দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১০ শ্রাবণ ১৪২০ সাল ১৫ রমজান ১৪৩৪ হিজরী
- কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১০ শ্রাবণ ১৪২০ সাল ১৫ রমজান ১৪৩৪ হিজরী
- কামরুল হাসান বাদল
প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও নিজেকে আর সুশীল হিসেবে ধরে রাখতে পারলেন না সরকার দলীয় সাংসদ গোলাম মাওলা রনি। গত সাড়ে চার বছর ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শোতে উপস্থিত হয়ে পত্রিকায় কলাম লিখে একজন সুশীল হয়ে উঠবার কত চেষ্টাই না তিনি করেছিলেন।
কাক যে কোকিল সেজে থাকতে পারে না শেষ পর্যন্ত তার প্রমাণ দিলেন পটুয়াখালী থেকে নির্বাচিত তরুণ এই সাংসদ।
গত শনিবার দুপুরে নিজ অফিসে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি চ্যানেলের দুই সংবাদকর্মীকে বেদম প্রহার করেছেন রনি ও তাঁর অফিসের লোকজন। আক্রান্ত দুই সংবাদকর্মী হচ্ছেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের অপরাধ বিষয়ক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘তালাশ’ এর প্রতিবেদক ইমতিয়াজ মোমিন ও ভিডিও চিত্রগ্রাহক মহসিন মুকুল। তাঁরা পটুয়াখালীর একটি বিষয়ে কিছু অভিযোগকে কেন্দ্র করে কিছুদিন ধরে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন।
ঘটনার পরে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। বর্তমানে জামিনে আছেন সাংসদ রনি। সাংবাদিক পেটানো ছাড়াও অন্য আরেকটি কারণে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে কারণ, রনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আর ইনডিপেনডেন্ট টিভির মালিক, যার বিরুদ্ধে রনি চাঁদাবাজির অভিযোগে পাল্টা মামলা করেছেন, বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা।
গোলাম মাওলা রনিকে প্রথম দেখি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশো অনুষ্ঠানে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক লাগানো, গেঁয়ো চেহারার সাথে খুব বেমানান টাই। শুদ্ধ উচ্চারণের প্রাণপণ চেষ্টারত তরুণ সাংসদ গোলাম মাওলা রনির চিবিয়ে চিবিয়ে বলা বক্তব্য শুনে আমি হতবাক। যেদিন তিনি বর্তমান সরকারের প্রথম মন্ত্রি পরিষদ গঠিত হওয়ার অনুষ্ঠান ও সেদিন তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ রসালো বক্তব্য রাখছিলেন। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী(১৯৯৬-২০০১) বর্তমান সাংসদ যাঁকে রনি চাচা বলে সম্বোধন করেন তাঁকে নিয়ে রনির অশালীন, অশ্রদ্ধা ও ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। সেদিন মন্ত্রিদের শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে এবং উপস্থিত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা যাঁরা মন্ত্রি সভায় স্থান পান নি তাঁদের নিয়েও রনি ভীষণ আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। একজন তরুণ নেতা দলের সিনিয়র নেতা যাঁরা তাঁর পিতৃতুল্য তাঁদের নিয়ে এমন মর্যাদাহানিকর কথা বলতে পারেন কীভাবে তা আমাকে ভাবিত করেছিল সেদিন। ভেবেছিলাম দলের পক্ষ থেকে এরপর তাঁকে সতর্ক করা হবে। তবে সতর্ক যে করা হয় নি অথবা সতর্ক করলেও তাতে খুব যে কাজ হয় নি তার প্রমাণ পেলাম কিছুদিন পরে আরেকটি অনুষ্ঠানে যেখানে রনি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এক গল্প ফেঁদেছিলেন। যেদিন রনি টকশোতে বলেছিলেন দেশের বাইরে গিয়ে শেখ হাসিনা নেতাদের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা নাকি বলেছিলেন, প্রতিযোগিতায় যে জিতবে তাঁকে মন্ত্রি বানাবেন। সেই দৌড়ে জিতে কে মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন সে কথাও রনি বলেছিলেন বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে। দল ও সরকারের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীদের নিয়ে রনির এ ধরনের অশ্রদ্ধাপূর্ণ ও অশালীন মন্তব্য অনেককে মর্মাহত করলেও টিভির টকশোতে এক প্রকার নিয়মিত হয়ে ওঠেন এবং একজন কলাম লেখক হিসেবেও আবির্ভূত হন তিনি।
যেদিন সাংবাদিক পেটালেন সেদিন রাতেও দেশের টেলিভিশন জগতে প্রথম তর্কাতর্কির অনুষ্ঠান চ্যানেল আই’এর তৃতীয় মাত্রায় উপস্থিত করা হয়েছিল তাঁকে ও ইনডিপেনডেন্ট টিভির বার্তা প্রধান খালেদ মুহিউদ্দিনকে। সে অনুষ্ঠানেও উত্তেজিত খালেদের পাশে বেশ নির্বিকার ও মিনমিনে মনে হয়েছে রনিকে। ভেবেছি এ বড়ো সেয়ানা মাল।
টিভির টকশো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হতে রনি নিজেকে এক সময় সুশীল হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। ভেবেছিলেন হয়ত এমন দু’চারজন সাংবাদিক পেটালেও খুব একটা যায় আসে না। আর যা হোক এমন পরিস্থিতিতে দেশের কিছু সুশীল ও তার্কিকরা তাঁর পক্ষ নেবেন।
রনির প্রথম ভাষ্যমতে ইনডিপেনডেন্ট টিভির সাংবাদিকরা চারদিন ধরে অনবরত তাঁকে অনুসরণ করছিল। তাঁর বাসস্থান থেকে অফিস এমন কি রাস্তায়ও তাঁকে অনুসরণ করছিল সাংবাদিকসহ দশ/ বারোজন লোক। যিনি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাঁকে এভাবে অনুসরণ করা সাংবাদিক নীতিমালায় পড়ে কিনা সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে বলতে চাই, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যম বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ওই মাধ্যমের অনেকের সাথে তাঁর পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ঘটনার পর সাংবাদিক নেতাদের অনেকের মধ্যস্থতার উদ্যোগ দেখে বুঝতে পেরেছি সাংবাদিক নেতাদের মধ্যেও অনেকের সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক আছে। ইনডিপেনডেন্ট টিভির সাংবাদিকরা যদি তাঁকে এমন ত্যক্ত বিরক্ত করেই থাকতেন তবে তা তিনি ঐ চ্যানেলের কাউকে না হোক সিনিয়র সাংবাদিক বা সাংবাদিক নেতাদেরও তা জানাতে পারতেন। এমন কি বার্তা প্রধান খালেদ মুহিউদ্দিনকেও ফোন করে অন্তত প্রশ্ন করতে পারতেন তাঁকে এভাবে হয়রানি(তাঁর ভাষায়) করার অর্থ কী?
গোলাম মাওলা রনি তার কিছুই করেন নি। তিনি সরাসরি দুই নিরীহ সাংবাদিককে পিটিয়ে দিলেন। যাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ রনি সাহেবরা জানেন বাংলাদেশে সাংবাদিক পেটালে কোন সমস্যা হয় না। যেখানে সাংবাদিক হত্যারই বিচার হয় না সেখানে দু’চারজন সাংবাদিক পেটালে এমন কী হয়। অতএব, সাংবাদিক পেটাও আর তারপর তাদের নামে চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দাও, ব্যস। দেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে সালমান এফ রহমান শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির হোতা তবে রনির কাছে চাঁদা চাইবেন ওকথা কেউ বিশ্বাস করে নি। সাংবাদিক পিটিয়ে চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দিয়ে রক্ষা পাওয়ার এই ওষুধ বোধ হয় রনির বেলায় কাজ করবে না এবার। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যাকে আইনসভা বলা হয় বাংলাদেশে তা জাতীয় সংসদ হিসেবে পরিচিত। আইন সভার সভ্যদের আমরা জাতীয় সংসদ সদস্য বলে থাকি। মূলত তাঁরা আইনসভার সভ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এই আইনসভার সভ্যদের অসভ্য আচরণে জাতি এখন ত্যক্ত বিরক্ত। বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত না থাকলে সংসদ অকার্যকর ও নিরস আর উপস্থিত থাকলে তাদের (উভয় পক্ষের কারো কারো) অশালীন, অভব্য, অসভ্য কথাবার্তা ও আচরণে আমরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ, হতাশ হয়ে পড়ি। রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন আইন সভার সভ্যরা। আর রাষ্ট্রের অন্য দুই বিভাগ অর্থাৎ শাসন ও বিচার বিভাগ সে অনুসারেই দেশ শাসন ও বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকেন। সেক্ষেত্রে আইনসভার সভ্যরা অনেক অনেক বেশি সম্মান গৌরব মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দিকে তাকালে কি তাই মনে হয়? সন্দেহ হয় না আসলে ওখানে ক’জন সভ্য লোক আছেন?
শুধু রনি বলে নয় বর্তমান সরকারসহ অতীতের সব সরকারের আমলে এ ধরনের কিছু কিছু বেয়াড়া সংসদ সদস্যের অপকর্মের চিত্র আমরা দেখেছি। এরা আইন প্রণয়ন করবেন কী? নিজেরাই আইন ভঙ্গ করে থাকেন বেশি। নিজ এলাকার স্কুল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে হাটবাজার ইজারা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, থানার ওসির বদলি পর্যন্ত সবকিছুতেই মাথা ঘামান তারা। তাদের মাধ্যমেই হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয় বলেই দুর্নীতি করার সুযোগ পান তাঁরা। শুল্কমুক্ত গাড়ি,সরকারি প্লটসহ নানা সুবিধার কারণে সংসদ সদস্য পদটি আর্থিকভাবে অধিক লাভবানের জায়গায় পরিণত হয়েছে। যে কারণে সংসদ নির্বাচন করতে এখন কোটি কোটি টাকা খরচের প্রয়োজনও হয়ে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার সারাদিন গোলাম মাওলা রনি পদত্যাগ নাটক করেছেন। দিন শেষে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বলেছেন দল বললে তিনি পদত্যাগ করবেন। প্রশ্ন হলো এই দলের কথা কি তিনি অতীতে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। তাহলে দিনের পর দিন যে কথা শুধু পার্টি ফোরামে বলা যায় সে কথা টকশো ও কলামে লিখে কি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন নি? আজ কেন দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর বিষয়টিতো রাজনৈতিক নয়, সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। তাঁর দায় কেন দল বহন করতে যাবে।
অনেকে রনির এই অবস্থাকে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। তিনিও এখন জাতির সামনে তাই তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে তো অনেকেই বলেছেন, লিখেছেন কই কোথাও তো তাঁদের আক্রান্ত হতে দেখলাম না। খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত যে রনি এতদিন তোয়াক্কা করেন নি, সরকারের বাঘা বাঘা মন্ত্রিকে পর্যন্ত যিনি কেটে ছিঁড়ে লবণ লাগিয়েছেন তারাও তো রনিকে টু শব্দ করতে পারেন নি। আর সবচেয়ে বড় কথাটি হলো রনি তো নিজেই প্রথম আঘাত করেছেন সাংবাদিকদের, যারা শুধু চাকরির স্বার্থে তাঁর অফিসে গিয়েছিলেন। এখন তো রনির কাছেই প্রথম শুনলাম কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে সাংবাদিকদেরও। তাহলে তো বড় মুশকিল পত্রিকা বা টিভি ভবন ছেড়ে তো এখন বাইরের সংবাদ সংগ্রহের জন্যে যেতেই পারবে না সাংবাদিকরা।
আমার লেখা সালমান এফ রহমানের পক্ষে বলবার জন্যে নয়। দেশের কোটি কোটি মানুষ জানেন তিনি কী ও কেমন ব্যক্তি। আমার বক্তব্য সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। যে ভঙ্গিতে গোলাম মওলা এই দু’জন সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়েছেন তা কোন অর্থেই সমর্থনযোগ্য নয়, ক্ষমাযোগ্যও নয়। এই অপরাধে গোলাম মওলা রনির উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। সরকার দলের এমপি বলে এক্ষেত্রে ক্ষমা পাওয়ার কোন অধিকার নেই তার। বরং দলীয়ভাবেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। গোলাম মওলা রনিরা কখনও কোন দলের সম্পদ নন তাঁরা দলের বোঝা। আওয়ামী লীগের উচিত ছিল এই বোঝাকে আরো আগে ফেলে দেওয়া। তাতে দলের ভাবমূর্তিই রক্ষা পেতো।
সে সাথে সাংবাদিকতার নীতিমালা বা বিশদভাবে বলতে গেলে টেলিভিশন সাংবাদিকতা নিয়েও অনেকের অনেক আপত্তি শোনা যায় আজকাল। সংবাদ সংগ্রহের নামে কারো ব্যক্তি জীবনের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করাও সাংবাদিকতার নীতিমালায় পড়ে না। আমার মনে এক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরও কিছুটা দায়িত্ব আছে। রনির কথামতো চারদিন ধরে যদি বাসা-অফিস-রাস্তায় তাঁকে অবিরাম অনুসরণ করা হয়ে থাকে তাও কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। একটি সমাজকে তখনই সভ্য সমাজ বলা যাবে যখন সমাজের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সভ্যতা, ভব্যতা, দায়িত্ববোধ ও নীতিবোধের পরিচয় দিয়ে থাকবেন। আর একটি জাতি বা সমাজকে সভ্যতার পথে নিয়ে যেতে সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্বটাই সর্বাগ্রে। এ কথাটি ভুলে গেলে চলবে না।
‘আমরা আছি রনি ভাই মাইরের ওপর ওষুধ নাই’। প্রবণতা থেকে আমাদের রাজনীতিকরা বের হতে না পারলে তার খেসারত দিতে হবে দলকে, জনগণকে এবং দেশকে।
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন