পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৩

'বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন?'

দৈনিক আজাদী             উপসম্পাদকীয়                কাল আজ কাল
৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৮ আশ্বিন ১৪২০ সাল ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী

মোমিন রোডের একটি দোকান থেকে পরিবারের যাবতীয় ওষুধ কিনতাম। দোকানটি চেরাগি থেকে বাসায় আসা-যাওয়ার পথের ধারেই। একদিন লক্ষ করলাম দোকানি তার পরিত্যক্ত বাক্স ও কার্টুনগুলো ফুটপাতেই ছুঁড়ে মারছে। ফলে তার দোকানের সামনে প্রায়ই আবর্জনা পড়ে থাকে। এর প্রতিবাদে তার দোকান থেকে ওষুধ কেনা ছেড়ে দিয়েছি।

শুধু এই দোকান বলে নয়। চট্টগ্রামে এমন কোনো দোকান বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না যার সামনের ফুটপাতের অংশটি জনগণের চলাচলের জন্য অবাধ ও নির্বিঘ্ন। আর যদি পাওয়া যায় তা আমি দেখতে যাব। আন্দরকিল্লার মোড় থেকে ডিসি হিল হয়ে নন্দনকানন পর্যন্ত মোমিন রোডের এই ফুটপাতটির মতো এত বহুমাত্রিক ব্যবহার্য ফুটপাত চট্টগ্রামে আর আছে কিনা তা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। পেঁয়াজআলুটমেটোধনেপাতাকলালুঙ্গিগেঞ্জিশাড়িশাকবাতের ওষুধপান সুপারির দোকানলেবুকলাসূতিকার ওষুধ নেহারি-তেহারি হালিমচনাপিঁয়াজুঘড়িশুঁটকিমাছফুলবাঁশ রকমারি ফার্নিচার,এমন কিছু নেই যা এই ফুটপাতে পাওয়া যায় না। এর সাথে গাড়ির চাকার দোকানচাকায় বাতাস দেওয়ার দোকান এমনকি এই জনারণ্য ফুটপাতে দিনে দুপুরে গোসল করার দৃশ্যও দেখা যায় অহরহ। অবশ্য এই ফুটপাত নয় চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের কোনো ফুটপাতে নর-নারী শিশু অবাধে হাঁটাচলা করতে পারে বলে আমার অন্তত জানা নেই। কিছু কিছু অভিজাত এলাকায় থাকতে পারে হয়তআমার সেসব এলাকায় যাওয়ার বেশি অভিজ্ঞতা নেই।

কোনো দোকানিই তার সামনের ফুটপাতের অংশটি নিয়মমাফিক মুক্ত রাখছেন না। বরং ফুটপাত দখলতো কেউ কেউ আবার ফুটপাত ছাপিয়ে রাস্তাও দখল করে নিয়েছেন। এ বিষয়ে কার কাছে অভিযোগ করা উচিত বা কারা এ সমস্যার প্রতিকার করতে পারেন তা জনগণ জানে না। আসলে এই নগরের কর্তৃপক্ষ কে-সিটি কর্পোরেশনসিডিএ মেট্রোপলিটন পুলিশ না কি সরাসরি সরকার তা বোঝা যাচ্ছে না কোনো মতেই।

লেখার শুরুতে যে উল্লেখ করলাম দোকানি তার দোকানের আবর্জনা ফুটপাতে ফেলছে। আমি ভেবে দেখেছি এরও একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। দোকানি তার দোকানটি ছাড়া আর কিছুকেই নিজের বলে ভাবতে পারছে না। দোকানটি সে সালামি বা ভাড়ায় নিয়েছে। এর জন্য তাকে প্রতি মাসে ভাড়া গুণতে হয়। এখান থেকেই তার পরিবার চলে কাজেই ওই দোকানটিকেই সে তার সম্পদ বলে মনে করে। নিজের বলে মনে করে। দোকানের বাইরের অংশটিকে সে তার বলে ভাবে না। ওই অংশটিকে সে ‘ওন’ করে না। দোকান থেকে ময়লা দূর করতে পারলেই হলো। বিভিন্ন বাসা বাড়িতেও দেখা যায় এমন আচরণ করতে। ঘরের ময়লা,তরিতরকারিমাছ-মাংস ইত্যাদির উচ্ছিষ্টটুকু জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে মেরে পরিত্রাণ পেতে চায় গৃহকর্ত্রী বা কর্তা। অর্থাৎ ঘরটা আমার বাইরের অংশটি আমার নয়। মনস্তাত্ত্বিক এই সমস্যা শুধু ওই দোকানি বা ঘরের কর্তা-কর্ত্রীদেরই শুধু নয়,এই সমস্যা আমাদের জাতীয় সমস্যা। সমস্যাটি হলো আমরা আমার অংশটি ছাড়া বাকিটুকুকে আমাদের ভাবতে পারছি না। নিজেদের ভাবতে পারছি না।

নিজের দোকান বা ঘর ছাড়া বাকি দেশটাও যে আমারএদেশের প্রতিটি ধুলিকণায়ও যে আমার মালিকানা স্বত্ব লেখা আছে। এদেশের ভালো-মন্দ সবকিছুরই যে আমিও একজন ভাগিদার সে কথাটি আমরা কেউ ভাবতে পারছি না। রাস্তায় ওয়াসার পাইপ থেকে অবিরাম পানি পড়তে দেখেও আমাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। পানির অপচয় বন্ধ করতে উদ্যোগ নিই না। রেলের প্ল্যাটফর্ম নোংরা করি। ট্রেনের বগি নোংরা করি। জিনিসপত্র নষ্ট করি আর ভাবি এতো আমার সম্পদ নয় রেলের। রেলের সম্পদ অন্য কেউ নষ্ট করছে। চুরি করছে দেখেও প্রতিবাদ করি না ভাবি এ-তো আমার নয়। অর্থাৎ যা কিছু সরকারের তাকেই আমরা শত্রুর সম্পদ বলে মনে করছি। তা ধ্বংস করতে পারলেই যেন পরম শান্তি। অদৃশ্য কোনো শত্রুর ওপর প্রতিশোধ নেওয়া।

এখন আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রি-পেইড। তার মানে আগে টাকা পরিশোধ করে পরে সেবা নিচ্ছি। পোস্ট পেইডও প্রায়ই একইটাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেবাও শেষ। অথচ সরকারি টেলিফোন অর্থাৎ এখন যাকে ল্যান্ডফোন বলা হচ্ছে তার টাকা বা বিল কত মাস পরে পরেই না পরিশোধ করেছি। নোটিসের পর নোটিস দেওয়া সত্বেও বিল পরিশোধের নামটিও নেই। বরং বিল চুরির জন্য কত ধরনের পন্থাই না আবিষ্কার করেছি। ব্যবহার করেছি। এখনও সরকারি আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে টিএন্ডটির শত শত কোটি টাকার বিল অনাদায়ী পড়ে আছে। আদায় হওয়ার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। এমনকি আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাইতো বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ টাকা বাকি ফেলে রেখেছেন টিএন্ডটির। অথচ মোবাইলের বিল কিন্তু সময় মতো পরিশোধ করছেন। একই অবস্থা ওয়াসার। এক লিটার পানি ২৫ টাকা দিয়ে কিনে খাই অথচ ওয়াসার পানির অপচয় আর সঠিকভাবে বিল পরিশোধ করা হলে ওয়াসার এমন দৈন্যদশা হতো না।

এশিয়ার সেরা চিটাগাং স্টিলমিল রুগ্ন করেধ্বংস করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন দেশে অন্তত ৫০টি ব্যক্তিখাতের স্টিলমিল দাপটের সাথে ব্যবসা করছে। ধ্বংস করা হয়েছে পাট শিল্প। বন্ধ করা হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম জুটমিল আদমজী জুট মিল। এর পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী ভারতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য জুটমিল। পাটশিল্পের পরিণতির আশঙ্কা করছি এখন তৈরি পোশাক শিল্পের। একটি অশুভ শক্তি সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী এই শিল্পকে ধ্বংস করতে। সময় থাকতে সচেতন না হলে পাটের মতো এই শিল্পও অনেকটা লুপ্ত হবে এ দেশ থেকে।

বর্তমানে এক বিপজ্জনক প্রবণতা পেয়ে বসেছে জাতিকে। কিছু একটা হলেই অবাধেনির্বিবাদেনিষ্ঠুরভাবে গাড়ি ভাঙচুর অগ্নি সংযোগ ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা। যে কোনো তুচ্ছ ঘটনায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন জ্বালানো আমাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড হয়ে উঠছে। বেতন-বোনাসের দাবিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন কমানোর দাবিশিক্ষা সম্পর্কিত যেমন পরীক্ষা পেছানো ভর্তি সমস্যা,দু’দলের মধ্যে কথা কাটাকাটিপ্রেম ঘটিত সংঘাতচা খেতে বসা নিয়ে তর্কাতর্কিএমন কি পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে না পারার মতো ঘটনার জন্যেও রাস্তা অবরোধ। গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটছে। এর সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতো আছেই। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের পথ রুদ্ধ করতে জামাত-শিবির ও হেফাজতে অব্যাহত ধ্বংস-নৈরাজ্যতো নিত্য-নৈমিত্তিকভাবে চলছেই।

নিজের দেশকে এবং দেশের সম্পদকে নিজের বলে ভাবতে না পারাভালো না বাসার মধ্যে আছে বাঙালির হাজার বছর ধরে উপনিবেশিক শাসনের কুফল। কারণবাঙালি ১৯৭১ এর আগে কখনোই স্বাধীন ছিল না। হাজার বছর ধরে শাসিত হয়েছে অন্যের দ্বারা। যে কারণে তারা নিজের ঘর-বাড়ি আর সম্পদ ছাড়া বাকি অংশটুকুকে ভেবেছে শাসকের সম্পত্তি হিসেবে। আর শাসক বা সরকার যেহেতু তাদের নয় সেহেতু ‘সরকারের মাল দরিয়া মে ঢাল’ মানসিকতায় প্রতিপালিত হয়েছে বাঙালি। ২১৩ বছর বৃটিশ-পাকিস্তানের গোলামি করতে করতে এ জাতির রক্ত-মাংস-মজ্জায় মিশে আছে এক প্রকার গোলামির হীনমন্যতা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীন দেশের আন্দোলনের মধ্যে চরিত্র ও আচরণগত পার্থক্য থাকতে হবে তা-ও বুঝতে পারছে বাঙালি। বৃটিশ পাকিস্তান সরকার অর্থাৎ শাসকশ্রেণি আমাদের প্রতিনিধি নয় সত্য কিন্তু এই দেশএই সরকার,এই সম্পদতো একান্তই আমারআমাদের। রেলের একটি বগি জ্বালিয়ে দেওয়া মানে আমিতো আমার সম্পদই পুড়িয়ে দিলাম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ মিলিয়ন ডলার হওয়ার অর্থতো আমার। আমাদের অর্থাৎ আমার দেশেরই অগ্রগতি সাধিত হওয়া।

এ জাতির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝা বড় মুশকিল। যারা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করে তারাই নিজ মাতৃভাষার প্রতি এত অবহেলা করে তা দেখে কষ্ট পেতে হয়। যে জাতি তুলনাহীন রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে তারা সে স্বাধীনতাকে এত অপব্যবহার ও অবমূল্যায়ন করে তা দেখে কষ্ট পেতে হয়।

তাই মাঝে মাঝে ভাবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি একটি অনিচ্ছুক ও অপ্রস্তুত জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেননতুবা একটি স্বাধীন দেশযা অর্জন করতে ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আড়াই লাখ মা-বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছেপ্রচুর সম্পদ নষ্ট হয়েছে তেমন একটি দেশে কীভাবে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দুটি ধারা থাকতে পারে। স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ