পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৩

' বেকায়দায় বিএনপি, অস্থিরতায় সরকার '

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
-কামরুল হাসান বাদল

গত ১১ মে প্রকাশিত আমার একটি লেখার প্রতিক্রিয়া ছাপা হয়েছে দৈনিক আজাদীর চিঠিপত্র বিভাগে। জনৈক পত্রলেখক বেশ ক্ষুব্ধ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় আমাকে ব্যক্তিগতভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছেন। একজন নবীন লেখক হিসেবে হয়তো এরচেয়ে বেশি শালীনভাবে লিখতে তিনি অভ্যস্ত নন। তা যাক তারপরেও আমি ক্ষুব্ধ নইকারণ ‘আমাদের এলাকায় একটি গভীর নলকূপ চাই’ বা ‘আমাদের এলাকায় ব্যাংকের শাখা চাই’ এ ধরনের লেখার বাইরে তিনি অন্যকিছু লেখার চেষ্টা করেছেন। আমি পত্রলেখকের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি। লেগে থাকলে তিনি লেখক হয়েও উঠতে পারেন। সীমিত লেখার পরিসর নষ্ট না করে মূল কথায় যাই।

গত সোমবার দেশের উচ্চ আদালতের একটি রায় বিএনপি’র জন্যে ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কর্নেল তাহেরের পরিবারের পক্ষ থেকে করা উক্ত মামলার রায়ে মহামান্য আদালত বলেছেনজিয়াউর রহমানের পরিকল্পনা বা ইচ্ছায় কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। আদালত কর্নেল তাহেরকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন সেই ট্রাইব্যুনালের সাথে জড়িতদের মধ্যে যে বা যারা জীবিত আছেন তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করতে। সে সাথে মহামান্য আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জিয়ার সম্পৃক্ততা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখতে বলেছেন।
৫ম সংশোধনী বাতিল রায়ের পর এই রায়টি বিএনপির জন্যে বড় একটি ধাক্কা। ঐ রায়ে জিয়াসহ সকল সামরিক শাসকের শাসনকে অবৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের গত সাড়ে চার বছরের শাসনামলে বিএনপি অনেক ইস্যু পেয়েছিল আন্দোলনের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যেতার কোনটিই বিএনপি কাজে লাগাতে পারেনি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে সামনের সারিতে সিট বাড়ানোর দাবিতে সেই যে বিএনপি সংসদ বর্জন শুরু করেছিল তা আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। বরং সংসদ বর্জনের কারণ বা সংসদে যোগ দেয়ার শর্তে নতুন নতুন দফা ও দাবি যোগ হয়েছে শুধু। গত চার বছরে সরকার বিরোধী আন্দোলনের অনেক ইস্যু পেয়েও বিএনপি কার্যত ফলপ্রসূ সরকার বিরোধী কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। শেয়ার বাজারডেসটিনিইউনি পে টু ইউহল মার্কস ইত্যাদি তার মধ্যে অন্যতম। দল হিসেবে বিএনপি’র এমন দুর্ভাগ্য যে তাদের প্রথম প্রথম বেশ কটি হরতাল আহ্বান করতে হয়েছিল শুধু নেত্রীর পরিবারের স্বার্থে। যার সাথে জনস্বার্থের কোনরূপ সংযোগই ছিল না।

অধিকন্তু একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিরোধীতা করে এবং এক পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের লাগাতার হরতালনৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে শর্তহীন সমর্থন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়াদল পরিচয়দানকারী বিএনপি’র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং একটি সময়ে বিএনপি পুরোপুরি জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে থাকে। গত ৪২ বছরের ইতিহাসে গণজাগরণ মঞ্চ এক অবাক বিস্ময়। দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ এদেশের বুকে আবার একাত্তরকে প্রতিষ্ঠিত করে পরম গৌরবে। প্রথম প্রথম বিএনপি’র পক্ষ থেকে কিছুটা নমনীয়ভাব দেখানো হলেও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার পুন:পুন মিথ্যাচার ও আক্রমণের প্রভাবে বিএনপি গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। যদিও গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিলবর্তমান সরকারের ওপর সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকে। শাহবাগের তরুণরা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেখে ধরে নিয়েছিল জামায়াতের সাথে সরকারের কোন গোপন সমঝোতা হয়েছে।

এই গণজাগরণ মঞ্চকে প্রতিহত করতেই মাঠে নামানো হয় হেফাজতে ইসলাম নামক একটি ধর্মীয় সংগঠনকে। মূলত-জামায়াতের অর্থ আর বিএনপির পরামর্শই এই সংগঠনটি অতিদ্রুত সারাদেশে সংগঠিত হতে থাকে এবং অকস্মাৎ ’১৩ দফা’ বলে একটি দাবিনামা পেশ করে বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তোলে। তাদের এই ১৩ দফা দাবি মেনে নেয়ার সময়সীমা শেষ হলে হেফাজতে ইসলাম গত ৫ মে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয়। ২ মে সংসদে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আলোচনার আহ্বান জানান বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করে উল্টো সরকারকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বেঁধে দেন বেগম খালেদা জিয়া। মূলত হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধশাপলা চত্বরে গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে বিএনপি যে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছিল তা ৫ মে মধ্যরাতে যৌথবাহিনীর অপারেশনের কারণে ব্যর্থ হয়ে যায়। এই ঘটনায় এবং এই ঘটনার পরে রাজনৈতিক ভুল চালের জন্য দারুণ সমালোচিত হচ্ছে বিএনপি। হেফাজতের কাঁধে ভর করে সরকার পতনের পরিকল্পনা করা এবং শাপলা চত্বরের সমাবেশে যৌথবাহিনীর অপারেশনে কয়েক হাজার কর্মীর মৃত্যু ও নিখোঁজের দাবি এবং ঘটনার পর নিহতদের গায়েবানা জানাজার ঘোষণায় বিএনপি’র রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ছিল বলে অনেকে মনে করেন। সবশেষে বিএনপি সংসদের বাজেট অধিবেশনে যোগ দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করে বিএনপি’র সংসদেই যাওয়া উচিত। সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত সংসদ। এমনকি আগামী নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে গঠিত হতে পারে এবং এই সরকার প্রধান কে হবেন তা সংসদে বসেই নিষ্পত্তি হোক এবং প্রয়োজনে এই আলোচনা পর্বটি সরাসরি ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় সম্প্রচারিত হোক। বেকায়দা অবস্থা কাটিয়ে এবার অন্তত বিএনপি যথার্থ সিদ্ধান্ত নেবে এমন ধারণা অনেকের।

অন্যদিকে বিএনপি বেকায়দায় থাকলেও অস্থিরতা পেয়ে বসেছে সরকারকে। যার সর্বশেষ নিদর্শন একমাস সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নির্ষিদ্ধ ঘোষণা করা। এর আগে এই মাসেই ঢাকায় পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপিকে দুই দুইবার সমাবেশ করতে না দিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে সরকার। এবং সর্বশেষ এক মাসের জন্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করে একটি ন্যক্কারজনক ঘটনার অবতারণা করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভা-সমাবেশ করা যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার স্থগিত থাকতে পারে শুধুমাত্র জরুরি অবস্থাকালীন। কিন্তু বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কোন কারণে সরকার এমন একটি স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো তা কারুর বোধগম্য নয়। বিষয়টি আওয়ামী লীগের অন্য মিত্রদলগুলোকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এমন কি আওয়ামী লীগ বা সরকারেরই অনেকে বিব্রত হয়েছেন। রাজনীতির খবরাখবর যারা এক আধটু রাখেন তাঁরা ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজধানী ঢাকা থেকে অনেক দূর চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাইয়ের একটি থানা উদ্বোধন শেষে কিছু সাংবাদিকদের বললেন কীভাবে। সরকারি একটি সিদ্ধান্ত যার সাথে জনগণের মৌলিক অধিকার জড়িত এবং যার সাথে সরকারের ভাবমূর্তিও জড়িত তেমন একটি সিদ্ধান্ত কি অকস্মাৎ নেয়া হয়েছিল। না হলে প্রায় মধ্যরাতে সরকারি যে ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো তা সকালেই কেন দেয়া হলো না। সম্ভবত পুরো বিষয়টি গুবলেট করে ফেলেছেন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশে এমন কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে যার জন্যে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে তা বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে শেষের দিকে এসে সরকারকে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতায় পেয়ে বসেছে। গত ২ মে সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলকে যেভাবে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের সেই অবস্থানে থাকেনি। প্রধানমন্ত্রীর সেই আহ্বানের বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বেঁধে দিয়েছিলেন। এরপরে পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে। এক সময় জাতিসংঘের মহাসচিবের দূত ও ইইউ’র রাষ্ট্রদূতদের উদ্যোগের কারণে বিএনপি শর্তহীন আলোচনায় সম্মত হয়। সে সময় অন্যদিকে বন ও পরিবেশমন্ত্রী ডহাছান মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান শেখ হাসিনা হবেন বলে শর্ত জুড়ে দেন। শুধু তাই নয় আওয়ামী লীগের যে কোন স্থানে হতে পারে আলোচনা’র অবস্থান থেকে সরে এসে একমাত্র সংসদেই আলোচনা হতে পারে বলে পুনঃশর্ত আরোপ করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কে হবেন তা যদি আওয়ামী লীগ আগে থেকে নির্ধারণ করে দেয় তা হলে তো আর আলোচনায় বসার দরকার নেই।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভেতরেই বুঝি একটি শক্তি আছে যারা দলের অভ্যন্তরে থেকে দলকে দুর্বল ও বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন। ঠিক সেরূপ শক্তিটি সরকারেও বিরাজ করে যাদের কাজই হলো উল্টা-পাল্টা কিছু একটা করে সরকারের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিয়ে সরকারকে বিতর্কিত ও বেকায়দায় ফেলা।

জনগণ মনে করেছিল গত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে যে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়েছিল তা সফলভাবে প্রতিহত করে সরকার একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড়াবে। বাস্তবতা দেখছি তার সম্পূর্ণ উল্টো। সংলাপে শর্ত জুড়ে দিয়ে বিরোধী দলের সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে এবং সর্বশেষে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার তার দুর্বলতাকেই ঢাকবার চেষ্টা করছে। এই ধরণের অস্থিরতা থেকে সরকারকে দ্রুত বেরিয়ে আসা উচিত।

মহিউদ্দিন খান আলমগীর একজন শিক্ষিত ও জ্ঞানী মানুষ। একটি সম্ভান্ত পরিবারেই তাঁর জন্ম। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক একজন মন্ত্রী হিসেবে মন্তব্য প্রদানের সময় তিনি সতর্ক থাকছেন না বলে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে সরকারের সাথে সাথে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও বিব্রত হচ্ছেন। সাবেক এই আমলা আওয়ামী লীগের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা জানি না কিন্তু তার কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের প্রকৃত ত্যাগী নেতা-কর্মীদের আহত করছে প্রতিনিয়ত। বিব্রত হচ্ছেন অনেক প্রবীণ ও ত্যাগী নেতৃবৃন্দ। এতে দল গতিশীলতা হারায়। যা একটি প্রাচীন ও গণতান্ত্রিক দলের জন্যে শুভ লক্ষণ নয়।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০১৩

' অনেক চ্যানেল, অনেক বলা '

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
-কামরুল হাসান বাদল
সম্ভবত ৭০ দশকের একটি ঢাকাইয়া ছবির নাম ছিল ‘অনেক প্রেম অনেক জ্বালা।’ আজকের লেখার শিরোনামটি তার ছায়া অবলম্বনে। ঢাকার ছবির কথাই যখন উঠলো তখন এখান থেকেই শুরু করি। মুম্বাইয়ার ধুমধারাক্কা ছবি ব্যর্থ অনুকরণে নির্মিত তথাকথিত অ্যাকশনধর্মী ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় একজন নায়ক (ত্রিভূজ প্রেমের ক্ষেত্রেগুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে অথচ কোথায় তাকে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নেয়া জরুরি। তা না করে বেঁচে থাকা নায়কআনন্দিত কিন্তু অশ্রুসিক্ত নায়িকা ও অন্যরা মিনিটের পর মিনিট তার না বলা কথাগুলো শুনে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত বাঘের বাচ্চা কথা বলতে বলতেই মৃত্যুবরণ করে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটি শেষ পর্যন্ত হয় না।

এসব দৃশ্য মনে পড়লো সম্প্রতি দেশের বিকশিত টিভি চ্যানেলগুলোর উপস্থাপক ও রিপোর্টারদের অনর্গল কথা বলার প্রবণতা দেখতে দেখতে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্ময়কর এক প্রতিভা। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখা তিনি সমৃদ্ধ করেছেন আপন মেধাপ্রজ্ঞা ও আলোয়। সারা জীবন সিরিয়াস লেখালেখি করলেও ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন ভীষণ-প্রাণবন্ত ও রসবোধ সম্পন্ন। অনেক বিষয় নিয়ে অনেকের সাথে তাঁর মজার মজার ঘটনা আছে। সেগুলো অন্যদিন আলোচনা করবো হয়তো আজকের প্রসঙ্গেই আসি। রবীন্দ্রনাথ এমনই ছিলেন যে মৃত্যু অবধারিত জেনেও মৃত্যুশয্যায় তিনি রসিকতা না করে থাকতে পারেননি। আজ আমার মনে হয় তিনি এই সময় অর্থাৎ ২০১৩ সালে বঙ্গদেশে এমন চ্যানেল প্রাবল্যের সময় যদি মৃত্যুবরণ করতেন তবে রসিকতা বুঝি করতে পারতেন না। তাঁকে সে সুযোগ দিতো না টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার বন্ধুরা। দৃশ্যটি হয়তো এমন হতো গুরুদেবকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে উঠছে প্রতিক্ষণে। তার চারপাশে অসংখ্য ডাক্তার নার্স আর মেডিক্যালের যন্ত্রপাতি তাঁর ফাঁক দিয়ে কোন এক চ্যানেলের ক্যামেরা বসিয়ে দেয়া হয়েছে আর গুরুদেবকে সে মুহূর্তে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে আপনার কেমন লাগছে। মানে এই যে কিছুক্ষণ পরে আপনি মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন। তা ভাবতে কেমন লাগছে। দেখা গেল এরই ফাঁকে আরেকটি চ্যানেল ঢুকে গেছে লাইভ দেখাতে এবং সেখান থেকে সিনিয়র রিপোর্টার (বিশ্বকবি বলে সিনিয়র রিপোর্টার পাঠানো হয়েছেগুরুদেবকে বলছেন শুনেছি মৃত্যুশয্যায়ও আপনি রসিকতা করে থাকেন এই মুহূর্তে আমাদের দর্শকদের জন্যে এমন কিছু কি বলবেন যাতে তারা আনন্দ পায়। বলা যায় না এটাই হয়ত আপনার শেষ রসিকতা হতে পারে।

এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যা বলতেন তা বোঝা যাক বা না যাক সিনিয়র রিপোর্টার আবার বলবেন পারমিতা ‘গুরুদেব যেমনটি বলছিলেন.....।’
পারমিতারা পারে বটে। আর যাই হোক অন্তত অনর্গল কথা বলতে পারেন। প্রয়োজনে অতিথিদের ধমক দিয়ে থামিয়ে নিজের জ্ঞানের বহর দেখিয়ে ছাড়বেন। আর তা করবেনই না বা কেন কম জানলে কি আর টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার বা প্রেজেন্টার হতে পারতেন।

সরাসরি সম্প্রচারের প্রাবল্যে দেশ ভেসে যাচ্ছে। যাই পাচ্ছে তাই সরাসরি দেখানো হচ্ছে। ক’দিন আগে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে যশোর সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ হেলিকপ্টার আর তারপরে বিমানবন্দর থেকে মাইক্রোতে র‌্যাব হেড কোয়ার্টারে আনা পর্যন্ত নিরস অপ্রয়োজনীয় বিষয়টি বিরক্তিকর ভাবে সরাসরি সম্প্রসারিত হলো। মাইক্রোর অভ্যন্তরে কে আছে তা দেখা যাচ্ছে না অকারণে তাকে ফলো করা হলো (মাফ করবেন ফলো করা মানে পেছনে পেছনে আসা এক্ষেত্রে চ্যানেলের গাড়িটি ছিল রানাকে বহনকারী মাইক্রোর সামনে। এভাবে সামনে সামনে থাকলে তাকে কী বলে বুঝতে পারছি নাএবং জ্যামে পড়ার কারণে এক পর্যায়ে ক্যামেরা পার্সন ও রিপোর্টার মাইক্রোর ভিতরে বসা রানার শর্ট নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু র‌্যাব সদস্যদের অসহযোগিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
জনসভা সরাসরি সম্প্রচারিত হলো তারপরেও আবার নেতৃবৃন্দের কাউকে কাউকে এক পাশে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে যার উত্তর ইতিমধ্যে জনসভায় পাওয়া গেছে। দেখা যাচ্ছে রিপোর্টার আপনাকে যেমনটি বলছিলাম বলে শুরু করেতো আর থামেনা। খবর পাঠককে পেছন থেকে প্রয়োজনে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন ‘ইন্টারফারেন্স করছে কিন্তু বেচারা খবর পাঠক মাঝে মাঝে সামান্যতম বিরতি পাচ্ছেন না যেখানে রিপোর্টারকে থামানো যায়। রিপোর্টার তার ইচ্ছেমতো স্ক্রিনে থেকে ক্ষান্ত দিলেন এমনটিই বলছিলেন সমাবেশে যোগ দিতে আসা ময়নার মা বলে।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন থেকে চসল আসলেও সম্প্রতি সাভারে ভবন ধসের পরে রীতিমতো অসহনীয় হয়ে উঠেছে। সদ্য উদ্ধার হওয়া একজন মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার আগেই তাকে ঘিরে ধরছে একদল সাংবাদিক “এখন আপনার অনুভূতি কীআসলে তখন পর্যন্ত লোকটি ছিল অনুভূতিহীন। অনেক বাজে ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা হয়েছে অনেককে। মৃত্যুকূপ থেকে বেরিয়ে আসা নারী শ্রমিকদের মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয়া হচ্ছে সে আর জীবনে কখনো তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করবে না বলে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটালেন দেশের এক সিনিয়র টিভি জার্নালিস্ট। বিশিষ্ট জনদের সংবাদ ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে যিনি এখন তারকা সাংবাদিক। জীবনজয়ী রেশমাকে উদ্ধারের পরপর তার বেশভূষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এখন নিন্দিত হচ্ছেন অনেক মহল থেকে।

সমস্যাটি আমাদের মাত্রা ও শালীনতা বোধের। দেশের সকল ক্ষেত্র থেকেই এই মাত্রাজ্ঞান ও শালীনতাবোধ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরেই আমাদের এই দৈন্য চলছে। এই মাসে যুক্ত হয়েছে আত্মপ্রচারের প্রবণতাও। নিজেকে দেখানোর নিজেকে প্রচার করার এবং তা অত্যন্ত শর্টকাট পথে তা অবৈধই হোক। তাতে যেন কিছুই যায় আসে না। দেশে এখন কোনটি নিউজ চ্যানেলকোনটি অ্যান্টার টেইনমেন্ট চ্যানেল তা বোঝার সাধ্য নেই। রাত ৯টা সাড়ে ৯ টার পর থেকে মধ্যরাত অবধি শুধুই টক শোশুধুই আলোচনা। বিশ্বের অনেক চ্যানেল বাংলাদেশেও দেখা যায়। আমি জানি না আর কোথাও এমন মানে শুধু কথা বলার জন্যে মানুষ এত উদগ্রীব শোনার জন্যে এতো আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে কিনা। শুধু কথাবার্তা আর ঝগড়া-ফ্যাসাদ দেখানোর অনুষ্ঠানগুলোও স্পন্সর হয়।

প্রিন্টিং মিডিয়ার জন্যে ন্যূনতম একটি নীতিমালা আছে। কমপক্ষে দশ বছরের সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা না থাকলে সম্পাদক হিসেবে নাম তোলা যায় না। এখানে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিটিই বার্তা সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় রাজনীতিবিদ আর টাকাওয়ালা হলেই চ্যানেলের মালিক হওয়া যায়। আর কোন চ্যানেলে ভাল করে দু বছরের মতো রিপোর্টিং করলেই অন্য নতুন চ্যানেলে বার্তা সম্পাদক হওয়া যায়। যার কারণে টিভি স্ক্রলে ভুল বানানোর ছড়াছড়ি দেখে আর বিস্মিত হই না।

বর্তমানে সরাসরি অনুষ্ঠানের প্রাবল্য দেখে আমার ভয় হয় কোনদিন না আবার পাবলিক টয়লেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখাতে গিয়ে উদ্বোধনের প্রাকটিক্যাল দৃশ্য দেখিয়ে না ফেলে। এ যেনো টেলিভিশন মিডিয়ার শিক্ষানবীশকাল চলছে। সংবাদপাঠক বললেন, ‘বিস্তারিত দেখুন আমাদের প্রতিবেদনে। তারপরে আর প্রতিবেদন আসে না। সংবাদ পাঠকের উশখুশ চেহারায় বোঝা যায় কিছু একটা হয়েছে। তিনি একটু পরপর বলছেন আমরা প্রতিবেদনটির জন্য অপেক্ষা করছি। শেষে হয়তো বললেনপ্রিয় দর্শকপ্রতিবেদনটি হাতে এলে আপনাদের তা দেখাবোচলে যাচ্ছি পরবর্তী খবরে। মনে হয় যেনো প্রতিবেদনটি রিপোর্টার কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠিয়েছেন। হরতালে আটকা পড়ে হাতে আসেনি। আবার দেখা গেলো সংবাদ পাঠিকা বা টক শো’র প্রেজেন্টার বলছেনঘটনাস্থলে আছে আমাদের প্রতিনিধি অমুকতার কাছেই শোনা যাক সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি কি। ‘অমুক’ আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু দেখা গেল রিপোর্টার কিছু শুনতে পাচ্ছেন না। এদিকে স্টুডিও থেকে বারবার তাগিদ এবং শেষের দিকে প্রায় ধমকের মতো ‘আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন না’দর্শকদের বিরক্তি ঘটিয়ে শেষে স্টুডিও থেকে বলা হলো ’দর্শক আমরা সংযোগ দিতে পারিনি। চলে যাচ্ছি বরইতলী গ্রামে মুড়ি উৎসবে আমাদের প্রতিবেদক তমুকের কাছে। ঠিক সে সময় আগের রিপোর্টারের কক্ত শোনা গেলো,শমরিতা আমি আপনাকে শুনতে পাচ্ছি।

এসব ত্রুটি ঘটছে কিন্তু প্রতিযোগিতাও তাড়াহুড়া করতে গিয়ে। কার আগে কে লাইভ দেখাবে এই নিয়ে চলে দারুণ প্রতিযোগিতা। আর এতে দুএকটা টিভির অতি আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। ইতিমধ্যে আমাদের টেলিভিশনগুলো শিক্ষা-সংস্কৃতি তথা সঙ্গীতের বারোটা বাজিয়েছেন এসএমএসের মাধ্যমে তারকা শিল্পী তা এসএমএস শিল্পী তৈরি করে। গাইতে পারুক না পারুক শিল্পী নিজের এলাকায় পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণ ভোট চেয়ে শিল্পী হয়ে উঠছেন।

আমার মনে হয় সাংবাদিকতার একটা মানদণ্ড থাকা উচিত। পরিমিত ও মাত্রাজ্ঞানবোধ প্রখর হওয়া প্রয়োজন। কোন প্রশ্নটি করা যাবেকখন করা যাবে বা কিভাবে করা উচিত সে শিক্ষা ও বোধটুকু ন্যূনতম থাকা আবশ্যক। আর টেলিভিশন যেহেতু ভিজুয়াল গণমাধ্যম সে ক্ষেত্রে পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে উচ্চারণ সবকিছুতে একটু মান থাকা জরুরি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

শনিবার, ১১ মে, ২০১৩

' সব সম্ভবের দেশ '

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
কামরুল হাসান বাদল

গোয়েবলসহিটলারের এই উপদেশটা আমার কাছে প্রাত:স্মরণীয় হয়ে উঠছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি এবং দর্শনের (?) কারণে। তিনি বলেছিলেন একটি মিথ্যাকে দশবার প্রচার করতে থাকো এক সময়ে তা সত্যে পরিণত হবে। হিটলারের সমপরিমাণ ঘৃণিত গোয়েব্‌লস বেঁচে নেই সত্য তবে তার এই উক্তি,কর্ম কিংবা দর্শনকে বাংলাদেশের মতো ৯০মুসলমানের দেশে আপ্তবাক্য মনে করে টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকোরআনকে যারা সংবিধান হিসেবে মানেন ইসলামী উগ্রপন্থী জামায়াতে ইসলামী এবং নাস্তিকতার সার্টিফিকেট প্রদানকারী ও ইসলামের হেফাজতকারী হিসেবে দাবিদার হেফাজতে ইসলাম।
গোয়েবলস মরে গিয়ে বেঁচেছেন নতুবা মিথ্যাচারের এমন বেসাতি দেখে লজ্জাদুঃখে আর অপমানে হয়তো আত্মহত্যাই করতেন। মিথ্যা কত প্রকার ও কী কী এবং নির্জলা একটি মিথ্যাকে কীভাবে শিল্পশোভিতদৃষ্টি ও শ্রুতিনন্দন করা যায় তা বোধহয় বিশ্বে বর্তমান এই তিন শক্তির চেয়ে বেশি ভাল কেউ জানে না।
গত ৫ মে মধ্যরাত থেকে ৬মে সোমবার প্রায় দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল যারা দেখেছেন এবং দুঃখজনকভাবে ঘটনার বিস্তৃতিবর্ণনা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের কারো কাছে বর্তমানে বিএনপি-হেফাজতের কর্মী সমর্থক ও মুখপ্রাপ্তদের কথার সামান্যতমও মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি যেন এমন, “আরে কী দেখেছিল তা রাখ আমি কী শুনে এলাম তা-ই শোন।’
বিশ্বের কোন দেশে সরকার বিরোধী কোন সমাবেশ এত কম সহিংসতা ও রক্তপাতে বন্ধ করা গেছে বলে আমার জানা নেই। চীনের তিয়েন ইয়েন স্কয়ারমিশরের তাহরির স্কয়ার ইত্যাদির কথা বিশ্বের মানুষ ভোলেনি। যদিও যে দু’টি সমাবেশ ছিল একনায়ক বা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে। বাংলাদেশের বাস্তবতা তা নয়। বরং বর্তমান বাংলাদেশের মতো এত বেশি গণতান্ত্রিক দেশ আর কোথাও আছে কি না তা নিয়েই আমি সন্দেহ পোষণ করি। আমার এই কথায় কিছু কিছু ইনটেলেকচুয়াল ব্যঙ্গ হাসি দেখতেও পারেন। তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে জামাত-বিএনপি ও যুদ্ধাপরাধীদের সমালোচনা করলে তাদের বলা হয় ভারতের দালাল আর আওয়ামী লীগসহ গণজাগরণ মঞ্চকে গালাগাল করলে তাদের বলা হয় ভেরি ইন্টেলেকচুয়াল।
বাংলাদেশে যদি এত অবাধ গণতন্ত্র নাই থাকতো তাহলে জামাত-শিবির এই দেশে রাজনীতি করে কী করে। হেফাজতে ইসলাম সমাবেশ করছে কী ভাবেকারণ এই দুই দল বা শক্তি যারা নামে আলাদা হলেও আকিদাদর্শনবিশ্বাসরাজনীতি ও আচরণের দিক দিয়ে অভিন্ন। এরাতো গণতন্ত্রই বিশ্বাস করে না। এরা গণতন্ত্রনির্বাচনপরমত সহিষ্ণুতাউদারতার ধারও ধারে না। অন্য ধর্মের প্রতি এদের সামান্যতম সৌজন্যতাবোধও নেই। এরা নিজেরাই ভাল জানে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন এদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না আর এ কারণেই তারা হত্যালুণ্ঠনঅগ্নিসংযোগনৈরাজ্য ও পেশিশক্তির জোরে ক্ষমতায় আসতে চায়। বিশ্বের সকল ধর্মীয় উগ্রবাদী দলগুলোর এই একটি বিষয়ে রয়েছে সম্পূর্ণ অভিন্নতা। যে কারণে ইউরোপআমেরিকা সহ বিশ্বের নানা দেশের বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোর সারা বছর জনগণ ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। এই অপশক্তিগুলোর কাছে মানুষের কোন দাম নেই। ক্ষমতাই এদের কাছে প্রধান। এ ক্ষেত্রে তাদের আদর্শ হিটলারমুসোলিনি এবং সমকালের ওসামা-বিনলাদেনদের মতো উগ্রকট্টর তথাকথিত ইসলামী নেতারা।
জামাত-হেফাজত পূর্বেই বলেছি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সকল সুবিধা নিয়ে এবং গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে আচরণ করে ফ্যাসিবাদী এবং অনেকটা দস্যুদের মতো। গত ডিসেম্বর থেকে জামাত-শিবির এবং গত ফেব্রুয়ারি থেকে হেফাজতে ইসলাম সারাদেশ জুড়ে যে তান্ডবের রাজত্ব শুরু করেছে তাকে গণতান্ত্রিক আচরণের কোন ব্যাখ্যায় ফেলা যাবেগত ছয় মাসে দেশের যে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করা হয়েছেমানুষ হত্যা করা হয়েছে নির্বিচারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর লোকদের হত্যা করা হয়েছে বিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক দেশে এমন করা সম্ভববিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক সরকার এমন হত্যাধ্বংসনৈরাজ্য মেনে নেবেকোন সে দেশ?রক্তের দাগ না মুছতেইশোক না কাটতেই এমন কি এখনো যেখানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে এবং প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০টি লাশ উদ্ধার হচ্ছেস্বজনদের আহাজারিতে বাংলার বাতাস ভারি হয়ে উঠছে তেমন একটি পরিস্থিতিতে কী এমন দাবি আদায় এবং তার জন্যে এত তাড়াহুড়া করে ঢাকা অবরোধের নামে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করতে হবেআসলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জন্ম নেয়া বিএনপি ষড়যন্ত্র ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার বিকল্পই ভাবতে পারে না।
সাভারের ঘটনার পরে সারাদেশে শোকের আবহ। তার সাথে যুক্ত হয়েছে বিদেশে এই শিল্প নিয়ে বিরূপ প্রচার না। এদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থানে ও সাফল্যে দেশে-বিদেশে যারা ইর্ষান্বিত তাদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কোথায় একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তানা করে এই সংকট মুহূর্তেও বিএনপিহেফাজতের কাঁধে চড়ে বঙ্গভবনে যেতে চেয়েছিল। এবং তার নীল নক্‌শা অনুযায়ী সাজানো হয়েছিল হেফাজতের অবরোধ আর বিএনপির ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম।
প্রধানমন্ত্রী আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দেরিতে হলেও জনগণ তাতে আশ্বস্তই হয়েছিল। কিন্তু হেফাজতের ৫ মে’র অবরোধ কর্মসূচিকে মাথায় রেখে লাগাতার অবস্থান করে রাজধানীকে অচল করে দিয়ে সরকার পতনের আশায় বিএনপি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে উল্টো ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বসে। সম্ভবত ক্ষমতায় যাওয়ার এত শর্টকার্ট রাস্তা পেয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলেন বিরোধী দলের নেতারা। হেফাজতকে অবরোধের সুযোগ দেয়া আর সে সাথে আলোচনার প্রস্তাবকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে বিএনপি যে রাজনৈতিক ভুল চাল চেলেছে তা দলকে রাজনৈতিকভাবে আরো দেউলিয়া করে দিল। এ প্রসঙ্গে একটি আগাম কথা বলে রাখিবাংলাদেশের রাজনীতির ধারা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে বা বলা যেতে পারে রাজনৈতিক মেরুকরণ হচ্ছে তাতে আমার ধারণা বাংলাদেশে বর্তমানের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে মত দুটি শক্তিরই অস্তিত্ব থাকবে। তার একটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রগতিশীলধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক শক্তি অন্যটি বর্তমান নামে হোক বা অন্য নামে হোক জামাত-হেফাজতেরনেতৃত্বে উগ্র-সাম্প্রদায়িক চরম ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সেখানে বিএনপির মতো সুবিধা ভোগী নেতাদের সমন্বয়ে গড়া জগা খিচুড়ি মার্কা রাজনৈতিক দলের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। আগামী নির্বাচনের জয়লাভ করতে না পারলে এই দলের অবস্থান মুসলিম লীগের চেয়েও খারাপ হবে। এক্ষেত্রে আগামী নির্বাচন যদি সঠিক অর্থে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় এবং সে সাথে আওয়ামী লীগ যদি সকল দোদুল্যমনতা ঝেড়ে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে থেকে তরুণ প্রজন্মকে আস্থায় নিতে পারে সেক্ষেত্রে বিএনপির জয় লাভেরও কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক কারণে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো ইসলামী জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে না। কোন বৃহৎ ও পরাশক্তির দাবার ঘুটি হিসেবে তা যদি কখনো হয়ও সেক্ষেত্রে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের অখন্ডতা রক্ষিত হবে বলে মনে হয় না।
হেফাজতিরা মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিল মিথ্যা কথা বলে। এবং এক সময় তাদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে তারা পালিয়ে যায়। দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা ভেবে সরকারের যা করা উচিৎ বর্তমান সরকার তাই করেছে অর্থাৎ তাদেরকে সমাবেশস্থল থেকে উচ্ছেদ করেছে। এরপর বিএনপির আচরণে মনে হয়েছে, ‘যার বিয়া তার খবর নাইপাড়া পড়শীর ঘুম নাই’ এর মতো। হেফাজতিরা কিছু বলার আগে আগ বাড়িয়ে বিএনপিই বলছে এত হাজার লোক মারা গেছে। এবং নিহতদের উদ্দেশ্যে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। হেফাজত থেকেই বলা হলো তারা শুধু নিহতদের উদ্দেশ্যে দোয়া করবে।
ঘটনার পরে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আমলা এম.কে আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেছেন বায়তুল মোকাররমে জ্বালাও পোড়াও পবিত্র কোরআন শরীফে আগুন দিয়েছে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। অন্যদিকে হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরীর অভিযোগ হেফাজত নয়আওয়ামী ওলেমা লীগের কর্মীরাই পায়জামা পাঞ্জাবি পরে এই জঘন্য কাজ করেছে। সত্য অবিকৃত থাকে আর মিথ্যা রং বদলায়। বানিয়ে বলতে হয় বলে একেকবার একেক ধরনের বক্তব্য হয়ে যায়। বিএনপি-জামাত-হেফাজতিতের সমর্থকরা ইসলামী ও দিগন্ত টেলিভিশন ছাড়া অন্য টিভি চ্যানেল দেখেন কিনাদেখলে তা বিশ্বাস করেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। এই দুটি চ্যানেল বর্তমানে বন্ধ থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের লোকদেরই মিথ্যা প্রচারকে কেন্দ্র করে দাবি করছে ৫ মে মধ্যরাতের পর শাপলা চত্বরে অভিযান চলাকালে হাজার হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। সমস্ত টিভি চ্যানেলপ্রিন্টিং মিডিয়াসহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমের শত শত লোক ছাড়াও মতিঝিল এলাকার অনেকের মোবাইলে তোলা সমস্ত প্রমাণকে মিথ্যা বলে বিএনপি-জামাত-হেফাজত যা বলতে চাইছে তার বিপক্ষে অনেকে বলেছেন প্রমাণের জন্যে সাভার ঘটনার পরে আহত-নিহতদের স্বজনদের মতো তালিকা উপস্থিত করা হোক।
এই জাতির কোন মনস্তাত্বিক সমস্যা হয়েছে বলে আমার ধারণা। বাংলাদেশে বর্তমানে যা চলছে তা কোন সভ্য জাতির আচরণ বলে মনে হচ্ছে না। মানসিক সুস্থতা নিয়ে বাস করাও দুরূহ হয়ে উঠছে এখন। মানসিক অবস্থাও যে স্বাভাবিক নয়সবকিছুকে গুছিয়েও বলা যাচ্ছে না বর্তমান লেখাটিও তার একটি প্রমাণ।
সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যার জয় হয় কি না তা দেখবার প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি আমি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ