পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২২ মার্চ, ২০১২

* 'এই মার্চকে নিয়ে যাবে সেই মার্চের কাছে?'

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                     কাল, আজ, কাল
২২ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি৮ চৈত্র ১৪১৮ সাল ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

বাঙালির জীবনে একবারই একটি ‘মার্চ’ এসেছিল উনিশ’শ একাত্তরে। অবিস্মরণীয়,অসাধারণ, গৌরব আর ত্যাগের মহিমায় প্রজ্জ্বোল মার্চ। প্রায় চার হাজার বছর ধরে বঙ্গীয় বদ্বীপের এ অঞ্চলে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা মানব বসতি পরবর্তীতে যারা বাঙালি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল তাদের ইতিহাসে স্বর্ণময় একটি দিন এই মার্চ মাসের ২৬ তারিখ। এই মার্চের জন্যে এই জাতিকে হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, অপেক্ষা করতে হয়েছে এক মহামানবের জন্যে যিনি তাদের মুক্তির দূত হয়ে আসবেন। এর আগে বাঙালি কখনো স্বাধীন ছিল না। এমনকি বাঙালি জাতি হিসেবে আলাদা মর্যাদায় অভিষিক্তও হয়নি কখনো। একদা বাংলা নামে কোন দেশও ছিল না। বিভিন্ন রাজা-বাদশা বা নৃপতির দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন নামে বাঙালিরা শুধু শাসিত হয়ে এসেছে। পাল বংশ বলুন কিংবা লক্ষণ সেন, ওদের আমলেও বাঙালি স্বাধীনতা ভোগ করেনি, মূলত সামন্তশ্রেণীর শাসিত রাজ্যগুলো রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃত নয়। আমরা যে ছোটবেলা থেকে নাটক বা ইতিহাসে পড়ে এসেছি, ‘বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব---’ এ কথাটিও সত্য নয়। বস্তুত নবাব আলীবর্দী খা বা নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাঙালি ছিলেন না এবং তাদের রাজ্য বা নবাবীও স্বাধীন ছিলনা। মোঘল সম্রাটদের বার্ষিক কর প্রদানের মাধ্যমে তারা স্বাধীন নবাবের সুবিধা ভোগ করতেন শুধু, জনগণ সেখানে স্বাধীন থাকার প্রশ্নও ছিল না। বৃটিশ রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ ’৪৭ এর দেশ বিভাগের আগে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে একবার বাংলার স্বাধীনতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নষ্ট করেছিলেন তৎকালীন সর্বভারতীয় রাজনীতিকরা বিশেষ করে পাকিস্তান কেন্দ্রীক মুসলিম লীগের নেতারা। এই বিষয়টি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং বিস্তৃতও বটে। তাই অন্য কোনদিন এই বিষয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। আমরা মূল কথায় আসি।

বাঙালির জন্যে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, মানচিত্র ও পতাকার স্বপ্নকার ও তা বাস্তবায়নের দাবিদার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সারা বিশ্বে বাঙালির কিংবা বাংলা ভাষাভাষির একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। ভাষার নামে দেশের নাম সম্ভবত বিশ্বেও আর কোথাও নেই। ৪৮ সালেই এদেশের মানুষ অনুধাবন করেছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তাদের জন্যে নয়। তার ভাষা, সংস্কৃতি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে হলে, বাঁচিয়ে রাখতে হলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বেরিয়ে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাঙালির অন্তর্গত এই আতাঙক্ষা বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু যার কারণে ভাষা আন্দোলনের ‘স্পিরিট’, ত্যাগ ও অর্জনকে কাজে লাগিয়ে ক্রমে ক্রমে বাঙালির বুকে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে রোপন করে দিয়েছেন। আর খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে চারাকে বৃক্ষে রূপান্তর করে বাঙালিকে প্রথম স্বাধীনতা অর্জনের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আগে আর কোন নেতা যে বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেননি তা কিন্তু নয়। তবে তারা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন নি। জাতির এই মুক্তিদাতার জন্যে বাঙালিকে তার সৃষ্টি থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা ও বিশ্বাস এই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলেছিল একাত্তরের দুর্দান্ত,দুর্বিনীত, দুঃসাহসিক মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে। আমেরিকার পরে বাংলাদেশ দ্বিতীয় যারা ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেছিল। দু’একটির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম যারা স্বাধীনতা দিবস ছাড়াও একটি বিজয় দিবস উদযাপন করে থাকে।

মার্চ শুধুমাত্র স্বাধীনতা দিবসের মাস নয়, বরং ১৯৭১ এর মার্চ মাসের প্রতিটি দিন,প্রতিটি ক্ষণ বাঙালির ইতিহাসের এক অনন্য ও ঘটনাবহুল উপাদান। তারপর থেকে বিশেষ করে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পরে দীর্ঘ ২৮ বছর এই মার্চকে ম্লান করে দেয়ার চক্রান্ত করা হয়েছে। গৌরবকে আড়াল করে মার্চকে মার্চপাস্টের মাসে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার দীর্ঘ ৪১ বছর পরে এই গৌরবের মার্চেই বাঙালির সমুদ্র’জয় ঘটলো। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপহার দিয়েছিলেন ১৪৪,০০০ বর্গ কিলোমিটার সার্বভৌম বাংলাদেশ আর তার একচল্লিশ বছর পরে আরেক মার্চে তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কল্যাণে জাতি অর্জন করলো প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান ১ লক্ষ ১১ হাজার বর্গ কিলোমিটার জলসীমায় বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব। এ যেন এক নতুন বাংলাদেশ অবিষ্কার। বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর মহান মার্চের গৌরবের এক প্রবহমান যুগলবন্দি। চারদশক ধরে ঝুলে থাকা মিয়ানমারের সাথে সমুদ্র সীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যে বর্তমান সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্রসীমার দাবি নিয়ে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (ইটলস)এ মামলা দাখিল করে। অনেক কারণে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে ঐতিহাসিক এই রায়ের ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির সাথে সাথে ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার পথও প্রশস্ত হলো। যদি তাই হয় তবে আগামী বছর দুয়েকের ভেতর সমুদ্র সীমা আরো বিস্তৃত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের এত বিশাল অর্জন এই-ই প্রথম। অথচ অদ্ভুদ এক স্থবির জাতি আমরা এত বিশাল অর্জন, প্রাপ্তি ও বিজয়টিকে সম্মিলিতভাবে। জাতীয়ভাবে “সেলিব্রেট” করতে পারিনি। এই সুসংবাদের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেছেন এটি সরকারের নয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সফলতা। হায়রে প্রশংসা কৃপণতা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠান বলেতো কখনো শুনিনি। কান টানলে যে মাথা আসে তা সম্ভবত আমাদের ক্ষুদ্র প্রাণের রাজনীতিকরা ভুলে যান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের মাধ্যমে হলেও এই প্রাপ্তি ও অর্জন তো পুরো জাতির। পুরো বাংলাদেশের। দলীয় সংকীর্ণতার কারণে মানুষ বুঝেই উঠতে পারলোনা ১৪ মার্চ ছিল জাতির আরেকটি বিজয় দিবস।

এই মার্চের ২০ তারিখে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল। যে এশিয়া কাপে এর আগে একটিও বড় জয় ছিল না বাংলাদেশের, বড় তিন শক্তির কাছে ব্রাত্য হয়ে পড়ে থাকা বাংলাদেশ প্রথম খেলাতেই পাকিস্তানিদের জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভিত আর আগের মত নড়বড়ে নেই। পরবর্তী ম্যাচে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে বিজয় সে কথারই প্রতিধ্বনি। আর গত মঙ্গলবার এশিয়া কাপের একাদশতম আসরে দশবারের ফাইনালিস্ট শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মত ফাইনালে বাংলাদেশ। যে রাতে দেশের কোটি কোটি মানুষ অবাক চোখে বাংলাদেশের বিজয় দেখেছে। স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শকদের উল্লাসের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখা গেল আনন্দে হাততালি দিতে। প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আনন্দকে এভাবেই ভাগ করে নিতে হয়। এই দল গঠনে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল যার কারণে প্রধান নির্বাচক আকরাম খান পদত্যাগও করেছিলেন। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সে জটিলতা দূর হয়েছিল। যার সুফল গত মঙ্গলবার মিরপুর স্টেডিয়ামে প্রত্যক্ষ করলো জাতি।

আজ ২২ মার্চ আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা। এশিয়া কাপ ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। খেলার সাথে রাজনীতি নেই বটে তবে আবেগতো আছে। আজ থেকে ৪২ বছর আগে পাকিস্তানের সাথে নয় মাস যুদ্ধ করে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত প্রায় আড়াই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম আর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছিলাম স্বাধীনতা। যার চারদশক পূর্তি আমরা এখনো পালন করে চলছি। এই স্বাধীনতার মাসেই, ২৬ তারিখের খুব কাছাকাছিতে আবারও আমাদের মুখোমুখি পাকিস্তান।

আন্তর্জাতিকভাবে পরিচয়দানকারী বাংলাদেশের ক্রিকেট দল, দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ান ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করা উজ্জ্বীবিত ক্রিকেট দল, লক্ষ কোটি মানুষের আশির্বাদ ও ভালবাসায় সিক্ত ক্রিকেট দল এই মার্চে কি আরেকটি ঐতিহাসিক বিজয় উপহার দেবে আমাদের? অনেক ঘটনা অনেক অর্জন অনেক আবেগের মাস মার্চে কি আরেকটি বিজয়ের দিন যুক্ত হবে? প্রিয় সাকিব, প্রিয় মাশরাফী, প্রিয় নাজমুল, প্রিয় তামিম, প্রিয় মুশফিক, প্রিয় বাংলাদেশ দল তোমাদের কাছে এটুকু প্রত্যাশা করা কি বেশি হয়ে যাবে!জাতি ভীষণ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে প্রিয় সন্তানেরা। ৪১ বছর পরে সেই মার্চ মাসে,২৬ মার্চের মাত্র চারদিন আগে, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে আরেকবার পাকিস্তানের পরাজয় দেখার সাধ পূর্ণ হবে তো। তোমরা কি এই মার্চকে নিয়ে যাবে সেই মার্চের কাছে?

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলামলেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ