পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৩

গণতন্ত্রের স্বার্থেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তি চাই

দৈনিক আজাদী                                    উপসম্পাদকীয়                           কাল আজ কাল
৩১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১৮ মাঘ ১৪১৯ সাল ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী

শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। আর এ জন্যে চাই প্রথমেই একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং সাহসী ও দেশপ্রেমিক নির্বাচন কমিশনার।

নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পরে একানব্বই সালে বিচারপতি সাহাবউদ্দিন এর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার। ঐ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপ ও জনমতে প্রকাশ পেয়েছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। এই ধারণা খোদ খালেদা জিয়াও পোষণ করতেন। নির্বাচনে কারচুপি হবে এমন আগাম আশঙ্কা থেকে নির্বাচনের পরদিন তিনি হরতালও আহ্বান করে রেখেছিলেন। তবে নির্বাচনে অভাবনীয় জয়লাভের পর আর হরতাল করেন নি বা করার প্রয়োজন পড়েনি। সে নির্বাচন পরবর্তী শেখ হাসিনার একটি উক্তি তখন ভীষণ আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন ‘নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধীরাতো বলেছেই এমন কি অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী সমর্থকও শেখ হাসিনার সেই উক্তির ভীষণ সমালোচনা করেছিলেন। নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন কী সেই সূক্ষ্ম কারচুপি। লেখার কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার আকাঙক্ষায় তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া থেকে বিরত থাকলাম। তবে ছোট্ট দু’টো উদাহরণ না দিলেই বুঝি নয়। একটি হল রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহম্মদ এর তথাকথিত নিরপেক্ষ থাকা। যার প্রকৃত স্বরূপ পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন উদ্ভাসিত হয়েছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছেগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রণীত ভোটার লিস্টযেখান থেকে অন্তত দেড় কোটি ভুয়া ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছিল। অন্তত শেষের কারণটির জন্যেই বিএনপি-জামাতের জয়লাভ বা পরাজয় ঘটতো।

১৯৯৪ সালে মাগুরা উপ-নির্বাচনে বিএনপি সরকারের নজিরবিহীন ভোট কারচুপি ও তাতে বিচারপতি আব্দুর রউফের নির্বাচন কমিশনের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের কারণে তৎপরবর্তী জাতীয় নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরিচালিত করার দাবি উঠে এবং এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। বিএনপি ১৯৯৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ভোটার বিহীন নির্বাচন করে। এবং সর্বশেষে মার্চের শেষে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিএনপি পদত্যাগ করে। সেই নির্বাচনেও কম ঘটনা ঘটেনি। সেনা অভ্যুত্থানেরও চেষ্টা করা হয়েছিল। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়েছিল।

তা যাক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি ছাড়া আর কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। কোন না কোনভাবে তারা নিন্দিত হয়েছেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে দেশের সুশীল শ্রেণী বা বুদ্ধিজীবী পর্যায়ে একমাত্র বিচারপতি হাবিবুর রহমান ছাড়া আর কারো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এমন কি এঁদের কে কোথায় সে খবরটিও গণমাধ্যম বা জনগণ রাখে না বা রাখার প্রয়োজন মনে করে না।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা দাবি কে করেছিলএখন কারা করছে না বা কারা করছে এটি দেখার বিষয় নয় এখন। গণতন্ত্র মুক্তি পাওয়ার ২৩ বছরের মাথায় এসে সে হিসেব করেও লাভ নেই। এখন প্রশ্ন হতে পারে একটি দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা বা তা থাকলে বিলুপ্ত করা প্রয়োজন কি না। ‘গণতন্ত্র’ এই ধারণাটি যে সব দেশ থেকে নেয়া হয়েছে কিংবা ওসব দেশের অনুকরণে বিশ্বের অন্যান্য যে সব দেশে এমন ওয়েস্ট মিনিস্টার ধরনের গণতন্ত্র চর্চা হয়ে থাকে সে সব দেশে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আছে কি না। ওসব দেশে না থাকলে তবে বাংলাদেশে কেনউত্তর হতে পারে ওসব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা ওসব দেশে বড় দুই দলের মধ্যে বাংলাদেশের মতো কামড়াকামড়ি নেই। পরস্পরকে অবিশ্বাস করার সংস্কৃতিও নেই। যুক্তিটি মিথ্যে নয়। তবে পুরোটা মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়। প্রথমততত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কোন ধারণাই গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় নেই। দ্বিতীয়ততত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কোন চিরস্থায়ী ফয়সালা নয়। কোন না কোন দেশে একদিন এই ব্যবস্থা রহিত করার প্রয়োজন হবে। ২৩ বছর পরে না হলেও আর কত বছর এই ধারা চলতে থাকবে। তৃতীয়তএটি কোন সম্মানজনক পদ্ধতিও নয়না রাজনীতিকদের জন্যে না জনগণের জন্যে। দশজন অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক ব্যক্তি কী করে পাঁচ বছরের জন্যে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন। যাদের কোনদিনই জনগণের কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন হবে না। অতীতে এঁদের মধ্যে সবাই যে সৎ ছিলেন বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন নি তাও তো না। এ ছাড়া ৩ মাসের জন্যে ক্ষমতায় এসে দীর্ঘ দু’বছরেও না গেলে কী করার আছে তখন। চতুর্থতএই পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে মনোনীত করার বিধান রেখে কার্যত আদালত বা বিচার ব্যবস্থাকে কলুষিত করা হয়েছে। যে কারণে ২০০৬ সালে সংঘাত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নয়তার প্রধান কে হবেন সে প্রশ্ন নিয়ে। বর্তমানেও একই সংকট বিদ্যমান। বিএনপি’র কথা মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে গেলে সরকার প্রধান কে হবেনতারা তো বিচারপতি খায়রুলকে মেনে নেবেন না। তখনও কি সংঘাত অনিবার্য নয়।

মোট কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মুখ্য নয়। মুখ্য হওয়া উচিত নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে। আমার মতে সে ক্ষেত্রে সবার আগে হাত দেওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনে। এই কমিশন এমনভাবে গঠন করা দরকার যারা নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। নির্বাচনকালীন যে সরকার থাকবে দৈনন্দিন কাজ ছাড়া অন্য কিছুর ক্ষমতা তাদের থাকবে না। স্বরাষ্ট্রপররাষ্ট্রসংস্থাপন বা নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যে মন্ত্রণালয় তাদের অধীনে নিতে চাইবে তাদের তাই-ই দেয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনে প্রভাব ফেলার মত কোন কাজ করারই অধিকার সংরক্ষণ করবে না। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ দানের ক্ষমতাও ভোগ করতে পারে।

মোট কথা বিশ্বের অন্যান্য দেশে যে ভাবে বা যে রীতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশেও তাই হবে। আমার মনে হয় যারা এখনও বিএনপি-জামাতের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন চাইছেন এবং কৌশলে ইনিয়ে-বিনিয়ে তা না হলে দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলে পক্ষান্তরে বিএনপি-জামাতকে সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছেন তাঁরা একটু দয়া করে বিষয়টি ভেবে দেখবেন। দলীয় অভিসন্ধির কারণে জাতির কাঁধে অহেতুক একটি বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবি করছে বিএনপিতারা তো সে সংসদে যায়-ই না। সংসদে অনুপস্থিত থাকার রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বিএনপি। তর্কের খাতিরেও যদি বলিআগামী নির্বাচন না হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হল। এবং দেখা গেল যে কোন কারণে বিএনপি হেরে গেল। তবে কি তারা আগামীতে নিয়মিত সংসদে যোগ দেবেসে নিশ্চয়তা কোথায়বিএনপি তো গত নির্বাচনে তাদের ইশতেহারে লিখেছিল এক নাগাড়ে ৩০ দিন অনুপস্থিত থাকলে সংসদে তার সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে। অথবা আওয়ামী লীগ হেরে গেলে তারাও সংসদে গিয়ে সংসদকে কার্যকর করবে তারও বা নিশ্চয়তা কোথায়শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। আর এ জন্যে চাই প্রথমেই একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং সাহসী ও দেশপ্রেমিক নির্বাচন কমিশনার।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৩

হায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়! কোহিনুর, হারুনরা তো অ্যাসেট নয়

দৈনিক আজাদী                           উপসম্পাদকীয়                                  কাল আজ কাল
২৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১১ মাঘ ১৪১৯ সাল ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
কামরুল হাসান বাদল


১ জানুয়ারি১৯৭৩ সাল। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকায় মিছিল বের করেছিল। বিনা কারণে ও বিনা উস্কানিতে সেদিন সে মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। মৃত্যুবরণ করে দুজন নিরপরাধ-তরুণ ছাত্র। এখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। চারিদিকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং তৎপরবর্তী দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশের পাশে আছে বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তখন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। পাকিস্তানিদের পরাজয় ঠেকাতে যুদ্ধের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সপ্তম নৌবহর প্রেরণ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের ষড়যন্ত্রের কারণে দেশের মানুষও তখন চরমভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মিছিলে বিনা কারণে সেদিন পুলিশ কেন গুলিবর্ষণ করেছিল তা এক রহস্যময় ঘটনা।

এ ঘটনায় বঙ্গবন্ধুকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। সিপিবি ও ন্যাপের তৎকালীন নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কারণে অপ্রীতিকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছিল তৎকালীন সরকার। সেদিন কার নির্দেশে পুলিশ গুলি বর্ষণ করেছিল তা আজো জানা সম্ভব হয়নি। তবে সদ্য স্বাধীন দেশে প্রথম পুলিশের গুলিতে নিহত দুই নিরীহ ছাত্রের অভিশাপ থেকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে আজো বের হতে পারেনি তা আরেকবার অনুধাবন করলাম গত ২২ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রদত্ত পুলিশ ও প্রেসিডেন্ট পদক প্রদান অনুষ্ঠান দেখে।

পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মোট ৬৭ জনকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক প্রদান করেন। পুলিশ বিভাগে ভাল ও বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য এই পদক প্রদান করা হয়ে থাকে। এবার পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ঢাকার লালবাগ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন উর রশিদকে । তাঁকে পদক দেয়ার কারণ হিসেবে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁর এলাকায় ঈদ ও পূজার সময়ে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান হিসেবে। সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিছু প্রশংসযোগ্য কথা বলেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছেনপুলিশের কাজ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইনভঙ্গকারী যত শক্তিশালী হোক তাদের আইনের আওতায় আনাই হচ্ছে পুলিশের কাজ। তিনি বলেছেনতাঁর সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান না। একটি স্টেটম্যান সুলভ বক্তৃতা স্বীকার করতে হবে। তাঁর বক্তব্যের জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই।

ঘটনাটি সম্ভবত ওখানে শেষ হয়ে যেতো পারতো। কিংবা দু’একটি গণমাধ্যমে হয়ত ডিসি হারুনের প্রসঙ্গটি তুলে সামান্য সমালোচনা হতে পারতো। তাঁকে পদক দেয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল তাঁর এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু অভিশপ্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী,এক সময়ের চৌকষ সিএসপি অফিসারসাবেক আমলা জনাব মহিউদ্দিন খান আলমগীর প্রসঙ্গটিকে টক অব দি কান্ট্রিতে পরিণত করেছেন। শুধু তাই নয় বলা যায় আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন। ডিসি হারুনের মতো একজন বিতর্কিত পুলিশ অফিসারকে কেন পদক দেয়া হল,সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুককে পেটানো তার পদক প্রাপ্তিতে বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে। পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে উল্লেখ করা প্রয়োজন ২০১১ সালে বিএনপির ডাকা দু’দিনের হরতালে পিকেটিং রত অবস্থায় জয়নাল আবেদীন ফারুকের সাথে কথা কাটাকাটির জের হিসেবে এই পুলিশ অফিসার তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে দেশে-বিদেশে নিজে নিন্দিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারকেও বিব্রতকর (?) পরিস্থিতিতে ফেলেছিলেন। যতই উত্ত্যক্তকারী হোক একজন সংসদ সদস্য এবং বিরোধী দলীয় হুইপের গায়ে হাত তোলা যদি পদক প্রাপ্তির যোগ্যতা হিসেবে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিবেচ্য হতে পারে তা হলে আমাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। অথচ এই পদক প্রদান অনুষ্ঠানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেনপুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর এই কথার পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে আমরা কিসের সাথে তুলনা করতে পারি।

মনে পড়ছে কোহিনুরের কথা। ডিসি কোহিনুর বিএনপি জামাত সরকারের সময়ে বিরোধীদলের কাছে সাক্ষাৎ যমের অপর নাম কোহিনুরের সখ্যতা ছিল তারেক ও তার হাওয়া ভবনের সাথে। কোহিনুরকেও বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আস্কারা দিয়ে এমন জায়গায় তুলেছিলেন যেতার ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো তার অধিনস্থতো বটে কমিশনার আইজি পর্যন্ত। তার কারণে বিএনপির লাভ হয়নি বরং পতন তরান্বিত হয়েছে। পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছিল,ভেঙে পড়েছিল তাদের চেইন অব কমান্ড। পুলিশ বিভাগে অসন্তোষ ঘনীভূত হয়েছিল। যার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পেয়েছিলাম ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে পল্টন এলাকায়। পুলিশ দিয়ে যদি ক্ষমতায় টিকে থাকা যেতো তাহলে আজও বোধ হয় এরশাদের শাসনকাল দেখতে পেতাম। আজ এই লেখাটি যখন চট্টগ্রামের পাঠকরা পড়ছেন তখন তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি এই দিনেই চট্টগ্রামের লালদিঘির মাঠে আয়োজিত আওয়ামী লীগের জনসমাবেশ পণ্ড করার জন্যে এরশাদের পুলিশ বাহিনী পাখির মতো গুলি করে মানুষ মেরেছিল। যা চট্টগ্রাম গণহত্যা বলে বিবেচিত। সেদিনও সৌভাগ্যক্রমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়। লাশ গুম করার অভিপ্রায়ে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষ অনেককে বলুয়ারদিঘির পাড়ের শ্মশানে পুড়ে ফেলা হয়েছিল। তারপরেও এরশাদের শেষ রক্ষা হয় নি। দু’বছর পরে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। স্বাধীনতার পর যে ক’জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন তার মধ্যে দু’একজন ছাড়া সবাই ক্ষমতা ছাড়ার পরে পুলিশের পিটুনি খেয়েছেন। অথচ ক্ষমতায় থাকতে তাঁরাই ‘আমার পুলিশ’, ‘আমার পুলিশ’ বলে মুখে খই ফুটিয়েছেন। এঁরা কেউই পুলিশের উপকারের জন্যে সংস্কার করতে উদ্যোগী হন নি অথচ পুলিশকে নিজ ও নিজ দলের জন্য যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন। এঁদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ অন্যান্য পুলিশরাই পরে তাঁদের ধোলাই করার চেষ্টা করেছে।

পাকিস্তান আমলের পাবলিক সার্ভেন্ট মহিউদ্দিন খান আলমগীর ’৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আশু পতন বুঝতে পেরে সদলবলে জনতার মঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন। এর বাইরে আওয়ামী লীগের জন্যে তাঁর ত্যাগ কতটুকু আমার জানা নেই। কিন্তু আমার জানা আছে এদেশের হাজার হাজার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর কথাযাঁরা বিশেষ করে ’৭৫ পরবর্তী বৈরি সময়ে আওয়ামী লীগের পতাকা বহন করেছে। জিয়াএরশাদ আর জামাত শিবিরের পেটুয়া ও গুণ্ডা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেপঙ্গু হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। জামাত শিবিরের বর্বরতার কাছে অসহায়ের মতো প্রাণ দিয়েছে। অঙ্গহানি হয়েছে। সে সময় জনাব আলমগীর সে সমস্ত সরকারের সেবায় করে যাচ্ছিলেন। আজ তাঁর এবং তাঁর মন্ত্রণালয়ের ভুলের কারণে যে খেসারত আওয়ামী লীগকে ভবিষ্যতে দিতে হবে তার দায় নেবে কেতাঁর অনবরত বিতর্কিত কথাবার্তা প্রতিদিন লক্ষ কোটি আওয়ামী সমর্থকদের বিব্রত করছে। এই সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে। এই মন্ত্রণালয় চালাতে তাঁর লাগাতার ব্যর্থতা চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ভেতরে। তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সাহারা খাতুনের ব্যর্থতাকেও ম্লান করে দিচ্ছে।

যে আচরণ বিএনপি জামাত জোট করেছে সে আচরণ অন্তত আওয়ামী লীগের কাছে মানুষ প্রত্যাশা করে না। মতিয়ানাহিদওবায়দুল কাদেরদের অনেক সাফল্য নিচে পড়ে যাচ্ছে একটি মাত্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে। এখন না বুঝলে তবে কবে বুঝবে সরকার কোহিনুর হারুনরা কখনোই কোন সরকারের অ্যাসেট নয় বরং লায়ব্লিটিস। যে পুলিশ অফিসার একজন সাংসদের গায়ে হাত তুলতে পারেযে পুলিশ অফিসার একজন তরুণকে (বিশ্বজিৎকুপিয়ে মারার দৃশ্য উপভোগ করতে পারে তাকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এড়িয়ে মন্ত্রীকে বরং নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের দিকে নজর বেশি দেয়া উচিত। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন অপকর্ম দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষ ক্ষেপে উঠছে। যার সমস্ত দায় বর্তাবে আওয়ামী লীগের ওপর। ছাত্রলীগের এসব কর্মকাণ্ডে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় লাভের পেছনে যে সোয়া এক কোটি নতুন ভোটার ছিল তারা তো বিগড়ে গেছেই সে সাথে এবারের সমসংখ্যক নতুন ভোটারও বিগড়ে যাবে। মাঝখানে দেশকে রসাতলে ফেলে আজকের ছাত্রলীগের বীর সেনানীরা দলে দলে যোগদান করবে শহীদ জিয়ার আদর্শের দলে। তখন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান কী হবে..... বুঝতে পারছি না।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৩

শিক্ষক বনাম পুলিশ ও একটি ছাত্র সংগঠন

দৈনিক আজাদী                                 উপসম্পাদকীয়                               কাল আজ কাল
১৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি, ৪ মাঘ ১৪১৯ সাল , ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
কামরুল হাসান বাদল


বেশ ক’বছর আগে ভারত সরকার সে দেশের শিক্ষকদের বেতন এমন করেছেন ইচ্ছে করলে একজন শিক্ষক নিজস্ব গাড়ি রাখতে পারেন। আর বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক হাজার শিক্ষক এমপিওভুক্তির দাবিতে কয়েকদিন যাবত রাজধানী ঢাকায় আন্দোলন সংগ্রাম করছেন এবং তা করতে গিয়ে তাঁদের ছাত্রতুল্য পুলিশের হাতে ব্যাপক পিটুনিও খাচ্ছেন।

যে কোন সরকারের শেষ সময়ে দাবি আদায়ের শ্রেষ্ঠ সময় বলে পরিগণিত হচ্ছে বেশ কিছুকাল যাবত। এ সময় ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর জনসমর্থন কমতে থাকে। জনপ্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সঠিক ও আন্তরিকভাবে কাজ করে না ফলে সরকারের অবস্থান হয় নড়বড়ে। এ সময় বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম তীব্র হয়। সরকার তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে এদের অনেক দাবি মেনে নেয় কিংবা মেনে নিতে বাধ্য হয়। এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে সে ধরনের কিছু ভাবার আগে আরো কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।

দেশে বর্তমানে ইচ্ছে করলেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব নয়। আইনটি খুব বেশি দিনের নয়। তাই এর আগে যে অরাজকতা হওয়ার কথা তা হয়ে গেছে। নিজের কিংবা পিতা-মাতা এমন কি শ্বশুর-শাশুড়ীর নামেও অনেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছেন। কয়েকশ গজের মধ্যে দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমন নজিরও বাংলাদেশে আছে। এদের মধ্যে অনেকে নিজেদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করে স্বীয় প্রভাবে এমপিওভুক্ত করে এর ব্যয়ভার সরকারের ওপর চাপিয়ে একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন এমপিওভুক্তি করে শিক্ষকদের বেতন চাদিয়েছেন। এমপিওভুক্তি নিয়েও অতীতে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। তাই বর্তমান সরকার এমপিওভুক্তির ব্যাপারে লানোর মতো অর্থ সরকারের হাতে নেই কাজেই এখন এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা সম্ভব নয়।

নুরুল ইসলাম নাহিদ বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন সফল শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর আন্তরিকতাদক্ষতা,উদারতা ও সততা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করেছেন। তাঁর কাছে আমার অনুরোধ-শিক্ষকদের এভাবে পুরো ঢাকা শহরে না দাবড়িয়ে তাঁদের সাথে আলোচনায় বসুন। দাবি দাওয়া নিয়ে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় আসুন। একটি সভ্য জাতি শিক্ষকদের ওপর এমন আচরণ করতে পারে না বলে আমার বিশ্বাস। শিক্ষামন্ত্রীর কথাটি অবিশ্বাস্য নয়। মাত্র কয়েকদিন আগে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১ লক্ষ ছাব্বিশ হাজার শিক্ষককে বেতন দেবে সরকার। এর আগে দেশের পৌনে দু’কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে বই দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বা বাস্তবতায় এখন হয়ত এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তা কাঁদানে গ্যাসমরিচের গুড়ো ও জলকামান দিয়ে না ঠেকিয়ে তাদের সাথে আলোচনার টেবিলে নিষ্পত্তি করা উচিত। এই শিক্ষকরাইতো আমাদের সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলবে। আজ একটি শিশু যখন টেলিভিশনের পর্দায় একজন শিক্ষককে এমন তাড়া খেতে দেখে তখন তার মানসিক অবস্থাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সমাজই বা এসব শিক্ষকদের সম্মান করবে কতটুকু।

এই যখন ঢাকার পরিস্থিতি তখন দেশের দুটি অন্যতম উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বহিরাগতদের হামলায় আহত হয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক। এ সময় তারা দুজন শিক্ষকের ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপ করে তাতে দুজন শিক্ষকদের চোখেও অ্যাসিড পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গত শনিবার ১২ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলা চালায় তাতে প্রায় ২৫ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন। একটি জাতীয় দৈনিকে ছবি ছাপা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষক লাউঞ্জে ছোড়া ছাত্রলীগের ইট-পাটকেল থেকে বাঁচতে শিক্ষক কীভাবে সোফার গদি দিয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। এর আগে ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়ে আহত হওয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের আহবায়ক ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাত্রলীগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। তার ৯৯ ভাগ সংবাদই নেতিবাচক। ছাত্রলীগের বর্তমান ভাবমূর্তি শূন্যের কোঠায় না বলে বলা উচিত ঋণাত্মক। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত অত্যন্ত গৌরবময় ইতিহাসের স্রষ্টা ছাত্র রাজনীতির এই বিশাল ক্যানভাসটি আজ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া এই সংগঠনটির এমন করুণ পরিণতি দেখতে দেখতে আজ এ বিষয়ে কিছু লিখতেও মন চায় না। শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি ছাত্রলীগ নামধারী এই তরুণরা কারাকে তাদের গড ফাদারআশ্রয়দাতামদদদাতাকার বা কাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে আজ তারা এত বেপরোয়া। ওদের নিয়ন্ত্রণ করবার কেউ কি নেই?

বিএনপির বর্তমান মুখপাত্র তরিকুল ইসলাম ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছেন শয়তানও ওদের ভয় পায়। আমি তরিকুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তি তথা বিএনপি-জামাতের সবাইকে বলতে চাই ওদের গালাগাল নয় বরং বুকে জড়িয়ে ধরুন কারণ ওদের কারণেই আপনাদের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম হচ্ছে।

সম্প্রতি দু’একটি জরিপে দেখলাম বিএনপির প্রতি জনগণের সমর্থন বেড়েছে। আমার বিশ্বাস এই সমর্থন বৃদ্ধির পেছনে বিএনপির কোন কৃতিত্ব নেই। কারণ গত চারবছরে বিএনপি এমন কোন কিছুই দেখাতে পারেনি যার দ্বারা তার সমর্থন বৃদ্ধি পেতে পারে। তাদের সমর্থন বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগসরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। ক্ষমতায় গেলে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বিএনপি-জামাত এদের অনেককে পুরস্কৃত করতে পারে চাইলে। তবে মুশকিল হবে নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে এদের একটাকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলাফল ঘোষণার রাতেই বীরদর্পিরা গা ঢাকা দেবে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস থেকে। এদের বদলে ফিরে আসবে ছাত্রদল নতুন বোতলে পুরোনো মদের মতো। তারাও আগামী পাঁচ বছর প্রাণান্তকর চেষ্টা করবে সরকারের জনপ্রিয়তা কীভাবে কমানো যায়। অথচ ভাবতে অবাক লাগে সেনা সমর্থিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলায় যখন দু’নেত্রীকে বন্দি করে দেশান্তরী করার চেষ্টা হচ্ছিল তখন দু’দলের এত বীর সেনানীরা সুবোধ বালকের আচরণই করেছিল। যা করার করেছিল তখন সাধারণ কর্মী-সমর্থকরাই।

ছাত্রলীগকে নিয়ে আমার বলবার কিছু নেই। ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে’র মতো আওয়ামী লীগের পতনই দেখবো।’ তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ।’ বাংলাদেশের সর্বনাশই হয়ত দেখব। ছাত্রলীগ প্রতিদিন একটু একটু করে নৌকাকে ফুটো করছেপ্রতিদিন একটি একটি করে কফিনে পেরেক ঠুকছেপ্রতিদিন ঘণ্টা বাজাচ্ছে। তাদের এ’কাজ থেকে নিবৃত করবে কে?

খোদ রাষ্ট্রই যদি শিক্ষকদের সম্মান না জানায় তাহলে সমাজ কিংবা ছাত্র সমাজ কতটুকু সম্মান জানাবে শিক্ষকদের। ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক আচরণও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার ও তাঁর মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রতি বিনীত আবেদন রইলশিক্ষকদের প্রতি একটু সম্মানজনক আচরণ করুন।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৩

পদ্মা সেতু কি সত্যিই জরুরি

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                               কাল আজ কাল
১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৭ পৌষ ১৪১৯ সাল ২৭ সফর ১৪৩৪ হিজরী

*কামরুল হাসান বাদল

মহাজোট তথা আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই সেতু নির্মিত হলে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে দুই ভাগ যোগ হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য বিপণনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কথাগুলো মিথ্যে নয়। আমার ব্যক্তিগত দ্বিমতও নেই। কিন্তু বিষয়টি অগ্রাধিকারভিত্তিক কিনা তা নিয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিদ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণদুর্নীতি দূরীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাও ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ আশানুরূপ না বাড়লেও যেকোন ভাবেই হোক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটামুটি সচল রাখতে পারা গেছে তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প কারখানা। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণদুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় খুব যে সফল তা বলা যাবে না। আওয়ামী লীগের সফলতা অনেকতবে অন্তত এই তিনটি ক্ষেত্রে মানুষ আরো সফলতা আশা করেছিল।

আমি বর্তমান সরকারকে কোনভাবেই বিগত বিএনপি-জামাত সরকারের সাথে তুলনা করতে রাজি নই। তাই কেউ যদি বলেনবর্তমান দুর্নীতি গত শাসনামলের হাওয়া ভবনের তুলনায় অনেক কম তাদের এই যুক্তিকে আমি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাই। কারণ জনগণ হতে বিএনপি পরিত্যাজ্য হওয়ার ঐটিই ছিল অন্যতম কারণ। শেখ হাসিনার ওপর আস্থাভাজন জনগণ তার নেতৃত্বের সরকারের কাছ থেকে বিগত সরকারের আচরণ আশা করেন না। কাজেই কোন অজুহাতে বর্তমানের দুর্নীতিকে জায়েজ করা ঠিক হবে না। তবে আমি এবং আমার মতো অনেকেই এখনো বিশ্বাস করে না বিএনপি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে (অধিকতরসুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে।

প্রসঙ্গটি ছিল অগ্রাধিকার নিয়ে। উন্নয়ন কর্মসূচির পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার। পদ্মা সেতু হলে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হতো বটেপ্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পেতো তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু তার আগে তো কিছু কাজ বাকি আছে। তা কেন যুগের পর যুগ অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। শাসকগোষ্ঠীর নজরে আসছে নাঅর্থনীতিবিদগণ ভাবছেন নারাজনীতিকরা সোচ্চার হচ্ছেন না তা বড় বিস্ময়কর। যেমন ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ক।

বাংলাদেশ শুধু নয় বিশ্বের যে কোন দেশে (যেখানে বন্দর আছেরাজধানীর পরে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রথমে বন্দর নগরীই হয় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ রাজনীতিপ্রশাসন ও বৈদেশিক যোগাযোগ ছাড়া অর্থনীতির সমস্ত কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হয় বন্দর বা বন্দর নগরীকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে পাঠকরা ভারতপাকিস্তানকে উদাহরণ হিসেবে মনে করতে পারেন। দূরদেশের তুলনা দেয়ার দরকার নেই। চট্টগ্রামও দেশের প্রধান বন্দর নগরী। এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই দেশের আমদানি রফতানিসহ মোট অর্থনীতির ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য তো রয়েছেই যা পর্যটন শিল্প বিকাশে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। অথচ সেই চট্টগ্রামের সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার কী হাল তা পাঠক মাত্রই জানেন। ঢাকা চট্টগ্রামের মহাসড়কটি নামেই মহাসড়ক যা বস্তুত উত্তরবঙ্গের যে কোন জেলার সাথে উপজেলার সড়কের মত কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও খারাপ। মহাসড়ক কাকে বলে এবং তা তৈরি করা বাংলাদেশেই সম্ভব একবার সড়কপথে উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ করেছেন যারা তারা তা উপলব্ধি করতে পারবেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম-ঢাকা তথাকথিত মহাসড়কের যে অবস্থা তাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে যেতে লাগে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা। স্বাভাবিকভাবে যা হওয়া উচিত ছিল আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা। বড় জোর ৪ ঘণ্টা। দশ বারো বছর আগেও পাঁচ ঘণ্টায় সড়কপথে ঢাকা যাওয়া যেতো। এখন তো চট্টগ্রাম শহর থেকে রাউজান যেতেই লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা।

একটি প্রধান বন্দর শহর থেকে অন্যান্য জেলা তো দূরের কথা রাজধানীতে যেতে যদি লাগে পুরো ১২ ঘণ্টা তাও আবার যাত্রী পরিবহনে সেখানে পণ্য পরিবহনের কী অবস্থা হতে পারে ভেবে দেখা উচিত। সড়কপথের এই দীর্ঘ যানজটনিরাপত্তাহীনতা কি জাতীয় অর্থনীতিতে কোনই প্রভাব ফেলছে না। যে বন্দর দিয়ে মোট আমদানি রফতানির সিংহ ভাগ কাজ সমাধা হয় সে বন্দরের সাথে রাজধানীসহ দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যদি আজ অবধি এরূপ চলতে থাকে তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। এই সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হলে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে কত ভাগ যোগ হতো তা কেন কোন অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন না তা ভেবে পাই না। আমার মতো একজন মূর্খও তো হিসেব না করেই বলতে পারি তা পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে যা হতো তার প্রায় দু’গুণ। মেনে নিলাম দু’গুণ নয় একগুণ বা সমান তাহলেও এ কাজটি এতদিন কোন সরকার বা দল করল না কেন। করার আন্তরিক উদ্যোগ নিল না কেনকেন ঢাকাচট্টগ্রাম সড়কের উন্নয়ন হলো না এত বছর। ছয় লেন করার প্রক্রিয়া কেন বার বার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে কি এই সড়ক বা চট্টগ্রামসহ এই অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে একজন এরশাদের দরকার ছিল চট্টগ্রামে। প্রশ্নটি অবমাননাকর এই লেখকের জন্যেগণতন্ত্রকামী রাজনীতিক ও জনগণের জন্যেও।

একটি সময় বৃহত্তর সিলেটের পাইকারি-ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল কিনতে আসতেন চট্টগ্রামে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তারা এখন ঢাকামুখী সিলেট থেকে ঢাকা যেতে লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। চট্টগ্রাম-সিলেটের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যা আছে তা না থাকার নামান্তর আর রেল যোগাযোগে যে দুটি ট্রেন চলাচল করে তাতে কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের অবস্থা চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য জেলারও। প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে চট্টগ্রাম থেকে যেতে লাগে গাড়ি ভেদে সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে ছয় ঘণ্টা।

পদ্মা সেতু নিয়ে অন্তত গত এক বছর অনেক ঘটনা ঘটেছে। জলঘোলা করা হয়েছে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগে সরকারকে নাস্তানাবুদ করা হয়েছে। যে যাই বলুক বা করুক বিশ্বব্যাংকও সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে পদ্মা সেতু বিষয়ে বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। তাদের একেকবার একেক ধরনের কথায় অনেকের ধারণা এর পিছনে বৃহৎ কোন শক্তির অদৃশ্য হাত রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সরকারের দোদুল্যমনতাও। আমার তো মনে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবমতো নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহাল থাকলে এই সেতুর কাজ কিছুটা এগিয়ে যেতো।

বিগত বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর মর্যাদায় আটজন ছিলেন চট্টগ্রামের। তাদের সময়ে উন্নয়নের চেয়ে দলাদলিই বেশি হয়েছে বলা যায়। আর বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী এমপি মিলিয়েও কম নয়। এঁদের মধ্যে বর্ষীয়ান রাজনীতিকও ছিলেন এবং আছেন যাঁরা বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতি করেছেন। তাঁরা কেন বা কোন যুক্তিতে চট্টগ্রামের প্রাপ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সোচ্চার নন তার মমার্থ বুঝি না। এঁদের সমস্যাটা কোথায়চট্টগ্রামের উন্নয়ন কোন আঞ্চলিক উন্নয়ন নয়। এর পক্ষে কথা বলাটাও আঞ্চলিকতা নয়। বস্তুত চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়ন। কাজেই আমার বিশ্বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কথামতো ছয় লেনে উন্নীত হলে দেশের অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে তা পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার চেয়ে কোন অংশে কম নয় বরং বেশি। অতএবউন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে এই কাজটিই আগে করা হোক। জাতির মাথা থেকে পদ্মা সেতুর ভূত নেমে গেলে লাভ ছাড়া ক্ষতি হবে না কিছুই।

সরকার বা সরকারি প্রশাসনে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী বেশ কিছু ব্যক্তি সর্বদাই থাকেন যাদের কারণে চট্টগ্রামকে দিন দিন গুরুত্বহীন করার পাঁয়তারা চলছে। যার ধারাবাহিকতায় নৌ বাহিনীর সদর দপ্তরবিভিন্ন ব্যাংক বীমার কেন্দ্রীয় অফিসবিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানআমদানি রফতানির প্রধান অফিসসহ ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছুই সুকৌশলে ঢাকায় স্থানান্তর করে ফেলা হয়েছে। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে সম্ভব নয় নতুবা প্রধান সমুদ্র বন্দরসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যও হয়ত ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো।

পদ্মার ওপারের সাথে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নয়। সেতু না থাকার কারণে বিলম্ব হয়সেতু নির্মিত হলে কয়েক ঘণ্টা সময় বেঁচে যেতো। অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যাপ্ত প্রশস্ত না হওয়ায় ও যথাযথ সংস্কারের অভাবে দীর্ঘ যানজট হয়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সাথে পণ্যমূল্য বাড়াচ্ছে সে খবর কে রাখে বলুন।

আমাদের জনপ্রতিনিধিরা চট্টগ্রামে তো বেশ ভালই কথাবার্তা বলেন। বক্তৃতা ভাষণ ভালই করেন। কিন্তু ঢাকায় গেলে মূল স্থানে কেন এত ম্রিয়মান থাকেন বুঝতে পারি না। চট্টগ্রামের স্বার্থ নিয়ে চট্টগ্রামের প্রকৃত অধিকার নিয়ে বুক ফুলিয়ে কথা বলবার কি কেউ নেই?


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৩

নারী তুমি কোথায় নিরাপদ

দৈনিক আজাদী                   উপসম্পাদকীয়                               কাল আজ কাল
৪ জানুয়ারি শুক্রবার ২০১৩ খ্রি. ২১ পৌষ ১৪১৯ সাল ২১ সফর ১৪৩৪ হিজরী

*কামরুল হাসান বাদল

বেশ কয়েক মাস আগে এই পত্রিকায় আপনার সন্তান যখন বড় হচ্ছে শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। ভারতের চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খানের ‘সত্যমেব জয়তে’ অনুষ্ঠানটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা সে কলামে পুরুষদের অনাচারের কথাই লিখেছিলাম। কলামটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমার একজন নিয়মিত পাঠক যিনি আমার লেখা পড়ে ব্যক্তিগত বা ফোনে বিভিন্ন মন্তব্য করে থাকেনতিনি ফোনে জানালেন যেতাঁর এক পরিচিত আমার লেখা পড়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি না কি ভাবতেও পারছেন না বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। পাছে তাঁর কন্যা সন্তান পড়ে ফেলবে সে সংকোচে তিনি সেদিনের পত্রিকাটি বাসায় নিয়ে যেতে পারেন নি। আমার ধারণা এই ভদ্রলোক পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হলে গত কয়েকদিন ধরে ভারতের নয়াদিল্লীসহ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহের সংবাদ পড়ে থাকবেন। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে একটি চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর একজন মেডিক্যাল ছাত্রী ও তার ছেলে বন্ধুকে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়া হয়। এরপরের ঘটনা পাঠকরা সবাই জানেন। ভারতে নববর্ষের উৎসব বর্জন করা হয়েছে ‘ভারত কন্যা’র সম্মানে। এই ঘটনাটি যখন ভারত বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল তখনও বাংলাদেশে ঘটে গেছে বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা। পাঠক মাত্রই জানেন সব ধর্ষণের সংবাদ মানুষ জানতে পারে না। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার লোক লজ্জাসমাজ সংকোচের ভয়ে ও সংকোচে প্রকাশ করে না। তারপরেও কিছু কিছু ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

একজন মহিলা চিকিৎসক ধর্ষিত হয়েছেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে একজন ওয়ার্ডবয় কর্তৃক। একজন কিশোরীকে তিনদিন তালাবদ্ধ ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণের পরে ফেলে আসা হয়েছে রেল লাইনের ধারে। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপাতি ইউনিয়নে টুমাচিং মারমা নামের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এসব প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার দুএকটি বর্ণনা মাত্র। এ গুলো গেল ধর্ষণের ঘটনা। এছাড়া কতভাবে নারীরা নিগৃহিত হচ্ছে তার দুএকটি উদাহরণ একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম ‘জিন তাড়ানোর নামে ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা’। বোয়ালখালীতে ভুয়া বৈদ্য জিন তাড়ানোর নামে পটিয়ার এক মেধাবী স্কুল ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। নিহত তানজিনা জাহান রুশ্মি (১৬পটিয়া এয়াকুবদণ্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী। গত শুক্রবার রাত ৮টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। একইদিন চন্দনাইশের বৈলতলী ইউনিয়নের নাথপাড়ায় প্রভা দেবী নামের এক গৃহবধূকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে মহিলার অবস্থা সংকটাপন্ন।
প্রতিদিন প্রতিনিয়ত এমন কত ঘটনাই না ঘটছে কয়টি ঘটনার উল্লেখ করবো। তবে প্রশ্ন হচ্ছে নারী নিরাপদ কোথায়রাজধানীর চলন্ত বাসেনিজের কর্মক্ষেত্রেবাড়িতেস্কুলে কোথায় তার নিরাপত্তা। তার চারপাশে হায়েনার মতো পুরুষেরা ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায়। পুরুষের এসব অপকর্ম লেখা হলে সে ঐ পত্রিকাটি বাসায় নিতে ভয় পায়। পাছে তার চরিত্র উন্মোচিত হয়ে যায় তার কন্যা সন্তানের কাছে। পুরুষতো পুরুষই। সম্পর্কে সে যাই-ই হোক। আমার এক কবি বন্ধুর উদ্ধৃতি আমার ঐ লেখায় দিয়েছিলাম, “আমার মেয়ের ব্যাপারে আমার বাবাকেও বিশ্বাস করি না” তা পড়ে অনেকে তা অতিরঞ্জিত বলেছিলেন। আমি বলি আমি তো পুরুষনারীরাই জবাব দিক এ কথার।

এই ধরনের ঘটনাকে অনেকে পাশবিক অত্যাচার বলে অভিহিত করেন। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমার এক কবি বন্ধু কথায় কথায় কুকুর শুয়োর নিয়ে অত্যন্ত নিম্নমানের কিছু কথা বলেন। আমি তার কথারও প্রতিবাদ জানাই। পাশবিক অত্যাচার বলতে যা বোঝানো হয় সে ধরনের অত্যাচার পশুরা কখনো করে নাকরতেও পারে না। এ ধরনের ঘটনা শুধুমাত্র মানুষরাই পারে ও করে। তাই এমন নিন্দনীয় কাজকে পুরুষিক বা মানুষিক বলেই আখ্যা দেয়া উচিৎ। পশুদের সমাজে ধর্ষণের কোন ঘটনা নেই। চুরিজালিয়াতিমিথ্যাখুনহত্যা দুর্নীতি জবর দখল,চাঁদাবাজী ও ভূমি দস্যুতা বলে কিছু নেই। পশুরা ক্ষুধা লাগলে শিকার করে। আগে থেকে মজুত করে নাগুদামজাত করে না। পশুরা ক্ষুধা লাগলেই শুধু শিকার করে তা কোনক্রমেই হত্যা ও হিংস্রতা নয়। তা যদি হত্যা ও হিংস্রতা হয় তবে এর চেয়ে হাজার লক্ষ গুম হত্যা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত মানুষরা করে যাচ্ছে।

নয়াদিল্লীর ঘটনার পর ভারত জুড়ে ধর্ষকদের বিচারে নয়া আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। অনেকে আইন পরিবর্তন করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অতি দ্রুত বিচার এবং সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রাখার দাবি জানিয়েছেন। অনেকে ধর্ষকের সাজা হিসেবে তাদের নপুংসক করে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন। ধর্ষণের মামলার সামান্যতম খোঁজ খবরও যারা রাখেন তারা জানেন দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের মামলা করা এবং তা প্রমাণ করা কত কঠিন। একজন নারী একবার ধর্ষিত হয়ে বিচারপ্রার্থী হিসেবে আদালতে দাঁড়ালে তাকে কতবার কতভাবে আসামীপক্ষের আইনজীবী আত্মীয় স্বজনের দ্বারা পরোক্ষ-ধর্ষিত হতে হয়। বাংলাদেশে তো বটে খোদ ভারতের মত একটি রাষ্ট্রে গত কতেক বছরের ধর্ষণের মামলা ও তাতে সাজা হওয়ার চিত্র দেখে আঁতকে উঠেছেন অনেকে। এবং সে কারণেই ভারতে এ আইন পরিবর্তন করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। বাংলাদেশেও-ধর্ষণ-মামলার জন্যে যুগোপযোগী ও আধুনিক আইন প্রণয়নের দাবি জানাই।

একদল পুরুষ নারীকে বিনোদনের সামগ্রী মনে করে। নারী এদের কাছে যে কোন পণ্য। এরা নারীকে নগ্ন করে তার শরীরকে উপজীব্য করে তোলে। পুরুষের আফটার সেভের বিজ্ঞাপন থেকে অধুনা ক্রিকেট খেলার চিয়ার্স গার্লের নামে অনাবৃত দেহের প্রদর্শনীতে লাগিয়েছে। হাজার হাজার দর্শকের সামনে এরা বিনোদন সামগ্রী। আরেক দল পুরুষ তারা নিজেদের জানে না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই তাদের। তাই তারা নারীদের অন্ধকারে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। নারীকে আলখেল্লায় ঢেকে রাখতে চায়। এই পুরুষরা জানে নারীর জন্যে তারা কতটা বিপজ্জনক।

যে কোন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় নারী ও শিশুদের। আজ থেকে এক চল্লিশ বছর আগে এ দেশে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাধর্ষণলুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ত্রিশ লক্ষ শহীদের পাশাপাশি ধর্ষিত হয়েছিল প্রায় ৪ লক্ষ মা বোন। বাংলাদেশে আজ সে সব অপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া চলছে। ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত মানবতাবিরোধী সে অপরাধীদের বাঁচাতে তৎপর দেশের প্রধান বিরোধীদল সহ অভিযুক্তদের রাজনৈতিক দল। ধর্ষকদের কোন ভাবেই ক্ষমা করা যায় কিনা দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক এদেশের নারীরাই সে সিদ্ধান্ত দিক।

দেশে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। কর্মসংস্থান ও কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়েছে। নারীরা এখন সেনানৌবিমান বাহিনীসহ অনেক কঠিন পেশায় অংশ নিচ্ছে। সামাজিক ভাবে নারীরা এখন অনেকদূর এগিয়েছে। দুই প্রধান দলের নেতৃত্বে দুজন নারী হওয়ায় সমাজে তার প্রভাবও পড়েছে। এমনকি প্রসবকালীন নারীমৃত্যুর হারও কমেছে। কিন্তু তার পরেও নারীর প্রকৃত মুক্তি কি ঘটেছে?

আসলে নারীকে নারী হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে দেখলে হয়ত সংকট অনেকটা কেটে যেত। আর সেক্ষেত্রে নারীদেরও যথেষ্ট ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। নিজেকে পণ্য করে না তুলে কিংবা নিজেকে ঢেকে না রেখেমানুষের মর্যাদার দাবিতে তাকে অধিক সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। নিজেদের মুক্তি নিজেদের দিয়েই শুরু করতে হবে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ