পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১২

একটি যৌক্তিক, সফল ও সর্বাত্মক হরতাল

দৈনিক আজাদী                               উপসম্পাদকীয়                           কাল আজ কাল
২০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ৬ পৌষ ১৪১৯ সাল ৬ সফর ১৪৩৪ হিজরী

*কামরুল হাসান বাদল

স্মরণকালের একটি যৌক্তিকসফল ও সর্বাত্মক হরতাল পালিত হল দেশে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তরান্বিত করাররাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবিতে সিপিবিবাসদসহ বামমোর্চার এই হরতাল ছিলসম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও অহিংস। দীর্ঘকাল ধরে হরতাল অর্থ যেখানে ছিল হরতালপূর্ব সন্ধ্যায় গাড়িতে আগুন দেয়াহরতালের সময় যানবাহন ভাঙচুরঅগ্নি সংযোগজ্বালাও-পোড়াও,হত্যা-মৃত্যু আর ধ্বংসের উৎসব। পিকেটারদের হাতে উদ্যত্ত মারণাস্ত্রইট-পাটকেল ও পেট্রোলের বোতল। গত ১৮ তারিখের হরতাল তা পাল্টে দিয়েছে। এ দিন কোথাও কোন গাড়ি ভাঙচুর করা হয়নিজ্বালিয়ে দেয়া হয় নিভীতি সঞ্চার করা হয়নি। পিকেটার বলতে যা বোঝায় তেমন কাউকে দেখা যায় নি। তবে পিকেটারদের মতো যে তরুণরা রাজপথে ছিলেন তাদের হাতে লাঠিরামদা,চাপাতিইট-পাটকেলককটেল-পেট্রোলের বোতলের পরিবর্তে শোভা পেয়েছে গিটার,হারমোনিয়ামতবলাবাঁশি। তাদের কণ্ঠে ছিল জাগরণের গানদেশের গানভালবাসার গান। োগানের বদলে ছিল বিদ্রোহের কবিতাঅবিনাশী পংক্তিমালা। মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবেই সাড়া দিয়েছে হরতাল আহবানে। টিভিতে দেখলাম অনেকে এমন হরতালকে এক কথায় স্বাগত ও দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম হরতাল পালনের পর কোন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধন্যবাদ জানালো।

হরতাল যে কোন গণতান্ত্রিক দেশের প্রতিবাদের পন্থা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যে সব দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা পায়নি পূর্ণঙ্গভাবে। এবং নির্বাচিত সরকারগুলো অনেক সময় গণতান্ত্রিক পথে চলে না যেখানে হরতালের মতো কর্মসূচি না দিয়ে বিরোধীদলের উপায়ও থাকে না। মহাত্মা গান্ধীও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হরতাল কর্মসূচি পালন করেছেন। বাংলাদেশের দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে হরতালের অসামান্য অবদান অস্বীকার করারও উপায় নেই। স্বাধীন দেশে এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ৭২ ঘণ্টার হরতালও পালিত হয়েছে। সে পর্যন্ত হরতালের কিছুটা জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু এরপর থেকে হরতাল তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে। অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হরতাল মূলত ভয়তাল বা আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। পিকেটিং ভয়াবহ ও নির্মম হয়ে ওঠে। জনগণের মধ্যে হরতাল বিরোধী মনোভাবও জাগ্রত হতে থাকে। এবং সবশেষে হরতালকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠতে থাকেদেশের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে। অনেকে আবার এর বিরুদ্ধে মতামতও ব্যক্ত করেন। হরতাল বন্ধ করাকে মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো হটকারীতা বলে অভিহিত করেছেন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলো প্রথম বেশ ক’টি হরতাল পালন করেছে সম্পূর্ণ ব্যক্তি ও পরিবারিক কারণে। জনগণের কোন দাবি নয়,তাদের নেত্রীর বাড়ি রক্ষা থেকে শুরু করে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত নেতাদের মুক্তির দাবিতে। আর বর্তমানে জামাত-শিবির-বিএনপির সমর্থনে হরতাল করছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও বিচারের সম্মুখীন জামাতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে। গত কয়েক মাসের এসব আন্দোলনহরতাল ধ্বংস,মৃত্যুহত্যা-হামলা ও হিংস্রতার দিক দিয়ে পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে ব্যাপক। এমন কি এসব হরতাল ও আন্দোলনে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর পরিকল্পিত ও চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হয়েছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে জামাত-শিবিরের এমন হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ যখন ক্রমশ উদ্বিগ্নবিরক্ত ও বিরূপ হয়ে উঠছিল যে সময়ে এবং বিশেষ করে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে হঠাৎ সিপিবি-বাসদের এই হরতাল কর্মসূচি ঘোষণায় দেশের অনেক মানুষ কিছুটা বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু এসব বাম নেতাদের হরতাল আহবানতাতে অংশগ্রহণের জন্যে জনগণের প্রতি আবেদন এবং হরতালের জন্যে কাওকে বাধ্য না করে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস হরতাল পালন সাধারণ মানুষ বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান হিংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিরাট প্রভাব ফেলেছে। হরতাল যদি যৌক্তিকন্যায় সংগতসময়ানুগ হয় সে হরতাল পালনের জন্য পিকেটিংয়ের প্রয়োজন হয় না। জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক কিছু করার প্রয়োজন হয় না। জামাতের এতদিনের নৈরাজ্যকর কর্মসূচির মুখে এ হরতাল শান্তিকামী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। আমার ধারণা এমন হরতাল বাংলাদেশে আগামীদিনের হরতালকে জটিল করে তুলবে।

অনেকের মতো আমিও বিশ্বাস করিজামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা কোন বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে না। নিষিদ্ধ হলে এই দল অন্যদল বা অন্য নামে দেশে একই ধরনের রাজনীতি করে যাবে। এবং এর দ্বারা সমস্যারও পূর্ণ সমাধান করা যাবে না। বরং সেক্ষেত্রে ’৭২ এর সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিই নিষিদ্ধ করা উচিৎ। ‘ধর্ম যার যাররাষ্ট্র সবার’ এই আদর্শের ভিত্তিতেই রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিৎ। বর্তমানে জামাত ছাড়াও অনেক ধর্মভিত্তিক দল বিদ্যমান যারা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায়। নির্দিষ্ট কোন দল নয়ব্যবস্থার পরিবর্তন করেই দেশে মৌলবাদী শক্তিকে রোখা সম্ভব।

আমি নৈরাশ্যবাদী নই। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশও ঠিকই একদিন উঠে দাঁড়াবে। স্বাধীনতার পর বিগত একচল্লিশ বছরে দেশ ও দেশের মানুষের অর্জনও কম নয়। আমি মনে করি দেশের এমন একটি দিক নেই যেখানে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়নি।

সাধারণ মানুষগুলোর এই অসাধারণ কৃতিত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতো দেশের রাজনীতি যদি সঠিকভাবে চলতো। ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি যদি লোপ পেতো। শীর্ণদেহী পোশাককর্মী আর বিদেশের মাটিতে মানবেতর জীবন যাপন করে যারা দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান সম্মানজনক পর্যায়ে এনেছেন তাঁদের ত্যাগ বৃথা যেতে পারে না।

আমার বিশ্বাস ১৮ তারিখের হরতাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তথা মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়কে সফল করতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।



লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ