পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১২

দালাল বনাম ইনটেলেকচুয়াল

দৈনিক আজাদী                             উপসম্পাদকীয়                                   কাল আজ কাল
২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১২ খ্রি. ১৪ পৌষ ১৪১৯ সাল ১৪ সফর ১৪৩৪ হিজরী

*কামরুল হাসান বাদল

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে নতুন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ভুল বললাম বলা উচিৎ একটি ধারণার জন্ম দিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে প্রথম যখন ৬ দফা ঘোষণা করেছিলেন সেদিনও তেমনিভাবে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যে ওটি সিআইএর তৈরি করা দলিল। পরবর্তীতে বলা হয়েছিল ৬ দফা ভারতের তৈরি রাজনৈতিক কর্মসূচি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধুতাঁর দল ও পরিবার নিয়েও অনেক ভুল ধারণা বা অপপ্রচার করা হতো। যা যতই দিন যাচ্ছে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এমনকি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরও বলা হতো শেখ হাসিনা কোনদিন তাঁর পিতার হত্যাকান্ডের বিচার করতে পারবেন না কিংবা করবেন না। কারণ এই বিচার করতে গেলে আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই ফেঁসে যাবেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিই শেষ হয়ে যাবে। বলার প্রয়োজন পড়ছে না দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে কিনা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ করবে নাকরতে আন্তরিক নয় ইত্যাদি বহুকথা বলা হয়েছেবলা হচ্ছে। বাস্তবতা ভিন্ন হতে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে হচ্ছে এবং সঠিক ও যথার্থ সাজা হতে যাচ্ছে তা জামাত-শিবিরের মরিয়া হয়ে ওঠা থেকে আমি নিশ্চিত হচ্ছি।

শুরু করেছিলাম সাম্প্রতিক প্রবণতা বা ধারণার কথা দিয়ে। তা কী তাই এখন খুলে বলি। তা হলো,কেউ একজন যখন বিএনপি-জামাত বা যুদ্ধাপরাধীদের সমালোচনা করেন তখন তাকে বলা হয় আওয়ামী লীগের দালাল। আর যখন কেউ আওয়ামী লীগ বা বর্তমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে গালি দেন বা সমালোচনা করেন তখন তাকে বলা হয় ইনটেলেকচুয়াল। বর্তমানে এসব ইনটেলেকচুয়ালদের মুখরতাবাচালতাপ্রগলভতা ও ঔদ্ধত্যে টেলিভিশন দেখা ও খবরের কাগজ পড়া প্রায় ছেড়ে দেয়ার অবস্থা। এরা জাতির স্বঘোষিত বিবেককক্তস্বর ও নিরপেক্ষ সুশীল শ্রেণী। এই শ্রেণীর এখন প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে গভীর রাতে টেলিভিশনের টকশো’তে অংশ নিয়ে সরকার তথা ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে তুলোধূনো করা। ইনিয়ে-বিনিয়ে বিএনপির পক্ষে তথা জামাত তথা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানো। এদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সর্বজান্তা অধ্যাপকপত্রিকার সম্পাদকচাকরীবিহীন সাংবাদিকআমেরিকা ফেরৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এদের পেশাগত পরিচয় যাই হোক রাজনৈতিক আদর্শ রসুনের কোষার মত একই জায়গায়। এদের মধ্যে অনেকেই রাতারাতি বিখ্যাত হয়েছেন চ্যানেলওয়ালাদের সস্তা ধরনের টকশোতে উপস্থিত হয়ে সরকার বিরোধী বিশেষ করে ট্রাইব্যুনাল বিরোধী বক্তব্য দিতে দিতে। বিখ্যাত হয়েছেন বলা ঠিক হলো না বলা উচিৎ বিখ্যাত করা হয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলের মালিকরা বেশ একটি মওকা পেয়ে বসেছেন। শুধু দেখা এবং তা প্রতিদিন একই বিষয়ে শুনবার বা শোনাবার জন্যে বিজ্ঞাপনদাতা স্পন্সর করে। এত কম মূলধন ও পরিশ্রমে প্রোগাম তৈরি টক শো ছাড়া আর সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট উপস্থাপক ছাড়া অংশগ্রহণকারীদের দু-চার পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে সর্বমোট হাজার বিশেক টাকার মধ্যে একটি টকশো করে ফেলা সম্ভব। তা বিক্রি করাও সম্ভব। বাংলাদেশ ছাড়া টেলিভিশনের প্রাইম টাইমে বিনোদন ছাড়া শুধু কথা বলা আর কোথাও হয় কিনা সন্দেহ আছে।

ঘরে বাইরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আওয়ামী লীগ তথা বর্তমান সরকারের আক্রান্ত হতে দেখে কাহলিল জিবরানের একটি গল্পের কথা মনে পড়লো। গল্পটি সম্ভবত পূর্বেও একবার লিখেছিলাম। খুব প্রাসঙ্গিক বলে আবারও লিখছি লোকটিরঘোড়া চুরি হয়েছিল। তা দেখে শুনে সবাই লোকটিকে গালমন্দ করছিল তার বোকামির জন্য। কেউ বলছে তুমি ঘোড়া বাইরে বেঁধে রেখে ভেতরে ঘুমাতে গেলে কেনকেউ বলছে ঘুমাতে গিয়েছো ভালমাঝে মধ্যে এসে দেখলে না কেনএভাবে ক্রমাগত সমালোচনা শুনতে শুনতে লোকটি ক্ষেপে গিয়ে একসময় বললো চুপ কর তোমরা। ঘোড়া চুরি হয়েছে আমার আর তোমরা শুধু তার জন্যে আমাকেই গালাগাল করছো। যে ঘোড়া চুরি করেছে তাকে এ পর্যন্ত একটি কথাও বললে না। আওয়ামী লীগেরও দশা হয়েছে এখন ঐ লোকটির মতো। সমস্ত কিছুর দায় শুধুই আওয়ামী লীগের। অথচ এই দলটির নেতৃত্বেই এদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই আওয়ামী লীগ সরকারই সংবিধানে গণতন্ত্রসমাজতন্ত্রধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের মূলস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। এই আওয়ামী সরকারই ১৯৭২ সালের দালাল আইন প্রণয়ন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিল। ৭৫ এ জাতির জনককে হত্যার পর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ করা হয়েছে। সংবিধানে বিসমিল্লাহ যোগ করা হয়েছে। (জিয়ার উত্তরসুরি এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছে)। বাঙালি দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে সংবিধানের প্রস্তাবনায় মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্থলে স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিকৃত করে পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। যা স্বাধীনতা পরে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন। ফলে দেশ মারাত্মকভাবে সাম্প্রদায়িকতার পথে অগ্রসর হয়েছে তৈরি হয়েছে অনেক ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী দল। জন্ম নিয়েছে জঙ্গিবাদ। যার চূড়ান্ত স্বরূপ আমরা গত বিএনপি জামাত সরকারের শাসনামলে প্রত্যক্ষ করেছি।

এখন আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেই অপর পক্ষ থেকে বলা হয় তবে বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম কেন সংবিধানে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বললে বলা হয় ৪১ বছর পরে কেনগোলাম আজমসাঈদীনিজামী ও সাকাদের মতো চিহ্নিত ও শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে বলা হয় আওয়ামী লীগে যারা আছে তাদের আগে করা হোকস্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করা হোক। বড় মুশকিলে নিপতিত হয়েছে আওয়ামী লীগ ঘোড়া চুরি হয়ে যাওয়া লোকটির মতো। যারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজন করেছেযারা সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাও সমাজতন্ত্র ছুঁড়ে ফেলেছেযারা ধর্ম ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করেছেযারা হাজার হাজার জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি করেছে,যারা বাংলাদেশকে বোমা-গ্রেনেডের দেশে পরিণত করেছেযারা যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় স্মৃতি সৌধ অপবিত্র করেছে। যারা এখনো যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়ে দেশকে অকার্যকর,ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে। যারা প্রতিনিয়ত গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতা করছে তাদের ব্যাপারে এসব ইনটেলেকচুয়ালরা নিশ্চুপ।

নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেনসব সময় যে খারাপ লোকরাই দেশের বা সমাজের ক্ষতি করে তা নয়। ভাল লোকরাই করে যখন তারা এ সময় নীরবতা পালন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বোনাপার্টের ব্যাখ্যার চেয়েও খারাপের দিকে কারণ যাদের ভাল মানুষ বলে এতকাল জেনে এসেছি তারা নিশ্চুপ নন। তারাও বলছেন তবে এমনভাবে বলছেন শুনে মনে হয় খারাপ লোকরাই কথাগুলো বলছে।

ভাত বাসি হলে পান্তা খাওয়া যায়। পচলে অন্তত দোচোয়ানি বানানো যায়। কিন্তু বিরানি পচলে কোনভাবেই খাওয়া যায় না। দুর্গন্ধ ছড়ায়। আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিৎ। কাদের সিদ্দিকীর এমন মন্তব্যের পর কথাটি মনে এলো।

দুঃসময়ে বন্ধুর পরিচয়। বাঙালি জাতির বর্তমান এই দুঃসময়ে আয়নায় বন্ধুর মুখ দেখা যাবে। জাতির প্রকৃত বন্ধুদের পরিচয় উদঘাটিত হবে খুব শীঘ্রই।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১২

একটি যৌক্তিক, সফল ও সর্বাত্মক হরতাল

দৈনিক আজাদী                               উপসম্পাদকীয়                           কাল আজ কাল
২০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ৬ পৌষ ১৪১৯ সাল ৬ সফর ১৪৩৪ হিজরী

*কামরুল হাসান বাদল

স্মরণকালের একটি যৌক্তিকসফল ও সর্বাত্মক হরতাল পালিত হল দেশে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তরান্বিত করাররাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবিতে সিপিবিবাসদসহ বামমোর্চার এই হরতাল ছিলসম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও অহিংস। দীর্ঘকাল ধরে হরতাল অর্থ যেখানে ছিল হরতালপূর্ব সন্ধ্যায় গাড়িতে আগুন দেয়াহরতালের সময় যানবাহন ভাঙচুরঅগ্নি সংযোগজ্বালাও-পোড়াও,হত্যা-মৃত্যু আর ধ্বংসের উৎসব। পিকেটারদের হাতে উদ্যত্ত মারণাস্ত্রইট-পাটকেল ও পেট্রোলের বোতল। গত ১৮ তারিখের হরতাল তা পাল্টে দিয়েছে। এ দিন কোথাও কোন গাড়ি ভাঙচুর করা হয়নিজ্বালিয়ে দেয়া হয় নিভীতি সঞ্চার করা হয়নি। পিকেটার বলতে যা বোঝায় তেমন কাউকে দেখা যায় নি। তবে পিকেটারদের মতো যে তরুণরা রাজপথে ছিলেন তাদের হাতে লাঠিরামদা,চাপাতিইট-পাটকেলককটেল-পেট্রোলের বোতলের পরিবর্তে শোভা পেয়েছে গিটার,হারমোনিয়ামতবলাবাঁশি। তাদের কণ্ঠে ছিল জাগরণের গানদেশের গানভালবাসার গান। োগানের বদলে ছিল বিদ্রোহের কবিতাঅবিনাশী পংক্তিমালা। মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবেই সাড়া দিয়েছে হরতাল আহবানে। টিভিতে দেখলাম অনেকে এমন হরতালকে এক কথায় স্বাগত ও দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম হরতাল পালনের পর কোন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধন্যবাদ জানালো।

হরতাল যে কোন গণতান্ত্রিক দেশের প্রতিবাদের পন্থা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যে সব দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা পায়নি পূর্ণঙ্গভাবে। এবং নির্বাচিত সরকারগুলো অনেক সময় গণতান্ত্রিক পথে চলে না যেখানে হরতালের মতো কর্মসূচি না দিয়ে বিরোধীদলের উপায়ও থাকে না। মহাত্মা গান্ধীও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হরতাল কর্মসূচি পালন করেছেন। বাংলাদেশের দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে হরতালের অসামান্য অবদান অস্বীকার করারও উপায় নেই। স্বাধীন দেশে এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ৭২ ঘণ্টার হরতালও পালিত হয়েছে। সে পর্যন্ত হরতালের কিছুটা জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু এরপর থেকে হরতাল তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে। অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হরতাল মূলত ভয়তাল বা আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। পিকেটিং ভয়াবহ ও নির্মম হয়ে ওঠে। জনগণের মধ্যে হরতাল বিরোধী মনোভাবও জাগ্রত হতে থাকে। এবং সবশেষে হরতালকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠতে থাকেদেশের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে। অনেকে আবার এর বিরুদ্ধে মতামতও ব্যক্ত করেন। হরতাল বন্ধ করাকে মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো হটকারীতা বলে অভিহিত করেছেন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলো প্রথম বেশ ক’টি হরতাল পালন করেছে সম্পূর্ণ ব্যক্তি ও পরিবারিক কারণে। জনগণের কোন দাবি নয়,তাদের নেত্রীর বাড়ি রক্ষা থেকে শুরু করে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত নেতাদের মুক্তির দাবিতে। আর বর্তমানে জামাত-শিবির-বিএনপির সমর্থনে হরতাল করছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও বিচারের সম্মুখীন জামাতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে। গত কয়েক মাসের এসব আন্দোলনহরতাল ধ্বংস,মৃত্যুহত্যা-হামলা ও হিংস্রতার দিক দিয়ে পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে ব্যাপক। এমন কি এসব হরতাল ও আন্দোলনে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর পরিকল্পিত ও চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হয়েছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে জামাত-শিবিরের এমন হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ যখন ক্রমশ উদ্বিগ্নবিরক্ত ও বিরূপ হয়ে উঠছিল যে সময়ে এবং বিশেষ করে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে হঠাৎ সিপিবি-বাসদের এই হরতাল কর্মসূচি ঘোষণায় দেশের অনেক মানুষ কিছুটা বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু এসব বাম নেতাদের হরতাল আহবানতাতে অংশগ্রহণের জন্যে জনগণের প্রতি আবেদন এবং হরতালের জন্যে কাওকে বাধ্য না করে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস হরতাল পালন সাধারণ মানুষ বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান হিংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিরাট প্রভাব ফেলেছে। হরতাল যদি যৌক্তিকন্যায় সংগতসময়ানুগ হয় সে হরতাল পালনের জন্য পিকেটিংয়ের প্রয়োজন হয় না। জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক কিছু করার প্রয়োজন হয় না। জামাতের এতদিনের নৈরাজ্যকর কর্মসূচির মুখে এ হরতাল শান্তিকামী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। আমার ধারণা এমন হরতাল বাংলাদেশে আগামীদিনের হরতালকে জটিল করে তুলবে।

অনেকের মতো আমিও বিশ্বাস করিজামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা কোন বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে না। নিষিদ্ধ হলে এই দল অন্যদল বা অন্য নামে দেশে একই ধরনের রাজনীতি করে যাবে। এবং এর দ্বারা সমস্যারও পূর্ণ সমাধান করা যাবে না। বরং সেক্ষেত্রে ’৭২ এর সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিই নিষিদ্ধ করা উচিৎ। ‘ধর্ম যার যাররাষ্ট্র সবার’ এই আদর্শের ভিত্তিতেই রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিৎ। বর্তমানে জামাত ছাড়াও অনেক ধর্মভিত্তিক দল বিদ্যমান যারা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায়। নির্দিষ্ট কোন দল নয়ব্যবস্থার পরিবর্তন করেই দেশে মৌলবাদী শক্তিকে রোখা সম্ভব।

আমি নৈরাশ্যবাদী নই। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশও ঠিকই একদিন উঠে দাঁড়াবে। স্বাধীনতার পর বিগত একচল্লিশ বছরে দেশ ও দেশের মানুষের অর্জনও কম নয়। আমি মনে করি দেশের এমন একটি দিক নেই যেখানে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়নি।

সাধারণ মানুষগুলোর এই অসাধারণ কৃতিত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতো দেশের রাজনীতি যদি সঠিকভাবে চলতো। ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি যদি লোপ পেতো। শীর্ণদেহী পোশাককর্মী আর বিদেশের মাটিতে মানবেতর জীবন যাপন করে যারা দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান সম্মানজনক পর্যায়ে এনেছেন তাঁদের ত্যাগ বৃথা যেতে পারে না।

আমার বিশ্বাস ১৮ তারিখের হরতাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তথা মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়কে সফল করতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।



লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১২

বিশ্বজিৎ হত্যার দায় কার?

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                                 কাল আজ কাল
১৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ সাল ‌২৮ মহররম ১৪৩৪ হিজরি                      
* কামরুল হাসান বাদল

কচু কাটা কখনো দেখিনি। তবে আন্দাজ করতে পারি। কচু গাছের কচি কচি ডগাগুলো খুব সহজেই কাটা যায়। এক কোপে অনেক ডগা। সাপ পেটানোও দেখিনি। তবে জানি তা খুব নির্দয়ভাবে। গত রোববার বিএনপি-জামাতের ডাকা অবরোধের দিন নিরীহ নিরপরাধ বিশ্বজিৎকে যেভাবে কোপানো হয়েছে বুঝতে পারছি না তাকে কীসের সাথে তুলনা করব। বিশ্বজিতের ওপর হামলার দৃশ্য ক’দিন ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছেপত্রিকায় ছবি ছাপানো হচ্ছে। আমি এর কোনটিই দেখতে পারিনি। হয়ত ভীরুকাপুরুষ বলে। সাহস নেই বলে। আসলে আমার সাহস নেই মানুষের ওই উন্মত্ততা দেখবার। আমার সাহস নেই মানুষের এই নির্মমতানিষ্ঠুরতা দেখবার। মানুষের হিংস্রতা দেখবার। আমি মনেপ্রাণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। আমি তাদের এবং তাদের রাজনীতিকে ঘৃণা করি। কিন্তু তাই বলে আমি কখনোই চাইবো না এদেশের কোন যুদ্ধাপরাধীর এমন (পরিণতিহোকএমন করে তাকে হত্যা করা হোক। আমি এবং আমার মত লক্ষ কোটি সভ্য মানুষ বিচারের মাধ্যমে তাদের সাজার নিশ্চয়তা চাই। বিশ্বের কোন কুখ্যাত খুনী বা দুর্ধর্ষ অপরাধীরও এমন মৃত্যু কামনা করি না।

দুঃখিতবিশ্বজিৎ মৃত্যুর সময় জানতেও পারলো না কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। তার কোন অপরাধ ছিল না। অবরোধকারী কিংবা অবরোধবিরোধী কোন পক্ষেই তার অবস্থান ছিল না।তবুও তাকে মরতে হলো। আমাদের নষ্ট রাজনীতিআর হানাহানির সংস্কৃতির বলি বিশ্বজিৎ দাস।

গত কিছুদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনপ্রচলনের দাবি আর জামাতের তাদের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিযারা বর্তমানে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে বিচারের সম্মুখীনএকীভূত হয়ে পরিস্থিতি বিপজ্জনক করে তুলছিল। গত কয়েকদিন জামাত-শিবির সারাদেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তারা জ্বালাও-পোড়াও নীতি গ্রহণ করে প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও গাড়ি ভাঙচুরঅগ্নিসংযোগ এবং বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালাচ্ছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতেবর্তমান বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবার অভিপ্রায়ে তাদের এসব কর্মসূচিকে নীতিগত বা নৈতিক সমর্থন দান করে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। এভাবে তারা একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে উন্মত্ত-হিংস্র একদল কর্মী বাহিনীকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে নিরীহ মানুষের গাড়ি ভাঙচুর,অগ্নিসংযোগ তথা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দিয়ে নিজেরা গা ঢাকা দিয়েছে। নিজেদের গাড়ি গ্যারেজে রেখে জনগণের গাড়ি ভাঙার উৎসবে মেতেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা জনগণের সম্পদ ধ্বংস করছে।বিএনপির এই আচরণে আমরা বিস্মিত নই। এটাই স্বাভাবিক। যে বিএনপি বা তাদের প্রতিষ্ঠাতার করুণায় জামাতের রাজনীতি করার সুযোগ হয়েছে। যে দলের প্রত্যক্ষ মদদেপ্রশ্রয়ে ও কল্যাণে জামাত সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে। মন্ত্রীত্ব পেয়েছে সে জামাতের দুঃসময়ে বিএনপি দূরে দূরে থাকবে তা বোধহয় একজন বোকাও বলতে চাইবে না। অতএব হিসেবটি সোজা। বিএনপি তার পুরোনো রাজনৈতিক মিত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে। ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষিত হওয়ার আগে যুগপৎ মরণ কামড় দেয়ার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে বিএনপি কোন নীতি আদর্শের ধার ধারে না। (বস্তুত বিএনপির নীতি ও আদর্শই বা কী তা এখনো পরিষ্কার নয়যতটা পরিষ্কার জামাতে ইসলামীর।)

কথায় বলেটাকা যখন কথা বলে ঈশ্বর তখন চুপ করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশসমূহে এখন জামাতের টাকা কথা বলতে শুরু করেছে। গত প্রায় সাড়ে তিন দশকের অর্জিত অর্থ সম্পদ এখন তারা বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত নিজেদের নেতাদের রক্ষা করতে। এতে যে তারা ব্যর্থ নয় তার প্রমাণ দি ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদন। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি স্কাইপে আঁড়ি পাতা এবং তা তাদের সমর্থিত একটি পত্রিকায় প্রকাশ করা। যে বিতর্কে শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেছেন। আইনমন্ত্রী যাই বলে থাকুন না কেন এখন এই বিচার প্রক্রিয়ার পরিণতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও উৎকক্তা বাড়বে বৈ কমবে না।

ফিরে আসি বিশ্বজিৎ হত্যার প্রসঙ্গে। এ বিষয়ে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সরকারের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই। স্বাভাবিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেখানে কীভাবে নয়া নিয়োগপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুবলীগের অনুষ্ঠানে গিয়ে জামাত-শিবিরকে ঠেকাতে যুবলীগ কর্মীদের মাঠে নামার আহবান জানাতে পারেনঅবশ্য একই অনুষ্ঠানে যুবলীগ প্রধান ওমর ফারুক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বলেছেন,জামাত-শিবিরকে ঠেকানো পুলিশের কাজযুবলীগ কর্মীদের নয়। তিনি বা যুবলীগ তাঁর এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বিচক্ষণতারই পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি জামাত তথা বিরোধীদলের অবরোধ কর্মসূচির দিন কোন যুক্তিতে ছাত্রলীগকে মাঠে নামানো হল। গত রোববার বিএনপি-জামাত জোট যে নৈরাজ্য ও ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল দেশের জনগণের সাথে বিশ্ববাসীও তা অবলোকন করেছে। কিন্তু এক বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ড বিরোধী দলের সকল অপকর্মকে ঢেকে দিয়ে ছাত্রলীগের ভূমিকাকে নিন্দনীয় করে তুলেছে। নিষ্ঠুর এই হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন তারা ছাত্রলীগের বহিস্কৃত নেতা কর্মী। যদি তাই হয় তাহলে ওদের বাঁচাতে পুলিশ এত তৎপর কেনস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন না। পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রাখছেন কেনবিএনপির মহাসচিবকে গ্রেফতার করা হলো। তার গ্রেফতারের প্রতিবাদে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং তা বিএনপিকে আরো সুযোগ তৈরি করে দেয়া হবে জেনেও কেন এই সিদ্ধান্ত নেয়া হল। ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধানকে গ্রেফতার করা গেলে বিশ্বজিতের হত্যাকারীদের গ্রেফতারে পুলিশের গাফিলতি কেনবিএনপি নেতা-কর্মীদের প্রতি পুলিশ এমন আচরণ করলেও জামাত-শিবিরের কর্মসূচির সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে কীভাবে। শিবিরের মার পুলিশ হজম করে কীভাবেতবে কি পুলিশের ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ শিথিল?

এবার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে সংসদ নির্বাচনের দাবি করছেন এবং তার জন্যে দেশকে এক প্রকার গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন সেই সংসদেইতো আপনি ও আপনার দল উপস্থিত থাকেন না। আগামীবার জয়ী হবেন তেমন নিশ্চয়তা কি পেয়েছেন। জিতলে ঠিক আছেহারলে কি এখনও এভাবে সংসদ বর্জন করবেনদাবি করেন জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষকসেক্টর কমান্ডার। দাবি করেন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসাবে। শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করেন জাতীয় স্মৃতি সৌধে। শিখা অনির্বাণে। তাহলে আপনার স্বামী যুদ্ধ করেছিল কাদের বিরুদ্ধে। আপনার স্বামীতো বিজয়ী দলের। সে যুদ্ধে পরাজিত শক্তি কারা?

শুরু করেছিলাম বিশ্বজিতের হত্যা প্রসঙ্গ নিয়ে। আমরা জানি না যে পরিস্থিতির উদ্রেক হয়েছে দেশে তাতে ভবিষ্যতে আরও কত বিশ্বজিৎকে প্রাণ দিতে হতে পারে। নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে যারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি প্রস্তুত করছেন তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চাই এই রক্তই একদিন বড্ড পিচ্ছিল করে তুলবে ক্ষমতার সিঁড়িকে। তাতে যে কোন সময় পা ফসকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। হত্যাকারী যে বা যে দলের হোক। বিশ্বজিৎ হত্যার সঠিক ও দ্রুত বিচার চাই।



লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১২

বাংলাদেশ কি হেরে যাবে? ( প্রথম পর্ব )

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                        উপসম্পাদকীয়                             সমসাময়িক
চট্টগ্রাম, বুধবার ১২ ডিসেম্বর ২০১২, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪১৯  
* কামরুল হাসান বাদল

যে লক্ষ্য, আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্থাৎ এদেশের প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্জনের পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হতে পারে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী, অবিনশ্বর ও প্রবহমান।এই মহান মুক্তিযুদ্ধকে যারা শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইতি টানতে চান তারা কার্যত ইতিহাস বিকৃত করছেন। আপোস করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এরা বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামকে অস্বীকার করতে চান মূলত হীন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এঁরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার বেনিফিসিয়ারি। এঁদের প্রশ্রয়ে, অভিভাবকত্বে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা এদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে।

‘৭২ এর সংবিধানের প্রস্তাবনা, আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া (জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের) মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’

১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান ও তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টারা সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এর সাথে সাথে প্রস্তাবনায় একটি ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেন। ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম, এর স্থলে প্রতিস্থাপিত করেন ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ’। এই বিশাল কারচুপি কিংবা শঠতা সাধারণভাবে খেয়াল করার মতো নয়। অর্থাৎ একজন সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টির তারতম্য বুঝে ওঠার কথা নয়। কিন্তু একজন সচেতন মানুষ মাত্রই অনুধাবন করতে পারেন কিংবা পেরেছেন যে, এই ছোট্ট একটি পরিবর্তনের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস, আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও ত্যাগকে কীভাবে অস্বীকার বা বিকৃত করা হয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি তখন কিন্তু শুধুমাত্র একাত্তর সালের নয়মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের কথাই শুধু বলি না।

 আমরা তখন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আন্দোলন, সংগ্রাম সবকিছু নিয়ে বলি। দীর্ঘকাল বাঙালি পরাধীন ছিল। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন শাসক ও বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত হয়ে শাসিত হয়েছে শুধু।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ অর্জন করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে এই জাতিকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। নেতাজী সুভাষ বসু, বিপ্লবী সূর্যসেন কিংবা ’৪০ এর ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব কোনটিই বিচ্ছিন্ন নয়।

 আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে ’৪৭ এর দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা এদেশের বাঙালির ওপর উর্দুভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এর পেছনে তাদের অভিসন্ধি অত্যন্ত পরিষ্কার। একটি সংস্কৃতির প্রধান বাহন হলো তার ভাষা।

আর এই ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে সে জাতিকে তার মূল সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা। পরজীবী ও সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তু করে তোলা। কাজেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে যারা বুকের রক্ত দিয়েছে তারা শুধু মাতৃভাষার অধিকারই আদায় করেনি সে সাথে তারা বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য এককথায় সংস্কৃতিকেই রক্ষা করেছিল। যে কারণে আমি বায়ান্নের সেই আন্দোলনকে শুধু ভাষা আন্দোলন না বলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। বায়ান্নে যদি বাঙালিরা ব্যর্থ হতো তবে এত তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হতো কিনা তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ রয়েছে।

 অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয় বায়ান্নের সাফল্যই বাঙালির বুকের সুপ্ত স্বপ্ন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলেছে। এরপরের ইতিহাস স্বাধীনতা ও মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ৬দফা আন্দোল, ’৬৭ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন, ’৭১ এর অসহযোগ আন্দোলন ও সবশেষে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

 বাঙালির এই সুদীর্ঘ সংগ্রামকেই আমরা মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করি। আমরা বিশ্বাস করি ’৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধ, যা সশস্ত্র যুদ্ধ ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের সাথে সাথে সমাপ্ত হয়েছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। যে লক্ষ্য, আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্থাৎ এদেশের প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্জনের পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হতে পারে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী, অবিনশ্বর ও প্রবহমান।

এই মহান মুক্তিযুদ্ধকে যারা শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইতি টানতে চান তারা কার্যত ইতিহাস বিকৃত করছেন। আপোস করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এঁরা বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামকে অস্বীকার করতে চান মূলত হীন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার বেনিফিসিয়ারি। এঁদের প্রশ্রয়ে, অভিভাবকত্বে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা এদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে।

প্রিয় পাঠক এ কথাগুলো আপনারা বহুবার শুনেছেন, পড়েছেন, জেনেছেন। নতুন করে বলতে হলো এই কারণে যে, আমাদের প্রবহমান মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায় অর্থাৎ একাত্তরের পরাজিত শত্রু, যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।

বর্তমান সরকার এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় এসেছে। কাজেই এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ না করে তাদের গত্যন্তরও নেই। কিন্তু বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ মনে হয় বাস্তবিক ততটা নয়। কারণ স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪১ বছরে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বহুধা-বিভক্ত হয়েছে আর অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পাকাপোক্ত হয়েছে।

পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের আর্থিক সহায়তায় এই শক্তি দেশে বিদেশে প্রভূত সম্পদের মালিক হয়েছে। এদের নেতাকর্মীরা অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে বিরাজ করছে। তাছাড়া এ ধরনের অপরাধের বিচার করার অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য যথেষ্ট না থাকা এবং বিষয়টিকে অধিক গুরুত্বের সাথে না নেওয়ার কারণেও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর হয়নি। সে সাথে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি তার দীর্ঘদিনের পুরোনো মিত্র জামায়াত ও তার অভিযুক্ত শীর্ষ নেতাদের রক্ষা করতে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামায় এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনে।

গত কয়েক মাস ধরে চলে আসা প্রধান বিরোধীদলের আন্দোলন- সংগ্রাম-বক্তৃতা-বিবৃতি এবং সর্বশেষ গত কয়েকদিন ধরে চলে আসা জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব এবং তাতে বিএনপির নৈতিক সমর্থন দানের পরে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের যুদ্ধে বাংলাদেশ কি হেরে যাবে?  (আগামী সপ্তাহে সমাপ্য)


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১২

নৈতিক সমর্থন, খালেদার ভাষণ ও বউ তালাকের গল্প

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                               কাল আজ কাল      

৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২২ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ সাল ‌২১ মহররম ১৪৩৪ হিজরি
* কামরুল হাসান বাদল

বিএনপির নৈতিক সমর্থনে জামাত-শিবিরের আরেকটি অনৈতিক হরতাল পালিত হল দেশে। বাংলাদেশে হরতাল মানে জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর আর সরকারি তথা জনগণের যানমালের ক্ষয়ক্ষতি। এই হরতালও তার বাইরে নয় বরং তা কয়েক মাত্রায়, রূপে ও দাবিতে ব্যতিক্রম। এই হরতাল নিয়ে লেখার আগে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অতি সাম্প্রতিক একটি ভাষণ নিয়ে কিঞ্চিত আলোকপাত করি।
নারায়ণগঞ্জ শহরের মণ্ডলপাড়ায় গতকাল ঝটিকা মিছিল থেকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা পুলিশের চার সদস্যকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে এবং ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। ছবিতে আহত এক পুলিশ সদস্যকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে




কয়েকদিন আগে বরিশালের জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া জনতার উদ্দেশ্যে বলেছেন আগামী নির্বাচনে তাকে ও তার দলকে জয়যুক্ত করতে। অন্তত একবার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছেন ক্ষমতায় গিয়ে যদি ব্যর্থ হন তাহলে ভবিষ্যতে আর কোন দিন ভোট চাইবেন না। জনতার মুখোমুখী দাঁড়াবেন না। শুনে খুব ভাল লাগার সাথে সাথে গ্রাম বাংলায় প্রচলিত একটি গল্প মনে পড়ে গেল। গল্পটি এমন,- একলোক- কথায় কথায় তার বন্ধুর সাথে বাজি ধরে বললো, যদি তুই ব্যাপারটা আমাকে বোঝাতে পারিস তাহলে আমি বউ তালাক দেবো। বন্ধুও বাজিতে রাজি। বাজির কথা চারদিকে খুব সহসা চাউর হয়ে গেল। লোকটি বাড়িতে ফেরার আগেই সে কথা গিয়ে পৌঁছলো তার বউয়ের কাছে। লোকটি ঘরে এসে দেখে তার বউ কান্নাকাটি করে একসা। ছোট ছোট বাচ্চা দুটির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। স্বামী ফিরতেই বললো এই রইল তোমার সংসার, আমি চললাম বাপের বাড়ি। যে লোক সামান্য বাজিতে হারলে বউ তালাক দেয়ার কথা বলে তার সাথে আর সংসার কীসের। আমারতো কোন দাম নাই। তুমি থাকো তোমার সংসার নিয়ে আমি আমার ছেলেদের নিয়ে বাপের বাড়ি চললাম। শুনে স্বামী হাসতে হাসতে বললো দূর বোকা। তুমি যাবে কোন দুঃখে। বাজিতে আমি হারবো না কি। সে দুই বছর ধরে আমাকে বুঝাক না তাতে কী, আমি বুঝলে তো!

বেগম জিয়া বলেছেন ‘যদি ব্যর্থ হই’। পাঁচ বছর পরে সারা দেশের মানুষ ‘আপনি ব্যর্থ: আপনি ব্যর্থ’ বলে চিৎকার করলে তো হবে না। তাকে স্বয়ং বুঝতে হবে তিনি ব্যর্থ। আর তা না হলে--? বাংলাদেশে কে কখন ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছে? এমন কি ব্যর্থতার স্বীকার করেছে? তিনি তার ভাষণে ভবিষ্যতে ব্যর্থ হলে কী করবেন তা বলেছেন কিন্তু অতীতের কোন ব্যর্থতার কথা তো স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন নি। তা হলে কি অতীতে তাঁর বা তাঁর সরকারের কোনরূপ ব্যর্থতা, দুর্বলতা বা অপরাধ ছিল না? ভুল ছিল না? তিনি অতীতের কোন কিছুর জন্য ক্ষমা চান নি। বরং ভবিষ্যতে ব্যর্থ হলে তাঁর বিচারের ভার দিয়েছেন জনগণের ওপর। তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়াল যে তাঁর গত পাঁচ বছরের শাসনামলে যা যা ঘটেছে তার সবকিছুই সঠিক ছিল এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে? তার মানে আবার সারাদেশে জঙ্গি উত্থান। ৬৩ জেলায় একযোগে বোমাবাজি, বোমা ফাটিয়ে বিচারক হত্যা, গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে ২৬ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটানো। সাবেক অর্থমন্ত্রী হত্যা, আহসানউল্লা মাস্টার হত্যা। গির্জা, সিনেমা হল, রমনার বটমূলে, উদীচী ও সিপিবি সমাবেশে বোমা হামলা। বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলা। দশ ট্রাক অস্ত্র খালাস মামলা, বাংলা ভাইয়ের উত্থান, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার। হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক দুঃশাসন ইত্যাদি কোন ভুল বা খারাপ কাজ নয় বরং ভবিষ্যতে আবার ক্ষমতায় গেলে এ সমস্ত চালু হওয়ার পাশাপাশি নতুন কিছু সংযোচিত হওয়া? যেহেতু তিনি অতীতের কোন কৃতকর্মের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চান নি, নিদেন ভুল স্বীকার পর্যন্ত করেন নি তার মানে আমরা ধরে নেবো বিএনপির গত পাঁচ বছরের শাসনামলের তাদের কৃত আচরণের কোন পরিবর্তন হবে না। যদি তাই-ই হয় তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের দোষ কোথায়। তাদের ব্যথতাই বা কী? বিএনপি আমলের দুর্নীতির সাথে যদি বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি কাটাকাটি হয়ে সমানও হয় অন্যসব ক্ষেত্রেতো বর্তমান ক্ষমতাসীনরাই এগিয়ে। কৃষি, শিক্ষা, মানব উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, অবকাঠামো, আইনশৃংখলা, পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অগ্রগতি তো ঈর্ষণীয়, যা তুলনামূলকভাবে গত চল্লিশ বছরে হয়নি। প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বোমাবাজী থেকে দেশতো এখনো মুক্ত। মতিউর রহমান নিজামী বা সাকার গাড়িতে তো আর জাতীয় পতাকা উড়ছে না। রাষ্ট্রীয়ভাবেতো সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানী দেয়া হচ্ছে না। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি চর্চাতো সদা বহমান। দলিত তো হচ্ছে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বিকৃত হচ্ছে না ইতিহাস। কীভাবে এবং কোন উপায়ে খালেদা জিয়ার বা তার দল দেশে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করবেন? তার ব্যাখ্যা পেলে খুশী হতাম। কারণ তিনি (খালেদা জিয়া) নিজেই বলেছেন তার ছেলে তারেক রহমান অত্যন্ত সৎভাবে জীবন যাপন করতেন। তারেক রহমানের জীবন যাপন ও তার কর্মকাণ্ড যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের কি বিশ্বাস করতে হবে বেগম জিয়ার এই কথাকে? এদেশের মানুষ কি এত সহজে হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অনাচারের কথা ভুলে যেতে পারবে? গত মঙ্গলবারে জামাতের আহুত হরতালে নৈতিক সমর্থন দিয়ে বিএনপি আবার প্রমাণ করেছে তারা অতীতের রাজনীতি থেকে একচুলও সরে আসে নি। বরং ’৭৫ এর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে জেনারেল জিয়া-জামাতের প্রতি যে নৈতিক সমর্থন দিয়ে, অর্থ দিয়ে, প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে এদেশে ওদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন ভবিষ্যতেও সে ধারা অব্যাহত থাকবে। এবং বর্তমানে জামাতের শীর্ষ নেতা যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে বর্তমানে বিচারের সম্মুখীন তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে। এই বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে।

আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে বাধ্য। কারণ তারা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছ থেকে সেই ম্যান্ডেট নিয়েছে। অর্থাৎ এই বিচার প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ একটি পক্ষ। স্বাভাবিকভাবে তারা প্রতিপক্ষকে দুর্বল ও ঘায়েল করার চেষ্টা করবে। জামাত-শিবির যদি এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের মুক্তির দাবিতে অযৌক্তিক আন্দোলন করে দল বা প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগ তা প্রতিরোধের চেষ্টা করতেই পারে। বরং অন্যপক্ষ হিসেবে জামাত পর্যবেক্ষণ করতে পারে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে কিনা। তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হচ্ছে কি না। যে আইনে বর্তমান ট্রাইব্যুনাল বিচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তা বিশ্বের অন্য যে কোন এ ধরনের আদালতের চেয়ে অনেক উদার। কারণ একমাত্র বাংলাদেশে এই অপরাধীদের আপিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। যা বিশ্বে অন্য কোন ট্রাইব্যুনালে ছিল না। এবং যে আদালত বলতে পারে রায় ঘোষিত হওয়ার আগে এদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সম্বোধন না করতে সে আদালতের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর।

অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে যুদ্ধাপরাধীদের যারা বাঁচাতে চায় তারা হয়ত জানে না যে, এই দেশে দানা বেধে ওঠা কোন আন্দোলন বা জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের কোন আন্দোলন অতীতে বিফল হয় নি, অতএব ভবিষ্যতেও বিফল হবে না।
দেশের মানুষ কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয় নি।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১২

খালেদার ভারত সফর এবং জামায়াতের মারদাঙ্গা আচরণ

দৈনিক আজাদী                                   উপ-সম্পাদকীয়                        কাল আজ কাল
৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৪ কার্তিক ১৪১৯ সাল ‌২২ জিলহজ ১৪৩৩ হিজরি 

কামরুল হাসান বাদল

গত কয়েকদিন ধরে বেগম খালেদা জিয়ার ভারত সফর নিয়ে সারাদেশে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে সংবাদ মাধ্যম সবখানেই আলোচনা, তর্ক ও যুক্তি পাল্টা যুক্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছিল সফরটি। এর অবশ্য কারণও আছে। বিএনপি তথা জাতীয়তাবাদী দলের প্রায় সাড়ে তিন দশকের ইতিহাসে মৌলিক নীতি পরিবর্তনের মত কথা বা সিদ্ধান্ত (আগে) শোনা যায় নি। এক আধটু রাজনীতির খবরও যারা রাখেন তারা জানেন যে, ভারত বিরোধীতার স্লোগান দিয়ে, নীতি নিয়ে এবং জনগণের মাঝে ভারতবিরোধী মনোভাব জাগিয়ে দিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। যে কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, চৈনিক বিপ্লবী (এঁরাও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এক প্রকার) এবং মুসলিম লীগ ঘরানার রাজনীতিক, যাঁরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে কোন কারণে ভারতকে দোষারোপ করতে অভ্যস্ত ছিলেন, প্রথম থেকেই বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠা প্রকৃতপক্ষে এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের ধড়ে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিল। এই দলকে অবলম্বন করেই দেশে রাজাকার আলবদর শান্তি কমিটিসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা সংগঠিত, পুনর্বাসিত হওয়া ও পরবর্তীতে স্বাধীন দেশের ক্ষমতা ভোগের সুযোগ পেয়েছিল। 

   এই দলটির দ্বারাই মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর ভারত যেহেতু মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী অন্যতম দেশ সেহেতু অপছন্দ বা গালাগালি বা বিরোধীতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে ভারত। এই বেগম জিয়া, তাঁর দলের অন্যান্য নেতা, কর্মী সমর্থক ও তাঁর জোটের শরীকরা বরাবরই বলে এসেছেন আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে কাফের হয়ে যাবে, ঈমান চলে যাবে, বাংলাদেশ ভারত হয়ে যাবে। মসজিদে নামাজের পরিবর্তে পূজা হবে, আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে ইত্যাদি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার শান্তি বাহিনীর সাথে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদনের আগে পরে খালেদা জিয়া স্বয়ং বলেছিলেন, এই চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয় দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের পরে দেশে বিদেশে জানাজানি হয়ে গেল তৎকালীন বিএনপি জামাত জোট সরকার কীভাবে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করে আসতো। সে সময় এই অস্ত্র সরবরাহের পক্ষে বলতে গিয়ে অনেক বিএনপি নেতা ও তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বলার চেষ্টা করেছেন যে, ওরা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, তারা স্বাধীনতাকামী। আমরা (তাঁদের ভাষায়) যেহেতু যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি সেহেতু অন্য স্বাধীনতাকামীদের সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব। তৎকালীন পত্র পত্রিকা খুঁজলে এর স্বপক্ষে প্রমাণও পাওয়া যাবে।

ভারত বিরোধীতায় তিনি বা তাঁর দলের এই যখন অবস্থান তখন তিনি বা তাঁর দলের হঠাৎ ভারতনীতির পরিবর্তনে হতচকিত দেশের সচেতন মহল। এতদিনের ভারতবিদ্বেষ ভুলে খালেদা জিয়া ভারতে শীর্য পর্যায়ে অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার সাথে সাক্ষাৎ করে অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর কথা বলেছেন। ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের মাটি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহারের সুযোগ না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া অন্য যা সব বলেছেন তা মোট কথায় বলতে গেলে তা ভারতের কাছে এক প্রকার দাসখত লিখে দেয়ার মত করেছেন। এ নিয়ে তাঁর দলের নেতারা বিশেষ করে মওদুদ আহমেদদের মত ক্ষমতালোভীরা রীতিমত ক্ষমতার সিংহাসনে বসার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন, আওয়ামী লীগকে শূন্য হওয়ার আগে অন্তত বিরোধী দল হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখার আহবান জানিয়েছেন।
ভারতের এই সফরকে অত্যন্ত সফল বলে অভিহিত করে তাঁর দলের নেতারা আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করার শতভাগ আশাবাদী হয়েছেন। মওদুদ আহমেদ প্রগলভ হয়ে বলেছেন এই সফরের ফলে আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। মোট কথা খালেদা জিয়া এই ভারত সফর তাঁর দলকে একপ্রকার উজ্জীবিত করছিল বলেই মনে হচ্ছিল গত ক’দিন। দেশের শান্তিকামী ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। কারণ বিএনপির অহেতুক ভারত বিরোধীতা সুস্থ কোন রাজনৈতিক আচরণ ছিল না। তাছাড়া দেশের একটি অন্যতম প্রধান দলের সাথে প্রতিবেশী বিশেষ করে ভারতের মত একটি বৃহৎ দেশের সাথে সদ্ভাব থাকাই বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে ভারতের নীতি পরিবর্তনের আভাসও পাওয়া গিয়েছিল। প্রতিবেশী দেশের শুধুমাত্র একটি দলের সাথে সদ্ভাব বজায় না রেখে সব দলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে ভারতের আচরণ দেখে। এই বিষয়টিও মন্দ নয়। ভারত তার স্বার্থে সব দলের সাথেই সুসম্পর্ক রাখতে চায়।
কিন্তু গত মঙ্গলবার বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রাক্তন মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির ভারতনীতির কোন পরিবর্তন হয় নি। খালেদা জিয়ার ভারত সফর নিয়ে জামায়াতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তারা ভারতের সাথে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনঢ় আছেন ইত্যাদি। তবে যে, ভারতে গিয়ে খালেদা জিয়া অতীত ভুলে যাওয়ার কথা বলে পক্ষান্তরে অতীতে তাঁদের ভুল স্বীকার করে এলেন এবং অন্যান্য অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেন তার কী হলো? বিএনপির মঙ্গলবারের বক্তব্যের সাথে তো গত কয়েকদিনের কথাবার্তা, বক্তৃতা বিবৃতির মিল নেই। তার মানে বিএনপি এখনো জামাতকে ঘাটাতে বা চটাতে চাইছে না। বা বিএনপি বুঝতে পেরেছে ভারত বিরোধীতাই তার রাজনীতির মূল শক্তি? তার মানে ভারত নিয়ে বিএনপি গত সাড়ে তিন দশক যা করেছে। বলেছে তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে? ক্ষমতায় গেলে উলফাকে অস্ত্র যোগাড়ের ব্যবস্থা করে দেবে খালেদার সরকার? বিষয়টি গোলমেলে করে ফেলেছেন বিএনপি নেতারা। তাঁরা ভারতে থাকতে একরকম বলেছেন এখন দেশে এসে অন্যরকম বলছেন। মঙ্গলবারের এই ব্রিফিংয়ে খালেদা জিয়ার অন্যতম সফরসঙ্গী শমসের মোবিন চৌধুরী উপস্থিত থাকলেও তাঁকে বেশি কিছু বলতে দেখা যায় নি।
ভারতে খালেদা জিয়ার এই সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের ভেতরেও যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা গোপন থাকে নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ও দলের সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তাকে এক কথায় রাজনীতি সুলভ বা বিজ্ঞজনোচিত বলা যাবে না। আশরাফ সাহেব বলেছেন, খালেদা জিয়া ভারতে গিয়ে কার কার সাথে কী কী বলেছেন সবই তাঁদের জানা আছে প্রয়োজনে তা প্রকাশ করা হবে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলে একটি কথা আছে। বর্তমান নেতাদের কথাবার্তা শুনে মনে হয় এসবের বুঝি দাফন হয়ে গেছে। আশরাফ সাহেব কি সত্যিই আলোচনার বিষয়গুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারবেন? তা কি সম্ভব? প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রের মত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আওয়ামী লীগ তথা সরকার পক্ষ তাদের দুর্বলতাই প্রকাশ করেছে। বোকারা জানে না কখন কথা বলতে হয় কখন চুপ থাকতে হয়। গত কয়েকদিন ধরে সারাদেশে একযোগে জামাত শিবির হাঙ্গামা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলেছে। তারা উস্কানিমূলকভাবে পুলিশকে আক্রমণ করছে। সাধারণ মানুষের সম্পদ নষ্ট করছে, যানবাহনের ক্ষতি করছে। রাস্তায় রাস্তায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যতই পরিণতির দিকে যাবে এবং সরকারের মেয়াদ যতই শেষের দিকে যাবে জামাত-শিবিরের এমন কার্যকলাপ ততই বৃদ্ধি পাবে। আমার ধারণা ভবিষ্যতে তা আরো ব্যাপকভাবে হতে পারে। কিন্তু মুশকিল হলো এই অপশক্তিকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করার মতো সাংগঠনিক শক্তি, মনোবল, ঐক্য ও আনুগত্য ছাত্রলীগ যুবলীগের আছে বলে মনে হয় না।
ক্ষমতা অনেক মানবিক গুণাবলী নষ্ট করে হয়ত। 


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১২

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এখনো অপরিহার্য কেন

দৈনিক আজাদী                            উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
১১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৬ আশ্বিন ১৪১৯ সাল ‌২৪ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দুই ধারায় বিভক্ত। একটি ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িকধর্মনিরপেক্ষশোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অন্যটি আধা সামরিকপুরো পাকিস্তানি ভাবধারায় সাম্প্রদায়িক ও লুটেরা শ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য হোক প্রথমটির নেতৃত্বে আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অন্যটির নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। এ পর্যন্ত পড়ে অনেক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে-আওয়ামী লীগ কি লুটেরা নয়বা আওয়ামী লীগে কি সবাই ধোয়া তুলসী পাতাএ বিষয়ে আমার সাফ জবাব হ্যাঁ এবং আছে। বিশদ আলোচনার আগে বিশ্ব বিখ্যাত আরব কবি কাহলিন জিবরানের একটি গল্প বলি। ছোট ছোট কয়েকটি বাচ্চা নিয়ে উপত্যকায় খাদ্য অন্বেষণ করছিল একটি মেষ। এমন সময় একটি বাজপাখি মেষ শাবককে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে আরেকটি বাজপাখি এসে বাধা দেয়ফলে যুদ্ধ লেগে যায় আকাশে দু’বাজপাখির মধ্যে। মেষ শাবকগুলো ভয় পেয়ে মায়ের কাছে ছুটে এসে বললো, ‘ঐ পাখি দুটো বুঝি আমাদের আক্রমণ করতে আসছে।’ শুনে মা বলল ‘‘তোমরা বুঝতে পারছোনা বাছা কোনটি আমাদের আক্রমণ করতে চায় কোনটি চায় বাঁচাতে।” ইঙ্গিতটি যাঁরা বুঝতে পেরেছেন তারা এখানেই পড়া বন্ধ না করে কলামটি দয়া করে শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির যে একটি স্বাধীন মাতৃভূমির প্রয়োজন এবং তা প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব এ বোধ ও সাহসটুকু জুগিয়েছিল ’৫২ এর সফল আন্দোলন। আমি পূর্বে অনেকবার বলেছি যে, ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন স্রেফ রাষ্ট্র ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না। এই দাবিতে আন্দোলন হয়েছে ঠিকই কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেদিনের সেই আন্দোলন ছিল একাধারে ভাষাইতিহাসঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনও। যার কারণে ঐ আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মতো একটি সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষশোষণহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ মূলত সে পথেই যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু ’৭৫ এর মর্মান্তিক ও কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সে যাত্রাপথকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। দেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যাওয়ার সকল প্রকার চেষ্টা করা হয়েছে। কথাটি একজন কট্টর সমর্থকদের মতো শোনাবে তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি আওয়ামী লীগ ও তার নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাঙালির স্বপ্নস্বাধীন মাতৃভূমির স্বাদ এখনো পূরণ হতো না। এবং ’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশকে যে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছিল তাও আওয়ামী লীগ না হলে ঠেকানো যেত না। খোলাসা করে বললে বলতে হয় এখনো বাংলাদেশ যতটুকু বাংলাদেশ আছে তা সম্ভব হয়েছে এখনো আওয়ামী লীগ আছে বলেই। নতুবা এতদিনে এটির পরিণামও পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তানের মতই হতো। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে এদেশে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া যখন নিষিদ্ধ প্রায় তখনও অনেকে বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শকে বুকে লালন করে শুভ দিনের প্রত্যাশা করেছে। জেলে চার জাতীয় নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যেও ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা। তা করা গেলে আরেকটি পাকিস্তান তৈরির পথ অনেকটা সুগম হবে তা বুঝতে ভুল করেনি ’৭৫ এর ঘাতকরা। তাদের সেই অভিপ্রায় সফল ও হতো যদি শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করতেন এবং দলের হাল না ধরতেন। ’৭৫ থেকে ’৮২ এই ক’বছরেই নানা ষড়যন্ত্রেনানা মতবাদে নানা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে যাচ্ছিল। ’৭৫ পরবর্তী হতাশবিভক্তকোণঠাসা ও দুর্বল আওয়ামী লীগকে আজকের এই পর্যায়ে আনার পেছনে শেখ হাসিনার অবদান কম নয়। তা যেমন তার নেতৃত্বের কারণে তেমনি জাতির জনকের রক্ত সম্পর্কের কারণেও। বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতিতে এখনো আওয়ামী লীগের বিকল্প গড়ে না ওঠার দায় আওয়ামী লীগের নয়। এই ব্যর্থতা বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোর। কারণ শুধু ক্ষমতার রাজনীতির জন্যেলুটপাটে অংশ নেয়ার জন্যে যারা আজ আওয়ামী লীগে ভিড়েছে এবং যাদের জন্যে আওয়ামী লীগ আজ বিতর্কিত ও নিন্দিত হচ্ছে তাদের উত্থান ঠেকানো যেত যদি এদেশে একটি দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটতো। অতীতের মতো এখনো দেখতে পাই আওয়ামী লীগকে চাপে রাখতেসঠিক পথে পরিচালিত করতে ১৪ দলের মতো রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন আছে। আমরা এখনো দেখতে পাই বর্তমান মন্ত্রিসভায়ও উজ্জ্বলসফল ও ব্যতিক্রম ব্যক্তিরা কোন একটি সময়ে বাম ঘরানার রাজনীতি করেছেন নতুবা কোন না কোনভাবে যুক্ত ছিলেন। তারপরেও বলতে হয় এদেশে জঙ্গিবাদ ঠেকাতেসাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঠেকাতে আওয়ামী লীগের বিকল্প এখনো নেই। এবং সে আওয়ামী লীগকে একতাবদ্ধ করতেসুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। ১/১১ এর ঘটনা থেকেই আমরা শিক্ষা পেয়েছি হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগকে যোগ্য নেতৃত্ব দেয়ার একক কোন নেতা নেই। আর আওয়ামী লীগ দুর্বল হলেদ্বিধা বিভক্ত হলেএদেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীরই শক্তি বৃদ্ধি হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এটি কোন গণতান্ত্রিক দেশের একটি গণতান্ত্রিক দলের সুস্থ রাজনৈতিক ধারা কিনাআমি নি:সন্দেহে বলবো তা নয়। এমন পরিস্থিতি কাম্যও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির ধারাতো তাই। বাংলাদেশ ছাড়া পার্শ্ববর্তী মায়ানমারভারতপাকিস্তানশ্রীলঙ্কা এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডির জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও রাজনীতি করেছেন দীর্ঘদিন। ভাল হোক আর মন্দ হোক এই পারিবারিক রাজনীতির আবর্তেই চলছে এদেশগুলোর রাজনীতি। তা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। যাক সে কথাএবার অন্য শক্তিটির কথা বলি। অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক ও ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা দল ও সামরিক ছত্রছায়ায় জন্ম নেয়া দলগুলোর কথা যদি ধরি। আরেকটু খুলে বললে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তির কথা যদি ধরি সেখানে নেতৃত্বের কোন সংকট নেই। প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নেতৃত্বে আজ খালেদা জিয়াও যা নিজামীও তা কিংবা তা যেকোন ব্যক্তি,তাকে শিখন্ডি করে এই শক্তির তৎপরতা চলতে কোন বাধা নেই। স্বাধীনতার পরে যে কোনভাবেই হোক জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করে এসেছে। এবং দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল ও মিথ্যা ইতিহাস শুনিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তৈরি করা হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ বিরোধী যেকোন শক্তিকে সমর্থন দেবেনেতৃত্বে যারাই থাকুক না কেন। একটি মুসলিম প্রধান দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে পরিণত করা সহজ সাধ্য নয়। এছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম মুসলিম দেশ যেখানে গণতন্ত্রের চর্চা আছে। (প্রকৃত গণতন্ত্র অবশ্য এখনো সুদূর পরাহত)। অন্তত ভোটাধিকার সহ রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ কিছুটা হলেও আছে। এই ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে একটি শক্তি বাংলাদেশে সর্বদাই সক্রিয়। এরা রাজনৈতিকভাবেই শুধু চিহ্নিত নয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এরা সক্রিয়। এরা মুখে উদারতা ও প্রগতিশীলতার কথা বললেও কার্যত আক্রমণ ও ক্ষতি করেন প্রগতিশীল শক্তির।

বিশ্বে বর্তমান সরকার প্রধানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীযুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকপ্রধান বিরোধি দল, (২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালিন সরকারের সময়ে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। অভিযোগ আছে এই ঘটনার সাথে তৎকালিন জোট সরকারের সংপৃক্ততা ছিলপার্শ্ববর্তী মায়ানমারের আরকানি মুসলিমদের জঙ্গিগোষ্ঠীআসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাসহ বেশ কিছু উগ্রগোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু এখন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার জীবন বিপন্ন হওয়া মানে মৌলিক বাংলাদেশউদার বাংলাদেশ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়া।

তাইঅনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে এখনো অপরিহার্য বলেই মনে হয়। আজকে দেশে অনেক বুদ্ধিজীবী যখন নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে হাসিনা-খালেদা কিংবা আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে একই পাল্লায় মাপার চেষ্টা করেন এবং আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে ভাবেন তখন বিস্মিত হই। ওরা হয় অপরিণামদর্শী নতুবা জ্ঞানপাপী। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিহলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার জন্যে সরকার সমালোচিতনিন্দনীয় হতে পারে। পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও কালক্ষেপণ সমালোচনার বিষয় হতে পারে কিন্তু তা কোনক্রমেই সরকার পতনের কারণ হতে পারেনা। এটি ভাববার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ নেই যে,আওয়ামী লীগ সরকারের ওসব ব্যর্থতা বা বিতর্কিত কাজের জন্যে আগামীবার বিএনপি-জামাত জোটকে পুনরায় ক্ষমতায় আনা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ ১০০ ভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বটে কিন্তু তাই বলে যে কাজ বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে করা সম্ভব তা ধারণা করা বা মনে করা চরম বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

বিগত জোট সরকারের শাসনকালেএমন কি নির্বাচনে জেতার পরদিন থেকে শুরু হওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনসারাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলাসিনেমা হল ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বোমা হামলাব্রিটেন রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলাদশ ট্রাক অস্ত্র চালান২১ আগস্ট বিরোধী দলের সমাবেশে গ্রেনেড হামলাআদালতে বোমা ফাটিয়ে বিচারক হত্যাবাংলা ভাইয়ের উত্থানসাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ.এম এস কিবরিয়া হত্যা প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও জঙ্গি হামলার মতো অসংখ্য ঘটনার পরে এখনো যারা মনে করেন আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি-জামাত নেতাদের মানসিক সুস্থ্যতা নিয়ে প্রশ্ন জাগ্রত হয়। আমি বরং মনে করি সত্যিকার দেশপ্রেমিক বাম ও গণতান্ত্রিক মোর্চাগুলো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালি হোক। দর কষাকষি করার মত সংসদে আসন লাভ করুক এবং বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে প্রগতিশীল,ধর্মনিরপেক্ষ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে চাপে রাখুক। একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের সরকার প্রধান হয়ে শেখ হাসিনা জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে জাতিসংঘবিশ্ব ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সংস্কারের যে দাবি করে চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। চার দশক আগে যে দশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অপমানিত করা হয়েছিল সে দেশের একজন প্রধানমন্ত্রী সেই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন এই দাবি করেছিলে-তখন তাঁর এই স্পর্ধা একজন বাঙালি হিসেবে আমাকে জাগিয়ে তুলেছে ফের। লক্ষণীয় ইতোমধ্যে বিশ্ব ব্যাংক সংস্কারের কথা নিজেই বলেছেন সংস্থাটির প্রধান। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় অগ্রজ সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী ‘সংকট বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থারমন্ত্রীর নয়” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। আমি তাঁর লেখার সাথে একমত। বস্তুত ব্যক্তির নয় সংকট ব্যবস্থার। ব্যবস্থার কারণেই বঙ্গবন্ধু সফল হতে পারেননি। আর সীমাহীন আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত সততা থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় হোঁচট খাচ্ছেন বার বার। আমরা নিজেরা বর্তমান বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করছি বটে। কিন্তু তার জন্যে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ তাগিদ শুধু আজ বাংলাদেশেই নয় ভেনিজুয়েলায় শ্যাভেজের চতুর্থবারের বিজয় কিংবা ল্যাটিন আমেরিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে তরুণদের মধ্যে বিপ্লবী বীর চে’ গুয়েভারাকে নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি সে ইঙ্গিতই প্রদান করে। বর্তমান লুটেরা শ্রেণীর শাসন থেকে মুক্তির জন্য আমাদেরও বিপ্লব ও সে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে একজন চে’র প্রয়োজন। কিন্তু সে সম্ভাবনা ও বাস্তবতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আর যাই করি না কেন জঙ্গি সমর্থিত একটি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় পুনরার আসীন করতে পারি না।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ