পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৩

'এগিয়ে চলো রনি ভাই'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১০ শ্রাবণ ১৪২০ সাল ১৫ রমজান ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও নিজেকে আর সুশীল হিসেবে ধরে রাখতে পারলেন না সরকার দলীয় সাংসদ গোলাম মাওলা রনি। গত সাড়ে চার বছর ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শোতে উপস্থিত হয়ে পত্রিকায় কলাম লিখে একজন সুশীল হয়ে উঠবার কত চেষ্টাই না তিনি করেছিলেন।

কাক যে কোকিল সেজে থাকতে পারে না শেষ পর্যন্ত তার প্রমাণ দিলেন পটুয়াখালী থেকে নির্বাচিত তরুণ এই সাংসদ। 

গত শনিবার দুপুরে নিজ অফিসে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি চ্যানেলের দুই সংবাদকর্মীকে বেদম প্রহার করেছেন রনি ও তাঁর অফিসের লোকজন। আক্রান্ত দুই সংবাদকর্মী হচ্ছেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের অপরাধ বিষয়ক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘তালাশ’ এর প্রতিবেদক ইমতিয়াজ মোমিন ও ভিডিও চিত্রগ্রাহক মহসিন মুকুল। তাঁরা পটুয়াখালীর একটি বিষয়ে কিছু অভিযোগকে কেন্দ্র করে কিছুদিন ধরে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। 

ঘটনার পরে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। বর্তমানে জামিনে আছেন সাংসদ রনি। সাংবাদিক পেটানো ছাড়াও অন্য আরেকটি কারণে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে কারণ, রনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আর ইনডিপেনডেন্ট টিভির মালিক, যার বিরুদ্ধে রনি চাঁদাবাজির অভিযোগে পাল্টা মামলা করেছেন, বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা। 

গোলাম মাওলা রনিকে প্রথম দেখি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশো অনুষ্ঠানে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক লাগানো, গেঁয়ো চেহারার সাথে খুব বেমানান টাই। শুদ্ধ উচ্চারণের প্রাণপণ চেষ্টারত তরুণ সাংসদ গোলাম মাওলা রনির চিবিয়ে চিবিয়ে বলা বক্তব্য শুনে আমি হতবাক। যেদিন তিনি বর্তমান সরকারের প্রথম মন্ত্রি পরিষদ গঠিত হওয়ার অনুষ্ঠান ও সেদিন তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ রসালো বক্তব্য রাখছিলেন। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী(১৯৯৬-২০০১) বর্তমান সাংসদ যাঁকে রনি চাচা বলে সম্বোধন করেন তাঁকে নিয়ে রনির অশালীন, অশ্রদ্ধা ও ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। সেদিন মন্ত্রিদের শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে এবং উপস্থিত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা যাঁরা মন্ত্রি সভায় স্থান পান নি তাঁদের নিয়েও রনি ভীষণ আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। একজন তরুণ নেতা দলের সিনিয়র নেতা যাঁরা তাঁর পিতৃতুল্য তাঁদের নিয়ে এমন মর্যাদাহানিকর কথা বলতে পারেন কীভাবে তা আমাকে ভাবিত করেছিল সেদিন। ভেবেছিলাম দলের পক্ষ থেকে এরপর তাঁকে সতর্ক করা হবে। তবে সতর্ক যে করা হয় নি অথবা সতর্ক করলেও তাতে খুব যে কাজ হয় নি তার প্রমাণ পেলাম কিছুদিন পরে আরেকটি অনুষ্ঠানে যেখানে রনি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এক গল্প ফেঁদেছিলেন। যেদিন রনি টকশোতে বলেছিলেন দেশের বাইরে গিয়ে শেখ হাসিনা নেতাদের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা নাকি বলেছিলেন, প্রতিযোগিতায় যে জিতবে তাঁকে মন্ত্রি বানাবেন। সেই দৌড়ে জিতে কে মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন সে কথাও রনি বলেছিলেন বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে। দল ও সরকারের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীদের নিয়ে রনির এ ধরনের অশ্রদ্ধাপূর্ণ ও অশালীন মন্তব্য অনেককে মর্মাহত করলেও টিভির টকশোতে এক প্রকার নিয়মিত হয়ে ওঠেন এবং একজন কলাম লেখক হিসেবেও আবির্ভূত হন তিনি। 

যেদিন সাংবাদিক পেটালেন সেদিন রাতেও দেশের টেলিভিশন জগতে প্রথম তর্কাতর্কির অনুষ্ঠান চ্যানেল আই’এর তৃতীয় মাত্রায় উপস্থিত করা হয়েছিল তাঁকে ও ইনডিপেনডেন্ট টিভির বার্তা প্রধান খালেদ মুহিউদ্দিনকে। সে অনুষ্ঠানেও উত্তেজিত খালেদের পাশে বেশ নির্বিকার ও মিনমিনে মনে হয়েছে রনিকে। ভেবেছি এ বড়ো সেয়ানা মাল। 

টিভির টকশো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হতে রনি নিজেকে এক সময় সুশীল হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। ভেবেছিলেন হয়ত এমন দু’চারজন সাংবাদিক পেটালেও খুব একটা যায় আসে না। আর যা হোক এমন পরিস্থিতিতে দেশের কিছু সুশীল ও তার্কিকরা তাঁর পক্ষ নেবেন। 

রনির প্রথম ভাষ্যমতে ইনডিপেনডেন্ট টিভির সাংবাদিকরা চারদিন ধরে অনবরত তাঁকে অনুসরণ করছিল। তাঁর বাসস্থান থেকে অফিস এমন কি রাস্তায়ও তাঁকে অনুসরণ করছিল সাংবাদিকসহ দশ/ বারোজন লোক। যিনি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাঁকে এভাবে অনুসরণ করা সাংবাদিক নীতিমালায় পড়ে কিনা সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে বলতে চাই, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যম বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ওই মাধ্যমের অনেকের সাথে তাঁর পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ঘটনার পর সাংবাদিক নেতাদের অনেকের মধ্যস্থতার উদ্যোগ দেখে বুঝতে পেরেছি সাংবাদিক নেতাদের মধ্যেও অনেকের সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক আছে। ইনডিপেনডেন্ট টিভির সাংবাদিকরা যদি তাঁকে এমন ত্যক্ত বিরক্ত করেই থাকতেন তবে তা তিনি ঐ চ্যানেলের কাউকে না হোক সিনিয়র সাংবাদিক বা সাংবাদিক নেতাদেরও তা জানাতে পারতেন। এমন কি বার্তা প্রধান খালেদ মুহিউদ্দিনকেও ফোন করে অন্তত প্রশ্ন করতে পারতেন তাঁকে এভাবে হয়রানি(তাঁর ভাষায়) করার অর্থ কী? 

গোলাম মাওলা রনি তার কিছুই করেন নি। তিনি সরাসরি দুই নিরীহ সাংবাদিককে পিটিয়ে দিলেন। যাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ রনি সাহেবরা জানেন বাংলাদেশে সাংবাদিক পেটালে কোন সমস্যা হয় না। যেখানে সাংবাদিক হত্যারই বিচার হয় না সেখানে দু’চারজন সাংবাদিক পেটালে এমন কী হয়। অতএব, সাংবাদিক পেটাও আর তারপর তাদের নামে চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দাও, ব্যস। দেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে সালমান এফ রহমান শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির হোতা তবে রনির কাছে চাঁদা চাইবেন ওকথা কেউ বিশ্বাস করে নি। সাংবাদিক পিটিয়ে চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দিয়ে রক্ষা পাওয়ার এই ওষুধ বোধ হয় রনির বেলায় কাজ করবে না এবার। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যাকে আইনসভা বলা হয় বাংলাদেশে তা জাতীয় সংসদ হিসেবে পরিচিত। আইন সভার সভ্যদের আমরা জাতীয় সংসদ সদস্য বলে থাকি। মূলত তাঁরা আইনসভার সভ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এই আইনসভার সভ্যদের অসভ্য আচরণে জাতি এখন ত্যক্ত বিরক্ত। বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত না থাকলে সংসদ অকার্যকর ও নিরস আর উপস্থিত থাকলে তাদের (উভয় পক্ষের কারো কারো) অশালীন, অভব্য, অসভ্য কথাবার্তা ও আচরণে আমরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ, হতাশ হয়ে পড়ি। রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন আইন সভার সভ্যরা। আর রাষ্ট্রের অন্য দুই বিভাগ অর্থাৎ শাসন ও বিচার বিভাগ সে অনুসারেই দেশ শাসন ও বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকেন। সেক্ষেত্রে আইনসভার সভ্যরা অনেক অনেক বেশি সম্মান গৌরব মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দিকে তাকালে কি তাই মনে হয়? সন্দেহ হয় না আসলে ওখানে ক’জন সভ্য লোক আছেন? 

শুধু রনি বলে নয় বর্তমান সরকারসহ অতীতের সব সরকারের আমলে এ ধরনের কিছু কিছু বেয়াড়া সংসদ সদস্যের অপকর্মের চিত্র আমরা দেখেছি। এরা আইন প্রণয়ন করবেন কী? নিজেরাই আইন ভঙ্গ করে থাকেন বেশি। নিজ এলাকার স্কুল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে হাটবাজার ইজারা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, থানার ওসির বদলি পর্যন্ত সবকিছুতেই মাথা ঘামান তারা। তাদের মাধ্যমেই হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয় বলেই দুর্নীতি করার সুযোগ পান তাঁরা। শুল্কমুক্ত গাড়ি,সরকারি প্লটসহ নানা সুবিধার কারণে সংসদ সদস্য পদটি আর্থিকভাবে অধিক লাভবানের জায়গায় পরিণত হয়েছে। যে কারণে সংসদ নির্বাচন করতে এখন কোটি কোটি টাকা খরচের প্রয়োজনও হয়ে পড়েছে। 

গত মঙ্গলবার সারাদিন গোলাম মাওলা রনি পদত্যাগ নাটক করেছেন। দিন শেষে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বলেছেন দল বললে তিনি পদত্যাগ করবেন। প্রশ্ন হলো এই দলের কথা কি তিনি অতীতে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। তাহলে দিনের পর দিন যে কথা শুধু পার্টি ফোরামে বলা যায় সে কথা টকশো ও কলামে লিখে কি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন নি? আজ কেন দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর বিষয়টিতো রাজনৈতিক নয়, সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। তাঁর দায় কেন দল বহন করতে যাবে। 

অনেকে রনির এই অবস্থাকে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। তিনিও এখন জাতির সামনে তাই তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে তো অনেকেই বলেছেন, লিখেছেন কই কোথাও তো তাঁদের আক্রান্ত হতে দেখলাম না। খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত যে রনি এতদিন তোয়াক্কা করেন নি, সরকারের বাঘা বাঘা মন্ত্রিকে পর্যন্ত যিনি কেটে ছিঁড়ে লবণ লাগিয়েছেন তারাও তো রনিকে টু শব্দ করতে পারেন নি। আর সবচেয়ে বড় কথাটি হলো রনি তো নিজেই প্রথম আঘাত করেছেন সাংবাদিকদের, যারা শুধু চাকরির স্বার্থে তাঁর অফিসে গিয়েছিলেন। এখন তো রনির কাছেই প্রথম শুনলাম কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে সাংবাদিকদেরও। তাহলে তো বড় মুশকিল পত্রিকা বা টিভি ভবন ছেড়ে তো এখন বাইরের সংবাদ সংগ্রহের জন্যে যেতেই পারবে না সাংবাদিকরা। 

আমার লেখা সালমান এফ রহমানের পক্ষে বলবার জন্যে নয়। দেশের কোটি কোটি মানুষ জানেন তিনি কী ও কেমন ব্যক্তি। আমার বক্তব্য সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। যে ভঙ্গিতে গোলাম মওলা এই দু’জন সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়েছেন তা কোন অর্থেই সমর্থনযোগ্য নয়, ক্ষমাযোগ্যও নয়। এই অপরাধে গোলাম মওলা রনির উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। সরকার দলের এমপি বলে এক্ষেত্রে ক্ষমা পাওয়ার কোন অধিকার নেই তার। বরং দলীয়ভাবেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। গোলাম মওলা রনিরা কখনও কোন দলের সম্পদ নন তাঁরা দলের বোঝা। আওয়ামী লীগের উচিত ছিল এই বোঝাকে আরো আগে ফেলে দেওয়া। তাতে দলের ভাবমূর্তিই রক্ষা পেতো। 

সে সাথে সাংবাদিকতার নীতিমালা বা বিশদভাবে বলতে গেলে টেলিভিশন সাংবাদিকতা নিয়েও অনেকের অনেক আপত্তি শোনা যায় আজকাল। সংবাদ সংগ্রহের নামে কারো ব্যক্তি জীবনের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করাও সাংবাদিকতার নীতিমালায় পড়ে না। আমার মনে এক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরও কিছুটা দায়িত্ব আছে। রনির কথামতো চারদিন ধরে যদি বাসা-অফিস-রাস্তায় তাঁকে অবিরাম অনুসরণ করা হয়ে থাকে তাও কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। একটি সমাজকে তখনই সভ্য সমাজ বলা যাবে যখন সমাজের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সভ্যতা, ভব্যতা, দায়িত্ববোধ ও নীতিবোধের পরিচয় দিয়ে থাকবেন। আর একটি জাতি বা সমাজকে সভ্যতার পথে নিয়ে যেতে সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্বটাই সর্বাগ্রে। এ কথাটি ভুলে গেলে চলবে না। 

‘আমরা আছি রনি ভাই মাইরের ওপর ওষুধ নাই’। প্রবণতা থেকে আমাদের রাজনীতিকরা বের হতে না পারলে তার খেসারত দিতে হবে দলকে, জনগণকে এবং দেশকে। 

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

সোমবার, ২২ জুলাই, ২০১৩

'পাকিস্তানের মালালা, বাংলাদেশের মাওলানা ও আমাদের ভালো মানুষেরা'

সুপ্রভাত বাংলাদেশ                    সমসাময়িক
২২ জুলাই ২০১৩
কামরুল হাসান বাদল ২২ জুলাই ২০১৩
গত ১৩ জুলাই জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, ‘মৌলবাদীরা বই ও নারীকেই (নারী জাগরণকে) বেশি ভয় পায়।’ মালালা জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র পাকিস্তানের এক বিস্ময় বালিকা। রক্তচক্ষু ও নির্দেশ অমান্য করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অপরাধে (!) তালেবানরা তার ওপর গুলিবর্ষণ করেছিল। প্রায় মৃত্যুর কাছ থেকে বেঁচে আসা মালালা ইউসুফজাই সেই থেকে শুধু পাকিস্তান বা এই উপমহাদেশের শান্তিকামী, উদার ও প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর কাছেই শুধু নয়, সারা বিশ্বের কাছে প্রতিবাদ ও লড়াইয়ের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

মৌলবাদীরা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে একাধিকবার হুমকি দিয়েছিল বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করতে। মালালা এই উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর বারণ শোনেননি। তিনি তাঁর শিক্ষাগ্রহণ চালিয়ে যেতে অনড় ছিলেন। পরিণতিতে তাকে জঙ্গি তালেবানিদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশে তঁাঁর চিকিৎসা না হলে বেঁচে থাকা হয়তো সম্ভব হতো না তাঁর।
মালালার দুর্ভাগ্য তার জন্ম হয়েছে পাকিস্তানের মতো এক জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে। উন্নত কোনো দেশে জন্ম হলে তাঁর কাহিনী অন্য ধরনেরও হতে পারতো। তবে এখন যা হয়েছে তাকে বলতে হয় বিপরীতে হিত হয়েছে তাঁর। মানবতা, গণতন্ত্র, প্রগতিশীলতা ও নারীবিদ্বেষী তালেবানদের অন্যায় নির্দেশ মানেননি মালালা। তিনি বিদ্রোহ করেছেন কারণ তিনি জানেন শিক্ষা ব্যতিরেকে নারী জাগরণ কখনও সম্ভব নয়। এই অচলায়তন ভাঙতে তার মতো অসংখ্য মালালার প্রতিবাদ করা উচিত, অসংখ্য মালালার জন্ম হওয়া উচিত।
মালালাকে দেখে পাকিস্তানের নারী সমাজ নতুন করে আবার নিজেদের মানুষ ভাবতে শিখবে। নিজেদের দাবির জন্যে সোচ্চার হয়ে উঠবে। হয়ত এভাবে একদিন পাকিস্তানের বুকে গেড়ে বসা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের হাত থেকে তাদের প্রকৃত মুক্তি অর্জন হতে পারে। মালালা আজ সারা বিশ্বের বিশেষ করে পশ্চাদপদ ও ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার কোটি কোটি নারীর কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
মালালা যেদিন জাতিসংঘে বক্তব্য প্রদান করলেন তার সপ্তাহখানেক আগে থেকে বাংলাদেশের এক ধর্মীয় নেতার বক্তব্য সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সপ্তাহখানেক আগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে প্রথমবারের মতো হেফাজতে ইসলামের আমীর হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা আহমদ শফীর একটি ভিত্তিও ক্লিপিং ছাড়া হয়। পরবর্তীতে কয়েকটি টিভি চ্যানেলে সে ক্লিপিংটি দেখানো হয় এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রেও মাওলানা শফীর বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়। ভিভিওটিতে দেখা যাচ্ছে কোনো এক শীতের রাতে একটি ওয়াজ মাহফিলে তিনি বক্তব্য রাখছেন। তাঁর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিতে আমার রুচিতে লাগছে।
সেদিনের ওয়াজে শফী সাহেব শুধু নারীদেরই দোষারোপ করলেন অথচ নারীরা যাদের দ্বারা অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত ও ধর্ষিত হয়ে থাকে সেই পুরুষদের ব্যপারে একটি বাক্যও উচ্চারণ করলেন না। সমস্ত অনাচারের দায় যেনো শুধু নারীর।
এক্ষেত্রে কি পুরুষের কোনো দোষ নেই। তিনি তো তাঁর বক্তব্যে একবারের জন্যেও উচ্চারণ করলেন না পুরুষরাও যেনো শ্রদ্ধার চোখে নারীদের দেখে, সম্মানের চোখে দেখে। মা-বোনের মতো দেখে। পুরুষ কি ভাদ্র মাসের কুকুর না কি উন্মত্ত ষাঁড়? নারী দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। পুরুষের চরিত্র ঠিক রাখার কোনো কথা কি ইসলাম ধর্মে বলা হয়নি?
দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের নিয়েও তিনি অত্যন্ত অশালীন, অভদ্র ও শিষ্টাচার বর্জিত কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায় সেখানে নাকি মেয়েরা জেনা করে টাকা কামায়, কী করুণ তাচ্ছিল্য আমাদের নারী শ্রমিকদের প্রতি। অথচ এদেরই রক্তে-ঘামে পরিশ্রমে দেশ আজ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এদের কল্যাণে দেশের অর্থনীতি বেগবান হয়েছে। আজ রিজার্ভের পরিমাণ যে দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে তাতে এই নারী শ্রমিকদের অবদান কম নয়।
গার্মেন্টসে কাজ করতে গিয়ে গত তিন দশকের মধ্যে তিনটি মেয়েও ধর্ষিত হয়েছে কিনা তা বাংলাদেশের কোনো পরিসংখ্যানে নাই। বরং নারী ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে বাড়ি-ঘরে ও অন্য বাস্তবতায়।
আসলে মালালার উপলব্ধিই ঠিক ( মৌলবাদীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় বই অর্থাৎ জ্ঞান ও নারীদের)। এই অমোঘ সত্যটিই বেরিয়ে এসেছে মাওলানা শফী সাহেবের বক্তৃতায়। যাঁর দল হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতাই এক সময় স্লোগান দিয়েছিলেন ‘বাংলা হবে আফগান, আমরা সবাই তালেবান।’
পাকিস্তানে তালেবানদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার পরপর প্রথমেই তাদের আক্রমণের শিকার হয় সে দেশের নারীরা। সেখানে মৌলবাদীরা নারীদের চাকরি করতে বাধা দেয়। তাদের শিক্ষাগ্রহণে বাধা দেয়। তারা অবরুদ্ধ করে নারীদের। এই পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তানেও। সেদেশে নারীদের দুর্গতি নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্র বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের দারুণ ক্ষুব্ধ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশেও সেই শক্তির উত্থানপর্ব চলছে। গত বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল অস্বাভাবিক গতিতে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সে সব তৎপরতা বন্ধ করার সাথে সাথে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এবং বর্তমান বছরের প্রথমদিকে কয়েকজনের রায় ঘোষিত হলে দেশজুড়ে জামায়াত-শিবির যে তাণ্ডব চালায় তার সাথে যুক্ত হয় হেফাজতে ইসলাম নামের কওমী-মাদ্রাসা ভিত্তিক কথিত ধর্মীয় সংগঠনটি। ২০১০ সালে সরকারের নারী নীতির প্রতিবাদের প্রথম তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। দীর্ঘ বিরতির পর এবং রাজাকারদের বিচার প্রায় সমাপ্ত হয়ে আসার এই সময়ে তারা নতুন করে মাঠে নামে ১৩ দফা কর্মসূচি নিয়ে।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নারীদের ঘরে বন্দি করে রাখা সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মের কোথাও নারীদের অপমানিত করা হয়নি। বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানানোর স্বপ্ন থেকেই ধর্মান্ধরা এই ধরনের প্রলাপ বকে যাচ্ছেন। তাদের এই ধরনের বক্তব্য বা আচরণে ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না।
কারণ দেশের লক্ষ লক্ষ কর্মজীবী নারীরা আর কখনও তাদের কথামতো ঘরে ফিরে যাবে না।
তবে মুশকিলটা হয়েছে দেশের বর্তমান অপরাজনীতি নিয়ে। কারণ দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি হেফজতে ইসলামের এই সব কর্মকাণ্ডের সমর্থক। এবং বিএনপি স্বপ্ন দেখছে হেফাজতের সমর্থনে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এই শক্তির ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ধর্মকে অনৈতিকভাবে ব্যবহারের নজির আছে। আর গোড়া থেকে হেফাজতে ইসলামকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও দিয়ে এসেছে বিএনপি।
হেফাজত যে ১৩ দফা দাবি দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে বিএনপি কখনও কিছু বলেনি। বর্তমানে মওলানা শফীর বক্তব্যের প্রতিবাদও বিএনপি করবে বলে আশা করি না। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই, হেফাজতের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে নির্বাচনে গিয়ে জয়লাভ করলে তারা কি হেফাজতের ১৩ দফা দাবি মেনে নেবে? অথবা মাওলানা শফী সাহেবের বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করে নারী শিক্ষা বন্ধে ও তৈরি পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করবে?
মওলানা শফীর এই বক্তব্যে দেশের প্রগতিশীল মানুষ ক্ষুব্ধ। একজন শিক্ষিত মানুষ নারীদের নিয়ে প্রকাশ্যে এমন বিষোদগার করতে পারেন তা ভেবে অনেকে বিস্মিত ও হতাশ। আমি বিস্মিত হয়েছি সুশাসনের জন্যে যে সব নাগরিক গলা ফাটান রাতদিন, মানবাধিকার কর্মীরা যারা বিদেশে গিয়ে বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নালিশ করে আসেন এবং ৮৪ লাখ নারীর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, শান্তির জন্য যিনি নোবেল অর্জন করেছেন তাঁদের সকলের আশ্চর্য নীরবতা দেখে।
নেপোলিয়ান বোনাপার্টের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করি। তিনি বলেছিলেন, সমাজে খারাপ লোকরাই শুধু খারাপ কাজ করেন তা না। ভালোরাও করেন যখন তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলে চুপ করে থাকেন।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৩

'কন্যা, জায়া, জননী-প্রণমি তোমায়'

দৈনিক আজাদী            উপসম্পাদকীয়                কাল আজ কাল
১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৩ শ্রাবণ ১৪২০ সাল ৮ রমজান ১৪৩৪ হিজরী

অস্কার বিজয়ী বাঙালি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবিটি যারা দেখেছেন তারা বাংলার বুকে ঘটে যাওয়া ৫০ এর মনন্তর বলে পরিচিত দুর্ভিক্ষের করুণ অবস্থা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশ সৃষ্ট সে দুর্ভিক্ষে অনেকের মতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল শুধু অবিভক্ত বাংলায়। তখন দুই বাংলা মিলে জনসংখ্যা সাড়ে সাত থেকে আট কোটির মতো ছিল হয়ত।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই দেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটির মতো। সে সময়ে যে খাদ্য উৎপাদন হতো তা দিয়ে এই জনসংখ্যার সারা বছরের চাহিদা পূরণ হতো না। কাজেই খাদ্য আমদানি করতে হতো তখনও।

মার্কিন বারণ উপেক্ষা করে কিউবায় চট রপ্তানি করার অপরাধে (!)’৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশ অভিমুখি সব ধরনের খাদ্য জাহাজ ফিরিয়ে নেয়। একেতো খাদ্য ঘাটতির দেশ তার ওপর ’৭১ সালের যুদ্ধের কারণে এবং স্বাধীনতার পরে প্রাকৃতিক অবস্থা অনুকূল না থাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল পরপর কয়েক বছর। মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো খাদ্য জাহাজগুলো আকস্মিক ফিরিয়ে নেওয়ায় ’৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারকে এই কারণে দেশে-বিদেশে নিন্দিত হতে হয়েছিল। বাসন্তি নামক এক অপ্রকৃতিস্থ মহিলার জাল পরিহিত ছবি ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় নিপতিত করা হয়েছিল। এই ঘটনার অনেককাল পরে প্রমাণিত হয়েছিল সেই ছবিটি ছিল বানোয়াটএকজন অপ্রকৃতিস্থ মহিলাকে জাল পরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল তৎকালীন সরকার তথা স্বাধীন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে। বলাবাহুল্য এই চক্রান্ত এখনও থেমে নেই বরং তা আগের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ক্ষেত্রমাত্রাপরিমাণ ও পরিসরে।

আমাদের তখন শিশু ও কৈশোর কাল। ৭০ দশকের কথা বলছি। তখন দেখতাম দুপুরে যখন সবার খাওয়া-দাওয়া প্রায় শেষ তখন কিছু কিছু ভিক্ষুক আসতো। একটু ভাতের জন্যে তাদের কী হাহাকার ও আহাজারি। এই আহাজারির শব্দ রাতের বেলাও শুনতাম। আমার ছেলেবেলা কেটেছে রংপুরে। সেখানে দেখেছি সামান্য ভাতের জন্য নারী-শিশু পুরুষের সে কি হাহাকার। প্রায় প্রতিদিন দুপুর ও রাতে এমন ভিক্ষুকদের ভাত খাওয়ানের দায়িত্ব ছিল আমার ও আমার পিটেপিঠি বড় ভাইয়ের। সবার খাওয়া-দাওয়ার পরে বেঁচে যাওয়া ভাত-তরকারি খাওয়ানো হতো ভিক্ষুককে। কোনোদিন হয়ত তাদের পেট ভরতো কোনো দিন হয়ত ভরতো না। দেখতাম সামান্য ভাত বলে তাতে পানি দিয়ে কি অপরিসীম তৃপ্তিতে তারা তা খেতো। আর ভিক্ষা হিসেবে চাল দেওয়ার রেওয়াজতো বাংলাদেশের বহু পুরোনো। এই পরিস্থিতি ৮০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল। তারপর থেকে চিত্র বা পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। কয়েক বছর আগেও আশ্বিন কার্তিক ও আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে দেশের উত্তরাঞ্চালে মঙ্গা দেখা দিত। বিশেষ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসের মঙ্গা ছিল উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে কুড়িগ্রামলালমনিরহাটসহ ওই এলাকার বেশ ক’টি জেলায় প্রতিবছরের নিয়মিত দৃশ্য। শুধু উত্তরাঞ্চল নয় চট্টগ্রামে আমাদের গ্রামের বাড়ি রাউজানের গহিরায়ও আমি অনেক পরিবারকে দেখেছি এ সময় একবেলা কোনোমতে খেতে। আমি জাউ খেতে দেখেছি। দেখেছি ভাতের অভাবে বাঙ্গিতরমুজ ও কাঁঠাল খেয়ে জীবন ধারণ করতে ৭১’ সালে আমাদের দক্ষিণ গহিরায় রেডিও ছিল আমাদের ঘরে একটি। পাড়াশুদ্ধ লোক বিবিসিভয়েস অব অ্যামেরিকাআকাশ বাণী কলকাতা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ শুনতে ভিড় জমাতো আমাদের কাছারি ঘরে।

দিন পাল্টেছে। অন্তত ভাতের জন্যে কাউকে আজ আহাজারি করতে হয় না। চট্টগ্রামের গ্রাম এলাকায় এখন ভিক্ষুক নেই বললেই চলে। শহরেও আজকাল ভিক্ষা হিসেবে কেউ চাল নেয় না। এক টাকার নিচে ভিক্ষা নিতে ভিক্ষুকরা অসম্মান বোধ করে। চট্টগ্রাম শহরে ভাত খাওয়ানোর কোনো ভিক্ষুক পাওয়া যায় না। মুসলিম পরিবারে অনেকে মাঝে-মধ্যে মিসকিন হিসেবে এতিম বা ভিক্ষুকদের খাইয়ে থাকেন।

এ ধরনের মিসকিন খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা জানেন মিসকিন যোগাড় করতে কী পরিমাণ বিড়ম্বনা পোহাতে হয় আজকাল। আমার এক বন্ধু একটি মাজারে গিয়েছিলেন কিছু ভিক্ষুক এনে মিসকিন খাওয়াতে। সব শুনে অর্থাৎ গাড়ি ভাড়ার দরদাম ঠিক করে ভিক্ষুক সর্দার জিজ্ঞাস করলেন তার বাসায় লিফ্‌ট আছে কিনা। আমাদের যে পাড়ায় একটি মাত্র রেডিও ছিল একাত্তরেএখন সেখানে প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে রঙিন টেলিভিশনডিশ সংযোগসহ। সিরামিক ইটের বাড়ি আছে কয়েক ডজনকোটিপতির সংখ্যাও কয়েক ডজনের কম নয়। এখন আমাদের বাড়িটিই সবচেয়ে জীর্ণ-শীর্ণ।

একটি সময় মহররম ও মেয়ে জামাই বা এ ধরনের অতি গুরুত্বপূর্ণ মেহমান ছাড়া মুরগি খাওয়া হতো না। দু’চার-দশ মাইলের মধ্যে গরু জবাই হতো একটি। আর মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর জন্যেই শুধু কেনা হতো আঙুরআপেল নাসপাতির মতো ‘বেহেশতের ন্যামা’ খ্যাত ফলগুলি। এক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের জনসংখ্যা আজ ১৬ কোটি। পাশাপাশি আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে নদী ভাঙনশিল্প কারখানা ও বসতি স্থাপনে। তারপরেও দেশ আজ খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে। গুদামের অভাবে চাল রপ্তানির কথা ভাবছে সরকার।

এতসব পুরানো কথা লিখলাম শুধু এটুকু বোঝাতে যে আজ দেশের যে পরিবর্তন তা নতুন প্রজন্মের কোনো সন্তানের পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন। কারণ বিশ-ত্রিশ বছর আগে এই বাংলাদেশ কেমন ছিল তা যে না জানলে পরিবর্তনটুকু বুঝবে না।

এই ব্যাপক পরিবর্তনটুকু কীভাবে সাধিত হলো। কোনো জাদুমন্ত্রে কি এই পরিবর্তনমোটেও না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষই এই পরিবর্তনের বড় রূপকার। বিশ্বব্যাংক বলেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এই অগ্রগতির সঠিক কোনো ব্যাখ্যা নেইতা বিস্ময়কর।

এক্ষেত্রে দুটো সেক্টরের অবদানই সবচেয়ে বেশি একটি জনশক্তি রপ্তানি অন্যটি তৈরি পোশাক শিল্প। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে। প্রথম অবস্থানে আছে চীন। প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী আর তৈরি পোশাক শিল্পের লাখ লাখ নারী শ্রমিকের রক্ত-ঘাম-পরিশ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে বিনির্মাণ হয়েছে নতুন বাংলাদেশের। যে দেশের রিজার্ভের পরিমান এখন দেড় হাজার বিলিয়ন ডলারের অধিক। ’৭২ যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে ব্যাঙ্গ করেছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সেই বাংলাদেশ আজ আমেরিকার কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে বছরে অন্তত সে দেশের ১২ জন মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেন। আর এই সাফল্যের পেছনে যাদের সবচেয়ে বড় অবদান তারা হচ্ছেন বাংলাদেশের নারী সমাজ। তৈরি পোশাক শিল্প ছাড়াও প্রবাসী যারা বছরের পর বছর বিদেশে মানবেতর জীবন যাপন করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করেছেন সেখানেও ওই প্রবাসী শ্রমিকের মতোই ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে দেশে রেখে যাওয়া তাদের স্ত্রীদের। যারা বছরের পর বছর স্বামীর অবর্তমানে স্বামী সংসার তথা বাবা-মা-ভাইবোন ও পুত্র-কন্যাদের আগলে রাখেন। নিজের জৈবিক চাহিদাকে চাপা দিয়ে তারা স্বামীকে বিদেশের মাটিতে শান্তিতে টাকা উপার্জনের জন্যে উপযুক্ত করে রাখেন। অতএব মানতে হবে মধ্যবর্তী আয়ের দেশে পরিণত হতে যাওয়া বাংলাদেশের জন্যে সবচেয়ে বড় অবদান এই দেশের নারীদের।

অথচ কী বিস্ময়লজ্জা আর অপমানের সাথে উল্লেখ করতে হচ্ছে এই নারীদের নিয়েই হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আহমদ শফী কিছু অবমাননাকরআপত্তিজনক ও অশ্লীল উক্তি করেছেন। তিনি নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনা করতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন যা আমার লিখতেও কুণ্ঠা হচ্ছে। অথচ এ ক্ষেত্রে পুরুষেরও যে দায়িত্ব আছেনারীদের দেখলে পুরুষেরও যে সমীহ করা উচিত সে কথাটি তিনি একবারও উচ্চারণ করেননি। তিনি বলেছেন গার্মেন্টসে মেয়েরা জেনা করে টাকা উপার্জন করে। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করতে গিয়ে কোনো নারী শ্রমিক ধর্ষিত হয়েছে তার কোনো রেকর্ড নেই। বরং উল্টো নারীরা বেশি ধর্ষিত হয় তার বাড়িতে বা তার আশেপাশে বেশি। পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরা গরিব বলে টাকার বিনিময়ে কারখানার মালিককর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেহদান করে এমন ভাবনা একজন বিকৃত মনের মানুষই ভাবতে পারে। এভাবে আমাদের নারী শ্রমিকদের যারা অপমান করছে তাদের কাছে জানতে চাই দেশের অগ্রগতিতে তাদের কী অবদান আছে। ক্ষেত শ্রমিক থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমিক বলতে চাই দেশের অগ্রগতি সাধনে কোন ক্ষেত্রে নারীর অবদান নেই। তার পাশাপাশি মাওলানা শফী সাহেবদের প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হন বৌ তালাকের ফতোয়া দেওয়া ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের কী অবদান। নারীরা যা করছে সে টুকুতো তারা করতে পারছে না। অতএব তারা নারীদের বিপক্ষে বলবে। নারী জাগরণকে থামাতে চাইবে।

বাংলাদেশের নারী জাগরণকে যারা স্তব্ধ করতে চায়। নারীদের মানুষ হিসেবে সম্মানতো দূরের কথা স্বীকারও করতে চায় না,নারীদের যারা শুধু পুরুষের সেবাদাসী করে রাখতে চায় তাদেরকে এদেশের নারীরাই চিহ্নিত করুকঘৃণা করুক। যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক হীন স্বার্থে শফী সাহেবদের এই ধরনের ন্যক্কারজনক বক্তব্য সমর্থন দিচ্ছেন অথবা প্রতিবাদ না জানিয়ে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে ধরে রাখছেন সে সব দলপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বর্জন করুক নারীরা। নারীদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নারীরাই আদায় করে নিক।

কন্যাজায়াজননী এই তিনরূপের নারী প্রকৃতপক্ষে মাতৃরূপী নারীর সবচেয়ে বড় মর্যাদা হলো তার মাতৃত্ব। নারীতো মা-ই। মাওলানা শফীর বক্তব্যে একজন পুরুষ হিসেবে আমি লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী নারী সমাজের কাছে। কারণ নারী আমাদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের কাছে কন্যা-জায়া-জননী অর্থাৎ সম্মানের।

নারী পুঁজিবাজার অর্থনীতি ও মৌলবাদীদের হাতের পুতুল ও পণ্য না হয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠুক একজন মানুষ হিসেবে আমি তাই চাই।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই, ২০১৩

'লিমনের ভাগ্য আর যেন না হয়'

দৈনিক আজাদী              উপসম্পাদকীয়                কাল আজ কাল
৪ জুলাই ২০১৩

-কামরুল হাসান বাদল

এদেশের মানুষের কতোভাবে মৃত্যু হয় তার ইয়ত্তা নেই। আর কতো ধরনের দুর্ঘটনায় পতিত হতে হয় তারও কোন শেষ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য লিমনের। তার সাথে দুর্ঘটনা ঘটলো রাষ্ট্রের। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিই এখন লিমনের চরম প্রতিপক্ষ।

হতভাগ্য তরুণ এই লিমনকে ২০১১ সালের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে গুলি করেছিল রাষ্ট্রের এলিট ফোর্স নামে খ্যাত র‌্যাব। ওই দিনই ঘটনার নেতৃত্বে থাকা র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক লুৎফর রহমান বাদী হয়ে লিমনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। একটি অস্ত্র আইনে অপরটি বন্দুকযুদ্ধ করে সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে। অপরদিকে লিমনকে অন্যায়ভাবে গুলি করা হয়েছে দাবি করে তার মা ছেনোয়ারা বেগম ডিএডি লুৎফর রহমানসহ র‌্যাবের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল একটি মামলা করেন।

লিমনের এই ঘটনা দেশে বেশ আলোচিত সমালোচিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়। কারণ বিভিন্ন গণমাধ্যম তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, লিমন ছিল প্রকৃতই একজন নিরপরাধ। আর র‌্যাবও তাকে গুলি করেছিল ভুল করে, না চিনে। তবে সেদিন যে মোর্শেদ জমাদ্দার নামক যে ব্যক্তিকে ধরতে গিয়ে লিমনদের গ্রামে র‌্যাব অভিযান চালিয়েছিল সে মোর্শেদ বা তার সহযোগীদের এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি র‌্যাব।

লিমনের ঘটনায় বিব্রত র‌্যাব ও প্রশাসন সে সময় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে। জনগণের কাছে তার কোনটিই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। বরং মানুষ মনে করে লিমনকে ভুল করে হোক আর যে ভাবেই হোক গুলি করেছে র‌্যাব। আর লিমন যেহেতু অপরাধী নয় সেহেতু এই ঘটনার সাথে জড়িত র‌্যাব সদস্যদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক।

অন্যদিকে র‌্যাব কোন ভুল করেনি এবং লিমন প্রকৃতই একজন অপরাধী তা প্রমাণ করতে গিয়ে এখন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই লিমন নামক পঙ্গু এক তরুণের বিপক্ষে চলে গেছে। লিমনকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে রাষ্ট্রের একটি ভুল কাজের বিরুদ্ধে।

চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের রুখতে পুলিশবাহিনী যখন ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছিল তখন র‌্যাব গঠন ও এর অভিযানে দেশের অধিকাংশ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারের মতো মানবাধিকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল শ্রেণী কর্তৃক সমালোচিত হলেও দেশের সাধারণ মানুষের ব্যাপক আস্থা আছে র‌্যাবের প্রতি। এই বাহিনী গঠনের পর দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির যে কিছুটা উন্নতি ঘটেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অর্থাৎ এখন যে পরিস্থিতি তার আরও অবনতি হতে পারতো এই বাহিনী গঠিত না হলে। সেদিন লিমনকে গুলি করার ঘটনাটিও এমন এক অভিযান পরিচালনা করতে গিয়েই ঘটেছিল। এবং অধিকাংশ প্রতিবেদক ও বিশ্লেষকদের মতে লিমনকে ভুল করেই গুলি করা হয়েছিল। কথা হচ্ছে মানুষের একশটি কাজের মধ্যে সবকটিই নির্ভুল হবে তাতো নয়। দুএকটি ভুলও হতে পারে। তবে বিচক্ষণতা হচ্ছে দ্রুতই সে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু লিমনের ক্ষেত্রে বরং হয়েছে উল্টো। র‌্যাব ভুল করতে পারে না তা প্রমাণ করতে গিয়ে লিমন এবং তার পরিবারের ওপর ক্রমাগত অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ গত কয়েকদিন আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান লিমনের পরিবারের কাছে একটি আপস ফর্মুলা দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন লিমনের পরিবার র‌্যাবের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিলে র‌্যাবও লিমনের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করে নেবে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পন্থা বটে। কারণ তাঁর উদ্যোগের স্বপক্ষে বলতে গিয়ে ড. মিজান বলেছেন রাষ্ট্রের বিপক্ষে লড়াই করা কঠিন। আমার মনে হয় দুর্গতি থেকে লিমনকে বাঁচাতে এটি তার সীমিত ক্ষমতার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। মীমাংসা হতে পারে কিংবা হলো বটে কিন্তু গুলি করায় লিমনের যে পা’টি কেটে ফেলা হয়েছে তা ফেরত পাওয়া যাবে কি?

গত ২৩ জুন লিমন ও তার পরিবারকে ডেকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

প্রস্তাবটি ভেস্তে যাওয়ায় লিমনের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠছে। বোঝা যাচ্ছে লিমনের জন্যে আরও দুর্গতি অপেক্ষা করছে। অথচ ঘটনা অনেক আগেই শেষ হতে পারতো। কারও ভুলের জন্যে যদি তা ঘটে থাকে তা স্বীকার করে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই ঘটনার নিষ্পত্তি হয়ে যেতো। অনেক ভালো কাজ করার অধিকারী ও প্রশংসার দাবিদার র‌্যাব ও বিতর্কিত হতো না জনগণের কাছে।

গত ২৪ জুন রেলের দেড় কোটি টাকার একটি কাজের টেন্ডার নিয়ে চট্টগ্রামের সি আর বিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ বছরের একটি শিশুও রয়েছে। ঘটনার সাথে অভিযুক্তদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অন্যতম একজন নাম লিমন দেখে অনেকে প্রশ্ন করেছেন এবার এই লিমনের পায়ে কি গুলি চালাবে পুলিশ বা র‌্যাব?

আসলে পুলিশ বা র‌্যাব নিরপরাধ লিমনদের পিছে না লেগে এমন শত শত টেন্ডারবাজ লিমনদের পিছে লাগতো তা আখেরে বর্তমান সরকারেরই লাভ হতো। ঝালকাঠির পঙ্গু লিমন বর্তমান সরকারের জন্যে হুমকি নয়। হুমকি হচ্ছে ছাত্রলীগ-যুবলীগে ঘাপটি মেরে থাকা চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ-সন্ত্রাসী লিমন যারা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে প্রতিদিন একটি একটি করে পেরেক ঠুকছে কফিনে। যারা বিএনপি-জামাত-হেফাজতের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করছে বর্তমান সরকারের সমস্ত অর্জনকে কালিমালিপ্ত করতে। অথচ বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পেছনে যাদের সামান্যতম অবদানই ছিল না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ