পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুন, ২০১২

* প্রসঙ্গ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান

দৈনিক আজাদী উপ-সম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল

২৮ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৪ আষাঢ় ১৪১৯ সাল ৭ শাবান ১৪৩৩ হিজরি

 কামরুল হাসান বাদল 

মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের জাতিগত দাঙ্গার কারণে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ তার অবস্থান পাল্টাবে না বলে জানিয়ে দেয়ার পরে দেশের কিছু সংবাপত্র, বেসরকারি টেলিভিশন, রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীরা চরম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে ’৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের ভারতে আশ্রয় নেয়ার পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে সরকারের এই আচরণকে অমানবিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থার চাপ (বর্তমানে তাদের অবস্থান পাল্টিয়েছে) আর বাংলাদেশের কিছুশ্রেণীর মানুষের, বিশেষ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিভিন্নভাবে জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত ও কিছু বুদ্ধিজীবীর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখে বিশ্ব বিখ্যাত আরব কবি কাহলিল জিবরানের একটি গল্পের কথা মনে পড়লো। গল্পটা সংক্ষেপে এ রকম, সারাদিন ঘোড়া ছুটিয়ে সন্ধ্যায় পথের পাশের এক সরাইখানায় আশ্রয় নিল এক ব্যক্তি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আঁগে সরাইখানার পাশে একটি খুঁটিতে ঘোড়াটি বেঁধে রাখলো সে। ভোরে ঘুম ভেঙ্গে লোকটি বাইরে এসে দেখলো তার ঘোড়াটি চুরি হয়ে গেছে। প্রিয় ঘোড়া হারিয়ে লোকটি পথের উপরেই বিলাপ করতে লাগলো। সে সময় ও পথ দিয়ে যারা যাচ্ছিল তারা লোকটির কাছে তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে লোকটি তার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আবার কাঁদতে থাকে। ঘটনা শুনে পথিক দলগুলোর বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে লোকটির বোকামির জন্যে তাকে ভর্ৎসনা করছিলো। কেউ বললো আরে তুমিতো আস্তা বোকা, তোমার ঘোড়া চুরি হবে না তো কার হবে। বাইরে ঘোড়া বেঁধে কি কেউ ভিতরে গিয়ে ঘুমায়। কেউ কেউ বললো, ঘুমিয়েছো ভাল কথা, রাতে দু’একবার এসে দেখে যাবে না। কেউ আবার বললো তোমারতো ঘোড়ার সাথেই ঘুমানো উচিৎ ছিল। এভাবে ওপথে যারা যাচ্ছিল তাদের সবাই ঘটনার বর্ণনা শুনে লোকটিকে একপ্রকার গালাগাল করে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতির এক পর্যায়ে লোকটি সমবেত মানুষগুলোর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে উঠলো, চুপ করো তোমরা, আমাকে আর একটিও গালি দিতে পারবে না। সেই ভোর থেকে তোমরা সবাই শুধু আমাকেই গালি দিয়ে গেলে, কিন্তু যে আমার ঘোড়াটি চুরি করলো তার ব্যাপারে তোমরা একটি কথাও বললে না।

মিয়ানমারের সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওপর দেশ-বিদেশের চাপ প্রয়োগের অবস্থা দেখে আমার সেই বিখ্যাত গল্পটির কথা মনে পড়লো। জাতিগত দাঙ্গা দমন ও রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ মিয়ানমার সরকারকে কিছু না বলে বা কোন প্রকার আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি না করে বারবার বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করা হচ্ছে। শুধু অনুরোধ নয় একপ্রকার চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে এদেশে রোহিঙ্গাদের আবার আশ্রয় দিতে ও পুনর্বাসন করতে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কর্মকর্তাতো ৭১ এর ইতিহাসই শুধু তুলে ধরনেনি (বরং) সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে মায়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্ষমতা বহির্ভূতভাবে পরিদর্শনে গেছেন। শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয়ে তাঁর গতিবিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন। আমি বিস্মিত হয়েছি আমাদের বর্ষিয়ান সাংবাদিক, কলামিস্ট এ.বি.এম মুসার একটি বক্তব্যে। একটি টিভি চ্যানেলে উপস্থাপকের উস্কানিতে জনাব মুসা বললেন জাতিসংঘের কর্মকর্তার ওপর সরকারি বিধিনিষেধে তিনি অবাক হয়েছেন, কারণ বিশ্বে এমন কোন নজির নেই। হায় মুসা ভাই তিনি এত সহজে ভুলে গেলেন সাম্প্রতিক সিরিয়ার কথা, ইরান, ইরাক, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়র কথা। এসব দেশে জাতিসংঘের কর্মকর্তা নয় প্রতিনিধিদেরকে কেমন নাকানি-চুবানি খাওয়ানো হয়েছিল। মুসাভাই, রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাংলাদেশের কোন ভূমিকা নেই, ঘটনাটি সম্পূর্ণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। রোহিঙ্গাদের এই পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ কোনক্রমেই দায়ি নয়। কিন্তু এর দায়ভার যখন বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চান জাতিসংঘের কর্মকর্তা তার জন্যে আপনার খারাপ লাগে, তবে দয়া করে জাতিসংঘের এই কর্মকর্তাকে একবার জিজ্ঞাসা করতে পারেন? ফেলানীর লাশ যখন কাঁটা তারের বেড়ায় পুরো একদিন ঝুলছিল তখন জাতিসংঘের এই কর্মকর্তাগণ ক’বার গিয়েছিলেন সীমান্ত পরিদর্শনে। বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন নিশ্চুপ ছিল কেন? বাংলাদেশই কি শুধু মানবতা দেখিয়ে যাবে? যে মানবতা বাংলাদেশ বহু পূর্বে দেখিয়েছিল তার প্রতিদানে বাংলাদেশ কী পেয়েছে? যুগের পর যুগ লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের পালতে হচ্ছে বাংলাদেশে। যারা আজ টেকনাফ-উখিয়া, কক্সবাজারের মতো বিস্তির্ণ এলাকায় বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড মাদক ব্যবসা থেকে অস্ত্র ব্যবসা আর জঙ্গিবাদের মদদ ও সহায়তা দিয়েছে, তাদের সে অপকর্মের দায় জাতিসংঘের কোন সংস্থা নেবে? তার মানে কয়েক বছর পরপর মিয়ানমারে এরূপ জাতিগত দাঙ্গা হতে থাকবে আর বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়ে ওদের ‘আহলান-সাহলান’ জানাবে, যে রূপ বিএনপির শাসনকালে জানানো হয়েছিল? একদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বতীপুরের পাকিস্তানি শরণার্থী (জেনেভা ক্যাম্প বলে পরিচিতি, যেখানে পাকিস্তানে ফিরে যেতে ইচ্ছুক অবাঙালিদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে) আর জিয়ার আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলারদের (যুগের পর যুগ গুচ্ছগ্রামের নামে সরকারি খরচে যাদের চালানো হয়েছে) প্রতিপালনেইতো গরীব এদেশের নাভিশ্বাস ওঠার কথা। স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর পরেওতো জাতিসংঘ পাকিস্তানকে রাজি করাতে পারেনি তার আটকে পড়া নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে। যেভাবে পারেনি লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা তথা মিয়ানমারের নাগরিকদের সে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। অবশ্য এ ধরণের পরিস্থিতি বজায় থাকলে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদেরও করে টরে খাওয়ার সুযোগ থাকে।

সরকারের বর্তমান অবস্থানের সমালোচকরা যারা বলছেন শরণার্থীদের ফেরত পাঠিয়ে বাংলাদেশ অমানবিক কাজ করেছে বা বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভুল বার্তা দেয়া হয়েছে তারা কি জানেন পুশ-ব্যাকের নামে যে সমস্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিল তাদের অধিকাংশই আর আরাকানে ফিরে যায়নি। তারা বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন পথে পুনরায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এ তথ্য আমার নয়। স্থানীয় অধিবাসীদের বরাত দিয়ে চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় দৈনিক দাবি করেছে ভাষা, আত্মীয়তা, ব্যবসা ও অন্যান্য কারণে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের খাতিরে স্থানীয়দের অনেকেই এদের আশ্রয় দিয়েছে। এবং ইতিমধ্যেই তারা মূল জনস্রোতের সাথে মিশে গিয়েছে।

অসহায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের প্রতি আমার যে, মমত্ববোধ নেই, আমার হৃদয়েও যে ব্যথা লাগেনি তা কিন্তু নয়। তবে আমি বলতে চাই কয়েকবছর পর পর এ অবস্থা চললে এবং প্রত্যেকবার বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে আগামী কয়েক বছরের মাধ্য রাখাইন প্রদেশ রোহিঙ্গা শূন্য করে ফেলবে মিয়ানমার সরকার। বরঞ্চ দীর্ঘ বছর পরে যখন মিয়ানমারে গণতন্ত্রের হাওয়া লেগেছে, নোবেল শান্তি বিজয়ী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচি যখন সে দেশের পার্লামেন্টে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছেন তখন এই সমস্যার প্রতি বিশ্বজনমত তৈরি করতে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের কঠোর অবস্থানই মিয়ানমারের ওপর বিশ্ব জনমতের চাপ প্রয়োগে সহায়ক হবে।

রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ড নির্দয় আচরণ করেনি। বরং খাবার দাবার ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করে তাদের পুশব্যাক করার চেষ্টা করেছে। এ ধরনের দু’জন আহত রোহিঙ্গার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। যদিও তাদের বাঁচানো যায়নি। আর বিজিবি ও কোস্টগার্ড খুব বেশি নিষ্ঠুর আচরণ করলে এত এত রোহিঙ্গা আবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে যেতে পারতো না। ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে বসে কিংবা পত্রিকায় কলাম লিখে বাস্তবতাহীন কথাবার্তা বলা ও লেখা যায় বটে। তবে তারা যদি টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজারের আদি বাঙালিদের সাথে কথাবার্তা বলতেন বা তাদের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করতেন তাহলে হয়ত তাদের বক্তব্যের অন্তসারশূন্যতা তারা বুঝতে পারতেন। মাসখানেক থেকে চট্টগ্রাম শহরের বাসা বাড়িগুলোতে কাজের লোকের নামে অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিচ্ছে। এবং তাদের এ কাজে লাগাতে ইতিমধ্যেই একটি দালাল শ্রেণীও তৈরি হয়েছে। যারা কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে এদের বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে সরবরাহ করছে। এরা কি আর কখনো মিয়ানমারে ফিরে যাবে?

মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে বাংলাদেশি পাশপোর্ট নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা আছে যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত থাকে। তাদের পাশপোর্ট বাংলাদেশি বলে সে দেশের আইনশৃংখলা বাহিনী ও মিডিয়ার কাছে বাঙালি মাত্রই অপরাধী বলে চিহ্নিত হয প্রায় সময়ই। সেদিনের টক শো’তে উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী ও এবিএম মুসা দুজনেই বলছিলেন এদের পাশপোর্ট দেয় কে? আমি খুব অবাক হলাম দুজনের কথা শুনে। মুসা ভাই কি জানেন না যারা রোহিঙ্গাদের একদিন আহলান-সাহলান বলে গ্রহণ করে নিয়েছিল, বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শক্তির জন্যে ওরা ব্যবহৃত হয়, জঙ্গি তৎপরতা চালাতে যারা এদের কাছ থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ সংগ্রহ করে, নির্বাচন এলে রোহিঙ্গারা যাদের জন্যে কাজ করে এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্যে যারা ওসব এলাকায় অপতৎপরতা চালায় তারাই বা তাদের সহায়ক সরকারি কর্মকর্তারাই ওদের পাশপোর্টের ব্যবস্থা করে দেয়। এসব তথ্য তো মুসা ভাইয়ের মত একজন প্রবীণ সাংবাদিকের অজানা থাকার কথা নয়।

আমি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে সংসদে দেয়া আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বক্তব্য শুনেছি। আমি মনে করি এ ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থান ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জোরালো ভূমিকা রাখবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আগে ওসব অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।


লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক
email: qbadal@yahoo.com

শুক্রবার, ২২ জুন, ২০১২

* আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি

দৈনিক আজাদী উপ-সম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল

২২ জুন শুক্রবার ২০১২ খ্রি. ৮ আষাঢ় ১৪১৯ সাল ১ শাবান ১৪৩৩ হিজরি


কামরুল হাসান বাদল
ক্রমেইএকাকী, নিসঙ্গ আর সংকীর্ণ হয়ে পড়ছিল পুকুরটি। তার চতুষ্পার্শে গজিয়ে উঠেছে সুউচ্চ দালান। চারপাশের নোংরা পানিতে কবেই শুদ্ধতা হারিয়েছে এই জলধারিণী। অথচ শত বছর ধরে এই এলাকার অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, পরিবেশকে শীতল করেছে আর আমিষের জন্যে যোগান দিয়েছে মাছের। কত কালের সাক্ষী, কত ঘটনা আর কতো কতো মানুষের অসংখ্য স্মৃতির মুন্সি পুকুর আজ বিপন্নের সম্মুখীন। কিছু অর্থলোলুপ, ভূমি দস্যু ও প্রকৃতি বিনাশী মানুষের লোভের থাবায় হারিয়ে যেতে বসেছে চকবাজার এলাকার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই পুকুরটি। কয়েক দশক থেকে বাংলাদেশের কিছু শ্রেণীর মানুষ আবাসন ব্যবসার নামে দেশের খাল- বিল- নদী- নালা-পুকুর জলাশয় এমনকি সাগর পর্যন্ত দখল করে নেয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এদের হাত থেকে ভবিষ্যতে হয়ত কবরস্থান, শ্মশানের মতো জায়গাগুলোও পরিত্রাণ পাবে না। এই ধারায় বেশ কয়েক বছর ধরে পুকুরটি ভরাট করে তার ওপর বিল্ডিং বানানোর পাঁয়তারায় এটিকে ইচ্ছেমতো দূষণ করা হয়েছে। রাতের আঁধারে ময়লা ও মাটি ফেলতে ফেলতে সবার অলক্ষে এর অনেক অংশ অনেক আগেই ভরাট করে ফেলা হয়েছিল। এবং শেষে প্রকাশ্যে পুকুরটি ভরাট করে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হলে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠন। অবশষে শত বছরের পুরোনো মুন্সিপুকুর দখল, মাটি ভরাট ও ভবন নির্মাণের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। গত রোববার ১৭ জুন এই আদেশ প্রদান করেন বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি ফরিদ আহম্মদের আদালত। তার আগে ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি অবৈধ দখল, মাটি ভরাট এবং ভবন নির্মাণের উদ্যোগের বিষয়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর পক্ষে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও এখলাস উদ্দিন ভূঁইয়া একটি রিট আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তিন মাসের এই স্থগিতাদেশ দেয়। এই আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার, চসিক ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পাঁচলাইশ থানার ওসিকে। এই পুকুরে মাটি ভরাট ভবন নির্মাণ ও দখলকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং পুকুরটি সংরক্ষণে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানাতে বিবাদিদের চার সপ্তাহের সময় দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুসারে কোন পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি।

এখন কথা হলো মাননীয় আদালত তিন মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন ভাল কথা, কিন্তু তারপর? সমাজের এই অর্থলোলুপ দানবদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা থেকে রেহাই পাবে তো মুন্সিপুকুর? নাকি দেশের হাজার হাজার জলাধারের বা পুকুরদিঘির নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো ভাগ্যবরণ করে নিতে হবে শতবর্ষী এই পুকুরকে? মুন্সিপুকুরের দিকে হাত বাড়িয়েছিল যারা, তারা বড়ই ক্ষমতাশালী। এদের অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার দাপটের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারেন যে কেউ। এদেশে তো বিক্রি হয়ে যাওয়ার লোকের অভাব নেই। কেউ কম দামে কেউ বা বেশি দামে, আর যারা দাম পান না তাঁরা বাইরে বাইরে সততার ভান ধরেন শুধু। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে তা এতই নগণ্য যে তাদের শক্তিশালী বীক্ষণযন্ত্রেও খুঁজে পাওয়া দায়। (এই ব্যতিক্রমী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা) এমন একটি শক্তির হাতে পড়ে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আসকার দিঘির অস্তিত্বও আজ বিলীন হওয়ার পথে।

প্রায় ৩৪০ বছর আগে মোঘল সম্রাট কর্তৃক এই এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে এসেছিলেন আসকর খাঁ। ১৬৬৯ থেকে ১৬৭১ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলে প্রজাদের পানীয় জলের সুবিধার্থে এই দিঘিটি খনন করেছিলেন তিনি। প্রায় ৫ কানি জমির ওপর খনন করা এই দিঘিটি তাঁর নামানুসারেই পরিচিতি হয় আসকার দিঘি বলে। শত শত বছর এই দিঘিটি আশেপাশের অসংখ্য মানুষের পানীয় জল ছাড়াও দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটিয়েছে। মোঘলদের পরে এই দিঘি আনোয়ারার জমিদার যোগেশ চন্দ্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে লিজ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হাত বদল হয়ে আজ যাঁদের মালিকানায় গিয়ে ঠেকেছে তাঁরা আজ ঐতিহ্যবাহী এই দিঘিকে কৌশলে ভরাট করে তার ওপর আবাসন প্রকল্প গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে গেলেও প্রশাসন ও জনগণ আজ নিশ্চুপ ও নির্বিকার। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এক সময়ের নয়নাভিরাম এই দিঘিটি আজ দেখে মনে হবে যেনো একটি আস্ত ডোবা। পুরোটাই কচুরিপানায় ভর্তি। দিঘির বিশাল একটি অংশ ইতোমধ্যেই ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পাড়সহ ভরাট করা অংশে অনেক পাকা ভবনও তৈরি করা হয়েছে। এক সময় সাধারণ মানুষের পানীয় জলের জন্যে খনন করা এই দিঘির পানিকে সুকৌশলে এমন দূষিত করা হয়েছে যে, তা আজ কাপড় চোপড় বা থালা বাসন ধোয়ারও অযোগ্য। দু’দশক আগেও দিঘির উত্তর পাড় শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ সড়ক দিয়ে আসতে যেতে চোখে পড়তো সুবিশাল এই দিঘিটি। বিকেল হতে অনেক রাত পর্যন্ত দিঘির পাড়ে মানুষ ঘুরতে আসতো, আড্ডা দিতো, দুঃসহ গরমের মৌসুমে গভীর রাত অবধি মানুষ হাওয়া খেতে আসতো। আজ সেসব স্থানে গড়ে উঠেছে আসবাবপত্রের দোকান। দোতলা এই দোকানগুলোর উপরের তলায় শো রুম আর নিচের তলায় কারখানা। সে কারখানা ও কারখানার শ্রমিকদের যাবতীয় বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হয় দিঘির জলে। কচুরিপানায় ভর্তি এই দিঘি দেখে আর বোঝার উপায় নেই ভরতে ভরতে এর অবস্থা এখন প্রকৃত কী রূপ। আশেপাশে বাস করা লোকদের কাছ থেকে শোনা কচুরিপানার তিন থেকে চার ফুট নিচেই এখন দিঘির তলদেশ। এভাবে চললে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দিঘিটি ভরে একটি মাঠে পরিণত হবে। আর এর মালিকপক্ষ এই সুযোগটির জন্যেই অপেক্ষা করছেন। কারণ তখন তাকে আর জলাধার সংরক্ষণ আইনের ঝামেলায় যেতে হবে না। অথচ সংরক্ষণ করা হলে এই দিঘিটিও হতে পারতো নগরবাসীর বিনোদনের একটি অন্যতম স্থান। এর চারপাশে ঘাট বাঁধিয়ে দিয়ে পায়ে চালিত নৌকার ব্যবস্থা করা গেলে মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি দিঘিটি বাঁচতো, রক্ষা পেতো পরিবেশ আর মালিকপক্ষও আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। কিন্তু মালিক পক্ষ তা করবেন না, কারণ আবাসন শিল্পে এখন যে লাভ তার তুলনায় এ ধরনের উপার্জন তাদের কাছে নস্যি। আমাদের দেশের শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের কাছে “সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি” বা সামাজিক দায়বদ্ধতা বলতে যে একটি ধারণা আছে সে ব্যাপারে কোনরূপ জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি প্রায় সাড়ে তিন’শ বছরের এই দীঘিটিকে জাতীয় ঐতিহ্য ঘোষণা করে একে রক্ষা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। কুমিল্লার ধর্মসাগরের মতো এই দিঘি নগরবাসীর জন্যে অবারিত করা হোক।

’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে চট্টগ্রামে দিঘি ও পুকুরের সংখ্যা ছিল ১৫০০০ এরও বেশি। ছয় বছর আগের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল এই সংখ্যা মাত্র ১৮০০ মতো। আর এই লেখাটি যখন লিখছি তখন এর প্রকৃত সংখ্যা কত তা বলার মতো কর্তৃপক্ষও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি সরকার একটি পানি আইন প্রণয়ন করেছে এবং এর ফলে জলাধার ভরাট, নদী ভরাট বা গতি পরিবর্তনসহ অনেক কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কার্যত এর সুফল মানুষ কতটা পাবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। বর্তমানে যেখানে বক্সিরহাটের বাজার বসে সেখানে ছিল পাঁচটি পুকুর। তার মধ্যে মাজার সংলগ্ন পুকুরটি ছাড়া আর কোনটির অস্তিত্ব নেই। সেটিও রক্ষা পেয়েছে মাজারের কারণেই হয়ত। যেভাবে শতবর্ষী কোরবানীগঞ্জের বলুয়ার দীঘিটিকে চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে ভরাট করে দালান তোলা হচ্ছে, ক্ষমতাবান এই লোকগুলোর বিপক্ষে দাঁড়াবে তেমন কেউ নেই সেই এলাকায়। চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি পাড়ায় দু’তিনটি করে পুকুর ছিল, যার কোন অস্তিত্ব এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষের উদগ্র লাল সার কাছে এভাবে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের পুকুর বা জলাধারগুলো। আগে বিভিন্নস্থানের অবস্থাপন্ন পরিবার বা জমিদাররা সাধারণ মানুষের পানীয়জলের অভাব মেটানোর জন্যে এ ধরনের অসংখ্য পুকুর-দিঘি খনন করতেন। রাস্তার ধারে ধারে পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণার্থে কলসিতে পানি সরবরাহ করতেন। আর আজকের অবস্থাপন্ন বা বড় বড় ব্যবসায়ীরা সেসব পুকুর দিঘিগুলো ভরাট করে বাড়ি, কলকারখানা বা সুপার মার্কেট নির্মাণ করে ২৫ টাকায় এক লিটার পানি কিনতে বাধ্য করছে মানুষদের।

আগামী দু’তিন দশকের মধ্যে সুপেয় পানিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি পদার্থ। মোট কথা মিঠা পানিই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে বিশ্ব রাজনীতির। আমার এই আশংকাকে অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বিশ্ব পরিবেশের খবরাখবর যারা রাখেন তাঁরাও ইতিমধ্যেই এ ধরনের আশংকা প্রকাশ করে ফেলেছেন। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও অবিরাম দখল-দূষণে নদীগুলো মৃত প্রায়। জলাশয়গুলো বিলীনের পথে আর উজানে নদীতে বাঁধ, গতি পরিবর্তন ও পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে ভারত ইতিমধ্যেই আমাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছে। অকাতরে জলাধার ভরাট করায়ও ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে মাটির নিচে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। সে সাথে শূন্য হয়ে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ অনেক জলাধার। পুকুর-জলাশয় ভরাট করার কারণে বৃষ্টি ও বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে নদীতে, ফলে নদীর উচ্চতা বেড়ে গিয়ে বন্যা হচ্ছে। আর নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সে বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ করতে না পেরে নদীর দুকূল ভেঙে পড়ছে অতি দ্রুত ও নির্মমভাবে। সমতল জায়গায় পানি ধারণের ব্যবস্থা না থাকায় ভূগর্ভে পানি ঢুকতে পারছে না, ফলে ভূগর্ভেও পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। সে সাথে মাটি পানি শোষণ করতে না পারায় বাড়ছে উষ্ণতা। চরমভাবাপন্ন অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ।

এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে মূলত যারা দায়ী তারা অর্থ-বিত্তে ক্ষমতাশালী। তাদের সন্তানরা বিদেশে লেখাপড়া করে। সে সুবাদে তাদের প্রায় পুরো পরিবারই অবস্থান করেন বিদেশে। ছুটি কাটাতে মাঝে মধ্যে দেশে আসেন। এই দেশে তাঁদের সন্তানরা পাকাপোক্তভাবে বসবাস করবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। এই দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়লে তাদের কিছু যায় আসে না। বিত্তের জোরে বিশ্বের যে কোন উন্নত দেশে উন্নত জীবনযাপন করা তাঁদের জন্যে অসাধ্য নয়। কিন্তু আমরা যারা মাটি কামড়ে দেশে পড়ে থাকতে চাই, সন্তানদের যারা দেশ বা মাতৃভূমিকে মায়ের মতো ভালবাসার শিক্ষা দিয়েছি, কিংবা ঢাকায় যাওয়ারও যাদের গাড়ি ভাড়া নেই তাদের কি হবে? আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্যে কি ধরনের স্বদেশ রেখে যাবো আমরা। আমার পূর্ব প্রজন্মের কাছ থেকে তো এমন বিপজ্জনক স্বদেশ আমরা লাভ করিনি। তবে কেন এই ধ্বংসের দায়ভার নেবো আমরা। কেন এ দেশকে ধ্বংস করার, নিঃস্ব করার দৃশ্য অসহায়ের মতো দেখতে থাকবো আমরা। আমরা কি শুধু রাজনীতি করে করেই কাল কাটাবো নাকি তলে তলে, ধীরে ধীরে দেশকে যে ঝাঁঝড়া করে তোলা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত হবো। দেশটাতো আপনার আমার মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষের। আমরা কোটি কোটি সাধারণ মানুষের বিপক্ষে মাত্র কয়েক হাজার বা লাখের মতো দুর্বৃত্ত, তাদের ঠেকাতে পারবো না আমরা?

আমার প্রিয় কবি সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলি, “আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি, তুমি বাংলা ছাড়ো।” প্রিয় পাঠক, আমার লেখা যারা নিয়মিত পড়ে থাকেন, সন্দেহ নেই তাঁরা প্রায় সকলেই আমার মতো সাধারণ মানুষ। আসুন আমরা অধিকাংশ সাধারণ মানুষরা এই গুটি কয়েক অসাধারণ(!) মানুষদের অসাধারণ(!) কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। নির্ভরতার চাবি আজ নিজের হাতেই তুলে নিই। দুর্বৃত্তরা বাংলা ছাড়ণ্ডক।

শিল্পপতিদের শিল্প বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে আমার নদী। ধনবানরা ভরাট করছে আমার জলাশয়। দুর্বৃত্তরা লুটপাট করে গড়ে তুলছে অর্থের পাহাড়। আর আমরা সাধারণ মানুষ মাশুল দেবো সকল অপকর্মের? প্রিয় পাঠক আপনার বিবেক কি বলে? বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কবিতার একটি পংক্তি দিয়ে শেষ করছি লেখাটি, “..... যাহারা তোমার বিষায়েছে বায়ু/ নিভায়েছে তব আলো,/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ/ তুমি কি বেসেছো ভালো.....।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক
email:qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন, ২০১২

* প্রকৃত সার্বভৌম কে? সংসদ, আদালত নাকি জনগণ (শেষাংশ)

দৈনিক আজাদী                     উপসম্পাদকীয়                     কাল আজ কাল
১৪ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রিঃ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২৩ রজব ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

এই লেখার গত কিস্তি শুরু করেছিলাম বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রকৃতির মতো-মানুষের আচরণও চরমভাবাপন্ন হয়ে ওঠা নিয়ে। গত কিস্তির লেখা শেষ করার আগে আগে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দেখলাম এবং তারপরদিন পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদে জানলাম বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আবার সংসদ ও উচ্চ আদালত পরস্পরের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে গেছে প্রায়। বিষয়টি অনাকাঙিক্ষত, অনভিপ্রেত। সরকারের দুটি বিভাগ আইন ও বিচার বিভাগের এমন প্রায় মারমুখী অবস্থান গণতন্ত্র ও সুস্থ রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। গত ৫ জুন মঙ্গলবার সড়ক ভবনের জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি আবেদনের শুনানিকালে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংসদে দেয়া স্পিকার আবদুল হামিদের বক্তব্য আদালতের নজরে আনলে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন মানিক কিছু মন্তব্য করেন। প্রিয় পাঠক যাঁরা একটু আধটু সংসদ অধিবেশন দেখে থাকেন তাঁরা, কিংবা যাঁরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্পিকার আবদুল হামিদের বক্তব্য শুনে থাকবেন তাঁরা ধারণা করতে পেরেছেন নিশ্চয়ই, জীবন যাপন, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা, চালচলন ও রাজনৈতিক জীবনে স্পিকার আবদুল হামিদ সাহেব অত্যন্ত সাদামাটা, স্পষ্টবাদী ও হিউমারসম্পন্ন। তিনি সত্য কথা বলতে কিংবা নিজ দলের সংসদ সদস্যদের সমালোচনা করতেও ছাড়েন না। আমাদের বর্তমান ডেপুটি স্পিকার, শওকত আলী তিনিও একজন সজ্জন ভদ্র ও রাশভারী ধরনের মানুষ। এক কথায় বর্তমান স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে এক প্রকার বিতর্কহীন বলা যায়। অতি সম্প্রতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদে যা ঘটেছিল এ দুজনের একজনও সেদিন সংসদ পরিচালনায় থাকলে এমন ঘটনা ঘটতো না। তারপরেও অনভিপ্রেত এ ঘটনার সম্মানজনক একটি নিষ্পত্তি করেছেন স্পিকার আবদুল হামিদ, দুঃখ প্রকাশ ও আপত্তিকর শব্দ সংসদ কার্যবিবরণী থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ করার মাধ্যমে। এ কাজের মাধ্যমে মাননীয় স্পিকার ধন্যবাদার্হ হয়েছেন জাতির কাছে। এহেন একজন সম্মানীয় ব্যক্তির (স্পিকার) বিরুদ্ধে হাইকোর্টের বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন মানিক কী কী শব্দ ব্যবহার করেছেন তা জানার আগে আসুন জেনে নিই কীভাবে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। গত ২৯ মে সুপ্রিম কোর্টের জমি ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে দেয়া উচ্চ আদালতের একটি আদেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছিলেন আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ হলে জনগণ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে পারে। সে সাথে তিনি সংসদের কথাও বলেছিলেন যে, সংসদের বিরুদ্ধেও এমন ঘটতে পারে। এ বক্তব্যের সমালোচনা করে বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক যা যা বলেছেন, “তিনি (স্পিকার) জনগণকে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়েছেন যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল অপরাধ।” একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য হিসেবে বিচার বিভাগ সম্পর্কে অবমাননাকর (তাঁর ভাষায়) মন্তব্য করায় আইনজীবী হিসেবে স্পিকারের সনদ থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক। তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট ইজ নট কন্ট্রোলড বাই এনি মিনিস্টার অব অথরিটি।” তিনি আরও বলেন, “তিনি (স্পিকার) পুরোপুরি অসংসদীয় ভাষায় কথা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হয়ে তিনি কীভাবে এমন কথা বললেন।” সংবিধান নিয়ে স্পিকারের ‘জ্ঞান আছে কিনা’ তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।’ যিনি তাঁর পদের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন না তাঁর এ পদে থাকার কোন যোগ্যতাই নাই’ এমন মন্তব্য করেছেন মাননীয় বিচারপতি। এরপর স্পিকারের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করায় উক্ত বিচারপতির অপসারণের জন্য সময় বেঁধে দিয়ে মহাজোটের সাংসদরা বলেছেন, অন্যথায় সংসদই এই বিচারককে অভিশংসন করবে। এ সময় প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিনকে অপসারণে তিন দিন সময় দিয়ে বলেন, এর মধ্যে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে বিচারপতির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া না হলে সংবিধানে ১৯৭২ সালের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন করা হবে। (এটি করার মতো ক্ষমতা অবশ্য বর্তমান সংসদের আছে) এত বিস্তারিত লিখলাম একটি প্রশ্ন উত্থাপনের জন্যে যে, সংসদে স্পিকার যা বলেছিলেন তার প্রতিক্রিয়ার ভাষা কি এমন হওয়া উচিৎ ছিল? বাংলাদেশের জনগণ মাত্রই জানেন বর্তমান সরকারের সবকটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদে আছে প্রথমে বিদ্যুৎ এবং তারপরই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ বিভাগের অফিসটি নাকি সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ভূমিতে। দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানে ভবনটির অবস্থান থাকলেও অতি সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে সময় বেঁধে দিয়ে জায়গা খালি করার আদেশ দেয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এমন নাজুক অবস্থায় এবং গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল এই ভবনের স্থানান্তর সম্ভব নয় বলেই মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা এবং এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই স্পিকার আবদুল হামিদ মন্তব্য করেছিলেন এমন অবস্থা চললে খোদ জনগণই সংসদ ও আদালতের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠতে পারে। শুধু আমি নই যে কোন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলবেন এমন কথা বলে স্পিকার গর্হিত কোন কাজ করেননি, বা সংবিধান পরিপন্থী কোন কথা বলেননি। বরঞ্চ তিনি সংবিধানের মৌলিক দিকটি তুলে ধরেছেন বা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রিয় পাঠক, আমি গত কিস্তিতে লিখেছিলাম কীভাবে সংবিধানে জনগণকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে (যাতে) বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ।” অতএব রাষ্ট্রের যে কোন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার, অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করার অধিকার জনগণ সংরক্ষণ করে। সংবিধানই উল্লেখ করেছে “জনগণের অভিপ্রায়ের চরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয় তাহা হইলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে।” সে হিসেবে স্পিকার আবদুল হামিদ সেদিন যা বলেছেন তা সংবিধানের মূল স্পিরিটটি তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার প্রশ্ন সেখানে আসতেই পারে না। এখন সংবিধান বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন, যে কোন আদালতের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জনগণ প্রশ্ন তুললে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে নাকি তা সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি তথা স্পিকারের বক্তব্য প্রতিক্রিয়ায় একজন বিচারপতি যেসব ভাষা বা শব্দ উচ্চারণ করেছেন তা কি যৌক্তিক, শালীন ও ভদ্র? এ বিষয়ে স্পিকার একটি রুলিং দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। হয়ত লেখাটি প্রকাশ পাওয়ার পূর্বেও তা হয়ে যেতে পারে। স্পিকার কী রুলিং দেবেন আমরা জানি না তবে একটি সম্মানজনক ও সমঝোতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা রাখি। সরকারের দুটি বিভাগ আইন ও বিচার বিভাগ যখন একটি সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে ঠিক সে সময়ে অর্থাৎ গত ১০ জুন রোববার এক বিচারককে পিটিয়েছে পুলিশ। নরসিংদী জজ আদালতের মূল ফটকে একজন বিচারককে পুলিশ হেলমেট ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে এবং কিল ঘুষি মারে। ইদানীং পুলিশের আচরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে দেশে। বলা যায় পুলিশের ভাবমূর্তি এখন শূন্যের কোঠায় নয় রীতিমত ঋণাত্মক। আইন সভায় আইন প্রণয়ন হবে, সে আইনের ভিত্তিতে আদালত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন এবং তার ভিত্তিতে শাসন বিভাগ পরিচালিত হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রের এই তিন বিভাগের পরস্পরের বৈরী ও সংঘাতময় অবস্থানে আমরা জনগণ শংকিত ও উদ্বিগ্ন। এ অবস্থা নিরসনে সরকারেরই একটি বিরাট ভূমিকা আছে বলে আমরা মনে করি। সরকারের মন্ত্রী সাংসদদের আরও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ, সংযত কথাবার্তা ও দূরদর্শী চিন্তা করার আহবান জানাব আমরা। কঠিন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সরকার। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, কয়েকমাসের মধ্যে দুএকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী দল আন্দোলন সংগ্রাম আরও জোরদার করবে। নির্বাচনের আগে আগে দাতা গোষ্ঠীরা বিভিন্ন চাপে ফেলে সরকারকে দিয়ে জনবিরোধী কিছু কাজ করিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে এবং এমন পরিস্থিতিতে নিজ দলে, থাকা সুবিধাবাদী এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগ তথা সরকারের শুভাকাঙক্ষী সেজে দল বা সরকারেরই ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। সম্প্রতি দেশে যে সকল ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশই স্বাভাবিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। আমার জানা নেই এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের চিন্তা ভাবনা, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি কেমন ও কতটুকু। লেখাটি শেষ করবো বিতর্কটির যবনিকা টেনে। শাসন বিভাগ পরিচালিত হবে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। যে আইন প্রণয়ন করবেন আইন সভার সভ্যগণ (জাতীয় সংসদ)।

সে আইনের ধারা মোতাবেক বিচারকার্য পরিচালনা করবে বিচার বিভাগ তথা আদালত। একজন বিচারককে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে (অবশ্যই যুক্তিসংগত কারণে যা সংবিধানে উল্লেখ আছে) অপসারণের ব্যবস্থা আছে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদ চাইলে ১৯৭২ সালের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে সংসদ গায়ের জোরে গণ বিরোধী কোন বিল যা সংবিধানের মূল স্পিরিটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন কোন আইনও পাশ করতে পারেন ইচ্ছে করলে। অপরদিকে আদালতের কোন বিচারক সংসদ বা সংসদ সদস্যগণের সিদ্ধান্তের ওপর কোন প্রশ্ন করতে পারেন না। সংবিধানে তা বলা আছে। তার মানে সরকারের এই তিনটি বিভাগ স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজ নিজ ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্মপরিধি অনুযায়ী কাজ করবেন। অহেতুক এক বিভাগের ওপর অন্য বিভাগের হস্তক্ষেপ দ্বন্দ্ব-সংঘাতই বৃদ্ধি করবে শুধু। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে না নেমে সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের সার্বভৌমত্ব মেনে চলা উচিৎ। কারণ পূর্বেই বলেছি জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। তাই সরকারের প্রতিটি বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। জনগণের এই অধিকারকে সমুন্নত রাখতে অতীতে উচ্চ আদালতের প্রশংসনীয় ভূমিকা আমরা দেখেছি। আশা করি উচ্চ আদালত ভবিষ্যতেও তাঁদের এই ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন। আর সংসদ সদস্যগণ যখন জনগণ দ্বারাই নির্বাচিত হন এবং ৫ বছর পর পর জনতার কাছে ফিরে আসতে হয় তখন এক প্রকার জবাবদিহিতা তারাও করে থাকেন। কাজেই অন্য কোন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠান নয় জনগণই প্রকৃত সার্বভৌম সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক
email:qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal

বৃহস্পতিবার, ৭ জুন, ২০১২

* প্রকৃত সার্বভৌম কে? সংসদ, আদালত নাকি জনগণ -০১

দৈনিক আজাদী                                উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
৭ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ১৬ রজব ১৪৩৩ হিজরি


কামরুল হাসান বাদল

গত ৫ জুন ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে জলবায়ু পরিবর্তন, তার প্রভাব ও সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক লেখালেখি, বক্তৃতা বিবৃতি, সেমিনার সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু বা আবহাওয়ারও যে পরিবর্তন হয়েছে তা বেশ লক্ষ্যণীয়। ষড়ঋতু ও নাতিশীতোষ্ণ পরিমণ্ডলের বাংলাদেশের আবহাওয়া ক্রমেই চরমভাবাপন্ন হয়ে উরো মাঝে এক প্রকার অভব্যতা বিরাজ করছে। এটি মোটেই কাম্য নয়। তা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্যে ক্ষতিকারক তো বটে এবং তা একটি সভ্য জাতির আচরণ হিসেবেও পরিগণিত হতে পারে না। বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথিত একটি, বক্তব্যকে কেন্দ্র ঠছে। দশ দিনের শীত আর বিশ দিনের বৃষ্টি ছাড়া সারা বছরই কাটে প্রচণ্ড গরমের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায়। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের সাথে আরেকটি বিপর্যয়ও বুঝি জাতির জীবনে নেমে এসেছে তা হচ্ছে প্রকৃতির মতো আজকাল মানুষের আচার ব্যবহারও এক প্রকার চরম ভাবাপন্ন হয়ে ওঠা। বর্তমান সময়ের মতো আগে কখনো মনে হয় বাঙালি এতটা অসহিষ্ণু ছিল না। দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় থেকে সংসদ, শিক্ষিত জ্ঞানী থেকে সাধারণ খেটে যাওয়া মানুষ, সবার মাঝেই এক প্রকার অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা এবং কারো কাকরে জাতীয় সংসদে তিনজন সংসদ সদস্য যে ভাষায় কথা বলেছেন তা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিম অভিযোগ করেন টিআইবির এক অনুষ্ঠানে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের দেওয়া বক্তব্যে সংসদ ও সাংসদদের অবমাননা করা হয়েছে। এরপর সরকারি দলের সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু অধ্যাপক আবু সায়ীদের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁকে সংসদে তলব করার জন্য সাংসদদের কাছ থেকে নোটিস আহবান করেন। ঐ সময়ে স্পিকারের আসনে থাকা প্যানেল স্পিকার আলী আশরাফ বলেন অধ্যাপক আবু সায়ীদকে সংসদে এসে ক্ষমা চাইতে হবে। ও দিন সংসদের এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার ছিলেন না। তারপর গত সোমবার সংসদ ভবনের মনী হোস্টেলের আইপিডি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী বলেছেন, একটি পত্রিকা দেখে বিষয়টি ভালভাবে না জেনে তাঁর মতো (অধ্যাপক সায়ীদ) সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করা ঠিক হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, আমি দেখেছি একটি মাত্র পত্রিকায় তাঁর বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তাছাড়া উনি নিজেও বলেছেন সংসদ সদস্যদের অবমাননা করে তিনি কোন কথা বলেননি। সংসদতো এতো হালকা জায়গা নয় যে সবকিছুর প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, তাছাড়া তাও আবার সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে। আমি সংসদে থাকলে এ আলোচনা হতে দিতাম না। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিষয়টি এতদিনে জনমনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, প্রকৃতই তিনি সেদিন তেমন কোন বক্তব্য দেননি। দেশের একটি পত্রিকা, যেটি এদেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহযোগী, তেমন একটি পত্রিকার ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্যে এত বিশাল একটি ঘটনা ঘটলো তাতে ঐ পত্রিকার লাভ হলেও ক্ষতি হলো বাংলাদেশের, বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের। এ ঘটনার পরে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক সংযত ও জবাবদিহিমূলক সংবাদ পরিবেশনের দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে। এক সময়ের বিএনপি দলীয় সাংসদ, বর্তমানে বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিমের কাছে না হয় ঐ পত্রিকার সংবাদ প্রণিধানযোগ্য হতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদদের কাছেও কীভাবে ঐ একটি মাত্র পত্রিকার রিপোর্ট এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তা অনুধাবন করা কঠিন হয়ে উঠছে। ওদিন তিন সাংসদ যে ভাষায় কথা বলেছেন তা এক কথায় ভদ্রজনোচিত নয়। ইতিমধ্যে সংসদ বিবরণী থেকে এসব বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি উঠেছে। আমরা আশা করবো এ বিষয়ে সম্মানজনক একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবে সংসদ। তবে সেদিন তাঁদের সাংসদদের বক্তব্যের সাথে সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তাঁরা উত্থাপন করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন সংসদ সার্বভৌম, কেউ সংসদ বা সাংসদদের সমালোচনা করে কিছু বললে তা সংসদ অবমাননার শামিল হবে। টেলিভিশনে দেখলাম হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণের জন্যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়ে- ২ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। অবশ্য তার আগে স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে দেয়া হাইকোর্টের একজন বিচারপতির বক্তব্যে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত কয়েক মাস থেকে বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কিছু বিষয়ে উচ্চ আদালতের অতি সক্রিয়তা বা স্বপ্রণোদিত হয়ে ভূমিকা রাখা ও অন্যান্য কারণে জাতীয় সংসদের সাথে উচ্চ আদালতের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। মঙ্গলবারের ঘটনায় মনে হচ্ছে প্রতিষ্ঠান দুটি এবার বুঝি মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বিগত কিছুদিন থেকে চলে আসা এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জেগেছে আসলে সার্বভৌম কারা? জাতীয় সংসদ নাকি সর্বোচ্চ আদালত। কে কার অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে? আসলে কি সংবিধানে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের এমন ক্ষমতা বা স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে যে, কেউ তাদের কাজের সমালোচনা করতে পারবে না, করলে তা সংসদ অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে? চলুন দেখি সংবিধান কী বলে। সংবিধানের প্রস্তাবনা : “আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া (জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের) মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”... “আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।” প্রথমভাগ, ৭ (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল ওই সাংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্ব কার্যকর হইবে। (২) জনগণের অভিপ্রায়ের চরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি ওই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয় তাহা হইলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে।” এবার দেখুন সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি নিয়ে সংবিধানে কী বলা আছে। ৭৮ (১) সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। (২) সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃংখলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে তিনি সকল ক্ষমতা প্রয়োগ সম্পর্কিত কোন ব্যাপারে কোন আদালতের এখতিয়ারের অধিন হইবেন না। (৩) সংসদে বা সংসদের কোন কমিটিতে কিছু বলা বা ভোটদানের জন্য কোন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোন আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৪) সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোন রিপোর্ট। কাগজপত্র ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৫) এই অনুচ্ছেদ সাপেক্ষে সংসদের আইন দ্বারা সংসদের, সংসদের কমিটি সমূহের এবং সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার নির্ধারণ করা যাইতে পারে।” প্রিয় পাঠক এর বাইরে আর কোন অনুচ্ছেদ দ্বারা এমন কথা হয়নি যে, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলন, অন্যায়, দুর্নীতি বা এমন বিষয়ে জনগণ কোন প্রশ্ন করতে পারবে না। উচ্চ আদালত যদি সংবিধানের অভিভাবক হয়। আর সে আদালতের বিচারপতিগণ যদি দলীয় সরকারের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন এবং বিচারপতিদের অপসারণ করার অধিকার যদি সংসদ সংরক্ষণ করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে তবে প্রশ্ন ওঠে প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌম কে? আমরা সংবিধানের প্রস্তাবনায় দেখলাম বাংলাদেশের জনগণই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছে। ৭ (১) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধিন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। অতএব খুব বেশি তর্কে না গিয়ে বলা যায় সংসদ বা উচ্চ আদালত নয় জনগণই সার্বভৌম ও সকল ক্ষমতার মালিক। অতএব রাষ্ট্রের যে কোন বিভাগ, (আইন, বিচার ও শাসন) ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন করার, জানার অধিকার জনগণের আছে। এবং তারপক্ষ হয়ে এ প্রশ্ন যে কেউ করার অধিকার রাখেন। অধ্যাপক আবু সায়ীদ বলেছেন তিনি মন্ত্রী বা সাংসদদের নিয়ে কিছু বলেন নি। আমরা মনেকরি তিনি কিছু বললেও তাঁকে সংসদে ডেকে বা তলব করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে পারে না জাতীয় সংসদ। এমনকি আদালতের বিষয়েও জনগণ প্রশ্ন রাখার অধিকার রাখে। কারণ দেশের কোন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানই আইন বা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। জনগণ যেহেতু সকল কিছুর মালিক অতএব সাদামাটা কথায় মালিকের অধিকার থাকে কোথায় কী ঘটছে তা জানার। দেখার ও অনিয়ম দেখলে বিচার করার। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশে একটি আইন সভা থাকে সেখানে আইন প্রণয়নের জন্য জনগণ যাদের নির্বাচিত করে পাঠান তাঁদের বলা হয় আইন সভার সভ্য। বাংলাদেশে সে আইন সভার নাম জাতীয় সংসদ আর তার সভ্যদের বলা হয় জাতীয় সংসদ সদস্য। তাঁরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত এবং জনগণের নিকট দায়বদ্ধ। অতএব তাঁদের যে কোন ভাল বা খারাপ কাজের প্রশংসা কিংবা সমালোচনা বা নিন্দা জানানোর অধিকারও জনগণ সংরক্ষণ করেন। তাঁরা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে নন। কাজেই তাঁদের দুর্নীতিবাজ বললেই রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সংসদ অবমাননার অভিযোগ তোলা যুক্তি সংগত নয়। আমি খুশি হতাম যদি অধ্যাপক আবু সায়ীদ এর প্রতি এমন বিষোদগার না করে কোন একজন সাংসদ যদি দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বলতেন আমি অমুক, অধ্যাপক সায়ীদ সাহেবের বক্তব্যে আমার মানহানি হয়েছে। আমার সারাজীবনে আমি কোথায় এক টাকার অনিয়ম বা দুর্নীতি করেছি তা প্রমাণ করা হোক। ৩০০ জন সাংসদের মধ্যে এমন সাহসী কেউ নেই? ছিলেন না সেদিন? রাজনীতি করতে গেলে প্রশংসা স্তুতির সাথে নিন্দার দায়ও নিতে হয়। এমন উন্নাসিক আচরণ অন্তত জাতীয় সংসদ থেকে আশা করা যায় না। জয়নাল আবদিন ফারুক (যিনি এর প্রতিবাদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধ্যাপক আবু সায়ীদের নামটিও মনে করে বলতে পারছিলেন না) আর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বলার ভাষা এক হতে পারে না। এই মাত্রাজ্ঞানটুকু আমাদের মাননীয় সাংসদদের নেই তা ভাবতেও কষ্ট হয়। এভাবে প্রতিদিন বিভিন্নভাবে বিভিন্নজনকে বিপক্ষে ঠেলে দিয়ে আওয়ামী লীগ কার্যত কী অর্জন করতে চায় তা আমার মাথায় ঢুকছে না। (আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক
ইমেইলঃ qbadal@yahoo.com
Qumrul Hassan Badal

পোস্টসমূহ