দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ সাল ২৮ মহররম ১৪৩৪ হিজরি
* কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ সাল ২৮ মহররম ১৪৩৪ হিজরি
* কামরুল হাসান বাদল
কচু কাটা কখনো দেখিনি। তবে আন্দাজ করতে পারি। কচু গাছের কচি কচি ডগাগুলো খুব সহজেই কাটা যায়। এক কোপে অনেক ডগা। সাপ পেটানোও দেখিনি। তবে জানি তা খুব নির্দয়ভাবে। গত রোববার বিএনপি-জামাতের ডাকা অবরোধের দিন নিরীহ নিরপরাধ বিশ্বজিৎকে যেভাবে কোপানো হয়েছে বুঝতে পারছি না তাকে কীসের সাথে তুলনা করব। বিশ্বজিতের ওপর হামলার দৃশ্য ক’দিন ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে, পত্রিকায় ছবি ছাপানো হচ্ছে। আমি এর কোনটিই দেখতে পারিনি। হয়ত ভীরু, কাপুরুষ বলে। সাহস নেই বলে। আসলে আমার সাহস নেই মানুষের ওই উন্মত্ততা দেখবার। আমার সাহস নেই মানুষের এই নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা দেখবার। মানুষের হিংস্রতা দেখবার। আমি মনে- প্রাণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। আমি তাদের এবং তাদের রাজনীতিকে ঘৃণা করি। কিন্তু তাই বলে আমি কখনোই চাইবো না এদেশের কোন যুদ্ধাপরাধীর এমন (পরিণতি) হোক, এমন করে তাকে হত্যা করা হোক। আমি এবং আমার মত লক্ষ কোটি সভ্য মানুষ বিচারের মাধ্যমে তাদের সাজার নিশ্চয়তা চাই। বিশ্বের কোন কুখ্যাত খুনী বা দুর্ধর্ষ অপরাধীরও এমন মৃত্যু কামনা করি না।
দুঃখিত, বিশ্বজিৎ মৃত্যুর সময় জানতেও পারলো না কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। তার কোন অপরাধ ছিল না। অবরোধকারী কিংবা অবরোধবিরোধী কোন পক্ষেই তার অবস্থান ছিল না।তবুও তাকে মরতে হলো। আমাদের নষ্ট রাজনীতি, আর হানাহানির সংস্কৃতির বলি বিশ্বজিৎ দাস।
গত কিছুদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনপ্রচলনের দাবি আর জামাতের তাদের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবি, যারা বর্তমানে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে বিচারের সম্মুখীন, একীভূত হয়ে পরিস্থিতি বিপজ্জনক করে তুলছিল। গত কয়েকদিন জামাত-শিবির সারাদেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তারা জ্বালাও-পোড়াও নীতি গ্রহণ করে প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালাচ্ছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে, বর্তমান বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবার অভিপ্রায়ে তাদের এসব কর্মসূচিকে নীতিগত বা নৈতিক সমর্থন দান করে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। এভাবে তারা একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে উন্মত্ত-হিংস্র একদল কর্মী বাহিনীকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে নিরীহ মানুষের গাড়ি ভাঙচুর,অগ্নিসংযোগ তথা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দিয়ে নিজেরা গা ঢাকা দিয়েছে। নিজেদের গাড়ি গ্যারেজে রেখে জনগণের গাড়ি ভাঙার উৎসবে মেতেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা জনগণের সম্পদ ধ্বংস করছে।বিএনপির এই আচরণে আমরা বিস্মিত নই। এটাই স্বাভাবিক। যে বিএনপি বা তাদের প্রতিষ্ঠাতার করুণায় জামাতের রাজনীতি করার সুযোগ হয়েছে। যে দলের প্রত্যক্ষ মদদে, প্রশ্রয়ে ও কল্যাণে জামাত সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে। মন্ত্রীত্ব পেয়েছে সে জামাতের দুঃসময়ে বিএনপি দূরে দূরে থাকবে তা বোধহয় একজন বোকাও বলতে চাইবে না। অতএব হিসেবটি সোজা। বিএনপি তার পুরোনো রাজনৈতিক মিত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে। ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষিত হওয়ার আগে যুগপৎ মরণ কামড় দেয়ার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে বিএনপি কোন নীতি আদর্শের ধার ধারে না। (বস্তুত বিএনপির নীতি ও আদর্শই বা কী তা এখনো পরিষ্কার নয়, যতটা পরিষ্কার জামাতে ইসলামীর।)।
কথায় বলে, টাকা যখন কথা বলে ঈশ্বর তখন চুপ করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশসমূহে এখন জামাতের টাকা কথা বলতে শুরু করেছে। গত প্রায় সাড়ে তিন দশকের অর্জিত অর্থ সম্পদ এখন তারা বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত নিজেদের নেতাদের রক্ষা করতে। এতে যে তারা ব্যর্থ নয় তার প্রমাণ দি ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদন। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি স্কাইপে আঁড়ি পাতা এবং তা তাদের সমর্থিত একটি পত্রিকায় প্রকাশ করা। যে বিতর্কে শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেছেন। আইনমন্ত্রী যাই বলে থাকুন না কেন এখন এই বিচার প্রক্রিয়ার পরিণতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও উৎকক্তা বাড়বে বৈ কমবে না।
ফিরে আসি বিশ্বজিৎ হত্যার প্রসঙ্গে। এ বিষয়ে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সরকারের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই। স্বাভাবিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেখানে কীভাবে নয়া নিয়োগপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুবলীগের অনুষ্ঠানে গিয়ে জামাত-শিবিরকে ঠেকাতে যুবলীগ কর্মীদের মাঠে নামার আহবান জানাতে পারেন? অবশ্য একই অনুষ্ঠানে যুবলীগ প্রধান ওমর ফারুক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বলেছেন,জামাত-শিবিরকে ঠেকানো পুলিশের কাজ, যুবলীগ কর্মীদের নয়। তিনি বা যুবলীগ তাঁর এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বিচক্ষণতারই পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি জামাত তথা বিরোধীদলের অবরোধ কর্মসূচির দিন কোন যুক্তিতে ছাত্রলীগকে মাঠে নামানো হল। গত রোববার বিএনপি-জামাত জোট যে নৈরাজ্য ও ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল দেশের জনগণের সাথে বিশ্ববাসীও তা অবলোকন করেছে। কিন্তু এক বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ড বিরোধী দলের সকল অপকর্মকে ঢেকে দিয়ে ছাত্রলীগের ভূমিকাকে নিন্দনীয় করে তুলেছে। নিষ্ঠুর এই হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন তারা ছাত্রলীগের বহিস্কৃত নেতা কর্মী। যদি তাই হয় তাহলে ওদের বাঁচাতে পুলিশ এত তৎপর কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন না। পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রাখছেন কেন? বিএনপির মহাসচিবকে গ্রেফতার করা হলো। তার গ্রেফতারের প্রতিবাদে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং তা বিএনপিকে আরো সুযোগ তৈরি করে দেয়া হবে জেনেও কেন এই সিদ্ধান্ত নেয়া হল। ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধানকে গ্রেফতার করা গেলে বিশ্বজিতের হত্যাকারীদের গ্রেফতারে পুলিশের গাফিলতি কেন? বিএনপি নেতা-কর্মীদের প্রতি পুলিশ এমন আচরণ করলেও জামাত-শিবিরের কর্মসূচির সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে কীভাবে। শিবিরের মার পুলিশ হজম করে কীভাবে? তবে কি পুলিশের ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ শিথিল?
এবার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে সংসদ নির্বাচনের দাবি করছেন এবং তার জন্যে দেশকে এক প্রকার গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন সেই সংসদেইতো আপনি ও আপনার দল উপস্থিত থাকেন না। আগামীবার জয়ী হবেন তেমন নিশ্চয়তা কি পেয়েছেন। জিতলে ঠিক আছে, হারলে কি এখনও এভাবে সংসদ বর্জন করবেন? দাবি করেন জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার। দাবি করেন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসাবে। শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করেন জাতীয় স্মৃতি সৌধে। শিখা অনির্বাণে। তাহলে আপনার স্বামী যুদ্ধ করেছিল কাদের বিরুদ্ধে। আপনার স্বামীতো বিজয়ী দলের। সে যুদ্ধে পরাজিত শক্তি কারা?
শুরু করেছিলাম বিশ্বজিতের হত্যা প্রসঙ্গ নিয়ে। আমরা জানি না যে পরিস্থিতির উদ্রেক হয়েছে দেশে তাতে ভবিষ্যতে আরও কত বিশ্বজিৎকে প্রাণ দিতে হতে পারে। নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে যারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি প্রস্তুত করছেন তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চাই এই রক্তই একদিন বড্ড পিচ্ছিল করে তুলবে ক্ষমতার সিঁড়িকে। তাতে যে কোন সময় পা ফসকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। হত্যাকারী যে বা যে দলের হোক। বিশ্বজিৎ হত্যার সঠিক ও দ্রুত বিচার চাই।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন