পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

'জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানো যাবে কি?' ১ম পর্ব

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                                       কাল আজ কাল
২৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১৫ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
প্রিজনভ্যানে বোমা মেরে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে ৩ জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর দেশজুড়ে আবার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব হয়েছে কি? বাংলা ভাই নেই কিন্তু জেএমবির কার্যক্রমতো বন্ধ হয়নি। প্রিজনভ্যান থেকে এভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা অতীতে ঘটেনি। এই আলোচনা ও উত্তেজনা শেষ হতে না হতেই গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রায় সব পত্রিকায় একটি সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে বিশ্বের ১০টি সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তালিকায় এবার উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নাম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক তথ্য ও মতামত প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে পরিচিত আইএইচএসের ‘আইএইচএস জেন্সস গ্লোবাল টেরোরিজম এন্ড ইনসারজেন্সি অ্যাটাক ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের’ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নাম ৩ নম্বরে উল্লেখ করা হয়েছে। গত প্রায় দু’বছর ধরে আন্দোলনের নামে মূলত একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতের নেতাদের মুক্তি দাবি ও বিচারের বিরোধীতা করতে গিয়ে যে সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে তাঁর ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে তারা। এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে।

গত শনিবার রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশ সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত ‘জঙ্গিবাদের হুমকি, বাংলাদেশের ভাবনা শীর্ষক আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার আবদুর রশিদ দাবি করেছেন হরকাতুল জিহাদ, হিজবুত তাহরীর, জামায়াতুল-মুজাহিদিনসহ বাংলাদেশে মোট ৪০টির মতো জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। ব্যারিস্টার রশিদ জঙ্গিবাদের কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, হরকাতুল জিহাদ, হিজবুত তাহরীর জামায়াতুল মুজাহিদিনসহ যে ৪০টি জঙ্গি সংগঠন আছে তাদের কারণে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ২২ হাজার ৭শ জনের মৃত্যু হয়েছে। হিন্দুদের ৩০০ মন্দির, ৫০০ বাড়ি ও ২০০ দোকান ভাঙচুর হয়েছে। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ দেশের মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে। জঙ্গিবাদ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে সাংঘর্ষিক। তথাকথিত জিহাদ, খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে জঙ্গিবাদ চলছে।’ বর্তমানে শুধু এই কয়টি দেশই নয়, প্রায় সবকটি মুসলিম প্রধান দেশে জঙ্গিবাদ মানব সভ্যতা, শান্তি ও প্রগতির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। অনেকক্ষেত্রে অমুসলিম দেশগুলোও নিস্তার পাচ্ছে না আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলো থেকে।

মূলত বিশ্ব আজ দুটি অপশক্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে। একদিকে পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি অন্যদিকে উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আড়ালে ফ্যাসিবাদ। এই দুই অপশক্তির মাঝখানে পড়ে বিপন্ন হচ্ছে মানবতা। সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার ভারসাম্যহীন বিশ্বে আজ একক পরাশক্তি হয়ে উঠতে চায়। এজন্যে বিশ্বের কিছু কিছু দেশে ঘাঁটি গড়ে তুলতে চায় আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের জন্য। বিশ্বের তাবৎ জ্বালানী তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্যে তেল রফতানিকারক প্রায় সবদেশেই তারা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে আগেই। আমেরিকা তাঁর এসব অপকর্ম করার লক্ষ্যে যেসব দেশে তাঁর আগ্রাসন পরিচালনা করেছে তাঁর অধিকাংশই মুসলিম প্রধান দেশ। এসব দেশে আমেরিকার অন্যায় আচরণ ও কিছু কিছু দেশের শাসকশ্রেণির নতজানু ও তাঁবেদারি আচরণের প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের জনগণের মধ্যে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আমেরিকা বিরোধী একটি মনোভাব জাগ্রত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বে তেমন কোনো রাজনৈতিক বিরোধীতা গড়ে না ওঠায় তরুণদের এই ক্ষোভ ও বিদ্রোহকে পুঁজি করার সুযোগ পেয়েছে কিছু উগ্র ইসলামী চিন্তাবিদ। যারা পরবর্তীতে গড়ে তোলে বিভিন্ন সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠী। ইরাকে অন্যায় যুদ্ধ ও সাদ্দামকে প্রহসনের বিচারে হত্যা, লাদেনের খোঁজে পাকিস্তান-আফগানিস্তানে আমেরিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় লিবিয়ার গাদ্দাফিকে উৎখাত ও প্রকাশ্য রাজপথে তাকে হত্যা করা এবং নির্লজ্জ ও অনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থনদান বিশ্বব্যাপী আমেরিকা বিরোধী একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তৈরি হয় মুসলিমদের মধ্যে। যেহেতু সাম্যবাদী ও সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র এখন নেই মার্কিন বিরোধী তেমন কোনো সংগঠনও নেই বিশ্বব্যাপী সেহেতু এই ক্ষোভের সমস্ত ফল তুলে নেয় ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীরা। যদিও এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে তৈরি করেছিল প্রথমে আমেরিকাই আফগানিস্তানে সোভিয়েত উপস্থিতি প্রতিহত করার লক্ষ্যে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে মূলত জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের পৃষ্ঠপোষকতায়। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। এর আগে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে সব ধরনের ধর্মীয় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। জিয়ার আমল থেকে শুরু করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জামায়াত ও শিবির বাংলাদেশে দাপটের সাথে রাজনীতি করেছে। ছাত্র রাজনীতিতে রগ কাটা ও নৃশংস হত্যার সংস্কৃতি চালু করে ইসলামী ছাত্র শিবির। প্রথম প্রথম রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে তাদের স্লোগানও ছিল বেশ আকর্ষণীয় ও আবেগময়। গত শতকের ৭০ দশকের শেষে ও ৮০ দশক পর্যন্ত শিবিরের রাজনৈতিক আহবান ছিল এক ধরনের ইমোশনাল ব্লাকমেইলিং করার মতো। যেমন হাটহাজারী কলেজ মাঠের পূর্ব পাশের দেওয়ালে বর্তমানে উপজেলা পরিষদের পেছনের দেওয়াল। বড় বড় হরফে লেখা স্লোগানটির কথা আমার এখনো মনে পড়ে, ‘পুঁজিবাদ সেতো অভিশাপ, সমাজতন্ত্র সেতো আত্মার বন্দিশালা, হে মানুষ বাঁচতে চাও কি আল-কোরান তোমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে।’ তাদের এমন ডাকে সাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ আজ দিকভ্রান্ত মানবতাহীন অবিবেচক ও হন্তারক হয়ে উঠেছে। এই সংগঠন আজ বিশ্বের সশস্ত্র গোষ্ঠীর তালিকায় তিন নম্বরে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের জনগণ এই জঙ্গি গোষ্ঠীর রূপ ভালোভাবেই প্রত্যক্ষ করেছে গত ২০০১-২০০৬ বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ও সময়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চরম উত্থান ঘটে বাংলাদেশে। শুধু দেশে নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কয়েকটি প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে তৎকালীন সরকার ও দেশের জঙ্গিদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। উলফার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের জন্য আনীত অস্ত্রের চালান ধরা পড়ে যাওয়ায় এ সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

জেএমবির জঙ্গিদের দ্বারা আসামী ছিনতাই ঘটনার পর বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে আবার আলোচনা হচ্ছে। যদিও অন্তত গত দু’দশক ধরে দেশে জঙ্গি তৎপরতা অব্যাহতভাবে চলছে। তবে কখনো তা নীরবে (বর্তমান সরকারের শাসনকালে) কখনো সরবে (বিএনপি-জামাত) জোট শাসনকালে।

বাংলাদেশে উগ্র ইসলামী গোষ্ঠী ও জঙ্গিদের শ্রেণি আবার এক নয়। জামায়াতে ইসলামসহ কয়েকটি ইসলামী দলের কর্মী সমর্থকরা সমাজের নিম্নস্তর থেকে শুরু করে উচ্চ স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। সমাজের সকল পেশায় এবং সরকার বা প্রশাসনের সব স্তরে জামায়াতের নেতা ও কর্মীরা সক্রিয়। তারা স্ব-স্ব অবস্থান থেকে দলের জন্য কাজ করেন। এর মধ্যে দলকে সংগঠিত করা, দলের জন্য নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ ও নিজেদের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ দলের তহবিলে প্রদান করাও এই শর্তে দলীয় লোকদের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের তথ্য ফাঁস করা ইত্যাদি কাজ করে থাকেন। এই গোষ্ঠীর আবার একেবারে সাধারণ সমর্থকও আছে যারা দলের একেবারে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে থাকেন। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায় ঘোষিত হওয়ার পর তাকে ‘চাঁদে দেখা গেছে এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার ও গুজব রটানোর ক্ষেত্রে এরা কাজ করে এবং সাধারণ সহজ-সরল মানুষকে ধর্মের কথা বলে। বেহেস্ত দোজখের কথা বলে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে।

হিজবুত তাহরীরের মতো কিছু সংগঠন আছে। এই সংগঠনগুলো প্রচণ্ড আমেরিকা বিরোধী। এই ধরনের দলগুলোর নেতা ও কর্মীরা সমাজের বিত্তশালী ও উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের সদস্য। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব দলের অন্যতম টার্গেট। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই এ ধরনের উগ্র ও জঙ্গিবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। গণ-জাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের বিরুদ্ধে এ দলগুলো অত্যন্ত সক্রিয়। এদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিরূপ অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও সুপরিকল্পিত। এ সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের শাখা। বাংলাদেশে এ দল নিষিদ্ধ। তবে উল্লেখ করার বিষয় যে, যে কারণে এবং যত তাড়াতাড়ি হিজবুত তাহরীরের মতো দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সে একই কারণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হয়নি। তার কারণ হিজবুত তাহরীররা প্রচণ্ড মার্কিন বিরোধী আর জামায়াত-মার্কিন সমর্থক। মার্কিন সবুজ সংকেত পাওয়া যায়নি বলে বাংলাদেশে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি বলে অনেকের ধারণা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই কি সব ল্যাটা চুকে বুকে যাবে? দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? হিজবুত তাহরীর, জেএমবিসহ অনেক দলই তো নিষিদ্ধ, তাই বলে কি তাদের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে? জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে কি তাদের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে? অতীতের অভিজ্ঞতা তা বলে না। নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে হয়ত প্রকাশ্যে মিটিং-মিছিল করা সম্ভব হবে না ওদের। সরকার অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কিন্তু গোপন তৎপরতা রোধে কী-ই বা করতে পারবে।

ধর্মীয় জঙ্গিবাদ প্রতিহত করার একটি বিপদ হচ্ছে এরা ন্যক্কারজনকভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে। নিজেরা আক্রান্ত হলে ধর্মকে আক্রমণ করা হয়েছে কিংবা ইসলাম ধর্মের ওপর আঘাত বলে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করে তুলতে পারে। ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যাকে হারাম এবং এই কাজ নিন্দিত করা হলেও এরা জিহাদের নামে আত্মঘাতি হামলা, বোমা হামলা করে থাকে, যা ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না।

এরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে নিজেদের এবং দলের প্রচার-প্রপাগান্ডায় এদের মেধাকে কাজে লাগায়। এরা চিন্তা-চেতনায় অত্যন্ত পশ্চাদমুখী, রক্ষণশীল ও পাশ্চাত্য বিরোধী হলেও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (যার অধিকাংশই এদের ভাষায় ইহুদী-নাছারা তাদের সৃষ্টি) ব্যবহার করে পূর্ণ মাত্রায়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ওরা অত্যন্ত দক্ষ। এদের কয়েক হাজার দক্ষ প্রশিক্ষিত তরুণ আছে যাদের নিয়মিত বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক সব ধরনের তৎপরতায় সক্রিয় থাকার জন্য। যে কারণে অন-লাইনভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে এদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বাঁশের কেল্লা ধরনের অনেক ‘সাইট’ আছে যার মাধ্যমে নিয়মিত তারা তাদের দলের পক্ষে প্রচার ও অপ্রচার করে থাকে।

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংগঠনের অবস্থান বেশ ভালো এবং ধীরে ধীরে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রভাব বিস্তারে সক্ষমও হয়েছে। প্রিজনভ্যান থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জেএমবি নেতাদের ছিনতাই ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হলে বোঝা যেত সরকারি কোন কোন প্রতিষ্ঠান ও মহলের সাথে এ ধরনের জঙ্গি দলগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে।

ক্ষমতায় যাওয়া আর সন্ত্রাস ও জঙ্গি নির্মূল করা সমার্থক নয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে বলে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আছে ভেবে বসে তাকলে চলবে না। এর জন্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি প্রয়োজন। বলা বাহুল্য তা খুব স্বল্প মেয়াদী হলেও হবে না। কারণ দীর্ঘ বছর ধরে গেড়ে বসা এই শক্তিকে প্রতিহত করতে স্বল্প-মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে তা নিয়ে আগামী কিস্তিতে আলোচনার আশা রইল।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com Google+

বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

'ড. অনুপম সেন এমন বিনয়ী দেখিনি'

দৈনিক আজাদী                                     উপসম্পাদকীয়                                          কাল আজ কাল
২০ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ৮ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপ শ্রেণীকক্ষে বসে বাইরের আবহাওয়া আন্দাজ করা যায় না। মেয়েটি ক্লাস শেষ
করে বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে দেখল অঝোর বৃষ্টি ঝড়ছে। রাস্তায় রিকশা-টেক্সিও কম। বৃষ্টি থেকে গা বাঁচাতে অনেকে বিল্ডিংয়ের নিচে গাদাগাদি করে ঠাঁই নিয়েছে। অগত্যা মেয়েটিও মিশে গেল সেখানে। প্রতীক্ষা একটি রিকশার। বৃষ্টির ছাঁট লেগে অনেকের মতো তার পোশাক ভিজে একশা। এরই মধ্যে মেয়েটি হঠাৎ দেখতে পেল একটি গাড়ি প্রায় তার সামনে এসে দাঁড়াল। পিছনের জানালার গ্লাস নেমে একজন বললেন, ‘এসো মা তোমাকে আমি নামিয়ে দিচ্ছি। এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তো গাড়ি পাবে না।’ মেয়েটি চমকে গেল, আরে এঁযে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। মেয়েটি লজ্জা ও দ্বিধা নিয়ে বলল, না থাক স্যার, আমি যেতে পারব। মেয়েটির আড়ষ্টতা দেখে স্যার হয়ত ভাবলেন মেয়েটি তাঁর সাথে পেছনের সিটে বসতে লজ্জা পাচ্ছে। এবার তিনি দরজা খুলে মেয়েটিকে বললেন, মা তুমি পেছনে বসো, আমি সামনে বসলাম। তিনি সামনের সিটে বসলেন, এই করতে গিয়ে তাঁকেও ভিজতে হলো খানিকটা অগত্যা মেয়েটিকে উঠতে হলো গাড়িতে। মেয়েটির গন্তব্য পৌঁছে দেওয়া হলো সেদিন।

মাফ করবেন এটি কোনো গল্পের অংশ বিশেষ নয়। ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আমিও যাই। যাই মূলত উপাচার্য স্যারের কাছে। তাঁর বাসায়ও যাই। তবে যেখানে যাই শুধু সাদরে গ্রহণ করে পরম আন্তরিকতায় আতিথেয়তা করেন তা নয় ফিরে আসার সময়ে দরজাকে পর্যন্ত খুলে বলবেন, ভালো থাকুন বাদল। এ অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়। আমাদের অনেকের।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম-প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য তিনি- ড. অনুপম সেন, আমি এমন বিনয়ী মানুষ দেখিনি। স্যারকে অনেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কিংবা সভাপতি হতে হয়। এভাবে তাঁকে আমাদের অনুষ্ঠানেও আসতে হয়েছে। এর জন্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু স্যারকে টেলিফোনেই বলেছি, তিনি সানন্দে সম্মতি দিয়েছেন। অথচ এই শহরেই অনেককে অতিথি, প্রধান অতিথি বা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করার অনুরোধ জানাতে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করতে হয়, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে অপমানও করেন। এই ধরণের তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশের সকল সংস্কৃতিকর্মীদেরই আছে। মনে পড়ছে তিন/ চার বছর আগে আমি আর নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে চরমভাবে অপমানিত হয়েছিলাম স্বঘোষিত ওস্তাদ বলে এক বংশিবাদকের কাছে। ড. সেন স্যারকে অনুষ্ঠানে অতিথি করতে গিয়ে আয়োজকরা তাঁর কাছ থেকে অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদাও নিয়ে আসেন। প্রায় অনুষ্ঠানের জন্য তাঁর কমপক্ষে বরাদ্দ থাকে একটি কড়কড়ে পাঁচ শ টাকার নোট। অনুরোধ-উপরোধে তা বাড়তে থাকে। বলছিলাম যে, তাঁকে প্রায়ই টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানাই। তো তেমন কোনো একদিন তিনি টেলিফোন রিসিভ করতে না পারলে পরে কল-ব্যাক করেন। জানতে চান কেন ফোন করেছিলাম। এই নিয়মের ব্যত্যয় কখনো হয়নি। স্যারের দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে আমি তাঁর একজন ছাত্র হওয়ারও যোগ্য নই তবুও তিনি এই ক্ষুদ্র মানুষটির প্রতি যে সৌজন্য ও বিনয় প্রদর্শন করেন তা দেখে আমি কখনো কুক্তিত কখনো বিস্মিত হই। এই ‘হামবড়া’ সমাজে, মেকি ও হিপোক্র্যাট সমাজে ড. অনুপম সেন একজন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। শুনেছি তিনি যখন তাঁর গ্রামের বাড়িতে যান তখন তাঁর গ্রাম থেকে অনেক দূরে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। খুব সাদাসিদে ও সাধারণভাবে মিশতে চান গ্রামের মানুষের সাথে। বিলাসবহুল গাড়িটি যেন এর মধ্যে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায় সে জন্যই এই ব্যবস্থা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। পড়ে লন্ডনে পিএইচডি করে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করেন। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের কাল ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ’৭০-’৭১ এর সে উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ যাত্রাপথের তিনি অন্যতম সারথি। ’৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে চট্টগ্রাম শহরে অধ্যাপক আবুল ফজল, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ডা. কামাল-এ-খান প্রমুখের সাথে তিনিও ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল ও স্লোগানে। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ড. আসিুজ্জামানসহ ভারতে পাড়ি জমান এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের জনগণের বিশেষ করে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন আদায়ে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। এরপর থেকে বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা, জেলের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরে বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটেছে তার বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন অবিচল ভাবে। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা একজন অভিভাবকের মতো। চট্টগ্রামে সামাজিক-সাম্প্রদায়িক-রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান এখন একজন অভিভাবকের ন্যায়। তাঁর সুগভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অসাধারণ বাগ্মিতা তাঁকে চট্টগ্রামের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে ও অনুষ্ঠানে অপরিহার্য করে তুলেছে। তিনি স্বয়ং আলোকিত মানুষ। তাঁর উপস্থিতিও আলোকিত করে রাখে চারপাশ।

তিনি পিএইচডি করেছেন লন্ডনে। তাঁর গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল লন্ডনের একটি নামী প্রকাশনা সংস্থা ১৯৮২ সালে The state, industrialization and class formation in India. গবেষণা গ্রন্থটি তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও সম্মান। তিনি স্বীকৃত হয়েছেন একজন আন্তর্জাতিক সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে। স্যার একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, বইটির দাম বড্ড বেশি, বাংলাদেশে তা পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁর সংগ্রহেও আছে মনে হয় একটি মাত্র কপি। দুঃখজনক হলেও সত্যি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বইটি নিয়ে আলোচনা ও বইটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশে তেমনভাবে বইটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমার ধারণা অনেকে হয়ত এই তথ্যটিও জানেন না। এর পরে তাঁর আরও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধ,কবিতা ও অনুবাদ। সমাজ রাজনীতি অর্থনীতির মতো গভীর চিন্তামনষ্ক গ্রন্থ যেমন লিখেছেন তেমনি লিখেছেন আবেগধর্মী কবিতাও। তাঁর লেখা, পাণ্ডিত্য, প্রজ্ঞা মনন ও সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কিছু লেখার যোগ্যতাও আমার নেই। ওসব নিয়ে অন্যকোনো গবেষক, জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তি হয়ত লিখবেন। আমি শুধু তাঁর সারল্য, মানবতাবোধ, মার্জিত ও আন্তরিক-আচরণ নিয়েই বলতে চাই কারণ আমাদের সমাজে দুকলম লিখেই অনেকে নিজেদের পণ্ডিত-জ্ঞানী ও বড় লেখক বলে দাবি করেন।

দেশে আরও পণ্ডিত ব্যক্তি আছেন। বহুমাত্রিক গুণের ব্যক্তিত্বও আছেন; কিন্তু তাঁরা নিজেদের নিয়ে,নিজের অহমিকা নিয়ে এতই মগ্ন থাকেন যে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ তাঁদের কাছে ঘেঁষতে পারি না। আর এ জায়গাতেই ড. অনুপম সেন অনন্য। তিনি ছোট বড়, পরিচিত-অপরিচিত সবার সাথেই কথা বলেন, মেশেন আন্তরিকতার সাথে। আহবানে সাড়া দেন ভনিতা ও অহংকারহীনভাবে। দেশের কিংবা বিশ্বের যে কোনো বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করা যায়- তাঁর কাছ থেকে শেখা যায়। জানার এবং তা ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করার পাণ্ডিত্য ও যোগ্যতা সবার থাকে না, যা ড.অনুপম সেনের কাছে পাওয়া যায়।

এ বছর একুশের পদক পেয়েছেন ড. অনুপম সেন। আমি মনে করি, এ পদক বা সম্মান আরও আগে প্রাপ্য ছিল তাঁর। তবুও বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ। মাঝে মাঝে কিছু পদক বা স্বীকৃতি নিজেই ধন্য হয় যোগ্য ব্যক্তির করস্পর্শে। রাষ্ট্রীয় এই সম্মানপ্রাপ্তিতে স্যারকে আমাদের অভিনন্দন। যদিও চট্টগ্রামবাসী এর চেয়েও বড় সম্মান ও স্বীকৃতি তাঁকে অনেক আগেই প্রদান করেছে হৃদয়ের অর্ঘ্য দিয়ে।

ড. সেন স্যারকে দেখলে মাঝে মাঝে আমার বিশ্বকবির একটি গানের কলি মনে পড়ে। বাঙালির অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ সন্তান যা সৃষ্টি করে গেছেন তা এক বিশাল ও অফুরন্ত সম্পদ। বাঙালির প্রাত্যহিকতায় অনিবার্য রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করা এক কথায় দুঃসাধ্য। সেই বিশ্ববরেণ্য কবি তাঁর একটি বিখ্যাত গানে লিখেছেন, ‘আমার জনম গেল বৃথা কাজে/ আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে/বৃথাই তুমি শক্তি দিলে শক্তিদাতা... পণ্ডিত ড. অনুপম সেনের বিনয় এভাবেই আমার ও আমাদের কাছে তাঁকে পুজনীয় করে রেখেছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

'আগামী প্রজন্মের জন্য অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে করণীয়'

দৈনিক আজাদী                                        উপসম্পাদকীয়                                           কাল আজ কাল
১৩ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১২ রবিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
দেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। একটি শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অন্যটি বিপক্ষে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই আজ নতুন করে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটছে।

শুরুতেই আসুন সাম্প্রদায়িকতা কী, এ বিষয়ে একটি ধারণা গ্রহণের চেষ্টা করি। জাতি আর সম্প্রদায় এক কথা নয়।
এক অর্থও বোঝায় না। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠে একটি জাতিসত্তা। এর পেছনে কাজ করে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু ও অন্যান্য উপাদান। আর সম্প্রদায় সৃষ্টি হয় প্রধানত ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে জাতি হিসেবে বাঙালি হলেও এখানে ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে আমরা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ইত্যাদি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। সম্প্রদায় পরিবর্তনযোগ্য, জাতিত্ব নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরবরা একটি জাতি। তবে তারা মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্যে মিসকিন হিসেবে পরিচিত। মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তারা আরব হতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা আলাদা মর্যাদাও লাভ করে না। যতটুকু লাভ করে একজন শিক্ষিত অমুসলিম ভারতীয়। বেরাদানে মুসলিম বলা হলেও একটি পর্যায়ে যে যার জাতির পরিচয়েই বিবেচিত হয়। তেমনি করে বাঙালি খ্রিস্টানরা ইংল্যান্ডে মাইগ্রেট করার পর ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারেন, ইংরেজ জাতি নন। অর্থাৎ ধর্ম পরিবর্তন করে সম্প্রদায় পরিবর্তন করা যায় বটে, জাতিত্ব যায় না। এর আরেকটি রূপ দাঁড়াল বিভিন্ন জাতির মধ্যে আবার একই সম্প্রদায়ের লোক থাকতে পারে। যেমন বৌদ্ধ, খ্রিস্টান,মুসলিম সম্প্রদায় বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যেও বিদ্যমান।

একটি সম্প্রদায় তার ধর্ম পালন করবে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করবে, এতে কোনো দোষ নেই, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই; কারণ তা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িকতা নয়। সাম্প্রদায়িক আচরণ বা সাম্প্রদায়িকতা তখনই বলা হয়ে থাকে যখন তারা ধর্মীয় বিবেচনা থেকে অন্য ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতি বিরূপ আচরণ করে, তাদের ক্ষতিসাধন করে। ধর্মের এই উগ্র, গোঁড়া ও অসহিষ্ণু রূপটিই সাম্প্রদায়িকতা। যখন কেউ নিজ ধর্ম বা সম্প্রদায়কে অন্য ধর্ম বা সম্প্রদায়ের চেয়ে শ্রেয়তর মনে করেন এবং জোরপূর্বক তার প্রাধান্য অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তখন তাও সাম্প্রদায়িক। আর এ ক্ষেত্রে বিপদের কারণ উগ্র সম্প্রদায়টি যদি লোকসংখ্যা, জনবল,রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থনৈতিকভাবে অন্য সম্প্রদায়ের চেয়ে শক্তিশালী ও সুবিধাপ্রাপ্ত হয়। এ রকম সম্প্রদায়গত এই উন্নাসিক আচরণই হলো সাম্প্রদায়িকতা। শুধু বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে নয়, যেখানে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার আছে সেখানেই কোনো না কোনোভাবে সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান।

আমি আগেই বলেছি বাংলাদেশে বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতা প্রকটভাবে বিদ্যমান। শুধু তাই নয় বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রে বা সমাজে সাম্প্রদায়িকতা একটি মূল সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় ঐক্যও বিভক্ত হচ্ছে এই একটি প্রশ্নে। একটি পক্ষ অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে আর তার বিপরীত অংশটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সুবিধার কথাই বলে থাকেন, সকল কিছুর ঊর্ধ্বে তার সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অবস্থানের কথা ভাবেন। বলাবাহুল্য তা তারা চায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। আর এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হীনস্বার্থে ও ক্ষমতার মোহে রাজনৈতিক দলগুলো অধিকাংশ সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষ অবলম্বন করে থাকে অনৈতিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে। ভোটের রাজনীতিতে সাময়িকভাবে তারা লাভবান হলেও তাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে সমাজ জীবনের স্থিতি নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে আমাদের সমাজে সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার লাভ করেছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সহনশীলতা লোপ পেতে বসেছে।

উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ব্রিটিশ শাসনামলে। তার আগে মোঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করেছে খুব সতর্কতার সাথে। তারা এ দেশীয়দের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে আঘাত করার চেষ্টা করেনি। চেষ্টা করেনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে ধর্মকে চাপিয়ে দিতে। তারা সবসময় সমন্বয়ের চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন ধর্মের জনগোষ্ঠীর সাথে বিবাহবন্ধন বা সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ধর্ম দ্বীন-এ-এলাহীও ওই কৌশল বা সমন্বয় করে চলার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ব্রিটিশরাই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা উসকে দেওয়ার কাজ করেছে। ’ঊণশধঢণ টভঢ ৗলফণ’ ব্রিটিশদেরই প্রবর্তিত শাসন ও শোষণ কৌশল। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে বলে রাখি, টাকা-উপঢৌকন ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে রাজনীতিক বা প্রভাবশালীদের বেচাকেনার সংস্কৃতিও শুরু করেছিল ব্রিটিশরা। ১৭৫৭ সালে লর্ড ক্লাইভ অর্থ ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজের দলে ভিড়িয়েছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও প্রভাবশালী আমাত্য রাজা রায় বল্লভদের মতো ব্যক্তিদের। তারপর থেকে বেচাকেনার সংস্কৃতি যে শুরু হল তা থেকে এখনও রেহাই পায়নি ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশের রাজনীতি।

সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত ভাগ এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতা দৃঢ়মূল হওয়ার কারণ। উপমহাদেশের প্রধান দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি রাষ্ট্র। আর এ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে পাঞ্জাব ও বাংলাদেশকে।

এই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। গোড়া থেকেই এই রাষ্ট্র অমুসলিম তথা হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতি চরম ঘৃণা ও উপেক্ষা লালন করেছে। দেশত্যাগী হিন্দুদের বিষয়-সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি আখ্যা দিয়ে দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছেন তাদের হিন্দুস্তানের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চলেছে। এমনকি আমাদের যে মহান ভাষা আন্দোলন, মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ের আন্দোলন, সে আন্দোলনকেও ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে কারণ সেদিন অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে একজন হিন্দুও যদি মারা যেত তাহলে বাংলা ভাষা আন্দোলনের মোড়টাই তারা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। এই আন্দোলন হিন্দুদের ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করার সুযোগ পেত।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষা রক্ষার আন্দোলন নয়। আপাতদৃষ্টিতে সে রকম মনে হলেও তা ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ভাষার সাথে সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবোধ রক্ষারও আন্দোলন। তাই সঙ্গত কারণে ওই আন্দোলনের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছে এবং সূক্ষ্মভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালির স্বাধীন সত্তা বা স্বরাজের অংকুরোদগমও ঘটেছে। অর্থাৎ বাঙালির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারে এই সাহসী স্বপ্নের প্রণোদনা যুগিয়েছে বায়ান্নের সফল ভাষা আন্দোলন। ফলে এই আন্দোলনের মাত্র ১৮ বছর পরে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে এমন একটি দলের বিজয় লাভ সম্ভব হয়েছেন যারা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। সে দলের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করল সেই রাষ্ট্রের চার মূল স্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্ম নিরপেক্ষতাকেও গ্রহণ করল তারা। শুধু তাই নয় নতুন রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ হলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি।

এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে একটি মুসলিম দেশ থেকে আলদা হলো তা-ই নয়, সে দেশ পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো নব্য স্বাধীন এই দেশের শতকরা ৮৮ ভাগ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নিবেশিত হলো। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মধ্যরাতে শহীদমিনারে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো এবং শহীদদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানোও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। বিপদের শুরুও সেখান থেকে। কারণ শুরু থেকে বাংলাদেশের একটি বিরুদ্ধ শক্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে আখ্যায়িত করল ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতা নামে। আর শহীদমিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকে শিরিক-গুনাহর সাথে তুলনা শুরু করল। তারপরও ৭৫ পর্যন্ত রাষ্ট্রের গন্তব্য ঠিকই ছিল, কিন্তু ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে ও জেলখানায় তাজউদ্দিনসহ চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা তাদের শাসন-শোষণের পথ মসৃণ করার লক্ষ্যে ক্রমে ক্রমে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানি দিয়েছে, হীনস্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সকল অনুষ্ঠানের ইসলামীকরণ করেছেন। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করেছেন। একাত্তরে পাকিস্তানিদের সহযোগী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর মতো চরম উগ্র দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন, অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম এবং সাপ্তাহিক ছুটি রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবার করে সাধারণ মুসলমানদের ধর্মানুভূতিকে পুঁজি করা হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনীতে ক্বেরাত প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বেতার-টেলিভিশনে আজান প্রচার করে সমাজে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি ৯০ দশকের শেষের দিকে সরকারি ছত্রছায়ায় হিন্দুদের মন্দিরে হামলা চালানোর মতো অপকর্মও করা হয়েছে। এই প্রবণতা ও ধারা ১৯৯৬ পর্যন্ত বজায় ছিল। ওই বছরই অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এলেও এ ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন সাধন তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

আওয়ামী লীগ যেহেতু একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল এবং তাদের হাতেই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেহেতু স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে ৭৫-এর পর সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংগঠনগুলোর আক্রমণের শিকারে পরিণত হয় তারা। ধর্মনিরপেক্ষতাকে যেহেতু ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতা বলে প্রচার করা হয়েছে সেহেতু তারা এই অপবাদ (?) ঘোচাতে বেশি বেশি ধর্মচর্চা শুরু করেন।

মসজিদ-মাদ্রাসায় বেশি বেশি অর্থ বরাদ্দ আর হজ করে ইসলামি লেবাজ ধারনের প্রতিযোগিতায় নামেন। এমনকি খেলাফত মজলিশের মতো সংগঠনের সাথেও তারা নির্বাচনী মোর্চা গঠনের উদ্যোগ নেন। অবশ্য দেশের প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর চাপে পরে তারা সে সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।

সামাজিক কারণসমূহ

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা। সমাজে দুর্নীতি ও অসততাও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতি ঢেকে রাখতে ও নিজেকে ধার্মিক-পরহেজগাররূপে উপস্থাপন করতে ধর্মকে অবলম্বন করে অনেকে। এর সাথে যুক্ত হয় মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী প্রবাসীদের অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতা। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান ইত্যাদি আরব দেশে বসবাসকারীরা নিজ দেশে তাদের স্ত্রী কন্যাদের ওসব দেশের মহিলাদের মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য করে। ফলে এরা বাঙালি সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। ক্রমে এদের জীবনযাপনও অতি রক্ষণশীলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিবারের পুত্র-কন্যাদের মধ্যে অনেককে মাদ্রাসা শিক্ষায় উৎসাহী করে তোলা হয়। আধুনিক শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষ ছড়ান হয়।

একসময় সমাজে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা হতো। এক সময় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় ছিল যারা বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। খেলাঘর, কচি কাঁচার আসর, চাঁদের হাট, শাপলা কুঁড়ির আসরের মতো শিশুসংগঠন ছিল, যেখানে সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে সাথে শিশুকে অন্যান্য মানবিক গুণাবলীর শিক্ষা দেওয়া হত। ছেলে-মেয়ে একসাথে বেড়ে ওঠার কারণে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক তৈরি হত। প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মকা-, বিতর্ক, নাটক, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী ইত্যাদি পালন করা হত। এখন শিশু-সংগঠনগুলো অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় আর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা হয় না বললেই চলে। যাত্রাপালা, জারি-সারি, কবিগান তথা দেশি ও লোকজ সংস্কৃতিচর্চাও লোপ পেয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। সেসব স্থান দখল করেছে আকাশ সংস্কৃতি,ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা। এখন ছয় বছরের কন্যাসন্তানকেও বোরকায় আবৃত করে ফেলা হচ্ছে!

বাংলাদেশে অনেক ধর্মের লোক বাস করে। অন্যতম প্রধান চারটি ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টান,বৌদ্ধ ধর্মের লোক ছাড়াও নানা ধারার প্রকৃতি পুজারী ক্ষুদ্র ধর্মাবলম্বী লোকের বাস বাংলাদেশে। ধর্মীয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে পূর্ণ আমাদের দেশ। বছরজুড়ে লেগে থাকে কোনো না কোনো ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠান। এই বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল উদাহরণ হতে পারত আমাদের দেশ। এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য রক্ত দিয়েছে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সাম্প্রদায়িক আচরণের কারণে দেশ বিভাগের সময় যেখানে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ শতাংশে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর হিন্দুদের দেশত্যাগের ধারা রোধ করা যায়নি। মনে করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবেন। কিন্তু দিন দিন সে আশা গুড়েবালিতে পরিণত হচ্ছে। এখন তো প্রতিটি নির্বাচনের পরে কিছু হিন্দুর দেশত্যাগ নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠছে। আর স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো বিচার না হওয়ায় এ প্রবণতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু এর মাধ্যমে দেশ একটি বিপজ্জনক পরিণতির দিকে যাচ্ছে। দেশ সংঘ্যালঘু শূন্য হলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের সাথে সাথে এর অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক ধর্মের দেশে পরিণত হলে মৌলবাদ জঙ্গিবাদ আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো কট্টর ধর্মীয় দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ।

এবার ফিরে আসি নির্ধারিত বিষয়ে। আগামী প্রজন্মের জন্য অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের করণীয় কী ? বা আমাদের কী কী করতে হবে। এককথায় যদি এর উত্তর দিতে চাই, তা হল, এতক্ষণ দেশে সাম্প্রদায়িকতা উত্থানের যে কারণগুলো তুলে ধরলাম তা প্রতিহত বা দূর করতে হবে। তবেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আর বিস্তারিত বললে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রথমে প্রয়োজন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য ও সদিচ্ছা। সংবিধান থেকে সাম্প্রদায়িক বিষয়গুলো বাদ দেওয়া, রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ করা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, সমাজে অপসংস্কৃতি দূর করার লক্ষ্যে সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখা,মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা, শিক্ষায় সমতা আনা, পাঠ্যসূচিতে মানবিক বিকাশ ঘটে এমন পরিবর্তন আনা, দুর্নীতি রোধ করা, কোনো ধর্মের প্রতি আলাদাভাবে রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব না থাকা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সমাজের সর্বস্তরে মানবিক গুণের বিকাশে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরায় জেগে-ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আমি মনে করি দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে কিংবা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ওই চেতনার কাছেই ফিরে যেতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাটি প্রকৃতই একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা। অর্থাৎ জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি কিন্তু সম্প্রদায়গতভাবে আমরা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান। বাঙালি জাতির এই হাজার বছরের ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ আবার ফিরিয়ে আনার মধ্যেই নিহিত আছে শান্তি।

তবে জাতীয়তাবোধ নিয়েও বিপত্তি হতে পারে। গত শতকের ৪০ দশকে জার্মানরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি দাবি করে হিটলার যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নির্মূল করতে চেয়েছিলেন সিমেটিক ইহুদিদের। ‘সবাইকে বাঙালি হয়ে যেতে হবে’ বলেও একটা ভুল আমরা করে ফেলেছিলাম। পাকিস্তানিরা আমাদের সাথে যেরূপ আচরণ করেছিল আমার তো মনে হয় সেরূপ আচরণ আমরা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে করছি। অথচ আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। সেখানে শুধু ধর্মীয় নয় ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসনও চালাচ্ছি আমরা।

এ রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। এর ব্যত্যয় হলে এর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এ দেশকে একটি উগ্র-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করা হলে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা যাবে না।

তাই আগামী প্রজন্মের জন্য তো বটেই বাংলাদেশের জন্যও একে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগর আয়োজিত সেমিনারে পঠিত। (সংক্ষেপিত)

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ