পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৩

'কন্যা, জায়া, জননী-প্রণমি তোমায়'

দৈনিক আজাদী            উপসম্পাদকীয়                কাল আজ কাল
১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৩ শ্রাবণ ১৪২০ সাল ৮ রমজান ১৪৩৪ হিজরী

অস্কার বিজয়ী বাঙালি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবিটি যারা দেখেছেন তারা বাংলার বুকে ঘটে যাওয়া ৫০ এর মনন্তর বলে পরিচিত দুর্ভিক্ষের করুণ অবস্থা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশ সৃষ্ট সে দুর্ভিক্ষে অনেকের মতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল শুধু অবিভক্ত বাংলায়। তখন দুই বাংলা মিলে জনসংখ্যা সাড়ে সাত থেকে আট কোটির মতো ছিল হয়ত।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই দেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটির মতো। সে সময়ে যে খাদ্য উৎপাদন হতো তা দিয়ে এই জনসংখ্যার সারা বছরের চাহিদা পূরণ হতো না। কাজেই খাদ্য আমদানি করতে হতো তখনও।

মার্কিন বারণ উপেক্ষা করে কিউবায় চট রপ্তানি করার অপরাধে (!)’৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশ অভিমুখি সব ধরনের খাদ্য জাহাজ ফিরিয়ে নেয়। একেতো খাদ্য ঘাটতির দেশ তার ওপর ’৭১ সালের যুদ্ধের কারণে এবং স্বাধীনতার পরে প্রাকৃতিক অবস্থা অনুকূল না থাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল পরপর কয়েক বছর। মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো খাদ্য জাহাজগুলো আকস্মিক ফিরিয়ে নেওয়ায় ’৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারকে এই কারণে দেশে-বিদেশে নিন্দিত হতে হয়েছিল। বাসন্তি নামক এক অপ্রকৃতিস্থ মহিলার জাল পরিহিত ছবি ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় নিপতিত করা হয়েছিল। এই ঘটনার অনেককাল পরে প্রমাণিত হয়েছিল সেই ছবিটি ছিল বানোয়াটএকজন অপ্রকৃতিস্থ মহিলাকে জাল পরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল তৎকালীন সরকার তথা স্বাধীন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে। বলাবাহুল্য এই চক্রান্ত এখনও থেমে নেই বরং তা আগের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ক্ষেত্রমাত্রাপরিমাণ ও পরিসরে।

আমাদের তখন শিশু ও কৈশোর কাল। ৭০ দশকের কথা বলছি। তখন দেখতাম দুপুরে যখন সবার খাওয়া-দাওয়া প্রায় শেষ তখন কিছু কিছু ভিক্ষুক আসতো। একটু ভাতের জন্যে তাদের কী হাহাকার ও আহাজারি। এই আহাজারির শব্দ রাতের বেলাও শুনতাম। আমার ছেলেবেলা কেটেছে রংপুরে। সেখানে দেখেছি সামান্য ভাতের জন্য নারী-শিশু পুরুষের সে কি হাহাকার। প্রায় প্রতিদিন দুপুর ও রাতে এমন ভিক্ষুকদের ভাত খাওয়ানের দায়িত্ব ছিল আমার ও আমার পিটেপিঠি বড় ভাইয়ের। সবার খাওয়া-দাওয়ার পরে বেঁচে যাওয়া ভাত-তরকারি খাওয়ানো হতো ভিক্ষুককে। কোনোদিন হয়ত তাদের পেট ভরতো কোনো দিন হয়ত ভরতো না। দেখতাম সামান্য ভাত বলে তাতে পানি দিয়ে কি অপরিসীম তৃপ্তিতে তারা তা খেতো। আর ভিক্ষা হিসেবে চাল দেওয়ার রেওয়াজতো বাংলাদেশের বহু পুরোনো। এই পরিস্থিতি ৮০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল। তারপর থেকে চিত্র বা পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। কয়েক বছর আগেও আশ্বিন কার্তিক ও আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে দেশের উত্তরাঞ্চালে মঙ্গা দেখা দিত। বিশেষ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসের মঙ্গা ছিল উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে কুড়িগ্রামলালমনিরহাটসহ ওই এলাকার বেশ ক’টি জেলায় প্রতিবছরের নিয়মিত দৃশ্য। শুধু উত্তরাঞ্চল নয় চট্টগ্রামে আমাদের গ্রামের বাড়ি রাউজানের গহিরায়ও আমি অনেক পরিবারকে দেখেছি এ সময় একবেলা কোনোমতে খেতে। আমি জাউ খেতে দেখেছি। দেখেছি ভাতের অভাবে বাঙ্গিতরমুজ ও কাঁঠাল খেয়ে জীবন ধারণ করতে ৭১’ সালে আমাদের দক্ষিণ গহিরায় রেডিও ছিল আমাদের ঘরে একটি। পাড়াশুদ্ধ লোক বিবিসিভয়েস অব অ্যামেরিকাআকাশ বাণী কলকাতা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ শুনতে ভিড় জমাতো আমাদের কাছারি ঘরে।

দিন পাল্টেছে। অন্তত ভাতের জন্যে কাউকে আজ আহাজারি করতে হয় না। চট্টগ্রামের গ্রাম এলাকায় এখন ভিক্ষুক নেই বললেই চলে। শহরেও আজকাল ভিক্ষা হিসেবে কেউ চাল নেয় না। এক টাকার নিচে ভিক্ষা নিতে ভিক্ষুকরা অসম্মান বোধ করে। চট্টগ্রাম শহরে ভাত খাওয়ানোর কোনো ভিক্ষুক পাওয়া যায় না। মুসলিম পরিবারে অনেকে মাঝে-মধ্যে মিসকিন হিসেবে এতিম বা ভিক্ষুকদের খাইয়ে থাকেন।

এ ধরনের মিসকিন খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা জানেন মিসকিন যোগাড় করতে কী পরিমাণ বিড়ম্বনা পোহাতে হয় আজকাল। আমার এক বন্ধু একটি মাজারে গিয়েছিলেন কিছু ভিক্ষুক এনে মিসকিন খাওয়াতে। সব শুনে অর্থাৎ গাড়ি ভাড়ার দরদাম ঠিক করে ভিক্ষুক সর্দার জিজ্ঞাস করলেন তার বাসায় লিফ্‌ট আছে কিনা। আমাদের যে পাড়ায় একটি মাত্র রেডিও ছিল একাত্তরেএখন সেখানে প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে রঙিন টেলিভিশনডিশ সংযোগসহ। সিরামিক ইটের বাড়ি আছে কয়েক ডজনকোটিপতির সংখ্যাও কয়েক ডজনের কম নয়। এখন আমাদের বাড়িটিই সবচেয়ে জীর্ণ-শীর্ণ।

একটি সময় মহররম ও মেয়ে জামাই বা এ ধরনের অতি গুরুত্বপূর্ণ মেহমান ছাড়া মুরগি খাওয়া হতো না। দু’চার-দশ মাইলের মধ্যে গরু জবাই হতো একটি। আর মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর জন্যেই শুধু কেনা হতো আঙুরআপেল নাসপাতির মতো ‘বেহেশতের ন্যামা’ খ্যাত ফলগুলি। এক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের জনসংখ্যা আজ ১৬ কোটি। পাশাপাশি আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে নদী ভাঙনশিল্প কারখানা ও বসতি স্থাপনে। তারপরেও দেশ আজ খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে। গুদামের অভাবে চাল রপ্তানির কথা ভাবছে সরকার।

এতসব পুরানো কথা লিখলাম শুধু এটুকু বোঝাতে যে আজ দেশের যে পরিবর্তন তা নতুন প্রজন্মের কোনো সন্তানের পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন। কারণ বিশ-ত্রিশ বছর আগে এই বাংলাদেশ কেমন ছিল তা যে না জানলে পরিবর্তনটুকু বুঝবে না।

এই ব্যাপক পরিবর্তনটুকু কীভাবে সাধিত হলো। কোনো জাদুমন্ত্রে কি এই পরিবর্তনমোটেও না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষই এই পরিবর্তনের বড় রূপকার। বিশ্বব্যাংক বলেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এই অগ্রগতির সঠিক কোনো ব্যাখ্যা নেইতা বিস্ময়কর।

এক্ষেত্রে দুটো সেক্টরের অবদানই সবচেয়ে বেশি একটি জনশক্তি রপ্তানি অন্যটি তৈরি পোশাক শিল্প। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে। প্রথম অবস্থানে আছে চীন। প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী আর তৈরি পোশাক শিল্পের লাখ লাখ নারী শ্রমিকের রক্ত-ঘাম-পরিশ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে বিনির্মাণ হয়েছে নতুন বাংলাদেশের। যে দেশের রিজার্ভের পরিমান এখন দেড় হাজার বিলিয়ন ডলারের অধিক। ’৭২ যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে ব্যাঙ্গ করেছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সেই বাংলাদেশ আজ আমেরিকার কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে বছরে অন্তত সে দেশের ১২ জন মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেন। আর এই সাফল্যের পেছনে যাদের সবচেয়ে বড় অবদান তারা হচ্ছেন বাংলাদেশের নারী সমাজ। তৈরি পোশাক শিল্প ছাড়াও প্রবাসী যারা বছরের পর বছর বিদেশে মানবেতর জীবন যাপন করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করেছেন সেখানেও ওই প্রবাসী শ্রমিকের মতোই ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে দেশে রেখে যাওয়া তাদের স্ত্রীদের। যারা বছরের পর বছর স্বামীর অবর্তমানে স্বামী সংসার তথা বাবা-মা-ভাইবোন ও পুত্র-কন্যাদের আগলে রাখেন। নিজের জৈবিক চাহিদাকে চাপা দিয়ে তারা স্বামীকে বিদেশের মাটিতে শান্তিতে টাকা উপার্জনের জন্যে উপযুক্ত করে রাখেন। অতএব মানতে হবে মধ্যবর্তী আয়ের দেশে পরিণত হতে যাওয়া বাংলাদেশের জন্যে সবচেয়ে বড় অবদান এই দেশের নারীদের।

অথচ কী বিস্ময়লজ্জা আর অপমানের সাথে উল্লেখ করতে হচ্ছে এই নারীদের নিয়েই হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আহমদ শফী কিছু অবমাননাকরআপত্তিজনক ও অশ্লীল উক্তি করেছেন। তিনি নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনা করতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন যা আমার লিখতেও কুণ্ঠা হচ্ছে। অথচ এ ক্ষেত্রে পুরুষেরও যে দায়িত্ব আছেনারীদের দেখলে পুরুষেরও যে সমীহ করা উচিত সে কথাটি তিনি একবারও উচ্চারণ করেননি। তিনি বলেছেন গার্মেন্টসে মেয়েরা জেনা করে টাকা উপার্জন করে। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করতে গিয়ে কোনো নারী শ্রমিক ধর্ষিত হয়েছে তার কোনো রেকর্ড নেই। বরং উল্টো নারীরা বেশি ধর্ষিত হয় তার বাড়িতে বা তার আশেপাশে বেশি। পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরা গরিব বলে টাকার বিনিময়ে কারখানার মালিককর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেহদান করে এমন ভাবনা একজন বিকৃত মনের মানুষই ভাবতে পারে। এভাবে আমাদের নারী শ্রমিকদের যারা অপমান করছে তাদের কাছে জানতে চাই দেশের অগ্রগতিতে তাদের কী অবদান আছে। ক্ষেত শ্রমিক থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমিক বলতে চাই দেশের অগ্রগতি সাধনে কোন ক্ষেত্রে নারীর অবদান নেই। তার পাশাপাশি মাওলানা শফী সাহেবদের প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হন বৌ তালাকের ফতোয়া দেওয়া ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের কী অবদান। নারীরা যা করছে সে টুকুতো তারা করতে পারছে না। অতএব তারা নারীদের বিপক্ষে বলবে। নারী জাগরণকে থামাতে চাইবে।

বাংলাদেশের নারী জাগরণকে যারা স্তব্ধ করতে চায়। নারীদের মানুষ হিসেবে সম্মানতো দূরের কথা স্বীকারও করতে চায় না,নারীদের যারা শুধু পুরুষের সেবাদাসী করে রাখতে চায় তাদেরকে এদেশের নারীরাই চিহ্নিত করুকঘৃণা করুক। যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক হীন স্বার্থে শফী সাহেবদের এই ধরনের ন্যক্কারজনক বক্তব্য সমর্থন দিচ্ছেন অথবা প্রতিবাদ না জানিয়ে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে ধরে রাখছেন সে সব দলপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বর্জন করুক নারীরা। নারীদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নারীরাই আদায় করে নিক।

কন্যাজায়াজননী এই তিনরূপের নারী প্রকৃতপক্ষে মাতৃরূপী নারীর সবচেয়ে বড় মর্যাদা হলো তার মাতৃত্ব। নারীতো মা-ই। মাওলানা শফীর বক্তব্যে একজন পুরুষ হিসেবে আমি লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী নারী সমাজের কাছে। কারণ নারী আমাদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের কাছে কন্যা-জায়া-জননী অর্থাৎ সম্মানের।

নারী পুঁজিবাজার অর্থনীতি ও মৌলবাদীদের হাতের পুতুল ও পণ্য না হয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠুক একজন মানুষ হিসেবে আমি তাই চাই।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ