পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

'নিতে পার প্রাণ, দিতে পার কি?'

দৈনিক আজাদী              উপসম্পাদকীয়             কাল আজ কাল
২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১১ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী


এক. “অরা খালি বাপেক পুড়্যাই মারেনিপরিবারকে ছারখার কর‌্যা দিচে”। এই বিলাপ ট্রাকচালক শামসুল হকের মেজো ছেলে হাবলু মিয়ার।
গত সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর টানা ৪৮ ঘন্টার হরতালের প্রথম দিনে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার দশমাইল এলাকায় হরতাল সমর্থকরা শামসুল হকের ট্রাকে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। এতে ট্রাকে আগুন লেগে গেলে তিনি গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে গত রোববার তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুরের গণ্ডগ্রামে। শামসুল হকের ছেলে লাবলু মিয়া কাঁদতে কাঁদতে আরও বলেনসংসারে ১২/১৩ জন সদস্য। বাবার উপার্জনেই খরচ চলত। শামসুল হকের একটি মেয়ে গত বছর বগুড়াস্থ শাহ সুলতান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে মেয়েটি আহাজারি করছিল, ‘হামার আব্বুক তোমরা অ্যানে দাওহামার আব্বুতো কোনো পাপ করেনি। ক্যানে মারলে ওরা’।

আসলে শামসুল হককে কেনো মেরেছে ওরা তার উত্তর আমরাও জানি না। শুধু জানি একাত্তরে এভাবে নিরপরাধ ত্রিশ লক্ষ মানুষকে যারা হত্যা করেছিলহত্যায় সহযোগিতা করেছিল তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে। ৪৩ বছর আগের হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করতে ওদের উত্তরসূরিরা আবার হত্যার উৎসবে মেতেছে। শুধু একজন শামসুল হক নয়। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে বিশেষ করে বিভিন্ন অপরাধীর সাজার রায় ঘোষিত হতে থাকার পর থেকে ওদের হাতে কত শামসুল হক প্রাণ হারিয়েছেকতজন পঙ্গু হয়েছেকত পরিবার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়েছে তার হিসাব এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়। ঢাকায় একটি গাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। আগুন লাগার পরে চালক নেমে প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা তাকে নামতে দেয়নি। বলেছে তুই মরলে অ্যারা গাড়ি নিয়ে বের হতে ভয় পাবে।

দুইপাকিস্তানের পেশোয়ারে ঐতিহাসিক একটি গির্জার পাশে গত রোববার আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৭০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক। পাকিস্তানে খ্রিস্টানদের ওপর এটাই মারাত্মক হামলার ঘটনা। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতায় ১৩০ বছরের পুরনো অল সেইন্টস গির্জার আশপাশের কয়েকটি ভবনের জানালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। মৃতের মধ্যে শিশুনারী ও পুলিশও রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র বলেছে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে। তালেবানের সঙ্গে জড়িত জঙ্গিদল টিটিপি জানদুল্লাহ এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। পাকিস্তানে ১৮ কোটি জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।

তিনকেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির একটি শপিংমলে গত শনিবার সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৭০ জনআহতের সংখ্যা ৩০০শ’রও বেশি। তারা এই বিপণি কেন্দ্রে ঢুকে অনেক নারী ও শিশুকে জিম্মি করে রাখে। আল কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ইসলামপন্থি জঙ্গি সংগঠন সোমালিয়ার আল-শাবাব এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত এই দুটি-বৃহৎ হত্যাকাণ্ডের সংবাদের চাপে আফগানিস্তানইরাকলিবিয়াসহ অন্য কয়েকটি মুসলিম দেশে ছোটখাটো কিছু হত্যাকাণ্ডের সংবাদ চাপা পড়ে গেছে।

চারখুব অসহায় হয়েবিনীতভাবে (জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী নই বলেপ্রশ্ন করতে চাই এই মৃত্যুএই হত্যার উৎসব কার স্বার্থে। কিসের স্বার্থে। কোন উদ্দেশ্যে শত শত নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করা হলো। এতে কার কী অর্জিত হলো। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের কোথাও কি এমন হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ আছেনা বৈধতা আছে। এতে ইসলাম ধর্মের কী লাভ হলো। মুসমানদের কোন স্বার্থ রক্ষিত হলো। এভাবে এরা কোন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলাম ধর্মের সাথে এদের নৈতিক ও আদর্শিক মিলটা কোথায়। বরং এ ধরনের কাপুরুষোচিত হত্যা ও আক্রমণের কারণে আজ সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্ম জঙ্গিবাদের সমার্থক হয়ে উঠছে আর বিপন্ন ও পরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘুরামুসলিমরা। পশ্চিমা বিশ্বে আজ মুসলিম নামধারী হলেই তাকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অনেককে সন্দেহের তালিকায়ও রাখা হচ্ছে। এদের অধিকাংশই নিরীহ ও নিরপরাধ। এসব কারণে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের সন্তান যারা ওদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে তারা ভীষণ বিব্রত ও অবমাননাকর পরিস্থিতিতে পড়ছে। ওদেশের শিশুদের মনেও এখন এক প্রকার ঘৃণা ও অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে মুসলিম শিশু সহপাঠীদের প্রতি। ইসলামের নামে এমন জঙ্গিরূপ পরিহার না করলে অদূর ভবিষ্যতে সকল সভ্য ও উন্নত দেশগুলো মুসলিমদের এক প্রকার বয়কট করা শুরু করবে তাদের দেশ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার খাতিরে।

পাঁচবাংলাদেশে বর্তমানে যা চলছে তা জঙ্গিবাদেরই অন্য রূপ। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা গণহত্যাধর্ষণঅগ্নিকাণ্ড ও লুটপাট করেছিল তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে স্বাধীনতার দীর্ঘ চারদশক পরে। এই দীর্ঘসময়ে সিংহভাগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এই শক্তির সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকরাই। ফলে অর্থনৈতিকসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এরা ’৭১’র চেয়েও অনেক শক্তিশালী। বিশেষ করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান শুধু ভালো নয়। দেশের বর্তমান অর্থনীতির ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো। কাজেই বর্তমান বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালকে বিব্রতবিতর্কিত ও অকার্যকর করতে তারা শত শত কোটি ডলার খরচ করার মতো ক্ষমতা রাখে। করছেও তাই। ফলে টাকার জোরে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টাও করছে তারা। জামায়াত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলো মোকাবেলা করছেউচ্চ আদালতে আপিল করছে অন্যদিকে মামলায় হেরে গিয়ে হরতালের নামে দেশে নৈরাজ্যও চালাচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার ও এর প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেমানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছে অথচ হরতাল ডেকে যারা মানুষ হত্যা ও নৈরাজ্য চালাচ্ছে সে বিষয়ে আশ্চর্য নীরবতা পালন করছে।

ছয়তারুণ্যের ধর্ম হচ্ছে আধুনিক হওয়া। নতুনকে ধারণ করা। তারুণ্যের ধর্র্ম হচ্ছে বিদ্রোহ আর বিপ্লব করাসকল অসুন্দর আর অকল্যাণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তারুণ্যের ধর্ম হচ্ছে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের জয়গান গাওয়া। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকা। এই তারুণ্যের রূপ দেখলাম শাহবাগসহ দেশের আনাচে-কানাচে। যারা দিনের পর দিন অহিংসভাবে আন্দোলন-অবস্থান করে গেছে। আর অন্যদিকে আরেকদল তরুণদের দেখছি যারা হঠাৎ মৃত্যুদূতের মতো উপস্থিত হয়ে ভেঙেচূরে ধ্বংস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করে মেতে ওঠে হত্যার উল্লাসে। জীবনের পরিবর্তে তারা নিয়ে আসে মুত্যুর পয়গাম। কিন্তু প্রশ্ন করতে চাই যা তারা দিতে পারে নাসৃষ্টি করতে পারে না তা ধ্বংস বা হত্যা করবে কীভাবে। জীবনতো কেউ দিতে পারেনাযা সে দিতে পারে না তা বধ করবে কীভাবে সে। পৃথিবীর সমস্ত ধনরাজী দিয়ে একটি মানুষতো দূরের কথামানুষের একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কি অবিকল তৈরি করা সম্ভব। যারা জীবন দিতে পারে না।

জীবনের জয়গান যাদের দ্বারা গীত হয় নাজীবনের পক্ষে যারা কোনোদিন দাঁড়ায় না তারা জীবন কেড়ে নিতে আসে কোন দুঃসাহসে। ত্রিশ লক্ষ প্রাণ হত্যার বিচার ঠেকাতে এরা আরও কত প্রাণ কেড়ে নেবে মানুষের?

পুনশ্চঃ- ‘অভিজাত যুবলীগ’ শীরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম কয়েক সপ্তাহ আগে। সেখানে যুবলীগের কিছু সমালোচনা করেছিলাম। গত কয়েকদিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় দেখলাম চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ-মাদক বিরোধী প্রচারণা ও আন্দোলন শুরু করেছে। প্রীত হলাম। আমি মূলত এ সংগঠনগুলোর কাছে এ ধরনের ইতিবাচক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা করি। নবগঠিত যুবলীগ কমিটিকে ধন্যবাদ।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

'জয় নব উত্থান'

দৈনিক আজাদী                   উপসম্পাদকীয়               কাল আজ কাল
১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৪ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১২ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী

বছর দুয়েক আগে সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ করলেও গত সপ্তাহ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। অবশ্য এর আগে দু’তিনটি জনসভায় মায়ের সাথে জনসম্মুখে এসেছিলেন তিনি। কার্যত সেসব সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী পুত্র জয়কে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘রূপকল্প ২০২১ গত পাঁচ বছরের অর্জনআগামী পাঁচ বছরের অঙ্গীকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি একক ও স্বাধীনভাবে জনগণের মুখোমুখি এলেন। সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তর বিশেষ করে তরুণদের সাথে মতবিনিময় করেন। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। এর পরের দিন অর্থাৎ গত শনিবার চট্টগ্রাম ক্লাবেও এমন একটি আয়োজনে তিনি মুখোমুখি হন চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এ অনুষ্ঠানে তিনি তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে।

রাজনীতিতে জয়ের সক্রিয় হওয়া নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান বিরোধীদল স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দলের যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবীর রিজভী জয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য প্রদানের অভিযোগ এনেছেন। এছাড়া নামে সুশীল কার্যত রাজনীতিককিছু অতি বাম ও ‘কনফিউজড’ কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তবে মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়া আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছেন জয়তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

উত্তরাধিকারের রাজনীতি যারা পছন্দ করেন না তাঁরাই মূলত জয়ের রাজনীতিতে আসা সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। আমি নিজেও উত্তরাধিকারের রাজনীতি বা রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র পছন্দ না করলেও ঘোরতর বিরোধী নই। কারণ রাজনীতি পরিচালিতই হয় ভাবাবেগ দিয়ে। প্রিয় নেতা বা দলের জন্য অধিকাংশ কর্মী সমর্থকরা যুক্তি-তর্কের ধার ধারে না। নেতা যা বলে বা দল যে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় তারা তা-ই করে। এক্ষেত্রে অনেকটা রেজিমেন্টালটা আগে এই ভাবাবেগ বা ধারা শুধু বাংলাদেশই নয়। এর উদাহরণ আছে ভারতপাকিস্তানশ্রীলংকানেপালইন্দোনেশিয়াবার্মা বা মায়ানমারকাশ্মিরউত্তর কোরিয়াএমনকি আমেরিকায়ও। জন এফ কেনেডির জনপ্রিয়তার তোড়ে তার পরিবারও সম্মানীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। শাসনকার্যে জড়িত না থাকলেও বৃটেনঅস্ট্রেলিয়ানিউজিল্যান্ডজাপানবেলজিয়ামথাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে রাজা-রানিরা পূজনীয় হচ্ছেন স্রেফ ভালোবাসা ও আবেগের টানে।

তবে পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে যদি অযোগ্যদুর্নীতিবাজ অর্ধশিক্ষিত আর সন্ত্রাসের গডফাদার কেউ রাজনীতিতে আসেন সেখানেই আপত্তি থাকার কথা। একজন আধুনিকশিক্ষিতমার্জিত ও সৎ তরুণ যদি রাজনীতিতে আসেন এবং তা যদি পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমেও হয় তাতে আপত্তি থাকবে কেন?

রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নিয়ে বলতে গেলে একটু পূর্ব থেকে শুরু করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড স্রেফ ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নয়। এই হত্যাকাণ্ড একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে একটি জাতির মৌলিক পরিচয়সহ রাষ্ট্রের মূল স্বপ্নকেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। যে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন ও মুক্ত করা হয়েছিল ’৭৫ এর পরে বাংলাদেশ সে রাষ্ট্রের দিকেই ধাবিত করা হচ্ছিল। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাসমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো মৌলিক চেতনাগুলো মুছে ফেলা হয়েছিল এবং এই কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন করার সব ধরনের কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বলা বাহুল্য কার্যত তাই ঘটতো দেশেযদি ৮০’এর দশকের শুরুতে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ন্যস্ত করা না হতো। আজ বাংলাদেশ বলতে (একাত্তরের চেতনায়)যতটুকু আছে তা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগের পুনর্জীবনের কারণেও এবং আওয়ামী লীগ যে এখনো বৃহৎ রাজনৈতিক দল তা শেখ হাসিনার কারণে। ৭৫ থেকে ৮১ পর্যন্ত বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা অবলোকন করেছেন তারা আমার সাথে একমত পোষণ করবেন বলেই মনে করি। যদি সে কাল রাতে (১৫ আগষ্ট ১৯৭৫বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যদের সাথে শেখ হাসিনা ও রেহানাকেও হত্যা করা হতো তাহলে আজ ‘আমার সোনার বাংলা’ বদলে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ গাইতে হতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো এক একটি ওয়াজিরিস্তানে পরিণত হতো। এছাড়া শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আগমন আকস্মিক হলেও অসম্ভব ছিল না। কারণ তিনি দেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিয়েছেন। নিজে অল্পসময়ের জন্য হলে ও ছাত্র রাজনীতি করেছেন। এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতো অবিস্মরণীয় ও অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তির কন্যা হিসেবে কিছুটা দীক্ষা হলেও পেয়েছিলেন।

সে হিসেবে শেখ হাসিনার রাজনীতিকে উত্তরাধিকারের রাজনীতি বলে একেবারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা সঙ্গত হবে না। বরং কিছু ভুল-ভ্রান্তি ছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন ও চারদশকের কলঙ্ক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে শেখ হাসিনা একজন দক্ষ রাষ্ট্র নায়কের পরিচয়ই দিয়েছেন। যারা এতকাল বলেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আওয়ামী লীগ করতে পারবে না বা করবে নাযুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে না বা তার সবটাই শেখ হাসিনার সরকার করে দেখিয়েছেন। এবং এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অবস্থান ও আন্তরিকতাই ছিল প্রধান। যারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন নাআওয়ামী লীগকে ভোট দেন নাবিএনপি ও জামায়াতের চেয়ে আওয়ামী লীগকেই বেশি গালাগাল করেনতারাই কিন্তু আবার আওয়ামী লীগকে দিয়েই সকল জঞ্জাল পরিষ্কার করিয়ে নিতে চান।

আওয়ামী লীগে অনেক ভুল-ত্রুটি আছে। অনেক গডফাদারচাঁদাবাজটেন্ডারবাজদুর্নীতিবাজ আছে। আওয়ামী লীগে যুবলীগ-ছাত্রলীগের মতো রাজনৈতিক টিউমার আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার অন্যদিকে জামায়াত-হেফাজত ও জঙ্গিদের ঠেকানোর মতো রাজনৈতিক সামাজিক শক্তিও আছে তাতেও সন্দেহ নেই। অর্থাৎ এই মুহূর্তে দেশে তৃতীয় কোনো শক্তির উদ্ভব হয়নি যারা বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবেলা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আমার অনেক বন্ধুরা অভিযোগ করেন তৃতীয় ধারা আওয়ামী লীগই তৈরি হতে দেয়নি। কী বালখিল্য কথাগণজাগরণ মঞ্চের উত্থান কি আওয়ামী লীগ ঠেকাতে পেরেছিলআর যদি আওয়ামী লীগ গণজাগরণ মঞ্চকে শেষ পর্যন্ত গ্রাসই করে থাকে তবে তৎপরবর্তী সময়ে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন করে চাঙ্গা হলো না কেনসমস্যাটি আওয়ামী লীগের না কি বামপন্থি সংগঠন বা তৃতীয় ধারা তৈরির কারিগরদের। আওয়ামী লীগের প্রতি বিরক্ত হয়ে জনমত বিএনপি’র দিকে ঝুঁকবে কেনতৃতীয় ধারা তা কাজে লাগাতে পারলো না কেনআওয়ামী লীগ-বিএনপিতো নিজেরা তাদের অবস্থান ছেড়ে দেবে না। অন্যদের তা দখলে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য দলগুলোর দুর্বলতার জন্যও কি আওয়ামী লীগ দায়ী!

আওয়ামী লীগ পুরনো ও বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এই দল জাতিকে অনেক কিছু অর্জন করে দিয়েছে। আর বৃহৎ ও পুরনো হওয়ার কারণে এই দলে অনেক সুবিধাবাদীলুটেরা উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীর সমাহার ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে যদি জয়ের মতো একজন তরুণসৎ ও শিক্ষিত রাজনীতিকের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর নেতৃত্বে যদি দল গতি পায়দিক নির্দেশনা ও সঠিক পথের সন্ধান পায় তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না। বরং নতুন যুগের সাথেসময়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজাতে অর্থাৎ যুগোপযোগী করে তুলতে সজীব ওয়াজেদ জয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি যাদের আবেগ এখনো অটুট তাঁদের কাছে জয়ের নেতৃত্ব অধিকতর গ্রহণীয়ই হবে-পরিত্যাজ্য নয়।

দুভাগে বিভক্ত জাতির সামনে দু’শিবিরের নেতৃত্বের চিত্রটি তুলে ধরতে চাই পাঠকদের সামনে। এর একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানশেখ হাসিনাসজীব ওয়াজেদ জয়। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানবেগম খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া। গত বিএনপি জামায়াত জোটের পাঁচ বছরে তারেক জিয়ার রাজনীতির চিত্র আমরা দেখেছি। এখন সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতি দেখার পালা। পারিবারিক ঐতিহ্যশিক্ষাসংস্কৃতি আর রাজনৈতিক সততার কথা আজ নাইবা তুললাম। জয়ের আগমনে বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতির নব উত্থান ঘটুক। তা-ই প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

'চে’র মতো রাগী, চেরাগী ও অন্যান্য'

১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ২৮ ভাদ্র ১৪২০ সাল ৫ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
প্রচলিত আছে পীর বদর শাহ চট্টগ্রাম নগরীর মাঝখানে পাহাড়ের একপাশে একটি স্থানে কুপি বা চেরাগ জ্বালিয়ে মানুষের বসবাসের গোড়াপত্তন করেন। তার আগে এসব জায়গা ছিল দৈত্য-দানো,জ্বীনদের আস্তানা। বদর শাহের চেরাগের আলো যতদূর গেছে ততদূর থেকে জ্বীন-ভূতেরা পালিয়ে গেছে। এভাবে এখানে মানববসতি গড়ে ওঠে। মানুষের জ্বালানো আলোয় অন্ধকারের প্রাণীরা পালিয়ে যেতে থাকে আর চারদিকে বাড়তে থাকে মানুষের কোলাহল। সে থেকে এ স্থানের নাম চেরাগী পাহাড়। সংস্কারের বিকৃতি নিয়ে পাহাড়টি এখনো টিকে আছে জামালখানের কাছে। এখনো অনেকে সন্ধ্যায় এখানে ধূপকাঠি জ্বালায়, মোমবাতি জ্বালায়।

জ্বীন-ভূত, দৈত্য-দানোয় অনেকের বিশ্বাস নেই। সে প্রসঙ্গে আমি যেতেও চাই না, তবে আলো জ্বালিয়ে এ অঞ্চলে প্রথম মানববসতির সূচনা করার কাহিনীটি আমার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। মনে হয় হাজার বছর আগে এই স্থানে আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করে যেমন মানুষের উত্থান ও জয়গান ঘোষিত বা রচিত হয়েছিল সে ধারা এখনও বহমান। এই চেরাগী পাহাড় এখনও অবিরাম আলো বিতরণ করে আসছে মানুষকে। অন্ধকার থেকে, অমঙ্গল থেকে, কুসংস্কার ও অসভ্যতা থেকে মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চেরাগী পাহাড়।

হাজার বছর আগে একজন পীর কিভাবে চেরাগ জ্বালিয়েছিলেন সে দৃশ্য দেখেনি কেউ হয়ত তবে এখন এ সময়ে চেরাগী পাহাড়ে কিভাবে আলো জ্বলে, কারা জ্বালায় আর কেমন করে জ্বালায় তা দেখতে হলে গভীর রাতের শেষে এখানে আসতে হবে। এলে দেখা যাবে জেগে থাকা চেরাগী পাহাড়কে। ঝুপড়ির চায়ের দোকানের সামনে চা-পিপাসু কয়েকজনের আড্ডা। একটু ভিতরে গেলে মুদ্রণ শিল্পের অবিরাম শব্দ আর সেখানে কর্মরতদের চরম ব্যস্ততা। মধ্যরাতের পরপর মেশিন থেকে পত্রিকা নামছে। কোনো কোনো পরিবহনে তা চলেও যাচ্ছে গন্তব্যে। আর অন্ধকার ভেদ করে আলো ফুটবার আগে থেকে শত শত পত্রিকার হকার আসতে থাকে তাদের সাইকেল নিয়ে। চেরাগী পাহাড়ে চট্টগ্রামের অন্যতম দুটো দৈনিক আজাদী ও সুপ্রভাত বাংলাদেশ ছাপা হয়। পত্রিকা দুটির অফিস ছাড়াও আরও প্রায় ৫০টি পত্রিকারও টিভি মিডিয়ার অফিস আছে এখানে। এখানে আছে হকার ইউনিয়ন ও তাদের বিভিন্ন সংগঠনের অফিস। মধ্যরাত থেকে সকাল দশটা এগারোটা পর্যন্ত বিরতি দিয়ে দিয়ে এখান থেকে পত্রিকা চলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায়। আরেকটি পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোণ এখানে ছাপা না হলেও তাদের বিক্রয়কেন্দ্র আছে এখানে একটি। চেরাগী পাহাড়ে দুটি বইয়ের দোকান ছাড়াও চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ও আছে। সঙ্গত কারণে এখানে সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি লেখক-কবি-সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের আনাগোনা লেগেই থাকে।

এখানে চে’র মতো রাগী ও স্বপ্নবাজ তরুণরা যেমন আসে তেমনি আসে রোমান্টিক কবি কিংবা সঙ্গীত শিল্পী। সৃষ্টির মোহে, সৃজনশীলতার মোহে যেমন অনেকে আসে তেমনি আবার অনেকে আসে স্বপ্নভঙ্গের যাতনা নিয়ে। চরম হতাশা আর সবার ওপর বিরক্তি নিয়ে। কেউ এখানে জীবন জাগাতে আসে কেউ জীবনের ওপর নিরীক্ষা চালাতে আসে। কেউ আসে ফিউশনের আশায়। কেউ এসে দেখেন কনফিউশন। কেউ আসেন জীবনের আহবানে কেউ বা মৃত্যুর স্বরূণ অবলোকনের আশায়।

অনেকে সন্ধ্যায় এখানে এলে বিস্মিত হন। প্রশ্ন করেন কি হচ্ছে এখানে? এত লোক কেন? জবাব একটাই এটি চেরাগী পাহাড়। এখানে সবাই আসে বিশেষত তরুণরা। কয়েকবছর আগে এখানে যারা নিয়মিত আড্ডা দিতেন তাদের অনেককেই আজকাল দেখা যায় না। তাদের স্থান দখল করে নিয়েছে আরেক দল তরুণ। এভাবে এখানে মুখেরও বদল হয়। আড্ডারুদেরও বদল হয়। কিন্তু বদল যাই-ই হোক এখানে প্রাণের জোয়ার থাকে সর্বক্ষণ, সারাবেলা। অনেকে চেরাগী চত্বরে আর দাঁড়াতে বা আড্ডা দিতে পছন্দ করেন না আজকাল। তাদের অভিযোগ এত গ্যাঞ্জাম আর ভীড়। ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে কোনো বেয়ারা তরুণ। যাদের চোখে বয়োজ্যেষ্ঠরা এক প্রকার অপাংক্তেয়, গুরুত্বহীন।

এক সময় আড্ডা ছিল মুসলিম হল কেন্দ্রিক, শিল্পকলা কেন্দ্রিক। আজকাল অন্যান্য সকল আড্ডা ছাপিয়ে-ছাড়িয়ে চেরাগী পাহাড়ের আড্ডাই অন্যতম প্রধান হয়ে উঠেছে। শিল্প সাহিত্য-সংস্কৃতি অর্থাৎ সৃজনশীল কাজের সাথে যারাই জড়িত তাদেরকে কোনো না কোনো সময়ে চেরাগী পাহাড় আসতে হয়। দিনে একবার না এলে অনেকের নাকি ভাত হজম হয় না। অনেকে চেরাগী পাহাড়ের এই পরিবেশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও অধুনা আজিজ সুপার মার্কেটের সাথে তুলনা করেন। এখানে আড্ডা হয় শিল্প সাহিত্য নিয়ে, সঙ্গীত নিয়ে, প্রকাশনা নিয়ে, বই-পত্র ও পত্রিকা নিয়ে। সন্ধ্যার পর পর শহরের নানা প্রান্ত থেকে তরুণরা ছুটে আসে এখানে। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মেতে ওঠে আড্ডায়।

আশেপাশের অনেকে বিরক্তও হন তাদের ওপর। কারণ একটি সময়ে এখানে চলাফেরাও মুশকিল হয়ে পড়ে। চেরাগী পাহাড়ের এই অংশকে ডিঙিয়ে যেতে হয় অনেককে তাদের বাসা-বাড়িতে। মাঝে-মধ্যে নারী ও শিশুদের কিছুটা বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। এ নিয়ে দুয়েকবার অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া এই আড্ডার সুযোগে এখানে অসামাজিক কাজও চলে। মাদকের নীল বিষের ছোঁয়ায় এখানে বিপন্ন হয় তারুণ্য। অনেকে এর খপ্পরে পড়ে এক সময় হারিয়ে গেছে জীবনের এই উচ্ছ্বলতা থেকে। এখানে কবিতা হয়, গলা ছেড়ে গান গাওয়া হয়। শোনা হয় জন্ম বাউল আবদুল হামিদের দোতারা। এখানে তর্ক হয়, কখনো বা মারামারিও হয়। তারপরেও চেরাগী পাহাড়ের আড্ডায় ছেদ পড়ে না।

এখানে অনেক স্বপ্নবান তরুণ আসে। সমাজের অসাম্য বিভেদ, কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। তারা প্রতিবাদ করে। তারা সংঘবদ্ধ হয় আর আমি স্বপ্ন দেখি চে’র মতো কোনো এক রাগী তরুণ একদিন ঠিক দাঁড়িয়ে বলবে, বন্ধ হোক এসব। এ নষ্ট রাজনীতি, এই লুটপাট, এই অসাম্য, এই ধর্মীয় অনাচার। মানুষ ডাক দিয়ে বলবে, “জাগো বাহে কোনঠে সবায়।”

আমি আশাবাদী মানুষ। সব সময় স্বপ্ন দেখি একদিন এই অন্ধকার ঠিক কেটে যাবে। ধর্ম-বর্ণ-ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার বাসযোগ্য একটি মাতৃভূমি ঠিকই প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি শোষণহীন-বঞ্চনাহীন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যহীন বাংলাদেশ একদিন ঠিকই প্রতিষ্ঠিত হবে। অনেক অনিয়ম, অনেক অস্থিরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিন কোনো এক সুন্দর সকালে একদল তরুণ দেবশিশুর মতো উঠে এসে বলবে, “আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি।” আমরা বিস্মিত চোখে আমাদের সন্তানদের সে উত্থানপর্ব দেখব। নব বাংলাদেশকে দেখবো।

একদিন এ অঞ্চলে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল এই চেরাগী পাহাড় থেকে। আজও সভ্যতার প্রধান বাহন সংবাদপত্র এই এলাকা থেকে ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো। প্রগতিশীলতার আলো। সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যেতে অনেক সংগঠনের কর্মীরা প্রতিনিয়ত “আলো হাতে চলিয়াছে” দেশে তরুণদের বিনোদনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। খেলার মাঠ নেই, ভালো কোনো ছবি বা সিনেমা নেই, কোনো থিয়েটার নেই, নিঃশ্বাস নেওয়ার খোলা কোনো চত্বর নেই। নিরুপায় তরুণরা এখানে আসে। আমাদের মতো বয়স্করা মাঝে মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি বটে কিন্তু তারপরেও ভাবি এরা যাবে কোথায়। এই তরুণদের ভীড়ে মাঝে-মধ্যে দু’একজন বিভ্রান্ত বেপথু তরুণ অপ্রীতিকর ও অসামাজিক কিছু কাজও করে। তবে সংখ্যায় তারা অত্যন্ত নগণ্য। তারুণ্যের সহজাত প্রাবল্যে তাদের ভেসে যাওয়ার কথা।

তারপরেও চেরাগী পাহাড় জেগে থাক। প্রাণের স্পন্দনে, আলোর জোয়ারে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ