দৈনিক আজাদী উপ-সম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল
২৮ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৪ আষাঢ় ১৪১৯ সাল ৭ শাবান ১৪৩৩ হিজরি
২৮ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৪ আষাঢ় ১৪১৯ সাল ৭ শাবান ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
মিয়ানমারের
আরাকান রাজ্যের জাতিগত দাঙ্গার কারণে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না
দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ তার অবস্থান পাল্টাবে না বলে জানিয়ে দেয়ার পরে
দেশের কিছু সংবাপত্র, বেসরকারি টেলিভিশন, রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীরা চরম
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে ’৭১
সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের ভারতে আশ্রয় নেয়ার পরিস্থিতির
সাথে তুলনা করে সরকারের এই আচরণকে অমানবিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই বিষয়ে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থার
চাপ (বর্তমানে তাদের অবস্থান পাল্টিয়েছে) আর বাংলাদেশের কিছুশ্রেণীর
মানুষের, বিশেষ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিভিন্নভাবে
জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত ও কিছু বুদ্ধিজীবীর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখে বিশ্ব
বিখ্যাত আরব কবি কাহলিল জিবরানের একটি গল্পের কথা মনে পড়লো। গল্পটা
সংক্ষেপে এ রকম, সারাদিন ঘোড়া ছুটিয়ে সন্ধ্যায় পথের পাশের এক সরাইখানায়
আশ্রয় নিল এক ব্যক্তি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আঁগে সরাইখানার পাশে একটি
খুঁটিতে ঘোড়াটি বেঁধে রাখলো সে। ভোরে ঘুম ভেঙ্গে লোকটি বাইরে এসে দেখলো
তার ঘোড়াটি চুরি হয়ে গেছে। প্রিয় ঘোড়া হারিয়ে লোকটি পথের উপরেই বিলাপ
করতে লাগলো। সে সময় ও পথ দিয়ে যারা যাচ্ছিল তারা লোকটির কাছে তার কান্নার
কারণ জানতে চাইলে লোকটি তার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আবার কাঁদতে থাকে। ঘটনা
শুনে পথিক দলগুলোর বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে লোকটির বোকামির জন্যে তাকে
ভর্ৎসনা করছিলো। কেউ বললো আরে তুমিতো আস্তা বোকা, তোমার ঘোড়া চুরি হবে না
তো কার হবে। বাইরে ঘোড়া বেঁধে কি কেউ ভিতরে গিয়ে ঘুমায়। কেউ কেউ বললো,
ঘুমিয়েছো ভাল কথা, রাতে দু’একবার এসে দেখে যাবে না। কেউ আবার বললো তোমারতো
ঘোড়ার সাথেই ঘুমানো উচিৎ ছিল। এভাবে ওপথে যারা যাচ্ছিল তাদের সবাই ঘটনার
বর্ণনা শুনে লোকটিকে একপ্রকার গালাগাল করে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতির এক
পর্যায়ে লোকটি সমবেত মানুষগুলোর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে উঠলো, চুপ করো
তোমরা, আমাকে আর একটিও গালি দিতে পারবে না। সেই ভোর থেকে তোমরা সবাই শুধু
আমাকেই গালি দিয়ে গেলে, কিন্তু যে আমার ঘোড়াটি চুরি করলো তার ব্যাপারে
তোমরা একটি কথাও বললে না।
মিয়ানমারের
সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওপর দেশ-বিদেশের চাপ প্রয়োগের অবস্থা দেখে
আমার সেই বিখ্যাত গল্পটির কথা মনে পড়লো। জাতিগত দাঙ্গা দমন ও রোহিঙ্গাদের
পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ মিয়ানমার সরকারকে কিছু না বলে বা কোন প্রকার
আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি না করে বারবার বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
শুধু অনুরোধ নয় একপ্রকার চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে এদেশে রোহিঙ্গাদের আবার
আশ্রয় দিতে ও পুনর্বাসন করতে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক
কর্মকর্তাতো ৭১ এর ইতিহাসই শুধু তুলে ধরনেনি (বরং) সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে
মায়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্ষমতা বহির্ভূতভাবে পরিদর্শনে গেছেন। শেষ
পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয়ে তাঁর গতিবিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন। আমি
বিস্মিত হয়েছি আমাদের বর্ষিয়ান সাংবাদিক, কলামিস্ট এ.বি.এম মুসার একটি
বক্তব্যে। একটি টিভি চ্যানেলে উপস্থাপকের উস্কানিতে জনাব মুসা বললেন
জাতিসংঘের কর্মকর্তার ওপর সরকারি বিধিনিষেধে তিনি অবাক হয়েছেন, কারণ
বিশ্বে এমন কোন নজির নেই। হায় মুসা ভাই তিনি এত সহজে ভুলে গেলেন
সাম্প্রতিক সিরিয়ার কথা, ইরান, ইরাক, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়র কথা। এসব
দেশে জাতিসংঘের কর্মকর্তা নয় প্রতিনিধিদেরকে কেমন নাকানি-চুবানি খাওয়ানো
হয়েছিল। মুসাভাই, রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাংলাদেশের কোন ভূমিকা নেই,
ঘটনাটি সম্পূর্ণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। রোহিঙ্গাদের এই পরিস্থিতির
জন্য বাংলাদেশ কোনক্রমেই দায়ি নয়। কিন্তু এর দায়ভার যখন বাংলাদেশের
কাঁধে চাপাতে চান জাতিসংঘের কর্মকর্তা তার জন্যে আপনার খারাপ লাগে, তবে
দয়া করে জাতিসংঘের এই কর্মকর্তাকে একবার জিজ্ঞাসা করতে পারেন? ফেলানীর লাশ
যখন কাঁটা তারের বেড়ায় পুরো একদিন ঝুলছিল তখন জাতিসংঘের এই কর্মকর্তাগণ
ক’বার গিয়েছিলেন সীমান্ত পরিদর্শনে। বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন
নিশ্চুপ ছিল কেন? বাংলাদেশই কি শুধু মানবতা দেখিয়ে যাবে? যে মানবতা
বাংলাদেশ বহু পূর্বে দেখিয়েছিল তার প্রতিদানে বাংলাদেশ কী পেয়েছে? যুগের
পর যুগ লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের পালতে হচ্ছে বাংলাদেশে। যারা আজ
টেকনাফ-উখিয়া, কক্সবাজারের মতো বিস্তির্ণ এলাকায় বিভিন্ন অসামাজিক
কর্মকাণ্ড মাদক ব্যবসা থেকে অস্ত্র ব্যবসা আর জঙ্গিবাদের মদদ ও সহায়তা
দিয়েছে, তাদের সে অপকর্মের দায় জাতিসংঘের কোন সংস্থা নেবে? তার মানে
কয়েক বছর পরপর মিয়ানমারে এরূপ জাতিগত দাঙ্গা হতে থাকবে আর বাংলাদেশ তার
সীমান্ত খুলে দিয়ে ওদের ‘আহলান-সাহলান’ জানাবে, যে রূপ বিএনপির শাসনকালে
জানানো হয়েছিল? একদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বতীপুরের
পাকিস্তানি শরণার্থী (জেনেভা ক্যাম্প বলে পরিচিতি, যেখানে পাকিস্তানে ফিরে
যেতে ইচ্ছুক অবাঙালিদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে) আর জিয়ার আমলে পার্বত্য
চট্টগ্রামে সেটেলারদের (যুগের পর যুগ গুচ্ছগ্রামের নামে সরকারি খরচে যাদের
চালানো হয়েছে) প্রতিপালনেইতো গরীব এদেশের নাভিশ্বাস ওঠার কথা। স্বাধীনতার
একচল্লিশ বছর পরেওতো জাতিসংঘ পাকিস্তানকে রাজি করাতে পারেনি তার আটকে পড়া
নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে। যেভাবে পারেনি লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা তথা মিয়ানমারের
নাগরিকদের সে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। অবশ্য এ ধরণের পরিস্থিতি
বজায় থাকলে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদেরও করে টরে খাওয়ার সুযোগ থাকে।
সরকারের
বর্তমান অবস্থানের সমালোচকরা যারা বলছেন শরণার্থীদের ফেরত পাঠিয়ে
বাংলাদেশ অমানবিক কাজ করেছে বা বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভুল বার্তা
দেয়া হয়েছে তারা কি জানেন পুশ-ব্যাকের নামে যে সমস্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত
পাঠানো হয়েছিল তাদের অধিকাংশই আর আরাকানে ফিরে যায়নি। তারা বিভিন্ন ভাবে,
বিভিন্ন পথে পুনরায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এ তথ্য আমার নয়। স্থানীয়
অধিবাসীদের বরাত দিয়ে চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় দৈনিক দাবি করেছে ভাষা,
আত্মীয়তা, ব্যবসা ও অন্যান্য কারণে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের খাতিরে
স্থানীয়দের অনেকেই এদের আশ্রয় দিয়েছে। এবং ইতিমধ্যেই তারা মূল জনস্রোতের
সাথে মিশে গিয়েছে।
অসহায়
রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের প্রতি আমার যে, মমত্ববোধ নেই, আমার হৃদয়েও যে
ব্যথা লাগেনি তা কিন্তু নয়। তবে আমি বলতে চাই কয়েকবছর পর পর এ অবস্থা
চললে এবং প্রত্যেকবার বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে আগামী
কয়েক বছরের মাধ্য রাখাইন প্রদেশ রোহিঙ্গা শূন্য করে ফেলবে মিয়ানমার
সরকার। বরঞ্চ দীর্ঘ বছর পরে যখন মিয়ানমারে গণতন্ত্রের হাওয়া লেগেছে,
নোবেল শান্তি বিজয়ী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচি যখন সে দেশের
পার্লামেন্টে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছেন তখন এই সমস্যার প্রতি বিশ্বজনমত
তৈরি করতে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের কঠোর
অবস্থানই মিয়ানমারের ওপর বিশ্ব জনমতের চাপ প্রয়োগে সহায়ক হবে।
রোহিঙ্গাদের
সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ড নির্দয় আচরণ করেনি।
বরং খাবার দাবার ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করে তাদের পুশব্যাক করার চেষ্টা
করেছে। এ ধরনের দু’জন আহত রোহিঙ্গার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। যদিও তাদের বাঁচানো যায়নি। আর বিজিবি
ও কোস্টগার্ড খুব বেশি নিষ্ঠুর আচরণ করলে এত এত রোহিঙ্গা আবার বাংলাদেশের
অভ্যন্তরে ঢুকে যেতে পারতো না। ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে বসে
কিংবা পত্রিকায় কলাম লিখে বাস্তবতাহীন কথাবার্তা বলা ও লেখা যায় বটে। তবে
তারা যদি টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজারের আদি বাঙালিদের সাথে কথাবার্তা বলতেন
বা তাদের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করতেন তাহলে হয়ত তাদের বক্তব্যের
অন্তসারশূন্যতা তারা বুঝতে পারতেন। মাসখানেক থেকে চট্টগ্রাম শহরের বাসা
বাড়িগুলোতে কাজের লোকের নামে অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিচ্ছে। এবং তাদের এ
কাজে লাগাতে ইতিমধ্যেই একটি দালাল শ্রেণীও তৈরি হয়েছে। যারা কয়েক হাজার
টাকার বিনিময়ে এদের বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে সরবরাহ করছে।
এরা কি আর কখনো মিয়ানমারে ফিরে যাবে?
মধ্যপ্রাচ্যে
বিশেষ করে সৌদি আরবে বাংলাদেশি পাশপোর্ট নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা আছে যারা
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত থাকে। তাদের পাশপোর্ট বাংলাদেশি
বলে সে দেশের আইনশৃংখলা বাহিনী ও মিডিয়ার কাছে বাঙালি মাত্রই অপরাধী বলে
চিহ্নিত হয প্রায় সময়ই। সেদিনের টক শো’তে উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী ও
এবিএম মুসা দুজনেই বলছিলেন এদের পাশপোর্ট দেয় কে? আমি খুব অবাক হলাম
দুজনের কথা শুনে। মুসা ভাই কি জানেন না যারা রোহিঙ্গাদের একদিন
আহলান-সাহলান বলে গ্রহণ করে নিয়েছিল, বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শক্তির জন্যে
ওরা ব্যবহৃত হয়, জঙ্গি তৎপরতা চালাতে যারা এদের কাছ থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ
সংগ্রহ করে, নির্বাচন এলে রোহিঙ্গারা যাদের জন্যে কাজ করে এবং রোহিঙ্গাদের
আশ্রয় দেয়ার জন্যে যারা ওসব এলাকায় অপতৎপরতা চালায় তারাই বা তাদের
সহায়ক সরকারি কর্মকর্তারাই ওদের পাশপোর্টের ব্যবস্থা করে দেয়। এসব তথ্য
তো মুসা ভাইয়ের মত একজন প্রবীণ সাংবাদিকের অজানা থাকার কথা নয়।
আমি
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে সংসদে দেয়া আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির
বক্তব্য শুনেছি। আমি মনে করি এ ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত তথা মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থান ভবিষ্যতে এমন ঘটনার
পুনরাবৃত্তি রোধে জোরালো ভূমিকা রাখবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আগে ওসব
অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন