পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৩

নারী তুমি কোথায় নিরাপদ

দৈনিক আজাদী                   উপসম্পাদকীয়                               কাল আজ কাল
৪ জানুয়ারি শুক্রবার ২০১৩ খ্রি. ২১ পৌষ ১৪১৯ সাল ২১ সফর ১৪৩৪ হিজরী

*কামরুল হাসান বাদল

বেশ কয়েক মাস আগে এই পত্রিকায় আপনার সন্তান যখন বড় হচ্ছে শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। ভারতের চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খানের ‘সত্যমেব জয়তে’ অনুষ্ঠানটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা সে কলামে পুরুষদের অনাচারের কথাই লিখেছিলাম। কলামটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমার একজন নিয়মিত পাঠক যিনি আমার লেখা পড়ে ব্যক্তিগত বা ফোনে বিভিন্ন মন্তব্য করে থাকেনতিনি ফোনে জানালেন যেতাঁর এক পরিচিত আমার লেখা পড়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি না কি ভাবতেও পারছেন না বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। পাছে তাঁর কন্যা সন্তান পড়ে ফেলবে সে সংকোচে তিনি সেদিনের পত্রিকাটি বাসায় নিয়ে যেতে পারেন নি। আমার ধারণা এই ভদ্রলোক পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হলে গত কয়েকদিন ধরে ভারতের নয়াদিল্লীসহ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহের সংবাদ পড়ে থাকবেন। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে একটি চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর একজন মেডিক্যাল ছাত্রী ও তার ছেলে বন্ধুকে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়া হয়। এরপরের ঘটনা পাঠকরা সবাই জানেন। ভারতে নববর্ষের উৎসব বর্জন করা হয়েছে ‘ভারত কন্যা’র সম্মানে। এই ঘটনাটি যখন ভারত বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল তখনও বাংলাদেশে ঘটে গেছে বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা। পাঠক মাত্রই জানেন সব ধর্ষণের সংবাদ মানুষ জানতে পারে না। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার লোক লজ্জাসমাজ সংকোচের ভয়ে ও সংকোচে প্রকাশ করে না। তারপরেও কিছু কিছু ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

একজন মহিলা চিকিৎসক ধর্ষিত হয়েছেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে একজন ওয়ার্ডবয় কর্তৃক। একজন কিশোরীকে তিনদিন তালাবদ্ধ ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণের পরে ফেলে আসা হয়েছে রেল লাইনের ধারে। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপাতি ইউনিয়নে টুমাচিং মারমা নামের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এসব প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার দুএকটি বর্ণনা মাত্র। এ গুলো গেল ধর্ষণের ঘটনা। এছাড়া কতভাবে নারীরা নিগৃহিত হচ্ছে তার দুএকটি উদাহরণ একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম ‘জিন তাড়ানোর নামে ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা’। বোয়ালখালীতে ভুয়া বৈদ্য জিন তাড়ানোর নামে পটিয়ার এক মেধাবী স্কুল ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। নিহত তানজিনা জাহান রুশ্মি (১৬পটিয়া এয়াকুবদণ্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী। গত শুক্রবার রাত ৮টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। একইদিন চন্দনাইশের বৈলতলী ইউনিয়নের নাথপাড়ায় প্রভা দেবী নামের এক গৃহবধূকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে মহিলার অবস্থা সংকটাপন্ন।
প্রতিদিন প্রতিনিয়ত এমন কত ঘটনাই না ঘটছে কয়টি ঘটনার উল্লেখ করবো। তবে প্রশ্ন হচ্ছে নারী নিরাপদ কোথায়রাজধানীর চলন্ত বাসেনিজের কর্মক্ষেত্রেবাড়িতেস্কুলে কোথায় তার নিরাপত্তা। তার চারপাশে হায়েনার মতো পুরুষেরা ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায়। পুরুষের এসব অপকর্ম লেখা হলে সে ঐ পত্রিকাটি বাসায় নিতে ভয় পায়। পাছে তার চরিত্র উন্মোচিত হয়ে যায় তার কন্যা সন্তানের কাছে। পুরুষতো পুরুষই। সম্পর্কে সে যাই-ই হোক। আমার এক কবি বন্ধুর উদ্ধৃতি আমার ঐ লেখায় দিয়েছিলাম, “আমার মেয়ের ব্যাপারে আমার বাবাকেও বিশ্বাস করি না” তা পড়ে অনেকে তা অতিরঞ্জিত বলেছিলেন। আমি বলি আমি তো পুরুষনারীরাই জবাব দিক এ কথার।

এই ধরনের ঘটনাকে অনেকে পাশবিক অত্যাচার বলে অভিহিত করেন। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমার এক কবি বন্ধু কথায় কথায় কুকুর শুয়োর নিয়ে অত্যন্ত নিম্নমানের কিছু কথা বলেন। আমি তার কথারও প্রতিবাদ জানাই। পাশবিক অত্যাচার বলতে যা বোঝানো হয় সে ধরনের অত্যাচার পশুরা কখনো করে নাকরতেও পারে না। এ ধরনের ঘটনা শুধুমাত্র মানুষরাই পারে ও করে। তাই এমন নিন্দনীয় কাজকে পুরুষিক বা মানুষিক বলেই আখ্যা দেয়া উচিৎ। পশুদের সমাজে ধর্ষণের কোন ঘটনা নেই। চুরিজালিয়াতিমিথ্যাখুনহত্যা দুর্নীতি জবর দখল,চাঁদাবাজী ও ভূমি দস্যুতা বলে কিছু নেই। পশুরা ক্ষুধা লাগলে শিকার করে। আগে থেকে মজুত করে নাগুদামজাত করে না। পশুরা ক্ষুধা লাগলেই শুধু শিকার করে তা কোনক্রমেই হত্যা ও হিংস্রতা নয়। তা যদি হত্যা ও হিংস্রতা হয় তবে এর চেয়ে হাজার লক্ষ গুম হত্যা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত মানুষরা করে যাচ্ছে।

নয়াদিল্লীর ঘটনার পর ভারত জুড়ে ধর্ষকদের বিচারে নয়া আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। অনেকে আইন পরিবর্তন করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অতি দ্রুত বিচার এবং সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রাখার দাবি জানিয়েছেন। অনেকে ধর্ষকের সাজা হিসেবে তাদের নপুংসক করে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন। ধর্ষণের মামলার সামান্যতম খোঁজ খবরও যারা রাখেন তারা জানেন দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের মামলা করা এবং তা প্রমাণ করা কত কঠিন। একজন নারী একবার ধর্ষিত হয়ে বিচারপ্রার্থী হিসেবে আদালতে দাঁড়ালে তাকে কতবার কতভাবে আসামীপক্ষের আইনজীবী আত্মীয় স্বজনের দ্বারা পরোক্ষ-ধর্ষিত হতে হয়। বাংলাদেশে তো বটে খোদ ভারতের মত একটি রাষ্ট্রে গত কতেক বছরের ধর্ষণের মামলা ও তাতে সাজা হওয়ার চিত্র দেখে আঁতকে উঠেছেন অনেকে। এবং সে কারণেই ভারতে এ আইন পরিবর্তন করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। বাংলাদেশেও-ধর্ষণ-মামলার জন্যে যুগোপযোগী ও আধুনিক আইন প্রণয়নের দাবি জানাই।

একদল পুরুষ নারীকে বিনোদনের সামগ্রী মনে করে। নারী এদের কাছে যে কোন পণ্য। এরা নারীকে নগ্ন করে তার শরীরকে উপজীব্য করে তোলে। পুরুষের আফটার সেভের বিজ্ঞাপন থেকে অধুনা ক্রিকেট খেলার চিয়ার্স গার্লের নামে অনাবৃত দেহের প্রদর্শনীতে লাগিয়েছে। হাজার হাজার দর্শকের সামনে এরা বিনোদন সামগ্রী। আরেক দল পুরুষ তারা নিজেদের জানে না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই তাদের। তাই তারা নারীদের অন্ধকারে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। নারীকে আলখেল্লায় ঢেকে রাখতে চায়। এই পুরুষরা জানে নারীর জন্যে তারা কতটা বিপজ্জনক।

যে কোন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় নারী ও শিশুদের। আজ থেকে এক চল্লিশ বছর আগে এ দেশে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাধর্ষণলুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ত্রিশ লক্ষ শহীদের পাশাপাশি ধর্ষিত হয়েছিল প্রায় ৪ লক্ষ মা বোন। বাংলাদেশে আজ সে সব অপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া চলছে। ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত মানবতাবিরোধী সে অপরাধীদের বাঁচাতে তৎপর দেশের প্রধান বিরোধীদল সহ অভিযুক্তদের রাজনৈতিক দল। ধর্ষকদের কোন ভাবেই ক্ষমা করা যায় কিনা দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক এদেশের নারীরাই সে সিদ্ধান্ত দিক।

দেশে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। কর্মসংস্থান ও কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়েছে। নারীরা এখন সেনানৌবিমান বাহিনীসহ অনেক কঠিন পেশায় অংশ নিচ্ছে। সামাজিক ভাবে নারীরা এখন অনেকদূর এগিয়েছে। দুই প্রধান দলের নেতৃত্বে দুজন নারী হওয়ায় সমাজে তার প্রভাবও পড়েছে। এমনকি প্রসবকালীন নারীমৃত্যুর হারও কমেছে। কিন্তু তার পরেও নারীর প্রকৃত মুক্তি কি ঘটেছে?

আসলে নারীকে নারী হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে দেখলে হয়ত সংকট অনেকটা কেটে যেত। আর সেক্ষেত্রে নারীদেরও যথেষ্ট ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। নিজেকে পণ্য করে না তুলে কিংবা নিজেকে ঢেকে না রেখেমানুষের মর্যাদার দাবিতে তাকে অধিক সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। নিজেদের মুক্তি নিজেদের দিয়েই শুরু করতে হবে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ