পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ২০১২

* হিমুর কাছে খোলা চিঠি



৩১ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ৯ রজব ১৪৩৩ হিজরি

প্রিয় হিমু, জানি এ চিঠির কোন শব্দ, আবেগ, ক্ষোভ, বেদনা, হতাশা ও আবেদন কিছুই তোমাকে স্পর্শ করবে না। তুমি আজ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। তুমি যেখানে গেছো সেখান থেকে কেউ কখনো ফিরে আসে না, তুমিও আসবেনা জানি। ‘কীরে দোস্ত’ তোমার এ শব্দ শুনে কোন বন্ধু আর চকিত ফিরে তাকাবেনা। তুমি কি তোমার মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে? এ ডাকতো তোমার মা আর কখনো শুনবে না। এই হতভাগিনী প্রতিদিন কতভাবেই না কত চিন্তা করবে তার হিমু হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরে ডেকে উঠবে ‘মা’ বলে। এই হতভাগিনী ঈশ্বরের কাছে তার সমস্ত পুণ্যের বা সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে তার হিমুকে ফেরত চাইবে। কিন্তু পাবে না। এই দুঃখিনী মা গত ২৭ এপ্রিল থেকে পরবর্তী ২৬ দিনের সমস্ত ঘটনাকে একটি দুঃস্বপ্ন ভেবে বারবার আশায় বুক বাঁধার চেষ্টা করবে একদিন ঠিক ঠিক আমার হিমু আমার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু আমরা জানি এমন কি তোমার বাবা ও ছোট ভাইও জানবে তুমি আর কখনো ফিরে আসবে না। শুধু তোমার মা। দুঃখিনী, হতভাগিনী মার মন কখনো তা বুঝবে না। সে তোমার ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তোমার জামা কাপড় থেকে তোমার শরীরের ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করবে, তোমার শূন্য বিছানা তোমার মায়ের বুকের হাহাকারকে বিলাপে আর এক সময় সে বিলাপ থেকে তা পাথর হয়ে তোমার মায়ের বুকে চেপে বসবে, যে পাথর এই বেচারীকে মৃত্যু অবধি বয়ে বেড়াতে হবে। কোন পাপ স্পর্শ করবার আগে, জীবনের সুধা পান করবার আগে, পৃথিবীর এত সৌন্দর্য্য মন ভরে দেখবার আগে, মা বাবার স্বপ্ন পূরণের আগে তোমার এ মৃত্যুতে আমরা ব্যথিত, মর্মাহত, লজ্জিত। আমরা অপরাধীর মতো পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি, ব্যর্থতার আমাদের মস্তক নত হতে হতে বুকের কাছে নেমে আসছে। আমি চোখ তুলে তাকাতে পারছি প্রায় তোমার বয়সী আমার একমাত্র সন্তানের দিকে। লজ্জায় ধিক্কারে গ্লানি ও অপমানে ঝাপসা হয়ে উঠছে দৃষ্টি। হিমু, তোমাকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতায় প্রতিদিন বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দাঁড়াতে সত্যি আমি ক্লান্ত হিমু। আমার রাষ্ট্র, আমার দেশ, আমার সমাজ তোমাদের মতো সন্তানদের বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিতে পারছে না কেন? আমরা কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছি এমন একটি সমাজ নির্মাণে যেখানে আমাদের সকল হিমুর নিরাপত্তা থাকবে, তারা বেড়ে উঠবে একটি মুক্ত বাতাবরণে, কোন দীনতা কোন হীনতা, কোন অন্যায় কোন পাপ আমাদের সন্তানদের যেনো স্পর্শ করতে না পারে। আমরা পারিনি। আমাদের এমন অসংখ্য হিমু প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত কোন কারণ ছাড়া, কিংবা কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হচ্ছে। তারতো বিচারও মিলছেনা। তোমাকে যেদিন ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতনের পরে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হলো সেদিন তোমার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, থানা কর্তৃপক্ষ প্রথমে তা নিতে চায়নি। যদি সেদিন পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিতো তবে তোমার খুনিরা হয়ত এভাবে পালিয়ে যেতে পারতো না। একজন নিরপরাধ-তরুণকে অমানবিকভাবে নির্যাতন করে, কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেয়ার পরও অপরাধটি পুলিশের দৃষ্টিতে গুরুত্ব পেলো না কেন? অপরাধীরা সমাজের বিত্তবান বলে? উঁচু শ্রেণীর লোক বলে? তার মানে অপরাধটিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে শেষ পর্যন্ত হিমুকে মরে যেতে হবে? মরে যেতে হলো? তার মানে সমাজের যে লোকদের কাছে একজন হিমুর জীবন একটি কুকুরের চেয়েও নগণ্য তাঁদের বাঁচাতেই দেশের পুলিশ বাহিনীর বেতন ভোগান্তি আমাদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ? তার মানে আমাদের ট্যাক্সের টাকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পোষা হচ্ছে যাদের কাজ হবে সমাজের উঁচু তলার মানুষদের শুধু নিরাপত্তা বিধান করা? এতদিন পরেও অপরাধী কেউ আটক হলো না। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে কৈফিয়ত তলব করতে হবে? তার মানে উচ্চ আদালত মাথা না ঘামালে এ মামলা কি ধামাচাপা পড়ে যেতো? টাকা আর প্রতিপত্তির জোরে পার পেয়ে যেতো অপরাধীরা। পুলিশ তবে আছে কীজন্যে? প্রকাশ্য দিবালোকে আদালতপাড়ায় তরুণীর শ্লীলতাহানীর জন্যে? সাংবাদিকদের বেধড়ক পেটানোর জন্যে? শিক্ষকদের বেত মারার জন্যে? ধর্ষক হয়ে ওঠার জন্যে? মানবাধিকারকে পদদলিত করবার জন্যে? অপরাধীদের বাঁচানোর জন্যে? এমন পুলিশী রাষ্ট্রের জন্যে বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। বাংলাদেশের জন্ম হয়নি ২২ পরিবার থেকে ২৯ হাজার পরিবার গড়ে ওঠার জন্যে। বাংলাদেশের জন্ম হয়নি এভাবে হিমুদের মৃত্যুবরণ করার জন্যে। কোন না কোন উপায়ে অসৎ অর্থে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনিক শ্রেণী ও তাদের পরিবারের ব্যভিচার, অনাচার ও মূল্যবোধ ও আদর্শহীন জীবন-যাপনের দৃশ্য এটি। যেসব পরিবারে মানবতাবোধের কোন চর্চা হয় না, সততার কোন পাঠ শিক্ষা দেয়া হয় না, মূল্যবোধ বা আদর্শের কথা উচ্চারিত হয় না সেসব পরিবারের সন্তানরাতো এমন অমানুষ হিসেবেই গড়ে উঠবে। হিমু, তোমার আমার পরিবারের সন্তানরাতো ওদের কুকুরের খাদ্য হয়ে উঠতে পারি শুধু, বন্ধু হয়ে নয়। তাই ওরা তোমার বন্ধু বেশে এসেছিল বন্ধু হতে নয়। কারণ অর্থ-বিত্ত ছাড়া এমন পরিবারে সম্পর্কের কোন দাম নেই। ওদের সমাজে একজন মানুষ বা একটি পরিবারকে দেখা হয় তার আর্থিক সংগতি নিয়ে তার বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা ও ব্যাংক ব্যালান্স নিয়ে। ওদের আলোচনার কোন সুকুমার শিল্পের কথা থাকে না, যাকে গাড়ির মডেলের কথা, থাকে-মোবাইল ফোনের-মডেলের কথা, শাড়ির ডিজাইনের কথা, জীবনকে ভোগ করার উদগ্র বাসনার কথা। থাকে না জীবনের কথা, সমাজের কথা, থাকে না জীবনের নানা কথা। আমি জানিনা হিমু। তোমার হত্যার সঠিক বিচার এদেশে হবে কিনা। আমি জানি না হিমু, তোমার মতো আরও কত হিমুকে এভাবে প্রাণ দিতে হবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কিংবা এমনকি নিরীহ জীবনযাপন করেও। তোমার মৃত্যুর দায়ভার আমারও। তোমার হত্যার বিচার যদি না হয় তার দায়ভারও আমার। আমি সত্যি করে বলি হিমু। এমন স্বদেশ, এমন বাংলাদেশ আমরা চাইনি। এমন মাতৃভূমির স্বপ্নও আমরা দেখিনি। তবুও এদেশ মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠছে। আমরা খুব সাধারণ মানুষ কী করতে পারি হিমু, শুধু চিৎকার করে বলা ছাড়া ‘‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না”। ‘আমার দেশ না’।


 লেখক : কবি সাংবাদিক, কলামলেখক
 email.qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal 

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১২

* বিদ্যুৎহীন থাকি নিশিদিন---

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                           কাল, আজ, কাল
২৪ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২ রজব ১৪৩৩ হিজরি


অনেক আগে লেখা আমার একটি ছড়া, এই আসে বাতি এই চলে যায়/ চলে যায় বুঝি শরমে,/ আমরা ক’জন থাকি খালি গায়/ চালভাজা হই গরমে।/... বিদ্যুৎহীন থাকি নিশিদিন/ দুঃখ বোঝেনা পিডিবি,/ শুনে বলে তোরা পাবি ঠিক তবে/ বেশি বেশি করে ফি দিবি।/ ছড়ার শেষের পংক্তিটা ঈষৎ পরিবর্তন করেছি, কারণ সরকার এখন বিশেষ দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় বেশি দামে লোডশেডিংহীন বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ওপর লোডশেডিং এর ভার আরও কত বাড়বে তার হিসাব কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা সরকার এখনো দেয়নি। যদিও পুরোদেশ লোডশেডিংএর নামে বিদ্যুৎ সংকটে দিশাহীন। আসলে বিদ্যুৎ সমস্যা কতটা প্রকট তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম ক’দিন আগে গ্রামে গিয়ে। আমাদের গ্রামের বাড়ি রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে ছিলাম গত বৃহস্পতিবার হতে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা গ্রামে অবস্থান করে দেখলাম গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকে প্রকৃত পক্ষে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মতো। শহরের প্রায় উল্টো। শহরে লোডশেডিং হয় ৪ থেকে পাঁচ ঘণ্টা আর গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকেনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। গ্রামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে অনেকে অভিযোগ করেছেন, নামাজের সময়ে লোডশেডিং নিত্য নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে বলে তাদের অনেকের অভিযোগ রমজান মাসে সেহরীর ও ইফতারের সময় লোডশেডিং অবধারিত। অভিযোগকারীদের মধ্যে অনেকে এমনও প্রসঙ্গ তুলেছেন যে, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল, বা হিন্দু সমর্থিত দল বলে প্রমাণ করার জন্যে পল্লী বিদ্যুতের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সময়ে লোডশেডিং এর নামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তাদের অভিযোগ বর্তমান সরকারকে বিব্রত ও জনগণের কাছে অজনপ্রিয় করে তুলবার অপচেষ্টায় সরকারের ভিতরের কিছু লোক এমন দুষ্কর্ম করে চলেছে। বিষয়টি কতটা সত্যি আমি জানিনা তবে বোরো মৌসুমের ধানকাটা হয়ে যাওয়ার পরেও এই দুঃসহ গরমে এমন লোডশেডিং গ্রামের মানুষের জীবনকে সত্যিই যে দুর্বিষহ করে তুলছে তা সচক্ষে দেখলাম। বিদ্যুৎ নিয়ে গত বিএনপি-জামাত জোটের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধান। মহাজোট ক্ষমতা গ্রহণের পর পর দ্রুত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সে ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর কারণ হিসেবে অনেকেই সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। দায়ী করছেন সরকারের ভুল নীতিকে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরার আগে বর্তমানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বা উৎপাদন, বণ্টন এবং এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করি। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত মেটানোর লক্ষে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে যেমন কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট, রেন্টাল প্ল্যান্ট ও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সহসা বিদ্যুৎ সরবরাহের আশায় এবং সে সময়ে দেশে গ্যাস সংকটের কথা বিবেচনা করে সবকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয় তেল চালিত পদ্ধতির। যে সময় তেল চালিত এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল সে সময়ের তুলনায় বর্তমানে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। অন্যদিকে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরকার একবার ভর্তুকী দিয়ে তেল সরবরাহ করছে আবার সে কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশি দামে কিনে কম দামে সরবরাহ করতে গিয়ে আরেকবার ভর্তুকী দিচ্ছে। এভাবে ভর্তুকীর পর ভর্তুকী দিতে দিতে এবং এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যে তেল আমদানি করতে করতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়েছে, অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে সরকার ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ নিয়েছে ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। মোট কথা দ্রুত বিদ্যুতের সংস্থান করতে গিয়ে অন্যভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর বর্তমানে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে না পারায় বন্ধ রয়েছে অথবা পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না অনেক কেন্দ্র। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে সরকারের এমন চুক্তি রয়েছে যে, তেলের অভাবে কেন্দ্র বন্ধ থাকলে তার দায়ভার সরকারের অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও তাতে মালিকপক্ষের কোন ক্ষতি নেই। আমরা দ্রুত বিদ্যুৎ চেয়েছিলাম বটে তবে এমন রাষ্ট্রীয় ক্ষতি করে নয়। পিডিবি চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুসারে এ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে নতুন করে তিন হাজার তিনশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর গত তিনবছরে ২২ লাখ গ্রাহককে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। মে মাসে তিনি তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের ট্যারিফ বৃদ্ধি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। সে সাথে তিনি আগামী ২০১৩ সালের মধ্যে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যদিও আমি বুঝতে পারছিনা বর্তমান বছরের প্রায় পাঁচ মাস গত হতে চললো বাকী আছে আর সাত মাস। এই অল্প সময়ের মধ্যে কী এমন আলাদিনের চেরাগ আছে যা দিয়ে পরিস্থিতি এমন রাতারাতি পাল্টে দেয়া যাবে। আমরা বরং জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে প্রশ্ন করতে পারি শুধু তেল নির্ভর কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতো আপদকালীন এই দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে স্থায়ীভাবে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা আপনি করতে পেরেছেন। বরং বিদ্যুৎ উপদেষ্টার বিভিন্ন পদক্ষেপে তাকে অপরিনামদর্শী কিংবা অযোগ্য বলেই জনগণের মনে হতে পারে। নতুন সংযোগের ফলেই শুধু বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে তা কিন্তু নয়। পুরোনো বিদ্যুৎ সংযোগেই তো প্রতি দিন, প্রতি ঘণ্টা এমন কি প্রতি মিনিটে বেড়ে চলেছে বিদ্যুৎ চাহিদা। সরকার বা সচেতন একজন নাগরিক মাত্রই হিসেব করে দেখতে পারেন নতুন ফ্লাট, নতুন মার্কেট বা নতুন কোন কল-কারখানা বা ফ্যাক্টরি ছাড়াও প্রতিদিন যে হাজার হাজার টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, ইস্ত্রি বা এমন ধরনের বিদ্যুৎ চালিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে তার বিদ্যুৎ খরচতো পুরনো সংযোগেই ঘটছে বেশি। তার মানে প্রতিদিন বা প্রতিঘণ্টায় মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়েই চলেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আগামী ২০ বছরেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারের শেষের দিকে এসে বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর চাপে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আরও বাড়বে সন্দেহ নেই। তার ফলে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার নতুন যে নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে তাতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে কিনা তা নিয়ে আশংকা আছে। শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম যদি বাড়াতেই হয় সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু পরামর্শ আছে। যা সরকার চাইলে বিবেচনা করতে পারে। এক্ষেত্রে গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কিছুটা রেহাই দেয়ার কৌশল হিসেবে কয়েকটি ধাপে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন, ৫০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্যে সর্বনিম্ন দাম নিধারণ, এরপর ৫০ থেকে ১০০ পর্যন্ত, ১০০ থেকে ২০০ পর্যন্ত ২০০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত ৪০০ থেকে ৬০০ এমন করে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ওপর বেশিদাম বসিয়ে গরীব ও নিম্ন বিত্ত মানুষদের কিছুটা রেহাই দেয়া যেতে পারে। যে সব পরিবার শুধুমাত্র বেঁচে থাকার মত করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তার সাথে এসি, মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন ও লিফ্‌ট ব্যবহারকারীদের এক কাতারে ফেলা বা একই দামে বিদ্যুৎ বিল আদায় করা সমীচিন হবে বলে মনে হয় না। যেহেতু বড় লোকরাই মাথাপিছু বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করে সেহেতু সবচেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা উচিৎ তাদের। বড়লোকদের আরাম আয়েশের জন্যে বিদ্যুতের ভর্তুকীর টাকা কেন বহন করতে হবে গরীবদের যারা বড়লোকদের একটি বাথরুমের বিদ্যুৎ খরচ করে মোটে। এক্ষেত্রে একাধিক সংযোগ বা একাধিক মিটারে বিদ্যুৎ বিল যেন ভাগ হতে না পারে সেদিকেও কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারী প্রয়োজন। তবে যাই বলিনা কেন, ক্ষমতা গ্রহণের সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় জনগণ দিন দিন হতাশই হচ্ছে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম মহাজোটের সংসদ সদস্যগণ তাদের নির্বাচনী এলাকায় যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ তথা তাদের ভোটারদের জবাব দেয়ার মত কোন অজুহাত তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। পরিস্থিতিটি ভীষণ তাৎপর্যময়। নির্বাচনের অন্যতম প্রতিশ্রুতি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সামান্যতম উন্নতি না ঘটিয়ে ভোটারদের প্রশ্নের জবাব দেয়াও আসলে সম্ভব নয়। তবে এক্ষেত্রে ভাল অবস্থানে আছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা। কারণ যেহেতু তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধি নন সেহেতু জনগণের কাছে জবাবদিহিতার প্রয়োজনও তার নেই। নির্বাচন এলে এই সাংসদ বা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের যেতে হবে জনগণের কাছে তখন এসব উপদেষ্টাদের ভূমিকা কী হবে তা আগাম কল্পনা করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিই বিএনপি-জামাত জোটের পতনের অন্যতম কারণ ছিল আগামী নির্বাচনে সেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মহাজোট তথা আওয়ামী লীগকে ডোবাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই গেলো।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক 
Email-qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal

বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১২

* আপনার সন্তান যখন বড় হচ্ছে

দৈনিক আজাদী                                 উপসম্পাদকীয়                         কাল, আজ, কাল
১৭ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি

তরুণীটির কক্তে যেন সারা বিশ্বের অপমানিত, লাঞ্ছিত নারীদের মর্মবেদনার সুর বেজে উঠছিল। মেয়েটি বলছে, আমার বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। আমাকে বাসায় রেখে মা-বাবা গেছেন হাসপাতালে। সে সময় বাসায় আসেন আমাদের এক পারিবারিক বন্ধু। মা তাঁকে কাকা বলে সম্বোধন করতেন বয়স পঞ্চান্নের মতো। একা পেয়ে লোকটি ইচ্ছেমতো নোংরা আচরণ করলো আমার সাথে। আমি স্তম্ভিত, স্থবির। আমি বাধা দিতে পারলাম না। তারপর দীর্ঘদিন সে লোকটি আমার ওপর যৌন-নির্যাতন চালিয়েছে, যা আমি মা-বাবাকে জানাতে পারিনি। এ বর্ণনা দেয়ার সময় মেয়েটির চোখ বেয়ে নামছিল অঝোর ধারা, চোখ মুছছিলেন উপস্থাপক আর বেদনা ও ক্ষোভে হতবিহবল উপস্থিত দর্শক। এরপরে একটি তরুণের করুণ অভিজ্ঞতার বর্ণনা। তখন তার বয়স মাত্র সাড়ে ছ’ বছর। গোসলখানায় গা ধুয়ে দিচ্ছিল বয়স্ক এক আত্মীয়। স্বাভাবিকভাবে শিশুটি ছিল নগ্ন। গোসল করানোর ফাঁকে শিশুটির মা কিছুক্ষণের জন্যে ঘরের বাইরে গেলে নোংরামীতে মেতে ওঠে পুুরুষটি। তরুণটি তাঁর এই করুণ অভিজ্ঞতা ও নিপীড়নের বর্ণনা দেয়ার সময়ও কাঁদছিলেন। সাথে বিস্মিত উপস্থাপক ও হলভর্তি দর্শকও। প্রিয় পাঠক, এ দৃশ্য ভারতের একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের নতুন অনুষ্ঠান “সত্যমেব জয়তের দ্বিতীয় এপিসোডের। অনুষ্ঠানটি নির্মাতা ও উপস্থাপক মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় অভিনেতা” মিস্টার পারফেক্‌সনিস্ট হিসেবে খ্যাত আমির খান। নিজস্ব প্রডাকসন্স হাউজ থেকে নির্মিত এ অনুষ্ঠানের প্রযোজক আমির খানের স্ত্রী কিরণ। ঝলমলে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগৎ আর পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী, সাম্প্রতিক বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত গণতান্ত্রিক ভারতের সমাজের গোপন, অন্ধকার দিক এটি। আমির খান অত্যন্ত নিষ্ঠা, সাহস আর আন্তরিকতার সাথে এ অনুষ্ঠানটি নির্মাণ করলেও আমি মনে করি এতে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকাটি পালন করেছে ও দুজন তরুণ তরুণী বিশেষ করে তরুণীটি। এমন প্রকাশ্যে সে তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে এতটুকু কুক্তিত হয়নি, বরং সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সে বলেছে, আমি যখন এ অনুষ্ঠানে এসে এসব বলব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তখন অনেকেই আমাকে বলেছে আমি এখনো অবিবাহিত বলে সমস্যা হতে পারে। এ পর্যায়ে তরুণটি একটু রসিকতা করেই বললো, আমি মনে করি বরং এ অনুষ্ঠানটি দেখার পরেই আমার বিয়ের প্রস্তাব আসতে পারে। অনুষ্ঠানটি দেখতে দেখতে আমার মনে হলো, বাংলাদেশে কি এমন একটি অনুষ্ঠান করা সম্ভব? কোন টিভি চ্যানেল কিংবা কোন নির্মাতা প্রাতিষ্ঠানিক এমন একটি ভূমিকা নিতে পারে? যদি কেউ উদ্যোগ নেয়ও এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে যিনি বা যাঁরা তাঁদের জীবনের অপমানের কষ্টের, লাঞ্ছনার কথা এমনভাবে তুলে ধরতে পারবেন? এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই ধর্মীয় অনুশাসন তা কি করতে দেবে? না কি মেনে নিতে হবে আমাদের দেশে আমাদের সমাজে, আমাদের পরিবারে এমন ঘটনা ঘটে না? সত্যি কি তাই। শুধু এদেশের কেন, আমারতো মনে হয় পৃথিবীর কোন নারীই বলতে পারবেন না জীবনের কোন না কোন সময়ে কারো না কারো দ্বারা তিনি অপমানিত হননি, খুলে বললে যৌন হয়রানির শিকার হননি। চাহনী, কথা, ইশারা বা ব্যবহারে? আমি শুধু নারীদের কথাইবা বলছি কেন? এমন বিকৃত পুরুষের দ্বারা (ছেলে) শিশু-কিশোররাও কি নির্যাতিত হয়নি? আমার নিজের শিশু ও কৈশোর কালটিও তো কেটেছে এমন আতংক আর নিরাপত্তাহীনতায়। একজন পুরুষের চেহারা কতটা কদর্য হতে পারে একজন পুরুষ হয়েও আমি কতবার তা প্রত্যক্ষ করেছি। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভাল বলেছিলেন বিখ্যাত ছড়াশিল্পী লুৎফর রহমান রিটন। ’৯৭, ’৯৮ সালের দিকের ঘটনা। তিনি তখন “ছোটদের কাগজ’ বের করছেন। বাংলা একাডেমির মাঠে আড্ডা দিতে দিতে উঠে এসেছিল প্রসঙ্গটি। তিনি বলেছিলেন, “আমার মেয়ের ব্যাপারে আমি আমার বাবাকেও বিশ্বাস করি না।” এরপরে “মেয়ে তুমি বড় হচ্ছো” প্রচ্ছদ কাহিনী করে ছোটদের কাগজের একটি সংখ্যাও করেছিলেন। ও সংখ্যায় তিনি মেয়েদের বেড়ে ওঠার সময়ের বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমস্যার বিষয়ে চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। পরে ‘ছেলে তুমি বড় হচ্ছ’ বিষয়ে আরেকটি সংখ্যা করার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমার জানা এক মহিলার অভিজ্ঞতার কথা বলি। স্কুল জীবনে সে তার গৃহ শিক্ষকের দ্বারা আপত্তিকর আচরণের শিকার হলেও সে কখনো তা তার মা-বাবাকে জানাতে সাহস পায়নি কারণ তার বাবা মা’র অগাধ আস্থা ছিল গৃহ শিক্ষকটির প্রতি। এই শিক্ষকটি তাঁর বিকৃতি চরিতার্থ করতে না পারলে পড়া না পারার অজুহাতে কিশোরীটিকে যখন বেদম প্রহার করতো তখনও তাতে তার বাবা মা’রও সায় থাকতো। এমন ঘটনা এদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরেইতো ঘটে। মেয়েরাতো প্রথম নিপীড়নের শিকার হয় পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনদের দ্বারা। এ আত্মীয়রা বয়স, মর্যাদা ও সম্পর্কে এমন অবস্থানের হয় যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা একটি শিশু বা উঠতি বয়সী কারু পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় চতুর পুরুষরা, বাহিরে যারা চরম ভদ্র, পরহেজগার বা ভীষণ খ্যাতিমান। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকে বাসার কাজের লোক, ড্রাইভার এমন কি যে কেউ। বস্তুত নারী কোথাও নিরাপদ নয়। কোন পুরুষের কাছে, সম্পর্কে সে যাই-ই হোক। এ অভিজ্ঞতা কমবেশি সব নারীরই আছে। এই চরম পুরুষশাসিত সমাজে এটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এমন নিপীড়নের শিকার হওয়া শিশুদের মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে না। তাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে নানাবিধ উপসর্গ। অবশেসনে ভুগতে পারে তারা, তৈরি হতে পারে পুরুষের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা ও ঘৃণা। স্বাভাবিক জীবনযাপন চিন্তা ও পড়াশোনায়ও বিঘ্ন ঘটতে পারে তাদের। এমনকি তাদের মধ্যে জন্ম নিতে পারে এমন বিকৃতিরও। প্রিয় পাঠক, একটি সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে খাওয়া পড়া আর বিদ্যালয়ে পাঠিয়েই মা বাবার কর্তব্য শেষ হতে পারে না। ফুলের মতো শিশুদের জীবনকে বিকশিত করে তুলতে মা-বাবার আরও সতর্ক ও মনোযোগী হওয়া জরুরি। কাজেই যে কোনভাবে, যে কোন কিছুর বিনিময়ে আপনার সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সে যেন তার যে কোন সমস্যা বা প্রশ্ন নিয়ে আপনার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে সে পরিবেশ গড়ে তুলুন। তাকে অভয় দিন। তার মতামত বা পছন্দ অপছন্দকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিন। কারো ব্যবহার বা আচরণ নিয়ে অভিযোগ করলে তাকে তিরস্কার বা ধমক না দিয়ে কৌশলে তার অভিযোগ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করুন। বিভিন্ন হোস্টেল, মাদ্রাসা, মক্তব বা এমন ধরনের প্রতিষ্ঠানে সাধারণত যেখানে কো-এডুকেশন নেই শিশু-কিশোর এমনকি তরুণরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলগুলোতে র‌্যাগিংয়ের নামে সিনিয়ররা জুনিয়রদের ওপর যে ধরনের পাশবিক নির্যাতন চালায় তার বর্ণনা যে কোন সুস্থ মানুষকে স্তম্ভিত করে দেবে। আমাদের সমাজে এমন অনেক ধরনের দুষ্কর্ম, ব্যভিচার প্রচলিত আছে যা নিয়ে আলোচনা করতেও আমরা বিব্রতবোধ করি। তার কারণ হয়ত এমন যে কেঁচো খুড়তে শেষে না সাপ বেরিয়ে আসে। এই নিবন্ধকারও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তার দ্বারা কোন না কোন সময়ে কোন না কোন নারী অপমানিত হয়নি, হোকনা তো কথায়, ইংগিতে আচরনে বা অন্য কোনভাবে? আমার এমন একটি লেখায় অনেকে অস্বস্তি বা বিরক্তিবোধ করতে পারেন। কিন্তু আমি বলতে চাই একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্যে চাই সুস্থ মানসিকতার মানুষ। আর একজন মানুষ তৈরি হয় অর্থাৎ একজন মানুষের প্রকৃত মানসিক বিকাশের ভিত্তিটা তৈরি হয় তার প্রথম দশ বছরের মধ্যেই। এসময় একটি শিশুর সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে তার মানসিক বিকাশও সুস্থভাবে হবে না। কাজেই আমরা যা-ই করিনা কেন আমার আপনার সন্তান কীভাবে বা কোন পরিবেশে বড় হচ্ছে তা লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন তার জন্যে একটি সুন্দর, পবিত্র ও আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করা। একটি জাতি কতটা সভ্য তা নির্ধারিত হয় সে জাতি তার নারী ও শিশুদের ওপর কী ধরনের আচরণ করছে তার ওপর। একটি ছেলে যখন একটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে তা অনেকের চোখে পড়ে কারণ বিপরীত লিঙ্গ বলে এবং তা ইভ-টিজিং হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু একটি ছেলে যখন অপর আরেকটি পুরুষ কর্তৃক উত্ত্যক্ত হয় তখন তা অনেকের চোখে পড়ে না, অনেকে তা দোষ হিসেবেও নেয় না। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে হয়ত বলা যেতো এদেশে ধর্ষণের চেয়ে বলাৎকারের সংখ্যাও কম নয়। এদেশে শিশুদের আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে হলে এসবের বিরুদ্ধে সমাজের ভেতরেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক। 
Email: gqbabal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১২

* 'প্রণমি তোমায় জননী সাহসিকা'

দৈনিক আজাদী                            উপসম্পাদকীয়                         কাল, আজ, কাল
১০ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.২৭ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি


পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রিপা আক্তার। হঠাৎ প্রসব বেদনা ওঠে। দ্রুত তাঁকে একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন নয়টা পাঁচ মিনিট। নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৪০ মিনিট পরই তাকে স্বজনদের কাছে রেখে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে ছুটেন রিপা। গত শুক্রবার কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক গত রোববার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এটি। খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নয় মনে করে পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিলো সংবাদটি। কিন্তু সেদিন ঐ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে অন্যতম পঠিত সংবাদ ছিল এটি। এরপর দিনই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কথা বলেন রিপার সাথে। তিনি ফোনে রিপাকে বলেছেন, “মা তুমি পড়োতোমার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।” মন্ত্রী সে সাথে সংশ্লিষ্ট পত্রিকারিপার বাবাকলেজের অধ্যক্ষ ও স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথেও কথা বলেন। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।

রিপার বিয়ে হয়েছিল ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর। বিয়ের পরও তিনি যথারীতি পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন আর এরই মধ্যে সন্তানসম্ভবা হন তিনি। ১৯ মে সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ থাকলেও তার আগেই তাঁর প্রসব বেদনা ওঠে। সন্তান ভূমিষ্ঠের পরপরই রিপা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। প্রথমে আপত্তি জানালেও রিপার ঐকান্তিক ইচ্ছার কাছে হার মানে সবাইশেষে তাঁর বাবাই তাঁকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ২০ মিনিট পরে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হলেও ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮০ নম্বরের উত্তর দিতে পেরেছেন তিনি। রিপার কথা পড়তে গিয়ে এমন আরেকজন পরীক্ষার্থীর কথা মনে পড়লো। স্বামী যার ডান হাতের আঙুল কেটে নিয়েছিল যেন সে পড়ালেখা করতে না পারে। সে মেয়েটিও পরীক্ষা দিচ্ছে এবার। অদম্য সাহসী রিপাদের কথা যখন পত্রিকায় পড়ছি তখন গত দু’বছর আগে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সংঘটিত একটি ঘটনার কথা মনে পড়লো। সম্ভবত ২০১০ সালের মে মাসের দিকেরই একটি ঘটনা। বিয়ের আসরে খাওয়া দাওয়া শেষে যখন আক্‌দ পড়ানোর প্রস্তুতি চলছিল তখনই ঘটলো বিপত্তিটা। বিয়ের আসরে এক তরুণী এসে দাবি করে মঞ্চে উপবিষ্ট বর তারই প্রেমিক। এতদিন তার সাথে প্রেম করে এখন বিয়ে করতে যাচ্ছে অন্য একজনকে। ব্যস লেগে গেলো ‘ভজকট’।অবশেষে বিয়ের আসরে উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবিয়ের কাজী ও কনে পক্ষের বাবা মার সম্মতিতে দুই তরুণীকেই আক্‌দ পড়িয়ে সোপর্দ করা হয় প্রতারক বলে অভিযুক্ত বরকে।

গুণধর বর একজনকে বিয়ে করতে এসে এক সাথে দু’দুটি নতুন বউ নিয়ে ঘরে ফিরলেন। সাবাশ পুরুষ। সে সময় এ ঘটনা নিয়ে “এযে তারই অপমান কবে বুঝবে নারী” শীর্ষক একটি লেখা লিখেছিলাম। পুরুষ শাসিত সমাজে নারী নিগ্রহ এবং এক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা নিয়ে আমার সে লেখার পরে অনেকে তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া এমন অনেক অপমানের কথা জানিয়েছিলেন যা তাঁরা তখন প্রতিবাদ করতে পারেন নি। আমি রিপাদের সাহসী বর্ণনা পড়ার সাথে সাথে রাঙ্গুনিয়ার ঐ দুজন তরুণীর কথা ভাবছিলাম একই দেশ একই সমাজের দুজন নারী কত প্রতিবাদী ও উদ্যমী আর দুজন কেমন নির্লিপ্ত ও আত্মসমর্পিতা। শিক্ষা অর্জন করাতো রিপার মৌলিক অধিকার। রিপার স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন এ ব্যাপারে রিপাকে বাধা দেয়নি। বর্তমান সময়ের এখনো এটি একটি উদারতাযেখানে আরেকজন পরীক্ষার্থীর আঙুল কেটে নিয়েছিল তার পাষণ্ড স্বামী। এক্ষেত্রে রিপার স্বামীকে আমরা ধন্যবাদ জানাতে পারি।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান সমাজে নারীর অবস্থান কী?এটির উত্তর খোঁজার আগে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করতে পারি। গত বছর বাংলাদেশে এসে তিনি বলেছিলেন, “সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে।” মন্তব্যটি ফেলে দেয়ার মত নয়। বাংলাদেশকে নিয়ে সহজেই যাঁরা হতাশা ব্যক্ত করেন আমার লেখাটি সম্ভবত তাঁদের সন্তুষ্ট করবে না। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে বিশেষ করে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান করুণ নয়বরং এই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায় আশাব্যঞ্জক বলতে হবে। ২০১২ সালে এসে বাংলাদেশের নারীরা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি আত্মনির্ভরশীল ও সাহসী। আর এটি সম্ভব হয়েছে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গত একুশ বছর ধরে পালাক্রমে দুজন নারীর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার কারণে।

প্রধানমন্ত্রীবিরোধী দলীয় নেত্রীসংসদ উপনেতাপররাষ্ট্রমন্ত্রীস্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকৃষি মন্ত্রী,শ্রম প্রতিমন্ত্রীসচিববিচারকএসপি এমনকি সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক নারীর অংশগ্রহণ ও সাফল্য সমাজে কি একটুও প্রভাব ফেলেনি বলে ভাবতে হবেতৈরি পোশাক শিল্প এমন কি বর্তমানে নির্মাণ শিল্পে পর্যন্ত নারী শ্রমিকদের বিশাল অংশগ্রহণ সমাজে কি কোন পরিবর্তন সৃষ্টি করেনিসমাজের ভিতরে অবস্থান করে বাস্তবতাটি অনেকের চোখে পড়ছে নাকারণ পরিবর্তনটি সাধিত হচ্ছে খুব ধীরে ধীরে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বে আজ এক অন্যতম পরাশক্তি। সে ভারতেও আজ হাজার হাজার কন্যা শিশুকে জন্মের আগেই হত্যা করা হয় ভ্রূণ অবস্থাতেই যে সংবাদ তাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয় হরহামেশাই। পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ নাইবা করলাম। তবে বাংলাদেশে যে নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে না। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও নারীরা অপমানিত হচ্ছে নালাঞ্ছিত হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আমি বলতে চাইছি যে কোন মুসলিম বিশ্বের তুলনায় এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি একেবারে হতাশাজনকও নয়। তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন বিশেষ করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অগ্রসর ও প্রগতিশীল শক্তির অবস্থানটিই সবচেয়ে আগে জরুরি। কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতায় কোন মৌলবাদী শক্তির উত্থান বা অংশীদারিত্ব নারীদের এ অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে সন্দেহ নেই। যারা প্রকাশ্যে শ্লোগান দিতে পারে “আমরা সবাই তালেবানবাংলা হবে আফগান” অন্তত তাদের কাছে নারী মুক্তির দাবি তোলা বা মুক্তির আশা করা মরীচিকার পানে ছুটে চলার মতই হতে পারে। আমরা রিপার এই সাহসী কর্মের প্রশংসা না করে পারি না। পারি না তাঁর মাতৃত্বকে সম্মান না জানিয়ে থাকতে। পড়ালেখার প্রতি তাঁর অদম্য ইচ্ছা বাংলার লক্ষ লক্ষ নারীকে উজ্জীবিত করবেপ্রাণিত করবে সন্দেহ নেই। এই সাহসী জননীকে আমাদের শ্রদ্ধাভিনন্দন।

আজকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েদের কৃতিত্বপূর্ণ অবস্থানফলাফল ভালো করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখে আমরা আশান্বিত হই একদিন সমাজের সর্বক্ষেত্রে আমাদের মেয়েরাও এগিয়ে থাকবে নিজেদের যোগ্যতায়আপন মর্যাদায়। পুরুষের কৃপায় নয়।

এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে লেখাটি শেষ করতে পারলে ভাল লাগতোকিন্তু পারছি না। মনে পড়ছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে একটি নারীনীতি ঘোষণা করেছিলকিন্তু দেশের কিছু দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা ও আন্দোলন হুমকির কারণে পিছিয়ে আসে সরকার। এ বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল যার প্রধান একজন নারী সে দলও রহস্যজনকভাবে নীরবতা পালন করেছে। সম্ভবত এ দলটি তার দীর্ঘদিনের মিত্র এসব মৌলবাদী সংগঠনগুলোকে চটাতে চায়নি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে সামরিক কু’এর মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইউব খান ১৯৬১ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ এর মত একটি আধুনিক আইন প্রণয়ন করেছিলেন। সে আইনে তালাক ও হিল্লে বিয়ের মতো অমানবিক কিছু রীতি পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। অথচ তার ৫০ বছর পরে একটি স্বাধীন দেশেযে দেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও যার স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে তেমন একটি দেশে সামান্য একটি নারীনীতি প্রণয়ন করতেও সরকার দ্বিধাগ্রস্ত হয়।

আমি দুঃখতি। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে আবার আমাকে রাজনীতির কথা বলতে হয়। ৭৫ এ জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা/দখলকারী শক্তি পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে এদেশে বিস্তার ঘটিয়েছে ধর্মান্ধ ও চরম মৌলবাদী গোষ্ঠীর। আর দীর্ঘদিন সরকারি আনুকূল্যে এদের শেকড় এমনভাবে গজিয়েছে যে মাত্র পাঁচ বছরে এত জঞ্জাল পরিষ্কার করা সম্ভব নয় বলে মনে হয়। আমার ধারণা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যে একটি উদারগণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক শক্তির দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্র শাসন জরুরি।

লেখক কবিসাংবাদিককলামলেখক
email:qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

* যুদ্ধাপরাধীর বিচার, সরকারের প্রস্তুতি ও বর্তমান সংকট

দৈনিক আজাদী                         উপসম্পাদকীয়                         কাল, আজ, কাল

৩ মে বৃহস্পতিবার২০১২ খ্রি.২০ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ১০ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল

২০০৮ সাল। সাধারণ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষিত হয়েছে, আওয়ামী লীগ ধস নামানো বিজয় অর্জন করেছে। যে বিজয়কে শুধু ’৭০ এর বিজয়ের সাথে তুলনা করা চলে। ’৭০ এর ম্যান্ডেট ছিল ৬ দফা আর ২০০৮ সালের অন্যতম ম্যান্ডেট যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেদিন আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ পরবর্তী রাতে আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেন চাই” শিরোনামের এই লেখায় আমি মূলত কিশোর বা উঠতি তরুণ বয়সের পাঠক যারা আগামী নির্বাচন অথাৎ ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নতুন ভোটার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে তাদের কাছে এই বিচারের উদ্যোগ যেন জরুরি এবং এই উদ্যোগ গ্রহণ করলে, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে কিংবা বিচারের রায় কার্যকর করতে গেলে কী কী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে, দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। সে সাথে ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রায় সোয়া এক কোটি নতুন ভোটার যারা আওয়ামী লীগের জয়লাভের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছিল তাদের কাছেও আমার এই সংখ্যায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। লেখাটি সে সময় কোথাও ছাপাতে পাঠাইনি তবে তার বছর খানেক পরে আমার কিছু বন্ধুর পরামর্শ, চাপে ও সহযোগিতায় বই আকারে প্রকাশ করি। সম্মানীয় পাঠক, আমাকে মার্জনা করবেন কোনরূপ আত্মপ্রচার বা আমার সেই বইয়ের বিজ্ঞাপনের জন্যে এই গৌড়চন্দ্রিকার অবতারণা করিনি। আমি শুধু এটুকু তুলে ধরবার জন্যে লিখলাম যে, নির্বাচনে জয়লাভের পরে যদি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের কেউ বিচারের সম্মুখীন করতে যায় তখন কী পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে তা নিয়ে আমার মতো একজন অতি সাধারণ ব্যক্তিও যখন ভাবতে বসেছি তখন নিশ্চয়ই দেশের আরও লক্ষ কোটি মানুষও আমার মতো ভেবেছেন আর যাঁদের হাতে ক্ষমতা সপেছিলাম অর্থাৎ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা তো আরও বেশি ভেবেছিলেন বলে মনে করি। কিন্তু আজ প্রায় সাড়ে তিন বছরের মত সময় পেছনে ফেলে এসে বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে মনে হচ্ছে আমরা যেভাবে ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ হয়ত সেভাবে ভাবেনি। কোথায় যেন একটু দূরদর্শিতা, সতর্কতা ও কৌশলের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে দেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। ’৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধীতাকারী আলবদর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী ও আরেক ঘাতক আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়ে খালেদা জিয়া এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিকামী জনগণকে চরমভাবে অপমানিত করেছিলেন। সারাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, বাংলা ভাইয়ের শাসন, ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ, আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র আটক আর তারেক জিয়ার হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক দুর্নীতি আর লুটপাটে এদেশের তরুণ-সমাজ ক্রমেই প্রতিবাদী হয়ে উঠছিল। ফলে বিএনপি-জামায়াত শক্তির অপসারণ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ ও এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে ফলে মানুষ বিশেষ করে সোয়া এক কোটি নতুন ভোটার আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়। ফলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে আওয়ামী লীগ বাধ্য। বর্তমানে দুটো ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। জেলে ভরা হয়েছে গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, সালা উদ্দিন কাদের, আব্দুল আলিমদের মতো জাঁদরেল রাজাকারদের সাড়ে তিন বছর আগেও যা ছিল কল্পনাতীত। ’৭৫ এর পরে এদেশে একটি ধারণাকে প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা হয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার কখনো হবে না। অনেক বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক নানাভাবে বক্তৃতা, বিবৃতি এমনকি লেখা-লেখির মাধ্যমেও প্রচার করার চেষ্টা করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু হত্যকাণ্ডের বিচার-কখনো হবে না। কারণ আওয়ামী লীগ তা চায় না, খামাখা মামলাগুলো ঝুলিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে এবং তা সুষ্ঠু ও বিতর্কহীন ভাবেই হয়েছে। বর্তমানে তেমন একটি প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার আওয়ামী লীগ সম্পন্ন করে যাবে না, আগামীবার নির্বাচনে জয়লাভের জন্যে এটিকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিচার আওয়ামী লীগকে ওই মেয়াদেই সম্পন্ন করতে হবে, রায় কার্যকর করতে হবে। শাপের লেজে পা যখন দেয়া হয়ে গেছে তা আর উঠিয়ে নেয়া যাবে না। সাপকে বধ না করা পর্যন্ত। আশা করি এটুকু বাস্তবতা বোঝার মতো বোধশক্তি আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের আছে। তবে অন্তত একটি বিষয়ে যে আওয়ামী লীগ তথা সরকার দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়নি বা এখনো দিচ্ছে না সে বিষয়ে আমি অন্তত নিশ্চিত। ’৭৫ এ জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা মোশতাক- জিয়া-এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় ’৭১ এর পরাজিত শক্তি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আর পুরাতন মুসলিম লীগের ধ্যান-ধারণায় গড়া বিএনপি তো এই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির অন্যতম রাজনৈতিক মিত্র। কাজেই স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে এবং এর মধ্যে বেশির ভাগ সময় রাষ্ট্র ক্ষমতা ভোগকারী এসব যুদ্ধাপরাধীর যখন বিচার কার্য চলবে, এরা যখন জেলের অভ্যন্তরে থাকবে (গত সাড়ে তিন দশক যা ছিল একেবারে অবিশ্বাস্য) এর বিচারের রায় যত ঘনিয়ে আসবে তখন আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্নে দেশ পরিচালনা করবে, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা সব ঠিকঠিক চলবে, প্রধান বিরোধী দল এই বিচার প্রক্রিয়ার নীরব দর্শক হয়ে থাকবে এমন মনে করাই আওয়ামী লীগ বর্তমান সরকারের চরম বোকামী, অদূরদর্শিতা ও অবিচক্ষনতা। বর্তমান দেশের পরিস্থিতি আমাকে সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। এরশাদ-খালেদা জিয়ার আমলে গড়ে তোলা আমলা-প্রশাসন-পুলিশ বাহিনী রাতারাতি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যান্ডেট পূরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে তার নিশ্চয়তা বর্তমান সরকার কীভাবে পেলো আমি জানি না। এই সরকারের সমস্ত অর্জনকে ম্লান করে দিতে, সরকারকে বিব্রত ও ব্যর্থ করে দিতে ওদের কোন শক্তি যে তৎপর নয় তার নিশ্চয়তা কোথায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভা উপদেষ্টা কিংবা দলেও যে এমন স্যাবোটাজ করার লোক নেই সে বিষয়েও নিশ্চিত হই কীভাবে। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়। অতীতের অনেক ঘটনা আমাদের সংশয়ে ফেলতে বাধ্য করে বারবার। প্রাণহারী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যে কোন কিছুর বিনিময়ে বাঁচার চেষ্টা করে। প্রয়োজনে সে তার সমুদয় সম্পদ বিক্রি করে হলেও তার চিকিৎসা করে সুস্থ হতে চায়। সে হয়ত ভাবে বেঁচে উঠলে এমন সম্পদ অর্জন কঠিন কিছু নয়। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। ’৭১ এর পরে এই প্রথম অস্তিত্ব বিপণ্ন হওয়ার পরিস্থিতি মুখোমুখী জামায়াত তথা যুদ্ধাপরাধীরা। গত চল্লিশ বছর ধরে গেড়ে বসা এই শক্তির অর্থের উৎসও অর্থ ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখন জীবন বাঁচাতে এসব অর্থ কি তারা ব্যবহার বা খরচ করবে না অকাতরে। শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগের সংবাদ আর নতুন নয়। এর মধ্যে মাত্র দু’এক হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের বাজারে ছড়িয়ে দিলে বিক্রি হয়ে যাওয়ার লোকের অভাব হবে কি? এদেশে তো মাত্র ৫০ টাকার জন্যেও মানুষ খুন হয়। এদেশের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিরাইতো মালী পিয়নের মতো পদে লোক নিয়োগের সময়ও ঘুষ খায়। এদেশের সিংহভাগ বাড়ি গাড়িই তো কোন না কোন প্রকারের চোরাই অর্থে কেনা। অতএব শর্ষের ভিতর যদি ভূতের সংখ্যা বেড়ে যায়। অন্তত বাংলাদেশের বাস্তবতায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে দেশে যে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। যে আশংকা আমি ২০০৮ সালের বর্ষশেষ রাতে অনুধাবন করেছিলাম। কিন্তু দুঃখ হলো প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশীদার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা সে বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেনি। যে কারণে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের মধ্যে মিলিত কোন প্রস্তুতি নেই। ফলে সরকারের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে, অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে আত্ম বিশ্বাসের। আগামী দেড় বছরের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ-মানবতা বিরোধী অপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায় এর সময় যতই ঘনিয়ে আসবে পরিস্থিতি ততই খারাপের দিকে যাবে। বিএনপি ও তার অংশীদার চরম দক্ষিণপন্থী দলগুলো চাইবে না বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক, যে কারণে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখে নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে ব্যর্থ হতে সবধরণের কূট কৌশলের আশ্রয় নেবে তারা। গ্যাস, বিদ্যুৎ, দ্রব্য মূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে এই বিচার কাজ সম্পন্ন করা সরকারের পক্ষে কঠিন থেকে কঠিনতম হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির ঐক্য সুদৃঢ় করার কোন বিকল্প নেই। এখন থেকে কৌশলী না হলে বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। মনে রাখা উচিৎ সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।

লেখক-কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক 
Email- qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ