পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১২

চট্টগ্রাম থেকে হজফ্লাইট নেই, কী করতে আছেন এমপি, মন্ত্রীরা!

দৈনিক আজাদী                               উপ-সম্পাদকীয়                         কাল আজ কাল
২০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ৫ আশ্বিন ১৪১৯ সাল ‌৩ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

এ বছর চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি কোন হজ ফ্লাইট নেই। অর্থাৎ চট্টগ্রামের ১০ হাজার হজযাত্রীর মধ্যে মাত্র ২ হাজার হজযাত্রী নিয়মিত ফ্লাইটে যাওয়ার সুযোগ পেলেও বাকি ৮ হাজার হজযাত্রীকে ঢাকা হয়ে জেদ্দা যেতে হবে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বোয়িং ৭৪৭ এবং ৭৭৭ এর মতো বড় বোয়িং বিমানগুলোর অবতরণ সুবিধা নেই চট্টগ্রামের কথিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গত বছর চট্টগ্রাম থেকে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট থাকায় হজযাত্রীদের সুবিধা হয়েছিল। কিন্তু এ বছর বিমান কর্তৃপক্ষ সে ব্যবস্থা না করায় মহাদুর্ভোগে পড়বেন হজযাত্রীরা।

বাংলাদেশ একটি বৃহত্তম মুসলিম দেশ। প্রতিবছর এদেশ থেকে হজে যাওয়ার যাত্রী বাড়ছে। অথচ আজ কয়েক বছর থেকে হজ মওসুম এলেই বিমান কর্তৃপক্ষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার হজযাত্রীকে দু:সহ যন্ত্রণার মধ্যে পড়তে হয়। আমাদের মনে আছে গত জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামের মীর নাছির বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে কমিশন বাণিজ্যের জন্য ফ্লাই বিড়ম্বনায় কত হজযাত্রী কষ্ট পেয়েছিলেন। শেষেতো এক কি দুজন হজযাত্রী মৃত্যুবরণও করেছিলেন। তবে এ বছর এখনো হজ ফ্লাইট নিয়ে কোন ধরনের বিড়ম্বনা বা অনিয়ম ঘটেনি। গত রোববার থেকে যে ক’টি হজ ফ্লাইট ঢাকা বিমান বন্দর ত্যাগ করেছে তার কোন যাত্রীও কোনরূপ অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। তবে ভাড়া করা একটি বিমান পালিয়ে যাওয়ায় এবং হজ ফ্লাইট সিডিউল ঠিক রাখতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজার হাজার যাত্রী চরম বিপাকে পড়েছেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে বিমান বন্দরে আটকা পড়েছেন, যাদের অনেকের চাকরিতে যোগদানের শেষ সময়টুকুও পার হয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবার থেকে বিমানের সময়সূচি ভাঙতে শুরু করে। এই কয়েকদিন ধরে চলা সংকটে বিভিন্ন গন্তব্যের ফ্লাইটসূচির বারবার বদলাতে হচ্ছে। পরে সে বদলানো সময়সূচিও ঠিক রাখা যাচ্ছে না। ঢাকা বিমান বন্দরে যাত্রীরা বিক্ষোভ করেছে। চট্টগ্রামের যাত্রীরা ২য় বারের মতো বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে। এর আগে বিমান অফিসও ভাঙচুর করা হয়েছিল এক দফা।

আসলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। তবে এই পরিস্থিতি আকস্মিক কিংবা অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ বিমানের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নতুন কিছু নয়। কোন সরকারের আমলেই এমন কি সেনা শাসিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও বিমানের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করা এমনকি কমানোও সম্ভব হয়নি। বরং এই মন্ত্রণালয় যার দায়িত্বেই দেয়া হয়েছে তিনিই জড়িয়ে গেছেন দুর্নীতিতে। যাদের রক্ষক হওয়ার কথা তারাই ভক্ষক হয়েছেন বিমানের শত শত কোটি টাকার সম্পত্তির। বিমানের সামান্য ঝাড়ণ্ডদার থেকে শুরু করে শীর্ষ পদের লোকটি পর্যন্ত কোন না কোনভাবে দুর্নীতি, অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতার সঙ্গে জড়িত। কাজেই এই সংস্থার কাঁধ থেকে দুর্নীতির ভূত কখনোই তাড়ানো সম্ভব হয়নি।

দুঃখিত, আমি লিখতে বসেছিলাম চট্টগ্রামে হজ ফ্লাইট না দেয়া ও বিমান বন্দরের সীমাবদ্ধতা বা নির্মাণ ত্রুটি নিয়ে, অথচ লিখে ফেললাম বিমানের দুর্নীতি নিয়ে। আসলে কান টানলে মাথা আসে। আমার মতো চট্টগ্রামবাসী সবার মনে থাকার কথা গত আওয়ামী লীগ আমলে এই বিমান বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু ও সমাপ্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম বেতার ঘোষক এম. এ হান্নানের নামে তার উদ্বোধন হয়েছিল। বলা হয়েছিল-এটি একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। অনেক বিদেশি বিমান সংস্থার বোয়িং বা ফ্লাইট আসা-যাওয়া ছাড়াও শুধু এখাতে জ্বালানি বিক্রি করেও এই বিমান বন্দর অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে,তেল বিক্রিতো দূরের কথা দিনে দিনে কমে গেছে বৈদেশিক উড়োজাহাজের সংখ্যা। হাতে গোণা যে ক’টি বিদেশি সংস্থার উড়োজাহাজ আসা-যাওয়া করে তার মধ্যে বেশ ক’টি অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে পারে।

এ বছর চট্টগ্রাম থেকে হজ্বফ্লাইট দিতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিমানের চট্টগ্রাম অফিসের মহাব্যবস্থাপক একটি দৈনিকের প্রতিনিধিকে বলেছেন বড় ধরনের বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নের সুবিধা এই বিমানবন্দরে নেই। অর্থাৎ পর্যাপ্ত রানওয়ের অভাবে এ ধরনের বোয়িংগুলো চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামতে উঠতে পারবে না। এ পরিস্থিতিতে আমাদের প্রশ্ন হলো, মাত্র ১০/১২ বছর আগে নির্মিত একটি বিমানবন্দরে এই সীমাবন্ধতা কেন? নির্মাণের সময় কর্তৃপক্ষ কি ভাবেনি এখানে কী ধরনের বা কোন কোন বিমানগুলো অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে পারবে? তার মানে নামে আন্তর্জাতিক হলেও বাস্তবে কি এই বিমানবন্দরটি একটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আধুনিক রূপ(বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে) সিভিল এডিয়েশন কর্তৃপক্ষ কী জবাব দেবেন তার? স্বাধীনতার পরপর আমরা লক্ষ করছি, প্রশাসন বা ক্ষমতার কেন্দ্রে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী এমন একটি শক্তি আছে যারা প্রতি পদে পদে চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। চট্টগ্রামের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে দিন দিন খাটো করার একটি সুগভীর চক্রান্ত চলছে দীর্ঘদিন থেকে। আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভাবেও চট্টগ্রামকে গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই রেল,নৌসহ অনেক সংস্থার সদর দফতর চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অনেক বহুজাতিক কোম্পানির মূল কারখানা বা মূল কার্যালয়ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। গত কয়েক মাস আগে এভাবে চা বোর্ডের নীলাম অফিসও সিলেটে নিয়ে যাওয়ার পায়ঁতারা করা হয়েছিল। প্রবল জনক্ষোভে ও প্রতিবাদে আপাতত তা বন্ধ হয়েছে।

এ বছর তার সাথে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি হজফ্লাইট। এ বিষয়ে প্রাক্তন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এবং বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে হজ্বযাত্রীদের জন্য বিমানের বিশেষ ফ্লাইটের কথা কর্তৃপক্ষকে বলেছি, কিন্তু তারা কী করেছেন তা এখন পর্যন্ত জানি না। বক্তব্যটি একজন জনপ্রতিনিধি ও চট্টগ্রামের রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দায়িত্ববান কথা বলে মনে হয়নি। বরং এ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়। সরকারি দলের একজন এমপি ও মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামে হজযাত্রীরা সরাসরি কোন হজফ্লাইট পাবে না এবং এ বিষয়ে মাননীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কিছু করণীয় নেই তা বুঝে নিতে কষ্ট হচ্ছে।

চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে নিয়েছেন বটে, তাই বলে প্রধানমন্ত্রী কাঁধকে এত শক্ত ও প্রশস্ত ভাববার কোন অবকাশ নেই। কারণ তাঁর একার পক্ষে এতকিছু নজরে রাখাও তদারক করা সম্ভব নয়। সমীচিনও নয়। চট্টগ্রামের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হওয়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেনে উত্তীর্ণ করার কাজ ঝুলে যাওয়া এবং যারা চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে সড়ক অব্যবস্থাপনা ও সংস্কার না হওয়ার জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরকেই জবাবদিহি করতে হবে। জনতার মুখোমুখী দাঁড়াতে হবে এবং সে সময়ও খুব বেশি দূরে নয়। মাত্র এক বছর কয়েক মাস।

মনে রাখা দরকার সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২

চিকিৎসা বাণিজ্য : ফুল দিয়ে বরণ, আগরবাতি দিয়ে বিদায়

দৈনিক আজাদী                    উপসম্পাদকীয়                              কাল আজ কাল
১৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৯ ভাদ্র ১৪১৯ সাল ‌২৫ শাওয়াল ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

শিল্পী শাহরিয়ার খালেদ একজন রসিক মানুষ। সবকিছুতেই তিনি রস খুঁজে পান। একবার খুব নামকরা একটি বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, এখানে রোগীদের বরণ করা হয় রজনীগন্ধা দিয়ে আর বিদায় জানানো হয় আগরবাতি দিয়ে। মাঝখানে রোগীর স্বজনদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, ক্রন্দন ও বিলাপের সাথে মোটা অংকের অর্থ ব্যয়। রসিকতার ছলে হলেও কথাটি মিথ্যে বলেন নি তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় কার্যত এই পরিস্থিতিই বিদ্যমান। আক্ষরিক অর্থে ফুল ও আগরবাতি না হলেও চিকিৎসার নামে যে, অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের সর্বস্বান্ত করা হয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। গুটিকয় অসাধারণ উদাহরণ ছাড়া বাংলাদেশের কোন চিকিৎসা কেন্দ্র বা তার চিকিৎসকদের প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা নেই বাংলাদেশের জনগণের। যার ফলে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে শুধুমাত্র চিকিৎসা ক্ষেত্রে। উন্নত বিশ্বের উন্নত চিকিৎসা নিতে বা কোন দেশ বা বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের মানুষের আগ্রহ থাকবে। তা দোষের নয়। তবে এই দেশের মত এত বিপুল পরিমাণ রোগী চিকিৎসার জন্য তৃতীয় কোন দেশে গমন করে কিনা আমার জানা নেই।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সামগ্রিক চিত্র হতাশাজনক। প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি চিকিৎসা সেবা অপর্যাপ্ত। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে খুব বেশি বিপদে না পড়লে সরকারি হাসপাতালে কেউ ভর্তি হতে চায় না। তারপরেও সীমিত সামর্থে যেখানে সরকারিভাবে যে সুযোগ সুবিধাগুলো বিশেষ করে জটিল রোগের চিকিৎসা সংক্রান্ত আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হয় তা হাসপাতালের চিকিৎসকরাই ব্যবহার করেন না রোগীদের কাজে। কারণ এইসব রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চিকিৎসা ইত্যাদির পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকে তার সবটুকুই যেন বেসরকারিখাতে হয় অর্থাৎ এই জটিল রোগের চিকিৎসা যেন বাইরে করতে বাধ্য হয় মানুষ, সরকারি ডাক্তারেরা সে চেষ্টাই করেন। প্রত্যেক সরকারি ডাক্তার কোন না কোনভাবে বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালগুলোর সাথে জড়িত। এক্ষেত্রে তারা রোগীর স্বার্থ না দেখে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থকেই বড় করে দেখেন। সরকারি ডাক্তাররা বিরক্তি, তাচ্ছিল্য,অবহেলা এমনকি ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের বাধ্য করেন সরকারি হাসপাতালের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস কিংবা বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের সাথে জড়িত থাকার বিপক্ষে নই। দেশে এমনিতেই চিকিৎসক সংকট। তার ওপরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা ক্লিনিক হাসপাতালে তাদের সেবা বন্ধ করা হলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিপর্যয় হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের তো একটু মানবিক হওয়া উচিত। দেশে এমন অনেক চিকিৎসক আছেন যাদের সিরিয়াল নেওয়ার জন্যে রাতের দুটো থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এমন অনেক ডাক্তার আছেন দিনে অন্তত দেড়শ জন রোগী দেখেন অথচ নানান পরীক্ষার নামে গরিব রোগীদের বেলায়ও ডায়াগনসিস সেন্টার থেকে কমিশন আদায় করেন ৫০% পর্যন্ত। আর সে সাথে গত দু’দশক ধরে ওষুধ কোম্পানিদের মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে রোগীদের লিখে দেন দুই নম্বর ওষুধ।
ডাক্তার বা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। লিখতে গেলে কয়েক খণ্ড মহাভারত হয়ে যাবে। তবে এর মধ্যেও যে ভাল চিকিৎসক নেই বা মানসম্মত চিকিৎসা হচ্ছে না দেশে তা কিন্তু নয়। দুঃখজনকভাবে সংখ্যাটি কম। পুলিশের সবাই যেমন ঘুষখোর নয়। সব রাজনীতিকরা যেমন লুটেরা নন তেমনি সব চিকিৎসকরাই অমানবিক নন। চিকিৎসকদের মধ্যে আমার অনেক ভাল বন্ধু আছেন একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণে যারা আমার সহযাত্রী,সহযোদ্ধা। আমি কখনোই তাদের অপমান করতে পারি না। তাদের অনেকে আমার অগ্রজ তুল্য।
লিখতে বসেছিলাম বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালগুলোর নগ্ন বাণিজ্য প্রবণতা নিয়ে। সারা শহরে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা এসব ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোর অধিকাংশই বৈধ নয়। শুধু তাই নয় নামে হাসপাতাল হলেও এগুলো মূলত একেকটি ডিসপেনসারির সমতুল্য নয়ত এক প্রকার অবকাশ কেন্দ্র। থাকবেন ঘুমাবেন আর বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে চিকিৎসা সেবা নেবেন। সারা বাংলাদেশে নিজস্ব ডাক্তার দিয়ে পরিচালিত মোট ১০টি হাসপাতালও নেই। এগুলো অধিকাংশই পরিচালিত হয় সদ্য পাস করা তরুণদের দিয়ে। একটু জটিল ধরনের রোগীর সামনে এদের অসহায় চেহারা দেখে রাগ হওয়ার বদলে মায়াই লাগে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী ১০ শয্যার বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের জন্য প্রতিদিন তিনজন ডাক্তার ও ছয় জন নার্স থাকা বাধ্যতামূলক।
অথচ চট্টগ্রামের কোথাও এই নিয়ম মানা হচ্ছে বলে জানা নেই। সরকারি হিসেবমতে চট্টগ্রামে মাত্র ৭০টি বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের লাইসেন্স রয়েছে। অথচ খোঁজ নিলে জানা যাবে বর্তমানে আড়াই শতেরও বেশি হাসপাতাল ক্লিনিক আছে চট্টগ্রামে। তার মানে তিন চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানই আইনতঃ ভুয়া। আবার লাইসেন্স প্রাপ্তরাও যে সরকারি সব বিধি পালন করে ব্যবসা করছেন তা কিন্তু নয়। এর মধ্যে অনেকের অনুমতি এবং অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক, নার্স সব মিলিয়ে ক্যাপাসিটি ১০ শয্যার অথচ সেখানে বিদ্যমান ৩০ থেকে ৫০ শয্যা। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে এসব ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোতে রোগীদের কাছ থেকে সেবার বিনিময়ে মোটা অংকের অর্থ আদায় করা হলেও প্রকৃত চিকিৎসা সেবা তারা দেন না বা দিতে অক্ষম। সামান্য পেট ব্যথার জন্যেও বাইরে থেকে ডাক্তার কল করে আনা ছাড়া রোগী বা তার স্বজনদের কোন উপায় নেই। বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে টাকা দিয়েও রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না এসব প্রতিষ্ঠানে।
এ অভিযোগ সাধারণ মানুষ কাকে, কোথায় জানাবে? বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর জন্যে সরকারি কোন নীতিমালাও নেই। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারি মহলের এমন উদাসীনতায় হতাশ না হয়ে পারা যায় না। আধুনিক স্থাপত্যের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এমন অনেক হাসপাতাল আছে যারা শুধু বাইরের ঠাঁট দেখিয়েই রোগীদের পকেট খালি করে চিকিৎসার নামে। এমনও অভিযোগ আছে মৃত মানুষকে দুইদিন ধরে লাইফ সাপোর্ট লাগিয়ে রাখা হয়েছিল শুধুমাত্র মোটা অংকের বিল করার জন্যে। এমন অমানবিকতা মনে হয় বাংলাদেশেই সম্ভব।
একবার পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। আমার আগের সিরিয়ালের রোগী ডাক্তারের পুরো ফিস দিতে পারছেন না বলে ডাক্তার তাকে বলছিলেন, ‘আমার বাবা হালের গরু বিক্রি করে আমাকে ডাক্তারি পড়িয়েছেন, ফিস কম নেবার জন্যে নয়’। আমি বিনয়ের সাথে প্রতিবাদ করে বললাম, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনি তো সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। কারণ তখনও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ চালু হয় নি।
আপনার বাবার শুধু গরু বেচার টাকায় আপনার পড়াশোনার খরচ ওঠে নি। সেখানে জনগণের অর্থও আছে। একজন সরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রের পিছনে সরকার ব্যয় করে কয়েক লক্ষ টাকা। যা জনগণের ট্যাক্সের। আমার কথায় সেদিন ডাক্তার সাহেব খুশি হতে পারেন নি। তার চিকিৎসা নেয়া আমার বন্ধ হয়েছে। লেবার ডেলিভারির কারণে বিল কম তাই সিজার অপারেশন করে অসহায় মানুষদের নিঃস্ব করে যারা, তারা আর যাই হোক প্রকৃত চিকিৎসক নন। রোগগ্রস্ত একজন অসহায় মানুষের কাছে চিকিৎসক স্বয়ং একজন ঈশ্বরের দূত। এই ঈশ্বরের দূত রোগীদের জীবনে যমদূত হয়ে আসুক তা কারুরই কাম্য নয়।
এত অনিয়ম এত হতাশা আর নৈরাজ্যের মাঝেও কিছু কিছু চিকিৎসক উজ্জ্বল তারার মত পথভ্রষ্টদের পথ দেখায়। এই গরিব দেশে আজ ওপেন হার্ট সার্জারি হয়। এবং তা সাফল্যের সাথে বাংলাদেশের ডাক্তাররা করেন। ক্যান্সার চিকিৎসা হয় বা দেশের কোন চিকিৎসক করেন। কিংবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ২০০০ টাকার বিনিময়ে হার্টে রিং লাগানো হয়। সে অপারেশন সফল করেন কিছু তরুণ চিকিৎসক তখন মনটা ভাল হয়ে যায়। মনে হয় এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায় নি। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যায় নি।
রজনীগন্ধা দিয়ে যে রোগীকে বরণ করা হলো সে সত্যিকার সুস্থ হয়ে চিকিৎসকের হাতেই সে ফুল অর্পণ করুক। আগরবাতির মৃত্যুগন্ধ দূর হোক চিকিৎসা ব্যবস্থার আকাশ থেকে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ইমাম, মুয়াজ্জিনদের জন্যে আলাদা বেতন স্কেল প্রয়োজন

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                                                    ব্রাত্যজনের কথা                                           
চট্টগ্রাম, বুধবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০১২, ২৮ ভাদ্র ১৪১৯

কামরুল হাসান বাদল
খুব বেশিদিনের কথা নয়। ২০/৩০ বছর আগেও দেশে প্রতি গ্রামে খুব বেশি হলে একটি করে মসজিদ ছিল। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতি পাড়ায় একটি আর বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মুসল্লির সংখ্যা বেড়েছে। সে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে ধর্মাচার। এখন আগের চেয়ে বেশি বেশি মানুষ নামাজ পড়ে। বেশি বেশি হজ করে। বড় বড় গরু কোরবানি দেয়। ঈদে বেশি বেশি অর্থ ব্যয় করার প্রতিযোগিতায় নামে। এখন বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। চট্টগ্রামে প্রতি সপ্তাহে কয়েক হাজার মেজবান অনুষ্ঠিত হয়। আগে সবকিছুই কম কম হতো। বেশিরভাগ মানুষ ভাগে কোরবানি করতো। ঈদে সাদা-মাটা কাপড় কিনতো। খাবার-দাবারে এমন অপচয় ছিল না। অনেক দূর হেঁটে গিয়ে নামাজ আদায় করতো। কিন্তু তখন এমন সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ছিল না। মানুষ এমন নির্লজ্জ ছিল না। নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর ছিল না। সমাজে এমন হানাহানি ছিল না। অর্থের নগ্ন প্রতিযোগিতা ছিল না। বড়লোকী দেখানোর বিষয় ছিল না। সম্পদের এমন বৈষম্যও ছিল না। কিন্তু মানুষ অধিকাংশে সৎ ছিল। ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, ছিনতাই, রাহাজানি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, ভূমিদখল, নদী-নালা, খাল-বিল দখল ও দূষণ ছিল না। চুরি, ডাকাতি, হত্যা, গুম, খুন এত অধিক মাত্রায় ছিল না। এখন অধিক মাত্রায় ধর্মাচারের সাথে সাথে সমাজে, দেশে এই প্রবণতাগুলোও বৃদ্ধি পেয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য করে, ফাইল আটকে ঘুষ খেয়ে, মামলার চার্জশিট বদল করে, আয়কর ফাঁকি দিয়ে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে, ওভার ইনভয়েসে বিদেশে অর্থ পাচার করে, সরকারি সম্পত্তি দখল করে, ভূমি দখল করে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে রাতারাতি বড়লোক হওয়াদের ধর্মচর্চার কাছে প্রকৃত ঈমানদার এখন বড়ই শরমিন্দা। আজকাল খুব বেশি বেশি বলা হচ্ছে রাজনীতি এখন প্রকৃত রাজনীতিবিদদের দখলে নেই। আমলা, ব্যবসায়ী আর অবসরপ্রাপ্তদের দখলে। কালো টাকা আর পেশির দখলে।  ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা, পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তারা আছেন।

মাত্র সাত বছরে জীবন পাল্টে যাওয়া হলমার্কের তানভীরকে কেউ কি এই প্রশ্ন করার সাহস করেছিল গত ক’বছরে? সাধারণ মানুষ কে? আয়কর বিভাগ? ৭ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে যার গ্যারেজে থাকে ২৭টি দামি গাড়ি এই তথ্য কি আয়করওয়ালারা পান নি? তাদের মনে কি একবারও প্রশ্ন জাগেনি এত অর্থের উৃৎস কী? লুটপাট করে টাকা বানিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি আলীশান পাকা মসজিদ, পারলে একটি স্কুল, স্থানীয় কবরস্থান পাকা করা, প্রতিবছর দু’তিনবার গরু জবাই করে খাওয়ালে আর বছর বছর হজ করে এলেইতো হয়ে গেলো। কেউ প্রশ্ন করবে না এই অর্থের উৎস কী?

সাধারণ মানুষকে না হয় বাদ দিলাম। ধর্ম রক্ষা ও প্রচারের নিয়তে যারা আরবি মাধ্যম অর্থাৎ মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করে ঈমাম, মুয়াজ্জিন হয়েছেন তারাও কি কখনো এ প্রশ্ন করার সাহস করেছেন কাউকে? অথবা যখন জানতে পেরেছেন এই ব্যক্তির উপার্জন হালাল নয়, তখন কি তাকে বয়কট করার সাহস করতে পেরেছেন? পারেন নি। কারণ ঐ সাহস তাঁরা সঞ্চার করতে পারেন না।

এরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে মসজিদ করেন ঠিকই। কিন্তু সবচেয়ে কার্পণ্য করেন ঈমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা প্রদানে। আমি দেখেছি গ্রামে গ্রামে যে মসজিদগুলো আছে তার অধিকাংশ ঈমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা অত্যন্ত মানবেতর। এমন অনেক ঈমাম-মুয়াজ্জিন আছেন যাদের বেতন দেয়া হয় ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। এদের কোন আবাসন সুবিধা নেই। দুটি কক্ষ নেই। বোনাস ভাতা এমন কি চাকরির নিশ্চয়তাটুকুও নেই। মসজিদ কমিটির কর্তাব্যক্তিদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে তাদের চাকরি। এরা সাধারণত পরিবার থেকে থাকেন দূরে। বছরে দু একবারও অনেকে পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারে না। অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও এদের দেখভালের কোন স্বজন কাছে থাকে না। এদের দুবেলা খেতে হয় অন্যের ঘরে পালাক্রমে। এক সপ্তাহ এই পরিবারে তো আরেক সপ্তাহ ঐ পরিবারে। নিজের ভালমন্দ খাওয়ার স্বাধীনতা নেই। দেখা গেলো আজ তার পেটে অসুখ। খেতে ইচ্ছে করছে আনাজ কলা অথচ তাকে দেয়া হতো গরুর কালো ভুনা মাংস। অর্থাৎ অন্যের করুণায়, অনুগ্রহ আর সাহায্যে জীবন নির্বাহ করতে হয় এসব ঈমাম-মুয়াজ্জিনদেরকে। এদের বাড়তি আয়ের একমাত্র উৎস কারো ঘরে বা পরিবারে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মিলাদে অংশ নেয়া, খতমে কোরআন বা ওয়াজ নসিহত করা।

এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া উচিত। নির্ধারিত হওয়া উচিত ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের আলাদা বেতন কাঠামো। মসজিদ প্রতিষ্ঠার আগে সরকারি অনুমোদন নেয়া অত্যাবশ্যক করার পাশাপাশি মসজিদ প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদানের শর্ত হিসেবে যোগ করা উচিত এর ব্যয়ভার ও ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি। সারাদেশের মসজিদগুলোকে শ্রেণী বিভাগ করে প্রতিটি শ্রেণীর মসজিদের ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরিবিধি প্রণয়ন, বেতন-ভাতা নির্ধারণ, স্থায়ী নিয়োগপত্র প্রদান, গ্র্যাচুয়েটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পেনশনের ব্যবস্থাসহ আবাসিক সুবিধা প্রদান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ মাসের পর মাস পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকবেন এমন কি তার বাৎসরিক ছুটিরও কোন হিসাব থাকবে না তা অত্যন্ত অমানবিক। যে কোন কাজ বা শারীরিক অবস্থা যাই থাকুক, বছরের পর বছর দিনের পাঁচটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজটি সম্পাদন করা খুব সহজ নয়। মসজিদ নির্মাণের আগে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ