পৃষ্ঠাসমূহ

সোমবার, ২২ জুলাই, ২০১৩

'পাকিস্তানের মালালা, বাংলাদেশের মাওলানা ও আমাদের ভালো মানুষেরা'

সুপ্রভাত বাংলাদেশ                    সমসাময়িক
২২ জুলাই ২০১৩
কামরুল হাসান বাদল ২২ জুলাই ২০১৩
গত ১৩ জুলাই জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, ‘মৌলবাদীরা বই ও নারীকেই (নারী জাগরণকে) বেশি ভয় পায়।’ মালালা জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র পাকিস্তানের এক বিস্ময় বালিকা। রক্তচক্ষু ও নির্দেশ অমান্য করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অপরাধে (!) তালেবানরা তার ওপর গুলিবর্ষণ করেছিল। প্রায় মৃত্যুর কাছ থেকে বেঁচে আসা মালালা ইউসুফজাই সেই থেকে শুধু পাকিস্তান বা এই উপমহাদেশের শান্তিকামী, উদার ও প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর কাছেই শুধু নয়, সারা বিশ্বের কাছে প্রতিবাদ ও লড়াইয়ের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

মৌলবাদীরা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে একাধিকবার হুমকি দিয়েছিল বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করতে। মালালা এই উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর বারণ শোনেননি। তিনি তাঁর শিক্ষাগ্রহণ চালিয়ে যেতে অনড় ছিলেন। পরিণতিতে তাকে জঙ্গি তালেবানিদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশে তঁাঁর চিকিৎসা না হলে বেঁচে থাকা হয়তো সম্ভব হতো না তাঁর।
মালালার দুর্ভাগ্য তার জন্ম হয়েছে পাকিস্তানের মতো এক জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে। উন্নত কোনো দেশে জন্ম হলে তাঁর কাহিনী অন্য ধরনেরও হতে পারতো। তবে এখন যা হয়েছে তাকে বলতে হয় বিপরীতে হিত হয়েছে তাঁর। মানবতা, গণতন্ত্র, প্রগতিশীলতা ও নারীবিদ্বেষী তালেবানদের অন্যায় নির্দেশ মানেননি মালালা। তিনি বিদ্রোহ করেছেন কারণ তিনি জানেন শিক্ষা ব্যতিরেকে নারী জাগরণ কখনও সম্ভব নয়। এই অচলায়তন ভাঙতে তার মতো অসংখ্য মালালার প্রতিবাদ করা উচিত, অসংখ্য মালালার জন্ম হওয়া উচিত।
মালালাকে দেখে পাকিস্তানের নারী সমাজ নতুন করে আবার নিজেদের মানুষ ভাবতে শিখবে। নিজেদের দাবির জন্যে সোচ্চার হয়ে উঠবে। হয়ত এভাবে একদিন পাকিস্তানের বুকে গেড়ে বসা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের হাত থেকে তাদের প্রকৃত মুক্তি অর্জন হতে পারে। মালালা আজ সারা বিশ্বের বিশেষ করে পশ্চাদপদ ও ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার কোটি কোটি নারীর কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
মালালা যেদিন জাতিসংঘে বক্তব্য প্রদান করলেন তার সপ্তাহখানেক আগে থেকে বাংলাদেশের এক ধর্মীয় নেতার বক্তব্য সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সপ্তাহখানেক আগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে প্রথমবারের মতো হেফাজতে ইসলামের আমীর হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা আহমদ শফীর একটি ভিত্তিও ক্লিপিং ছাড়া হয়। পরবর্তীতে কয়েকটি টিভি চ্যানেলে সে ক্লিপিংটি দেখানো হয় এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রেও মাওলানা শফীর বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়। ভিভিওটিতে দেখা যাচ্ছে কোনো এক শীতের রাতে একটি ওয়াজ মাহফিলে তিনি বক্তব্য রাখছেন। তাঁর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিতে আমার রুচিতে লাগছে।
সেদিনের ওয়াজে শফী সাহেব শুধু নারীদেরই দোষারোপ করলেন অথচ নারীরা যাদের দ্বারা অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত ও ধর্ষিত হয়ে থাকে সেই পুরুষদের ব্যপারে একটি বাক্যও উচ্চারণ করলেন না। সমস্ত অনাচারের দায় যেনো শুধু নারীর।
এক্ষেত্রে কি পুরুষের কোনো দোষ নেই। তিনি তো তাঁর বক্তব্যে একবারের জন্যেও উচ্চারণ করলেন না পুরুষরাও যেনো শ্রদ্ধার চোখে নারীদের দেখে, সম্মানের চোখে দেখে। মা-বোনের মতো দেখে। পুরুষ কি ভাদ্র মাসের কুকুর না কি উন্মত্ত ষাঁড়? নারী দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। পুরুষের চরিত্র ঠিক রাখার কোনো কথা কি ইসলাম ধর্মে বলা হয়নি?
দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের নিয়েও তিনি অত্যন্ত অশালীন, অভদ্র ও শিষ্টাচার বর্জিত কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায় সেখানে নাকি মেয়েরা জেনা করে টাকা কামায়, কী করুণ তাচ্ছিল্য আমাদের নারী শ্রমিকদের প্রতি। অথচ এদেরই রক্তে-ঘামে পরিশ্রমে দেশ আজ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এদের কল্যাণে দেশের অর্থনীতি বেগবান হয়েছে। আজ রিজার্ভের পরিমাণ যে দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে তাতে এই নারী শ্রমিকদের অবদান কম নয়।
গার্মেন্টসে কাজ করতে গিয়ে গত তিন দশকের মধ্যে তিনটি মেয়েও ধর্ষিত হয়েছে কিনা তা বাংলাদেশের কোনো পরিসংখ্যানে নাই। বরং নারী ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে বাড়ি-ঘরে ও অন্য বাস্তবতায়।
আসলে মালালার উপলব্ধিই ঠিক ( মৌলবাদীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় বই অর্থাৎ জ্ঞান ও নারীদের)। এই অমোঘ সত্যটিই বেরিয়ে এসেছে মাওলানা শফী সাহেবের বক্তৃতায়। যাঁর দল হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতাই এক সময় স্লোগান দিয়েছিলেন ‘বাংলা হবে আফগান, আমরা সবাই তালেবান।’
পাকিস্তানে তালেবানদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার পরপর প্রথমেই তাদের আক্রমণের শিকার হয় সে দেশের নারীরা। সেখানে মৌলবাদীরা নারীদের চাকরি করতে বাধা দেয়। তাদের শিক্ষাগ্রহণে বাধা দেয়। তারা অবরুদ্ধ করে নারীদের। এই পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তানেও। সেদেশে নারীদের দুর্গতি নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্র বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের দারুণ ক্ষুব্ধ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশেও সেই শক্তির উত্থানপর্ব চলছে। গত বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল অস্বাভাবিক গতিতে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সে সব তৎপরতা বন্ধ করার সাথে সাথে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এবং বর্তমান বছরের প্রথমদিকে কয়েকজনের রায় ঘোষিত হলে দেশজুড়ে জামায়াত-শিবির যে তাণ্ডব চালায় তার সাথে যুক্ত হয় হেফাজতে ইসলাম নামের কওমী-মাদ্রাসা ভিত্তিক কথিত ধর্মীয় সংগঠনটি। ২০১০ সালে সরকারের নারী নীতির প্রতিবাদের প্রথম তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। দীর্ঘ বিরতির পর এবং রাজাকারদের বিচার প্রায় সমাপ্ত হয়ে আসার এই সময়ে তারা নতুন করে মাঠে নামে ১৩ দফা কর্মসূচি নিয়ে।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নারীদের ঘরে বন্দি করে রাখা সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মের কোথাও নারীদের অপমানিত করা হয়নি। বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানানোর স্বপ্ন থেকেই ধর্মান্ধরা এই ধরনের প্রলাপ বকে যাচ্ছেন। তাদের এই ধরনের বক্তব্য বা আচরণে ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না।
কারণ দেশের লক্ষ লক্ষ কর্মজীবী নারীরা আর কখনও তাদের কথামতো ঘরে ফিরে যাবে না।
তবে মুশকিলটা হয়েছে দেশের বর্তমান অপরাজনীতি নিয়ে। কারণ দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি হেফজতে ইসলামের এই সব কর্মকাণ্ডের সমর্থক। এবং বিএনপি স্বপ্ন দেখছে হেফাজতের সমর্থনে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এই শক্তির ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ধর্মকে অনৈতিকভাবে ব্যবহারের নজির আছে। আর গোড়া থেকে হেফাজতে ইসলামকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও দিয়ে এসেছে বিএনপি।
হেফাজত যে ১৩ দফা দাবি দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে বিএনপি কখনও কিছু বলেনি। বর্তমানে মওলানা শফীর বক্তব্যের প্রতিবাদও বিএনপি করবে বলে আশা করি না। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই, হেফাজতের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে নির্বাচনে গিয়ে জয়লাভ করলে তারা কি হেফাজতের ১৩ দফা দাবি মেনে নেবে? অথবা মাওলানা শফী সাহেবের বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করে নারী শিক্ষা বন্ধে ও তৈরি পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করবে?
মওলানা শফীর এই বক্তব্যে দেশের প্রগতিশীল মানুষ ক্ষুব্ধ। একজন শিক্ষিত মানুষ নারীদের নিয়ে প্রকাশ্যে এমন বিষোদগার করতে পারেন তা ভেবে অনেকে বিস্মিত ও হতাশ। আমি বিস্মিত হয়েছি সুশাসনের জন্যে যে সব নাগরিক গলা ফাটান রাতদিন, মানবাধিকার কর্মীরা যারা বিদেশে গিয়ে বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নালিশ করে আসেন এবং ৮৪ লাখ নারীর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, শান্তির জন্য যিনি নোবেল অর্জন করেছেন তাঁদের সকলের আশ্চর্য নীরবতা দেখে।
নেপোলিয়ান বোনাপার্টের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করি। তিনি বলেছিলেন, সমাজে খারাপ লোকরাই শুধু খারাপ কাজ করেন তা না। ভালোরাও করেন যখন তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলে চুপ করে থাকেন।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ