পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১২

* 'প্রণমি তোমায় জননী সাহসিকা'

দৈনিক আজাদী                            উপসম্পাদকীয়                         কাল, আজ, কাল
১০ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.২৭ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি


পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রিপা আক্তার। হঠাৎ প্রসব বেদনা ওঠে। দ্রুত তাঁকে একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন নয়টা পাঁচ মিনিট। নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৪০ মিনিট পরই তাকে স্বজনদের কাছে রেখে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে ছুটেন রিপা। গত শুক্রবার কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক গত রোববার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এটি। খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নয় মনে করে পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিলো সংবাদটি। কিন্তু সেদিন ঐ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে অন্যতম পঠিত সংবাদ ছিল এটি। এরপর দিনই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কথা বলেন রিপার সাথে। তিনি ফোনে রিপাকে বলেছেন, “মা তুমি পড়োতোমার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।” মন্ত্রী সে সাথে সংশ্লিষ্ট পত্রিকারিপার বাবাকলেজের অধ্যক্ষ ও স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথেও কথা বলেন। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।

রিপার বিয়ে হয়েছিল ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর। বিয়ের পরও তিনি যথারীতি পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন আর এরই মধ্যে সন্তানসম্ভবা হন তিনি। ১৯ মে সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ থাকলেও তার আগেই তাঁর প্রসব বেদনা ওঠে। সন্তান ভূমিষ্ঠের পরপরই রিপা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। প্রথমে আপত্তি জানালেও রিপার ঐকান্তিক ইচ্ছার কাছে হার মানে সবাইশেষে তাঁর বাবাই তাঁকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ২০ মিনিট পরে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হলেও ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮০ নম্বরের উত্তর দিতে পেরেছেন তিনি। রিপার কথা পড়তে গিয়ে এমন আরেকজন পরীক্ষার্থীর কথা মনে পড়লো। স্বামী যার ডান হাতের আঙুল কেটে নিয়েছিল যেন সে পড়ালেখা করতে না পারে। সে মেয়েটিও পরীক্ষা দিচ্ছে এবার। অদম্য সাহসী রিপাদের কথা যখন পত্রিকায় পড়ছি তখন গত দু’বছর আগে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সংঘটিত একটি ঘটনার কথা মনে পড়লো। সম্ভবত ২০১০ সালের মে মাসের দিকেরই একটি ঘটনা। বিয়ের আসরে খাওয়া দাওয়া শেষে যখন আক্‌দ পড়ানোর প্রস্তুতি চলছিল তখনই ঘটলো বিপত্তিটা। বিয়ের আসরে এক তরুণী এসে দাবি করে মঞ্চে উপবিষ্ট বর তারই প্রেমিক। এতদিন তার সাথে প্রেম করে এখন বিয়ে করতে যাচ্ছে অন্য একজনকে। ব্যস লেগে গেলো ‘ভজকট’।অবশেষে বিয়ের আসরে উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবিয়ের কাজী ও কনে পক্ষের বাবা মার সম্মতিতে দুই তরুণীকেই আক্‌দ পড়িয়ে সোপর্দ করা হয় প্রতারক বলে অভিযুক্ত বরকে।

গুণধর বর একজনকে বিয়ে করতে এসে এক সাথে দু’দুটি নতুন বউ নিয়ে ঘরে ফিরলেন। সাবাশ পুরুষ। সে সময় এ ঘটনা নিয়ে “এযে তারই অপমান কবে বুঝবে নারী” শীর্ষক একটি লেখা লিখেছিলাম। পুরুষ শাসিত সমাজে নারী নিগ্রহ এবং এক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা নিয়ে আমার সে লেখার পরে অনেকে তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া এমন অনেক অপমানের কথা জানিয়েছিলেন যা তাঁরা তখন প্রতিবাদ করতে পারেন নি। আমি রিপাদের সাহসী বর্ণনা পড়ার সাথে সাথে রাঙ্গুনিয়ার ঐ দুজন তরুণীর কথা ভাবছিলাম একই দেশ একই সমাজের দুজন নারী কত প্রতিবাদী ও উদ্যমী আর দুজন কেমন নির্লিপ্ত ও আত্মসমর্পিতা। শিক্ষা অর্জন করাতো রিপার মৌলিক অধিকার। রিপার স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন এ ব্যাপারে রিপাকে বাধা দেয়নি। বর্তমান সময়ের এখনো এটি একটি উদারতাযেখানে আরেকজন পরীক্ষার্থীর আঙুল কেটে নিয়েছিল তার পাষণ্ড স্বামী। এক্ষেত্রে রিপার স্বামীকে আমরা ধন্যবাদ জানাতে পারি।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান সমাজে নারীর অবস্থান কী?এটির উত্তর খোঁজার আগে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করতে পারি। গত বছর বাংলাদেশে এসে তিনি বলেছিলেন, “সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে।” মন্তব্যটি ফেলে দেয়ার মত নয়। বাংলাদেশকে নিয়ে সহজেই যাঁরা হতাশা ব্যক্ত করেন আমার লেখাটি সম্ভবত তাঁদের সন্তুষ্ট করবে না। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে বিশেষ করে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান করুণ নয়বরং এই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায় আশাব্যঞ্জক বলতে হবে। ২০১২ সালে এসে বাংলাদেশের নারীরা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি আত্মনির্ভরশীল ও সাহসী। আর এটি সম্ভব হয়েছে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গত একুশ বছর ধরে পালাক্রমে দুজন নারীর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার কারণে।

প্রধানমন্ত্রীবিরোধী দলীয় নেত্রীসংসদ উপনেতাপররাষ্ট্রমন্ত্রীস্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকৃষি মন্ত্রী,শ্রম প্রতিমন্ত্রীসচিববিচারকএসপি এমনকি সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক নারীর অংশগ্রহণ ও সাফল্য সমাজে কি একটুও প্রভাব ফেলেনি বলে ভাবতে হবেতৈরি পোশাক শিল্প এমন কি বর্তমানে নির্মাণ শিল্পে পর্যন্ত নারী শ্রমিকদের বিশাল অংশগ্রহণ সমাজে কি কোন পরিবর্তন সৃষ্টি করেনিসমাজের ভিতরে অবস্থান করে বাস্তবতাটি অনেকের চোখে পড়ছে নাকারণ পরিবর্তনটি সাধিত হচ্ছে খুব ধীরে ধীরে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বে আজ এক অন্যতম পরাশক্তি। সে ভারতেও আজ হাজার হাজার কন্যা শিশুকে জন্মের আগেই হত্যা করা হয় ভ্রূণ অবস্থাতেই যে সংবাদ তাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয় হরহামেশাই। পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ নাইবা করলাম। তবে বাংলাদেশে যে নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে না। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও নারীরা অপমানিত হচ্ছে নালাঞ্ছিত হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আমি বলতে চাইছি যে কোন মুসলিম বিশ্বের তুলনায় এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি একেবারে হতাশাজনকও নয়। তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন বিশেষ করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অগ্রসর ও প্রগতিশীল শক্তির অবস্থানটিই সবচেয়ে আগে জরুরি। কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতায় কোন মৌলবাদী শক্তির উত্থান বা অংশীদারিত্ব নারীদের এ অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে সন্দেহ নেই। যারা প্রকাশ্যে শ্লোগান দিতে পারে “আমরা সবাই তালেবানবাংলা হবে আফগান” অন্তত তাদের কাছে নারী মুক্তির দাবি তোলা বা মুক্তির আশা করা মরীচিকার পানে ছুটে চলার মতই হতে পারে। আমরা রিপার এই সাহসী কর্মের প্রশংসা না করে পারি না। পারি না তাঁর মাতৃত্বকে সম্মান না জানিয়ে থাকতে। পড়ালেখার প্রতি তাঁর অদম্য ইচ্ছা বাংলার লক্ষ লক্ষ নারীকে উজ্জীবিত করবেপ্রাণিত করবে সন্দেহ নেই। এই সাহসী জননীকে আমাদের শ্রদ্ধাভিনন্দন।

আজকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েদের কৃতিত্বপূর্ণ অবস্থানফলাফল ভালো করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখে আমরা আশান্বিত হই একদিন সমাজের সর্বক্ষেত্রে আমাদের মেয়েরাও এগিয়ে থাকবে নিজেদের যোগ্যতায়আপন মর্যাদায়। পুরুষের কৃপায় নয়।

এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে লেখাটি শেষ করতে পারলে ভাল লাগতোকিন্তু পারছি না। মনে পড়ছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে একটি নারীনীতি ঘোষণা করেছিলকিন্তু দেশের কিছু দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা ও আন্দোলন হুমকির কারণে পিছিয়ে আসে সরকার। এ বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল যার প্রধান একজন নারী সে দলও রহস্যজনকভাবে নীরবতা পালন করেছে। সম্ভবত এ দলটি তার দীর্ঘদিনের মিত্র এসব মৌলবাদী সংগঠনগুলোকে চটাতে চায়নি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে সামরিক কু’এর মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইউব খান ১৯৬১ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ এর মত একটি আধুনিক আইন প্রণয়ন করেছিলেন। সে আইনে তালাক ও হিল্লে বিয়ের মতো অমানবিক কিছু রীতি পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। অথচ তার ৫০ বছর পরে একটি স্বাধীন দেশেযে দেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও যার স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে তেমন একটি দেশে সামান্য একটি নারীনীতি প্রণয়ন করতেও সরকার দ্বিধাগ্রস্ত হয়।

আমি দুঃখতি। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে আবার আমাকে রাজনীতির কথা বলতে হয়। ৭৫ এ জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা/দখলকারী শক্তি পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে এদেশে বিস্তার ঘটিয়েছে ধর্মান্ধ ও চরম মৌলবাদী গোষ্ঠীর। আর দীর্ঘদিন সরকারি আনুকূল্যে এদের শেকড় এমনভাবে গজিয়েছে যে মাত্র পাঁচ বছরে এত জঞ্জাল পরিষ্কার করা সম্ভব নয় বলে মনে হয়। আমার ধারণা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যে একটি উদারগণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক শক্তির দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্র শাসন জরুরি।

লেখক কবিসাংবাদিককলামলেখক
email:qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ