দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
-কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
-কামরুল হাসান বাদল
সম্ভবত ৭০ দশকের একটি ঢাকাইয়া ছবির নাম ছিল ‘অনেক প্রেম অনেক জ্বালা।’ আজকের লেখার শিরোনামটি তার ছায়া অবলম্বনে। ঢাকার ছবির কথাই যখন উঠলো তখন এখান থেকেই শুরু করি। মুম্বাইয়ার ধুমধারাক্কা ছবি ব্যর্থ অনুকরণে নির্মিত তথাকথিত অ্যাকশনধর্মী ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় একজন নায়ক (ত্রিভূজ প্রেমের ক্ষেত্রে) গুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে অথচ কোথায় তাকে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নেয়া জরুরি। তা না করে বেঁচে থাকা নায়ক, আনন্দিত কিন্তু অশ্রুসিক্ত নায়িকা ও অন্যরা মিনিটের পর মিনিট তার না বলা কথাগুলো শুনে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত বাঘের বাচ্চা কথা বলতে বলতেই মৃত্যুবরণ করে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটি শেষ পর্যন্ত হয় না।
এসব দৃশ্য মনে পড়লো সম্প্রতি দেশের বিকশিত টিভি চ্যানেলগুলোর উপস্থাপক ও রিপোর্টারদের অনর্গল কথা বলার প্রবণতা দেখতে দেখতে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্ময়কর এক প্রতিভা। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখা তিনি সমৃদ্ধ করেছেন আপন মেধা, প্রজ্ঞা ও আলোয়। সারা জীবন সিরিয়াস লেখালেখি করলেও ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন ভীষণ-প্রাণবন্ত ও রসবোধ সম্পন্ন। অনেক বিষয় নিয়ে অনেকের সাথে তাঁর মজার মজার ঘটনা আছে। সেগুলো অন্যদিন আলোচনা করবো হয়তো আজকের প্রসঙ্গেই আসি। রবীন্দ্রনাথ এমনই ছিলেন যে মৃত্যু অবধারিত জেনেও মৃত্যুশয্যায় তিনি রসিকতা না করে থাকতে পারেননি। আজ আমার মনে হয় তিনি এই সময় অর্থাৎ ২০১৩ সালে বঙ্গদেশে এমন চ্যানেল প্রাবল্যের সময় যদি মৃত্যুবরণ করতেন তবে রসিকতা বুঝি করতে পারতেন না। তাঁকে সে সুযোগ দিতো না টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার বন্ধুরা। দৃশ্যটি হয়তো এমন হতো গুরুদেবকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে উঠছে প্রতিক্ষণে। তার চারপাশে অসংখ্য ডাক্তার নার্স আর মেডিক্যালের যন্ত্রপাতি তাঁর ফাঁক দিয়ে কোন এক চ্যানেলের ক্যামেরা বসিয়ে দেয়া হয়েছে আর গুরুদেবকে সে মুহূর্তে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে আপনার কেমন লাগছে। মানে এই যে কিছুক্ষণ পরে আপনি মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন। তা ভাবতে কেমন লাগছে। দেখা গেল এরই ফাঁকে আরেকটি চ্যানেল ঢুকে গেছে লাইভ দেখাতে এবং সেখান থেকে সিনিয়র রিপোর্টার (বিশ্বকবি বলে সিনিয়র রিপোর্টার পাঠানো হয়েছে) গুরুদেবকে বলছেন শুনেছি মৃত্যুশয্যায়ও আপনি রসিকতা করে থাকেন এই মুহূর্তে আমাদের দর্শকদের জন্যে এমন কিছু কি বলবেন যাতে তারা আনন্দ পায়। বলা যায় না এটাই হয়ত আপনার শেষ রসিকতা হতে পারে।
এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যা বলতেন তা বোঝা যাক বা না যাক সিনিয়র রিপোর্টার আবার বলবেন পারমিতা ‘গুরুদেব যেমনটি বলছিলেন.....।’
পারমিতারা পারে বটে। আর যাই হোক অন্তত অনর্গল কথা বলতে পারেন। প্রয়োজনে অতিথিদের ধমক দিয়ে থামিয়ে নিজের জ্ঞানের বহর দেখিয়ে ছাড়বেন। আর তা করবেনই না বা কেন কম জানলে কি আর টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার বা প্রেজেন্টার হতে পারতেন।
সরাসরি সম্প্রচারের প্রাবল্যে দেশ ভেসে যাচ্ছে। যাই পাচ্ছে তাই সরাসরি দেখানো হচ্ছে। ক’দিন আগে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে যশোর সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ হেলিকপ্টার আর তারপরে বিমানবন্দর থেকে মাইক্রোতে র্যাব হেড কোয়ার্টারে আনা পর্যন্ত নিরস অপ্রয়োজনীয় বিষয়টি বিরক্তিকর ভাবে সরাসরি সম্প্রসারিত হলো। মাইক্রোর অভ্যন্তরে কে আছে তা দেখা যাচ্ছে না অকারণে তাকে ফলো করা হলো (মাফ করবেন ফলো করা মানে পেছনে পেছনে আসা এক্ষেত্রে চ্যানেলের গাড়িটি ছিল রানাকে বহনকারী মাইক্রোর সামনে। এভাবে সামনে সামনে থাকলে তাকে কী বলে বুঝতে পারছি না) এবং জ্যামে পড়ার কারণে এক পর্যায়ে ক্যামেরা পার্সন ও রিপোর্টার মাইক্রোর ভিতরে বসা রানার শর্ট নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু র্যাব সদস্যদের অসহযোগিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
জনসভা সরাসরি সম্প্রচারিত হলো তারপরেও আবার নেতৃবৃন্দের কাউকে কাউকে এক পাশে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে যার উত্তর ইতিমধ্যে জনসভায় পাওয়া গেছে। দেখা যাচ্ছে রিপোর্টার আপনাকে যেমনটি বলছিলাম বলে শুরু করেতো আর থামেনা। খবর পাঠককে পেছন থেকে প্রয়োজনে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন ‘ইন্টারফারেন্স করছে কিন্তু বেচারা খবর পাঠক মাঝে মাঝে সামান্যতম বিরতি পাচ্ছেন না যেখানে রিপোর্টারকে থামানো যায়। রিপোর্টার তার ইচ্ছেমতো স্ক্রিনে থেকে ক্ষান্ত দিলেন এমনটিই বলছিলেন সমাবেশে যোগ দিতে আসা ময়নার মা বলে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন থেকে চসল আসলেও সম্প্রতি সাভারে ভবন ধসের পরে রীতিমতো অসহনীয় হয়ে উঠেছে। সদ্য উদ্ধার হওয়া একজন মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার আগেই তাকে ঘিরে ধরছে একদল সাংবাদিক “এখন আপনার অনুভূতি কী, আসলে তখন পর্যন্ত লোকটি ছিল অনুভূতিহীন। অনেক বাজে ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা হয়েছে অনেককে। মৃত্যুকূপ থেকে বেরিয়ে আসা নারী শ্রমিকদের মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয়া হচ্ছে সে আর জীবনে কখনো তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করবে না বলে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটালেন দেশের এক সিনিয়র টিভি জার্নালিস্ট। বিশিষ্ট জনদের সংবাদ ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে যিনি এখন তারকা সাংবাদিক। জীবনজয়ী রেশমাকে উদ্ধারের পরপর তার বেশভূষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এখন নিন্দিত হচ্ছেন অনেক মহল থেকে।
সমস্যাটি আমাদের মাত্রা ও শালীনতা বোধের। দেশের সকল ক্ষেত্র থেকেই এই মাত্রাজ্ঞান ও শালীনতাবোধ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরেই আমাদের এই দৈন্য চলছে। এই মাসে যুক্ত হয়েছে আত্মপ্রচারের প্রবণতাও। নিজেকে দেখানোর নিজেকে প্রচার করার এবং তা অত্যন্ত শর্টকাট পথে তা অবৈধই হোক। তাতে যেন কিছুই যায় আসে না। দেশে এখন কোনটি নিউজ চ্যানেল, কোনটি অ্যান্টার টেইনমেন্ট চ্যানেল তা বোঝার সাধ্য নেই। রাত ৯টা সাড়ে ৯ টার পর থেকে মধ্যরাত অবধি শুধুই টক শো; শুধুই আলোচনা। বিশ্বের অনেক চ্যানেল বাংলাদেশেও দেখা যায়। আমি জানি না আর কোথাও এমন মানে শুধু কথা বলার জন্যে মানুষ এত উদগ্রীব শোনার জন্যে এতো আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে কিনা। শুধু কথাবার্তা আর ঝগড়া-ফ্যাসাদ দেখানোর অনুষ্ঠানগুলোও স্পন্সর হয়।
প্রিন্টিং মিডিয়ার জন্যে ন্যূনতম একটি নীতিমালা আছে। কমপক্ষে দশ বছরের সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা না থাকলে সম্পাদক হিসেবে নাম তোলা যায় না। এখানে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিটিই বার্তা সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় রাজনীতিবিদ আর টাকাওয়ালা হলেই চ্যানেলের মালিক হওয়া যায়। আর কোন চ্যানেলে ভাল করে দু বছরের মতো রিপোর্টিং করলেই অন্য নতুন চ্যানেলে বার্তা সম্পাদক হওয়া যায়। যার কারণে টিভি স্ক্রলে ভুল বানানোর ছড়াছড়ি দেখে আর বিস্মিত হই না।
বর্তমানে সরাসরি অনুষ্ঠানের প্রাবল্য দেখে আমার ভয় হয় কোনদিন না আবার পাবলিক টয়লেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখাতে গিয়ে উদ্বোধনের প্রাকটিক্যাল দৃশ্য দেখিয়ে না ফেলে। এ যেনো টেলিভিশন মিডিয়ার শিক্ষানবীশকাল চলছে। সংবাদপাঠক বললেন, ‘বিস্তারিত দেখুন আমাদের প্রতিবেদনে। তারপরে আর প্রতিবেদন আসে না। সংবাদ পাঠকের উশখুশ চেহারায় বোঝা যায় কিছু একটা হয়েছে। তিনি একটু পরপর বলছেন আমরা প্রতিবেদনটির জন্য অপেক্ষা করছি। শেষে হয়তো বললেন, প্রিয় দর্শক, প্রতিবেদনটি হাতে এলে আপনাদের তা দেখাবো, চলে যাচ্ছি পরবর্তী খবরে। মনে হয় যেনো প্রতিবেদনটি রিপোর্টার কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠিয়েছেন। হরতালে আটকা পড়ে হাতে আসেনি। আবার দেখা গেলো সংবাদ পাঠিকা বা টক শো’র প্রেজেন্টার বলছেন, ঘটনাস্থলে আছে আমাদের প্রতিনিধি অমুক, তার কাছেই শোনা যাক সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি কি। ‘অমুক’ আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু দেখা গেল রিপোর্টার কিছু শুনতে পাচ্ছেন না। এদিকে স্টুডিও থেকে বারবার তাগিদ এবং শেষের দিকে প্রায় ধমকের মতো ‘আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন না’? দর্শকদের বিরক্তি ঘটিয়ে শেষে স্টুডিও থেকে বলা হলো ’দর্শক আমরা সংযোগ দিতে পারিনি। চলে যাচ্ছি বরইতলী গ্রামে মুড়ি উৎসবে আমাদের প্রতিবেদক তমুকের কাছে। ঠিক সে সময় আগের রিপোর্টারের কক্ত শোনা গেলো,শমরিতা আমি আপনাকে শুনতে পাচ্ছি।
এসব ত্রুটি ঘটছে কিন্তু প্রতিযোগিতাও তাড়াহুড়া করতে গিয়ে। কার আগে কে লাইভ দেখাবে এই নিয়ে চলে দারুণ প্রতিযোগিতা। আর এতে দুএকটা টিভির অতি আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। ইতিমধ্যে আমাদের টেলিভিশনগুলো শিক্ষা-সংস্কৃতি তথা সঙ্গীতের বারোটা বাজিয়েছেন এসএমএসের মাধ্যমে তারকা শিল্পী তা এসএমএস শিল্পী তৈরি করে। গাইতে পারুক না পারুক শিল্পী নিজের এলাকায় পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণ ভোট চেয়ে শিল্পী হয়ে উঠছেন।
আমার মনে হয় সাংবাদিকতার একটা মানদণ্ড থাকা উচিত। পরিমিত ও মাত্রাজ্ঞানবোধ প্রখর হওয়া প্রয়োজন। কোন প্রশ্নটি করা যাবে, কখন করা যাবে বা কিভাবে করা উচিত সে শিক্ষা ও বোধটুকু ন্যূনতম থাকা আবশ্যক। আর টেলিভিশন যেহেতু ভিজুয়াল গণমাধ্যম সে ক্ষেত্রে পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে উচ্চারণ সবকিছুতে একটু মান থাকা জরুরি।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন