দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
৩১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১৮ মাঘ ১৪১৯ সাল ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
৩১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১৮ মাঘ ১৪১৯ সাল ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। আর এ জন্যে চাই প্রথমেই একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং সাহসী ও দেশপ্রেমিক নির্বাচন কমিশনার।
নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পরে একানব্বই সালে বিচারপতি সাহাবউদ্দিন এর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার। ঐ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপ ও জনমতে প্রকাশ পেয়েছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। এই ধারণা খোদ খালেদা জিয়াও পোষণ করতেন। নির্বাচনে কারচুপি হবে এমন আগাম আশঙ্কা থেকে নির্বাচনের পরদিন তিনি হরতালও আহ্বান করে রেখেছিলেন। তবে নির্বাচনে অভাবনীয় জয়লাভের পর আর হরতাল করেন নি বা করার প্রয়োজন পড়েনি। সে নির্বাচন পরবর্তী শেখ হাসিনার একটি উক্তি তখন ভীষণ আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন ‘নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধীরাতো বলেছেই এমন কি অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী সমর্থকও শেখ হাসিনার সেই উক্তির ভীষণ সমালোচনা করেছিলেন। নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন কী সেই সূক্ষ্ম কারচুপি। লেখার কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার আকাঙক্ষায় তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া থেকে বিরত থাকলাম। তবে ছোট্ট দু’টো উদাহরণ না দিলেই বুঝি নয়। একটি হল রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহম্মদ এর তথাকথিত নিরপেক্ষ থাকা। যার প্রকৃত স্বরূপ পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন উদ্ভাসিত হয়েছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রণীত ভোটার লিস্ট, যেখান থেকে অন্তত দেড় কোটি ভুয়া ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছিল। অন্তত শেষের কারণটির জন্যেই বিএনপি-জামাতের জয়লাভ বা পরাজয় ঘটতো।
১৯৯৪ সালে মাগুরা উপ-নির্বাচনে বিএনপি সরকারের নজিরবিহীন ভোট কারচুপি ও তাতে বিচারপতি আব্দুর রউফের নির্বাচন কমিশনের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের কারণে তৎপরবর্তী জাতীয় নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরিচালিত করার দাবি উঠে এবং এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। বিএনপি ১৯৯৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ভোটার বিহীন নির্বাচন করে। এবং সর্বশেষে মার্চের শেষে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিএনপি পদত্যাগ করে। সেই নির্বাচনেও কম ঘটনা ঘটেনি। সেনা অভ্যুত্থানেরও চেষ্টা করা হয়েছিল। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়েছিল।
তা যাক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি ছাড়া আর কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। কোন না কোনভাবে তারা নিন্দিত হয়েছেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে দেশের সুশীল শ্রেণী বা বুদ্ধিজীবী পর্যায়ে একমাত্র বিচারপতি হাবিবুর রহমান ছাড়া আর কারো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এমন কি এঁদের কে কোথায় সে খবরটিও গণমাধ্যম বা জনগণ রাখে না বা রাখার প্রয়োজন মনে করে না।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা দাবি কে করেছিল, এখন কারা করছে না বা কারা করছে এটি দেখার বিষয় নয় এখন। গণতন্ত্র মুক্তি পাওয়ার ২৩ বছরের মাথায় এসে সে হিসেব করেও লাভ নেই। এখন প্রশ্ন হতে পারে একটি দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা বা তা থাকলে বিলুপ্ত করা প্রয়োজন কি না। ‘গণতন্ত্র’ এই ধারণাটি যে সব দেশ থেকে নেয়া হয়েছে কিংবা ওসব দেশের অনুকরণে বিশ্বের অন্যান্য যে সব দেশে এমন ওয়েস্ট মিনিস্টার ধরনের গণতন্ত্র চর্চা হয়ে থাকে সে সব দেশে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আছে কি না। ওসব দেশে না থাকলে তবে বাংলাদেশে কেন? উত্তর হতে পারে ওসব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা ওসব দেশে বড় দুই দলের মধ্যে বাংলাদেশের মতো কামড়াকামড়ি নেই। পরস্পরকে অবিশ্বাস করার সংস্কৃতিও নেই। যুক্তিটি মিথ্যে নয়। তবে পুরোটা মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কোন ধারণাই গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় নেই। দ্বিতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কোন চিরস্থায়ী ফয়সালা নয়। কোন না কোন দেশে একদিন এই ব্যবস্থা রহিত করার প্রয়োজন হবে। ২৩ বছর পরে না হলেও আর কত বছর এই ধারা চলতে থাকবে। তৃতীয়ত, এটি কোন সম্মানজনক পদ্ধতিও নয়, না রাজনীতিকদের জন্যে না জনগণের জন্যে। দশজন অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক ব্যক্তি কী করে পাঁচ বছরের জন্যে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন। যাদের কোনদিনই জনগণের কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন হবে না। অতীতে এঁদের মধ্যে সবাই যে সৎ ছিলেন বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন নি তাও তো না। এ ছাড়া ৩ মাসের জন্যে ক্ষমতায় এসে দীর্ঘ দু’বছরেও না গেলে কী করার আছে তখন। চতুর্থত, এই পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে মনোনীত করার বিধান রেখে কার্যত আদালত বা বিচার ব্যবস্থাকে কলুষিত করা হয়েছে। যে কারণে ২০০৬ সালে সংঘাত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নয়, তার প্রধান কে হবেন সে প্রশ্ন নিয়ে। বর্তমানেও একই সংকট বিদ্যমান। বিএনপি’র কথা মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে গেলে সরকার প্রধান কে হবেন? তারা তো বিচারপতি খায়রুলকে মেনে নেবেন না। তখনও কি সংঘাত অনিবার্য নয়।
মোট কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মুখ্য নয়। মুখ্য হওয়া উচিত নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে। আমার মতে সে ক্ষেত্রে সবার আগে হাত দেওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনে। এই কমিশন এমনভাবে গঠন করা দরকার যারা নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। নির্বাচনকালীন যে সরকার থাকবে দৈনন্দিন কাজ ছাড়া অন্য কিছুর ক্ষমতা তাদের থাকবে না। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, সংস্থাপন বা নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যে মন্ত্রণালয় তাদের অধীনে নিতে চাইবে তাদের তাই-ই দেয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনে প্রভাব ফেলার মত কোন কাজ করারই অধিকার সংরক্ষণ করবে না। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ দানের ক্ষমতাও ভোগ করতে পারে।
মোট কথা বিশ্বের অন্যান্য দেশে যে ভাবে বা যে রীতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশেও তাই হবে। আমার মনে হয় যারা এখনও বিএনপি-জামাতের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন চাইছেন এবং কৌশলে ইনিয়ে-বিনিয়ে তা না হলে দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলে পক্ষান্তরে বিএনপি-জামাতকে সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছেন তাঁরা একটু দয়া করে বিষয়টি ভেবে দেখবেন। দলীয় অভিসন্ধির কারণে জাতির কাঁধে অহেতুক একটি বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবি করছে বিএনপি, তারা তো সে সংসদে যায়-ই না। সংসদে অনুপস্থিত থাকার রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বিএনপি। তর্কের খাতিরেও যদি বলি, আগামী নির্বাচন না হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হল। এবং দেখা গেল যে কোন কারণে বিএনপি হেরে গেল। তবে কি তারা আগামীতে নিয়মিত সংসদে যোগ দেবে? সে নিশ্চয়তা কোথায়? বিএনপি তো গত নির্বাচনে তাদের ইশতেহারে লিখেছিল এক নাগাড়ে ৩০ দিন অনুপস্থিত থাকলে সংসদে তার সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে। অথবা আওয়ামী লীগ হেরে গেলে তারাও সংসদে গিয়ে সংসদকে কার্যকর করবে তারও বা নিশ্চয়তা কোথায়? শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। আর এ জন্যে চাই প্রথমেই একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং সাহসী ও দেশপ্রেমিক নির্বাচন কমিশনার।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন