎ একটি শার্ট আর সোয়েটার ছিল। আমি এগুলো বদলে সামরিক পোশাক পরারও সময় পেলাম না। তাঁরা আমাকে বিমান বন্দরে পৌঁছে দেন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামরিক যাত্রীবাহী বিমান দাঁড়ানো আছে’।

যখন বাংলাদেশের অনেক এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে যখন পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ শুধু সময়ের ব্যাপার তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ও উপপ্রধান সেনাপতির ভূমিকা দেখে এবং বর্তমানে জনাব এ কে খন্দকারের অবস্থান দেখে ভাবছি বাংলায় সেনাপতি পলাশী থেকে রেসকোর্স নামে আরও একটি লেখা লিখতে হবে আমাকে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

'১৯৭১ ভেতরে বাইরে একটি ব্যবচ্ছেদ' - ১ম পর্ব

দৈনিক আজাদী                                    উপসম্পাদকীয়                                  কাল আজ কাল
১১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২৭ ভাদ্র ১৪২১ সাল ১৫ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
গত কয়েকদিন ধরে দেশ জুড়ে আলোচিত-সমালোচিত ও নন্দিত-নিন্দিত হচ্ছে একটি বই। মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়কবিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান, সাবেক মন্ত্রী ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে তা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত সবখানে আলোচনার বিষয় এখন একে খন্দকার ও তার বিতর্কিত বইটি।

এ কে খন্দকার বেশ ভদ্র সজ্জন। মিতবাস এবং কর্মঠও বটে। কারণ ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ক্যাডেট পাইলট হিসেবে চাকরিতে ঢোকার দীর্ঘ বছর পর এ বছরের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার অধীনে নতুন সরকার গঠিত হলে সেখানে তাঁর ঠাঁই না হওয়ায় প্রথম বার চাকরিবিহীন, বেকার অথবা অবসর গ্রহণ করলেন। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদানের পর দীর্ঘ ১৮ বছর পর ১৯৬৯ সালে তিনি বাংলাদেশ থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে আসেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সহ-অধিনায়ক স্বাধীনতার পর বিমান বাহিনীর প্রধান, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোস্তাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদান। পরে চাকরিচ্যুত হয়ে তাঁর বইতে তিনি লিখেছেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন বা পদত্যাগে বাধ্য হয়ে সে সরকারের অধীনে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে ভারতের রাষ্ট্রদূত, তারপরে এরশাদের পতন হওয়া পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রীসভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং তার পরে আওয়ামীলীগের সাংসদ, পরে পরিকল্পনা মন্ত্রী। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকারের আমলেই তিনি ক্ষমতা ও তার সুফল ভোগ করেছেন। যে লোকটি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এ দেশে থাকেননি। যিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, এমনকি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানও ভালো করে দেখেননি বা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। যিনি বাঙালির এই দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করেননি অংশগ্রহণ করেননি এমনকি পত্র-পত্রিকায়ও ভালো করে পড়েননি (তিনি তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের কথা লেখা হতো না বলে এদেশের অনেক কিছুই তাঁর পক্ষে জানা তখন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি) তিনি যখন মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ এবং তার নায়কদের বিষয়ে লিখতে যান তখন তা খন্ডিত, বিকৃত আরোপিত ও ভ্রান্ত হতে বাধ্য। তা-না হলে নির্বাচন থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এবং তার লেখায় বহুবার উল্লেখিত সে সময় নিয়ে রাজনীতিবিদদের প্রসঙ্গে যে আপত্তিকর বিভ্রান্তিমূলক ও অপমানজনক মন্তব্য করেছেন তা উদ্ভাবিত হতো না। ১৯৫১ থেকে যাঁর জীবন কেটেছে সশস্ত্র বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি কীভাবে গণমানুষের রাজনীতি তাদের আবেগ-উত্তেজনা তাদের নেতাদের প্রতি অকৃত্রিম ও বাঁধভাঙ্গা ভালোবাসার মূল্যায়ন করবেন। তিনি সামরিক বাহিনীর লোক কাজেই বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ও তার পথ পরিক্রমায় একজন সামরিক ব্যক্তির দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে বারবার আন্দোলন সংগ্রামকে এক প্রকার সামঞ্জস্যহীন, অগোছানো, শৃঙ্খলাহীন ও নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা হিসেবে দেখেছেন এবং তাঁর বইতে তা বারবার উল্লেখ করেছেন।

বাঙালি হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল একটি উল্লেখযোগ্য ও গৌরবের কাল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠদলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার । অন্যদিকে ১৯৪৭ সালের পর প্রথমবারের মতো বাঙালির অবিসংবাদিত নেতাকে তাঁর ৬ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ না দিতে পশ্চিম পাকিস্তানি তথা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর নানাবিধ ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু তখন একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রধান। নির্বাচনে বিজয়ী এক নেতা। নিয়ম অনুসারে প্রেসিডেন্ট তাঁর দলকেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে ডাকবেন। তখন তিনি কোনো বিপ্লবী দলের প্রধান নন এবং দেশে বিপ্লবের মাধ্যমেও সরকার বদল হচ্ছে না। সে কারণে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সংসদ অধিবেশন আহবান না করা পর্যন্ত কার্যত বঙ্গবন্ধু কোনো কিছুই করতে পারেন না। শেষে ২৫ তারিখ অধিবেশন ডাকা হবে বলে ইয়াহিয়া আলোচনার আহবান জানালেন। একজন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত নেতা হিসেবে সে আলোচনার আহবানকে উপেক্ষা করে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত হতেন এবং যে কারণে বাংলাদেশের সে যুদ্ধে বিশ্ব জনমত এমনকি ভারতের সমর্থন আদায়ও সম্ভব হয়ে উঠতো না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত হস্তক্ষেপ করছে বলে এই যুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত পাকিস্তান। যে কারণে পাকিস্তানিদের দ্বারা আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা ঘোষণা না করার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং ইতিহাস সাক্ষী তিনি তাতে সফল হয়েছিলেন। কিছু মাথামোটা ও হঠকারী ছাত্র যুব ও আওয়ামীলীগ নেতার উস্কানি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে সময়কে মোকাবেলা করেছিলেন। সম্ভবত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক ছিলেন তিনি।

আন্দোলন সংগ্রামে অভিজ্ঞতাহীন ও জনগণের সাথে সম্পর্কহীন বাহিনীর ছাউনিতে বসবাসকারী একে খন্দকার সে সময়ে রাজনৈতিক দল ও তার নেতাদের ব্যর্থতা ও দূরদর্শিতাকে সমালোচনা করে লিখেছেন ‘আমি পাকিস্তানিদের তটস্ত রাখা ও তাদের পদ্ধতি ব্যাহত করার পরিকল্পনাগুলো উইং কমান্ডার এম আর মীর্জাকে জানিয়েছিলাম। আমার এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুই দিনের আন্দোলনে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়। বিজয়ের জন্য যথেষ্ট পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের উচিত ছিল, পাকিস্তানিরা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই ছোট ছোট আঘাত আর খোঁচার মাধ্যমে তাদের নাজেহাল করা।’ আরেক জায়গায় লিখেছেন সারাদেশে এ ধরনের ছোট ছোট তৎপরতা চালিয়ে পাকিস্তানিদের দৌড়ের ওপর রাখা যেত। কী বালখিল্য মূল্যায়ন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের তারিখ থাকা এবং তা নিয়ে আলোচনাকালে এমন তৎপরতা ও আক্রমণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অন্তর্ঘাতমূলক হতো না তখন। রাজনৈতিক এই বিচক্ষনতা তাঁর মতো একজন পাকিস্তানের ‘মোস্ট অবিডিয়েন্ট’ এর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না তখন। তিনি তাঁর লেখায় বারবার বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করেছেন স্বাধীনতা ঘোষণা, তার পূর্ব প্রস্তুতি ইত্যাদি না নেওয়ার জন্য। অথচ তাঁর বইতেই তিনি লিখেছেন আতাউল গণি ওসমানিকে ১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।’ যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি যদি বঙ্গবন্ধু নাই বা নিতেন তাহলে সেখানে ওসমানিকে সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন কেন? কেন বঙ্গবন্ধু ফেব্রুয়ারি মাসে ড. কামাল হোসেনকে স্বাধীনতার ঘোষণার খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর একজন উচ্চ কর্মকর্তা যাঁর চাকরির অধিকাংশ সময় পশ্চিম পাকিস্তানে কাটিয়েছেন তিনি কীভাবে জানবেন যে, ১৯৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগের একটি অংশ নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি ‘নিউক্লিয়ার্স’ গঠন করা হয়েছিল। তিনি কীভাবে জানবেন ১৯৬৯ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণ সভায় বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেছিলেন এবং ভারতের সাথে যোগাযোগের জন্য তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুভারকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। খন্দকার সাহেব কী করে ভাবলেন যে পূর্ব কোনো যোগাযোগ বা আলোচনা ছাড়াই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে ভারত সরকার যাচাই-বাছাই না করেই আশ্রয় দেবেন।

তিনি বারবার বলতে চেয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর অনেক বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল শুধু রাজনৈতিক নির্দেশনার অভাবে তা সম্ভব হয়নি? প্রশ্ন ওঠে তাঁর বেলায় কী ঘটেছিল? তিনিও কি বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, না কি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রতি অনুগত থাকার? তার বক্তব্য পাঠকরা অনুমান করুন, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান রেডিও ও টেলিভিশনে এক ভাষণে এই জঘন্য অপরাধের দায়ভার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর চাপিয়ে দেন। তিনি এই ভাষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশংসা ও শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করেন।’ তিনি তাই বইতে সেখানে স্বাধীনতার প্রশ্নে দোদুল্যমান বলে বঙ্গবন্ধুকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন সেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের ভাষায় বঙ্গবন্ধু ‘দেশদ্রোহী’। যেখানে পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটে প্রথমে পিলখানা, রাজারবাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে; সেখানে কয়েকদিন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর সকল বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা হয়েছিল এবং সে রাতেই অধিকাংশ বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তখনও তিনি পাকিস্তানি সরকারের অনুগত হয়ে চাকরি করে যাচ্ছিলেন। যেখানে বাঙালি ইপিআর, পুলিশ ও সামরিক ব্যক্তিদের পেলেই হত্যা কিংবা গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল সেখানে তিনি দিবিব রয়ে গেলেন কীভাবে একজন শীর্ষ বাঙালি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও? তাঁর ভাষায়, ২৬ মার্চ সারাদিন কারফিউ ছিল। ২৭ মার্চ সকালে অল্পক্ষণের জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তাই ২৭ মার্চ সকালে তাদের নিয়ে আসার জন্য নিজেই জিপ চালিয়ে আজিমপুরে যাই। পথে রাস্তার দু’পাশে ভয়ংকর ও বীভৎস দৃশ্য দেখি। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। কালো পিচের রাস্তা রক্তে লাল হয়ে গেছে। ভাবলাম এর পরতো এই হত্যাকারীদের সঙ্গে যাবার প্রশ্নই উঠে না। কয়েকদিনের মধ্যেই সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে আমরা পুনরায় আজিমপুরে স্ত্রীর বোনের বাসায় উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম।’ এরপরে তিনি লিখেছেন, ‘২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ভাবলাম এয়ারফোর্স অফিসার মেসে গিয়ে দেখি মেসের কী অবস্থা। মেসে গিয়ে দেখলাম, কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন, লক্ষ্য করলাম একটি সেনা ভর্তি ট্রাক অফিসার মেসে প্রবেশ করল। সৈনিকদের অনেকের হাতে অগ্নিবর্ষক অস্ত্র দেখলাম। সৈনিকেরা গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অফিসার মেসের একটু পেছনেই ছিল নাখালপাড়া গ্রাম। নাখালপাড়া গ্রামটি ছিল গরিব। রিক্সাওয়ালা ও খেটে খাওয়া মানুষের বাসস্থান। পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল এই গরিব মানুষগুলো আসল শত্রু, কারণ এরাই সব আন্দোলনের পুরোভাগে থাকে। অগ্নিবর্ষক অস্ত্রগুলো দিয়ে এদের বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের শিখায় পুরো এলাকা লাল হয়ে গেল। ঢাকায় কারফিউ থাকার কারণে নাখালপাড়ার বাসিন্দারা বাসায় আবদ্ধ ছিল। সব ঘর বাড়িতে দারুণভাবে আগুন জ্বলে উঠল। তাদের তখন ঘর থেকে বের হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। যখন তারা ঘর থেকে দৌঁড়ে বের হওয়া শুরু করে তখন এই অসহায় মানুষগুলোর ওপর পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করা শুরু করল। আমার পাশে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর কয়েকজন অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদেরই একজন আমার সামনেই বলে উঠলেন, ‘দিস ইজ দ্য ওয়ে টু ডিল উইথ দ্য বাস্টার্ডস।’ এই কথাটা আমি জীবনে ভুলব না। নিজ চোখের সামনে এই ঘটনা দেখে আমি স্থির করলাম, এদের সঙ্গে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না।’ এতক্ষণে অরিন্দম! যিনি পুরো মার্চ মাস জুড়ে উথালপাতাল করেছেন পাক আর্মিদের দৌঁড়ের ওপর রাখতে তিনি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের সঙ্গে আর না। প্রশ্ন উঠে যে পাকিস্তানিদের কাছে ওই গরিব বস্তিবাসী বাস্টার্ড এবং মৃত্যুই তাদের প্রাপ্য, এমন খুনীদের কাছে বিমান বাহিনীর শীর্ষ বাঙালি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলেন না কেন? তিনি লিখেছেন, ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রূপ নেয়। এখান থেকে প্রথমে স্থানীয় নেতারা ও পরে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমি মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা পুলিশ এবং চট্টগ্রামের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা জানতে পারি। এখানেও তথ্যগত ভুল করেছেন তিনি। কার্যত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়নি। তার কিছু যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিয়ে কালুরঘাটে অবস্থিত আরেকটি ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে ঘোষণা পাঠ ও প্রদান করা হয়েছিল। সে কেন্দ্রের ফ্রিকোয়েন্সি বেশি ছিল না বলে তার কোনো ঘোষণা ঢাকায় বসে শোনা সম্ভব নয়। যাক তারপরে তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী স্থলপথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আক্রমণ করতে না পেরে ২৯/৩০ মার্চ বিমানের সাহায্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে বোমা বর্ষণ করে। ২৮ বা ২৯ মার্চের পর থেকে বিমান বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলো বাঙালিদের পরিবর্তে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানি বৈমানিকদের দ্বারা উড্ডয়ন করা হতো। আমিসহ সব বাঙালি কর্মকর্তা তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ছিলাম নামে মাত্র। আমাদের কোনো দায়িত্ব-কর্তব্যে নিযুক্ত করা হতো না। পাকিস্তান বিমান বাহিনী কোথাও আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা ধারণা করতে পারতাম কিন্তু কবে, কখন কোথায় তা কার্যকর হবে তা নির্দিষ্টভাবে জানতে পারতাম না।’ প্রশ্ন উঠতে পারে যিনি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় পাক সেনাদের নির্মমতা দেখে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি ২৯ তারিখ পর্যন্ত তাঁর ভাষায় বিমান বাহিনীতে চাকরি করলেন কী করে? আর তাঁর কথায় মনে হলো তাঁকে বা তাঁদের বসিয়ে না রেখে দায়িত্ব বা কর্তব্য অর্পণ করলে তিনি খুশি হতেন। (পরবর্তী সপ্তাহে)
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

'ষোড়শ সংশোধনী বনাম বর্তমান আইন সভা' - ২য় পর্ব

দৈনিক আজাদী                                      উপসম্পাদকীয়                                          কাল আজ কাল
৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২০ ভাদ্র ১৪২১ সাল ৮ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
গত সপ্তাহে বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত করার লক্ষ্যে সংবিধানে যে সংশোধনী অর্থাৎ ষোড়শ সংশোধনী পাশ হতে যাচ্ছে তা কোনোভাবেই সংসদীয় গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং তা না থাকাটাই সাংঘর্ষিক ও বিপরীত। তবে প্রশ্ন তুলেছিলাম এ ক্ষমতা যে সংসদ বা যে ধরনের সংসদ সদস্যদের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছি সে সংসদ বা তার সদস্যগণ তার জন্যে কতটা উপযুক্ত।

পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম বিগত কয়েকটি সংসদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখতে পাই তাতে প্রতিনিধিত্বকারীর মধ্যে প্রকৃত রাজনীতিকের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। সৎ, দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত রাজনীতিকের সংখ্যাতো আশঙ্কাজনকভাবে কম। বলা যায় বিরলপ্রজ হয়ে উঠছেন তারা এবং সে সাথে এ-ও উল্লেখ করেছিলাম যে, রাজনীতিকে কলুষিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বেশ আগে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পরে যে শক্তিটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল তারাই মূলত তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাজনীতিকদের কেনাবেচা ও দলছুট করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বাস্তবেই রাজনীতিকদের জন্যে রাজনীতি কঠিন করে ফেলা হয়েছিল।

একজন জাতীয় সংসদ সদস্য পক্ষান্তরে যিনি একজন আইনসভার সভ্য তাঁর কাঁধে এত বেশি কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার পদটিকে এত বেশি লাভজনক ও লোভনীয় করা হয়েছে যে, তা আয়ত্ত করতে, দখল করতে সুবিধাবাদীরা উন্মুখ হয়ে থাকে। একজন সংসদ সদস্যের হাত দিয়েই তার এলাকায় শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের টাকা খরচ হয়। বদলি, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে কোনো কাজ একজন সংসদ সদস্যের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজেই একজন মানুষ না চাইলেও দেশের বিদ্যমান ‘সিস্টেম’ তাকে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠলে তার অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

এরশাদ আমলে প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীয়করণ করতে গিয়ে উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছিল। সরকারের উন্নয়ন কাজ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে করার লক্ষ্য(!) নিয়ে তা করা হলেও মূলত কখনও তা সঠিক ও সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা প্রশাসনকে অকার্যকর করে রাখে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও উপজেলা প্রশাসন পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাধা হিসেবে কাজ করেছে সংসদ সদস্যরাই। তাদের এলাকায় নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব খর্ব হতে পারে মনে করে সংসদ সদস্যরা উপজেলা বা স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালনে বাধা প্রয়োগ করেছে। সংসদ সদস্যরাই যেহেতু আইন প্রণয়ন করে থাকেন সেহেতু তাঁদের ক্ষমতা খর্ব করার মতো কোনো আইন প্রণয়নে তারা সম্মত হননি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকা ছিল এক ও অভিন্ন। যে কারণে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন হলেও সরকারের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আর আগ্রহ দেখা যায়নি। এক সময়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়ে উপমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করতেন। বর্তমান সরকারের আমলে সে মর্যাদাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে উন্নয়ন কাজে সরকার সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করবেন না কি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যানদের ব্যবহার করবেন। দেশের সুশীল শ্রেণির একটি অংশ উন্নয়ন কাজে স্থানীয় সরকারকে ব্যবহার করা এবং সে সাথে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর মত ব্যক্ত করে থাকেন। এখন আমরা দেখতে চাই সে ক্ষেত্রে আমাদের কী কী অসুবিধাগুলোর সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

১৯৪৭ সালে একই সাথে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলেও ভারতে গণতন্ত্র বিকাশের সাথে সাথে একই সমান্তরালে শক্তিশালী হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। যে কারণে সেখানে কার্যকর সংসদের পাশাপাশি কার্যকর তাদের স্থানীয় সরকারের তৃণমূল সংগঠন গ্রাম পঞ্চায়েত। কিন্তু পাশাপাশি অপর রাষ্ট্র পাকিস্তানে না হয়েছে গণতন্ত্রের বিকাশ, না হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ। পাকিস্তানে গণতন্ত্র বিকাশই লাভ করতে পারেনি। মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। তেমনি করে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল সংগঠন ইউনিয়ন পরিষদ সমূহেও হয়নি এবং সেখানেও প্রতিনিধিত্ব করেছে কিছু ব্যক্তি যারা পক্ষান্তরে পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় থাকার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৯ সানে পাকিস্তানে জেনারেল ইসকান্দর মীর্জার নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এরপর জেনারেল ইসকান্দর মির্জাকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন সেনা প্রধান জেনারেল আইউব খান। তিনি ক্ষমতায় এসে তা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পাকিস্তানে প্রবর্তন করেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শন প্রসূত বেসিক ডেমোক্রেসি বা বিডি। আইউব খানের প্রবর্তিত বেসিক ডেকোক্রেসিতে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন ইউনিয়ন বোর্ডের (বর্তমান পরিষদ) চেয়ারম্যানগণ। এটি ছিল আইউব খানের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ছিল না। সে ব্যবস্থায় বিত্তবান, প্রভাবশালী ও সরকারের তোষামোদকারীরা টাকা,ক্ষমতা উপঢোকন কখনওবা ভয় দেখিয়ে চেযারম্যানদের ভোট আদায় করে প্রাদেশিক ও গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন। আমরা একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব আইউব খান তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যেভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছিলেন পরবর্তীতে প্রতিটি সামরিক শাসক সে ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, অর্থাৎ তারাও তাঁদের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার খাতিরে প্রথমেই ব্যবহার করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও তার প্রতিনিধিদের। জনগণ ও তার প্রতিনিধিদের ভয় পায় বলে প্রায় প্রতিটি স্বৈরশাসক প্রথমে বেছে নিয়েছে স্থানীয় সরকারকে। সংসদকে পাশ কাটিয়ে কিংবা সংসদ ভেঙে দিয়ে এসব স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সাহায্যে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেছে। জেনারেল জিয়া, এরশাদ (তারা উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে) এবং সর্বশেষ- ১/১১ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেশ পরিচালনার ইতিহাস দেখলে তার সত্যতা পাওয়া যাবে। কাজেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি গণতন্ত্রমনস্ক জনগোষ্ঠীর আস্থা ও সমর্থন খুব বেশি বলে আমার মনে হয় না। ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য মেম্বার থেকে চেয়ারম্যান এবং অধুনা উপজেলা চেয়ারম্যানদের দুর্নীতির খতিয়ান সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম দীর্ঘ নয়।

এ ছাড়া আরও একটি আশঙ্কার কারণ আছে। একজন সংসদ সদস্য তার ভালো-মন্দ-কাজের জন্যে তার দল ও সংসদের কাছে দায়ী থাকেন। খুব বেশি নয়, ১০ থেকে ২০ জন সংসদ সদস্যের দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে একটি সরকারের ভিতও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি থাকে সংসদে। আর সেখানে শাস্তি না হলেও পরবর্তী নির্বাচনে জনগণই তাকেসহ তার দলকে উপযুক্ত জবাবটুকু প্রদান করতে পারে। কাজেই একজন সদস্য সব কিছুর উর্ধ্বে থাকতে পারেন না। কম বেশি অন্য সদস্যদের কাছে হলেও তাকে ভর্ৎসনা শুনতে হয়। অন্যদিকে আগেই বলেছি স্থানীয় সরকার বা উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ নির্বাচিত হন নির্দলীয়ভাবে। তার কর্মকাণ্ডের জন্যে কোনো দলের কাছে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় না। দুর্নীতিতেও তারা সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম অগ্রসর নন। কয়েকজন সংসদ সদস্যের কৃতকর্মের কারণে পার্টি ক্ষমতা হারাতে পারে কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যানরা এক একজন স্বতন্ত্র। কাজেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো দলীয় শৃঙ্খলাও কার্যকর নয়। আরেকটু খুলে যদি বলতে হয় তাহলে বলি এ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাই বেশি দুর্নীতির সাথে যুক্ত অতীতের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।

এখন জিজ্ঞাসা তাহলে বাকি থাকল কে? সংসদ সদস্য থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান দুপক্ষ নিয়েই আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তাহলে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে কে?

এ সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো- ব্যক্তিকে সৎ হওয়া। একজন সৎ মানুষের হাতে যে দায়িত্বই অর্পণ করুন না কেন, তা সঠিকভাবে পরিচালিত হতে বাধ্য। আর সৎ না হলে সে দায়িত্ব একজন সংসদ সদস্যকে দেওয়া হোক বা উপজেলা চেয়ারম্যানকে দেওয়া হোক ফল হবে অভিন্ন। দায়িত্ব নিতে হবে জনগণকে। জনগণ যদি যে কোনো মূল্যে দুর্নীতিবাজ নেতাকে প্রত্যাখ্যান করে পরিস্থিতি পাল্টাতে বাধ্য। কারণ ব্যক্তি সৎ না হলে সমাজ সৎ হবে না। সমাজ সৎ না হলে রাষ্ট্রও সৎ হবে না। কাজেই আগে ব্যক্তিকে সৎ হতে হবে। তাতে যে প্রক্রিয়া বা যে পদ্ধতিই বহাল থাকুক না কেন তাতে সুফল পাওয়া যাবে।

জনগণ যদি চায় তার প্রতিনিধি হোক একজন ভালো মানুষ, সৎ মানুষ তবে তা-না হয়ে উপায় কী। প্রশ্ন হলো জনগণ কি তা চায়। না কি পুরনো সে কথাটিই পুনরায় স্মরণ করব যে, ডাকাতের সর্দার হয় ডাকাত, আউলিয়ার সর্দার হবে আউলিয়া।

জনগণ সৎ হলে তার প্রতিনিধিরা সৎ হবে না কন?

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ