দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল
৩ মে বৃহস্পতিবার২০১২ খ্রি.২০ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ১০ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
২০০৮ সাল। সাধারণ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষিত হয়েছে, আওয়ামী লীগ ধস নামানো বিজয় অর্জন করেছে। যে বিজয়কে শুধু ’৭০ এর বিজয়ের সাথে তুলনা করা চলে। ’৭০ এর ম্যান্ডেট ছিল ৬ দফা আর ২০০৮ সালের অন্যতম ম্যান্ডেট যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেদিন আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ পরবর্তী রাতে আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেন চাই” শিরোনামের এই লেখায় আমি মূলত কিশোর বা উঠতি তরুণ বয়সের পাঠক যারা আগামী নির্বাচন অথাৎ ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নতুন ভোটার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে তাদের কাছে এই বিচারের উদ্যোগ যেন জরুরি এবং এই উদ্যোগ গ্রহণ করলে, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে কিংবা বিচারের রায় কার্যকর করতে গেলে কী কী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে, দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। সে সাথে ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রায় সোয়া এক কোটি নতুন ভোটার যারা আওয়ামী লীগের জয়লাভের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছিল তাদের কাছেও আমার এই সংখ্যায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। লেখাটি সে সময় কোথাও ছাপাতে পাঠাইনি তবে তার বছর খানেক পরে আমার কিছু বন্ধুর পরামর্শ, চাপে ও সহযোগিতায় বই আকারে প্রকাশ করি। সম্মানীয় পাঠক, আমাকে মার্জনা করবেন কোনরূপ আত্মপ্রচার বা আমার সেই বইয়ের বিজ্ঞাপনের জন্যে এই গৌড়চন্দ্রিকার অবতারণা করিনি। আমি শুধু এটুকু তুলে ধরবার জন্যে লিখলাম যে, নির্বাচনে জয়লাভের পরে যদি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের কেউ বিচারের সম্মুখীন করতে যায় তখন কী পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে তা নিয়ে আমার মতো একজন অতি সাধারণ ব্যক্তিও যখন ভাবতে বসেছি তখন নিশ্চয়ই দেশের আরও লক্ষ কোটি মানুষও আমার মতো ভেবেছেন আর যাঁদের হাতে ক্ষমতা সপেছিলাম অর্থাৎ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা তো আরও বেশি ভেবেছিলেন বলে মনে করি। কিন্তু আজ প্রায় সাড়ে তিন বছরের মত সময় পেছনে ফেলে এসে বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে মনে হচ্ছে আমরা যেভাবে ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ হয়ত সেভাবে ভাবেনি। কোথায় যেন একটু দূরদর্শিতা, সতর্কতা ও কৌশলের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে দেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। ’৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধীতাকারী আলবদর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী ও আরেক ঘাতক আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়ে খালেদা জিয়া এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিকামী জনগণকে চরমভাবে অপমানিত করেছিলেন। সারাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, বাংলা ভাইয়ের শাসন, ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ, আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র আটক আর তারেক জিয়ার হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক দুর্নীতি আর লুটপাটে এদেশের তরুণ-সমাজ ক্রমেই প্রতিবাদী হয়ে উঠছিল। ফলে বিএনপি-জামায়াত শক্তির অপসারণ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ ও এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে ফলে মানুষ বিশেষ করে সোয়া এক কোটি নতুন ভোটার আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়। ফলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে আওয়ামী লীগ বাধ্য। বর্তমানে দুটো ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। জেলে ভরা হয়েছে গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, সালা উদ্দিন কাদের, আব্দুল আলিমদের মতো জাঁদরেল রাজাকারদের সাড়ে তিন বছর আগেও যা ছিল কল্পনাতীত। ’৭৫ এর পরে এদেশে একটি ধারণাকে প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা হয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার কখনো হবে না। অনেক বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক নানাভাবে বক্তৃতা, বিবৃতি এমনকি লেখা-লেখির মাধ্যমেও প্রচার করার চেষ্টা করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু হত্যকাণ্ডের বিচার-কখনো হবে না। কারণ আওয়ামী লীগ তা চায় না, খামাখা মামলাগুলো ঝুলিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে এবং তা সুষ্ঠু ও বিতর্কহীন ভাবেই হয়েছে। বর্তমানে তেমন একটি প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার আওয়ামী লীগ সম্পন্ন করে যাবে না, আগামীবার নির্বাচনে জয়লাভের জন্যে এটিকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিচার আওয়ামী লীগকে ওই মেয়াদেই সম্পন্ন করতে হবে, রায় কার্যকর করতে হবে। শাপের লেজে পা যখন দেয়া হয়ে গেছে তা আর উঠিয়ে নেয়া যাবে না। সাপকে বধ না করা পর্যন্ত। আশা করি এটুকু বাস্তবতা বোঝার মতো বোধশক্তি আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের আছে। তবে অন্তত একটি বিষয়ে যে আওয়ামী লীগ তথা সরকার দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়নি বা এখনো দিচ্ছে না সে বিষয়ে আমি অন্তত নিশ্চিত। ’৭৫ এ জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা মোশতাক- জিয়া-এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় ’৭১ এর পরাজিত শক্তি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আর পুরাতন মুসলিম লীগের ধ্যান-ধারণায় গড়া বিএনপি তো এই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির অন্যতম রাজনৈতিক মিত্র। কাজেই স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে এবং এর মধ্যে বেশির ভাগ সময় রাষ্ট্র ক্ষমতা ভোগকারী এসব যুদ্ধাপরাধীর যখন বিচার কার্য চলবে, এরা যখন জেলের অভ্যন্তরে থাকবে (গত সাড়ে তিন দশক যা ছিল একেবারে অবিশ্বাস্য) এর বিচারের রায় যত ঘনিয়ে আসবে তখন আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্নে দেশ পরিচালনা করবে, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা সব ঠিকঠিক চলবে, প্রধান বিরোধী দল এই বিচার প্রক্রিয়ার নীরব দর্শক হয়ে থাকবে এমন মনে করাই আওয়ামী লীগ বর্তমান সরকারের চরম বোকামী, অদূরদর্শিতা ও অবিচক্ষনতা। বর্তমান দেশের পরিস্থিতি আমাকে সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। এরশাদ-খালেদা জিয়ার আমলে গড়ে তোলা আমলা-প্রশাসন-পুলিশ বাহিনী রাতারাতি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যান্ডেট পূরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে তার নিশ্চয়তা বর্তমান সরকার কীভাবে পেলো আমি জানি না। এই সরকারের সমস্ত অর্জনকে ম্লান করে দিতে, সরকারকে বিব্রত ও ব্যর্থ করে দিতে ওদের কোন শক্তি যে তৎপর নয় তার নিশ্চয়তা কোথায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভা উপদেষ্টা কিংবা দলেও যে এমন স্যাবোটাজ করার লোক নেই সে বিষয়েও নিশ্চিত হই কীভাবে। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়। অতীতের অনেক ঘটনা আমাদের সংশয়ে ফেলতে বাধ্য করে বারবার। প্রাণহারী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যে কোন কিছুর বিনিময়ে বাঁচার চেষ্টা করে। প্রয়োজনে সে তার সমুদয় সম্পদ বিক্রি করে হলেও তার চিকিৎসা করে সুস্থ হতে চায়। সে হয়ত ভাবে বেঁচে উঠলে এমন সম্পদ অর্জন কঠিন কিছু নয়। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। ’৭১ এর পরে এই প্রথম অস্তিত্ব বিপণ্ন হওয়ার পরিস্থিতি মুখোমুখী জামায়াত তথা যুদ্ধাপরাধীরা। গত চল্লিশ বছর ধরে গেড়ে বসা এই শক্তির অর্থের উৎসও অর্থ ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখন জীবন বাঁচাতে এসব অর্থ কি তারা ব্যবহার বা খরচ করবে না অকাতরে। শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগের সংবাদ আর নতুন নয়। এর মধ্যে মাত্র দু’এক হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের বাজারে ছড়িয়ে দিলে বিক্রি হয়ে যাওয়ার লোকের অভাব হবে কি? এদেশে তো মাত্র ৫০ টাকার জন্যেও মানুষ খুন হয়। এদেশের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিরাইতো মালী পিয়নের মতো পদে লোক নিয়োগের সময়ও ঘুষ খায়। এদেশের সিংহভাগ বাড়ি গাড়িই তো কোন না কোন প্রকারের চোরাই অর্থে কেনা। অতএব শর্ষের ভিতর যদি ভূতের সংখ্যা বেড়ে যায়। অন্তত বাংলাদেশের বাস্তবতায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে দেশে যে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। যে আশংকা আমি ২০০৮ সালের বর্ষশেষ রাতে অনুধাবন করেছিলাম। কিন্তু দুঃখ হলো প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশীদার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা সে বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেনি। যে কারণে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের মধ্যে মিলিত কোন প্রস্তুতি নেই। ফলে সরকারের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে, অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে আত্ম বিশ্বাসের। আগামী দেড় বছরের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ-মানবতা বিরোধী অপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায় এর সময় যতই ঘনিয়ে আসবে পরিস্থিতি ততই খারাপের দিকে যাবে। বিএনপি ও তার অংশীদার চরম দক্ষিণপন্থী দলগুলো চাইবে না বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক, যে কারণে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখে নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে ব্যর্থ হতে সবধরণের কূট কৌশলের আশ্রয় নেবে তারা। গ্যাস, বিদ্যুৎ, দ্রব্য মূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে এই বিচার কাজ সম্পন্ন করা সরকারের পক্ষে কঠিন থেকে কঠিনতম হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির ঐক্য সুদৃঢ় করার কোন বিকল্প নেই। এখন থেকে কৌশলী না হলে বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। মনে রাখা উচিৎ সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।
লেখক-কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক
Email- qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন