দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি, ৪ মাঘ ১৪১৯ সাল , ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি, ৪ মাঘ ১৪১৯ সাল , ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
কামরুল হাসান বাদল
বেশ ক’বছর আগে ভারত সরকার সে দেশের শিক্ষকদের বেতন এমন করেছেন ইচ্ছে করলে একজন শিক্ষক নিজস্ব গাড়ি রাখতে পারেন। আর বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক হাজার শিক্ষক এমপিওভুক্তির দাবিতে কয়েকদিন যাবত রাজধানী ঢাকায় আন্দোলন সংগ্রাম করছেন এবং তা করতে গিয়ে তাঁদের ছাত্রতুল্য পুলিশের হাতে ব্যাপক পিটুনিও খাচ্ছেন।
যে কোন সরকারের শেষ সময়ে দাবি আদায়ের শ্রেষ্ঠ সময় বলে পরিগণিত হচ্ছে বেশ কিছুকাল যাবত। এ সময় ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর জনসমর্থন কমতে থাকে। জনপ্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সঠিক ও আন্তরিকভাবে কাজ করে না ফলে সরকারের অবস্থান হয় নড়বড়ে। এ সময় বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম তীব্র হয়। সরকার তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে এদের অনেক দাবি মেনে নেয় কিংবা মেনে নিতে বাধ্য হয়। এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে সে ধরনের কিছু ভাবার আগে আরো কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।
দেশে বর্তমানে ইচ্ছে করলেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব নয়। আইনটি খুব বেশি দিনের নয়। তাই এর আগে যে অরাজকতা হওয়ার কথা তা হয়ে গেছে। নিজের কিংবা পিতা-মাতা এমন কি শ্বশুর-শাশুড়ীর নামেও অনেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছেন। কয়েকশ গজের মধ্যে দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমন নজিরও বাংলাদেশে আছে। এদের মধ্যে অনেকে নিজেদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করে স্বীয় প্রভাবে এমপিওভুক্ত করে এর ব্যয়ভার সরকারের ওপর চাপিয়ে একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন এমপিওভুক্তি করে শিক্ষকদের বেতন চাদিয়েছেন। এমপিওভুক্তি নিয়েও অতীতে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। তাই বর্তমান সরকার এমপিওভুক্তির ব্যাপারে লানোর মতো অর্থ সরকারের হাতে নেই কাজেই এখন এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা সম্ভব নয়।
নুরুল ইসলাম নাহিদ বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন সফল শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর আন্তরিকতা, দক্ষতা,উদারতা ও সততা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করেছেন। তাঁর কাছে আমার অনুরোধ-শিক্ষকদের এভাবে পুরো ঢাকা শহরে না দাবড়িয়ে তাঁদের সাথে আলোচনায় বসুন। দাবি দাওয়া নিয়ে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় আসুন। একটি সভ্য জাতি শিক্ষকদের ওপর এমন আচরণ করতে পারে না বলে আমার বিশ্বাস। শিক্ষামন্ত্রীর কথাটি অবিশ্বাস্য নয়। মাত্র কয়েকদিন আগে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১ লক্ষ ছাব্বিশ হাজার শিক্ষককে বেতন দেবে সরকার। এর আগে দেশের পৌনে দু’কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে বই দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বা বাস্তবতায় এখন হয়ত এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তা কাঁদানে গ্যাস, মরিচের গুড়ো ও জলকামান দিয়ে না ঠেকিয়ে তাদের সাথে আলোচনার টেবিলে নিষ্পত্তি করা উচিত। এই শিক্ষকরাইতো আমাদের সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলবে। আজ একটি শিশু যখন টেলিভিশনের পর্দায় একজন শিক্ষককে এমন তাড়া খেতে দেখে তখন তার মানসিক অবস্থাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সমাজই বা এসব শিক্ষকদের সম্মান করবে কতটুকু।
এই যখন ঢাকার পরিস্থিতি তখন দেশের দুটি অন্যতম উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বহিরাগতদের হামলায় আহত হয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক। এ সময় তারা দুজন শিক্ষকের ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপ করে তাতে দুজন শিক্ষকদের চোখেও অ্যাসিড পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গত শনিবার ১২ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলা চালায় তাতে প্রায় ২৫ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন। একটি জাতীয় দৈনিকে ছবি ছাপা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষক লাউঞ্জে ছোড়া ছাত্রলীগের ইট-পাটকেল থেকে বাঁচতে শিক্ষক কীভাবে সোফার গদি দিয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। এর আগে ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়ে আহত হওয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের আহবায়ক ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাত্রলীগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। তার ৯৯ ভাগ সংবাদই নেতিবাচক। ছাত্রলীগের বর্তমান ভাবমূর্তি শূন্যের কোঠায় না বলে বলা উচিত ঋণাত্মক। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত অত্যন্ত গৌরবময় ইতিহাসের স্রষ্টা ছাত্র রাজনীতির এই বিশাল ক্যানভাসটি আজ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া এই সংগঠনটির এমন করুণ পরিণতি দেখতে দেখতে আজ এ বিষয়ে কিছু লিখতেও মন চায় না। শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি ছাত্রলীগ নামধারী এই তরুণরা কারা? কে তাদের গড ফাদার, আশ্রয়দাতা, মদদদাতা? কার বা কাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে আজ তারা এত বেপরোয়া। ওদের নিয়ন্ত্রণ করবার কেউ কি নেই?
বিএনপির বর্তমান মুখপাত্র তরিকুল ইসলাম ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছেন শয়তানও ওদের ভয় পায়। আমি তরিকুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তি তথা বিএনপি-জামাতের সবাইকে বলতে চাই ওদের গালাগাল নয় বরং বুকে জড়িয়ে ধরুন কারণ ওদের কারণেই আপনাদের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম হচ্ছে।
সম্প্রতি দু’একটি জরিপে দেখলাম বিএনপির প্রতি জনগণের সমর্থন বেড়েছে। আমার বিশ্বাস এই সমর্থন বৃদ্ধির পেছনে বিএনপির কোন কৃতিত্ব নেই। কারণ গত চারবছরে বিএনপি এমন কোন কিছুই দেখাতে পারেনি যার দ্বারা তার সমর্থন বৃদ্ধি পেতে পারে। তাদের সমর্থন বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগ, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। ক্ষমতায় গেলে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বিএনপি-জামাত এদের অনেককে পুরস্কৃত করতে পারে চাইলে। তবে মুশকিল হবে নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে এদের একটাকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলাফল ঘোষণার রাতেই বীরদর্পিরা গা ঢাকা দেবে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস থেকে। এদের বদলে ফিরে আসবে ছাত্রদল নতুন বোতলে পুরোনো মদের মতো। তারাও আগামী পাঁচ বছর প্রাণান্তকর চেষ্টা করবে সরকারের জনপ্রিয়তা কীভাবে কমানো যায়। অথচ ভাবতে অবাক লাগে সেনা সমর্থিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলায় যখন দু’নেত্রীকে বন্দি করে দেশান্তরী করার চেষ্টা হচ্ছিল তখন দু’দলের এত বীর সেনানীরা সুবোধ বালকের আচরণই করেছিল। যা করার করেছিল তখন সাধারণ কর্মী-সমর্থকরাই।
ছাত্রলীগকে নিয়ে আমার বলবার কিছু নেই। ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে’র মতো আওয়ামী লীগের পতনই দেখবো।’ তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ।’ বাংলাদেশের সর্বনাশই হয়ত দেখব। ছাত্রলীগ প্রতিদিন একটু একটু করে নৌকাকে ফুটো করছে, প্রতিদিন একটি একটি করে কফিনে পেরেক ঠুকছে, প্রতিদিন ঘণ্টা বাজাচ্ছে। তাদের এ’কাজ থেকে নিবৃত করবে কে?
খোদ রাষ্ট্রই যদি শিক্ষকদের সম্মান না জানায় তাহলে সমাজ কিংবা ছাত্র সমাজ কতটুকু সম্মান জানাবে শিক্ষকদের। ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক আচরণও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার ও তাঁর মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রতি বিনীত আবেদন রইল, শিক্ষকদের প্রতি একটু সম্মানজনক আচরণ করুন।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন