দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৪ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রিঃ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২৩ রজব ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
১৪ জুন বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রিঃ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২৩ রজব ১৪৩৩ হিজরি
এই লেখার গত কিস্তি শুরু করেছিলাম বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রকৃতির মতো-মানুষের আচরণও চরমভাবাপন্ন হয়ে ওঠা নিয়ে। গত কিস্তির লেখা শেষ করার আগে আগে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দেখলাম এবং তারপরদিন পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদে জানলাম বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আবার সংসদ ও উচ্চ আদালত পরস্পরের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে গেছে প্রায়। বিষয়টি অনাকাঙিক্ষত, অনভিপ্রেত। সরকারের দুটি বিভাগ আইন ও বিচার বিভাগের এমন প্রায় মারমুখী অবস্থান গণতন্ত্র ও সুস্থ রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। গত ৫ জুন মঙ্গলবার সড়ক ভবনের জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি আবেদনের শুনানিকালে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংসদে দেয়া স্পিকার আবদুল হামিদের বক্তব্য আদালতের নজরে আনলে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন মানিক কিছু মন্তব্য করেন। প্রিয় পাঠক যাঁরা একটু আধটু সংসদ অধিবেশন দেখে থাকেন তাঁরা, কিংবা যাঁরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্পিকার আবদুল হামিদের বক্তব্য শুনে থাকবেন তাঁরা ধারণা করতে পেরেছেন নিশ্চয়ই, জীবন যাপন, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা, চালচলন ও রাজনৈতিক জীবনে স্পিকার আবদুল হামিদ সাহেব অত্যন্ত সাদামাটা, স্পষ্টবাদী ও হিউমারসম্পন্ন। তিনি সত্য কথা বলতে কিংবা নিজ দলের সংসদ সদস্যদের সমালোচনা করতেও ছাড়েন না। আমাদের বর্তমান ডেপুটি স্পিকার, শওকত আলী তিনিও একজন সজ্জন ভদ্র ও রাশভারী ধরনের মানুষ। এক কথায় বর্তমান স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে এক প্রকার বিতর্কহীন বলা যায়। অতি সম্প্রতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে সংসদে যা ঘটেছিল এ দুজনের একজনও সেদিন সংসদ পরিচালনায় থাকলে এমন ঘটনা ঘটতো না। তারপরেও অনভিপ্রেত এ ঘটনার সম্মানজনক একটি নিষ্পত্তি করেছেন স্পিকার আবদুল হামিদ, দুঃখ প্রকাশ ও আপত্তিকর শব্দ সংসদ কার্যবিবরণী থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ করার মাধ্যমে। এ কাজের মাধ্যমে মাননীয় স্পিকার ধন্যবাদার্হ হয়েছেন জাতির কাছে। এহেন একজন সম্মানীয় ব্যক্তির (স্পিকার) বিরুদ্ধে হাইকোর্টের বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন মানিক কী কী শব্দ ব্যবহার করেছেন তা জানার আগে আসুন জেনে নিই কীভাবে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। গত ২৯ মে সুপ্রিম কোর্টের জমি ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে দেয়া উচ্চ আদালতের একটি আদেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছিলেন আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ হলে জনগণ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে পারে। সে সাথে তিনি সংসদের কথাও বলেছিলেন যে, সংসদের বিরুদ্ধেও এমন ঘটতে পারে। এ বক্তব্যের সমালোচনা করে বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক যা যা বলেছেন, “তিনি (স্পিকার) জনগণকে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়েছেন যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল অপরাধ।” একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য হিসেবে বিচার বিভাগ সম্পর্কে অবমাননাকর (তাঁর ভাষায়) মন্তব্য করায় আইনজীবী হিসেবে স্পিকারের সনদ থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক। তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট ইজ নট কন্ট্রোলড বাই এনি মিনিস্টার অব অথরিটি।” তিনি আরও বলেন, “তিনি (স্পিকার) পুরোপুরি অসংসদীয় ভাষায় কথা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হয়ে তিনি কীভাবে এমন কথা বললেন।” সংবিধান নিয়ে স্পিকারের ‘জ্ঞান আছে কিনা’ তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।’ যিনি তাঁর পদের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন না তাঁর এ পদে থাকার কোন যোগ্যতাই নাই’ এমন মন্তব্য করেছেন মাননীয় বিচারপতি। এরপর স্পিকারের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করায় উক্ত বিচারপতির অপসারণের জন্য সময় বেঁধে দিয়ে মহাজোটের সাংসদরা বলেছেন, অন্যথায় সংসদই এই বিচারককে অভিশংসন করবে। এ সময় প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিনকে অপসারণে তিন দিন সময় দিয়ে বলেন, এর মধ্যে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে বিচারপতির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া না হলে সংবিধানে ১৯৭২ সালের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন করা হবে। (এটি করার মতো ক্ষমতা অবশ্য বর্তমান সংসদের আছে) এত বিস্তারিত লিখলাম একটি প্রশ্ন উত্থাপনের জন্যে যে, সংসদে স্পিকার যা বলেছিলেন তার প্রতিক্রিয়ার ভাষা কি এমন হওয়া উচিৎ ছিল? বাংলাদেশের জনগণ মাত্রই জানেন বর্তমান সরকারের সবকটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদে আছে প্রথমে বিদ্যুৎ এবং তারপরই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ বিভাগের অফিসটি নাকি সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ভূমিতে। দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানে ভবনটির অবস্থান থাকলেও অতি সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে সময় বেঁধে দিয়ে জায়গা খালি করার আদেশ দেয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এমন নাজুক অবস্থায় এবং গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল এই ভবনের স্থানান্তর সম্ভব নয় বলেই মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা এবং এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই স্পিকার আবদুল হামিদ মন্তব্য করেছিলেন এমন অবস্থা চললে খোদ জনগণই সংসদ ও আদালতের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠতে পারে। শুধু আমি নই যে কোন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলবেন এমন কথা বলে স্পিকার গর্হিত কোন কাজ করেননি, বা সংবিধান পরিপন্থী কোন কথা বলেননি। বরঞ্চ তিনি সংবিধানের মৌলিক দিকটি তুলে ধরেছেন বা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রিয় পাঠক, আমি গত কিস্তিতে লিখেছিলাম কীভাবে সংবিধানে জনগণকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে (যাতে) বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ।” অতএব রাষ্ট্রের যে কোন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার, অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করার অধিকার জনগণ সংরক্ষণ করে। সংবিধানই উল্লেখ করেছে “জনগণের অভিপ্রায়ের চরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয় তাহা হইলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে।” সে হিসেবে স্পিকার আবদুল হামিদ সেদিন যা বলেছেন তা সংবিধানের মূল স্পিরিটটি তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার প্রশ্ন সেখানে আসতেই পারে না। এখন সংবিধান বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন, যে কোন আদালতের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জনগণ প্রশ্ন তুললে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে নাকি তা সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি তথা স্পিকারের বক্তব্য প্রতিক্রিয়ায় একজন বিচারপতি যেসব ভাষা বা শব্দ উচ্চারণ করেছেন তা কি যৌক্তিক, শালীন ও ভদ্র? এ বিষয়ে স্পিকার একটি রুলিং দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। হয়ত লেখাটি প্রকাশ পাওয়ার পূর্বেও তা হয়ে যেতে পারে। স্পিকার কী রুলিং দেবেন আমরা জানি না তবে একটি সম্মানজনক ও সমঝোতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা রাখি। সরকারের দুটি বিভাগ আইন ও বিচার বিভাগ যখন একটি সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে ঠিক সে সময়ে অর্থাৎ গত ১০ জুন রোববার এক বিচারককে পিটিয়েছে পুলিশ। নরসিংদী জজ আদালতের মূল ফটকে একজন বিচারককে পুলিশ হেলমেট ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে এবং কিল ঘুষি মারে। ইদানীং পুলিশের আচরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে দেশে। বলা যায় পুলিশের ভাবমূর্তি এখন শূন্যের কোঠায় নয় রীতিমত ঋণাত্মক। আইন সভায় আইন প্রণয়ন হবে, সে আইনের ভিত্তিতে আদালত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন এবং তার ভিত্তিতে শাসন বিভাগ পরিচালিত হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রের এই তিন বিভাগের পরস্পরের বৈরী ও সংঘাতময় অবস্থানে আমরা জনগণ শংকিত ও উদ্বিগ্ন। এ অবস্থা নিরসনে সরকারেরই একটি বিরাট ভূমিকা আছে বলে আমরা মনে করি। সরকারের মন্ত্রী সাংসদদের আরও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ, সংযত কথাবার্তা ও দূরদর্শী চিন্তা করার আহবান জানাব আমরা। কঠিন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সরকার। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, কয়েকমাসের মধ্যে দুএকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী দল আন্দোলন সংগ্রাম আরও জোরদার করবে। নির্বাচনের আগে আগে দাতা গোষ্ঠীরা বিভিন্ন চাপে ফেলে সরকারকে দিয়ে জনবিরোধী কিছু কাজ করিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে এবং এমন পরিস্থিতিতে নিজ দলে, থাকা সুবিধাবাদী এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগ তথা সরকারের শুভাকাঙক্ষী সেজে দল বা সরকারেরই ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। সম্প্রতি দেশে যে সকল ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশই স্বাভাবিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। আমার জানা নেই এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের চিন্তা ভাবনা, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি কেমন ও কতটুকু। লেখাটি শেষ করবো বিতর্কটির যবনিকা টেনে। শাসন বিভাগ পরিচালিত হবে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। যে আইন প্রণয়ন করবেন আইন সভার সভ্যগণ (জাতীয় সংসদ)।
সে আইনের ধারা মোতাবেক বিচারকার্য পরিচালনা করবে বিচার বিভাগ তথা আদালত। একজন বিচারককে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে (অবশ্যই যুক্তিসংগত কারণে যা সংবিধানে উল্লেখ আছে) অপসারণের ব্যবস্থা আছে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদ চাইলে ১৯৭২ সালের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে সংসদ গায়ের জোরে গণ বিরোধী কোন বিল যা সংবিধানের মূল স্পিরিটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন কোন আইনও পাশ করতে পারেন ইচ্ছে করলে। অপরদিকে আদালতের কোন বিচারক সংসদ বা সংসদ সদস্যগণের সিদ্ধান্তের ওপর কোন প্রশ্ন করতে পারেন না। সংবিধানে তা বলা আছে। তার মানে সরকারের এই তিনটি বিভাগ স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজ নিজ ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্মপরিধি অনুযায়ী কাজ করবেন। অহেতুক এক বিভাগের ওপর অন্য বিভাগের হস্তক্ষেপ দ্বন্দ্ব-সংঘাতই বৃদ্ধি করবে শুধু। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে না নেমে সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের সার্বভৌমত্ব মেনে চলা উচিৎ। কারণ পূর্বেই বলেছি জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। তাই সরকারের প্রতিটি বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। জনগণের এই অধিকারকে সমুন্নত রাখতে অতীতে উচ্চ আদালতের প্রশংসনীয় ভূমিকা আমরা দেখেছি। আশা করি উচ্চ আদালত ভবিষ্যতেও তাঁদের এই ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন। আর সংসদ সদস্যগণ যখন জনগণ দ্বারাই নির্বাচিত হন এবং ৫ বছর পর পর জনতার কাছে ফিরে আসতে হয় তখন এক প্রকার জবাবদিহিতা তারাও করে থাকেন। কাজেই অন্য কোন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠান নয় জনগণই প্রকৃত সার্বভৌম সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন