দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১১ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১১ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী
এক. “অরা খালি বাপেক পুড়্যাই মারেনি, পরিবারকে ছারখার কর্যা দিচে”। এই বিলাপ ট্রাকচালক শামসুল হকের মেজো ছেলে হাবলু মিয়ার।
গত সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর টানা ৪৮ ঘন্টার হরতালের প্রথম দিনে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার দশমাইল এলাকায় হরতাল সমর্থকরা শামসুল হকের ট্রাকে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। এতে ট্রাকে আগুন লেগে গেলে তিনি গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে গত রোববার তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুরের গণ্ডগ্রামে। শামসুল হকের ছেলে লাবলু মিয়া কাঁদতে কাঁদতে আরও বলেন, সংসারে ১২/১৩ জন সদস্য। বাবার উপার্জনেই খরচ চলত। শামসুল হকের একটি মেয়ে গত বছর বগুড়াস্থ শাহ সুলতান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে মেয়েটি আহাজারি করছিল, ‘হামার আব্বুক তোমরা অ্যানে দাও, হামার আব্বুতো কোনো পাপ করেনি। ক্যানে মারলে ওরা’।
আসলে শামসুল হককে কেনো মেরেছে ওরা তার উত্তর আমরাও জানি না। শুধু জানি একাত্তরে এভাবে নিরপরাধ ত্রিশ লক্ষ মানুষকে যারা হত্যা করেছিল, হত্যায় সহযোগিতা করেছিল তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে। ৪৩ বছর আগের হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করতে ওদের উত্তরসূরিরা আবার হত্যার উৎসবে মেতেছে। শুধু একজন শামসুল হক নয়। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে বিশেষ করে বিভিন্ন অপরাধীর সাজার রায় ঘোষিত হতে থাকার পর থেকে ওদের হাতে কত শামসুল হক প্রাণ হারিয়েছে, কতজন পঙ্গু হয়েছে, কত পরিবার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়েছে তার হিসাব এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়। ঢাকায় একটি গাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। আগুন লাগার পরে চালক নেমে প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা তাকে নামতে দেয়নি। বলেছে তুই মরলে অ্যারা গাড়ি নিয়ে বের হতে ভয় পাবে।
দুই. পাকিস্তানের পেশোয়ারে ঐতিহাসিক একটি গির্জার পাশে গত রোববার আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৭০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক। পাকিস্তানে খ্রিস্টানদের ওপর এটাই মারাত্মক হামলার ঘটনা। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতায় ১৩০ বছরের পুরনো অল সেইন্টস গির্জার আশপাশের কয়েকটি ভবনের জানালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। মৃতের মধ্যে শিশু, নারী ও পুলিশও রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র বলেছে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে। তালেবানের সঙ্গে জড়িত জঙ্গিদল টিটিপি জানদুল্লাহ এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। পাকিস্তানে ১৮ কোটি জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।
তিন. কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির একটি শপিংমলে গত শনিবার সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৭০ জন, আহতের সংখ্যা ৩০০শ’রও বেশি। তারা এই বিপণি কেন্দ্রে ঢুকে অনেক নারী ও শিশুকে জিম্মি করে রাখে। আল কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ইসলামপন্থি জঙ্গি সংগঠন সোমালিয়ার আল-শাবাব এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত এই দুটি-বৃহৎ হত্যাকাণ্ডের সংবাদের চাপে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়াসহ অন্য কয়েকটি মুসলিম দেশে ছোটখাটো কিছু হত্যাকাণ্ডের সংবাদ চাপা পড়ে গেছে।
চার. খুব অসহায় হয়ে, বিনীতভাবে (জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী নই বলে) প্রশ্ন করতে চাই এই মৃত্যু, এই হত্যার উৎসব কার স্বার্থে। কিসের স্বার্থে। কোন উদ্দেশ্যে শত শত নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করা হলো। এতে কার কী অর্জিত হলো। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের কোথাও কি এমন হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ আছে, না বৈধতা আছে। এতে ইসলাম ধর্মের কী লাভ হলো। মুসমানদের কোন স্বার্থ রক্ষিত হলো। এভাবে এরা কোন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলাম ধর্মের সাথে এদের নৈতিক ও আদর্শিক মিলটা কোথায়। বরং এ ধরনের কাপুরুষোচিত হত্যা ও আক্রমণের কারণে আজ সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্ম জঙ্গিবাদের সমার্থক হয়ে উঠছে আর বিপন্ন ও পরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘুরা- মুসলিমরা। পশ্চিমা বিশ্বে আজ মুসলিম নামধারী হলেই তাকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অনেককে সন্দেহের তালিকায়ও রাখা হচ্ছে। এদের অধিকাংশই নিরীহ ও নিরপরাধ। এসব কারণে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের সন্তান যারা ওদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে তারা ভীষণ বিব্রত ও অবমাননাকর পরিস্থিতিতে পড়ছে। ওদেশের শিশুদের মনেও এখন এক প্রকার ঘৃণা ও অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে মুসলিম শিশু সহপাঠীদের প্রতি। ইসলামের নামে এমন জঙ্গিরূপ পরিহার না করলে অদূর ভবিষ্যতে সকল সভ্য ও উন্নত দেশগুলো মুসলিমদের এক প্রকার বয়কট করা শুরু করবে তাদের দেশ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার খাতিরে।
পাঁচ. বাংলাদেশে বর্তমানে যা চলছে তা জঙ্গিবাদেরই অন্য রূপ। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড ও লুটপাট করেছিল তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে স্বাধীনতার দীর্ঘ চারদশক পরে। এই দীর্ঘসময়ে সিংহভাগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এই শক্তির সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকরাই। ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এরা ’৭১’র চেয়েও অনেক শক্তিশালী। বিশেষ করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান শুধু ভালো নয়। দেশের বর্তমান অর্থনীতির ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো। কাজেই বর্তমান বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালকে বিব্রত, বিতর্কিত ও অকার্যকর করতে তারা শত শত কোটি ডলার খরচ করার মতো ক্ষমতা রাখে। করছেও তাই। ফলে টাকার জোরে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টাও করছে তারা। জামায়াত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলো মোকাবেলা করছে, উচ্চ আদালতে আপিল করছে অন্যদিকে মামলায় হেরে গিয়ে হরতালের নামে দেশে নৈরাজ্যও চালাচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার ও এর প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছে অথচ হরতাল ডেকে যারা মানুষ হত্যা ও নৈরাজ্য চালাচ্ছে সে বিষয়ে আশ্চর্য নীরবতা পালন করছে।
ছয়. তারুণ্যের ধর্ম হচ্ছে আধুনিক হওয়া। নতুনকে ধারণ করা। তারুণ্যের ধর্র্ম হচ্ছে বিদ্রোহ আর বিপ্লব করা, সকল অসুন্দর আর অকল্যাণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তারুণ্যের ধর্ম হচ্ছে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের জয়গান গাওয়া। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকা। এই তারুণ্যের রূপ দেখলাম শাহবাগসহ দেশের আনাচে-কানাচে। যারা দিনের পর দিন অহিংসভাবে আন্দোলন-অবস্থান করে গেছে। আর অন্যদিকে আরেকদল তরুণদের দেখছি যারা হঠাৎ মৃত্যুদূতের মতো উপস্থিত হয়ে ভেঙেচূরে ধ্বংস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করে মেতে ওঠে হত্যার উল্লাসে। জীবনের পরিবর্তে তারা নিয়ে আসে মুত্যুর পয়গাম। কিন্তু প্রশ্ন করতে চাই যা তারা দিতে পারে না, সৃষ্টি করতে পারে না তা ধ্বংস বা হত্যা করবে কীভাবে। জীবনতো কেউ দিতে পারেনা, যা সে দিতে পারে না তা বধ করবে কীভাবে সে। পৃথিবীর সমস্ত ধনরাজী দিয়ে একটি মানুষতো দূরের কথা, মানুষের একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কি অবিকল তৈরি করা সম্ভব। যারা জীবন দিতে পারে না।
জীবনের জয়গান যাদের দ্বারা গীত হয় না, জীবনের পক্ষে যারা কোনোদিন দাঁড়ায় না তারা জীবন কেড়ে নিতে আসে কোন দুঃসাহসে। ত্রিশ লক্ষ প্রাণ হত্যার বিচার ঠেকাতে এরা আরও কত প্রাণ কেড়ে নেবে মানুষের?
পুনশ্চঃ- ‘অভিজাত যুবলীগ’ শীরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম কয়েক সপ্তাহ আগে। সেখানে যুবলীগের কিছু সমালোচনা করেছিলাম। গত কয়েকদিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় দেখলাম চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ-মাদক বিরোধী প্রচারণা ও আন্দোলন শুরু করেছে। প্রীত হলাম। আমি মূলত এ সংগঠনগুলোর কাছে এ ধরনের ইতিবাচক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা করি। নবগঠিত যুবলীগ কমিটিকে ধন্যবাদ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন