৩১ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ৯ রজব ১৪৩৩ হিজরি
প্রিয় হিমু, জানি এ চিঠির কোন শব্দ, আবেগ, ক্ষোভ, বেদনা, হতাশা ও আবেদন কিছুই তোমাকে স্পর্শ করবে না। তুমি আজ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। তুমি যেখানে গেছো সেখান থেকে কেউ কখনো ফিরে আসে না, তুমিও আসবেনা জানি। ‘কীরে দোস্ত’ তোমার এ শব্দ শুনে কোন বন্ধু আর চকিত ফিরে তাকাবেনা। তুমি কি তোমার মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে? এ ডাকতো তোমার মা আর কখনো শুনবে না। এই হতভাগিনী প্রতিদিন কতভাবেই না কত চিন্তা করবে তার হিমু হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরে ডেকে উঠবে ‘মা’ বলে। এই হতভাগিনী ঈশ্বরের কাছে তার সমস্ত পুণ্যের বা সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে তার হিমুকে ফেরত চাইবে। কিন্তু পাবে না। এই দুঃখিনী মা গত ২৭ এপ্রিল থেকে পরবর্তী ২৬ দিনের সমস্ত ঘটনাকে একটি দুঃস্বপ্ন ভেবে বারবার আশায় বুক বাঁধার চেষ্টা করবে একদিন ঠিক ঠিক আমার হিমু আমার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু আমরা জানি এমন কি তোমার বাবা ও ছোট ভাইও জানবে তুমি আর কখনো ফিরে আসবে না। শুধু তোমার মা। দুঃখিনী, হতভাগিনী মার মন কখনো তা বুঝবে না। সে তোমার ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তোমার জামা কাপড় থেকে তোমার শরীরের ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করবে, তোমার শূন্য বিছানা তোমার মায়ের বুকের হাহাকারকে বিলাপে আর এক সময় সে বিলাপ থেকে তা পাথর হয়ে তোমার মায়ের বুকে চেপে বসবে, যে পাথর এই বেচারীকে মৃত্যু অবধি বয়ে বেড়াতে হবে। কোন পাপ স্পর্শ করবার আগে, জীবনের সুধা পান করবার আগে, পৃথিবীর এত সৌন্দর্য্য মন ভরে দেখবার আগে, মা বাবার স্বপ্ন পূরণের আগে তোমার এ মৃত্যুতে আমরা ব্যথিত, মর্মাহত, লজ্জিত। আমরা অপরাধীর মতো পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি, ব্যর্থতার আমাদের মস্তক নত হতে হতে বুকের কাছে নেমে আসছে। আমি চোখ তুলে তাকাতে পারছি প্রায় তোমার বয়সী আমার একমাত্র সন্তানের দিকে। লজ্জায় ধিক্কারে গ্লানি ও অপমানে ঝাপসা হয়ে উঠছে দৃষ্টি। হিমু, তোমাকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতায় প্রতিদিন বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দাঁড়াতে সত্যি আমি ক্লান্ত হিমু। আমার রাষ্ট্র, আমার দেশ, আমার সমাজ তোমাদের মতো সন্তানদের বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিতে পারছে না কেন? আমরা কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছি এমন একটি সমাজ নির্মাণে যেখানে আমাদের সকল হিমুর নিরাপত্তা থাকবে, তারা বেড়ে উঠবে একটি মুক্ত বাতাবরণে, কোন দীনতা কোন হীনতা, কোন অন্যায় কোন পাপ আমাদের সন্তানদের যেনো স্পর্শ করতে না পারে। আমরা পারিনি। আমাদের এমন অসংখ্য হিমু প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত কোন কারণ ছাড়া, কিংবা কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হচ্ছে। তারতো বিচারও মিলছেনা। তোমাকে যেদিন ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতনের পরে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হলো সেদিন তোমার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, থানা কর্তৃপক্ষ প্রথমে তা নিতে চায়নি। যদি সেদিন পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিতো তবে তোমার খুনিরা হয়ত এভাবে পালিয়ে যেতে পারতো না। একজন নিরপরাধ-তরুণকে অমানবিকভাবে নির্যাতন করে, কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেয়ার পরও অপরাধটি পুলিশের দৃষ্টিতে গুরুত্ব পেলো না কেন? অপরাধীরা সমাজের বিত্তবান বলে? উঁচু শ্রেণীর লোক বলে? তার মানে অপরাধটিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে শেষ পর্যন্ত হিমুকে মরে যেতে হবে? মরে যেতে হলো? তার মানে সমাজের যে লোকদের কাছে একজন হিমুর জীবন একটি কুকুরের চেয়েও নগণ্য তাঁদের বাঁচাতেই দেশের পুলিশ বাহিনীর বেতন ভোগান্তি আমাদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ? তার মানে আমাদের ট্যাক্সের টাকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পোষা হচ্ছে যাদের কাজ হবে সমাজের উঁচু তলার মানুষদের শুধু নিরাপত্তা বিধান করা? এতদিন পরেও অপরাধী কেউ আটক হলো না। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে কৈফিয়ত তলব করতে হবে? তার মানে উচ্চ আদালত মাথা না ঘামালে এ মামলা কি ধামাচাপা পড়ে যেতো? টাকা আর প্রতিপত্তির জোরে পার পেয়ে যেতো অপরাধীরা। পুলিশ তবে আছে কীজন্যে? প্রকাশ্য দিবালোকে আদালতপাড়ায় তরুণীর শ্লীলতাহানীর জন্যে? সাংবাদিকদের বেধড়ক পেটানোর জন্যে? শিক্ষকদের বেত মারার জন্যে? ধর্ষক হয়ে ওঠার জন্যে? মানবাধিকারকে পদদলিত করবার জন্যে? অপরাধীদের বাঁচানোর জন্যে? এমন পুলিশী রাষ্ট্রের জন্যে বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। বাংলাদেশের জন্ম হয়নি ২২ পরিবার থেকে ২৯ হাজার পরিবার গড়ে ওঠার জন্যে। বাংলাদেশের জন্ম হয়নি এভাবে হিমুদের মৃত্যুবরণ করার জন্যে। কোন না কোন উপায়ে অসৎ অর্থে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনিক শ্রেণী ও তাদের পরিবারের ব্যভিচার, অনাচার ও মূল্যবোধ ও আদর্শহীন জীবন-যাপনের দৃশ্য এটি। যেসব পরিবারে মানবতাবোধের কোন চর্চা হয় না, সততার কোন পাঠ শিক্ষা দেয়া হয় না, মূল্যবোধ বা আদর্শের কথা উচ্চারিত হয় না সেসব পরিবারের সন্তানরাতো এমন অমানুষ হিসেবেই গড়ে উঠবে। হিমু, তোমার আমার পরিবারের সন্তানরাতো ওদের কুকুরের খাদ্য হয়ে উঠতে পারি শুধু, বন্ধু হয়ে নয়। তাই ওরা তোমার বন্ধু বেশে এসেছিল বন্ধু হতে নয়। কারণ অর্থ-বিত্ত ছাড়া এমন পরিবারে সম্পর্কের কোন দাম নেই। ওদের সমাজে একজন মানুষ বা একটি পরিবারকে দেখা হয় তার আর্থিক সংগতি নিয়ে তার বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা ও ব্যাংক ব্যালান্স নিয়ে। ওদের আলোচনার কোন সুকুমার শিল্পের কথা থাকে না, যাকে গাড়ির মডেলের কথা, থাকে-মোবাইল ফোনের-মডেলের কথা, শাড়ির ডিজাইনের কথা, জীবনকে ভোগ করার উদগ্র বাসনার কথা। থাকে না জীবনের কথা, সমাজের কথা, থাকে না জীবনের নানা কথা। আমি জানিনা হিমু। তোমার হত্যার সঠিক বিচার এদেশে হবে কিনা। আমি জানি না হিমু, তোমার মতো আরও কত হিমুকে এভাবে প্রাণ দিতে হবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কিংবা এমনকি নিরীহ জীবনযাপন করেও। তোমার মৃত্যুর দায়ভার আমারও। তোমার হত্যার বিচার যদি না হয় তার দায়ভারও আমার। আমি সত্যি করে বলি হিমু। এমন স্বদেশ, এমন বাংলাদেশ আমরা চাইনি। এমন মাতৃভূমির স্বপ্নও আমরা দেখিনি। তবুও এদেশ মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠছে। আমরা খুব সাধারণ মানুষ কী করতে পারি হিমু, শুধু চিৎকার করে বলা ছাড়া ‘‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না”। ‘আমার দেশ না’।
লেখক : কবি সাংবাদিক, কলামলেখক
email.qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal
লেখক : কবি সাংবাদিক, কলামলেখক
email.qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal
