দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৭ পৌষ ১৪১৯ সাল ২৭ সফর ১৪৩৪ হিজরী
*কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৭ পৌষ ১৪১৯ সাল ২৭ সফর ১৪৩৪ হিজরী
*কামরুল হাসান বাদল
মহাজোট তথা আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই সেতু নির্মিত হলে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে দুই ভাগ যোগ হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য বিপণনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কথাগুলো মিথ্যে নয়। আমার ব্যক্তিগত দ্বিমতও নেই। কিন্তু বিষয়টি অগ্রাধিকারভিত্তিক কিনা তা নিয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দূরীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাও ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ আশানুরূপ না বাড়লেও যেকোন ভাবেই হোক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটামুটি সচল রাখতে পারা গেছে তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প কারখানা। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় খুব যে সফল তা বলা যাবে না। আওয়ামী লীগের সফলতা অনেক, তবে অন্তত এই তিনটি ক্ষেত্রে মানুষ আরো সফলতা আশা করেছিল।
আমি বর্তমান সরকারকে কোনভাবেই বিগত বিএনপি-জামাত সরকারের সাথে তুলনা করতে রাজি নই। তাই কেউ যদি বলেন, বর্তমান দুর্নীতি গত শাসনামলের হাওয়া ভবনের তুলনায় অনেক কম তাদের এই যুক্তিকে আমি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাই। কারণ জনগণ হতে বিএনপি পরিত্যাজ্য হওয়ার ঐটিই ছিল অন্যতম কারণ। শেখ হাসিনার ওপর আস্থাভাজন জনগণ তার নেতৃত্বের সরকারের কাছ থেকে বিগত সরকারের আচরণ আশা করেন না। কাজেই কোন অজুহাতে বর্তমানের দুর্নীতিকে জায়েজ করা ঠিক হবে না। তবে আমি এবং আমার মতো অনেকেই এখনো বিশ্বাস করে না বিএনপি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে (অধিকতর) সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে।
প্রসঙ্গটি ছিল অগ্রাধিকার নিয়ে। উন্নয়ন কর্মসূচির পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার। পদ্মা সেতু হলে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হতো বটে, প্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পেতো তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু তার আগে তো কিছু কাজ বাকি আছে। তা কেন যুগের পর যুগ অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। শাসকগোষ্ঠীর নজরে আসছে না, অর্থনীতিবিদগণ ভাবছেন না, রাজনীতিকরা সোচ্চার হচ্ছেন না তা বড় বিস্ময়কর। যেমন ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়ক।
বাংলাদেশ শুধু নয় বিশ্বের যে কোন দেশে (যেখানে বন্দর আছে) রাজধানীর পরে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রথমে বন্দর নগরীই হয় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ রাজনীতি, প্রশাসন ও বৈদেশিক যোগাযোগ ছাড়া অর্থনীতির সমস্ত কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হয় বন্দর বা বন্দর নগরীকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে পাঠকরা ভারত, পাকিস্তানকে উদাহরণ হিসেবে মনে করতে পারেন। দূরদেশের তুলনা দেয়ার দরকার নেই। চট্টগ্রামও দেশের প্রধান বন্দর নগরী। এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই দেশের আমদানি রফতানিসহ মোট অর্থনীতির ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য তো রয়েছেই যা পর্যটন শিল্প বিকাশে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। অথচ সেই চট্টগ্রামের সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার কী হাল তা পাঠক মাত্রই জানেন। ঢাকা - চট্টগ্রামের মহাসড়কটি নামেই মহাসড়ক যা বস্তুত উত্তরবঙ্গের যে কোন জেলার সাথে উপজেলার সড়কের মত কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও খারাপ। মহাসড়ক কাকে বলে এবং তা তৈরি করা বাংলাদেশেই সম্ভব একবার সড়কপথে উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ করেছেন যারা তারা তা উপলব্ধি করতে পারবেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম-ঢাকা তথাকথিত মহাসড়কের যে অবস্থা তাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে যেতে লাগে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা। স্বাভাবিকভাবে যা হওয়া উচিত ছিল আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা। বড় জোর ৪ ঘণ্টা। দশ বারো বছর আগেও পাঁচ ঘণ্টায় সড়কপথে ঢাকা যাওয়া যেতো। এখন তো চট্টগ্রাম শহর থেকে রাউজান যেতেই লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা।
একটি প্রধান বন্দর শহর থেকে অন্যান্য জেলা তো দূরের কথা রাজধানীতে যেতে যদি লাগে পুরো ১২ ঘণ্টা তাও আবার যাত্রী পরিবহনে সেখানে পণ্য পরিবহনের কী অবস্থা হতে পারে ভেবে দেখা উচিত। সড়কপথের এই দীর্ঘ যানজট, নিরাপত্তাহীনতা কি জাতীয় অর্থনীতিতে কোনই প্রভাব ফেলছে না। যে বন্দর দিয়ে মোট আমদানি রফতানির সিংহ ভাগ কাজ সমাধা হয় সে বন্দরের সাথে রাজধানীসহ দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যদি আজ অবধি এরূপ চলতে থাকে তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। এই সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হলে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে কত ভাগ যোগ হতো তা কেন কোন অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন না তা ভেবে পাই না। আমার মতো একজন মূর্খও তো হিসেব না করেই বলতে পারি তা পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে যা হতো তার প্রায় দু’গুণ। মেনে নিলাম দু’গুণ নয় একগুণ বা সমান তাহলেও এ কাজটি এতদিন কোন সরকার বা দল করল না কেন। করার আন্তরিক উদ্যোগ নিল না কেন? কেন ঢাকা- চট্টগ্রাম সড়কের উন্নয়ন হলো না এত বছর। ছয় লেন করার প্রক্রিয়া কেন বার বার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে কি এই সড়ক বা চট্টগ্রামসহ এই অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে একজন এরশাদের দরকার ছিল চট্টগ্রামে। প্রশ্নটি অবমাননাকর এই লেখকের জন্যে, গণতন্ত্রকামী রাজনীতিক ও জনগণের জন্যেও।
একটি সময় বৃহত্তর সিলেটের পাইকারি-ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল কিনতে আসতেন চট্টগ্রামে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তারা এখন ঢাকামুখী সিলেট থেকে ঢাকা যেতে লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। চট্টগ্রাম-সিলেটের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যা আছে তা না থাকার নামান্তর আর রেল যোগাযোগে যে দুটি ট্রেন চলাচল করে তাতে কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের অবস্থা চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য জেলারও। প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে চট্টগ্রাম থেকে যেতে লাগে গাড়ি ভেদে সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে ছয় ঘণ্টা।
পদ্মা সেতু নিয়ে অন্তত গত এক বছর অনেক ঘটনা ঘটেছে। জলঘোলা করা হয়েছে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগে সরকারকে নাস্তানাবুদ করা হয়েছে। যে যাই বলুক বা করুক বিশ্বব্যাংকও সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে পদ্মা সেতু বিষয়ে বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। তাদের একেকবার একেক ধরনের কথায় অনেকের ধারণা এর পিছনে বৃহৎ কোন শক্তির অদৃশ্য হাত রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সরকারের দোদুল্যমনতাও। আমার তো মনে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবমতো নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহাল থাকলে এই সেতুর কাজ কিছুটা এগিয়ে যেতো।
বিগত বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর মর্যাদায় আটজন ছিলেন চট্টগ্রামের। তাদের সময়ে উন্নয়নের চেয়ে দলাদলিই বেশি হয়েছে বলা যায়। আর বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী এমপি মিলিয়েও কম নয়। এঁদের মধ্যে বর্ষীয়ান রাজনীতিকও ছিলেন এবং আছেন যাঁরা বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতি করেছেন। তাঁরা কেন বা কোন যুক্তিতে চট্টগ্রামের প্রাপ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সোচ্চার নন তার মমার্থ বুঝি না। এঁদের সমস্যাটা কোথায়? চট্টগ্রামের উন্নয়ন কোন আঞ্চলিক উন্নয়ন নয়। এর পক্ষে কথা বলাটাও আঞ্চলিকতা নয়। বস্তুত চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়ন। কাজেই আমার বিশ্বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কথামতো ছয় লেনে উন্নীত হলে দেশের অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে তা পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার চেয়ে কোন অংশে কম নয় বরং বেশি। অতএব, উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে এই কাজটিই আগে করা হোক। জাতির মাথা থেকে পদ্মা সেতুর ভূত নেমে গেলে লাভ ছাড়া ক্ষতি হবে না কিছুই।
সরকার বা সরকারি প্রশাসনে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী বেশ কিছু ব্যক্তি সর্বদাই থাকেন যাদের কারণে চট্টগ্রামকে দিন দিন গুরুত্বহীন করার পাঁয়তারা চলছে। যার ধারাবাহিকতায় নৌ বাহিনীর সদর দপ্তর, বিভিন্ন ব্যাংক বীমার কেন্দ্রীয় অফিস, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আমদানি রফতানির প্রধান অফিসসহ ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছুই সুকৌশলে ঢাকায় স্থানান্তর করে ফেলা হয়েছে। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে সম্ভব নয় নতুবা প্রধান সমুদ্র বন্দরসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যও হয়ত ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো।
পদ্মার ওপারের সাথে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নয়। সেতু না থাকার কারণে বিলম্ব হয়, সেতু নির্মিত হলে কয়েক ঘণ্টা সময় বেঁচে যেতো। অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যাপ্ত প্রশস্ত না হওয়ায় ও যথাযথ সংস্কারের অভাবে দীর্ঘ যানজট হয়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সাথে পণ্যমূল্য বাড়াচ্ছে সে খবর কে রাখে বলুন।
আমাদের জনপ্রতিনিধিরা চট্টগ্রামে তো বেশ ভালই কথাবার্তা বলেন। বক্তৃতা ভাষণ ভালই করেন। কিন্তু ঢাকায় গেলে মূল স্থানে কেন এত ম্রিয়মান থাকেন বুঝতে পারি না। চট্টগ্রামের স্বার্থ নিয়ে চট্টগ্রামের প্রকৃত অধিকার নিয়ে বুক ফুলিয়ে কথা বলবার কি কেউ নেই?
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন