পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

'নির্বাচনই কি সংকটের মূল কারণ'


১৯ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৫ পৌষ ১৪২০ সাল ১৫ সফর ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ একটি প্রণিধানযোগ্য প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এলেন। এতদিন এ বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক পদে থাকা এবং আসন্ন নির্বাচনের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তির এই বক্তব্য বেশ আলোচনার সূত্রপাত ঘটাবে সন্দেহ নেই। গত মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়। তিনি বলেন, আপনারা(সাংবাদিকরা) নিজেরাই বিগত অনেকদিন থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। এই নৈরাজ্য অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। বলাবাহুল্য বর্তমান পরিস্থিতির দায় নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে বলে বিএনপি ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করলেন সিইসি। বর্তমানে সারাদেশে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা কি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুধু? একটু অতীতে, একটু গভীরে গেলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

১। বিএনপি কি প্রকৃতই নির্বাচনে যেতে আগ্রহী? তাদের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কোনো সুযোগ নেই। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের পরে সংসদ মনে করেছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আর প্রয়োজন নেই- কাজেই সংসদে তা রহিত করা হয়েছে অর্থাৎ এই ব্যবস্থা বাদ দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছে। সংবিধানে সংশোধনী আনতে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়। বর্তমান সরকারের তা ছিল বলে তারা সহজেই সংবিধান সংশোধন করতে পেরেছে। সংবিধান যারা সংশোধন করেছেন তারা সবাই একটি স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনের দ্বারা নির্বাচিত। যে নির্বাচন দেশে-বিদেশে সর্বমহল দ্বারা স্বীকৃত ও প্রশংসিত। তারা-দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। কাজেই তাদের সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত বলেই মেনে নিতে হবে। সংবিধানের কোথাও লেখা নেই সংশোধন সর্বসম্মতিক্রমে হতে হবে কিংবা গণভোট দিতে হবে।

২। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে বিএনপি প্রথম থেকে অসহযোগিতার মনোভাব নিয়েছে। এ বিষয়ে গঠিত কমিটিকে বিএনপি কোনো প্রকার সহযোগিতা করেনি। তাদের কোনো প্রকার প্রস্তাবও পেশ করেনি। অন্যদিকে নির্বাচন পরিচালনার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন গঠনেও তারা সহযোগিতা করেনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের আহবানেও তারা সাড়া দেয়নি। সার্চ কমিটিতে কোনো নামও জমা দেয়নি তারা। অর্থাৎ নির্বাচনকালীন একটা জট তৈরি পরিকল্পনা তারা আগে থেকেই নিয়ে রেখে ছিল। শেষমেশ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি প্রস্তাব এনেও পরে তারা তা ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন মহল থেকে তাদের দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হবে তা উপস্থাপনের দাবি জানান হলেও তারা তা করেনি। শেষে শেখ হাসিনা নিজে থেকে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়ে সে সরকারের বিএনপিকে অংশগ্রহণের আহবান জানালে বেগম খালেদা জিয়া তড়িঘড়ি করে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি ফর্মূলা পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ৫ জন করে নিয়ে দশ জনের একটি উপদেষ্টা পরিষদ ও নিরপেক্ষ একজনকে সরকার প্রধান নির্বাচিত করা। তার এই প্রস্তাব বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিল। কারণ অদূরদর্শী, হোমওয়ার্কবিহীন এই প্রস্তাব অন্তসার শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কারণ ১৩ ও ১৭ বছর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেকেই মৃত এবং বাকিদের মধ্যে অধিকাংশই শারীরিক ও মানসিকভাবে এমন গুরুদায়িত্ব বহনে অক্ষম। বেগম জিয়ার এই সংবাদ সম্মেলনের পর জানা গেছে তাঁর এ ধরনের প্রস্তাবের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির অনেকেই অব্যহিত ছিলেন না। তার মানে বিএনপি এখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে অনড় থাকলেও তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য বা প্রস্তাব এখনো নেই।

৩। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা হোক বা সর্বদলীয় সরকারই হোক মূল সমস্যাটি হলো সরকার প্রধান কে হবেন তাই নিয়ে। বিএনপির দাবি মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করে তাহলে সে সরকারের প্রধান কে হবেন? এই প্রশ্নটি চিরকালীন অমিমাংসিত। একটি সময়ে মনে করা হয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি বুঝি নিরপেক্ষ হন। কিন্তু ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান ও ২০০৬ সালে বিএনপির পছন্দনীয় প্রধান বিচারপতি এম আর ইমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার অভিপ্রায়ে চাকরির বয়সসীমা বাড়িয়ে দেওয়া ও তৎপরবর্তী বিএনপি সরকারের কার্যকলাপে আর সেই বিশ্বাসের জায়গা নেই এমন কি বিচারপতি খায়রুল হকও আর সরকার প্রধান হতে চান না। এমনকি বিচারপতিদের বিব্রত ও বিতর্কিত না করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি তাঁর রায়ে।

৪। আসলে এখন নির্বাচনটি মুখ্য নয়। এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও এই প্রশ্নে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান। কারণ বিএনপি জামায়াতের দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সহচর। এবং স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্জম্মদাতা। কাজেই বিএনপি তার দীর্ঘ কালের সহচর ও সহযোদ্ধাকে বেকায়দায় ফেলে একটি নির্বাচনে আসতে রাজি নয়। বর্তমানের পরিস্থিতি অনেকটা একাত্তরের পরিস্থিতিরই মতো। শুধু দেশে নয়, বাংলাদেশের প্রশ্নে এখন বিশ্ব রাজনীতিতেও একাত্তরের মতো মেরুকরণ ঘটেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে রাষ্ট্রগুলো আমাদের বন্ধু হিসেবে ছিল তারা ঠিকই বন্ধু আছে, অন্যদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবারও একাত্তরের ভূমিকায়। একাত্তরে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে ভারত ছাড়া তৎকালীন অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। এবার ভেঙে যাওয়া সেই সোভিয়েত পাশে নেই বাংলাদেশের। দেশের পরিস্থিতিও তাই। যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, অন্যদিকে পাকিস্তানি ও তাদের ভাবধারায় গঠিত বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অন্যদিকে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবধারায় একটি মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানানোর যুদ্ধ। যুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করছি এ কারণে যে, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক দল জামায়াত ও তার সহযোগী শক্তিগুলো ইতোমধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলে ঘোষণাও দিয়েছে। তারা অনেক আগে থেকেই গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে এসেছে।

৫। বিগত এক বছরেরও অধিক সময় ধরে বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী বা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারও রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত শিবির যা করেছে এবং তাতে নৈতিক সমর্থন দিয়ে দেশে যে পরিস্থিতি উদ্ভব করেছে তার দায় থেকে বিএনপি মুক্ত থাকতে পারে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হরতাল-অবরোধের নামে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে তাকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। বর্তমানের আন্দোলন বিএনপির আন্দোলন নয়। এবং এই আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণের চাবিও এখন বিএনপির হাতে নেই। তারা অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে কর্মসূচি দিচ্ছেন আর সারা দেশে অমানবিক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা।

৬। বর্তমান পরিস্থিতি যে একাত্তরেরই মতো তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে- পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বাংলাদেশের ওপর নিন্দা প্রস্তাব পাশ। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রতিবাদে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলাম কাদের মোল্লাকে শহীদি-পাকিস্তান আখ্যা দিয়ে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করে। তাতে সমর্থন দেয় ইমরান খানের তাহরিখ-ই-ইস্তেকলান, বর্তমান ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ও অন্যান্য কয়েকটি দল। বিরোধীতা করে পাকিস্তান পিপলস পার্টি,ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিসহ আরো কয়েকটি দল। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ও সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভীষণ আপত্তিকর মন্তব্য করেছে বাংলাদেশকে নিয়ে। সেদেশের জামায়াত পাকিস্তান সরকারকে আহবান করেছে বাংলাদেশ আক্রমণ করার জন্যে। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার আগে-পরে গোলাম মাওলা রনির মতো সাধুবেশে যে শয়তানগুলো এই কাদের মোল্লা সেই কসাই কাদের মোল্লা নয় বলে প্রচারণা চালিয়েছিল পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান তাদের গালে চপেটাঘাত হিসেবে বর্ষিত হয়েছে সন্দেহ নেই।

৭। যারা বাংলাদেশ চায়নি, তারা হুমকি দিয়ে তা কার্যকর করতে পারে যে ৫৫ হাজার বর্গমাইল তারা জ্বালিয়ে দেবে। যারা বাংলাদেশ চায়নি তারা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নও চায় না। তারা চায় এদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হোক। এদেশের অর্থনীতির চাকা একেবারে বন্ধ হয়ে গেলেও তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিএনপির মতো একটি বড় দল, যারা দুবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, বাংলাদেশের বিনির্মাণে যাদেরও কিছু অবদান ছিল তারা কেন জামায়াতের মতো একটি দলের কাছে সব কিছু সপে দিয়ে বসে আছে। জামায়াতের ইশারায় পরিচালিত হবে?

৮। কাজী রকিবউদ্দিন সাহেবের মন্তব্যের সাথে আমি একমত। বর্তমানে দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি চালানো হচ্ছে তা নির্বাচন বানচালের জন্যে নয়। মূলত বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা। বিগত ৫ বছর দেশের সকল ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটেছে তাকে বিস্ময়কর বলে আখ্যায়িত করেছিল বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়। বিশ্বের দ্রুত অগ্রসরমান দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০০৬ সালের পরে যারা আর দেশে ফেরেননি, আজকের বাংলাদেশ তাদের জন্যে এক অপার বিস্ময়। বাংলাদেশের অগ্রগতি যারা চায় না, কল্যাণ যারা চায় না এবং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নকে যারা (দেশি-বিদেশি) বাধাগ্রস্ত করতে চায় তাদের এজেন্ট হিসেবে একটি অপশক্তি আজ ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছে। আর বিএনপি একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে তাতে সমর্থন যুগিয়ে কার্যত আত্মঘাতী সিদ্ধান্তই নিচ্ছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ