দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১২ খ্রি. ১৪ পৌষ ১৪১৯ সাল ১৪ সফর ১৪৩৪ হিজরী
*কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১২ খ্রি. ১৪ পৌষ ১৪১৯ সাল ১৪ সফর ১৪৩৪ হিজরী
*কামরুল হাসান বাদল
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে নতুন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ভুল বললাম বলা উচিৎ একটি ধারণার জন্ম দিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে প্রথম যখন ৬ দফা ঘোষণা করেছিলেন সেদিনও তেমনিভাবে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যে ওটি সিআইএর তৈরি করা দলিল। পরবর্তীতে বলা হয়েছিল ৬ দফা ভারতের তৈরি রাজনৈতিক কর্মসূচি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু, তাঁর দল ও পরিবার নিয়েও অনেক ভুল ধারণা বা অপপ্রচার করা হতো। যা যতই দিন যাচ্ছে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এমনকি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরও বলা হতো শেখ হাসিনা কোনদিন তাঁর পিতার হত্যাকান্ডের বিচার করতে পারবেন না কিংবা করবেন না। কারণ এই বিচার করতে গেলে আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই ফেঁসে যাবেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিই শেষ হয়ে যাবে। বলার প্রয়োজন পড়ছে না দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে কিনা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ করবে না, করতে আন্তরিক নয় ইত্যাদি বহুকথা বলা হয়েছে, বলা হচ্ছে। বাস্তবতা ভিন্ন হতে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে হচ্ছে এবং সঠিক ও যথার্থ সাজা হতে যাচ্ছে তা জামাত-শিবিরের মরিয়া হয়ে ওঠা থেকে আমি নিশ্চিত হচ্ছি।
শুরু করেছিলাম সাম্প্রতিক প্রবণতা বা ধারণার কথা দিয়ে। তা কী তাই এখন খুলে বলি। তা হলো,কেউ একজন যখন বিএনপি-জামাত বা যুদ্ধাপরাধীদের সমালোচনা করেন তখন তাকে বলা হয় আওয়ামী লীগের দালাল। আর যখন কেউ আওয়ামী লীগ বা বর্তমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে গালি দেন বা সমালোচনা করেন তখন তাকে বলা হয় ইনটেলেকচুয়াল। বর্তমানে এসব ইনটেলেকচুয়ালদের মুখরতা, বাচালতা, প্রগলভতা ও ঔদ্ধত্যে টেলিভিশন দেখা ও খবরের কাগজ পড়া প্রায় ছেড়ে দেয়ার অবস্থা। এরা জাতির স্বঘোষিত বিবেক, কক্তস্বর ও নিরপেক্ষ সুশীল শ্রেণী। এই শ্রেণীর এখন প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে গভীর রাতে টেলিভিশনের টকশো’তে অংশ নিয়ে সরকার তথা ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে তুলোধূনো করা। ইনিয়ে-বিনিয়ে বিএনপির পক্ষে তথা জামাত তথা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানো। এদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সর্বজান্তা অধ্যাপক, পত্রিকার সম্পাদক, চাকরীবিহীন সাংবাদিক, আমেরিকা ফেরৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এদের পেশাগত পরিচয় যাই হোক রাজনৈতিক আদর্শ রসুনের কোষার মত একই জায়গায়। এদের মধ্যে অনেকেই রাতারাতি বিখ্যাত হয়েছেন চ্যানেলওয়ালাদের সস্তা ধরনের টকশোতে উপস্থিত হয়ে সরকার বিরোধী বিশেষ করে ট্রাইব্যুনাল বিরোধী বক্তব্য দিতে দিতে। বিখ্যাত হয়েছেন বলা ঠিক হলো না বলা উচিৎ বিখ্যাত করা হয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলের মালিকরা বেশ একটি মওকা পেয়ে বসেছেন। শুধু দেখা এবং তা প্রতিদিন একই বিষয়ে শুনবার বা শোনাবার জন্যে বিজ্ঞাপনদাতা স্পন্সর করে। এত কম মূলধন ও পরিশ্রমে প্রোগাম তৈরি টক শো ছাড়া আর সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট উপস্থাপক ছাড়া অংশগ্রহণকারীদের দু-চার পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে সর্বমোট হাজার বিশেক টাকার মধ্যে একটি টকশো করে ফেলা সম্ভব। তা বিক্রি করাও সম্ভব। বাংলাদেশ ছাড়া টেলিভিশনের প্রাইম টাইমে বিনোদন ছাড়া শুধু কথা বলা আর কোথাও হয় কিনা সন্দেহ আছে।
ঘরে বাইরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আওয়ামী লীগ তথা বর্তমান সরকারের আক্রান্ত হতে দেখে কাহলিল জিবরানের একটি গল্পের কথা মনে পড়লো। গল্পটি সম্ভবত পূর্বেও একবার লিখেছিলাম। খুব প্রাসঙ্গিক বলে আবারও লিখছি লোকটিরঘোড়া চুরি হয়েছিল। তা দেখে শুনে সবাই লোকটিকে গালমন্দ করছিল তার বোকামির জন্য। কেউ বলছে তুমি ঘোড়া বাইরে বেঁধে রেখে ভেতরে ঘুমাতে গেলে কেন? কেউ বলছে ঘুমাতে গিয়েছো ভাল, মাঝে মধ্যে এসে দেখলে না কেন? এভাবে ক্রমাগত সমালোচনা শুনতে শুনতে লোকটি ক্ষেপে গিয়ে একসময় বললো চুপ কর তোমরা। ঘোড়া চুরি হয়েছে আমার আর তোমরা শুধু তার জন্যে আমাকেই গালাগাল করছো। যে ঘোড়া চুরি করেছে তাকে এ পর্যন্ত একটি কথাও বললে না। আওয়ামী লীগেরও দশা হয়েছে এখন ঐ লোকটির মতো। সমস্ত কিছুর দায় শুধুই আওয়ামী লীগের। অথচ এই দলটির নেতৃত্বেই এদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই আওয়ামী লীগ সরকারই সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের মূলস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। এই আওয়ামী সরকারই ১৯৭২ সালের দালাল আইন প্রণয়ন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিল। ৭৫ এ জাতির জনককে হত্যার পর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ করা হয়েছে। সংবিধানে বিসমিল্লাহ যোগ করা হয়েছে। (জিয়ার উত্তরসুরি এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছে)। বাঙালি দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে সংবিধানের প্রস্তাবনায় মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্থলে স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিকৃত করে পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। যা স্বাধীনতা পরে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন। ফলে দেশ মারাত্মকভাবে সাম্প্রদায়িকতার পথে অগ্রসর হয়েছে তৈরি হয়েছে অনেক ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী দল। জন্ম নিয়েছে জঙ্গিবাদ। যার চূড়ান্ত স্বরূপ আমরা গত বিএনপি জামাত সরকারের শাসনামলে প্রত্যক্ষ করেছি।
এখন আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেই অপর পক্ষ থেকে বলা হয় তবে বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম কেন সংবিধানে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বললে বলা হয় ৪১ বছর পরে কেন? গোলাম আজম, সাঈদী, নিজামী ও সাকাদের মতো চিহ্নিত ও শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে বলা হয় আওয়ামী লীগে যারা আছে তাদের আগে করা হোক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করা হোক। বড় মুশকিলে নিপতিত হয়েছে আওয়ামী লীগ ঘোড়া চুরি হয়ে যাওয়া লোকটির মতো। যারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজন করেছে, যারা সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাও সমাজতন্ত্র ছুঁড়ে ফেলেছে, যারা ধর্ম ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করেছে, যারা হাজার হাজার জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি করেছে,যারা বাংলাদেশকে বোমা-গ্রেনেডের দেশে পরিণত করেছে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় স্মৃতি সৌধ অপবিত্র করেছে। যারা এখনো যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়ে দেশকে অকার্যকর,ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে। যারা প্রতিনিয়ত গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতা করছে তাদের ব্যাপারে এসব ইনটেলেকচুয়ালরা নিশ্চুপ।
নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন, সব সময় যে খারাপ লোকরাই দেশের বা সমাজের ক্ষতি করে তা নয়। ভাল লোকরাই করে যখন তারা এ সময় নীরবতা পালন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বোনাপার্টের ব্যাখ্যার চেয়েও খারাপের দিকে কারণ যাদের ভাল মানুষ বলে এতকাল জেনে এসেছি তারা নিশ্চুপ নন। তারাও বলছেন তবে এমনভাবে বলছেন শুনে মনে হয় খারাপ লোকরাই কথাগুলো বলছে।
ভাত বাসি হলে পান্তা খাওয়া যায়। পচলে অন্তত দোচোয়ানি বানানো যায়। কিন্তু বিরানি পচলে কোনভাবেই খাওয়া যায় না। দুর্গন্ধ ছড়ায়। আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিৎ। কাদের সিদ্দিকীর এমন মন্তব্যের পর কথাটি মনে এলো।
দুঃসময়ে বন্ধুর পরিচয়। বাঙালি জাতির বর্তমান এই দুঃসময়ে আয়নায় বন্ধুর মুখ দেখা যাবে। জাতির প্রকৃত বন্ধুদের পরিচয় উদঘাটিত হবে খুব শীঘ্রই।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com







