পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৯ মার্চ, ২০১২

'অলির কণ্ঠে শর্মিলা বোস'

 দৈনিক আজাদী                    উপসম্পাদকীয়                       কাল আজ কাল
২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৫ চৈত্র ১৪১৮ সাল ৫ জমাদিউল আওয়াল ১৪৩৩ হিজরি

‘আলেমের ঘরে জালেম’ একটি অতি পুরনো প্রবাদ। ভালো মানুষের ঘরে কোন কুলাঙ্গার সন্তান জন্ম নিলে সাধারণত এই প্রবাদটি উচ্চারিত হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে বৃটিশ ভারতে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের নেতা নেতাজী সুভাষ বোস এর ভাতিজি লন্ডন প্রবাসী ভারতীয় শর্মিলা বসুর সাম্প্রতিক ন্যক্কারজনক কীর্তিকলাপে প্রবাদটি বেশ প্রযোজ্য বলেই মনে হয়। পত্রিকায় এই মহিলার নাম উল্লেখ করে পাঠকদের কাছে তাকে পরিচিত করে তুলবার কাজটিও আমার কাছে ভীষণ অপরুচি বলে মনে হচ্ছে। কারণ সমাজে কিছু কিছু নোংরাস্থান থাকে- যেখানে মানুষ সহজে যেতে চায় না, আর গেলেও ঐ নোংরা পদার্থগুলো ঘাঁটে না কারণ তাতে গন্ধ আরও বেশি ছড়াবে, পরিবেশ নষ্ট হবে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই বিবেকহীন মহিলা যে মিথ্যাচার ও নোংরামি করেছেন তার উল্লেখ করে আমি পক্ষান্তরে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মা ও প্রায় তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চাই না। বিশেষ কোন দেশ বা বাংলাদেশের বিশেষ কোন গোষ্ঠীর পোষ্য তথাকথিত গবেষক এই মহিলা গবেষণার নামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ শহীদ, প্রায় তিন লক্ষ নির্যাতিতা মা-বোন তথা এদেশের ১৬ কোটি মানুষকে চরমভাবে অপমান করেছেন। প্রায় সাড়ে তিন দশক পরে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দেশে কিংবা বিশ্বের কোথাও কোন প্রকার বিতর্ক নেই, একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতার সপক্ষের একটি সরকারের উদ্যোগে যখন দেশে ’৭১ এর মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারে গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালে ঘাতকদের বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে সে সময় লন্ডন প্রবাসী এক প্রকারের অখ্যাত কোন এক লেখিকা কেন, কী উদ্দেশে বা কাদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা, কটাক্ষ করা ও অপমান করার গল্প ফাঁদলেন তা খুঁজে বের করা দরকার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আজম গংদের নেতৃত্বে লন্ডন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমূহে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যাদের উদ্দেশ্য ছিল মধ্য প্রাচ্যের মুসলিমদেশ, ইউরোপ ও আমেরিকার মত দেশগুলোতে বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচার চালানো এবং ’৭১ এর ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এদেশে পাকিস্তানিদের হত্যা, ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যাকে মিথ্যা বলে প্রচার করা। এই প্রচার এখনো থেমে থাকেনি বরং সে সব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী তথা রাজাকার, আলবদর আল শামস ও শান্তি কমিটির গডফাদারদের যখন বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে দেয়া হয়েছে তখন তা বহুগুণ, বহুভাবে ও বহুমাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যখন তার সঞ্চিত সর্বস্ব বিক্রি করে বাঁচতে চায়, সে যখন ভাবে বেঁচে উঠলে তা আবার অর্জন করা সম্ভব তেমনিভাবে যুদ্ধাপরাধী অর্থাৎ জামাত-শিবির তাদের এতদিন ধরে অর্জিত অর্থ সম্পদ সবকিছু বিকিয়ে দিয়ে হলেও পুনরায় বেঁচে উঠতে চাইবে। তাই-হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা ও লবিস্ট কোম্পানির পিছনে ঢেলে তারা বর্তমান সরকার ও তাদের দ্বারা গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালকে বিতর্কিত ও ব্যর্থ করতে চাইবে। আলোচিত ঐ মহিলাও তেমনি একজন ‘পেইড গবেষক ও লেখিকা’। আমি লেখার শুরুতে বলেছি এই মহিলা বা তার লেখা ও গবেষণার বিষয়ে লিখবার রুচি আমার নেই, বড়জোর তা দিয়ে ঠেকায় পড়লে টয়লেট পেপার হিসেবে ব্যবহার করা যায় মাত্র, লিখতে বাধ্য হলাম সম্প্রতি কর্নেল অলি আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ঐ মহিলার মতের মিল খুঁজে পেয়ে। গত তেইশ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিভ্রান্ত ও রুচিহীন এই ব্যক্তি তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার স্বীকৃত এই তথ্যটিকে অবাস্তব বলে দাবি করে বলেছেন সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে যারা মারা গেছেন তারাই শুধু শহীদ, আর অস্ত্র হাতে নেয়ার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বড়জোর ৩০ হাজার। তিনি তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী গেরিলা বাহিনী, মুজিব বাহিনী, ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীসহ লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম অবদানকে অস্বীকার করেছেন। সদ্য মহাজোট ত্যাগকারি এনডিপি নেতা কিছুদিন আগে তাঁর নির্বাচনী এলাকার একজন মহিলা সাংসদকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করায় তার এলাকা, বৃহত্তর চট্টগ্রামে অবাঞ্ছিত হওয়ার পাশাপাশি সারাদেশে প্রচণ্ড সমালোচনার সম্মুখিন হয়েছিলেন। এ জন্যে মামলায় জড়িয়ে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে লাঞ্ছিতও হয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে নিন্দা জানাচ্ছি না বরঞ্চ ধন্যবাদ জানাচ্ছি অকপটে তার মনের কথা প্রকাশ করার জন্যে। কারণ তার এ বক্তব্যের দ্বারা সত্যের দুটো উদাহরণ তৈরি করেছেন তিনি, তার একটি হলো কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না, আর অপরটি হলো, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা আজীবন মুক্তিযোদ্ধা নন, কিন্তু একজন রাজাকার আজীবন রাজাকার।’ এই সত্যটি একজন মক্তিযোদ্ধার পক্ষেই সম্ভব মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা বা বিতর্কিত করা, যা অন্যের পক্ষে সম্ভব নয়। যে কাজটি অলি সাহেবের নেতা মুক্তিযোদ্ধা ও সেকটর কমান্ডার বলে খ্যাত জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন। সাড়ে তিন বছর আগে যারা একে অপরকে পেলে হত্যা করতেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের মধ্যে শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন, দালাল আইন রহিত করে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন, গোলাম আজমকে এদেশে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তার একজন গুণমুগ্ধ শিষ্য ও সেই রাজনীতির বাই প্রোডাক্ট কর্নেল অলির স্থান যে মহাজোট নয় তা অনুধাবন করতে মাত্র তিন বছরের মত সময় লাগলো আর কি। যে মুক্তিযুদ্ধ একজন সাধারণ মেজরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল, যে মুক্তিযুদ্ধ একজন অখ্যাত ক্যাপ্টেনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মন্ত্রী বানিয়েছিল সে মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার, বিকৃত ও বিতর্কিত করার কাজটি যিনি করেন তিনি বা তারা আর যাই হোক নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় না দেয়াই উচিৎ। তাদেরকে দেয়া যুদ্ধকালীন খেতাব রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেয়া উচিৎ। কারণ মুক্তিযুদ্ধ পাক-ভারত যুদ্ধ নয় এবং স্রেফ একটি রাষ্ট্র কাঠামো থেকে বেরিয়ে আরেকটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করাও নয়। মুক্তিযুদ্ধ একটি আদর্শের যুদ্ধ। একটি চেতনার যুদ্ধ। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পুনর্জাগরিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ, পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিপরীতের একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও শোষণহীন, বঞ্চনাহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা। এই চেতনা, ধারণা ও আদর্শকে যারা আজীবন লালন করতে পারেন তিনিই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর যিনি বা যাঁরা বিচ্যুত হয়ে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা মুক্তিযোদ্ধা নন। মুক্তিযোদ্ধারা সামরিক বাহিনীর লোক নন, তাই তাদের অবসরও নেই, যুদ্ধের শেষও নেই। যে আদর্শ, চেতনা থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো তার পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের শেষ নেই, সমাপ্তি নেই, তাই আমরা বলি মুক্তিযুদ্ধ অবিরাম ও প্রবহমান। এর প্রতি যারা আজীবন অবিচল তারাই মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধ করেও এই আদর্শ থেকে যারা চ্যুত হয়েছেন তারা মুক্তিযোদ্ধা নন। এভাবেই অনেকেই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকতে পারেন নি। আর সারাজীবন বাংলাদেশ ও তার প্রকৃত চেতনাবিরোধী মনোভাব নিয়ে রাজাকাররা আমৃত্যু রাজাকারই থেকে যান। কর্নেল অলিরা ‘বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ’এর মত মুক্তিযোদ্ধা সেজে প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধেরই বিশাল ক্ষতি করেছেন। শুধু বাংলাদেশের সরকার বা জনগণের পরিসংখ্যান নয় বরং বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে, এঁদের আবার শহীদ হিসেবে উল্লেখ না করার ইংগিত দিয়ে, লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে খাটো করে অলি সাহেব যে অসৌজন্য ও বিশ্বাঘাতকতার পরিচয় দিয়েছেন তার জন্যে জাতির কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন তার স্বাধীনতাকে ও তার গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন কটাক্ষকারীকে অবশ্যই জনতার বিচারের কাঠগড়ায় তোলা উচিৎ। শর্মিলা বোস নামক এক অখ্যাত লেখিকা লন্ডনে বসে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বক্তব্য ও মতামত প্রচার করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদার হানি করে যেমন অমার্জনীয় অপরাধ করছেন ঠিক তেমনি করে এদেশে বসবাস করে এ দেশের জন্মকথা নিয়ে কটাক্ষকারী অলিরাও সে তুলনায় কম অপরাধী নন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে দেশে বিদেশে অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি-তো এখন প্রকাশ্যভাবেই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে। জামাত-শিবিরের ব্যাংক ও বেকারি ও চিকিৎসা-ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে দেশে বিদেশে বিভিন্ন ট্রাইবুনাল বিরোধী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এই শক্তির ইশারায়ও তাদের শেখানো বুলিতে কথা বলছে শর্মিলা বোসদের মতো ভাড়াটিয়া লেখকরা। কর্নেল অলিদের মতো ব্যক্তিরা যখন শর্মিলা বোসদের সুরে কথা বলেন তখন আমাদের বুঝতে বাকী থাকে না শর্মিলা এত মিথ্যা লেখার সূত্র, তথ্য, অর্থ ও সাহস কাদের মাধ্যমে, কোন রাজনৈতিক জোটের দ্বারা কীভাবে ও কেন পেয়েছেন।
 

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ২২ মার্চ, ২০১২

* 'এই মার্চকে নিয়ে যাবে সেই মার্চের কাছে?'

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                     কাল, আজ, কাল
২২ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি৮ চৈত্র ১৪১৮ সাল ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

বাঙালির জীবনে একবারই একটি ‘মার্চ’ এসেছিল উনিশ’শ একাত্তরে। অবিস্মরণীয়,অসাধারণ, গৌরব আর ত্যাগের মহিমায় প্রজ্জ্বোল মার্চ। প্রায় চার হাজার বছর ধরে বঙ্গীয় বদ্বীপের এ অঞ্চলে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা মানব বসতি পরবর্তীতে যারা বাঙালি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল তাদের ইতিহাসে স্বর্ণময় একটি দিন এই মার্চ মাসের ২৬ তারিখ। এই মার্চের জন্যে এই জাতিকে হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, অপেক্ষা করতে হয়েছে এক মহামানবের জন্যে যিনি তাদের মুক্তির দূত হয়ে আসবেন। এর আগে বাঙালি কখনো স্বাধীন ছিল না। এমনকি বাঙালি জাতি হিসেবে আলাদা মর্যাদায় অভিষিক্তও হয়নি কখনো। একদা বাংলা নামে কোন দেশও ছিল না। বিভিন্ন রাজা-বাদশা বা নৃপতির দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন নামে বাঙালিরা শুধু শাসিত হয়ে এসেছে। পাল বংশ বলুন কিংবা লক্ষণ সেন, ওদের আমলেও বাঙালি স্বাধীনতা ভোগ করেনি, মূলত সামন্তশ্রেণীর শাসিত রাজ্যগুলো রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃত নয়। আমরা যে ছোটবেলা থেকে নাটক বা ইতিহাসে পড়ে এসেছি, ‘বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব---’ এ কথাটিও সত্য নয়। বস্তুত নবাব আলীবর্দী খা বা নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাঙালি ছিলেন না এবং তাদের রাজ্য বা নবাবীও স্বাধীন ছিলনা। মোঘল সম্রাটদের বার্ষিক কর প্রদানের মাধ্যমে তারা স্বাধীন নবাবের সুবিধা ভোগ করতেন শুধু, জনগণ সেখানে স্বাধীন থাকার প্রশ্নও ছিল না। বৃটিশ রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ ’৪৭ এর দেশ বিভাগের আগে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে একবার বাংলার স্বাধীনতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নষ্ট করেছিলেন তৎকালীন সর্বভারতীয় রাজনীতিকরা বিশেষ করে পাকিস্তান কেন্দ্রীক মুসলিম লীগের নেতারা। এই বিষয়টি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং বিস্তৃতও বটে। তাই অন্য কোনদিন এই বিষয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। আমরা মূল কথায় আসি।

বাঙালির জন্যে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, মানচিত্র ও পতাকার স্বপ্নকার ও তা বাস্তবায়নের দাবিদার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সারা বিশ্বে বাঙালির কিংবা বাংলা ভাষাভাষির একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। ভাষার নামে দেশের নাম সম্ভবত বিশ্বেও আর কোথাও নেই। ৪৮ সালেই এদেশের মানুষ অনুধাবন করেছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তাদের জন্যে নয়। তার ভাষা, সংস্কৃতি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে হলে, বাঁচিয়ে রাখতে হলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বেরিয়ে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাঙালির অন্তর্গত এই আতাঙক্ষা বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু যার কারণে ভাষা আন্দোলনের ‘স্পিরিট’, ত্যাগ ও অর্জনকে কাজে লাগিয়ে ক্রমে ক্রমে বাঙালির বুকে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে রোপন করে দিয়েছেন। আর খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে চারাকে বৃক্ষে রূপান্তর করে বাঙালিকে প্রথম স্বাধীনতা অর্জনের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আগে আর কোন নেতা যে বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেননি তা কিন্তু নয়। তবে তারা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন নি। জাতির এই মুক্তিদাতার জন্যে বাঙালিকে তার সৃষ্টি থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা ও বিশ্বাস এই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলেছিল একাত্তরের দুর্দান্ত,দুর্বিনীত, দুঃসাহসিক মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে। আমেরিকার পরে বাংলাদেশ দ্বিতীয় যারা ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেছিল। দু’একটির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম যারা স্বাধীনতা দিবস ছাড়াও একটি বিজয় দিবস উদযাপন করে থাকে।

মার্চ শুধুমাত্র স্বাধীনতা দিবসের মাস নয়, বরং ১৯৭১ এর মার্চ মাসের প্রতিটি দিন,প্রতিটি ক্ষণ বাঙালির ইতিহাসের এক অনন্য ও ঘটনাবহুল উপাদান। তারপর থেকে বিশেষ করে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পরে দীর্ঘ ২৮ বছর এই মার্চকে ম্লান করে দেয়ার চক্রান্ত করা হয়েছে। গৌরবকে আড়াল করে মার্চকে মার্চপাস্টের মাসে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার দীর্ঘ ৪১ বছর পরে এই গৌরবের মার্চেই বাঙালির সমুদ্র’জয় ঘটলো। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপহার দিয়েছিলেন ১৪৪,০০০ বর্গ কিলোমিটার সার্বভৌম বাংলাদেশ আর তার একচল্লিশ বছর পরে আরেক মার্চে তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কল্যাণে জাতি অর্জন করলো প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান ১ লক্ষ ১১ হাজার বর্গ কিলোমিটার জলসীমায় বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব। এ যেন এক নতুন বাংলাদেশ অবিষ্কার। বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর মহান মার্চের গৌরবের এক প্রবহমান যুগলবন্দি। চারদশক ধরে ঝুলে থাকা মিয়ানমারের সাথে সমুদ্র সীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যে বর্তমান সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্রসীমার দাবি নিয়ে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (ইটলস)এ মামলা দাখিল করে। অনেক কারণে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে ঐতিহাসিক এই রায়ের ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির সাথে সাথে ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার পথও প্রশস্ত হলো। যদি তাই হয় তবে আগামী বছর দুয়েকের ভেতর সমুদ্র সীমা আরো বিস্তৃত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের এত বিশাল অর্জন এই-ই প্রথম। অথচ অদ্ভুদ এক স্থবির জাতি আমরা এত বিশাল অর্জন, প্রাপ্তি ও বিজয়টিকে সম্মিলিতভাবে। জাতীয়ভাবে “সেলিব্রেট” করতে পারিনি। এই সুসংবাদের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেছেন এটি সরকারের নয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সফলতা। হায়রে প্রশংসা কৃপণতা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠান বলেতো কখনো শুনিনি। কান টানলে যে মাথা আসে তা সম্ভবত আমাদের ক্ষুদ্র প্রাণের রাজনীতিকরা ভুলে যান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের মাধ্যমে হলেও এই প্রাপ্তি ও অর্জন তো পুরো জাতির। পুরো বাংলাদেশের। দলীয় সংকীর্ণতার কারণে মানুষ বুঝেই উঠতে পারলোনা ১৪ মার্চ ছিল জাতির আরেকটি বিজয় দিবস।

এই মার্চের ২০ তারিখে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল। যে এশিয়া কাপে এর আগে একটিও বড় জয় ছিল না বাংলাদেশের, বড় তিন শক্তির কাছে ব্রাত্য হয়ে পড়ে থাকা বাংলাদেশ প্রথম খেলাতেই পাকিস্তানিদের জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভিত আর আগের মত নড়বড়ে নেই। পরবর্তী ম্যাচে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে বিজয় সে কথারই প্রতিধ্বনি। আর গত মঙ্গলবার এশিয়া কাপের একাদশতম আসরে দশবারের ফাইনালিস্ট শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মত ফাইনালে বাংলাদেশ। যে রাতে দেশের কোটি কোটি মানুষ অবাক চোখে বাংলাদেশের বিজয় দেখেছে। স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শকদের উল্লাসের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখা গেল আনন্দে হাততালি দিতে। প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আনন্দকে এভাবেই ভাগ করে নিতে হয়। এই দল গঠনে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল যার কারণে প্রধান নির্বাচক আকরাম খান পদত্যাগও করেছিলেন। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সে জটিলতা দূর হয়েছিল। যার সুফল গত মঙ্গলবার মিরপুর স্টেডিয়ামে প্রত্যক্ষ করলো জাতি।

আজ ২২ মার্চ আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা। এশিয়া কাপ ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। খেলার সাথে রাজনীতি নেই বটে তবে আবেগতো আছে। আজ থেকে ৪২ বছর আগে পাকিস্তানের সাথে নয় মাস যুদ্ধ করে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত প্রায় আড়াই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম আর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছিলাম স্বাধীনতা। যার চারদশক পূর্তি আমরা এখনো পালন করে চলছি। এই স্বাধীনতার মাসেই, ২৬ তারিখের খুব কাছাকাছিতে আবারও আমাদের মুখোমুখি পাকিস্তান।

আন্তর্জাতিকভাবে পরিচয়দানকারী বাংলাদেশের ক্রিকেট দল, দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ান ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করা উজ্জ্বীবিত ক্রিকেট দল, লক্ষ কোটি মানুষের আশির্বাদ ও ভালবাসায় সিক্ত ক্রিকেট দল এই মার্চে কি আরেকটি ঐতিহাসিক বিজয় উপহার দেবে আমাদের? অনেক ঘটনা অনেক অর্জন অনেক আবেগের মাস মার্চে কি আরেকটি বিজয়ের দিন যুক্ত হবে? প্রিয় সাকিব, প্রিয় মাশরাফী, প্রিয় নাজমুল, প্রিয় তামিম, প্রিয় মুশফিক, প্রিয় বাংলাদেশ দল তোমাদের কাছে এটুকু প্রত্যাশা করা কি বেশি হয়ে যাবে!জাতি ভীষণ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে প্রিয় সন্তানেরা। ৪১ বছর পরে সেই মার্চ মাসে,২৬ মার্চের মাত্র চারদিন আগে, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে আরেকবার পাকিস্তানের পরাজয় দেখার সাধ পূর্ণ হবে তো। তোমরা কি এই মার্চকে নিয়ে যাবে সেই মার্চের কাছে?

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলামলেখক
email: qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ