পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২

চিকিৎসা বাণিজ্য : ফুল দিয়ে বরণ, আগরবাতি দিয়ে বিদায়

দৈনিক আজাদী                    উপসম্পাদকীয়                              কাল আজ কাল
১৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৯ ভাদ্র ১৪১৯ সাল ‌২৫ শাওয়াল ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

শিল্পী শাহরিয়ার খালেদ একজন রসিক মানুষ। সবকিছুতেই তিনি রস খুঁজে পান। একবার খুব নামকরা একটি বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, এখানে রোগীদের বরণ করা হয় রজনীগন্ধা দিয়ে আর বিদায় জানানো হয় আগরবাতি দিয়ে। মাঝখানে রোগীর স্বজনদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, ক্রন্দন ও বিলাপের সাথে মোটা অংকের অর্থ ব্যয়। রসিকতার ছলে হলেও কথাটি মিথ্যে বলেন নি তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় কার্যত এই পরিস্থিতিই বিদ্যমান। আক্ষরিক অর্থে ফুল ও আগরবাতি না হলেও চিকিৎসার নামে যে, অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের সর্বস্বান্ত করা হয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। গুটিকয় অসাধারণ উদাহরণ ছাড়া বাংলাদেশের কোন চিকিৎসা কেন্দ্র বা তার চিকিৎসকদের প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা নেই বাংলাদেশের জনগণের। যার ফলে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে শুধুমাত্র চিকিৎসা ক্ষেত্রে। উন্নত বিশ্বের উন্নত চিকিৎসা নিতে বা কোন দেশ বা বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের মানুষের আগ্রহ থাকবে। তা দোষের নয়। তবে এই দেশের মত এত বিপুল পরিমাণ রোগী চিকিৎসার জন্য তৃতীয় কোন দেশে গমন করে কিনা আমার জানা নেই।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সামগ্রিক চিত্র হতাশাজনক। প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি চিকিৎসা সেবা অপর্যাপ্ত। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে খুব বেশি বিপদে না পড়লে সরকারি হাসপাতালে কেউ ভর্তি হতে চায় না। তারপরেও সীমিত সামর্থে যেখানে সরকারিভাবে যে সুযোগ সুবিধাগুলো বিশেষ করে জটিল রোগের চিকিৎসা সংক্রান্ত আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হয় তা হাসপাতালের চিকিৎসকরাই ব্যবহার করেন না রোগীদের কাজে। কারণ এইসব রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চিকিৎসা ইত্যাদির পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকে তার সবটুকুই যেন বেসরকারিখাতে হয় অর্থাৎ এই জটিল রোগের চিকিৎসা যেন বাইরে করতে বাধ্য হয় মানুষ, সরকারি ডাক্তারেরা সে চেষ্টাই করেন। প্রত্যেক সরকারি ডাক্তার কোন না কোনভাবে বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালগুলোর সাথে জড়িত। এক্ষেত্রে তারা রোগীর স্বার্থ না দেখে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থকেই বড় করে দেখেন। সরকারি ডাক্তাররা বিরক্তি, তাচ্ছিল্য,অবহেলা এমনকি ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের বাধ্য করেন সরকারি হাসপাতালের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস কিংবা বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের সাথে জড়িত থাকার বিপক্ষে নই। দেশে এমনিতেই চিকিৎসক সংকট। তার ওপরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা ক্লিনিক হাসপাতালে তাদের সেবা বন্ধ করা হলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিপর্যয় হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের তো একটু মানবিক হওয়া উচিত। দেশে এমন অনেক চিকিৎসক আছেন যাদের সিরিয়াল নেওয়ার জন্যে রাতের দুটো থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এমন অনেক ডাক্তার আছেন দিনে অন্তত দেড়শ জন রোগী দেখেন অথচ নানান পরীক্ষার নামে গরিব রোগীদের বেলায়ও ডায়াগনসিস সেন্টার থেকে কমিশন আদায় করেন ৫০% পর্যন্ত। আর সে সাথে গত দু’দশক ধরে ওষুধ কোম্পানিদের মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে রোগীদের লিখে দেন দুই নম্বর ওষুধ।
ডাক্তার বা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। লিখতে গেলে কয়েক খণ্ড মহাভারত হয়ে যাবে। তবে এর মধ্যেও যে ভাল চিকিৎসক নেই বা মানসম্মত চিকিৎসা হচ্ছে না দেশে তা কিন্তু নয়। দুঃখজনকভাবে সংখ্যাটি কম। পুলিশের সবাই যেমন ঘুষখোর নয়। সব রাজনীতিকরা যেমন লুটেরা নন তেমনি সব চিকিৎসকরাই অমানবিক নন। চিকিৎসকদের মধ্যে আমার অনেক ভাল বন্ধু আছেন একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণে যারা আমার সহযাত্রী,সহযোদ্ধা। আমি কখনোই তাদের অপমান করতে পারি না। তাদের অনেকে আমার অগ্রজ তুল্য।
লিখতে বসেছিলাম বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালগুলোর নগ্ন বাণিজ্য প্রবণতা নিয়ে। সারা শহরে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা এসব ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোর অধিকাংশই বৈধ নয়। শুধু তাই নয় নামে হাসপাতাল হলেও এগুলো মূলত একেকটি ডিসপেনসারির সমতুল্য নয়ত এক প্রকার অবকাশ কেন্দ্র। থাকবেন ঘুমাবেন আর বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে চিকিৎসা সেবা নেবেন। সারা বাংলাদেশে নিজস্ব ডাক্তার দিয়ে পরিচালিত মোট ১০টি হাসপাতালও নেই। এগুলো অধিকাংশই পরিচালিত হয় সদ্য পাস করা তরুণদের দিয়ে। একটু জটিল ধরনের রোগীর সামনে এদের অসহায় চেহারা দেখে রাগ হওয়ার বদলে মায়াই লাগে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী ১০ শয্যার বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের জন্য প্রতিদিন তিনজন ডাক্তার ও ছয় জন নার্স থাকা বাধ্যতামূলক।
অথচ চট্টগ্রামের কোথাও এই নিয়ম মানা হচ্ছে বলে জানা নেই। সরকারি হিসেবমতে চট্টগ্রামে মাত্র ৭০টি বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের লাইসেন্স রয়েছে। অথচ খোঁজ নিলে জানা যাবে বর্তমানে আড়াই শতেরও বেশি হাসপাতাল ক্লিনিক আছে চট্টগ্রামে। তার মানে তিন চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানই আইনতঃ ভুয়া। আবার লাইসেন্স প্রাপ্তরাও যে সরকারি সব বিধি পালন করে ব্যবসা করছেন তা কিন্তু নয়। এর মধ্যে অনেকের অনুমতি এবং অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক, নার্স সব মিলিয়ে ক্যাপাসিটি ১০ শয্যার অথচ সেখানে বিদ্যমান ৩০ থেকে ৫০ শয্যা। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে এসব ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোতে রোগীদের কাছ থেকে সেবার বিনিময়ে মোটা অংকের অর্থ আদায় করা হলেও প্রকৃত চিকিৎসা সেবা তারা দেন না বা দিতে অক্ষম। সামান্য পেট ব্যথার জন্যেও বাইরে থেকে ডাক্তার কল করে আনা ছাড়া রোগী বা তার স্বজনদের কোন উপায় নেই। বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে টাকা দিয়েও রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না এসব প্রতিষ্ঠানে।
এ অভিযোগ সাধারণ মানুষ কাকে, কোথায় জানাবে? বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর জন্যে সরকারি কোন নীতিমালাও নেই। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারি মহলের এমন উদাসীনতায় হতাশ না হয়ে পারা যায় না। আধুনিক স্থাপত্যের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এমন অনেক হাসপাতাল আছে যারা শুধু বাইরের ঠাঁট দেখিয়েই রোগীদের পকেট খালি করে চিকিৎসার নামে। এমনও অভিযোগ আছে মৃত মানুষকে দুইদিন ধরে লাইফ সাপোর্ট লাগিয়ে রাখা হয়েছিল শুধুমাত্র মোটা অংকের বিল করার জন্যে। এমন অমানবিকতা মনে হয় বাংলাদেশেই সম্ভব।
একবার পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। আমার আগের সিরিয়ালের রোগী ডাক্তারের পুরো ফিস দিতে পারছেন না বলে ডাক্তার তাকে বলছিলেন, ‘আমার বাবা হালের গরু বিক্রি করে আমাকে ডাক্তারি পড়িয়েছেন, ফিস কম নেবার জন্যে নয়’। আমি বিনয়ের সাথে প্রতিবাদ করে বললাম, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনি তো সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। কারণ তখনও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ চালু হয় নি।
আপনার বাবার শুধু গরু বেচার টাকায় আপনার পড়াশোনার খরচ ওঠে নি। সেখানে জনগণের অর্থও আছে। একজন সরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রের পিছনে সরকার ব্যয় করে কয়েক লক্ষ টাকা। যা জনগণের ট্যাক্সের। আমার কথায় সেদিন ডাক্তার সাহেব খুশি হতে পারেন নি। তার চিকিৎসা নেয়া আমার বন্ধ হয়েছে। লেবার ডেলিভারির কারণে বিল কম তাই সিজার অপারেশন করে অসহায় মানুষদের নিঃস্ব করে যারা, তারা আর যাই হোক প্রকৃত চিকিৎসক নন। রোগগ্রস্ত একজন অসহায় মানুষের কাছে চিকিৎসক স্বয়ং একজন ঈশ্বরের দূত। এই ঈশ্বরের দূত রোগীদের জীবনে যমদূত হয়ে আসুক তা কারুরই কাম্য নয়।
এত অনিয়ম এত হতাশা আর নৈরাজ্যের মাঝেও কিছু কিছু চিকিৎসক উজ্জ্বল তারার মত পথভ্রষ্টদের পথ দেখায়। এই গরিব দেশে আজ ওপেন হার্ট সার্জারি হয়। এবং তা সাফল্যের সাথে বাংলাদেশের ডাক্তাররা করেন। ক্যান্সার চিকিৎসা হয় বা দেশের কোন চিকিৎসক করেন। কিংবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ২০০০ টাকার বিনিময়ে হার্টে রিং লাগানো হয়। সে অপারেশন সফল করেন কিছু তরুণ চিকিৎসক তখন মনটা ভাল হয়ে যায়। মনে হয় এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায় নি। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যায় নি।
রজনীগন্ধা দিয়ে যে রোগীকে বরণ করা হলো সে সত্যিকার সুস্থ হয়ে চিকিৎসকের হাতেই সে ফুল অর্পণ করুক। আগরবাতির মৃত্যুগন্ধ দূর হোক চিকিৎসা ব্যবস্থার আকাশ থেকে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ